বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/জর্মনির অভ্যুত্থান
১২৮
জর্মনির অভ্যুত্থান
ইউরোপের যে বড়ো বড়ো জাতিগুলোকে এখন আমরা দেখছি, তার একটির জন্মবৃত্তান্ত আগের চিঠিতে তোমাকে বলেছি। এবার তোমাকে আজকালকার আর-একটি বড়ো জাতির ইতিহাস বলব—সেটি হচ্ছে জর্মন।
জর্মানির সর্বত্র একই ভাষা একই রকমের জীবনধারা প্রচলিত; তবু কিন্তু বহু কাল ধরে এই জাতিটা ছোটো-বড়ো অনেকগুলো রাজ্যে বিভক্ত হয়ে ছিল। অনেক শো বছর যাবৎ জর্মনদের মধ্যে প্রধান ছিল হাপ্স্বুর্গ-রাজাদের রাজা অস্ট্রিয়া। তার পর প্রাশিয়া বড়ো হয়ে উঠল; জনজাতির নেতা কে হবে তাই নিয়ে এই দুয়ের মধ্যে লাগল রেষারেষি। নেপোলিয়ন দু পক্ষেরই গর্ব খর্ব করে দিলেন। তাঁর পীড়নে ব্যতিব্যস্ত হয়েই জর্মনিতে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠল, শেষ পর্যন্ত তার ফলে নেপোলিয়ন হেরে গেলেন। এমনি করে ইতালি এবং জর্মনি এই দুই দেশেই নেপোলিয়ন জাতীয়তাবোধ এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছিলেন, যদিও তিনি নিজে সেটা টেরও পান নি, করতে তো চানই নি। নেপোলিয়নের সময়ে জর্মনিতে জাতীয়তাবাদের প্রধান পাণ্ডা যাঁরা ছিলেন তাঁদের একজনের নাম হচ্ছে ফিখ্টে। ইনি ছিলেন একাধারে একজন দার্শনিক এবং অত্যুগ্র স্বদেশভক্ত লোক; তাঁর দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করবার জন্যে তিনি অনেক কিছুই করেছিলেন।
নেপোলিয়নের পতনের পরও অর্ধ শতাব্দী পর্যন্ত জর্মনির ছোটো ছোটো রাজাগুলো টিঁকে রইল, এদের একত্র করে একটি যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টি করতে অনেকে অনেকবার চেষ্টা করলেন; কিন্তু অস্ট্রিয়া আর প্রাশিয়া এই দুই রাজ্যের রাজারাই সে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তা হয়ে বসতে চাইলেন। ফলে সে সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গেল। ইতিমধ্যে দেশের মধ্যে সকল প্রকারের প্রগতিবাদীদের উপর নিদারণ পীড়ন চলতে লাগল। ১৮৩০ সনে একবার এবং ১৮৪৮ সনে একবার বিদ্রোহ হল, সে বিদ্রোহও সফল হল না। প্রজাদের স্তোক দেবার জন্যে সামান্য কিছু সংস্কারও সাধন করা হল।
ইংলণ্ডের মতো জর্মনিরও স্থানে স্থানে কয়লা এবং লোহার খনি ছিল, সুতরাং তার শিল্পপ্রগতিরও সুযোগ বর্তমান ছিল। এ ছাড়া জর্মনির আরও এক ব্যাপারে খ্যাতি ছিল, সে হচ্ছে তার দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিকের দল, আর তার সেনার পরাক্রম। দেশে কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হল, একটি শিল্পজীবী মজুরশ্রেণীও গড়ে উঠল।
এই সময়ে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে, প্রাশিয়াতে একটি লোকের আবির্ভাব হল; বহু বছর ধরে কেবল জন্ম নিতে নয়, সমস্ত ইউরোপের রাজনৈতিক জগতেই তিনি প্রভুত্ব করে গেলেন। এঁর নাম ওটো ফন বিস্মার্ক; ইনি ছিলেন একজন জাংকাব, মানে প্রাশিয়ার একজন ভূস্বামী। ওয়াটার্লুর যুদ্ধের বছরেই এঁর জন্ম হল। অনেক বছর যাবৎ ইনি রাষ্ট্রদূত হিসাবে ইউরোপের বহু রাজ্যের রাজসভায় নিযুক্ত ছিলেন। ১৮৬২ সনে তিনি প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হলেন, এবং তার পর থেকেই তাঁর অস্তিত্ব সম্বন্ধে সকলকে সচেতন করে তুললেন। প্রধানমন্ত্রী হবার এক সপ্তাহও পার হতে-না-হতে তিনি একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন: “এ যুগের বড়ো বড়ো সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে বক্তৃতা বা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রস্তাব দিয়ে নয়, অস্ত্র দিয়ে আর রক্ত দিয়ে।”
