বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ধর্মযুদ্ধের সময়কার ইউরোপ

উইকিসংকলন থেকে

৬৩

ধর্মযুদ্ধের সময়কার ইউরোপ

২০শে জুন, ১৯৩২

 একাদশ দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে খৃষ্টধর্মের সঙ্গে ইসলামের সংঘাতের বিষয়ে গত চিঠিতে তোমায় কিছু কিছু লিখেছি। খৃষ্টস্তান সম্বন্ধে একটা পরিকল্পনা ইউরোপের সর্বত্র এই সময় ছড়িয়ে পড়ে। ইতিপূর্বেই অবশ্য খৃষ্টধর্ম ইউরোপের সর্বত্র বিস্তারলাভ করেছে; পূর্ব-ইউরোপের স্লাভজাতির অন্তর্গত রাশিয়ান ও অন্যান্য জাতিরা সর্বশেষে খৃষ্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে। সত্য মিথ্যা জানি নে, রাশিয়ানদের ধর্মান্তর-গ্রহণ সম্বন্ধে বেশ মজার গল্প প্রচলিত আছে। প্রবীণ রাশিয়ানরা নাকি নূতন ধর্ম নেবার আগে এই প্রশ্নটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। আলোচনার বিষয় ছিল, তারা যে দুটি নূতন ধর্মের কথা শুনেছিল তার মধ্যে কোনটি গ্রহণ করবে—খৃষ্টধর্ম না ইসলাম? আধুনিক কালের রীতি অনুসারে তারা একটি প্রতিনিধিদল গঠন করে খৃষ্টান প্রধান ও মুসলমান-প্রধান দেশগুলি দেখে আসবার জন্য পাঠায়। কথা ছিল, যারা যে রিপোর্ট দাখিল করবে তাই দেখে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে। এই প্রতিনিধিদল মুসলমান-প্রধান পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি ঘুরে অবশেষে কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লে যায়। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের কাণ্ডকারখানা দেখে রাশিয়ানরা একেবারে অবাক হয়ে গেল। সেখানকার সনাতনপন্থী খৃষ্টানদের ভজন-পূজনের ঘটা, ধর্মমন্দিরের বিবিধ আড়ম্বর, পুরোহিতদের জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ, ধুপধুনা, সংগীত ইত্যাদি দেখে শুনে উত্তর-দেশবাসী অর্ধসভ্য সহজ সরল রাশিয়ানরা মুগ্ধ হয়ে গেল। ইসলামধর্মে এইরকম বাহ্যাড়ম্বরের বালাই নেই। সুতরাং প্রতিনিধিদল স্থির করল যে, খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করাই বিহিত হবে। ফিরে এসে তারা দেশের রাজাকে তাদের এই অভিমত জানাল। রাজা প্রজা সবাই মিলে রাশিয়ানরা এইভাবে নাকি খৃষ্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ থেকে ধর্ম আমদানি করা হয় বলে রোমের ক্যাথলিক-সম্প্রদায়-ভুক্ত না হয়ে রাশিয়ানরা সনাতনপন্থী গ্রীক খৃস্টানদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে। ইতিহাস পড়লে দেখতে পাই, রাশিয়া কোনো কালে রোমের পোপ অর্থাৎ রোমান ক্যাথলিকদের ধর্মগুরুর বশ্যতা স্বীকার করে নি।

 ধর্মযুদ্ধ আরম্ভ হবার অনেক আগেই রাশিয়া খৃষ্টধর্মাবলম্বী হয়। বুলগেরিয়ানদের সম্বন্ধে বলা হয়, তারাও নাকি ইসলামের দিকে ঝুঁকেও শেষ পর্যন্ত কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের আকর্ষণ এড়াতে না পেরে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে। বুলগেরিয়ার রাজা কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের রাজকুমারীকে বিয়ে করে সনাতন-শ্রেণীভুক্ত খৃষ্টান হন। এইভাবে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলিও খৃষ্টধর্ম স্বীকার করে নেয়।

