বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ধনসম্পদ যায় কোথায়?
১৩
ধনসম্পদ যায় কোথায়?
মুসৌরিতে তোমাকে যেসব চিঠি লিখেছি তাতে মানুষের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে নানাবিধ শ্রেণীর উদ্ভব হল তাই দেখাবার চেষ্টা করেছি। আদিম কালের মানুষকে বড়ো কঠোর জীবন যাপন করতে হত। কেবলমাত্র খাদ্যসংগ্রহ নিয়েই তার দুশ্চিতার অবধি ছিল না। বনে বনে শিকার করে বেড়াতে হত, প্রতিদিনের খাদ্যের জন্য ফলমূল সংগ্রহ করতে হত। কখনও কখনও খাদ্যের অন্বেষণে স্থান থেকে স্থানান্তরে যেতে হত। এইভাবে ক্রমে ক্রমে দল গড়ে উঠতে লাগল। এই দলগুলো আর কিছু নয়, কতকগুলো বৃহৎ পরিবারের সমষ্টিমাত্র। তারা একসঙ্গে বাস করত, একসঙ্গে শিকার করত, কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে একা থাকার চাইতে দল বেঁধে থাকা বেশি নিরাপদ। তার পরে একটা বিরাট পরিবর্তন এল—এটি হল কৃষিবিদ্যা-আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে; এতে এক ঘোরতর পরিবর্তন হল। লোকে দেখল, সারাক্ষণ শিকার করে বেড়ানোর চাইতে কৃষিবিদ্যার সাহায্যে জমি থেকে খাদ্যসংগ্রহ করা অনেক বেশি সহজ। আর জমি চাষ করা, বীজ বপন করা, ফসল কেটে আনা—এতসব কাজে ব্যাপৃত থাকলে জমিটাকেই সম্বল করে বাস করতে হয়। এতদিন যে তারা চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াত এখন আর তা সম্ভব হল না। কাজেই জমির কাছাকাছি স্থায়ী আস্তানা করতে হল। এরই ফলে আস্তে আস্তে গ্রাম শহর গড়ে উঠতে লাগল।
কৃষিবিদ্যার ফলে আরও-সব পরিবর্তন হয়েছে। জমি থেকে যে খাদ্য সংগ্রহ হত তা অনেক সময়েই তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে পড়ত; এই বাড়তি ফসল তারা মজুত করে রাখত। সেই পুরোনো দিনে যখন তারা শিকার করে খেত, তার চাইতে এখন জীবনের জটিলতা একটু বেড়ে গেল। বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগ হয়ে এক দল লোক জমিতে চাষের কাজ করতে লাগল, এক দল রক্ষণাবেক্ষণের, আর এক দল সাধারণ শৃঙ্খলা বিধানের। এই পরিচালক এবং শৃঙ্খলা-বিধানকারীর দলই ক্রমে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠল। পরে তারাই হল সমাজপতি কিংবা শাসনকর্তা, রাজা কিংবা অভিজাতসম্প্রদায়। হাতে ক্ষমতা পেয়ে খাদ্যের উদ্বৃত্ত অংশের বেশির ভাগ এরাই গ্রাস করতে লাগল। কাজেই এরা হয়ে উঠল অপরের চেয়ে ধনী; আর যারা জমিতে খেটে ফসল ফলাত তাদের ভাগে যেটুকু আসত তাতে কোনোরকমে তাদের উদরপূর্তি হত মাত্র। ক্রমে ক্রমে অবস্থা হল, পরিচালকের দল এত অলস এবং অকর্মণ্য হয়ে পড়ল যে, তাদের দ্বারা পরিচালনার কাজও আর ভালো করে চলত না। তারা কিছুই করত না, কিন্তু ভাগ নেবার বেলায় সবচেয়ে বড়ো ভাগটি তাদের নেওয়া চাই। তাদের এখন এই ধারণা জন্মে গেল যে অপরে যা পরিশ্রম করে উৎপাদন করবে তাই বসে বসে খাবার জন্মগত অধিকার তাদের আছে।
