বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/জাপানে শোগান-রাজত্ব

উইকিসংকলন থেকে

৫৫

জাপানে শোগান-রাজত্ব

৬ই জুন, ১৯৩২

 চীন থেকে পীতসাগর পার হয়ে জাপানে যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার। সুতরাং এত কাছে যখন এসেছি, একবার জাপান ঘুরে আসা যাক। ইতিপূর্বে জাপানের সম্বন্ধে যা লিখেছি তা মনে আছে তো? ক্ষমতালাভের উদ্দেশ্যে বিত্তশালী কয়েকটি বড়ো পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলতে দেখেছি; তার পরে কেন্দ্রে একটা গভর্মেণ্ট-প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও হচ্ছিল। আগে সম্রাটের ক্ষমতা কোনো-একটা বড়ো এবং ক্ষমতাশালী বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ক্রমে কেন্দ্রীয় গভর্মেণ্টেই সম্রাটের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। কেন্দ্রে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রমাণস্বরূপ নারা নগরে রাজধানী স্থাপিত হল। পরে আবার রাজধানী স্থানান্তরিত হয় কয়টো-নগরে। চীনা শাসন পদ্ধতির অনুকরণ করল জাপান; এমনকি শিল্পকলা, ধর্ম, রাজনীতি ইত্যাদি অনেক-কিছু গ্রহণ করল সরাসরি চীন থেকে কিংবা চীনের মধ্যস্থতায় অন্য দেশ থেকে। ‘দাই নিম্পন’ এই নামটাও চীনা।

 ফুজিআরা বংশ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিল; সম্রাট ছিল তাদের হাতের পুতুল। দু শো বছর তারা জাপানে আধিপত্য করেছে; শেষ পর্যন্ত সম্রাটরা হতাশ হয়ে সিংহাসন ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যায় মঠে। কিন্তু সন্ন্যাসী হলেও সংসার থেকে একেবারে আলগোছ রইল না, পরবর্তী সম্রাটকে শাসনকার্য সম্পর্কে নানা সলাপরামর্শ দিতে লাগল। এতে করে অবস্থাটা জটিল হয়ে উঠল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুজিআরা-বংশের ক্ষমতা ও প্রভুত্ব অনেকটা কমে গেল। সম্রাটরা একজনের পর একজন সিংহাসন ত্যাগ করে মঠে গেল বটে, কিন্তু আসল ক্ষমতা রইল তাদেরই হাতে।

 এদিকে দেশে আরও পরিবর্তন ঘটছিল; নূতন এক জমিদারশ্রেণীর উদ্ভব হল— সামরিক শ্রেণী। এরা ফুজিআরা-বংশেরই সৃষ্টি, গভর্মেণ্টের খাজনা আদায় করত। এদের বলা হত ‘দাইমো’, অর্থাৎ ‘বড়ো নাম’। ব্রিটিশরা আসবার আগে আমাদের প্রদেশেও এ ধরনের এক শ্রেণীর লোকের উদ্ভব হয়েছিল, বিশেষত অযোধ্যায়। ওখানকার রাজা ছিল অকর্মণ্য, ট্যাক্স আদায়ের জন্য তাকে লোক নিযুক্ত করতে হয়েছিল। এই লোকগুলো জোর করে ট্যাক্স আদায় করবার জন্য সৈন্যসামন্ত রাখত; আদায়ীকৃত ট্যাক্সের অধিকাংশই আত্মসাৎ করত নিজেরা। পরে এদের অনেকে এক-একজন বড়ো তালুকদার হয়ে দাঁড়ায়।

 দাইমোরাও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ, সৈন্যসামন্ত নিয়ে বিশেষ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিল। পরস্পরের মধ্যে লড়াই লেগেই থাকত, কয়টোর কেন্দ্রীয় গভর্মেণ্টকে মানত না কেউ। এদের মধ্যে আবার টায়রা আর মিনামতো-বংশ ছিল প্রধান। ১৯৫৬ খৃষ্টাব্দে এদের সহায়তায় সম্রাট ফুজিআরা-বংশকে দমন করেন। কিন্তু তার পরে এই দুই বংশ একে অন্যকে আক্রমণ করল; জয় হল টায়রাদের, এবং ভবিষ্যতে যেন আর উপদ্রব করতে না পারে এই উদ্দেশ্যে চারটি শিশু ছাড়া মিনামতো-বংশের অন্যান্য সকল লোককে তারা মেরে ফেলল। ঐ চার জনের মধ্যে একটির বয়স ছিল বারো বৎসর, নাম আরিতমো। টায়রা-পরিবার ঐখানে মস্ত একটা ভুল করল; আরিতমোকে তারা গ্রাহ্যের মধ্যে আনে নি; ভেবেছিল, ঐ একরত্তি ছেলে কী আর করবে? কিন্তু কালক্রমে আরিতমো ওদের দারুণ শত্রু হয়ে দাঁড়াল, প্রতিহিংসার সংকল্প ওর মনে। শেষ পর্যন্ত ও প্রতিহিংসা নিলে, রাজধানী থেকে তাড়িয়ে দিলে টায়রা-বংশকে, এক নৌ-যুদ্ধে ধ্বংস করল ওদের।

