বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/দক্ষিণ-ভারতের প্রাধান্যলাভ
২৯
দক্ষিণ ভারতের প্রাধান্যলাভ
সুদূর প্রাচ্যের চীনদেশ আর পাশ্চাত্যের রোম পরিভ্রমণ করে অনেক কাল পরে ভারতে ফিরে এলাম।
অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। উত্তর-ভারতের প্রদেশগুলো হীনবল হয়ে পড়ে; এদিকে দাক্ষিণাত্যে গজিয়ে ওঠে একটা নূতন সাম্রাজ্য—অন্ধ্র-সাম্রাজ্য। অশোকের বংশধরগণ বছর-পঞ্চাশেক মগধে রাজত্ব করেছিল, তার পর শেষ মৌর্যরাজের সেনাপতি বলপূর্বক সিংহাসন দখল করেন। ইনি ছিলেন ব্রাহ্মণ, নাম পুষ্যমিত্র। এঁর রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরভ্যুদয় হয়; বৌদ্ধসন্ন্যাসীদের উপর কিছুটা অত্যাচার-অবিচারও করা হয়েছিল। ভারতের ইতিহাস পড়তে পড়তে তুমি দেখতে পাবে, বৌদ্ধধর্মের উপর ব্রাহ্মণ্যধর্মের আক্রমণের রীতিটা ছিল কূটনৈতিক, অশিষ্ট অত্যাচার কখনও করে নি। কিছুটা অত্যাচার অবিচার যে হয় নি তা নয়, তবে সম্ভবত তার হেতু ছিল রাজনৈতিক। বৌদ্ধসংঘগুলো ছিল খুব শক্তিশালী; এগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতাও ছিল যথেষ্ট। সম্রাটদের মধ্যে অনেকে এই সংঘগুলোকে রীতিমতো ভয় করে চলতেন এবং তাই ওদের ক্ষমতা লোপ করবার জন্যে বরাবর চেষ্টা করেছেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মকে দেশছাড়া করল, তবে বৌদ্ধধর্মের আদর্শ কতকটা গ্রহণ করতে হয়েছিল।
এই নূতন ব্রাহ্মণ্যধর্ম পুরাতনের পুনরাবৃত্তি নয়, কিংবা বৌদ্ধধর্মের আদর্শকে অস্বীকারও করে নি। ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রাচীন নায়কগণের রীতি ছিল, নূতনকে গ্রহণ করা, খাপ খাইয়ে নেওয়া। আর্যগণ প্রথম যখন ভারতে এল তখন তারা দ্রাবিড়জাতির আচারপদ্ধতি ও সংস্কৃতি অনেকাংশে গ্রহণ করেছিল; জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক, এই রীতিই তারা পালন করেছে, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। বৌদ্ধধর্মের প্রতিও তাদের এই মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে—বুদ্ধকে করেছে অবতার আর দেবতা। অগণিত জনসাধারণ তাঁকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করেছে, অথচ তাঁর বাণী ও আদর্শকে পালন করে নি। ওদিকে ব্রাহ্মণ্যধর্ম তথা হিন্দুধর্ম ও তার আদর্শ এবং ভাবধারা বজায় রেখেছে। বৌদ্ধধর্মের উপর ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাববিস্তারের এই চেষ্টা অনেককাল ধরে চলেছিল, কেননা, অশোকের মৃত্যুর পরেই তো আর বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে লোপ পায় নি। আরও কয়েক শো বছর ছিল এ দেশে।
অশোকের মৃত্যুর পরে মগধে কোন বংশের প্রভুত্ব স্থাপিত হল, কারাই বা রাজা হল তা আলোচনা করার দরকার নেই। দুশো বছরের মধ্যেই মগধ সাম্রাজ্যের প্রতিপত্তি লোপ পেয়ে গেল; অবশ্য পরেও বৌদ্ধসংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে তার খ্যাতি ছিল।
এদিকে উত্তর-ভারত আর দাক্ষিণাত্যে মহা আন্দোলন চলছিল। শক, তুর্কি, কুষাণ, ব্যাকট্রিয়ার গ্রীকজাতি, সিথিয়াবাসী প্রভৃতি মধ্য-এশিয়ার নানা জাতির আক্রমণে উত্তর-ভারত উত্ত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। মধ্য-এশিয়া ছিল নানা জাতির জন্মস্থান; এরা কীরূপে ক্রমে ক্রমে সমগ্র এশিয়ায়, এমনকি ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে এবং ইতিহাসের পাতায় বারে বারে এদের আবির্ভাব হয়, সে কথা তোমাকে পূর্বে বলেছি। খৃষ্টের জন্মের পূর্বে প্রায় দু শো বছর কাল যাবৎ এভাবে ভারত অনেকবার আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু মনে রেখো, এইসমস্ত আক্রমণের উদ্দেশ্য দেশ-জয় কিংবা লুঠপাট নয়, আসল উদ্দেশ্য ছিল জায়গা দখল করে বসবাস করা। মধ্য-এশিয়ার জাতিদের অধিকাংশই ছিল যাযাবর, লোকসংখ্যা-বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাসস্থানে এদের সংকুলান হত না; কাজেই এরা এখান থেকে ওখানে যেত, নূতন জায়গার সন্ধানে ফিরত। আর-একটা কারণ এই ছিল যে, পিছন থেকে প্রায়ই এদের উপর চাপ পড়ত; এক জাতি আর-এক জাতিকে স্থানচ্যুত করে দিত এবং বাধ্য হয়েই এরা অন্য দেশ আক্রমণ করত। সুতরাং যেসকল জাতি ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিল, তাদের উদ্দেশ্য ছিল আশ্রয় লাভ করা। চীন-সাম্রাজাও যখনই সুযোগ পেয়েছে—যেমন হান বংশের রাজত্বকালে—যাযাবর জাতিগুলোকে তাড়িয়ে দিয়েছে দেশ থেকে।
আর-একটা কথা মনে রাখবে, মধ্য-এশিয়ার এইসমস্ত যাযাবর জাতি ভারতবর্ষকে পুরোপুরি শত্রুর দেশ বলে মনে করে নি। ইতিহাসে এদের বলা হয়েছে বর্বর; সে যুগের ভারতের তুলনায় এরা অবশ্য ততটা সভ্যভব্য ছিল না। কিন্তু অধিকাংশ জাতিই ছিল গোঁড়া বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, এবং ভারতবর্ষ এদের ধর্মের জন্মভূমি হওয়াতে এরা ভারতকে খুব শ্রদ্ধা করত।
পুষ্যমিত্রের রাজত্বকালেও ব্যাক্ট্রিয়ার গ্রীক রাজা মিনান্দার ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল আক্রমণ করেছিলেন। ইনি ছিলেন বৌদ্ধ। ব্যাক্ট্রিয়া ছিল ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে। প্রথমে সেলিউকসের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু পরে স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। পুষ্যমিত্রের নিকট পরাজিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু মিনান্দার কাবুল আর সিন্ধুদেশ অধিকার করতে সমর্থ হন।
ব্যাক্ট্রিয়াবাসীদের পরে এল শকজাতি। শকেরা উত্তর এবং পশ্চিম-ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এরা ছিল তুর্কি যাযাবর জাতির একটা শাখা; কুষাণজাতি এদের স্থানচ্যুত করেছিল। ব্যাক্ট্রিয়া, পার্থিয়া প্রভৃতি রাজ্য পদদলিত করে শকেরা এ দেশে এসে উত্তরাঞ্চলে, বিশেষত পাঞ্জাব, রাজপুতানা এবং কাথিয়াওয়াড়ে রাজ্য স্থাপন করে। ক্রমে এরা যাযাবর জাতির রীতিনীতি পরিত্যাগ করে এবং সভ্য জাতিতে পরিণত হয়।
এই সময়ের ইতিহাসে একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য। সেটা এই যে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তুর্কি, ব্যাক্ট্রীয় প্রভৃতি বিদেশী জাতি রাজত্ব করলেও ইন্দো-আর্য সমাজব্যবস্থায় তেমন কোনো ওলটপালট কখনও হয় নি। এরা ছিল বৌদ্ধ এবং বৌদ্ধসংঘব্যবস্থাই মেনে চলেছে; আর ঐসকল বৌদ্ধসংঘ তো প্রাচীন ভারতের গণতান্ত্রিক গ্রাম্য সমাজব্যবস্থার উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। সুতরাং এদের রাজত্বকালেও এ দেশে স্বায়ত্তশাসনমূলক গ্রাম্য শাসনব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল। তখনও বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও শিক্ষার কেন্দ্ররূপে তক্ষশীলা আর মথুরার খুব নামডাক ছিল, চীন এবং পশ্চিম-এশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা ওখানে আসত।