 এখন প্রশ্নটা হল এই ধর্মযুদ্ধ চলছিল যখন তখন ইউরোপে কী ছিল? আগেই তো পড়েছ, কোনো কোনো খৃস্টান রাজারাজড়া বহু দেশ অতিক্রম করে প্যালেস্টাইনে পৌঁছে নানারূপ দুর্বিপাকে পড়েন। এদিকে পোপ নিরাপদে রোমের ধর্ম-সিংহাসনে বসে আদেশ অনুজ্ঞা পাঠাচ্ছিলেন—খৃষ্টানরা যেন বিধর্মী তুর্কিদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড চালিয়ে যায়। এই সময়ে খৃষ্টজগতে পোপ ছিলেন সর্বেসর্বা, এত ক্ষমতা এর আগে বা পরে তাঁর কখনও হয় নি। আগেই তো তোমার গল্প বলেছি, কেমন করে একজন আত্মম্ভরী সম্রাট ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেনোসা নামে একটা জায়গায় খালি পায়ে বরফের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন পোপের দর্শন পাবার জন্যে ও তাঁর কাছ থেকে মার্জনা ভিক্ষা করবার জন্যে। এই পোপের নাম সপ্তম গ্রেগরি (গুরুপদ পাবার আগে তাঁর নাম ছিল হিল্‌ডে ব্রাণ্ড)। পোপ-নির্বাচন-বিষয়ে ইনি একটি নূতন নিয়মের প্রবর্তন করেন। রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরোহিতদের নাম ছিল কার্ডিনাল। এই কার্ডিনালদের একটা ধর্মমহাসমিতি থেকে পোপ নির্বাচিত হতেন। ১০৫৯ অব্দে এই নিয়ম প্রবর্তিত হয়, একটু-আধটু রদবদল হয়ে থাকলেও আজও সেই একই নিয়ম চলে আসছে। এখনও কোনো পোপের পরলোকপ্রাপ্তি ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ধর্মমহাসমিতির একটা কুলুপ-আঁটা কক্ষে অধিবেশন হয়। নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কার্ডিনালের ঘরের বাইরে বেরোবার উপায় নেই। অনেক সময় সর্ববাদিসম্মত কোনো একটা সিদ্ধান্তে না আসার ফলে এদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই বদ্ধ ঘরে বন্দীর মতো কাটাতে হয়েছে—চৌকাঠ পেরোবার উপায় নেই। কাজে কাজেই শেষ পর্যন্ত একটা মীমাংসায় আসতেই হয় কার্ডিনালদের। পোপ-নির্বাচন পর্ব সমাধা হলে চিমনি দিয়ে শাদা রঙের ধোঁয়া ছাড়া হয়। এই ধোঁয়া দেখে বাইরের প্রতীক্ষমান জনতা জানতে পারে যে ধর্মগুরু একজন কেউ নির্বাচিত হয়েছেন।

 পোপের বেলায় যেমন, পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট-নিয়োগের বেলাও সেইরকম নির্বাচনরীতি অনাসৃত হত। তফাত এই যে, সম্রাট নির্বাচন করত দেশের শক্তিশালী সামন্তবর্গ। এই শ্রেণীর সাতজন সামন্তরাজাদের বলা হত—নির্বাচক রাজা। সিংহাসনের উপর যাতে বংশানুক্রমিক অধিকার না জন্মায়, এই ছিল নির্বাচনের উদ্দেশ্য। বাস্তবিক ক্ষেত্রে অবশ্য দেখা যেত যে অনেক সময় একই বংশপরম্পরার মধ্যে এইরূপ নির্বাচন সীমাবদ্ধ হয়ে থাকত, বৎসরের পর বৎসর।

 দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে হোহেনস্টফেন্-রাজবংশ সম্রাটের পদ নিজেদের মধ্যে প্রায় কায়েমি করে রেখেছিল। হোহেনস্টফেন সম্ভবত জর্মনির অন্তর্গত একটি ছোটো শহর কিংবা গ্রামের নাম ছিল। এককালে এখানকার বাসিন্দা ছিল বলে বংশের নামও হয়েছিল হোহেনস্টফেন। এই বংশের প্রথম ফ্রেডরিক ১৯৫২ অব্দে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইতিহাসের পাতায় তিনি ফ্রেডরিক বার্বারোসা নামে পরিচিত। ইনিই ধর্মযুদ্ধে যোগ দেবার কালে পথিমধ্যে জলে ডুবে মারা যান। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এঁর শাসনকালকে বলা হয়, সর্বাপেক্ষা গৌরবময় যুগ। জর্মনিবাসীদের কাছে তিনি পুরাণ-বর্ণিত বীরপুরুষদের সমগোত্র—তাঁকে ঘিরে নানা কাহিনী ও কিংবদন্তী গড়ে উঠেছে। একটি কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, ফ্রেডরিক নাকি কোনো-এক পাহাড়ের গভীর গুহার মধ্যে ঘুমিয়ে আছেন, উপযুক্ত অবসর হলে তিনি যথাসময়ে গা-ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠবেন এবং তাঁর দেশ ও জাতিকে বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করবেন।

 পোপের সঙ্গে ফ্রেডরিক বার্বারোসার বহু কাল ধরে একটা দারণ বিসংবাদ চলে, শেষ পর্যন্ত পোপেরই জয় হয় এবং পোপের শাসন ফ্রেডরিককে নত মস্তকে স্বীকার করে নিতে হয়। বার্বারোসা ছিলেন স্বেচ্ছাচারী সম্রাট। কিন্তু তা হলে কী হয়, শক্তিশালী সামন্তদের হাতে এঁকে যথেষ্ট দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়। ইতালিতে তখন যেসব বড়ো বড়ো শহর গড়ে উঠছিল ফ্রেডরিক চেয়েছিলেন তাদের স্বাধীনতা হরণ করতে। কিন্তু এ কাজে তিনি সফলকাম হন নি। জর্মনিতেও এ সময় বড়ো বড়ো শহর নদীর ধারে ধারে গড়ে উঠেছিল। কলোন, হাম্‌বুর্গ, ফ্রাঙ্ক্‌ফুর্টের নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তাঁর স্বদেশে ফ্রেডরিক অন্য নীতি গ্রহণ করেছিলেন; স্বাধীন জর্মন শহরগুলি যাতে গড়ে উঠতে পাবে তার জন্য তিনি সবরকম সাহায্য করেছিলেন। এই স্বাধীন ও শক্তিশালী শহরগুলি বড়ো বড়ো সামন্তদের শক্তি খর্ব করবে, এটাই তিনি চেয়েছিলেন।

 ইতিপূর্বে একাধিকবার তোমায় বলেছি, এ দেশের প্রাচীনকালের শাস্ত্রাদিতে রাজধর্ম সম্বন্ধে কীরূপ ধারণা ছিল। আর্যদের সময় থেকে অশোকের রাজত্বকাল অবধি এবং এদিকে অর্থশাস্ত্র থেকে শুক্রাচার্যের নীতিসার রচনার কাল অবধি বার বার বলা হয়েছে যে, রাজা প্রজারঞ্জনের জন্য জনসাধারণের মতামত শ্রদ্ধাসহকারে পালন করবেন। দেশের প্রকৃত রাজাই হলেন জনসাধারণ। প্রাচীন ভারতে রাজধর্ম সম্বন্ধে এরূপ উচ্চ ধারণা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য দেশের মতো এ দেশেরও কোনো কোনো রাজা যথেচ্ছাচারিতা করতেন। এ বিষয়ে ইউরোপীয় মতবাদের তুলনা করতে গেলে দেখি যে, সেখানকার আইন অনুসারে রাজা ছিলেন দেশের সার্বভৌম কর্তা—তাঁর কথার উপর কারও কথা চলত না। ইউরোপীয় মতে রাজা ছিলেন দেশের শাসন-নিয়মের জীবন্ত প্রতীক। ফ্রেডরিক বার্বারোসা একবার বলেছিলেন, “রাজা কী নিয়মে রাজ্য চালাবেন সে বিষয়ে প্রজাদের নির্দেশ দেবার কোনো অধিকার নেই; তাদের একমাত্র কর্তব্য হল রাজার আদেশ মেনে চলা”