 এখন আর তাকে পায় কে? অফুরন্ত ক্ষমতা তার হাতে। সম্রাট আরিতমোকে সি-ই-তাই-শোগান উপাধিতে ভূষিত করল; এর অর্থ—দুর্বৃত্ত-দমনকারী বীর সেনাপতি। এটা ১১৯২ খৃষ্টাব্দের কথা। এই উপাধিটা বংশগত হয়ে দাঁড়াল এবং তার সঙ্গে এল পূর্ণ শাসনক্ষমতা।

 এভাবেই শুরু হল জাপানে শোগান-রাজত্ব। এই শোগান-রাজত্ব অনেক কাল চলেছিল—এই সেদিন পর্যন্ত, প্রায় সাতশো বছর। তার পরেই পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল আধুনিক জাপান।

 কিন্তু তা বলে মনে কোরো না, আরিতমোর বংশধরগণই এই সাত শো বৎসর রাজত্ব করেছিল। এই সময়ের মধ্যে শোগান-বংশে কত পরিবর্তন, কত গৃহযুদ্ধ ঘটেছে। অনেক সময়ে সম্রাটের প্রকৃত কোনো ক্ষমতাই থাকত না, শুধু নামে মাত্র সম্রাট; রাজাশাসন করত জনকতক কর্মচারী।

 আরিতমো রাজধানী কয়টোতে বাস করত না, পাছে রাজধানীর বিলাসব্যসন তাকে অকর্মণা করে তোলে। সে থাকত কামাকুরা নামক স্থানে; ওটা হল তার সামরিক রাজধানী। দেড় শো বৎসর অর্থাৎ ১৩৩৩ খৃষ্টাব্দ অবধি তা টিঁকে ছিল। এই সময়ে দেশে কোনোরূপ অশান্তি বা গৃহযুদ্ধ ছিল না; নানা বিষয়ে দেশের উন্নতিও হয়েছিল। শাসনব্যবস্থাও ছিল উৎকৃষ্ট, সমসাময়িক কালের ইউরোপের কোনো দেশে এমনটা ছিল না। চীনের উপযুক্ত শিষ্য হলেও এই দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিভিন্ন। চীন শান্তিপ্রিয় দেশ; আর জাপান দেশটা ছিল আক্রমণশীল ও সামরিক। চীনে সৈন্যরা ছিল ঘৃণার পাত্র, যুদ্ধ করা সম্মানের কাজ বলে কেউ মনে করত না; কিন্তু জাপানে সমাজের উচ্চশ্রেণীর লোকেরা সকলেই ছিল সৈনিক।

 চীনের অনেক-কিছু জাপান গ্রহণ করেছে বটে, কিন্তু তা নিজস্ব পদ্ধতিতে, জাতীয় বৈশিষ্টোর উপযোগী করে। চীনের সঙ্গে একটা নিবিড় সম্পর্ক তার বরাবর ছিল, ব্যবসাবাণিজ্য তো চলতই। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে মঙ্গোলীয়গণ যখন চীন এবং কোরিয়াতে আসে, তখন হঠাৎ ঐ সম্পর্কে ছেদ পড়েছিল। মঙ্গোলীয়গণ জাপান জয় করতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারে নি; জাপানিরা তাদের তাড়িয়ে দেয়। এই মঙ্গোলীয়গণ এশিয়ার চেহারা বদলে দিয়েছিল, ইউরোপকেও সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল, অথচ জাপানের কিছু করতে পারে নি। জাপানে বহির্জগতের প্রভাব পড়ে নি, নিজস্ব ধারাই সে বজায় রেখে চলেছে।

 তুলার চাষ কী করে প্রথম জাপানে প্রচলিত হয় সে সম্বন্ধে একটা গল্প আছে; জাপানের প্রাচীন সরকারি দলিলপত্রাদি থেকে তা জানা যায়। ৭৯৯ খৃষ্টাব্দে জাপানের উপকূলে একখানি জাহাজ জলমগ্ন হয়েছিল; তারই কয়েকজন ভারতীয় যাত্রীর কাছে ছিল তুলার বীজ।

 আর জাপানে চায়ের প্রচলন কবে থেকে জানো? সে পরেকার কথা। নবম শতাব্দীর প্রথম ভাগে চাষ শুরু হয়েছিল বটে, কিন্তু তখন সুবিধা হয় নি। তার পরে ১১৯১ খৃষ্টাব্দে জনৈক বৌদ্ধ শ্রমণ চীন থেকে চায়ের বীজ নিয়ে যায় জাপানে, এবং শীঘ্রই চা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু চা পান করবার পাত্র চাই তো? ঝোঁক পড়ল সুদৃশ্য বাসন তৈরির দিকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে একজন জাপানি চীনদেশে গেল পোর্সলিন বা চীনামাটির বাসন তৈরি করা শিখতে। সুদীর্ঘ ছয় বৎসর লোকটি সেখানে রইল, তার পর দেশে ফিরে সুন্দর জাপানি পোর্সলিন তৈরি করতে শুরু করল। আজকাল জাপানে চা-পান একটা চারুশিল্পে দাঁড়িয়ে গেছে এবং তাকে কেন্দ্র করে কতই-না উৎসব! যদি কখনও জাপানে যাও, ঠিক রীতি অনুযায়ী তোমাকে চা পান করতে হবে, নতুবা তুমি সেখানে অপাংক্তেয়।