বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/জাপানের অগ্রগতি

উইকিসংকলন থেকে

১১৬

জাপানের অগ্রগতি

২৭শে ডিসেম্বর, ১৯৩২

 জাপান সম্বন্ধে তোমাকে চিঠি লিখেছিলাম, তার পর অনেক দিন চলে গেছে। পাঁচ মাসেরও বেশি হল আমি তোমাকে লিখেছিলাম (৮১নং চিঠি) সপ্তদশ শতাব্দীতে এই দেশটি কী অদ্ভুত ভাবে নিজেকে সকলের থেকে আলাদা করে রেখেছিল। ১৬৪১ সনের পর থেকে দু শো বছরেরও বেশি কাল ধরে জাপানের লোকেরা বাইরের পৃথিবী থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করেছে। এই দু শো বছরে ইউরোপে এশিয়ায় এবং আমেরিকায়, এমনকি আফ্রিকাতে পর্যন্ত বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেল। এই সময়ে যেসমস্ত আশ্চর্য কাণ্ড ঘটেছে তার কিছু কিছু কাহিনী আমি তোমাকে বলেছি। কিন্তু এদের কোনো সংবাদই এই নিভৃতবাসী জাতিটির কানে এসে পৌঁছয় নি; জাপান যে প্রাচীন সামন্ত প্রথার রাজত্ব, বাইরের কোনো বার্তা এসে তার বাতাসে চাঞ্চল্য জাগায় নি। তাকে দেখলে মনে হত যেন কাল আর বিবর্তনের গতি তার কাছে এসে স্তব্ধ হয়ে থেমে গেছে। মধ্য-সপ্তদশ শতাব্দীর যুগটিকে যেন চিরতরে বন্দী করে রাখা হয়েছে সেখানে। কালপ্রবাহ বয়ে চলে পৃথিবী জুড়ে, কিন্তু জাপানের চেহারা মোটেই যেন বদলাচ্ছে না। সেখানে তখনও সামন্ত-প্রথা টিঁকে আছে। সেখানে ভূস্বামীশ্রেণীই সমাজের প্রভু। সম্রাটের ক্ষমতা প্রায় কিছুই নেই; শাসনের ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী হয়ে বসে আছে শোগানরা, বড়ো বড়ো উপজাতিগুলোর সর্দার তারা। ভারতবর্ষে যেমন ক্ষত্রিয় তেমনি জাপানেও একটা যোদ্ধার শ্রেণী ছিল, এদের নাম সামুরাই। সামন্ত রাজারা আর সামুরাইরাই দেশ শাসন করত। অনেক সময় আবার বিভিন্ন সামন্ত বা উপজাতির মধ্যেও ঝগড়া বাধত। চাষিদের এবং অন্যসকল প্রজাদের উৎপীড়ন এবং শোষণ করবার বেলা কিন্তু এরা সবাই একজোট হয়ে থাকত।

 তবুও একসময়ে জাপানে শান্তি স্থাপিত হল। দীর্ঘকাল ধরে গৃহবিবাদের ফলে দেশ একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়েছিল, এমন সময় এই শান্তি-স্থাপনের ফলে সকলেই একটা স্বস্তি পেয়ে বাঁচল। বড়ো বড়ো যোদ্ধা নায়কদের—এদের নাম ছিল দাইমিও—অনেককে দমন করে ফেলা হল। গৃহবিবাদের ফলে জাপান বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, ধীরে ধীরে সে ক্ষতি আবার সে পূরণ করে নিতে শুরু করল। মানুষের মন আবার শিল্প ও কলা, সাহিত্য ও ধর্মের দিকে ফিরতে লাগল। খৃস্টানধর্মের প্রতিপত্তি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল; বৌদ্ধধর্ম আবার জেগে উঠল। তার পরে আবার বড়ো হয়ে উঠল শিণ্টো; এটা জাপানের নিজস্ব ধর্ম, এর মূলকথা—পূর্বপূরুষদের পূজা। সামাজিক আচারব্যবহার এবং নৈতিক জীবনের ব্যাপারে আদর্শ করে নেওয়া হল চীনা ঋষি কনফুসিয়সের উপদেশকে। রাজা এবং সামন্ত-নায়কদের আশ্রয়ে কলাচর্চার উন্নতি হতে লাগল। কোনো কোনো দিক দিয়ে তখনকার জাপানের অবস্থা ছিল ঠিক মধ্যযুগের ইউরোপের মতো।