কিন্তু উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে পুনঃপুনঃ আক্রমণের ফলে এবং মৌর্য সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরাতে প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতি ক্রমে এ অঞ্চল থেকে অন্তর্হিত হয়; দাক্ষিণাত্যের ভারতীয় রাষ্ট্রগুলোই খাঁটি ইন্দো-আর্য প্রথার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। বহু গুণীজ্ঞানী লোক উত্তরাঞ্চল থেকে চলে যায় দাক্ষিণাত্যে। হাজার বৎসর পরে যখন মুসলমানগণ ভারত আক্রমণ করে তখনও ঠিক এই ব্যাপার ঘটেছিল। এই দেখো-না কেন, আজও পর্যন্ত উত্তর-ভারতই ঐসমস্ত আক্রমণের ফল ভোগ করছে, দাক্ষিণাত্যে বড়ো একটা আঁচড় লাগে নি। আমরা উত্তর ভারতের বাসিন্দারা একটা মিশ্র সংস্কৃতির আবহাওয়ায় গড়ে উঠেছি; এটা হিন্দু, মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রণ এবং তাতে আবার পাশ্চাত্যের ঢেউ এসে লেগেছে। এমনকি আমাদের ভাষাও মিশ্র ভাষা, তাকে হিন্দি, অথবা উর্দু কিংবা হিন্দুস্থানি যাই বলো-না কেন। অথচ দাক্ষিণাত্য আজও হিন্দু প্রধান, অধিবাসীরা বেজায় নিষ্ঠাপরায়ণ, সে তো তুমি নিজেই দেখেছ। শত শত বৎসর ধরে দাক্ষিণাত্য প্রাচীন আর্যসভ্যতার ধারা বজায় রাখতে চেষ্টা করেছে, এবং তার ফলে এমন এক কঠোর মনোবৃত্তিসম্পন্ন সমাজের সৃষ্টি হয়েছে যে তার পরমত-অসহিষ্ণুতা দেখলে অবাক লাগে। দেয়াল জিনিষটা ভয়াবহ; কখনও কখনও বাইরের বিপদ থেকে রক্ষা করলেও, শেষ পর্যন্ত মানুষকে বন্দী আর ক্রীতদাসে পরিণত করে; স্বাধীনতার বিনিময়ে তখন তোমাকে কিনতে হয় শুচিতা আর পবিত্রতা। আর মনের মধ্যে যদি একবার দেয়াল খাড়া করে তুলতে পারো তবে সেটা হবে আরও সাংঘাতিক; প্রাচীন কালের কোনো কুপ্রথাকেই তুমি ছাড়তে পারবে না, আবার নূতন চিন্তা বা আদর্শকে গ্রহণ করতেও তোমার বাধবে।
কিন্তু তথাপি দাক্ষিণাত্য একটা কাজের মতো কাজ করেছে, সহস্রাধিক বৎসর কাল যাবৎ শিল্পকলা ধর্ম আর রাজনীতিতে ভারতীয় আর্যসভ্যতার ধারা রক্ষা করেছে। প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলার নিদর্শন দেখতে চাও তো তোমাকে দক্ষিণ ভারতে যেতে হবে। আর রাজনীতির দিক থেকে দাক্ষিণাত্যের গণতান্ত্রিক সংসদগুলো যে রাজশক্তিকে সংযত রাখত, সে কথা তো মেগাস্থেনিসের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকেই আমরা জানতে পারি।
কেবল যে জ্ঞানী লোকেরাই উত্তর-ভারত ছেড়ে দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়েছিল তা নয়; শিল্পী, কারিকর, মিস্ত্রি প্রভৃতি অনেক গুণী লোকও মগধের পতনের পরে দাক্ষিণাত্যে চলে যায়। এই সময়ে দাক্ষিণাত্যের সহিত ইউরোপের বাণিজ্য চলত। এ দেশ থেকে সোনা, মুক্তা, হাতির দাঁত, চাল, লঙ্কা, ময়ূর, এমনকি বানরও বাবিলন মিশর গ্রীস এবং রোমে রপ্তানি করা হত। মালাবার উপকূল থেকে সেগুন কাঠ চালান দেওয়া হত বাবিলনে। আর-একটা কথা খেয়াল করবে যে, ভারতের নিজস্ব জাহাজে করেই এই ব্যবসাবাণিজ্য চলত। জাহাজের খালাসি ছিল যত দ্রাবিড়—জাতির লোক। এ থেকেই বুঝতে পারছ, সেই প্রাচীন যুগের পৃথিবীতে দাক্ষিণাত্যের স্থান কত উপরে ছিল। অসংখ্য রোমান মুদ্রা দক্ষিণ ভারতে পাওয়া গেছে। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি, মালাবার উপকূলে আলেকজান্দ্রিয়ার উপনিবেশ ছিল, আর ওদিকে ভারতীয় উপনিবেশ ছিল আলেকজান্দ্রিয়ায়।
অশোকের মৃত্যুর কিছু পরেই দাক্ষিণাত্যে অন্ধ্রজাতি শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপন করে। ভারতের পূর্ব-উপকূলে এবং মাদ্রাজের উত্তরে এই অন্ধ্রদেশ; বর্তমানে অন্ধ্র একটি কংগ্রেসী প্রদেশ, তা তুমি জানো। অন্ধ্রদেশের ভাষা তেলেগু। অশোকের মৃত্যুর পরে এই সাম্রাজ্য অতি দ্রুত বিস্তার—লাভ করে। উপনিবেশ স্থাপনের ব্যাপারে দাক্ষিণাত্য কীরূপ উদ্যোগী হয়েছিল সে কথা পরে বলব।
শক, সিথিয়াবাসী প্রভৃতি জাতির কথা তোমাকে বলেছি; এরা ভারতবর্ষ আক্রমণ করে এবং উত্তর-ভারতে বসবাস করতে থাকে। কালক্রমে এরা ভারতেরই অঙ্গীভূত হয়ে যায়; আমরা উত্তরভারতের বাসিন্দারা যেমন আর্যদের বংশধর তেমনি আবার ওদেরও বংশধর। বিশেষ করে, সাহসী রাজপুত জাতি আর কাথিয়াওয়াড়ের কর্মঠ অধিবাসীরা তো এদেরই সন্তানসন্ততি।