বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/টাকার অদ্ভুত আচরণ

উইকিসংকলন থেকে

১৭৩

টাকার অদ্ভুত আচরণ

১৬ই জুন, ১৯৩৩

 যুদ্ধের পরবর্তী কালে পৃথিবীতে যে কটি আশ্চর্য ব্যাপার দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে টাকার অদ্ভুত আচরণ। যুদ্ধের আগে প্রত্যেক দেশেরই টাকার একটা মোটামুটি স্থির মূল্য ছিল। প্রত্যেক দেশেরই নিজ মুদ্রা ছিল, যেমন ভারতবর্ষে টাকা, ইংলণ্ডে পাউণ্ড, আমেরিকাতে ডলার, ফ্রান্সে ফ্রাঙ্ক, জর্মনিতে মার্ক, রাশিয়াতে রুব্‌ল, ইতালিতে লিরা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই মুদ্রাগুলির আবার পরস্পরের মধ্যে একটা দর বাঁধা ছিল, সে দর বদলাত না। ‘আন্তর্জাতিক স্বর্ণ-মান’ যাকে বলে, তারই দ্বারা এরা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকত—তার মানে প্রত্যেকটি মুদ্রারই একটা নির্দিষ্ট মূল্য ছিল, সোনার দরে নির্ধারিত মূল্য; প্রত্যেক দেশের মুদ্রা তার নিজের সীমানার মধ্যে চলবে; কিন্তু বাইরে চলবে না। দুই দেশের মুদ্রার মধ্যে বিনিময়ের হার ঠিক হত, কোন মুদ্রায় কতখানি সোনা আছে তাই দিয়ে। অতএব দুই দেশের মধ্যে যত লেন-দেন, যত হিসাব-নিষ্পত্তি, তাও করা হত সোনা দিয়ে। প্রত্যেক দেশের মুদ্রার স্থির স্বর্ণমূল্য যতক্ষণ বজায় থাকছে, ততক্ষণ আন্তর্জাতিক বিনিময় বা লেন-দেনের অঙ্কও বিশেষ বদলাত না; কারণ সোনার দর মোটের উপর সর্বদাই প্রায় এক থাকে।

 যুদ্ধের সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে পড়ে সমস্ত যুদ্ধ-রত দেশের সরকাররা স্বর্ণ-মান ছেড়ে দিলেন, তার ফলে তাঁদের মুদ্রার দাম কমে গেল। খানিকটা মুদ্রাস্ফীতিও ঘটানো হল। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাবার সুবিধা হল, কিন্তু বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মধ্যে যে পরস্পর সম্পর্ক ছিল সেটা ওলটপালট হয়ে গেল। যুদ্ধের সময় সমস্ত পৃথিবীটাই দুটি বৃহৎ ভাগ হয়ে গিয়েছিল—একদিকে মিত্রপক্ষ, একদিকে জর্মন-পক্ষ। প্রত্যেক পক্ষেরই মধ্যেকার দেশদের মধ্যে সহযোগিতা এবং সমানুবর্তন চলত, কারণ যুদ্ধের প্রয়োজনকেই অন্য সব কিছুর চেয়ে বড়ো করে দেখা হচ্ছিল তখন। কিন্তু যুদ্ধের পরে মুশকিল বাধল। অর্থনৈতিক অবস্থা তখন বদলে যাচ্ছে, কোনো দেশই অন্য দেশকে বিশ্বাস করছে না; এর ফলে সকল দেশেরই মুদ্রার বিচিত্র রকম বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। এখনকার দিনে টাকা-কড়ির বাজারটা বেশির ভাগই চলছে ঋণ-মুদ্রা দিয়ে। ব্যাংক নোট এবং চেক দুটোই আসলে টাকা দেবার প্রতিশ্রুতিপত্র; টাকার সামিল বলেই তাকে লোকে মেনে নেয়। ঋণ বস্তুটা চলে বিশ্বাসের উপরে; বিশ্বাস যখন ভেঙে যায় তখন ঋণও অচল হয়ে ওঠে। যুদ্ধের পর থেকে টাকার বাজারে যে এত গোলমাল চলছে, এইটেই তার একটা কারণ: ইউরোপের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা, কেউ কাউকে বিশ্বাস করে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। তাছাড়া এখনকার পৃথিবীতে সবাইকে অন্য সবাইর উপরে নির্ভর করতে হয়, প্রত্যেক দেশই অন্য প্রত্যেক দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িত হয়ে আছে; দেশে দেশে সারাক্ষণই নানারকমের কাজ কারবার চলছে। তার মানেই হচ্ছে একটি দেশে যদি কোনো গোলমাল হয়, সে গোলমালের ফল অবিলম্বে অন্যান্য দেশেও আত্মপ্রকাশ করে। জর্মনির মার্কের যদি দাম কমে যায় বা জর্মনির একটা ব্যাঙ্ক যদি লালবাতি জ্বলে, তবে হয়তো তার ফলে লণ্ডন প্যারিস নিউইয়র্কের লোকেরাও নানান রকমের মুশকিলে পড়ে যাবে।