 কিন্তু পরিবর্তনকে ঠেকিয়ে রাখা অত সহজ নয়। বাইরের সঙ্গে সম্পর্ক রহিত করে রাখা হল, তবু জাপানের নিজের মধ্যে পরিবর্তন চলতে লাগল। অবশ্য অন্য অবস্থায় যেমন হতে পারত তার চেয়ে মন্দগতিতে। অন্যসব দেশের মতো জাপানেও সামন্ত প্রথার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বসে পড়বার উপক্রম হল। প্রজারা অসন্তুষ্ট হয়ে উঠল। সমস্ত ব্যাপারের কর্তাব্যক্তি ছিলেন শোগান, তাই অসন্তোষটাও পড়ল গিয়ে তাঁরই উপর। শিণ্টো পুজোর চলন বেড়ে গেছে, প্রজারা ক্রমেই বেশি করে সম্রাটের দোহাই দিতে লাগল, কারণ, তাদের ধারণা সম্রাটই হচ্ছেন সূর্যের একেবারে সাক্ষাৎ বংশধর। এইভাবে চতুর্দিকের অসন্তোষ-অশান্তির মধ্য থেকে জন্মলাভ করল একটা জাতীয়তাবোধ। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভাঙন থেকেই এর সৃষ্টি, তাই এর অবশ্যম্ভাবী ফল হল দেশময় একটা বিরাট পরিবর্তন—বাইরের জগতের কাছে জাপানের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল।

 জাপানে প্রবেশাধিকার লাভের জন্য বিদেশী জাতিরা বহুবার চেষ্টা করেছে, তার কোনো চেষ্টাই সফল হয় নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র এর জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছিল। তখন তারা পশ্চিমে কালিফোর্নিয়া পর্যন্ত সদ্য প্রভাব বিস্তার করেছে; সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো একটা বড়ো বন্দর হয়ে উঠছে ক্রমশ। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের নূতন পত্তন হয়েছে, তার আকর্ষণ তাকে টানছে অথচ প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সে যাত্রাপথ অতি দীর্ঘ। কাজেই আমেরিকা চাইল, জাপানের কোনো একটা বন্দরে যদি একবার থেমে যাওয়া যায়—তাতে দীর্ঘ পথের মাঝখানে একবার হাঁফ ছেড়ে বিশ্রাম করে নেওয়া যাবে। দরকারি জিনিসপত্রও কিছু জোগাড় করে নেওয়া যাবে। এইজন্যেই আমেরিকা জাপানের ক্ষমতা বুঝবার জন্যে বারংবার চেষ্টা করছিল।

 ১৮৫৩ সনে আমেরিকার একটি রণতরীর বহর জাপানে এল, নিয়ে এল আমেরিকার প্রেসিডেণ্টের একটি চিঠি। জাপানিরা সেই প্রথম বাষ্পকলের জাহাজ দেখল। এর এক বছর পরে শোগান দুটি বন্দর আমেরিকানদের জন্যে খুলে দিতে রাজি হলেন। এই খবর পেয়ে ইংরেজ রুশ আর ওলন্দাজরা অল্পদিনের মধ্যেই ছুটে এল, এসে তারাও শোগানের সঙ্গে অনুরূপ ধরনের সন্ধি করে নিল। এইভাবে ২১৩ বছর পরে জাপান আবার বিশ্বজগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করল।

 কিন্তু এর পরেই বিপদ বাধল। বিদেশীদের কাছে শোগান নিজেকেই সম্রাট বলে জাহির করেছিলেন। প্রজারা তাঁর উপর চটে গেল; তাঁর বিরুদ্ধে, এবং বিদেশীদের সঙ্গে তিনি যেসমস্ত সন্ধি করেছিলেন তার বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন শুরু হল। কয়েকজন বিদেশী মারা পড়ল; সুতরাং বিদেশী জাতিরা রণতরী নিয়ে জাপানকে আক্রমণ করল। অবস্থা ক্রমেই বেশি সঙ্গিন হয়ে উঠল, শেষ পর্যন্ত সকলের অনুরোধে পড়ে ১৮৬৭ সনে শোগান পদত্যাগ করলেন। তোকুগাওয়া-বংশের শোগান-পদ এইভাবে শেষ হয়ে গেল; তোমার মনে থাকতে পারে, ১৬০৩ সনে ইয়েয়াসুকে দিয়ে এর আরম্ভ হয়েছিল। শুধু তাই নয়, শোগান-প্রথাটা একেবারে উঠে গেল; প্রায় সাতশো বছর ধরে এই প্রথা টিঁকে ছিল।