রক্ত আর অস্ত্র। কথা-কটি প্রসিদ্ধ হয়ে আছে; এই কথা-কটিই হচ্ছে তাঁর নীতির যথার্থ পরিচায়ক; দূরদৃষ্টি এবং নির্মম নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি এই নীতি অনুসরণ করেছিলেন। গণতন্ত্রকে তিনি ঘৃণা করতেন; পার্লামেণ্ট এবং প্রজাতন্ত্রী ব্যবস্থাপক সভা প্রভৃতির সম্বন্ধেও তাঁর ছিল অপরিসীম অবজ্ঞা। তিনি যেন অতীত যুগের মানুষ, দৈবক্রমে এ যুগে এসে পড়েছেন; অথচ বর্তমান যুগটাকেই তিনি একেবারে নিজের ইচ্ছামতো করে গড়ে নিলেন, এমনি ছিল তাঁর কর্মশক্তি আর সংকল্পের জোর। আধুনিক জর্মনিকে সৃষ্টি করে গেলেন তিনি; ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়অর্ধেক কাল ধরে ইউরোপের যা ইতিহাস তাও তাঁরই হাতে গড়া হল। জর্মনির জীবনের প্রধান ছিলেন তার দার্শনিক আর বৈজ্ঞানিকরা, সে জর্মনি পিছনে গিয়ে আত্মগোপন করল; সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করল নবীন জর্মনি, রক্ত আর অস্ত্রের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সে জর্মন, তার পরিচয় তার সামরিক প্রতিভা। সেই সময়কার একজন প্রসিদ্ধ জর্মন বলেছিলেন, “বিস্মার্ক জর্মনিকে বড়ো করছেন, জর্মনদের ছোটো করছেন।” জর্মানিকে ইউরোপ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা বড়ো শক্তি করে তুলবেন, তাঁর এই নীতিতে জর্মনরা অত্যন্ত খুশি হয়ে উঠল; জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধির আনন্দে তারা তাঁর সমস্তরকম পীড়ন সহ্য করতে রাজি হয়ে গেল।
বিস্মার্ক যখন ক্ষমতা হাতে পেলেন তখন, কী তিনি করতে চান সে সম্বন্ধে স্থির সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে—কীভাবে তা করবেন তারও পরিকল্পনা তিনি করে ফেলেছেন। স্থির সংকল্প নিয়ে তিনি কাজে লেগে গেলেন, এবং আশ্চর্যরকম সাফল্য অর্জন করলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল জর্মনিকে, এবং জর্মনির নামে প্রাশিয়াকে, ইউরোপে সর্বেসর্বা করে তুলবেন। ইউরোপে তখন সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি বলে পরিচিত ছিল ফ্রান্স, তার রাজা তৃতীয় নেপোলিয়ন। অস্ট্রিয়াও ছিল একটি প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। এইসমস্ত দেশের সঙ্গে বিস্মার্ক নানা রকমের খেলা খেললেন, তার পর আবার একে একে এদের উচ্ছেদসাধন করলেন—আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কূটনীতির প্রাচীন রীতির পাঠ হিসাবে এটি একটি চমৎকার অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাজ হল, জাতিহিসেবে যে জর্মনিই সকলের উপরে, সেই সত্যটি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। বিস্মার্ক দেখলেন, প্রাশিয়া আর অস্ট্রিয়ার মধ্যে প্রাচীন কাল থেকে যে প্রতিবন্দ্বিতা চলে আসছিল, তাকে এবার শেষ করে দিতে হবে। এর অবসান হবে অবশ্য প্রাশিয়াকেই জিতিয়ে, অস্ট্রিয়াকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে তাকে দ্বিতীয় স্থান নিয়েই খুশি থাকতে হবে। প্রাশিয়ার অভ্যুত্থান ঘটাতে গেলে প্রথমেই দরকার হচ্ছে অস্ট্রিয়ার পতন; তার পরে আসবে ফ্রান্সের পালা। (এ কথা কিন্তু মনে রেখো, প্রাশিয়া অস্ট্রিয়া বা ফ্রান্স বলতে আমি বোঝাচ্ছি এদের শাসন কর্তৃপক্ষকে। এই কর্তৃপক্ষরা সকলেই ছিলেন অল্পবিস্তর স্বৈরতন্ত্রী; এদের পার্লামেণ্টদের আসলে ক্ষমতা প্রায় কিছুই ছিল না।)