 চীনদেশে রাজার কর্তব্য সম্বন্ধে কীরূপ ধারণা প্রচলিত ছিল সে কথাও এখানে আলোচনা করা যেতে পারে। চীনদেশের রাজারাজড়াদের অনেক গালভরা সব উপাধি ছিল— তাঁদের বলা হত স্বর্গপুত্র ও আরও কত কী! তাই বলে মনে কোরো না যেন যে তাঁরা ইউরোপীয় সম্রাটদের মতো সর্বশক্তিমান ছিলেন। রাজধর্ম সম্বন্ধে ভারত ও চীনের মতবাদ প্রায় একই রকমের ছিল। চীনদেশের একজন প্রাচীন লেখক মেঙ-সি বলেছেন, “দেশে সবার উঁচু স্থান হল জনসাধারণের, তার পর যাঁদের স্থান তাঁরা হলেন পৃথিবী ও শস্যের দেবগণ, সর্বশেষে যাঁর আসন তিনি হলেন দেশের শাসনকর্তা।”

 ইউরোপে সম্রাটদের স্থান ছিল সবার ঊর্ধ্বে, তাঁরা যেন স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতিনিধি হয়ে রাজ্যশাসন চালাতেন। এই থেকে ইউরোপে একটা বিশ্বাস প্রচলিত হয় যে, রাজারা হলেন ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতার অধিকারী। আসলে কিন্তু এতটা ক্ষমতা তাঁদের ছিল না। অনেক সময় সামন্তরাজারা সম্রাটের বিরুদ্ধেতা করতেন; পরবর্তীকালে বড়ো বড়ো শহরে নূতন নূতন শ্রেণীর সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন শ্রেণীর লোকেরা সম্রাটের ক্ষমতার অংশ দাবি করে বসে। এদিকে আবার রোমান ক্যাথলিকদের গুরু পোপ বলতেন যে, তিনিও সর্বশক্তিসম্পন্ন। যেখানে দুজন সর্বশক্তিমানের সংঘাত হয় সেখানে অনিবার্য বিপর্যয়।

 ফ্রেডরিক বার্বারোসার পৌত্রের নামও ছিল ফ্রেডরিক। বালক বয়সে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন, তাঁর নাম হয় দ্বিতীয় ফ্রেডরিক। এর কথা তোমাকে ইতিপূর্বেই বলেছি ইনিই সেই রাজা যাঁকে বলা হত ‘পৃথিবীর আশ্চর্য মানুষ’; ইনিই ধর্মযুদ্ধ করতে প্যালেস্টাইন গিয়ে মিশরের সুলতানের সঙ্গে মিত্রতা পাতিয়ে ফিরে আসেন। পিতামহের মতো ইনিও পোপের বিরুদ্ধতা করেন ও পোপের অনুজ্ঞা মেনে নিতে অস্বীকৃত হন। পোপ তাঁকে সম্প্রদায়-বহির্ভূত ও ধর্মচ্যুত ঘোষণা করে অপমানের প্রতিশোধ নেন। এই একটি মস্ত বড়ো অস্ত্র ছিল পোপদের হাতে, তবে বেশি ব্যবহারের ফলে ইতিমধ্যেই এই অস্ত্রের মরচে ধরেছিল। ধর্মগুরুর রোষ ফ্রেডরিকের মনে খুব বেশি দাগ কাটতে পারে নি। দিনকালও পূর্বের মতো ছিল না। ইউরোপের সমস্ত রাজারাজড়াদের কাছে ফ্রেডরিক দীর্ঘ পত্র লিখে জানালেন যে, রাজকার্যে পোপের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। তিনি ধর্মগুরু, ধর্ম ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে তিনি থাকুন; রাজনীতিতে তাঁর মাথা গলাবার কোনো দরকার নেই। ধর্মযাজকদের মধ্যে দুর্নীতির প্রসারের কথাও তিনি উল্লেখ করতে ছাড়েন নি। যুক্তির দিক থেকে ফ্রেডরিককে হারাবেন পোপের এমন সাধ্য ছিল না। সম্রাটের এই চিঠিগুলির যথেষ্ট ঐতিহাসিক মূল্য আছে। সম্রাটের সঙ্গে পোপের এই বিরোধের মধ্যে সর্বপ্রথম আমরা ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির বিরোধের ইঙ্গিত পাই। আধুনিক কালের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ফ্রেডরিকের যুক্তির যথেষ্ট মিল দেখতে পাওয়া যায়।

 দ্বিতীয় ফ্রেডরিক ধর্ম বিষয়ে বিশেষ সহনশীল ছিলেন, অনেক আরব ও ইহুদি দার্শনিক তাঁর রাজসভার সভাসদ ছিলেন। শোনা যায় যে, তাঁরই মারফত ইউরোপে আরবি সংখ্যা ও অ্যালজেব্রা (তোমার হয়তো মনে থাকবে, গণিতের এই শাখাটি সর্বপ্রথম ভারতে আবিষ্কৃত হয়) ইউরোপে প্রচলিত হয়। নেপ্‌ল্‌সের বিশ্ববিদ্যালয় এবং সালের্নোর বিখ্যাত চিকিৎসা-শিক্ষালয় এই সম্রাটই প্রতিষ্ঠা করেন।

 ফ্রেডরিকের রাজত্বকাল ছিল ১২১২ অব্দ থেকে ১২৫০ অবধি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপে হোহেনণ্টফেন-বংশের প্রতিপত্তি অন্তর্হিত হয়। গোটা সাম্রাজাটাই ভেঙে পড়ে। ইতালি সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, জর্মান খান্‌খান্ হয়ে যায় এবং চার দিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। চার দিকে দস্যু-তস্কর বিনা বাধায় দেশময় অত্যাচার ও লুটতরাজ চালাতে থাকে। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের বিরাট ভার জর্মন দেশ বহন করতে অপারগ হয়। ফ্রান্সের ও ইংলণ্ডের রাজারা তাঁদের সামন্তদের দমন করে নিজেদের নিজেদের রাজ্য দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করলেন। জর্মানির রাজা ছিলেন একাধারে সে দেশের রাজা ও পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট—তাঁরই হল সবচেয়ে মুশকিল। এক দিকে পোপ ও অন্য দিকে শক্তিশালী ইতালীয় শহরগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি এমন ব্যস্ত ছিলেন যে, গৃহশত্রু সামন্তদের দমন করা তাঁর পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যের ফাঁকা সম্মান বজায় রাখতে গিয়ে গৃহযুদ্ধে সমস্ত দেশ বিভক্ত ও দুর্বল হতে থাকে। জর্মনি একতাবদ্ধ হবার অনেক আগেই ফ্রান্স ও ইংলণ্ড পরাক্রমশালী দেশ বলে পরিগণিত হয়। বহুকাল ধরে জর্মানিতে বহুসংখ্যক ক্ষুদে ক্ষুদে রাজারাজড়াদের দল রাজত্ব করে। মাত্র ষাট বছর আগে জর্মানি আবার একতাবদ্ধ হয়, যদিচ ক্ষুদে রাজারা তখনও টিঁকে থাকে। ১৯১৪-১৮ অব্দের মহাযুদ্ধের পর এই ক্ষুদে নবাবদের দল নিশ্চিহ্ন হয়।

 দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের মৃত্যুর পরে জর্মানিতে এমন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় যে, দীর্ঘ তেইশ বছর সম্রাট-নির্বাচন স্থগিত থাকে। ১২৭৩ অব্দে হাপ্‌স্‌বুর্গের কাউণ্ট রুডল্‌ফ্ সম্রাট-পদে অভিষিত হন। ইউরোপের সাম্রাজ্য-উত্থানপতনের রঙ্গালয়ে এবার হাপ্‌স্‌বুর্গ-রাজবংশের আবির্ভাব হয়। সাম্রাজ্য ভেঙে যাবার আগে পর্যন্ত এই বংশ কোনোমতে টিঁকে ছিল। রাজবংশ হিসাবে হাপ্‌স্‌বুর্গদের পতন ঘটে মহাযুদ্ধের পর। যুদ্ধ বাধবার সময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরির সম্রাট ফ্রান্সিস জোসেফ ছিলেন হাপ্‌স্‌বুর্গীয়। সে সময় তাঁর বয়স ছিল অনেক—ইতিপূর্বেই তিনি একাদিক্রমে ষাট বছর রাজত্ব করেছেন। সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ফ্রাঞ্জ্ ফার্ডিন্যাণ্ড্। বল্‌কান দেশের বোস্‌নিয়া জেলার সেরাজেভো শহরে ফ্রাঞ্জ্ ও তাঁর স্ত্রী আততায়ীর হাতে ১৯১৪ অব্দে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের ফলেই মহাযুদ্ধের সূচনা হয় এবং মহাযুদ্ধের ফলে অন্য অনেক জিনিষের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোতন হাপ্‌স্‌বুর্গ-রাজবংশও লোপ পায়।

 এই তো গেল পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের কথা। এই সাম্রাজ্যের পশ্চিমে অবস্থিত ফ্রান্স ও ইংলণ্ডে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকত। দুই দেশে যুদ্ধ যদি-বা ক্ষান্ত হত, দুই দেশের সামন্তবর্গ ও রাজাদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ লেগেই থাকত। জর্মানির সম্রাটের চেয়ে এই দুই দেশের রাজাদের অদৃষ্ট ভালো বলতে হবে; এঁরা সামন্তদের নিজেদের বশে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফলে ইংলণ্ড ও ফ্রান্স অনেক বেশি সংহত ও একতাবদ্ধভাবে গড়ে ওঠে। একতার বলে এদের শক্তি প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

 ইংলণ্ডে এই সময় এমন একটি ঘটনা ঘটে যার ফলে সে দেশের ইতিহাসের ধারা পর্যন্ত বদলে যায়। ১২১৫ অব্দে ইংলণ্ডের রাজা জন ম্যাগ্‌না কার্টা নামে একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। পুরুষকেশরী রিচার্ডের পর জন ইংলণ্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন। জন পরস্বাপহরণে তৎপর ছিলেন অথচ তাঁর যতটা লোভ ছিল ততখানি ক্ষমতা ছিল না। ফলে তিনি সকলেরই বিরক্তিভাজন হয়ে পড়েন। সামন্তেরা তাঁর পিছু ধাওয়া করে শেষ পর্যন্ত টেম্‌স্ নদীর উপর অবস্থিত রাণীমিড নামে একটি দ্বীপে তাঁকে বন্দী করে এবং তাদের নিষ্কোষিত তলোয়ারের হুম্‌কি দেখিয়ে জনকে এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করায়। এই ম্যাগ্‌না কার্টায় অর্থাৎ মহাঘোষণা পত্রে সই করতে গিয়ে রাজাকে অঙ্গীকার করতে হয় যে, তিনি ইংলণ্ডের সামন্তবর্গের ও প্রজাসাধারণের কতকগুলি সহজাত অধিকার মেনে নেবেন। ইংলণ্ডের রাজনৈতিক স্বাধীনতালাভের ইতিহাসে এটা খুবই উল্লেখযোগ্য ঘটনা। চুক্তিপত্রে বলা হয়, রাজা প্রজাদের প্রতিনিধিস্থানীয় লোকের অনুমোদন বাতিরেকে কোনো লোকের স্বাধীনতায় কিংবা সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। এ থেকে জুরিপ্রথার অর্থাৎ সমশ্রেণীর লোকেদের দ্বারা বিচার-নিষ্পত্তির রেওয়াজ আসে। ইংলণ্ডে রাজার ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা খুব আগের থেকেই আরম্ভ হয়। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে রাজার সার্বভৌমত্ব-বিষয়ে যে ধারণা প্রচলিত ছিল, ইংলণ্ডে সে ধারণা গোড়া থেকেই সমর্থন পায় নি।

 ইংলণ্ডে সাত শো বছর আগে এই-যে একটি নীতি প্রবর্তিত হয়—ইংরেজদেরই রাজত্বে আজ ১৯৩২ অব্দেও ভারতে তার ব্যতিক্রম দেখতে পাই। এ কথা ভাবতে খুব আশ্চর্য মনে হয়, না? আজ এ দেশে সর্বশক্তিমান ভাইসর দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা, তিনি অর্ডিন্যান্স ও বিশেষ আইন জারি করে প্রজাসাধারণের স্বাধীনতা ও সম্পত্তি হরণ করতে পারেন।

 ম্যাগ্‌না কার্টা স্বাক্ষরিত হবার পর ইংলণ্ডে আর-একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। দেশের সামন্তবর্গ ও প্রজাসাধারণের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় সমিতি ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে। এইভাবে ইংলণ্ডে পার্লামেণ্ট-শাসনের পত্তন হয়। লর্ড ও বিশপদের নিয়ে ‘হাউজ অব লর্ড্‌স্’ এবং জনসাধারণ ও যুদ্ধোপজীবী সামন্তদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘হাউজ অব কমন্স’ গঠিত হয়। প্রথম প্রথম পার্লামেণ্টের ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ ছিল, কালক্রমে জাতীয় সমিতির শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এমন একটা অবস্থায় পৌঁছয় যেখানে রাজা ও সমিতির মধ্যে সার্বভৌমত্ব নিয়ে শক্তিপরীক্ষা হয়। রাজা নিহত হলেন এবং দেশের লোকের প্রতিনিধি-সভা স্বীয় ক্ষমতায় সুপ্রতিষ্ঠিত হল। এই ঘটনা ঘটে প্রায় চারশো বছর পরে সপ্তদশ শতাব্দীতে।

 ফ্রান্সেও তিন শ্রেণীর লোকদের এক-একটি কৌন্সিল ছিল। এই তিন শ্রেণীর লোক হল অভিজাত সম্প্রদায়, যাজক সম্প্রদায় ও জনসাধারণ। রাজার ইচ্ছা অনুসারে কালে-ভদ্রে এই কৌন্সিল বসত। ইংরেজ পার্লামেণ্ট যতটা ক্ষমতা অর্জন করে ফরাসি কৌন্সিল ততটা ক্ষমতা অর্জন করতে পারে নি। ফ্রান্সেও রাজশক্তি ধ্বংস হবার পূর্বে একজন রাজাকে তাঁর মস্তক দান করতে হয়।

 পূর্ব-দেশে তখনও গ্রীকদের পূর্ব-রোমান সাম্রাজ্য বেশ প্রতিপত্তিশালী ছিল। গোড়া থেকেই কারও-না-কারও সঙ্গে এই সাম্রাজ্যের যুদ্ধ লেগেই থাকত। অনেক সময় পরাভূত হবার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। উত্তর-দেশাগত বর্বর ও তার পর মুসলমানদের পর পর আক্রমণ সত্ত্বেও এই সাম্রাজ্য কোনোপ্রকারে টিঁকে ছিল। এই সাম্রাজ্যের উপর আক্রমণ চালায় রাশিয়ান, বুলগেরিয়ান, আরব ও সেলজুক তুর্কিরা। গ্রীক সাম্রাজ্যের সর্বনাশ হয় ধর্মযোদ্ধাদের আক্রমণের ফলে—এ যুদ্ধে যেমন ক্ষতি হয় তেমন সর্বনাশ তার কখনও হয় নি। বিধর্মীরা যতটা না ক্ষতি করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে খৃষ্টান ধর্ম যোদ্ধাদের দল। খৃষ্টান কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ শহরের উপর এরা যে নিদারুণ অত্যাচার করে তেমন অত্যাচার অসভ্য বর্বরেরাও করে নি। এই সর্বনাশা সংঘাতের পর কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি।

 পশ্চিম-ইউরোপের দেশগুলি পূর্ব ইউরোপের এই সাম্রাজ্য সম্বন্ধে খুব অল্পই জানত। কেবল জানত না বললে খুব কমই বলা হবে; খৃষ্টস্তানের বাইরে বলে পূর্বদেশবাসী ইউরোপীয়দের অবজ্ঞা করত। এ দেশের ভাষা ছিল গ্রীক, পশ্চিম-ইউরোপের সভ্য ভাষা ছিল লাতিন। অথচ তার পড়তি অবস্থাতেও কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লে যেমন বিদ্যাশিক্ষার চর্চা হত তেমনটা পশ্চিম-ইউরোপের খুব গৌরবের দিনেও হত কি না সন্দেহ। পূর্ব-দেশের এই বিদ্যা ছিল পরিণত বয়সের বিদ্যা, এর মধ্যে শক্তি ও সৃজনী ক্ষমতা ছিল না। পশ্চিম-দেশে বিদ্যার চর্চা বেশি ছিল না সত্য, কিন্তু এ বিদ্যায় ছিল যৌবনোচিত শক্তি, সৃজনক্ষমতা। এই শক্তিই একদিন প্রকাশ পেল শিল্পে, সাহিতো, নব নব সৌন্দর্যসৃষ্টিতে।

 পূর্ব-সাম্রাজ্যে ধর্মের সঙ্গে রাজশক্তির বিরোধ ছিল না, যেমনটা ছিল রোমে। রাজা ছিলেন সর্বশক্তিমান, তাঁর যথেচ্ছাচারিতায় কারও বাধা দেবার অধিকার ছিল না। এরকম স্বৈরতন্ত্রী রাজার অধীনে স্বাধীনতার প্রসঙ্গই ওঠে না। ছলে বলে কৌশলে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তিনিই করতেন সিংহাসন অধিকার। অন্যায় করে, রক্তপাত করে যিনি রাজমুকুট ছিনিয়ে নিতেন, প্রজাসাধারণ সভয়ে মেষপালের মতো তাঁকেই অনুসরণ করত। কে রাজা হলেন এতে তাদের খুব বেশি মাথাব্যথা ছিল না; তারা জানত যে রাজ-আজ্ঞা তাদের প্রতিপালন না করে গত্যন্তর নেই।

 ইউরোপের তোরণদ্বারে পূর্ব-সাম্রাজ্য ছিল শান্ত্রীর মতো দাঁড়িয়ে, এশিয়ার আক্রমণ থেকে পশ্চিমকে রক্ষা করাটাই ছিল যেন তার কাজ। শত শত বছর এ আক্রমণ তারা ঠেকিয়ে রেখেছিল। আরবরা কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল অধিকার করতে পারে নি। এই শহরের দরজা থেকে সেলজুক তুর্কিদের বিদায় নিতে হয়। মঙ্গোলরা রাশিয়া আক্রমণ করতে যায় এর পাশ কাটিয়ে। সর্বশেষে আসে অটোম্যান তুর্কিরা; এদের হাতেই শেষ পর্যন্ত ১৪৫৩ অব্দে এই বহুপ্রখ্যাত নগরীর পতন ঘটে, এবং এর পতনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব-সাম্রাজ্যেরও পতন হয়।