 নূতন সম্রাট এবার ক্ষমতা হাতে পেলেন। ইনি ছিলেন একজন ১৪ বছর বয়সের বালক, সদ্য সিংহাসনে বসেছেন। এঁর নাম ছিল সম্রাট মুৎসিহিতো। পঁয়তাল্লিশ বছর-কাল ইনি রাজত্ব করলেন—১৮৬৭ থেকে ১৯১২ সন পর্যন্ত। এই কালটাকে বলা হয়—মেইজি বা ‘জ্ঞানদীপ্ত-শাসন’ যুগ। এঁর রাজত্বকালেই জাপান একেবারে হূ হূ করে এগিয়ে চলল, পাশ্চাত্যজাতিদের ধরনধারন অনুকরণ করে নিয়ে অনেক দিক থেকে একেবারে তাদের সমকক্ষই হয়ে উঠল। এক-পুরুষের মধ্যে এত বড়ো একটা বিরাট পরিবর্তন-সাধন রীতিমতো বিস্ময়কর ব্যাপার; ইতিহাসেও এর জুড়ি নেই। শিল্পে ব্যবসায়ে শক্তিশালী জাতি হয়ে উঠল জাপান; তার পর পাশ্চাত্যদেশগুলির দেখাদেখি সাম্রাজ্যবাদী এবং লুণ্ঠনব্রতীও হয়ে উঠল। প্রগতির সমস্ত বাহ্যিক লক্ষণই তার মধ্যে দেখা গেল। শিল্পে সে তার শিক্ষকদেরও ছাড়িয়ে চলে গেল। তার লোকসংখ্যা দ্রুতবেগে বেড়ে চলল। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তার জাহাজ চলতে লাগল। একটি ‘বৃহৎ শক্তি’ বলে সে পরিচিত হয়ে গেল, আন্তর্জাতিক ব্যাপারেও তার কথা সকলে মন দিয়ে শোনে। কিন্তু তবুও এই যে এত বড়ো পরিবর্তন, জাতির হৃদয়ের গভীর তলদেশে তার মূল গিয়ে পৌঁছল না। এই পরিবর্তনগুলোকে উপর-উপর বললে ভুল হবে, তার চেয়ে এটা নিশ্চয়ই অনেক বড়ো জিনিস ছিল। কিন্তু শাসকদের মন-বুদ্ধি তখনও সেই সামন্ত যুগেই রয়ে গেছে, আধুনিক সংস্কারকে সেই সামন্তযুগের খোলার সঙ্গে মিলিয়ে নিতেই এঁরা চেষ্টা করছিলেন। কিছু পরিমাণে সে চেষ্টা সফল হয়েছিল বলে মনে হয়।

 জাপানে এইসমস্ত বিরাট পরিবর্তন ঘটল যাঁদের কল্যাণে তাঁরা হচ্ছেন দেশের অভিজাত-সম্প্রদায়ের একদল দূরদর্শী ব্যক্তি। এঁদের বলা হত ‘প্রবীণ রাজনীতিজ্ঞের দল’। বিদেশীদের তাড়াবার জন্যে যখন জাপানে দাঙ্গাহাঙ্গামা শুরু হল এবং তার শোধ নিতে বিদেশী রণতরী জাপানের উপরে কামান চালাল, জাপানিরা তখনই টের পেল, তারা কতখানি অসহায়; অপমানে লজ্জায় যেন মরে গেল তারা। তবু কিন্তু তারা কেবল ভাগ্যকে দোষ দিয়ে বুক চাপড়াতে বসল না; স্থির করল, এই পরাজয় এবং গ্লানি থেকেই যেটুকু শিক্ষা হল তাকে তাদের কাজে লাগাবে। প্রবীণ রাজনীতিজ্ঞেরা দেশের সংস্কার সাধন কীভাবে হবে তার একটা কর্মসূচী খাড়া করে দিলেন; জাপানিরা প্রাণপণ করে তাকে আঁকড়ে ধরে রইল।

 প্রাচীন সামন্তযুগের দাইমিও-প্রথা তুলে দেওয়া হল। সম্রাটের রাজধানী কিয়োটো থেকে সরিয়ে ইয়েদোতে নিয়ে যাওয়া হল, এর নূতন নাম দেওয়া হল টোকিও। নূতন একটি শাসনতন্ত্র রচনা করা হল; এতে ব্যবস্থাপক সভায় দুটি পরিষৎ থাকল—নিম্ন-পরিষদের সভ্যরা হবেন নির্বাচিত, উচ্চ-পরিষদের সভ্যরা হবেন মনোনীত। শিক্ষা, আইন, শিল্প ইত্যাদি করে প্রায় সমস্ত ব্যাপারেই অনেক অদলবদল ঘটানো হল। বড়ো বড়ো সেনাবাহিনী এবং রণতরী বহর গড়ে তোলা হল। বাইরের সমস্ত দেশ থেকে বিশেষজ্ঞ কর্মচারী নিয়ে আসা হল; জাপান থেকে ইউরোপ আর আমেরিকায় ছাত্র পাঠানো হতে লাগল—ভারতীয় ছাত্রদের মতো ব্যারিস্টার বা ঐরকম কিছু হবার জন্যে নয়, বৈজ্ঞানিক এবং শিল্প-বিশেষজ্ঞ হবার জন্যে।