কাজেই বিস্মার্ক নিঃশব্দে তাঁর সামরিক আয়োজনকে সম্পূর্ণ করে তুললেন। ইতিমধ্যে তৃতীয় নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়াকে আক্রমণ এবং পরাজিত করলেন। অস্ট্রিয়ার এই পরাজয়ের ফলেই দক্ষিণ-ইতালিতে গ্যারিবল্ডির অভিযান শুরু হল, শেষ পর্যন্ত ইতালি স্বাধীনই হয়ে গেল। বিস্মার্কের এতে খুব সুবিধা, কারণ অস্ট্রিয়ার এতে শক্তি কমে যাচ্ছে। পোল্যাণ্ডে রাশিয়ার অধীন-অঞ্চলে জাতীয়তাবাদীরা বিদ্রোহ করল, বিস্মার্ক জারকে তাঁর সাহায্য দিতে চাইলেন, দরকার হলে তিনি এই পোলদের মেরে শেষ করে দিতে পারেন। অত্যন্ত লজ্জাকর প্রস্তাব, কিন্তু বিস্মার্কের এতে কাজ হাশিল হল; ভবিষ্যতে ইউরোপে যদি কোনোরকম জটিল সমস্যা ওঠে, সে দিন জারের বন্ধুত্ব বিস্মার্কের পাওনা হয়ে রইল। এর পরে তিনি অস্ট্রিয়ার সঙ্গে একত্র হয়ে ডেনমার্ককে যুদ্ধে পরাস্ত করলেন। তার অল্পদিন পরেই আবার অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে বাধালেন, এবার তাঁর মিত্র করে নিলেন ফ্রান্স আর ইতালিকে। অতি অল্প দিনের মধ্যেই অস্ট্রিয়া প্রাশিয়ার কাছে পরাজয় স্বীকার করল; এটা হল ১৮৬৬ সালে। জর্মনিই ইউরোপের নেতৃস্থানীয় এবং জর্মনির মধ্যে বড়োকর্তার আসন প্রাশিয়ার, এ কথা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা হল। বিস্মার্ক বিচক্ষণ লোক, এবার তিনি অস্ট্রিয়ার প্রতি খুব সদ্ব্যবহার দেখাতে লাগলেন যেন দুয়ের মধ্যে কোনোরকম মনোমালিন্য না থাকে। এবার রাস্তা খোলা, উত্তর-জর্মনি জুড়ে একটি রাষ্ট্র তৈরি হল, তার নেতা হল প্রাশিয়া (অস্ট্রিয়া অবশ্য বাদ পড়ল)। বিস্মার্ক হলেন এই যুক্তরাষ্ট্রের চ্যান্সেলর বা প্রধানমন্ত্রী। এখনকার দিনে আমাদের বড়ো বড়ো রাজনীতি আর আইনের পণ্ডিতরা যুক্তরাষ্ট্র আর শাসনতন্ত্র কীরকম হবে তাই নিয়ে মাসের পর মাস বছরের পর বছর ধরে বক্তৃতা আর তর্কাতর্কির কচ্কচি চালাচ্ছেন; আর এই উত্তর-জর্মনির যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র বিস্মার্ক রচনা করেছিলেন ঠিক পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে। এই শাসনতন্ত্রটিই পুরো পঞ্চাশ বছর ধরে জর্মনিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছিল, এই সময়ের মধ্যে এর অতি সামান্যই অদল-বদল করার প্রয়োজন হয়েছে। বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন ১৯১৮ সনে জর্মনিতে প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হল তখনই মাত্র এর অবসান হয়েছে।
বিস্মার্কের প্রথম উদ্দেশ্যটি সফল হল, প্রাশিয়া তখন জর্মনির প্রধান শক্তি হয়ে বসেছে। এর পরের কাজ হল তাঁর, ফ্রান্সের শক্তি খর্ব করে ইউরোপে জর্মনির প্রতিপত্তি বড়ো করে তোলা। নিঃশব্দে কোনোরকম হৈচৈ না করে তিনি এর আয়োজন করলেন, সমস্ত জর্মনদের মধ্যে ঐক্যস্থাপনের চেষ্টা করলেন, এবং ইউরোপের এবং অন্যান্য দেশের সন্দেহও নিরসন করলেন। অস্ট্রিয়া তাঁর হাতে পরাস্ত হয়েছিল, তার প্রতিও তিনি এত ভদ্র ব্যবহার দেখালেন যে দু পক্ষের মধ্যে প্রায় কোনো অসদ্ভাবই আর রইল না। চিরকাল ধরেই ইংলণ্ড ছিল ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রতিদ্বন্দ্বী, তৃতীয় নেপোলিয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ফন্দিফিকির সে গভীর সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখত। কাজেই ফ্রান্সের সঙ্গে লড়াই করবার ব্যাপারে ইংলণ্ডের বন্ধুত্ব বাগিয়ে নিতে বিস্মার্কের মোটেই বেগ পেতে হল না। যুদ্ধের জন্য সবরকমে প্রস্তুত হয়ে নিয়ে তিনি শেষে এমনি ওস্তাদের মতো চাল দিলেন যে, ১৮৭০ সনে তৃতীয় নেপোলিয়ন নিজেই প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসলেন। সমস্ত ইউরোপ জানল, প্রাশিয়ার কোনো দোষ নেই, ফ্রান্স ওপরপড়া হয়ে তার সঙ্গে এসে যুদ্ধ বাধাচ্ছে। প্যারিসে লোকের মুখে ধ্বনি উঠল, ‘বার্লিন চলো’, ‘বার্লিন চলো’। তৃতীয় নেপোলিয়নের মনে মনে ভরসা ছিল, তিনি ধরে নিলেন অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর বিজয়ী সেনা বার্লিনে গিয়ে হাজির হবে। আসলে কিন্তু ঘটল ঠিক তার উল্টো। বিস্মার্কের সেনা সুশিক্ষিত; ফ্রান্সের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে সেই সেনা প্রচণ্ড আক্রমণ চালাল, তার বিক্রমে ফ্রান্সের সেনা একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে গেল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেডানে তৃতীয় নেপোলিয়ন স্বয়ং সসৈন্যে জর্মনদের হাতে বন্দী হলেন।
ফ্রান্সের দ্বিতীয় নেপোলিয়ন-সাম্রাজ্যের এইভাবে অবসান হল; এর পরেই প্যারিসে আবার একটি প্রজাতন্ত্রী সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। তৃতীয় নেপোলিয়নের পতন হয়েছিল অনেক কারণে; কিন্তু তার প্রধান কারণ ছিল, তাঁর প্রতি প্রজাদের বিদ্বেষ। তাঁর অত্যাচার ও পীড়ননীতির জন্য তারা তাঁকে মোটেই দেখতে পারত না। অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে তিনি প্রজাদের মনোযোগ অন্যত্র নিবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করতেন; বিপদ আসন্ন দেখলে রাজারা এবং শাসনকর্তারা অনেক সময়েই এই পন্থাটি অবলম্বন করে থাকেন। কিন্তু তাঁর এই ফন্দি খাটল না; শেষ পর্যন্ত যুদ্ধকে উপলক্ষ করেই তাঁর সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার শেষ হয়ে গেল।
প্যারিসে একটি দেশরক্ষী সরকার স্থাপিত হল। এঁরা প্রাশিয়ার সঙ্গে সন্ধি করতে চাইলেন। কিন্তু বিস্মার্ক সন্ধির যেসব শর্ত দিলেন তা এমন অপমানকর যে এঁরা স্থির করলেন, যুদ্ধই চালিয়ে যাবেন, যদিও তখন এঁদের সেনা বলতে আর বস্তুত কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। দীর্ঘকাল ধরে প্যারিসের অবরোধ চলল, শহরের চতুর্দিকে এবং ভার্সাইতে জর্মন সেনা ঘাঁটি করে বসে রইল। শেষ পর্যন্ত প্যারিস পরাজয় স্বীকার করল; নূতন প্রজাতন্ত্রকে পরাজয় এবং বিস্মার্কের দেওয়া সন্ধির কঠিন শর্তগুলোই মেনে নিতে হল। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ একটা বিরাট পরিমাণ টাকা এঁরা জর্মনিকে দিতে স্বীকৃত হলেন। আলসেস্ এবং লোরেন এই প্রদেশ-দুটি জর্মনিকে ছেড়ে দিতে তাঁরা বাধ্য হলেন; সন্ধির শর্তের মধ্যে এইটিই ছিল সবচেয়ে মর্মান্তিক; কারণ, এই প্রদেশ-দুটি দু শো বছরেরও বেশিকাল ধরে ফ্রান্সের অঙ্গ হয়ে ছিল।
প্যারিসের অবরোধ শেষ হবার আগেই কিন্তু ভার্সাইতে নূতন একটি সাম্রাজ্যের পত্তন হল। তৃতীয় নেপোলিয়নের ফরাসি সাম্রাজ্যের শেষ হয় ১৮৭০ সনের সেপ্টেম্বর মাসে। ১৮৭১ সনের জানুয়ারী মাসেই ভার্সাইয়ের প্রাসাদে, সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের প্রসিদ্ধ সভাগৃহে, মিলিত জর্মনির একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হল; তার কাইজার অর্থাৎ সম্রাট হলেন প্রাশিয়ার রাজা। জর্মনির সমস্ত অঞ্চলের রাজা আর প্রতিনিধিরা সেই সভায় সমবেত হয়ে তাঁদের নূতন সম্রাট কাইজারকে তাঁদের আনুগত্য নিবেদন করলেন। প্রাশিয়ার রাজবংশ হোহেন্জোলার্ন এবার হয়ে গেল সম্রাট-বংশ; মিলিত জর্মন এবার হয়ে উঠল সমস্ত পৃথিবীর মধ্যেই শক্তিশালী জাতিদের অন্যতম।
ভার্সাইতে আনন্দ এবং উৎসবের ধূম পড়ে গেল; অথচ তার ঠিক পাশেই প্যারিসে তখন
চলেছে দুঃখ দুর্দশা আর চরম গ্লানির রাজস্ব। ক্রমাগত একটির পর একটি সর্বনাশের আঘাতে প্রজারা তখন বিভ্রান্ত, বিহ্বল; স্থায়ী বা সুপ্রতিষ্ঠ শাসনব্যবস্থাও তাদের কিছু নেই। নির্বাচিত জাতীয় পরিষদে বহু সংখ্যক রাজপন্থী লোক ঢুকে বসেছে, তারা চক্রান্ত করছে আবার একজন রাজাকে সিংহাসনে বসাতে। পথের বাধা সরাবার জন্যে তারা জাতীয় রক্ষী বাহিনীকে নিরস্ত করে দিতে চেষ্টা করল; তাদের ধারণা ছিল সে বাহিনীটি প্রজাতন্ত্রে বিশ্বাসী। শহরের সমস্ত প্রজাতন্ত্রী এবং বিপ্লবীরাই বুঝলেন, এর মানে হচ্ছে আবার পুরোনো পন্থার প্রবর্তন, আবার অত্যাচারের আবির্ভাব। সুতরাং, এঁরা বিদ্রোহ করলেন; ১৮৭১ সনের মার্চ মাসে প্যারিসের ‘কমিউন’ প্রতিষ্ঠিত হল। এটা ছিল একটা পৌরসভার (মিউনিসিপালিটি) মতো বস্তু; এর আদর্শ ছিল অতীতের সেই বিরাট ফরাসি বিপ্লব। কিন্তু বস্তুত এর মধ্যে তার চেয়েও বৃহত্তর জিনিষের আভাস ছিল, তখন সেটা তেমন স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ে নি, কিন্তু আধুনিক কালে যে সমাজতন্ত্রবাদের দেখা আমরা পেয়েছি তার বীজ এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল। এক দিক থেকে বলা যায়, রাশিয়াতে যে সোভিয়েটগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, প্যারিস-কমিউন ছিল তাদেরই অগ্রদূত।
কিন্তু ১৮৭১ সনের এই প্যারিস-কমিউন বেশিদিন বাঁচল না। সাধারণ প্রজাদের এই জাগরণ দেখে রাজতন্ত্রী এবং বুর্জোয়ারা ভয় পেয়ে গেল; প্যারিসের যে অংশটি কমিউনের অধীনে তাকে তারা অবরোধ করে বসল। ভার্সাই এবং অন্যান্য নিকটবর্তী অঞ্চলে বসে জর্মন সেনা নিঃশব্দে শুধু চেয়ে দেখতে লাগল। যেসব ফরাসি সেনা জর্মনদের হাতে বন্দী হয়ে ছিল তাদের এবার ছেড়ে দেওয়া হল; প্যারিসে ফিরে এসে তারা তাদের পরোনো দিনের মনিবদের পক্ষ নিয়ে কমিউনের সঙ্গে যুদ্ধে লেগে গেল। কমিউন-ওয়ালাদের বিরুদ্ধে এরা অভিযান করল, ১৮৭১ সনে যে মাসের শেষাশেষি একটি রৌদ্রোজ্জ্বল দিবসে তাদের যুদ্ধে পরাজিত করল এবং প্যারিস শহরের রাস্তায় ত্রিশ হাজার নরনারীকে গুলি করে বধ করল। বহু সংখ্যক কমিউনপন্থী বন্দী হল, এদেরও পরে বেশ ধীরেসুস্থে গুলি করে মারা হল। এইভাবে প্যারিস-কমিউনের শেষ হল; সে সময়ে এই কমিউন ইউরোপে একটা বিরাট সাড়া জাগিয়ে তুলেছিল, সে সাড়া শুধু, একে যেরকম নৃশংস রক্তপাতের দ্বারা লুপ্ত করা হয়েছিল তার দরুন নয়; বর্তমান সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এইটিই ছিল প্রথম সমাজতন্ত্রী বিদ্রোহ। ধনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে দরিদ্ররা বহু বারই বিদ্রোহ করে; কিন্তু সমাজের যে ব্যবস্থার ফলে তাদের দারিদ্র্য তাকেই বদলে ফেলবার কথা তারা এর আগে আর কখনও ভাবে নি। এই কমিউন ছিল একাধারে একটি প্রজাতন্ত্রী এবং অর্থনৈতিক বিদ্রোহ; তাই ইউরোপে সমাজতন্ত্রী চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এটি একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রয়েছে। ফ্রান্সে তখন কমিউনকে বিনষ্ট করবার জন্যে যে প্রচণ্ড পীড়ন চালানো হল তার ফলে সমাজতন্ত্রবাদ অলক্ষ্যে গিয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হল; তার আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে বহুকাল লেগেছিল।
কমিউনকে উচ্ছেদ করা হল, কিন্তু রাজতন্ত্রেরও প্রতিষ্ঠা ফ্রান্সে আর হল না। কিছু দিন পর ফরাসিরা নিশ্চিতভাবেই প্রজাতন্ত্রকে স্বীকার করে নিল; ১৮৭৫ সনের জানুয়ারী মাসে একটি নূতন শাসনতন্ত্র রচনা করে ফ্রান্সের তৃতীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপন করা হল। তখন থেকে এই প্রজাতন্ত্রটিই চলে আসছে, এখনও সে টিঁকে রয়েছে। এখনও ফ্রান্সে এমন লোক কিছু কিছু আছে যারা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে। কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই অল্প; ফ্রান্স চিরকালের মতোই প্রজাতন্ত্রকে গ্রহণ করে নিয়েছে বলে মনে হয়। ফরাসি প্রজাতন্ত্র হচ্ছে বুর্জোয়াদের প্রজাতন্ত্র; অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীরাই এখানে প্রভুত্ব করছে।
১৮৭০-৭১ সনের জর্মন-যুদ্ধের ধাক্কা ফ্রান্স ক্রমে সামলে উঠল, সেই বিরাট পরিমাণ ক্ষতিপূরণও মিটিয়ে দিল। কিন্তু তার প্রজাদের মাথায় যে অপমানের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার আগুন তাদের মনের মধ্যে জ্বলে রইল। ফরাসিরা গর্বিত জাতি, তাদের স্মৃতিও প্রখর; প্রতিশোধ নেবার চিন্তায় তারা অধীর হয়ে উঠল। আলসেস এবং লোরেন প্রদেশ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এই আঘাতটাই তাদের খুব বেশি বেজেছিল। অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করবার পরে বিস্মার্ক তার প্রতি খুব সদয় ব্যবহার দেখিয়েছিলেন, সেটা তাঁর বিচক্ষণতার প্রমাণ। কিন্তু ফ্রান্সের প্রতি তিনি যে কঠোর আচরণ করলেন তার মধ্যে সহৃদয়তা বা বিচক্ষণতার পরিচয় কোথাও ছিল না। গর্বিত জাতির গর্ব খর্ব করলেন তিনি, তার পরিবর্তে অর্জন করলেন সেই জাতিটির ভয়ানক এবং অবিস্মৃত প্রতিহিংসা। এই যুদ্ধ তখনও শেষ হয় নি, সেডানের যুদ্ধটির ঠিক পরে, বিখ্যাত সমাজতন্ত্রবাদী কার্ল্ মার্ক্স্ একটি ইস্তাহার প্রকাশ করেছিলেন; তাতে তিনি এই ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আলসেস্কে এভাবে দখল করে নেবার ফলে “এই দুই দেশের মধ্যে মারাত্মক শত্রুতার সৃষ্টি করা হবে; শান্তির বদলে প্রতিষ্ঠা করা হবে মাত্র একটা সাময়িক সন্ধির।” মার্ক্সের আরও বহু বাণীর মতো তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণীটিও সম্পূর্ণ সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
