বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীন ও যাযাবর জাতি
৫৪
চীন ও যাযাবর জাতি
৫ই জুন, ১৯৩২
চীন এবং সুদূর প্রাচ্যের দেশগুলো সম্পর্কে অনেক কাল তোমাকে কিছু লিখি নি। ইতিমধ্যে ইউরোপ, ভারতবর্ষ আর পশ্চিম এশিয়া সম্পর্কে আমরা অনেক-কিছু আলোচনা করেছি; দেখেছি, আরবজাতি দূরদূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ল, জয় করল নানা দেশ; ইউরোপ ডুবে গেল অন্ধকারে। এই সময়ে চীনের অবস্থা ছিল খুব উন্নত। সপ্তম এবং অষ্টম শতাব্দীর কথা, চীনে তখন তাঙ-বংশের রাজত্ব। এই তাঙ-সম্রাটদের রাজত্বকালে সভ্যতা, সমৃদ্ধি, এবং শাসনব্যবস্থার দিক দিয়ে চীন এত বেশি উন্নতি লাভ করেছিল যে, তৎকালে সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো দেশ চীনের সমকক্ষ ছিল না। রোমের পতনের পরে ইউরোপের এত অবনতি ঘটেছিল যে, চীনের সঙ্গে তার তুলনাই করা চলে না। উত্তর-ভারতের অগ্রগতিতেও তখন ভাঁটা পড়েছিল, ক্রমশ তার অবনতি ঘটছে; অবশ্য দাক্ষিণাত্যের অবস্থা তখন অপেক্ষাকৃত উন্নত—সাগরপারে শ্রীবিজয়া, আংকোর প্রভৃতি দাক্ষিণাত্যের উপনিবেশগুলোর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এই সময়কার চীনের প্রতিদন্দ্বীরূপে দুটি রাষ্ট্রের নাম করা যেতে পারে, তা হচ্ছে আরব রাষ্ট্র বোগদাদ আর স্পেন। কিন্তু এদের উন্নত অবস্থাও খুব বেশিকাল স্থায়ী ছিল না। এ স্থলে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তাঙ-বংশের জনৈক সম্রাট একবার সিংহাসনচ্যুত হয়েছিলেন; তার পর আরবদের সহায়তায় তিনি পুনরায় ক্ষমতা লাভ করেন।
দেখা যাচ্ছে, এই সময়ে চীন দস্তুরমতো সুসভ্য দেশে পরিণত হয়েছে; সুতরাং চীন যদি তৎকালীন ইউরোপীয়দিগকে অর্ধ-বর্বর বলে মনে করত তবে নেহাত অন্যায় হত না। তখনকার পরিচিত জগতে চীনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দেশ আর ছিল না। পরিচিত জগৎ বলছি এই জন্যে যে, আমেরিকার তখন কী ঘটছিল আমি জানি না। এইটুকু মাত্র জানি যে, মেক্সিকো, পেরু প্রভৃতি দেশে কয়েক শো বছর আগেই সভ্যতার আলোক প্রবেশ করেছিল; কোনো কোনো বিষয়ে তারা আশ্চর্যরকম উন্নতি লাভও করেছিল, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল নেহাত পশ্চাৎপদ। যা হোক, ঐসকল দেশ সম্বন্ধে এত কম জানি যে, বেশি কিছু বলতে ভরসা পাই না। মেক্সিকো আর মধ্য-আমেরিকার মায়া সভ্যতা এবং পেরুরাষ্ট্রের কথা তোমাকে মনে রাখতে বলি। জ্ঞানী ব্যক্তিরা হয়তোবা এদের সম্পর্কে তোমাকে অনেক কিছু বলতে পারবেন।
আর-একটা কথা মনে রাখবে। মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতিদের কথা পূর্বে উল্লেখ করেছি; এদের কতক ইউরোপে চলে গেল, কতক-বা এল ভারতবর্ষে; হুন, তুর্ক, সিথিয়ান প্রভৃতি আরও অনেকে, ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো দলে দলে এদিকে-ওদিকে গেল। শ্বেতহুনজাতি এল ভারতবর্ষে, আর এত্তিলার অধীনস্থ হুনরা গেল ইউরোপে। মধ্য-এশিয়ার সেলজুক তুর্ক-জাতি বোগদাদ-সাম্রাজ্য দখল করেছিল; পরবর্তীকালে তুর্কদের আর এক বংশ, অটোমান তুর্ক-জাতির আবির্ভাব হয়; এরা কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ জয় এবং ভিয়েনা নগরের দ্বারদেশ অবধি অভিযান করেছিল। এই মধ্য-এশিয়া অথবা মঙ্গোলিয়া থেকেই এসেছিল দুর্ধর্ষ মঙ্গোলীয় জাতি; এরা দেশ জয় করতে করতে একেবারে ইউরোপের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত পৌঁচেছিল, এমনকি চীনকেও তাদের অধীনতা স্বীকার করতে হয়েছিল। এদেরই একজন আবার ভারতে একটা রাজবংশ ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, এবং এই বংশের কয়েকজন রাজা ইতিহাসে প্রসিদ্ধিলাভও করেছেন।