 এইসমস্ত কাজই চালাচ্ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিজ্ঞরা, সম্রাটের নামে। নূতন ব্যবস্থাপক সভা প্রভৃতি যত যাই হোক, সম্রাট কিন্তু তখনও আইনত জাপান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র শাসক হয়েই রইলেন। ও দিকে আবার এক দিকে যেমন এইসব সংস্কার ঘটিয়ে তোলা হচ্ছিল, তার সঙ্গে সঙ্গেই এঁরা সম্রাটকে দেবতা বলে পূজা করার নীতিটাকে প্রচার করতে লাগলেন। এই দুটো অল্পদিনের জন্যেও কী করে একসঙ্গে চলতে পারে বুঝতে আমাদের ধাঁধা লাগে। অথচ জাপানে দুটি ব্যাপার বেশ পাশাপাশি চলে গেল; আজ পর্যন্তও এদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় নি। সম্রাটের প্রতি জাপানিদের একটা অদ্ভূত শ্রদ্ধা আছে, এই শ্রদ্ধাটাকে প্রবীণ রাজনীতিজ্ঞরা দুই ভাবে কাজে লাগালেন। রক্ষণশীল এবং সামন্তপন্থী শ্রেণীগুলোকে তাঁরা জোর করেই সংস্কার-নীতি মেনে নিতে বাধ্য করলেন; এমনিতে হয়তো এরা তাঁদের বাধা দিত, কিন্তু সম্রাটের নাম-মাহাত্ম্যে এদের আর সে সাহস হল না। আবার যে অধিকতর অগ্রণী দলগুলো আরও বেশি জোরে এগিয়ে চলতে চাইল, সমস্ত সামন্ত-প্রথাটাকেই উৎখাত করে দিতে চাইল, তাদেরও এরই জোরে তাঁরা সংযত করে রাখলেন।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর এই শেষ-অর্ধেকে চীন এবং জাপানের মধ্যে যে তফাত দেখা গেল, সে অতি আশ্চর্য। জাপান অতি দ্রুতবেগে নিজেকে পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিত করে নিচ্ছিল; চীনের কথা আমরা আগেই দেখেছি, পরেও আবার আরও বেশি করে দেখব সে ক্রমেই অত্যন্ত জটিল সব সমস্যায় জড়িত হয়ে পড়ছিল। এটা কেন হল? চীন প্রকাণ্ড দেশ, বিপুল তার লোকসংখ্যা, বিরাট তার আয়তন। তার এই বিরাটত্বের জন্যেই সেখানে কোনোরকম পরিবর্তন ঘটানো কঠিন হয়ে উঠেছিল। বৃহৎ আয়তন, বিরাট জনতা বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এগুলো শক্তির উৎস। অথচ এর ভারেই ভারতবর্ষও বিপন্ন। হাতিকে ঠেলে চালানোই শক্ত; অবশ্য একবার যখন সে চলা শরু করে তখন দেখা যায়, ক্ষুদ্রতর জীবের তুলনায় তার শক্তিও অনেক বেশি, গতির বেগও অনেক বেশি। চীনের সরকারও তখন খুব বেশি কেন্দ্রায়ত্ত ছিল না; অর্থাৎ দেশের প্রত্যেক অঞ্চলেই অনেকখানি স্বায়ত্ত-শাসন চলিত ছিল। কাজেই জাপানের মতো এদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা এবং বড়োরকমের কোনো পরিবর্তন সাধন করা চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অতটা সহজ ছিল না। তার উপরে আবার চীনের ছিল একটা বিরাট সভ্যতা, হাজার হাজার বছর ধরে তিলে তিলে সে সভ্যতা গড়ে উঠেছে; প্রজার জীবনযাত্রার সঙ্গে সে সভ্যতার এমন ঘনিষ্ঠ সংযোগ যে, তাকে হঠাৎ বর্জন করা মোটেই সহজ নয়। এ দিক থেকেও আমরা ভারতবর্ষের সঙ্গে চীনের তুলনা করতে পারি। ও দিকে জাপান শুধু চীনের সভ্যতাকে ধার করে নিয়েছিল; তাকে বদলে নূতন জিনিস আমদানি করা তার পক্ষে অনেক বেশি সহজ। ইউরোপীয় জাতিগুলো সারা ক্ষণই চীনের সমস্ত ব্যাপারে এসে হস্তক্ষেপ করছিল; চীনের অসুবিধার সেটাও একটা কারণ। চীন প্রকাণ্ড দেশ, প্রায় একটা মহাদেশ বললেই হয়। জাপান দ্বীপের দেশ, তারা বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ও বন্ধ করে রাখতে পেরেছে। চীনের পক্ষে সেটা সম্ভব ছিল না। উত্তরে এবং উত্তর-পশ্চিমে রাশিয়া তার একেবারে গা ছুঁয়ে রয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমে ইংলণ্ড তার গায়ে ঘেঁষে বসেছে, দক্ষিণে ফ্রান্স ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। এই ইউরোপীয় জাতিগুলো চীনকে কায়দায় ফেলে তার কাছ থেকে বড়ো বড়ো সুযোগসুবিধা আদায় করে নিয়েছে, নিয়ে নিজেদের খুব বৃহৎরকমের একটা বাণিজ্য স্বার্থ গড়ে তুলেছে। এই স্বার্থের দোহাই দিয়ে চীনের উপর হস্তক্ষেপ করবার তাদের প্রচুর সুযোগ রয়ে গিয়েছিল।