 এই-সব কারণেই (এবং আরও অনেক কারণে, সেগুলো তোমাকে এখানে বলবার দরকার নেই), প্রায় সমস্ত দেশে তখন মুদ্রা নীতি বা টাকার বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। অনেকক্ষেত্রেই দেখা গেল, শিল্পপ্রগতির দিক থেকে যে দেশ যত বেশি অগ্রণী, বিপদও হয়েছে তারই তত বেশি। এর কারণ বোঝা শক্ত নয়। শিল্প-প্রগতিতে অগ্রণী হবার মানেই হচ্ছে, সে দেশটি আরও নানা দেশের সঙ্গে বহুবিধ বন্ধনে বাঁধা রয়েছে, সে বন্ধন যেমন জটিল তেমনই সূক্ষ্ম। তিব্বত অনগ্রসর দেশ, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তার সম্পর্কও তেমন নেই, মার্ক বা পাউণ্ডের দর চড়ল কি পড়ল তাতে তার কিছুমাত্র যাবে আসবে না—একথা বোঝা শক্ত নয়। কিন্তু ডলারের দর যদি হঠাৎ কমে যায়, তবে হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই জাপানে কান্নাকাটি পড়ে যাবে।

 তার পর আবার প্রত্যেক শিল্পপ্রধান দেশেরই মধ্যে এক-একদল লোকের স্বার্থ ছিল এক-একরকম। অনেকে চাইছিল টাকার দর কমুক, মুদ্রাস্ফীতি হোক (অবশ্য জর্মনির মতো অমন মাত্রাহীন সীমাহীন মুদ্রাস্ফীতি নয়); অনেকে আবার চায় ঠিক তার উল্‌টোটি, মুদ্রা-সংকোচন করা হোক তার মানেই সোনার অঙ্কে টাকার দাম বাড়ুক। যেমন ধরো, যারা পরের কাছে টাকা পাবে, মানে ব্যাঙ্কার ইত্যাদিরা, তারা ছিল টাকার দর বাড়বার পক্ষপাতী—তারা টাকা পাবে, অতএব টাকার দাম বেশি হলেই তাদের লাভ। তেমনি আবার, যাদের দেনা আছে তারা স্বভাবতই চাইবে টাকার দাম কমে যাক—সস্তা টাকা দিয়ে দেনা শোধ করায় তাদের সুবিধা। শিল্পপতিরা কারখানাওয়ালারা সস্তা টাকার পক্ষপাতী, কারণ এরা ছিল সাধারণত খাতকের দল, ব্যাঙ্কদের কাছে এদের দেনা। তার চেয়েও বড়ো কথা, এর ফলে বিদেশে তাদের তৈরি মাল বেচার সুবিধা হবে। ব্রিটেনের টাকার যদি দাম কমে যায়, তবে তার ফলে বিদেশের বাজারে জর্মনি বা আমেরিকা বা অন্যান্য দেশের মালের তুলনায় ব্রিটেনের মালের দর কম হবে, সুতরাং সে বাজারে ব্রিটেনের মালই বেশি বিকোবে, ব্রিটিশ শিল্পপতিদের তাইতেই লাভ। কাজেই দেখছ, এক-একদল টাকার দরটাকে এক-একদিকে টানতে লাগল; এই দড়িটানাটানির খেলায় প্রধান দুইপক্ষ হল শিল্পপতিরা আর ব্যাঙ্কাররা। যতদূর সম্ভব সংক্ষেপ করে আমি কথাটা বলবার চেষ্টা করলাম। আসলে অবশ্য আরও অনেক জটিল ব্যাপার এর মধ্যে ছিল।

 ফ্রান্সে এবং ইতালিতে মুদ্রাস্ফীতি হল, ফ্রাঙ্ক আর লিরার দাম কমে গেল। ফ্রাঙ্কের আগের দর ছিল প্রতি পাউণ্ড স্টার্লিং-এ (ব্রিটিশ পাউণ্ডের সরকারি নাম) ২৫ ফ্রাঙ্কের মতো। সেটা কমে হল প্রতি পাউণ্ডে ২৭৫ ফ্রাঙ্ক। শেষ পর্যন্ত সেটাকে পাউণ্ডে ১২০ ফ্রাঙ্কের কাছাকাছি একটা স্থির দর বেঁধে দেওয়া হল।

 যুদ্ধের পরে আমেরিকা ব্রিটেনকে সাহায্য করা বন্ধ করে দিল, তার ফলে পাউণ্ডেরও দর অল্প একটু পড়ে গেল। ইংলণ্ডের তখন একটি সমস্যা উপস্থিত হল। এখন সে কী করবে? পাউণ্ডের মূল্য স্বাভাবিক কারণেই যেটুকু কমেছে, এই মূল্য-হ্রাসকেই স্বীকার করে নেবে, এই নূতন দরেই পাউণ্ডের দাম ধার্য করে দেবে? তা করলে জিনিসপত্রের দাম কমবে, শিল্পপতিদের সুবিধা হবে; কিন্তু ব্যাঙ্কার এবং উত্তমর্নদের তাতে লোকসান হবে। তার চেয়েও বড়ো কথা, লণ্ডন এতদিন ছিল সমস্ত পৃথিবীর টাকার বাজারের কেন্দ্রস্থল, তার সে প্রতিষ্ঠারও অবসান হবে এতে। তখন তার সেই জায়গাতে এসে দাঁড়াবে নিউইয়র্ক; পৃথিবীর লোক টাকা ধার করতে আর লণ্ডনে আসবে না, নিউইয়র্কে যাবে। আর এ যদি না হয়, তবে অন্য পন্থাটি হচ্ছে পাউণ্ডের দরকে ঠেলে তুলে তার পুরোনো অঙ্কেই কায়েমি করে রাখা। পাউণ্ডের তাতে মর্যাদা বাড়বে, লণ্ডনও আগের মতোই টাকার বাজারে শীর্ষস্থান অধিকার করে থাকতে পারবে। কিন্তু শিল্পবাণিজ্যের ক্ষতি হবে এতে; তা ছাড়া আরও অনেক অবাঞ্ছিত ফল এর দেখা দেবে—কার্যকালে দেখা দিয়েওছিল।

 ১৯২৫ সনে ব্রিটিশ সরকার স্থির করলেন তাঁরা দ্বিতীয় পন্থাটিই নেবেন। পাউণ্ডের স্বর্ণ-মূল্যকে বাড়িয়ে তাঁরা ঠিক আগের অঙ্কে পৌঁছে দিলেন। এই ভাবে ব্যাংকারদের রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা শিল্প-বাণিজ্যের স্বার্থকে খানিকটা ক্ষুণ্ণ করলেন। কিন্তু আসল সমস্যা যেটি তখন তাঁদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সে আরও অনেক গুরুতর—তাঁদের সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব নিয়েই টান পড়বার উপক্রম ঘটেছিল তখন। পৃথিবীর টাকার বাজারে লণ্ডনই এতদিন প্রভুত্ব করে এসেছে। আজ যদি সে আসন থেকে সে বিচ্যুত হয়, তবে আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দেশ নেতৃত্ব বা সাহায্যের আশায় তার কাছে ছুটে আসবে না; এতবড়ো সাম্রাজ্যটাই ধীরে ধীরে মিলিয়ে শেষ হয়ে যাবে। অতএব এই প্রশ্নটা হয়ে উঠল একটা সাম্রাজ্যিক নীতির প্রশ্ন; ব্রিটেনের শিল্প-বাণিজ্য এবং দেশের লোকের আপাত-স্বার্থকে বলি দিয়েও এই বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদকেই তখন বাঁচিয়ে রাখা হল। তোমার হয়তো মনে আছে, ঠিক এই ভাবেই সাম্রাজ্য রক্ষার কথা চিন্তা করে যুদ্ধের পরে ব্রিটেন ভারতবর্ষের শিল্প-প্রচেষ্টাকে উৎসাহ এবং সাহায্য দিয়েছে; ল্যাংকাশায়ারের বস্ত্রশিল্প এবং ব্রিটেনের অন্যান্য শিল্প-বাণিজ্যের অনেকটা ক্ষতি স্বীকার করেও।

 নেতৃত্ব এবং সাম্রাজ্য টিঁকিয়ে রাখবার জন্য ব্রিটেন খুব একটা বীরোচিত চেষ্টাই করল সন্দেহ নেই। কিন্তু এর দরুন তাকে ভয়ানক লোকসান সইতে হল; শেষপর্যন্ত চেষ্টাটা সফলও হল না। অর্থনৈতিক জীবনে যে অনিবার্য ভাগ্য-বিপর্যয় তার আসন্ন হয়ে উঠেছিল তার প্রতিরোধ করবার সাধ্য ব্রিটিশ সরকারের হল না, কোনো সরকারেরই হয় না। কিছুদিনের মতো অবশ্য পাউণ্ড তার পুরোনো মর্যাদা এবং প্রতিষ্ঠা ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু তার মূল্য দিতে হল নিদারুণ—দেশের শিল্প-বাণিজ্য ক্রমে যেন পক্ষাঘাতে অচল হয়ে পড়ল। বেকার সমস্যা বাড়ল, বিশেষ করে কয়লা-শিল্পের খুব বেশি রকম ক্ষতি হল। পাউণ্ডের সংকোচনই (স্বর্ণ-মল্য বাড়াবার এই কায়দাটিকে এই নামেই ডাকা হয়) ছিল এর প্রধান হেতু। অন্যান্য কারণও অবশ্য ছিল। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ জর্মনির কাছ থেকে খানিকটা কয়লা নেওয়া হয়েছিল, তার মানেই ব্রিটিশ কয়লার প্রয়োজন আর ততটা রইল না; সুতরাং কয়লার খনিতে যে শ্রমিকরা খাটত তাদের মধ্যে বহু লোক বেকার হয়ে পড়ল। বিজেতা অতএব পাওনাদার দেশরা এইভাবে ধীরে ধীরে বুঝতে লাগল, বিজিত দেশের কাছে এই ধরনের রাজস্ব আদায় করে নেওয়াটা ঠিক অবিমিশ্র সুখলাভের ব্যাপার নয়। ব্রিটেনের কয়লা-শিল্পের বন্দোবস্তও ছিল অত্যন্ত খারাপ। বহু শত শত ছোটো ছোটো প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা ভাবে খনি চালাত; ইউরোপ মহাদেশের এবং আমেরিকার খনি চলত অনেক বেশি বড়ো বড়ো এবং অনেক বেশি সুসংহত সব প্রতিষ্ঠানের হাতে—তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলা ক্ষুদ্রকায় এবং বিশৃঙ্খল ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানদের পক্ষে সহজ ছিল না।