জমনিতে বিস্মার্ক তখন সর্বেসর্বা প্রভু, সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ‘রক্ত আর অস্ত্র’ নীতি তখনকার মতো জয়যুক্ত হয়েছে; জর্মনি সে নীতিকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করল, উদারপন্থী মতামতকে তারা তখন অবজ্ঞা করে। গণতন্ত্রের উপরে বিস্মার্কের শ্রদ্ধা ছিল না; তিনি রাজার হাতেই সমস্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে চেষ্টা করলেন। ও দিকে আবার জর্মনিতে শিল্প-কারখানা এবং শ্রমিকশ্রেণীর অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নূতন সব সমস্যা এসে উপস্থিত হল; শ্রমিকশ্রেণীর তখন শক্তি বেড়ে যাচ্ছে, তারা আমূল পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে। বিস্মার্ক এর সমাধান করলেন দুই উপায়ে: শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতিসাধন এবং সমাজতন্ত্রবাদের দমন। সমাজকল্যাণের জন্য কিছুটা আইনকানুন রচনা করলেন তিনি, এবং তার লোভ দেখিয়ে শ্রমিকদের হাত করে নিতে, অন্তত তারা চরমপন্থী না হয়ে ওঠে তার ব্যবস্থা করে নিতে চাইলেন। এইভাবে জর্মনিই প্রথম এই ধরনের আইনকানুন বানাতে শুরু করল; শ্রমিকদের বৃদ্ধ বয়সে পেন্সন্ দেবার, তাদের চিকিৎসা এবং জীবনবীমার ব্যবস্থা করবার, এবং আরও নানাবিধ উপায়ে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন করবার জন্যে আইন তৈরি হল। তখন পর্যন্ত ইংলণ্ডও এ দিকে বিশেষ কিছু কাজ করে নি, অথচ তার কল-কারখানা এবং শ্রমিক আন্দোলন, এর অনেক আগেই শুরু হয়েছে। বিস্মার্কের এই নীতিতে কিছুটা ফল হল। তবুও শ্রমিকদের সংগঠন বেড়ে চলল। শ্রমিকরা তখন কয়েকজন খুব ভালো নেতা পেয়ে গিয়েছিল, এদের কয়েকজনের নাম বলছি: ফার্ডিনাণ্ড ল্যাসেল, অত্যন্ত মেধাবী লোক; অনেকের মতে ঊনবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী। অতি অল্পবয়সে ইনি দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হন। উইলহেল্ম্ লীব্নেক্ট্, সাহসী এবং প্রবীণ যোদ্ধা ও বিদ্রোহী। ইনিও আর একটু হলেই বন্দুকের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছিলেন, অল্পের জন্যে বেঁচে যান এবং বৃদ্ধ বয়স পর্যন্তই বেঁচে থাকেন। তাঁর পুত্র কার্ল; স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম চালাতে চালাতেই ইনি অল্পদিন মাত্র পূর্বে ১৯১৮ সনে জর্মন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সময়ে আততায়ীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তার পর কার্ল মার্ক্স্, এঁর সম্বন্ধে আমি তোমাকে অনেক কথা বলব, আর-একটি চিঠিতে। মার্ক্স অবশ্য জীবনের বেশির ভাগই কাটিয়েছিলেন জর্মানির বাইরে, নির্বাসনে।
শ্রমিকদের সংঘগুলি বেড়ে উঠল; ১৮৭৫ সনে এরা সমস্ত একত্র হয়ে সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক দলে পরিণত হল। সমাজতন্ত্রবাদের এই বিস্তার বিস্মার্ক সইতে পারলেন না। এই সময়ে সম্রাটকে হত্যা করবার একটা চেষ্টা হয়; সেই অজুহাত ধরে বিস্মার্ক সমাজতন্ত্রবাদীদের উপরে একেবারে হিংস্র আক্রমণ চালালেন। ১৮৭৮ সনে বহু সমাজতন্ত্র-বিরোধী আইন রচিত হল, তার ফলে সমস্ত রকমের সমাজতন্ত্রী কার্যকলাপ নিষিদ্ধ হয়ে গেল। সমাজতন্ত্রবাদীদের সম্বন্ধে যেসকল আইন করা হল কঠোরতায় সেগুলো প্রায় সামরিক আইনের কাছাকাছি; হাজার হাজার লোককে কারাদণ্ড দেওয়া হল বা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হল। নির্বাসিতদের অনেকে আমেরিকায় চলে গেলেন এবং সেখানে সমাজতন্ত্রবাদের প্রথম প্রতিষ্ঠা করলেন। সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক দল