 কাজেই জাপান উল্কার বেগে সামনে ছুটে চলল। ও দিকে চীন তখন অন্ধের মতো ধস্তাধস্তি করে মরছে, নূতন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে, কিন্তু ফল কিছুই হচ্ছে না। অথচ এর মধ্যেও একটি আশ্চর্য বস্তু দেখবার আছে। জাপান পাশ্চাত্যদেশের কলকব্জা-শিল্পকে আয়ত্ত করে নিল, আধুনিক সেনা এবং নৌবহর ইত্যাদির জোরে বেশ-একটা অগ্রণী শিল্পপ্রধান জাতি সেজে বসল। ইউরোপের নূতন চিন্তাধারাকে মতামতকে কিন্তু সে তত সহজে মেনে নিল না—ব্যক্তি ও সমাজের স্বাধীনতা, জীবন ও সমাজ সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, এগুলোকে গ্রহণ করল না। মনেপ্রাণে সে থেকে গেল সেই সামন্ত-নীতি আর স্বৈরতন্ত্রেরই উপাসক; বাকি সমস্ত জগৎ যাকে বহুকাল পিছনে ফেলে চলে এসেছে এমন একটা অদ্ভুত রাজপূজাকে আঁকড়ে ধরে রইল জাপানিদের উন্মত্ত ও আত্মঘাতী দেশভক্তি, এই রাজভক্তিরই অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়মাত্র। জাতীয়তাবাদ এবং দেবতা জ্ঞানে সম্রাটের পূজা, দুটো ধর্ম পাশাপাশিই চলল জাপানে। ও দিকে আবার চীন বড়ো বড়ো কলকারখানাকে শিল্প-বাণিজ্যকে অতি সহজে আয়ত্ত করে নিল না, অথচ চীনারা, অন্তত আধুনিক কালের চীনারা, পাশ্চাত্যদেশের মতামত, চিন্তাধারাকে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আগ্রহভরে স্বীকার করে নিল। এই চিন্তাধারা আর তাদের নিজের চিন্তাধারার মধ্যে খুব বেশি তফাত ছিল না। কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, আধুনিক চীন পাশ্চাত্যসভ্যতার মূলতত্ত্বটিকে বেশি ভালো করে শিখে নিয়েছে; তবুও কিন্তু তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে জাপান—কারণ, সে সেই সভ্যতার বাইরের বর্মটাকে গায়ে এঁটে নিয়েছে, যদিও তার মূলতত্ত্বের দিক দিয়েই তাকায় নি। আবার এই বর্ম পরে তার গায়ের জোর বেড়ে গিয়েছে বলেই সমস্ত ইউরোপও তারিফ করল জাপানেরই; তাকে তারা নিজেদের দলভুক্ত বলেই মেনে নিল। কিন্তু চীন দুর্বল; তার কলের কামান নেই, কিচ্ছু নেই। অতএব চীনকে তারা অপমান করতে লাগল, তার ঘাড়ে চেপে বসে থাকল, তাকে খুব বিজ্ঞের মতো উপদেশ শোনাতে লাগল, তার ধনসম্পদ শুষে নিতে লাগল; তার চিন্তাধারাকে মতামতকে মোটে আমলই দিল না।