 কয়লা-শিল্পের অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হতে লাগল; খনির মালিকরা তখন স্থির করলেন শ্রমিকদের বেতন কমিয়ে দেবেন। খনি শ্রমিকরা এতে ভয়ানক আপত্তি জানাল; অন্যান্য শিল্পের শ্রমিকরাও তাদেরই সমর্থন করল। ব্রিটেনের সমগ্র শ্রমিক বাহিনী খনি শ্রমিকদের পক্ষ হয়ে লড়বার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল; একটি ‘কর্ম-পরিষৎ’ গঠন করা হল। এর কিছুদিন আগে দেশের প্রধান তিনটি ট্রেড-ইউনিয়নের মধ্যে একটি খুব বড়ো রকমের ‘ত্রি-শক্তি মৈত্রী’ স্থাপিত হয়েছিল; এই তিনটি ট্রেড-ইউনিয়ন হচ্ছে খনি শ্রমিক, রেলওয়ে-শ্রমিক এবং যান-বাহন শ্রমিকদের ইউনিয়ন—লক্ষ লক্ষ সুশিক্ষিত এবং সুসংহত শ্রমিক এদের মধ্যে ছিল। শ্রমিকরা এইরকম মারমুখো হয়ে উঠেছে দেখে সরকার একটু ভয় পেয়ে গেলেন; খনিওয়ালাদের একটা মোটারকম অর্থসাহায্য দিয়ে তাঁরা আসন্ন সংকটটাকে তখনকার মতো ঠেকিয়ে দিলেন—সেই সাহায্যের টাকায়, মালিকরা আরও এক বছর পর্যন্ত পুরোনো হারেই বেতন দিয়ে চলতে পারবে। ইতিমধ্যে অবস্থা বুঝবার জন্য একটা তদন্ত কমিশনও বসানো হল। কিন্তু আসল কাজের কিছুই হল না এতে। পরের বছর মানে ১৯২৬ সনে খনিওয়ালারা আবার বেতন কমাতে চেষ্টা করলেন। অতএব সংকটও আবার আসন্ন হয়ে উঠল। সরকার এবার আর ভয় পেলেন না; শ্রমিকদের সঙ্গে লড়াই করবার জন্য তৈরি হয়েই দাঁড়ালেন—গত কয়েক মাসে এই লড়াইয়ের জন্য তাঁরা সমস্ত রকম আয়োজন করে নিয়েছেন।

 কয়লা-ওয়ালারা স্থির করলেন, মজুরেরা বেতন কাটাতে রাজি হচ্ছে না, অতএব তাঁরা খনি তালাবদ্ধ করে দেবেন। এর ফলে অবিলম্বে সারা ইংলণ্ড জুড়ে ব্যাপক ধর্মঘট শুরু হয়ে গেল। এই ধর্মঘটের নির্দেশ দিলেন ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস। এদের আহ্বানে দেশে আশ্চর্য সাড়া জেগে উঠল; দেশের যেখানে যত সুসংহত শ্রমিকসংঘ ছিল প্রায় প্রত্যেকেই কাজ বন্ধ করে দিল। ইংলণ্ডের সমস্ত জীবনযাত্রাটাই প্রায় থমকে থেমে গেল—রেলগাড়ি চলে না, খবরের কাগজ ছাপানো যায় না, কোনো কাজকর্মই প্রায় চলছে না দেশে। দুটো চারটে অত্যন্ত অপরিহার্য কাজ শুধু স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর দ্বারা সরকার কোনোক্রমে চালিয়ে নিচ্ছিলেন। এই দেশব্যাপী ধর্মঘট শুরু হয় ১৯২৬ সনের ৩রা-৪ঠা মে দুপুররাত্রে কিন্তু ট্রেড-ইউনিয়ন কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতারা এই শ্রেণীর বৈপ্লবিক ধর্মঘট পছন্দ করতেন না; দশদিন ধর্মঘট চালাবার পর হঠাৎ এঁরা ধর্মঘট বন্ধ করবার নির্দেশ দিলেন; কে কোন অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি তাঁদের দিয়েছে ইত্যাদি অজুহাত দেখালেন। খনি শ্রমিকরা একেবারে দমে পড়ে গেল; তবু বহু দীর্ঘকাল, বহু মাস ধরে অনেক কষ্ট সয়েও তারা নিজেরা ধর্মঘট চালিয়ে গেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনাহার আর পীড়নের চোটেই তাদের হার মানতে হল। কেবল খনি-শ্রমিক নয়, ব্রিটেনের সমস্ত শ্রমিকেরই সেটা একটা নিদারুণ পরাজয়। বহু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন কমিয়ে দেওয়া হল; অনেক কারখানাতে খাটনির সময় বাড়িয়ে দেওয়া হল; শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান আরও নিচু হয়ে গেল। সরকার পক্ষের জয় হয়েছিল, সেই সুযোগে তাঁরা অনেকগুলো নূতন আইন তৈরি করে নিলেন, যেন তাই দিয়ে শ্রমিকদের জোর কমিয়ে দেওয়া যায়, যেন ভবিষ্যতে আর এরকমের কোনো দেশব্যাপী ধর্মঘট ঘটবার সম্ভাবনা না থাকে। ১৯২৬ সনের এই দেশজোড়া ধর্মঘট ব্যর্থ হয়েছিল তার কারণ, শ্রমিকদের নেতাদের মনের জোর এবং মতির স্থিরতা ছিল না, ধর্মঘটের জন্য তাঁরা ঠিকমতো প্রস্তুতও হয়ে নেন নি। বস্তুত এঁদের উদ্দেশ্যই ছিল ধর্মঘটকে এড়িয়ে চলা; সেটা যখন পেরে উঠলেন না তখন প্রথম সুযোগটি পাবামাত্রই একে তাঁরা ভেস্তে দিলেন। অন্য দিকে সরকার পক্ষ এর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে ছিলেন; এবং তাঁদের পিছনে ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীদের সমর্থন।

 ইংলণ্ডের এই ব্যাপক ধর্মঘট এবং কয়লার খনির দীর্ঘকালব্যাপী তালাবন্ধ ধর্মঘট দেখে সোভিয়েট রাশিয়াতে খুব উৎসাহের সঞ্চার হয়েছিল; ইংলণ্ডের খনি-শ্রমিকদের সাহায্যার্থে রাশিয়ার ট্রেড-ইউনিয়নরা একেবারে রাশি রাশি টাকা পাঠিয়ে দিলেন—রাশিয়ার শ্রমিকরাই চাঁদা করে সে টাকা তুলে দিয়েছিল।

 তখনকার মতো ইংলণ্ডে শ্রমিকরা পরাভূত হল। কিন্তু দেশের শিল্পপ্রচেষ্টায় তখন ভাঙন ধরেছে, বেকার সমস্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে—তার সমাধান এ দিয়ে হয় না। বেকার সমস্যা মানেই হচ্ছে শ্রমিকদের ব্যাপক দুঃখদর্দশা; তাছাড়া রাষ্ট্রের উপরেও এটা একটা প্রচণ্ড বোঝা হয়ে উঠেছিল; কারণ ইতিমধ্যে বহু দেশেই একটা বেকার-বীমার ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে। সকলেই তখন স্বীকার করছে, যে শ্রমিক তার নিজের কোনো দোয় ছাড়াই বেকার হয়ে রইল, তাকে ভরণপোষণ জোগাবার ভার বা কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্রের। অতএব বেকার বলে যারা খাতায় নাম লিখিয়েছে তাদের সাহায্য বা ভিক্ষা বলে কিছু দিতেই হত; অতএব সরকার এবং স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানদের প্রকাণ্ড পরিমাণ টাকা এই জন্য ব্যয় করতে হচ্ছিল।

 এই-সমস্ত ব্যাপার ঘটছিল কেন? শুধু ইংলণ্ডে বলে নয়, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই কেন তখন শিল্পের অবনতি ঘটছিল, বাণিজ্যে মন্দা পড়েছিল, বেকার-সমস্যা বেড়ে চলেছিল? মানবের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল? কত কন্‌ফারেন্সের পর কন্‌ফারেন্স হল, অবস্থার উন্নতি সাধনের জন্য রাষ্ট্রনীতিবিদরা আর শাসকরা স্পষ্টতই ব্যগ্রতা দেখাতে লাগলেন, কিন্তু ফল কিছুই হল না। এমন নয় যে ভূমিকম্প বন্যা বা অনাবৃষ্টির মতোই একটা কী প্রাকৃতিক বিপর্যয় এসে আঘাত হেনেছে পৃথিবীকে, বয়ে নিয়ে এসেছে দুর্ভিক্ষ আর দুর্দশা। পৃথিবী তো তখনও আগে যেমন চলত প্রায় তেমনই চলেছে। বাস্তবিকই তখন পৃথিবীতে আগের চেয়ে অনেক বেশি খাদ্য ছিল, অনেক বেশি কারখানা ছিল, যা কিছু মানুষের প্রয়োজন সবই অনেক বেশি বেশি ছিল। অথচ মানুষের দৈন্য-দুর্দশাও আগের চেয়ে ছিল অনেক বেশি। এই উল্‌টো ফল, এর মূলে কোথাও খুব প্রচণ্ড একটা ভুল রয়েছে, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। প্রত্যেক ব্যাপারেই তখন বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত চলেছে। সমাজতান্ত্রবাদীরা ও কমিউনিস্টরা বলছে, এর সবই হচ্ছে ধনিকতন্ত্রের কুফল; তার তখন নাভিশ্বাস উঠেছে। প্রমাণ হিসাবে তারা দেখাচ্ছিল রাশিয়াকে—বহু বিপত্তি বহু বাধাবিঘ্ন রয়েছে সেখানে, কিন্তু বেকার সমস্যা অন্তত নেই।

 এ-খুব বড়ো জটিল আলোচনা; আর ব্যাধি কি করে সারবে সে সম্বন্ধে ডাক্তার আর পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদের অন্ত নেই। তবুও একবার সমস্যাটাকে নেড়েচেড়ে দেখা যাক; এর মধ্যে খুব বড়ো বড়ো কথা যে-কটা আছে তার দু-একটাকে আলোচনা করে দেখি।

 সমস্ত পৃথিবী এখন দিন দিন একটিমাত্র অখণ্ড রূপ গ্রহণ করছে, এই রূপান্তর তার অনেকখানি সম্পূর্ণও হয়েছে। তার মানে, মানুষের জীবন, কার্যকলাপ, পণ্য-উৎপাদন, বণ্টন, ভোগ—সমস্তই একটা আন্তর্জাতিক বা সর্ব-জাগতিক ব্যাপারে পরিণত হচ্ছে, এই পরিণতির বেগও দিনদিনই বাড়ছে। বাণিজ্য, শিল্প, মুদ্রা-নীতি, এদেরও প্রকৃতি হয়েছে অনেকখানিই আন্তর্জাতিক। এসব ব্যাপারে সকল দেশই এখন পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে বাঁধা; পরস্পরের উপর নির্ভর করেই তারা বাঁচছে, একদেশে কোনো কিছু ঘটলে অন্য দেশদের মধ্যেও তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। অথচ এই এতখানি আন্তর্জাতিকতার মধ্যেও প্রত্যেক দেশের সরকার আর তার কূটনীতি এখনও চলেছে জাতীয়তার সংকীর্ণ পথ ধরে। বস্তুত যুদ্ধের পরবর্তী এই কটি বছরের মধ্যে এদের এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ক্রমেই উত্তরোত্তর বিকৃত এবং উগ্র হয়ে উঠেছে; আজকের দিনে পৃথিবীর অনেকখানি ব্যাপারই চলছে এর ইঙ্গিতে। তার ফলে বাধছে বিরোধ—একদিকে জগতের বাস্তব আন্তর্জাতিক জীবনের সব ঘটনা, আর একদিকে বিভিন্ন দেশের সরকারপক্ষের জাতীয় কূটনীতি—এই দুয়ের মধ্যে সারাক্ষণই সংঘাত চলেছে। মনে করো পৃথিবীর এই আন্তর্জাতিক জীবনধারা, এ যেন একটা নদী সমুদ্রের দিকে বয়ে চলেছে; আর বিভিন্ন জাতির নিজস্ব কূটনীতি যেন সেই নদীকে বাঁধবার চেষ্টা—তার স্রোতকে সে থামিয়ে দিতে চায়, বাঁধ দিয়ে আটকাতে চায়, পথ ছেড়ে অন্যপথে ঘুরিয়ে নিতে চায়, এমনকি পিছন ফিরেও যাওয়াতে চায়। সে নদী পিছন ফিরে যাবে না, বা তাকে থামিয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। এতো সোজা কথা। কিন্তু তবু হঠাৎ একবার হয়তো তার গতি খানিকটা ঘুরিয়ে দেওয়া যেতে পারে, বা একটা বাঁধ দেবার ফলে হয়তো সে ফুলে উঠে বন্যারই সৃষ্টি করতে পারে। ঠিক এমনি করেই আজকালকার এই জাতীয়তাবাদ নদীর সহজ ধারাটিকে ব্যাহত করছে, বন্যা ঘূর্ণি বা পঙ্কিল পল্বলের সৃষ্টি করছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তার নিজের পথে বয়ে চলবেই, তাকে ঠেকিয়ে রাখবার সাধ্য এদের নেই।

 বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে তাই আবির্ভাব হয়েছে তথাকথিত ‘অর্থ নৈতিক জাতীয়তাবাদের’। এর মানে হচ্ছে, দেশ অন্যদের কাছ থেকে যতটা পণ্য কিনল তার চেয়ে তাদের কাছে তার বেচতে হবে বেশি; যতটা পণ্যসামগ্রী সে ভোগ করে তার চেয়ে তাকে উৎপাদন করতে হবে বেশি। প্রত্যেক দেশই তার নিজের পণ্য অপরের কাছে বেচতে চাইছে—কিন্তু তাই যদি হয়, সে পণ্য কিনবে কে? মাল বেচতে গেলেই বিক্রেতা যেমন থাকবে তেমনই ক্রেতাও তো থাকা চাই। কেবলমাত্র বিক্রেতা দিয়েই ভরা একটা জগৎ—অতি অসম্ভব কল্পনা। অথচ এই কল্পনাকে আশ্রয় করেই অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি। প্রত্যেক দেশ তার চারদিকে বাণিজ্য-শুল্কের প্রাচীর খাড়া করে দিচ্ছে, বিদেশী পণ্য দেশে ঢুকতে না পারে এই শুল্ক তার পথ বন্ধ করবার অর্থনৈতিক বেড়া। আবার তারই সঙ্গে সঙ্গে, তার নিজের বৈদেশিক বাণিজ্যকে বাড়িয়ে তুলবার চেষ্টা। আধুনিক জগৎ গড়েই উঠেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আশ্রয় করে; এই শুল্ক-প্রাচীরগুলো সে বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, তাকে হত্যা করছে। বাণিজ্যে মন্দা পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই শিল্পেরও দুর্দশা ঘটে, বেকার সমস্যা বেড়ে যায়। তাই দেখে তখন আবার উগ্রতর উৎসাহে বিদেশী পণ্যকে বাইরে ঠেলে রাখবার চেষ্টা শুরু হয়—বলা হয়, এই পণ্যই এসে দেশের শিল্পকে বাড়তে দিচ্ছে না। শুল্ক-প্রাচীর আরও উঁচু করে তোলা হয়। অতএব তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বেশি বাধা পড়ে; এমনি করেই এই দুষ্ট চক্র পাক খেয়ে ঘুরতে থাকে।