মধ্য-এশিয়া এবং মঙ্গোলিয়ার যাযাবর জাতিদের সঙ্গে চীনদেশকে অনবরত যুদ্ধ করতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এইসকল যাযাবর জাতি চীনকে কেবলই উত্ত্যক্ত করেছে, সুতরাং আত্মরক্ষার্থে লড়াই করা ছাড়া চীনের উপায় ছিল না। আর এদের প্রতিরোধ করবার উদ্দেশ্যেই বিখ্যাত ‘চীনের প্রাচীর’ নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু এই প্রাচীর ওদের আক্রমণ ঠেকাতে পারে নি। চীন-সম্রাটগণ একজনের পর একজন কেবলই ওদের তাড়িয়েছেন এবং এই করেই চীন-সাম্রাজ্য পাশ্চাত্যে কাস্পিয়ান সাগর অবধি বিস্তার লাভ করেছিল। সাম্রাজ্যবাদ চীনে ছিল না বললেই হয়। কোনো কোনো সম্রাট সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন বটে, দেশজয়ের আকাঙ্ক্ষাও তাঁদের ছিল, কিন্তু সাধারণত চীনারা ছিল শান্তিপ্রিয় জাতি, যুদ্ধবিগ্রহ আর দেশজয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ ছিল না। যোদ্ধার চেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিকেই চীন বরাবর বেশি সম্মান দেখিয়েছে। এতৎসত্ত্বেও যে সময়ে সময়ে চীন-সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটেছিল তার কারণ, যাযাবর জাতিদের অত্যাচার ও আক্রমণ। একেবারে রেহাই পাবার জন্যে চীন-সম্রাটগণ এদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বহুদূরে পশ্চিমদিকে; কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয় নি; তবে চীন কিয়ৎপরিমাণে নিরুপদ্রব হয়েছিল।
চীন স্বস্তি লাভ করল বটে, কিন্তু ফ্যাসাদ হল অন্যান্য দেশের। চীনাদের কাছে তাড়া খেয়ে যাযাবর জাতিগুলো আক্রমণ করল তাদের। ওরা প্রবেশ করল ভারতবর্ষে, ইউরোপে হানা দিল বারংবার। তুর্কজাতি গেল ইউরোপে, আর হুন, তাতার প্রভৃতি জাতি অন্যান্য দেশে।
কিন্তু এর পরে এমন একটা সময় এল যখন চীনারা আর যাযাবর জাতিদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে ততটা সক্ষম রইল না।
তাঙ-রাজবংশের প্রভাবপ্রতিপত্তি ক্রমশ লোপ পেতে লাগল; পর পর কতকগুলো অক্ষম, অপদার্থ ব্যক্তি হল শাসনকর্তা। অনাচারে ছেয়ে গেল দেশ; তার উপরে অতিরিক্ত ট্যাক্সের ভার; জনগণের মনে অসন্তোষ। অবশেষে ৯০৭ খৃষ্টাব্দে এই বংশের পতন হল।
এর পরে অর্ধ-শতাব্দী কাল চীনের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে নি। ৯৬০ খৃষ্টাব্দে চীনে আর-এক প্রসিদ্ধ রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়—সুঙ-বংশ; এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা কাও-সু। কিন্তু তখনও রাজ্যের ভিতরে ও সীমান্তে গোলযোগ লেগেই ছিল। জমির খাজনা ধার্য হয়েছিল অতিরিক্ত; চাষিরা করভারে জর্জরিত, ক্ষুব্ধ। ভারতের মতো চীনেও জমিবিলির ব্যবস্থায় চাপ পড়ত বেশি জনসাধারণের উপর, এর প্রতিকার না হলে দেশে শান্তি বা উন্নতির আশা ছিল না। কিন্তু এ তো জানা কথা, কোনো-কিছুর আমূল পরিবর্তন করা দূরহ ব্যাপার। তবে এটাও ঠিক যে, যথাসময়ে পরিবর্তন করা না হলে হঠাৎ এক সময়ে নিজে থেকেই পরিবর্তন ঘটবে, সব কিছু ওলটপালট করে দেবে।
তাও রাজবংশ শাসনব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন করে নি, কাজেকাজেই তার পতন ঘটল। সুঙ-সম্রাটদের রাজত্বকালেও নানা অশান্তি উপদ্রব লেগেই ছিল। একটি লোক এইসমস্ত অশান্তি দূবে করতে পারতেন বটে; তিনি ছিলেন একাদশ শতাব্দীতে সুঙ-রাজাদের প্রধানমন্ত্রী—ওয়াঙ আন্ শি। চীনদেশের শাসনতন্ত্র রচিত হয়েছিল কন্ফুসিয়সের আদর্শানুযায়ী। কন্ফুসিয়সের বিরোধিতা করতে সাহস করত না কেউ। ওয়াঙ আন্ শি-ও অবশ্য তার বিরোধিতা করেন নি, তবে ঐ মত ও আদর্শের ব্যাখ্যা করেছিলেন নূতন ধরনে। তাঁর কতকগুলো মতবাদ তো সম্পূর্ণ আধুনিক কালোপযোগী। ওঁর উদ্দেশ্য ছিল, দরিদ্র জনগণের করভার লাঘব করে ধনীদের উপরে তা চাপানো। বস্তুত ওয়াঙ আন্ শি জমির ট্যাক্স কমিয়ে দিলেন; গরিব চাষিরা ইচ্ছা করলে অর্থের পরিবর্তে উৎপাদিত শসা দ্বারা খাজনা দিতে পারত। ধনীদের উপরে বসানো হল আয়কর। এই আয়করের ব্যবস্থাকে অতি আধুনিক বলে মনে করা হয়, অথচ দেখো, নয় শো বছর আগেই চীনদেশে এর প্রবর্তন করা হয়েছিল। গভর্মেণ্ট থেকে চাষিদের ঋণ দেবার ব্যবস্থা হল। বাজার দর হ্রাস পেলে চাষিদের বড়ো ক্ষতি, শস্যাদি বিক্রি করে লাভ থাকে না, ট্যাক্স দিতে পারে না। ওয়াঙ প্রস্তাব করলেন, বাজার-দরের যাতে উঠ্তি-পড়্তি না হয় সেজন্যে গভর্মেণ্টেরই কর্তব্য, শস্যাদি কেনা-বেচা করা। প্রত্যেক লোককে তার কাজের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবার প্রস্তাব করা হয়েছিল, বিনা পারিশ্রমিকে কাকেও খাটানো হত না। একটা সামরিক বাহিনীও ওয়াঙ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এইসকল সংস্কারকার্য বেশিদিন স্থায়ী হল না; কেবল সামরিক বাহিনী আট শতাধিক বৎসর কাল টিঁকে ছিল।
শাসনব্যাপারে সুঙ-রাজাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কিন্তু তাঁরা সমাধান করতে চেষ্টা করেন নি; ফলে তাঁদের অধঃপতন ঘটতে লাগল। উত্তরাঞ্চলের বর্বর জাতি খিতানদের সঙ্গে তাঁরা পেরে উঠলেন না, সাহায্যের জন্য কিন্ বা তাতারদের দ্বারস্থ হলেন। কিন্রা এসে খিতানদের তাড়িয়ে দিল বটে, কিন্তু নিজেরা থেকে গেল। সবলের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে গেলে দুর্বলের বরাতে এরকমটাই ঘটে থাকে। কিন্জাতি উত্তর-চীন দখল করে বসল, পিকিঙ হল তাদের রাজধানী। সুঙরা সরে গেল দক্ষিণদিকে। চীন-ভূখণ্ডে দুটো সাম্রাজ্যের সৃষ্টি হল—উত্তরে কিন্ আর দক্ষিণে সুঙ-সাম্রাজ্য। উত্তর-চীনে সুঙ-বংশের রাজত্বকাল চলেছিল ৯৬০ থেকে ১১২৭ খৃষ্টাব্দ অবধি; আর, দক্ষিণ-চীনে দেড় শো বৎসর; ১২৬০ সনে মঙ্গোলিয়ানদের হাতে তাদের রাজত্বের অবসান ঘটে। কিন্তু আশ্চর্য, চীনদেশও প্রাচীন যুগের ভারতেরই মতো; চীনের অধিবাসীরা এমনভাবে মঙ্গোলিয়ানদের আপন সভ্যতা ও কৃষ্টির দ্বারা প্রভাবিত করে নিলে যে শেষপর্যন্ত ওদের পৃথক অস্তিত্ব বড়ো-একটা রইল না, দস্তুরমতো চীনা বনে গেল।
যাই হোক, চীন যাযাবর জাতির কাছে হেরে গেল। কিন্তু তাদের হাতে চীনকে লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় নি; কেননা, চীনের সংস্পর্শে এসে তারা সভ্য হয়েছিল।
তাঙ-রাজাদের মতো সুঙ-রাজারা রাষ্ট্রশক্তির দিক থেকে তত ক্ষমতাশালী ছিল না। কিন্তু শিল্পকলার দিক দিয়ে তারা পূর্ব ঐতিহ্য বজায় রেখেছিল, এমনকি যথেষ্ট উন্নতিসাধনও করেছিল। বিশেষত দক্ষিণ-চীনে সুঙ-রাজাদের আমলে শিল্পকলা এবং কাব্যের বিশেষ উন্নতি হয়েছিল; সুঙ-শিল্পীরা প্রাকৃতিক দৃশ্যের চিত্র আঁকতে বিশেষ পটু ছিলেন। এই সময়েই পোর্সলিনের বা চীনামাটির বাসনের আবির্ভাব হয়; সুঙ-শিল্পীদের তুলির স্পর্শে চীনামাটির বাসনের সৌন্দর্য শতগুণে বেড়ে যায়। এর দু শো বৎসর পরে মিঙ-রাজাদের আমলে আরও উৎকৃষ্ট পোর্সলিন প্রস্তুত হয়েছিল। তখনকার এক-একখানি চীনামাটির বাসন আজও আমাদের চোখে অপূর্ব বলে মনে হয়।