 কেবল শিল্প-ব্যবসায়ের প্রণালীতে নয়, সাম্রাজ্যবাদী উগ্র নীতিতেও জাপান ইউরোপের অনুসরণ করল। শুধু ইউরোপীয় জাতিদের মেধাবী শিষ্য হয়েই থাকল না, অনেক সময়ে বিদ্যায় গুরুদেরও ছাড়িয়ে গেল সে। জাপানের পক্ষে বড়ো বিপদ বাধাচ্ছিল তার নূতন শিল্পতন্ত্র আর পুরোনো সামন্ততন্ত্রের অসামঞ্জস্য। একসঙ্গে দুটোকেই নিয়ে চলতে গিয়ে সে কোনোমতেই তার অর্থনৈতিক জীবনে একটা সুশৃংখলা আনতে পারছিল না। করের ভার অত্যধিক, তাই নিয়ে প্রজা অসন্তোষ প্রকাশ করছিল। দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা না হয় তার জন্যে সে একটি পুরোনো কৌশলের আশ্রয় নিল—বিদেশে যুদ্ধের আর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আয়োজন দিয়ে লোকের মনকে সেই দিকে আটকে রাখতে চাইল। তখন তার নূতন নূতন শিল্প-বাণিজ্য বেড়ে উঠছে, এদের জন্যেও তাকে বাধ্য হয়ে কাঁচা মাল আর বাজারের সন্ধানে ছুটতে হল—ঠিক যেমন শিল্পবিপ্লবের ফলে ইংলণ্ডকে এবং তার পরে অন্যান্য পাশ্চাত্যদেশগুলিকে বাণিজ্য আর রাজ্যজয় করতে বিদেশে বেরোতে হয়েছিল। জাপানে পণ্যের উৎপাদন বাড়ল, লোকসংখ্যাও দ্রুত বেড়ে চলল। ক্রমেই আরও বেশি বেশি খাদ্য, আরও বেশি বেশি কাঁচা মালের প্রয়োজন হতে লাগল। কোথায় সে পাওয়া যায়? সবচেয়ে কাছের দেশ আছে চীন আর কোরিয়া। চীনে বাণিজ্য করবার সুযোগ আছে, কিন্তু চীনের নিজেরই লোক-সংখ্যা অত্যধিক; কিন্তু চীন-সাম্রাজ্যের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে মাঞ্চুরিয়াতে প্রচুর জায়গা রয়েছে, সেখানে গেলে শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার, আর উপনিবেশ-স্থাপন বেশ চলতে পারে। অতএব জাপানের ক্ষুধিত দৃষ্টি পড়ল কোরিয়া আর মাঞ্চুরিয়ার উপরে।

 চীনের কাছ থেকে পাশ্চাত্যজাতিরা সকল রকমের সুযোগসুবিধা আদায় করে নিচ্ছিল, কিছু কিছু-বা জমিও দখল করে বসবার চেষ্টা করছিল—দেখে জাপান চকিত হয়ে উঠল। ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগল না তার। ঠিক তার মুখোমুখি দেশের উপরে যদি এই জাতিরা একবার পাকারকম আসন গেড়ে বসে যায় তবে হয়তো একদিন ভারও অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, অন্তত মহাদেশের উপর তার প্রতিপত্তি-বিস্তারে বাধা পড়বেই। তা ছাড়া এই লটের বাজারে বড়ো ভাগটা হস্তগত করবার ইচ্ছেও তার মনে ছিল।

 বাইরের জগৎকে তার দরজা খুলে দেবার পর পুরো কুড়িটি বছরও কাটল না, জাপান চীনের উপর জুলুম চালানো শুরু করল। জন-কয়েক জেলে নৌকোডুবি হয়ে চীনাদের হাতে মারা পড়েছিল; সেই তুচ্ছ বিবাদকে উপলক্ষ্য করে জাপান চীনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করে বসল। চীন প্রথমটা ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করল। কিন্তু তার পর দেখল, জাপান যুদ্ধ বাধাবার উপক্রম করছে; ও দিকে আবার ঠিক সেই সময়টাতেই আনামে ফরাসিদের নিয়ে সে ব্যতিব্যস্ত; বাধ্য হয়ে সে জাপানের দাবি স্বীকার করে নিল। এটা ১৮৭৪ সনের কথা। এই জয়ে জাপান উল্লসিত হয়ে উঠল; সঙ্গে সঙ্গেই আবার নূতন জয়যাত্রার সুযোগ খুঁজতে লেগে গেল। কোরিয়াকে মনে হল বেশ ভালো জায়গা; কী সামান্য একটু খুঁটিনাটি নিয়ে জাপান তার সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দিল, তার পরই তাকে আক্রমণ করে বসল। এর ফলে কোরিয়া বাধ্য হয়ে জাপানকে কিছু টাকা সেলামি দিল, আর তার কয়েকটা বন্দরে জাপানিদের বাণিজ্য করবার অধিকার দিয়ে দিল। পাশ্চাত্য-জাতিদের সুযোগ্য শিষ্য সে, তার প্রমাণ জাপান ভালো করেই দিল।