 আধুনিক জগতের শিল্প-জীবন বস্তুত জাতীয়তাবাদের যুগকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। পণ্য-উৎপাদন এবং বণ্টনের যে আয়োজন পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে, বিশেষ কোনো দেশ বা সরকারের জাতীয় গণ্ডির এলাকাতে আর তার স্থান সঙ্কুলান হয় না। ভিতরকার দেহটা ক্রমশ বেড়ে বড়ো হয়ে উঠছে, তার তুলনায় খোলাটা ছোটো; অতএব সে খোলা ফেটে ভেঙে যাচ্ছে।

 বাণিজ্যের পথে এই যে-সব শুল্ক-প্রাচীর প্রভৃতির বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, এতে বস্তুত প্রত্যেক দেশের কয়েকটি মাত্র শ্রেণীর উপকার। কিন্তু দেশের মধ্যে সেই শ্রেণীদেরই হাতে প্রভুত্ব; অতএব দেশ কোন্ পথে চলবে তাও এরাই স্থির করবে। প্রত্যেক দেশই চেষ্টা করছে লাফ দিয়ে অন্যকে ডিঙিয়ে যাবে; ফলে সবাই মিলেই হুড়োহুড়ি ঠোকাঠুকি করে মরছে, দেশে দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর বিদ্বেষ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া মেটাবার জন্য এখন বার বার করে চেষ্টা করা হচ্ছে, কত সভা কত কনফারেন্স ডাকা হচ্ছে; সভায় সকল দেশেরই রাষ্ট্রনীতিবিদরা খুব ভালো ভালো সংকল্প ব্যক্ত করছেন; তবু শান্তিস্থাপন তাঁরা কিছুতেই করতে পারছেন না। শুনে যেন ঠিক, ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক সমস্যা, হিন্দু-মুসলমান-শিখের সমস্যা মেটাবার জন্য যে বারবার চেষ্টা করা হচ্ছে, তার কথাই মনে পড়ে যায়—তাই না? সম্ভবত দুটি ক্ষেত্রেই চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে একই কারণে: ভুল ধারণা আর ভুল তথ্য নিয়ে এঁরা তর্ক করছেন, ভুল উদ্দেশ্য তো রয়েছেই।

 শুল্ক-প্রাচীর এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সহায়ক আরও যত ফিকির-ফন্দি আছে, যেমন শিল্পকে সরকারি অর্থ সাহায্য, পণ্যের রেল ভাড়ার বিশেষ সস্তা দর, ইত্যাদি—এর ফলে লাভ হয় কোন শ্রেণীদের? মালিক এবং উৎপাদক শ্রেণীদের। শুল্ক ইত্যাদি দিয়ে ঘিরে দেশের বাজারটিকে সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে, সেই বাজারের লাভটা এরা তুলে নেয়। এমনি করে বাণিজ্য-সংক্ষরণ শুল্ক-প্রাচীর ইত্যাদির আচরণে কতকগুলো কায়েমী-স্বার্থ গড়ে তোলা হয়; তারপর কায়েমী-স্বার্থ ওয়ালাদের যা নিয়ম, তাদের তিলমাত্র ক্ষতি ঘটতে পারে এমন কোনো পরিবর্তনের কথা উঠলেই এরা ঘোরতর আপত্তি প্রকাশ করতে থাকে। বাণিজ্য-শুল্ক একবার বসানো হলে সে শুল্ক যে আর তুলে দেওয়া হয় না, চলতেই থাকে, এইটাই হচ্ছে তার একটা কারণ। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদে সকলেরই ক্ষতি একথাটা এখন প্রায় সকল মানুষই বুঝে নিয়েছে; কিন্তু তবুও সে বস্তুটা পৃথিবী থেকে মুছে যাচ্ছে না—তারও কারণ এই। কতকগুলো কায়েমী-স্বার্থ একবার সৃষ্টি করে নিলে, তারপর তাকে উচ্ছেদ করা সহজ ব্যাপার নয়। কোনো একটি দেশের পক্ষে একাকী এই কাজ করতে এগিয়ে যাওয়া আরও বেশি শক্ত। পৃথিবীর সকল দেশ যদি একত্র হয়ে কাজ করতে রাজি হত, শুল্ক-প্রাচীর বস্তুটাকেই একেবারে তুলে দিতে, বা অন্তত অনেকখানি ছেঁটে দিতে রাজি হত, তাহলে হয়তো বা কাজটা হতেও পারত। কিন্তু সেক্ষেত্রেও কাজ সহজ হত না; তার কারণ, শিল্প-প্রচেষ্টায় যে দেশগুলি পিছিয়ে পড়ে আছে তাদের এতে অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ত—যে-দেশটা অনেক বেশি এগিয়ে গেছে তাদের সঙ্গে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এদের পক্ষে সম্ভব হত না। অনেকসময়ে সংরক্ষণ-শুল্কের আড়াল দিয়েই দেশে নূতন নূতন শিল্প গড়ে তোলা হয়।

 অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যকে বাধা দেয়, বন্ধ করে দেয়, তার ফলে পৃথিবীর বাজারে বেচাকেনা ঠিকমত চলতে পারে না। প্রত্যেক দেশই একটি একচেটিয়া এলাকাতে পরিণত হয়। তার বাজার তার নিজের জন্যই সংরক্ষিত; পৃথিবীতে অবাধ বাণিজ্যের খোলা বাজার ক্রমে অন্তর্হিত হয়ে যায়। বড়ো বড়ো ট্রাস্ট, বড়ো বড়ো কারখানা, বড়ো বড়ো দোকানদার, ছোটো ছোটো উৎপাদক বা ছোটো ছোটো দোকানদার যারা ছিল তাদের গিলে হজম করে ফেলে; বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে কিছু আর থাকে না। আমেরিকাতে ব্রিটেনে জর্মনিতে জাপানে এবং অন্যান্য সকল শিল্পপ্রধান দেশে এই রকমের জাতীর একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানরা ভয়ানক তীব্র গতিতে বেড়ে উঠেছে; ফলে দেশের সমস্ত ক্ষমতা গিয়ে একত্রিত হয়েছে মুষ্টিমেয় কটিমাত্র মানুষের হাতে। পেট্রল, সাবান, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, রণসম্ভার, ইস্পাত, ব্যাঙ্কিং ইত্যাদি করে কত জিনিসই যে একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের হাতে গিয়ে পড়েছে তার হিসাব নেই। এর আবার একটা অদ্ভূত ফল আছে। এই একচেটিয়া ব্যবসায় হচ্ছে বিজ্ঞানের উন্নতি এবং ধনিকতন্ত্রের প্রগতির অপরিহার্য ফল; অথচ সেই ধনিকতন্ত্রেরই মূল শিকড় এ কেটে দেয়। ধনিকতন্ত্রের শুরুই হয়েছিল পৃথিবী-জোড়া বাজার আর অবাধ বাণিজ্যকে আশ্রয় করে। প্রতিযোগিতাই ছিল ধনিকতন্ত্রের প্রাণবায়ু। এখন যদি সে পৃথিবী জোড়া বাজার আর না থাকে, দেশের গণ্ডির মধ্যেও যদি অবাধ বাণিজ্য এবং প্রতিযোগিতা আর বেঁচে না থাকে, তবে ধনতান্ত্রিক সমাজের এই যে পুরোনো ইমারৎ, এর তলাটাই একদম ফেঁসে যাবে। এর জায়গাতে তখন আবার কে এসে বসবে সে আলাদা কথা; কিন্তু এই-যে পরস্পর-বিরোধী কাণ্ড-কারখানা চারদিকে চলেছে, এ অবস্থায় পুরোনো দিনের ব্যবস্থাও আর বেশিদিন চলতে পারবে না বলেই মনে হয়।

 বিজ্ঞান আর শিল্প এতদূর এগিয়ে চলেছে, বর্তমান সমাজ- ব্যবস্থা তার সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারছে না। বিজ্ঞান আর শিল্প মিলে বিপুল পরিমাণ খাদ্য এবং জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রী তৈরি করছে; তত জিনিস নিয়ে কী করা যায় সেইটাই ধনিকতন্ত্র ভেবে উঠতে পারছে না। বস্তুত, প্রায়ই সে তার খানিকটা নষ্ট করে ফেলতে বা উৎপাদনের সীমা নির্দেশ করে দিতে রত হয়। অতএব আমরা একটা অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি ধনের প্রাচুর্য আর মানুষের দৈন্য একই সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের আর যন্ত্রশিল্পের পাল্লা যতদূর, ততখানি এগিয়ে চলবার শক্তি যদি ধনিকতন্ত্রের না থাকে, তবে তার পরিবর্তে আরেকটা এমন ব্যবস্থা বার করতে হবে যা বিজ্ঞানের সঙ্গে বেশি তাল মিলিয়ে চলতে পারবে। আর এ যদি করতে না চাই, তবে আর একটিমাত্র করবার জিনিস থাকে, সে হচ্ছে বিজ্ঞানকে গলাটিপে মেরে ফেলা, তাকে আর এগিয়ে যেতে না দেওয়া। কিন্তু সেটা কিঞ্চিৎ বোকার মতো কাজ হবে; সত্যিই সে কাণ্ড আমরা করতে যাব এটা ভাবাও শক্ত।

 অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, একচেটিয়া ব্যবসায় এবং দেশে দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৃদ্ধি, এবং ক্ষয়িষ্ণু ধনিকতন্ত্রের অন্যান্য যত অপসৃষ্টি—এদের ফলে পৃথিবী জুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। আধুনিক যুগের সাম্রাজ্যবাদও আসলে এই ধনিকতন্ত্রেরই একটা রূপ; প্রত্যেক সাম্রাজ্যবাদী দেশই অন্যান্য দেশকে শোষণ করে তার নিজের সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। এর ফলে আবার সৃষ্টি হচ্ছে এই সাম্রাজ্যবাদী দেশদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিরোধিতা। পৃথিবীটাই যেন কেমন উল্‌টো-পাল্‌টা হয়ে গেছে আজকাল, এর সব কিছু থেকেই খালি ঝগড়ার সৃষ্টি হয়।

 এই চিঠির শুরুতে আমি বলেছিলাম, যন্ত্রের পরবর্তী কালটিতে টাকার বড়ো অদ্ভূত আচরণ দেখা গেছে। কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত জিনিসই যেখানে অত্যন্ত অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করে বেড়াচ্ছে, সেখানে টাকার আর দোষ দিই কী করে?