তা হলেই দেখতে পাচ্ছ, কৃষিবিদ্যা-আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে কী বিরাট পরিবর্তন এসে গেল। খাদ্যসংগ্রহের উন্নততর প্রণালী উদ্ভাবন করে, খাদ্য সহজলভ্য করে দিয়ে, কৃষিবিদ্যা বলতে গেলে সমাজের ভিত্তি একেবারে নেড়েচেড়ে দিল। লোকের হাতে এখন প্রচুর অবসর। বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্ভব হল; প্রত্যেক ব্যক্তিকে এখন আর খাদ্যসংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে হয় না, কাজেই কতক লোক অন্য কাজ বেছে নিল। নানান রকমের শিল্প, নূতন নূতন ব্যবসা দেখা দিল। কিন্তু ক্ষমতা থেকে গেল সেই পরিচালকশ্রেণীর হাতেই।
পরবর্তী ইতিহাস থেকে তুমি দেখতে পাবে, খাদ্য এবং অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদনের নূতন নূতন প্রণালী উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে কীভাবে বড়ো বড়ো পরিবর্তন এসেছে। সভ্যতার গতির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ছাড়া আরও অনেক জিনিষের প্রয়োজন মানুষ বোধ করতে লাগল। কাজেই উৎপাদনপ্রণালীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজেও পরিবর্তন এল। একটা বেশ বড়োরকমের দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। এই ধরো, যখন রেল স্টীমার কারখানা সব বাষ্পে চালিত হতে লাগল তখন কাজেকাজেই আমাদের উৎপাদন এবং বণ্টন প্রণালীতে বিরাট পরিবর্তন দেখা দিল। সাধারণ শিল্পব্যবসায়ীরা তাদের নিজ হাতে এবং ছোটো ছোটো হাতিয়ারের সাহায্যে যেসব জিনিষ তৈরি করত তাই এখন অনেক বেশি দ্রুতবেগে উৎপন্ন হতে লাগল বাষ্পচালিত কারখানায়। বড়ো বড়ো কলগুলো তো আর কিছু নয়, খুব বিরাট আকারের হাতিয়ার মাত্র। এখন থেকে খাদ্যদ্রব্য এবং কারখানায়-উৎপন্ন অন্যান্য জিনিষ রেলে স্টীমারে করে দ্রুতবেগে দেশে দেশান্তরে প্রেরিত হতে লাগল। এর ফলে সারা পৃথিবী জুড়ে কত বড়ো পরিবর্তন এল তা তুমি সহজেই বুঝতে পারছ।
ইতিহাসে দেখা যায় কিছুকাল পরে পরেই নূতন নূতন এবং দ্রুততর উৎপাদনপ্রণালী আবিষ্কৃত হয়েছে। তুমি নিশ্চয় ভাবছ উৎপাদনপ্রণালী যত উন্নত হবে উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণও তত বাড়বে, পৃথিবীর সম্পদও ক্রমে বাড়তে থাকবে এবং বণ্টনের বেলায় প্রত্যেকের ভাগেই কিছু বেশি পড়বে। আমি কিন্তু বলব তোমার কথা খানিকটা সত্য হলেও পুরোপরি সত্য নয়। উৎপাদনপ্রণালীর উন্নতির ফলে পৃথিবীর সম্পদ অনেক বেড়েছে, এ কথা অবশ্যই সত্য। কিন্তু বেড়েছে কোন খানটায়? স্পষ্টই তো দেখতে পাচ্ছি, আমাদের দেশে এখনও দুঃখদৈন্যের অন্ত নেই। আর কেবল কি আমাদের দেশে? ইংলণ্ডের মতো ধনী দেশেও ঐ অবস্থা। কেন এমন হয়? এত ধনসম্পদ তা হলে কোথায় যায়? এটা বড়ো আশ্চর্যের বিষয় যে ক্রমেই পৃথিবীর ধনোৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও গরিবেরা সেই গরিবই থেকে যাচ্ছে। কোনো কোনো দেশে অবস্থার যৎকিঞ্চিৎ পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু যে পরিমাণে ধনোৎপাদন হচ্ছে, তার তুলনায় সেটা কিছুই নয়। এইসব ধনসম্পদ কোথায় যাচ্ছে সেটা আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি। ঐ-যে সব কর্মকর্তা আর পরিচালকের দল রয়েছেন, তাঁরা এমন ব্যবস্থা করেছেন যাতে সব ভালো জিনিষের মোটা অংশটা তাঁদেরই হাতে এসে পড়ে। আরও আশ্চর্য, সমাজে এমনসব শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, যারা ভুলেও কোনো কাজ করে না; অথচ অপরের পরিশ্রমলব্ধ লাভের বারো আনা অংশ তারাই বাগিয়ে নেয়। আর বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, এরাই সমাজে সম্মানের পাত্র হয়ে বসেছে। আবার এমন মূর্খও আছে যারা ভাবে, খেটে খেতে গেলে সম্মান বুঝি থাকে না। পৃথিবী জুড়ে এমনি বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থায় যে চাষীর দল জমিতে খেটে খাদ্য উৎপাদন করছে এবং যে শ্রমিক কারখানায় খেটে ধনোৎপাদন করছে, তারা যে দরিদ্রই থেকে যাবে, এ আর বিচিত্র কী? আমরা তো দেশের স্বাধীনতার কথা বলছি, কিন্তু সমাজের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা যদি দূর না হয়, শ্রমিক যদি তার পরিশ্রমের পুরস্কার না পায় তবে সেই স্বাধীনতা দিয়ে আমাদের কী হবে? রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং ধনবণ্টন-সমস্যা নিয়ে কতসব মোটা মোটা বই লেখা হচ্ছে। বড়ো বড়ো পণ্ডিত অধ্যাপকের দল এইসব বিষয়ে বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু কেবল কথা আর আলোচনাই চলছে; ওদিকে যে লোকটা খাটছে তার তো দুঃখের অন্ত নেই। দুশো বছর আগে প্রসিদ্ধ ফরাসি পণ্ডিত ভল্টেয়ার এইসব রাজনীতিজ্ঞের দল সম্বন্ধে বলেছিলেন, “যে চাষী খাদ্য উৎপাদন করে অপরের প্রাণরক্ষা করছে, তাকে অনাহারে বধ করাই হচ্ছে এদের দস্তুর।”
যাক সে কথা। আদিম মানুষ ক্রমে উন্নত হয়ে ধীরে ধীরে বন্যপ্রকৃতির উপর আপন প্রাধান্য বিস্তার করেছে। বনজঙ্গল সাফ করেছে, বাড়িঘর তৈরি করেছে এবং জমি চাষ করেছে। লোকে বলে, মানুষ নাকি প্রকৃতিকে জয় করেছে। এটা একটা ধোঁয়াটে রকমের কথা, পুরোপরি সত্য বলে একে গ্রহণ করা যায় না। এর চেয়ে বরং বলা ভালো যে, মানুষ প্রকৃতিকে বুঝতে শুরু করেছে এবং বোঝার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির সহযোগিতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে, প্রকৃতিকে আপনার প্রয়োজনে নিয়োজিত করছে। প্রাচীনকালে মানুষ প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে ভয়ের চোখে দেখেছে। বোঝবার চেষ্টা না করে পুজো দিয়ে, বলির আয়োজন করে প্রকৃতিদেবীকে প্রসন্ন করবার চেষ্টা করেছে। তাদের কাছে প্রকৃতি ছিল যেন একটা হিংস্র জন্তু; তাকে খোশামোদ করে, খুশি করে শান্ত রাখতে হয়। বজ্রপাত, বিদ্যুৎচমক, মহামারী সবতাতেই তাদের ভয় ছিল, আর তারা ভাবত উপযুক্ত বলি না পেলে এরা কিছুতেই নিবৃত্ত হবে না। অনেক সরলপ্রাণ লোকের