 বহুকাল ধরে কোরিয়া চীনের অধীনস্থ রাজ্য হয়ে ছিল। তার আশা ছিল চীন তাকে রক্ষা করবে; কিন্তু সাহায্য দেবার ক্ষমতা চীনের ছিল না। চীন সরকারের ভয় হল, জাপান বড়ো বেশি প্রবল হয়ে উঠবে। কোরিয়াকে তাঁরা উপদেশ দিলেন, এখনকার মতো জাপানের কথা মেনে নাও, এবং পাশ্চাত্যজাতিগুলোর সঙ্গে সন্ধি-স্থাপন করে নাও, তখন তারাই জাপানকে ঠেকিয়ে দেবে। এইভাবে ১৮৮২ সনে কোরিয়ার দরজা বাইরের জগৎকে খুলে দেওয়া হল। কিন্তু জাপান এত অল্পে তুষ্ট হবার পাত্র নয়। চীন তখন বিব্রত, সেই সুযোগ নিয়ে জাপান আবার কোরিয়ার সমস্যাটিকে খুঁচিয়ে তুলল। চীন বাধ্য হয়ে স্বীকার করল, কোরিয়া তাদের দুই দেশের যৌথ-কর্তৃত্বের অধীনে থাকবে; অর্থাৎ, হতভাগ্য কোরিয়াদেশটি চীন আর জাপান একসঙ্গে এই দুই দেশেরই অধীন বলে গণ্য হয়ে গেল। বেশ বোঝা যায়, এ ধরনের ব্যবস্থাতে সকল পক্ষেরই সমান অসুবিধা। এর ফলে হাঙ্গামা না বেধে পারে না। আর জাপানের তো ইচ্ছেই তাই, হাঙ্গামা বাধানো; ১৮৯৪ সনে সে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ লাগিয়ে দিল।

 ১৮৯৪-৯৫ সনের এই চীন-জাপান যুদ্ধে জাপানের পক্ষে হল একেবারে ছিনিমিনি খেলা। জাপানের সেনা আর নৌবহর আধনিক রীতিতে সজ্জিত; চীনের সেনা তখনও সেকেলে, অকর্মণ্য। সমস্ত ক্ষেত্রেই জাপান অনায়াসে যুদ্ধ জিতে গেল; চীনের উপরে সন্ধির এমনসব শর্ত চাপিয়ে দিল যে তার ফলে জাপানের মর্যাদা একেবারে পাশ্চাত্যজাতিদের সমান দাঁড়িয়ে গেল। কোরিয়াকে স্বাধীন দেশ বলে ঘোষণা করা হল, কিন্তু সেটা আসলে হল জাপানিকর্তৃত্বের একটা অবগুণ্ঠন মাত্র। এ ছাড়াও, মাঞ্চুরিয়াতে পোর্ট আর্থার-সহ লিয়াওতুং-উপদ্বীপ এবং ফরমোজা প্রভৃতি কয়েকটি দ্বীপ জাপানকে ছেড়ে দিতে চীন বাধ্য হল।

 ক্ষুদ্র জাপানের হাতে চীনের এই নিদারুণ পরাজয় দেখে সমস্ত পৃথিবী বিস্মিত হয়ে গেল। দূরপ্রাচ্যে নূতন একটা শক্তিমান জাতির এই অভ্যুদয়ে পাশ্চাত্যজাতিরা মোটেই খুশি হল না। চীন-জাপান যুদ্ধ যখন চলছে, যখন জাপান সে যুদ্ধে জিতে চলেছে, সেই সময়েই এরা জাপানকে সতর্ক করে দিয়েছিল, খাস চীনদেশের কোনো বন্দর জাপান হস্তগত করে নিলে এরা তা সহা করবে না। সে সতর্কবাণীকে অগ্রাহ্য করেই জাপান লিয়াওতুং-উপদ্বীপ আর তার সঙ্গে একটি ভালো বন্দর পোর্ট আর্থার আত্মসাৎ করে নিল। কিন্তু এগুলো ভোগ করতে সে পেল না। রাশিয়া জর্মনি ফ্রান্স, এই তিনটি বৃহৎ জাতি জেদ ধরে বসল, ও জায়গা তাকে ফেরত দিতেই হবে। জাপানকেও সেটা ফেরত দিতেই হল, তার ক্ষোভ এবং রাগের আর অবধি রইল না। কী করবে, এই তিনজনের সঙ্গে একা ঝগড়া করবার মতো শক্তি তার ছিল না।