এই আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু তবু সে বেঁচে রইল, এবং পরে আবার শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াল। বিস্মার্কের পীড়ননীতি তাকে মারতে পারল না, বরং সে নীতির সাফল্যেরই ফল হল বেশি খারাপ। শক্তিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই দলটি একটি বিরাট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল, তার প্রচুর ধনসম্পত্তি, হাজার হাজার বেতনভোগী কর্মচারী। কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা যখন ধনী হয়ে ওঠে তখনই তার মধ্যের বিপ্লবী মনটি মরে শেষ হয়ে যায়। জর্মনির এই সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক দলেরও অবস্থা ঠিক তাই হয়।
কূটনীতিতে বিস্মার্কের নৈপুণ্য তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত টিঁকে ছিল; তাঁর সময়কার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি এক বিরাট খেলা খেলে গেছেন। এখন যেমন, তখনকার দিনেও তেমনি, সে রাজনীতির সমস্তটাই ছিল চক্রান্ত আর প্রতিচক্রান্ত, প্রতারণা আর ধাপ্পাবাজির একটা আশ্চর্য ও জটিল জালবিস্তার, তার সমস্তখানিই গোপনে চলে, আবরণের তলায় ঢাকা থাকে। দিনের আলোতে প্রকাশ পেলেই আর তার অস্তিত্ব থাকে না। বিস্মার্কের তখন ভয় ধরেছে, ফরাসিরা হয়তো প্রতিশোধ না তুলে ছাড়বে না; তাই তিনি অস্ট্রিয়া আর ইতালির সঙ্গে একটা মৈত্রী স্থাপন করলেন, তার নাম হল ‘ত্রিশক্তির মৈত্রী’। এমনি করে দুই পক্ষই অস্ত্র-সংগ্রহ আর চক্রান্ত করতে লাগল আর পরস্পরের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাতে লাগল।
১৮৮৮ সনে একটি যুবাপুরুষ জর্মানির কাইজার হয়ে বসলেন, ইনি সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেল্ম্। নিজেকে তিনি একজন অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তি বলে মনে করতেন, সুতরাং অল্পদিনের মধ্যেই বিস্মার্কের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া লাগল। বৃদ্ধ বয়সে সেই লৌহের মত কঠিন ও দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর পদ থেকে বরখাস্ত করা হল। বিস্মার্কের রাগের আর শেষ রইল না। একটুখানি সান্ত্বনা হিসাবে কাইজার তাঁকে ‘প্রিন্স’ উপাধি দান করলেন। বিস্মার্ক কিন্তু রাগে দুঃখে, এবং সমস্ত রাজা-জাতটারই উপরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে একেবারে তাঁর নিজের বাড়িতে গিয়ে বাস শুরু করলেন। একজন বন্ধুর কাছে তিনি বলেছিলেন, “যেদিন এই পদ গ্রহণ করেছিলাম সেদিন আমার সহায় ছিল, রাজার প্রতি একটা গভীর আনুগত্য এবং ভক্তি। আমার ভাগ্য খারাপ, এখন দেখছি সে প্রীতি এবং ভক্তির ভাণ্ডার দিন দিন ক্রমেই কমে আসছে।...... তিন-তিনজন রাজাকে আমি উলঙ্গ দেখেছি; সকল ক্ষেত্রে সে দৃশ্যটা মনোরম ছিল না!”
রোষে ক্ষোভে ভরা মন নিয়ে বৃদ্ধ বিস্মার্ক আরও কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন; ১৮১৮ সনে ৮৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কাইজার কর্তৃক পদচ্যুত হবার পরে, এমনকি মৃত্যুর পরেও, তাঁর ব্যক্তিত্বের ছায়া জর্মানির উপরে ছড়িয়ে ছিল; তাঁর পরবর্তীরাও তাঁরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর পরবর্তী কালে যাঁরা এসেছেন তাঁরা মানুষ হিসাবে বিস্মার্কের চেয়ে অনেক ক্ষুদ্র।