বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/তিনটি মাস!
১৯
তিনটি মাস!
২১শে এপ্রিল, ১৯৩১
অনেকদিন তোমাকে চিঠি লিখি নি। ইতিমধ্যে প্রায় তিনটি মাস কেটে গেছে; অনেক দুঃখ, কষ্ট, উদ্বেগের মধ্য দিয়ে এই কটি মাস কাটল। এই তিন মাসে ভারতবর্ষে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, আর সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন হয়েছে আমাদেরই পরিবারে। সত্যাগ্রহ বা আইন অমান্য আন্দোলন আপাতত কিছু কালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে, কিন্তু ভারতের যেসমস্ত সমস্যা আমাদের সুমুখে রয়েছে তার সহজ সমাধান এখনও দেখা যাচ্ছে না। ওদিকে আমাদের পরিবারের যিনি ছিলেন কর্তা তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তিনি ছিলেন আমাদের সকলের প্রিয়; তাঁর কাছেই আমরা শক্তি এবং প্রেরণা লাভ করেছি, তাঁরই পক্ষপুটে আশ্রয়লাভ করে দিনে দিনে বর্ধিত হয়েছি এবং ভারতমাতার যৎসামান্য সেবার অধিকারও তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি।
নাইনি জেলে সেই দিনটির কথা স্পষ্ট মনে পড়ছে। সেদিন ২৬শে জানুয়ারি। রোজকার অভ্যাসমতো সেদিনও তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছিলাম—পুরাকালের ইতিহাস সম্বন্ধে। এর ঠিক আগের দিনেই তোমাকে চন্দ্রগুপ্ত এবং তাঁর স্থাপিত মৌর্য বংশ সম্বন্ধে লিখেছিলাম। সেই চিঠিতেই বলে রেখেছিলাম যে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পরে যাঁরা রাজত্ব করেছিলেন তাঁদের সম্বন্ধে আরও কিছু বলব, বিশেষ করে মহামতি অশোক সম্বন্ধে, যিনি ছিলেন দেবতাদেরও প্রিয়। ভারতের আকাশে একটি অত্যুজ্জল নক্ষত্রের ন্যায় অশোকের আবির্ভাব। তাঁর তিরোধানের পরেও তিনি তাঁর অমর স্মৃতি পশ্চাতে রেখে গিয়েছেন। অশোকের কথা ভাবতে ভাবতে আমার মন অতীতের প্রান্ত থেকে আবার ঘুরে ফিরে বর্তমানের ক্ষেত্রে ফিরে এল, ঠিক এই ২৬শে জানুয়ারির দিনটিতে। এটি আমাদের একটি স্মরণীয় দিন, কারণ এক বৎসর পূর্বে এই দিনটিকে আমরা ভারতবর্ষের সর্বত্র নগরে নগরে গ্রামে গ্রামে স্বাধীনতা দিবস কিংবা পূর্ণ স্বরাজ দিবস রূপে পালন করেছিলাম এবং দেশের লক্ষ লক্ষ লোক সেদিন স্বাধীনতার সংকল্প গ্রহণ করেছিল। তার পরে পুরো একটি বৎসর কেটে গেছে—বহু সংগ্রাম, বহু দুঃখের মধ্য দিয়ে কিছু কিছু, জয়ের সূচনাও দেখা গিয়েছে। আজ আবার সেই উৎসবের দিনটি ফিরে এসেছে। নাইনি জেলের ৬ নম্বর ব্যারাকে বসে বসে ভাবছিলাম, আজ আবার দেশময় কত সভা কত শোভাযাত্রা হবে, পলিশের লাঠি চলবে, কত লোক বন্দী হয়ে জেলে যাবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে একদিকে মন গর্বে আনন্দে অপরদিকে বেদনায় ভরে উঠছিল। হঠাৎ আমার চিন্তার সূত্রটি গেল ছিঁড়ে। বাইরের জগৎ থেকে সংবাদ এল, তোমার দাদু খুব অসুস্থ। তাঁর শয্যাপার্শ্বে উপস্থিত হবার জন্য আমাকে নাকি তক্ষুনি মুক্তি দেওয়া হবে। দুশ্চিন্তার ভারে আরসব ভাবনা গেল গুলিয়ে। তোমাকে যে চিঠি সবে লিখতে শুরু করেছিলাম তা রেখে দিতে হল। নাইনি জেল থেকে বেরিয়ে রওনা হলাম আনন্দভবনের দিকে।
দাদুর মৃত্যুর পূর্বে দশটি দিন আমি তাঁর শয্যাপার্শ্বে ছিলাম। ঐ কটি দিন দিরারাত্রি আমি তাঁর ব্যাধিযন্ত্রণা লক্ষ্য করেছি। কী অসীম সাহসের সঙ্গে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে যুঝেছেন তাও দেখেছি। জীবনে তিনি বহু সংগ্রাম করেছেন এবং বহু ক্ষেত্রেই জয়লাভ করেছেন। কখনও হার মানেন নি, মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েও মৃত্যুর কাছে হার মানতে চান নি। মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সেই শেষ সংগ্রাম দেখছিলাম। যাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি তাঁর রোগযন্ত্রণা এতটকু লাঘব করতে পারছিলাম না ভেবে আমার মন যখন অবসন্ন তখন, অনেকদিন আগে এডগার এলেন পো’র গল্পেপড়া কয়েকটি লাইন আমার মনে পড়ে গেল—মানুষ দেবতাদের কাছেও বশ্যতা স্বীকার করে না, এমনকি নিতান্ত দুর্বলচিত্ত না হলে মৃত্যুকেও পুরোপরি স্বীকার করে না।
৬ই ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন। তাঁর অতিপ্রিয় জাতীয় পতাকায় মৃতদেহটিকে আবৃত করে লক্ষ্ণৌ থেকে আনন্দভবনে তাঁকে নিয়ে এলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই দেহ একমুঠো ভস্মে পরিণত হল এবং মা গঙ্গা সেই অতি মূল্যবান দেহাবশেষ সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন।
লক্ষ লক্ষ লোক তাঁর জন্য শোক প্রকাশ করেছে, কিন্তু এই যে আমরা যারা তাঁর সন্তান, তাঁর রক্তমাংসে গড়া মানুষ—তাদের মনের অবস্থা কে বুঝবে? আর এই-যে আনন্দভবন, তার অবস্থাই বা কী? এটিও তো আমাদের মতোই তাঁর সন্তান। নিজের হাতে কত যত্নে কত ভালোবেসে একে গড়ে তুলেছিলেন। আজ সেই গৃহ জনহীন, পরিত্যক্ত; তার প্রাণশক্তি অন্তর্হিত। বারান্দায় মৃদু পদক্ষেপে অতিসন্তর্পণে আমরা হাঁটি চলি, পাছে যিনি এই সুখের নীড় গড়েছিলেন তাঁর শান্তির ব্যাঘাত হয়।
আমরা তাঁর জন্য শোকার্ত, প্রতি মুহূর্তে তাঁর অভাব বোধ করছি। এই-যে দিন যাচ্ছে, কই, শোকের তাপ তো একতিল কমছে না? তাঁর অভাব তেমনি অসহ্য মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় তিনি এটি চান নি; চান নি যে শোকে আমরা ভেঙে পড়ি। তিনি যেভাবে দুঃখের সম্মুখীন হয়েছেন এবং দুঃখকে জয় করেছেন আমরাও তাই করি, এই তিনি চেয়েছিলেন। তিনি যে কাজ অসমাপ্ত রেখে গেছেন আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে তাই করে গেলে তবেই তিনি তৃপ্তি পাবেন। চুপ করে বসে বৃথা আমাদের শোক করবার সময় কোথায়? কাজ যে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-যজ্ঞে আমাদের আহ্বান এসেছে। সেই যজ্ঞেই তিনি প্রাণ আহুতি দিয়েছেন। তাঁর মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা বেঁচে থাকব, প্রাণপণে সংগ্রাম করব, প্রয়োজন হয় তো প্রাণ দেব।
বসে বসে তোমাকে চিঠি লিখছি, সুমুখে যতদূর দেখা যায় আরবসাগরের নীল জলরাশি, অপরদিকে বহুদূরে ভারতের তটসীমা ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই সীমাহীন অনন্ত বিস্তার দেখে কেবলই মনে পড়ছে, উঁচু দেয়াল-ঘেরা নাইনি জেলের ছোট্ট ব্যারাকটি, যেখান থেকে তোমাকে আগের সব চিঠি লিখেছি। সুমুখে দিকচক্রবাল-রেখাটি সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—যেখানে আকাশ এবং সমুদ্র যেন মিশে গেছে। কিন্তু জেলখানার বন্দীর চোখে চারদিক ঘেরা উঁচু দেয়ালটাই দিগন্তরেখা টেনে দেয়। বন্দীদের মধ্যে আমরা অনেকে আজ কারাপ্রাচীরের বাইরে আছি, বাইরের মুক্ত হাওয়া উপভোগ করছি। কিন্তু আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে অনেকে আজও সংকীর্ণ কারাকক্ষে আবদ্ধ; সেখানে তারা না দেখে সমুদ্র, না দেখে ডাঙা, না দেখে দূর দিগন্ত। বলতে গেলে ভারতমাতা নিজেই কারারুদ্ধ, তাঁর স্বাধীনতা আজও অনাগত। ভারতবর্ষই যদি স্বাধীন না হল তবে আমাদের এইটুকু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মূল্য কোথায়?