 কিন্তু এই অপমান জাপান ভুলল না। তার মনের মধ্যে স্মৃতির আগুন জ্বলে রইল, তার জ্বালায় সে আরও বড়োরকমের একটা লড়াই করবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে উঠল। সে লড়াই এল ন বছর পরে, রাশিয়ার সঙ্গে।

 চীনের বিরুদ্ধে জয়-লাভের ফলে ইতিমধ্যেই জাপান দূরপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। চীনেরও সমস্তখানি দুর্বলতা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে; পাশ্চাত্যজাতিরা তাকে যেটুকু ভয় করে চলছিল সে ভয়ও গেছে ভেঙে। মৃত বা মুমূর্ষু দেহের উপর যেভাবে শকুনি পড়ে ঠিক তেমনি করেই তারা এসে চীনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল, চীনের দেহ থেকে যে যতখানি পারে ছিঁড়ে নিতে চেষ্টা করল। ফ্রান্স রাশিয়া ইংলণ্ড জর্মনি সবাই মিলে চীনের উপকূলস্থিত বন্দর আর চীনে ব্যবসার সুযোগসুবিধা নিয়ে একেবারে হুড়োহুড়ি কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দিল। নানা রকমের অধিকার আদায় করবার জন্যে যে মারামারি তারা শুরু করল তা যেমন অন্যায় তেমন কুৎসিৎ। প্রত্যেকটা অতি সামান্য খুঁটিনাটি কথার ছুতো ধরে এরা আরও খানিকটা করে সুবিধা বা অধিকার আদায় করে নিতে লাগল। দুজন মিশনারিকে চীনারা মেরে ফেলেছিল এই অজুহাতে জর্মনি জোর করে পূর্ব চীনে শান্‌তুং উপদ্বীপের কিয়াওচাও-বন্দর দখল করে নিল। জর্মনি কিয়াওচাও নিয়েছে, অতএব অন্যেরাও তাদের ভাগ আদায় করে নেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠল। রাশিয়া পোর্ট আর্থার দখল করে বসল—ঠিক তিন বছর আগে সে নিজেই জাপানকে এই বন্দরটি নিতে দেয় নি। রাশিয়া পোর্ট আর্থার নিয়েছে; অতএব ভারসাম্য বজায় রাখবার জন্যে ইংলণ্ড নিল ওয়েই-হাই-ওয়েই। ফ্রান্সও আনামের একটা বন্দর আর খানিকটা জায়গা দখল করে নিল। এর উপরে আবার রাশিয়া উত্তর-মাঞ্চুরিয়ার মধ্য দিয়ে একটা রেলপথ তৈরি করবার অনুমতি আদায় করল—এটা হল ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের একটা নূতন শাখা।

 এই নির্লজ্জ ছেঁড়াছিঁড়ি কাড়াকাড়ি—এ এক অপূর্ব ব্যাপার! নিজের জমি আর অধিকার এইরকম করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে, চীনের অবশ্যই সেটা খুব ভালো লাগে নি। কিন্তু তবু প্রতি বারেই তাকে রাজি হতে হচ্ছিল, কারণ, অন্য পক্ষ বিপুল নৌবহর নিয়ে আসছে, কামান চালাবে বলে ভয় দেখাচ্ছে। এই লজ্জাকর আচরণের কী নাম দেব আমরা? ডাকাতি? রাহাজানি? এইই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ। কখনও এটা একটু গোপনে কাজ সেরে নেয়; কখনও-বা প্রবল ধর্মনিষ্ঠার আবরণ বা পরোপকারের ছদ্ম ভান দিয়ে তার দুষ্কর্মকে একটু খানি ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখে। কিন্তু ১৮৯৮ সনে চীনে যা করা হল তার উপরে কোনো আবরণ বা ঢাকা ছিল না। সেখানে একেবারে নগ্ন বস্তুটাই তার সমস্তখানি কদর্যতা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল।