বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চেঙ্গিস খাঁ
৬৭
চেঙ্গিস খাঁ
২৫শে জুন, ১৯৩২
গত কয়েক চিঠিতেই আমি মঙ্গোলদের উল্লেখ করেছি; বাস্তবিক তারা আতঙ্ক ও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুঙ-রাজাদের আমলে তারা চীনে প্রবেশ করে; আবার পশ্চিম-এশিয়াতেও দেখতে পাই, মঙ্গোলরা প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে তছনছ করে দিলে। ভারতবর্ষে দাস-বংশের সম্রাটগণ যদিও তাদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল তথাপি তারা যে একটা মস্ত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তাতে ভুল নেই। মঙ্গোলিয়ার এইসকল যাযাবর জাতি সমগ্র এশিয়াকে যেন অবনতির ধাপে নামিয়ে এনেছিল; কেবল এশিয়া নয়, ইউরোপের অর্ধেক অংশেরও এই দশা ঘটেছিল। কিন্তু এরা কারা—হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে সারা পৃথিবীকে চমকিত করে দিলে? মধ্য-এশিয়ার হুন, তুর্ক, তাতার প্রভৃতি জাতি ইতিপূর্বে ইতিহাসে কীর্তি রেখে গেছে; যেমন, পশ্চিম-এশিয়ার সেলজুক তুর্ক জাতি, এবং উত্তর-চীনে তাতার জাতি। কিন্তু এযাবৎ মঙ্গোলদের কার্যকলাপ তো কিছু দেখা যায় নি? সম্ভবত পশ্চিম-এশিয়ায় তাদের সম্বন্ধে কেউ কিছু জানতই না। এরা ছিল উত্তর-চীনে কিন-তাতার-সাম্রাজ্যের অধীনস্থ অজ্ঞাত অখ্যাত উপজাতি।
হঠাৎ যেন তারা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল। যে যেখানে ছিল সবাই একত্র হয়ে সর্বশ্রেষ্ট খানকে নিজেদের নেতা মনোনীত করল এবং তার আনুগত্য স্বীকার করল। খানের অধীনে শুরু হল তাদের অভিযান পিকিঙ-অভিমুখে, ধ্বংস করল কিন্-সাম্রাজ্য। তারা চলল এগিয়ে পশ্চিমদিকে, কত কত সাম্রাজ্যকে দিল ছারখার করে। রাশিয়াকেও তারা করল পদানত। অতঃপর বোগদাদকে তারা নিশ্চিহ্ন করে দিল, লোপ পেল সাম্রাজ্য। এভাবে অগ্রসর হয়ে তারা পোল্যাণ্ডে এবং মধ্য-ইউরোপে এসে পৌঁছল। তাদের অগ্রগতিতে কেউ বাধা দিতে পারল না। দৈবক্রমে ভারতবর্ষ রক্ষা পেল। এ যেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত; এশিয়া ও ইউরোপের অধিবাসীদের নিশ্চয় তাক্ লেগে গিয়েছিল। ভূমিকম্পের মতো একটা দৈবদুর্বিপাক বিশেষ, যাতে মানুষের কোনো হাত থাকে না।
মঙ্গোলিয়ার এই যাযাবরগণ যেমন জোয়ান তেমনি ছিল কষ্টসহিষ্ণু। স্ত্রীপুরুষ সবাই এক-রকমের। বাস করত তাঁবুতে। কিন্তু তারা যে এতটা সাফল্য লাভ করেছিল তা তাদের শারীরিক শক্তি কিংবা কষ্টসহিষ্ণুতার দরুন নয়, নেতার গুণে। অসামান্য ক্ষমতাশালী লোক ছিলেন এই চেঙ্গিস খাঁ। ইনি ১১৫৫ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন, আসল নাম তিমুচিন। তাঁর শৈশবাবস্থায় পিতা ইয়েসুগি বাগাতুরের মৃত্যু হয়। মঙ্গোল ওমরাহগণকে ‘বাগাতুর’ বলা হত। এই শব্দটার অর্থ বীর। এর থেকেই উর্দু, ‘বাহাদুর’ কথাটার উদ্ভব হয়েছে, এইরূপ আমার আন্দাজ।
দশ বছর বয়স থেকে তাঁর জীবনসংগ্রাম শুরু হয়; সাহায্য করবার ছিল না কেউ; নিজের চেষ্টাতেই তিনি বড়ো হলেন, ক্ষমতা আয়ত্ত করলেন। অবশেষে মঙ্গোলদের জাতীয় সমিতি তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ খান বা কেগান অর্থাৎ সম্রাট মনোনীত করল। অবশ্য, ইতিপূর্বেই তাঁকে চেঙ্গিস নামে অভিহিত করা হয়েছিল।
এই নির্বাচন সম্বন্ধে চীনদেশে ত্রয়োদশ শতকে লিখিত ও চতুর্দশ শতকে প্রকাশিত ’মঙ্গোল জাতির গুপ্ত ইতিহাস’ নামক পুস্তকেও উল্লেখ আছে।
চেঙ্গিস যখন ‘কেগান’ বা সম্রাট হন তখন তাঁর বয়স একান্ন বৎসর। এই বয়সে লোকে নিরিবিলিতে শান্ত জীবন যাপন করতে চায়। কিন্তু তাঁর জীবনে এই সবে জয়যাত্রার শুরু। লক্ষ্য করে থাকবে, বড়ো বড়ো যোদ্ধারা সাধারণত যৌবনকালেই দেশজয়ে বের হন। চেঙ্গিস কিন্তু যৌবনের উৎসাহে এশিয়া অভিমুখে ধাওয়া করেন নি। তাঁর যৌবন অনেক কাল আগেই পেরিয়ে গেছে, তখন তিনি মধ্যবয়স্ক লোক। আগে থেকে ভেবে-চিন্তে মতলব ঠিক করে তবে তিনি কাজে নেমেছেন।
মঙ্গোলরা ছিল যাযাবর, নগর এবং নাগরিক জীবনধারা তারা পছন্দ করত না। অনেকের ধারণা, ওরা ছিল বর্বর। যাযাবর কিনা? কিন্তু এটা ভুল। তারাও জীবনযাপনের একটা প্রণালী গড়ে তুলেছিল, এবং সেই ব্যবস্থাটা ছিল দস্তুরমতো জটিল। শৃঙ্খলা আর সংঘবদ্ধতার গুণেই তারা যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হয়েছিল, শুধু সংখ্যাধিক্যের দরুন নয়। তা ছাড়া, চেঙ্গিসের মতো একজন ক্ষমতাশালী নেতাও তাদের ছিল। এ তো জানা কথা, চেঙ্গিসের মতো নেতা আর সামরিক প্রতিভাশালী যোদ্ধা ইতিহাসে আর নেই। তাঁর সঙ্গে তুলনায় আলেকজাণ্ডার ও সিজারের স্থান অনেক নীচে। চেঙ্গিস নিজে তো বড়ো সেনানায়ক ছিলেনই, তা ছাড়া তাঁর অধীনস্থ বহু সৈন্যাধ্যক্ষকে তিনি সামরিক শিক্ষা দিয়ে পারদর্শী করে তুলেছিলেন। স্বদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে ধাওয়া করেছেন, চার দিকে শত্রু আর বিরুদ্ধভাবাপন্ন অধিবাসী, এবং তারা সংখ্যায়ও অধিক; তথাপি চেঙ্গিসের অগ্রগতি কেউ রোধ করতে পারে নি।
চেঙ্গিস যখন দেশ জয় করে বেড়াচ্ছেন, মানচিত্রে তখনকার এশিয়া আর ইউরোপের চেহারাটা কীরকম ছিল জানো? মঙ্গোলিয়ার পুব আর দক্ষিণ দিকে চীন তখন দ্বিধাবিভক্ত;
দক্ষিণে ছিল সুঙ-সাম্রাজ্য; উত্তরে কিন্-তাতার-সাম্রাজ্য, পিকিঙ তার রাজধানী। আর পশ্চিমদিকে গোবি মরুভূমিতে তান্গুৎ-সাম্রাজ্য। ভারতবর্ষে তখন দাস-রাজাদের আমল। পারশ্য আর মেসোপটেমিয়া ছিল মুসলিম শাসনাধীনে, খোরাশান বা খিবা সাম্রাজ্য বলা হত তাকে; ভারতের সীমান্ত অবধি তা বিস্তৃত ছিল; রাজধানী সমরকন্দ। তারও পশ্চিমে সেলজুক তুর্ক, আর মিশর ও প্যালেস্টাইনে সালাদিনের বংশধরগণ তখন রাজত্ব করছে। বোগদাদে খলিফাদের রাজত্ব।
ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড তখন শেষ পর্যায়ে। দ্বিতীয় ফ্রেডরিক তখন রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট। ইংলণ্ডে ‘ম্যাগনা কার্টা’র যুগ। ফ্রান্সে নবম লুই সম্রাট; ইনি ধর্মযুদ্ধে যোগ দিয়ে তুর্কদের হাতে বন্দী হন এবং পরে অর্থের বিনিময়ে মুক্তিলাভ করেন। পূর্ব-ইউরোপে রাশিয়া দুটি সাম্রাজ্যে বিভক্ত—উত্তরে নভগরোদ্ আর দক্ষিণে কিয়েভ্। রাশিয়া এবং রোম সাম্রাজ্যের মাঝে ছিল হাঙ্গেরি আর পোল্যাণ্ড। আর কন্স্টাণ্টিনোপ্লের চার দিকে তখনও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রতিপত্তি ছিল।
চেঙ্গিস তাঁর জয়যাত্রার উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিলেন। সৈন্যদলকে সামরিক শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, ঘোড়াগুলিকেও শিক্ষা দিয়েছিলেন। যাযাবর জাতির পক্ষে ঘোড়া অপরিহার্য কিনা? উত্তর-চীনের কিন্-সাম্রাজ্য আর মাঞ্চুরিয়া বিধ্বস্ত করে তিনি পিকিঙ দখল করলেন। তার পরে কোরিয়া। দক্ষিণ-চীনের সুঙ-রাজাদের প্রতি সম্ভবত তিনি মৈত্রীভাবাপন্ন ছিলেন, কেননা ওরা কিন্সাম্রাজ্য-জয়ের ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করেছিল। ভবিষ্যতে নিজেদের পালাও যে আসতে পারে, সে কথা ভাবে নি। পরে তান্গুৎ-সাম্রাজ্যও চেঙ্গিসের অধীনতা স্বীকার করেছিল।
এত এত রাজ্য জয় করে চেঙ্গিস হয়তো-বা ক্ষান্ত দিতে চেয়েছিলেন; পশ্চিম দিকে অগ্রসর হবার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। খোরাশানের রাজার সঙ্গেও মৈত্রীসম্বন্ধ স্থাপনে তিনি ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু তা হবে কেন? লাতিন প্রবাদ আছে যে, ঈশ্বর যাদের ধ্বংস করতে চান তারাই প্রথমে পাগলামো শুরু করে। খোরাশানের শাহ্ এমনসব কার্যকলাপ শুরু করল যে, মনে হল, ধ্বংসই তার কাম্য। তার অধীনস্থ এক শাসনকর্তা অনেক মঙ্গোল ব্যবসায়ীকে হতা করে। চেঙ্গিস তা সত্ত্বেও অশান্তি সৃষ্টি করতে চান নি, শুধু ঐ গভর্ণরের শাস্তি দাবি করে দূত পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু শাহ্ তখন কাণ্ডজ্ঞানরহিত, তাঁর আদেশে দূতেরা নিহত হল। চেঙ্গিস অতটা বাড়াবাড়ি সহা করবেন কেন? কিন্তু তিনি তাড়াহুড়ো না করে ভালোরকম তৈরি হয়ে নিয়ে পশ্চিমাভিমুখে যাত্রা করলেন।
এই জয়যাত্রা শুরু হয় ১২১৯ খৃষ্টাব্দে। এশিয়ায় এবং ইউরোপের কতকাংশে দারুণ আতঙ্কের সৃষ্টি হল। এ যেন আবর্তমান একটা বিরাট লৌহখণ্ড, নগরের পর নগর আর লাখ লাখ মানুষ এর তলায় চাপা পড়ে পিষে যাচ্ছিল। খোরাশান-সাম্রাজ্য লোপ পেল। নিশ্চিহ্ন হল সমৃদ্ধিশালী বোখারা-নগরী; ধ্বংস হল রাজধানী সমরকন্দ, এবং তার দশ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে জীবিত রইল মাত্র ৫০ হাজার। হিরাট প্রভৃতি কত কত বর্ধিষ্ণু নগরী ভস্মীভূত হল, নিহত হল কত লক্ষ লক্ষ অধিবাসী। শত শত বৎসরের সাধনায় যে শিক্ষা সংস্কৃতি আর শিল্প গড়ে উঠেছিল পারশ্য ও মধ্য-এশিয়ায়, তার অস্তিত্ব আর রইল না। যে পথ দিয়ে চেঙ্গিস গেলেন তা পরিণত হল মরুভূমিতে।
খোরাশানের রাজার পুত্র জালাল্উদ্দিন এই বন্যাস্রোতের গতি রোধ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সিন্ধুনদের তীরে তাঁকে এমনই সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়তে হয় যে, কথিত আছে, তিনি ঘোড়াসুদ্ধ বিশ ফট নীচে নদীতে লাফিয়ে পড়েন এবং সাঁতরে নদী পার হয়ে যান। দিল্লির রাজসভায় তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন। চেঙ্গিস আর তাঁর পশ্চাদনুসরণ করেন নি।
সেলজুক সাম্রাজ্য আর বোগদাদের সৌভাগ্য, তারা রেহাই পেল, চেঙ্গিস সোজা রাশিয়ায় ঢুকে পড়লেন। কিয়েভের ডিউককে পরাজিত করে তাকে বন্দী করলেন। কিন্তু আবার তাঁকে ফিরতে হল পূর্বদিকে, তানগুৎ-সাম্রাজ্যে বিদ্রোহ দমন করতে।
১২২৭ খৃষ্টাব্দে চেঙ্গিস খাঁর মৃত্যু হয়, তখন তাঁর বয়স বাহাত্তর বৎসর। তাঁর সাম্রাজ্য কৃষ্ণসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর অবধি বিস্তৃত ছিল। মঙ্গোলিয়ায় কারাকুরাম নগর ছিল তাঁর রাজধানী। যাযাবর হলে কী হয়, সংগঠন-ক্ষমতা ছিল তাঁর অদ্ভূত। তাঁর মৃত্যুতে তাই সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরে নি।
পারশিক ও আরবি ঐতিহাসিকদের মতে চেঙ্গিস খাঁ ছিলেন দানববিশেষ, সাংঘাতিক নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক। নিষ্ঠুর ছিলেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে কিনা সমসাময়িক শাসকসম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁর বিশেষ তফাত ছিল না। ভারতে আফগান-রাজারা ঐ একই পর্যায়ভুক্ত ছিলেন। ১১৫০ সনে আফগানরা যখন গজনি দখল করে তখন কী হয়েছিল? কবেকার এক পূরোনো শত্রুতার অজুহাতে তারা গজনি শহরকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিলে; ক্রমান্বয়ে সাত দিন ধরে লুণ্ঠন আর হত্যাকাণ্ড চলেছিল। সমস্ত শিশু আর স্ত্রীলোকদের বন্দী করা হয় এবং নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় পুরুষদের। সুদৃশ্য অট্টালিকা ও ইমারতাদির একটিও আস্ত ছিল না। এই তো ছিল মুসলমানের প্রতি মুসলমানের ব্যবহার! ভারতে আফগান সম্রাটগণের কার্যকলাপ আর পারশ্য ও মধ্য-এশিয়ায় চেঙ্গিস খাঁর ধ্বংসকার্য এ দুয়ের মধ্যে তফাত কিছু নেই। খোরাশানের শাহ্ তাঁর দূতকে হত্যা করাতেই চেঙ্গিস বিশেষ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। চেঙ্গিস যেখানে গেছেন সেখানেই ধ্বংসকার্য সাধিত হয়েছে, কিন্তু মধ্য-এশিয়ার ধ্বংসলীলা চরমে উঠেছিল।
নগরাদি ধ্বংস করার পিছনে চেঙ্গিসের একটা উদ্দেশ্য ছিল। উনি ছিলেন যাযাবর, শহরনগরাদির প্রতি ছিল বিজাতীয় ঘৃণা। বাস করতেন স্তেপ-অঞ্চল বা বৃক্ষবিরল সমভূমিতে। এক সময়ে তিনি চীনের সমস্ত শহর ধ্বংস করবার কল্পনা করেছিলেন। সৌভাগ্য যে, সে কল্পনা কার্যে পরিণত করেন নি। যাযাবরের জীবনধারার সঙ্গে সভ্যতার ধারার মিলন ঘটাবেন, এই মতলবটা তাঁর ছিল। কিন্তু তা কি কখনও সম্ভব হয়?
চেঙ্গিস খাঁ এই নাম থেকে তোমার হয়তো ধারণা হয়েছে, তিনি মুসলমান ছিলেন। কিন্তু তা নয়। এটা মঙ্গোলীয় নাম। চেঙ্গিস পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। তাঁর ধর্ম ছিল শামধর্ম—নীলাকাশের আরাধনা। চীনের তাঙ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে প্রায়ই ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর নানা আলোচনা হত; কিন্তু ধর্মে তিনি অবিচল ছিলেন, এবং বিপৎকালে আকাশের পূজা করতেন।
আমি গোড়াতেই বলেছি, মঙ্গোলীয় পরিষদ চেঙ্গিসকে সর্বশ্রেষ্ঠ খান অর্থাৎ সম্রাট মনোনীত করেছিল। ওটা ছিল সামন্ততান্ত্রিক পরিষদ, গণপরিষদ নয়। তাই চেঙ্গিসও ছিলেন সামন্তাধিপতি।
চেঙ্গিস এবং তাঁর অনুগামীর দল নিরক্ষর ছিলেন; এমনকি, লিখনপদ্ধতির কথাই তাঁর জানা ছিল না। সংবাদাদি পাঠানো হত লোকমুখে, ছোটো ছোটো পদ্য কিংবা প্রবাদবাক্যের আকারে। মৌখিক সংবাদাদি আদানপ্রদানের দ্বারা এত বড়ো একটা সাম্রাজ্য পরিচালনা করা বড়ো বিস্ময়কর ব্যাপার। পরবর্তীকালে লিখন পদ্ধতির কথা জানতে পেরে তিনি তার মূল্য ও প্রয়োজনীয়তা বিশেষ উপলব্ধি করলেন এবং তাঁর পুত্রগণ ও প্রধান প্রধান কর্মচারীদিগকে এটা আয়ত্ত করে নিতে বললেন। অতঃপর মঙ্গোলদের প্রচলিত আইন এবং তাঁর বাণীসমূহ লিপিবদ্ধ করার আদেশ হল। চেঙ্গিসের ধারণা ছিল, এইসমস্ত চিরাচরিত বিধি অপরিবর্তনীয়। কোনো কালেই নড়চড় হবে না, কেউ অমান্য করতে পারে না, এমনকি সম্রাটও নয়। কিন্তু সেইসমস্ত অপরিবর্তনীয় বিধি আজ কোথায় লোপ পেয়ে গেছে! বর্তমান যুগের মঙ্গোলরাও নিশ্চয় তার খবর রাখে না।
প্রত্যেক দেশ এবং প্রত্যেক ধর্মেরই কতকগুলো চিরাচরিত বিধি আর লিপিবদ্ধ আইন আছে, এবং তার ধারণা, এসবের লয় নেই কোনোকালে। কখনও-বা এসবকে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ বলে মনে করা হয়; এবং সেইহেতুই এসব অপরিবর্তনীয় আর চিরস্থায়ী। কিন্তু আইন তো করা হয় চলতি কাল অনুযায়ী, এবং আইনের উদ্দেশ্য হল লোকের ভালো করা। কাল ও অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে পুরোনো বিধি খাপ খাবে কেন? কাল ও অবস্থা ভেদে তারও পরিবর্তন অপরিহার্য। নইলে তো ঐসমস্ত বিধিব্যবস্থা আমাদের পায়ে লোহার বেড়ির মতো জড়িয়ে থাকবে, পৃথিবীর অগ্রগতির সঙ্গে আমরা তাল রেখে চলতে পারব না। কোনো আইনই অপরিবর্তনীয় বিধি বলে গণ্য হতে পারে না। জ্ঞানের উপর এর ভিত্তি, সুতরাং জ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এর উন্নতিও অনিবার্য।
চেঙ্গিস খাঁ সম্পর্কে অনেক খুঁটিনাটি খবর তোমাকে দিলাম। এতটা বোধ করি দরকার ছিল না। কিন্তু এই লোকটিকে আমার বেশ লাগে। আমি একজন শান্তশিষ্ট অহিংস শান্তিপ্রিয় লোক; বাস করি শহরে, ঘৃণা করি সামন্ততন্ত্রকে। অথচ দেখো, আমার মতো লোকের কিনা যাযাবর জাতির এক অতি নিষ্ঠুর ভীষণপ্রকৃতির সামন্তাধিপতির প্রতি আকর্ষণ! আশ্চর্য নয় কি?