ধারণা, সূর্যগ্রহণ-চন্দ্রগ্রহণও একটা ভয়ংকর রকমের দুর্ঘটনা। এটা যে একটা অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিক ঘটনা সে কথা বোঝবার চেষ্টা না করে লোকে মিছিমিছি দুশ্চিন্তায় অধীর হয় এবং ব্যস্তসমস্ত হয়ে চন্দ্র-সূর্যকে রক্ষা করবার জন্য উপোস করে কিংবা গঙ্গাস্নান করে। চন্দ্র-সূর্য নিজেরাই নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে; তাদের নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার কিচ্ছু দরকার নেই।
সভ্যতা এবং সংস্কৃতির অগ্রগতির কথা আমরা বলেছি এবং এও দেখেছি, এর শুরু হয়েছিল যখন থেকে মানুষ শহরে এবং গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেছে। খাদ্যের যে উদ্বৃত্ত অংশ জমা থাকত তার ফলে মানুষের খানিকটা অবকাশ মিলল; এখন তারা শিকার এবং আহার অন্বেষণ ছাড়া অন্য জিনিষের কথা ভাববার সময় পেল। চিন্তাশক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শিল্প, ব্যবসা এবং সংস্কৃতিরও উন্নতি হতে লাগল। ওদিকে লোকসংখ্যাও বাড়ছে, তার ফলে অনেক লোককে একসঙ্গে কাছাকাছি থাকতে হত। তাতে একে-অন্যের সঙ্গে মেলামেশা বাড়ল এবং নানান ব্যাপারে মানুষে মানুষে আদানপ্রদান চলল। অনেক লোক একসঙ্গে বাস করতে হলে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সম্বন্ধে একটু বিবেচনা না করলে চলে না। এমন কাজ করা চলবে না, যাতে সঙ্গী কিংবা প্রতিবেশীর অসুবিধা হতে পারে। এ না হলে সামাজিক জীবন কিছতেই গড়ে উঠতে পারে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি পরিবারের কথাই ধরো-না—একটি পরিবারই তো বলতে গেলে একটি ছোটোখাটো সমাজ। পরিবারস্থ প্রত্যেকটি ব্যক্তি যদি অপরের সম্বন্ধে একটু বিবেচনা না করে তা হলে সে পরিবার তো কিছুতেই সুখী হতে পারে না। এটি এমন কিছু শক্ত ব্যাপারও নয়, কারণ পরিবারস্থ সকল ব্যক্তির মধ্যে এমনিতেই একটি ভালোবাসার সম্পর্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু দেখা যায়, আমরা ঐ সামান্য বিবেচনাটকু করতে ভুলে যাই। তাতে শুধু প্রমাণ হয় যে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে সভ্য এবং মার্জিত নই। পরিবারের চেয়ে বৃহত্তর গোষ্ঠী সম্বন্ধেও ঠিক ঐ কথাই ঘাটে—সেটা আমাদের প্রতিবেশী কিংবা এক-নগরের অধিবাসী, দেশবাসী অথবা বিদেশী—এদের যার সম্বন্ধেই হোক। সুতরাং লোকসংখ্যা-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক জীবনে অনেক উন্নতি হয়েছে। অপরের জন্য বিবেচনাবোধ এবং আত্মসংযম অনেক বেড়েছে। সংস্কৃতি, সভ্যতা, এসব কথার যথার্থ সংজ্ঞা দেওয়া বড়োই কঠিন। আমি তা দেবার চেষ্টাও করছি না। তবে সংস্কৃতি বলতে আমরা যেসব গুণের সমাবেশ মনে করি তার মধ্যে আত্মসংযম এবং অপরের মঙ্গলচিন্তা—এই দুটি গুণ নিশ্চয়ই প্রধান। যে ব্যক্তির মধ্যে এই আত্মসংযম এবং অপরের প্রতি বিবেচনাবোধের অভাব আছে, তাকে মার্জিত এবং সভ্য নিশ্চয়ই বলা চলে না।