বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/নববর্ষের উপহার
১
নববর্ষের উপহার
মনে আছে তোমার, দু বছর আগে আমি যখন এলাহাবাদে ছিলাম আর তুমি ছিলে মুসৌরিতে, তখন তোমাকে কতগুলি চিঠি পাঠিয়েছিলাম। সেগুলি তোমার নাকি ভালো লেগেছিল। তার পর থেকে আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, আমাদের এই পৃথিবী সম্বন্ধে ওই পর্যায়ের অনুসারী আরও কিছু তোমায় লিখব কি না। কেমন যেন দ্বিধা হয়েছিল এই সেদিনও। পুরোনোকালের ইতিহাস, বীর ও বীরাঙ্গনাদের কাহিনী পড়তে খুব ভালো লাগে, না? কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক ভালো হয় যদি আমরা ইতিহাস-গঠনে সাহায্য করি আমাদের নিজেদের কর্তব্য করে। বলেছি তো তোমায়, আমাদের দেশের ইতিহাসে একটা নূতন যুগ আরম্ভ হয়েছে। ভারতের অতীত অতি পুরাতনের আবছায়া কুয়াশায় আবৃত; কতশত শতাব্দী, কত হাজার বছর আগে যে আমাদের ইতিহাসের শুরু সে আমরাই ঠিক বলতে পারি নে। ভারতের অতীত ইতিহাসের কলঙ্কের কথা স্মরণ করলে আমাদের লজ্জিত ও দুঃখিত হতে হয়; তবু মোটামুটি ধরলে বোঝা যায় যে আমাদের অতীতগৌরবও কম ছিল না। সেই গৌরবময় অতীতদিনের স্মৃতি এখনও আমাদের গর্বের জিনিষ। আজ কিন্তু পুরাতনের কথা মনে করে সময়ক্ষেপ করলে আমাদের চলবে না। যে বর্তমানের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি এবং যে ভবিষ্যৎকে আমরা গড়ে তুলছি তার কথাই আজ আমাদের মনে রাখতে হবে।
তোমাকে যা লিখব ভেবেছিলাম সে সম্বন্ধে নাইনি জেলে বসে অনেক মালমশলা সংগ্রহ করেছি অবশ্য, তবু মন আমার কিছুতেই বসতে চায় না; কেবলই ভাবি বাইরের বিরাট আন্দোলনের কথা, ভাবি, বাইরের লোকেরা স্বরাজ-সাধনায় যে কর্তব্য করছে তাই আমিও করতাম আজ তাদের সঙ্গে থাকলে। বর্তমানের সব ঘটনা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমার সমস্ত মনটাকে জুড়ে আছে। তাই আর অতীতের কথা ভাববার সময় নেই। বুঝি অবশ্য যে, বাইরের কাজে যোগ দিতে পারব না, সুতরাং এভাবে বিচলিত হওয়া আমার পক্ষে উচিত নয়।
কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই ধরনের চিঠি লিখি নি কেন তার সত্যি কারণটা বলি শোনো। আমার এখন ভাবনা হচ্ছে, আমি কতটুকুই বা জানি যার বলে তোমাকে শিক্ষা দেব। বুদ্ধিতে এবং মাথায় তুমি এমন চটপট বড়ো হয়ে উঠছ—আমি স্কুল-কলেজে এবং তার পরেও যত পড়াশোনা করেছি তা হয়তো তোমার পক্ষে অতিসামান্য কিংবা অতিসাধারণ মনে হতে পারে। আরও কিছুদিন পরে তুমিই হয়তো শিক্ষক হয়ে অনেক নতুন নতুন জিনিষ শেখাবে আমাকে! কেমন? তোমার জন্মদিনে লেখা চিঠিটাতে লিখেছি-না যে অতিবিজ্ঞের মতো আমার অত জ্ঞান নেই যে বিদ্যে ফেটে বেরিয়ে পড়বার ভয়ে বর্ম এঁটে রাখতে হবে!
পৃথিবীর একেবারে প্রাচীনকালের ইতিহাস খুব স্পষ্ট নয় বলে সে সম্বন্ধে যা তোমাকে লিখেছিলাম তার জন্যে আমার খুব বেগ পেতে হয় নি। কিন্তু যেই আমরা অতিপুরাতনের খোলস ছেড়ে সত্যিকার ইতিহাসের সূচনায় আসি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহাদেশে বিভিন্ন সভ্যতার পরিব্যাপ্তি দেখতে আরম্ভ করি, তখন শতসহস্র ঘটনার সংঘাত মানবসমাজের বিচিত্র পরিণতির নানাবিধ খুঁটিনাটির মধ্যে পড়ে, বুদ্ধি যেন পথ হারিয়ে ফেলে। বই পড়ে অবশ্য অনেক সাহায্য পাওয়া যায়, কিন্তু নাইনি জেলে তো সে সুবিধে নেই। কাজেই পৃথিবীর ইতিহাসের একটা ধারাবাহিক বিবরণ আশা কোরো না আমার কাছ থেকে। ছেলেমেয়েরা যখন সন তারিখ মুখস্থ করে বিশেষ কোনো-একটি দেশের ইতিহাস আয়ত্ত করতে চায়, তখন আমার ভারি দুঃখ হয়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে যে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ আছে সেটাকে উপেক্ষা করলে ইতিহাস টেঁকে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি ওরকম বিশেষ একটা কি দুটো দেশের ইতিহাস পড়তে যাবে না—ওটা ভুল। সমস্ত পৃথিবীর ইতিহাস বিভিন্ন দেশের সম্বন্ধে পরম্পরাক্রমে আমাদের দেখে নিতে হবে। মনে রেখো যে জাতে জাতে এবং দেশে দেশে যে বৈষম্যটকু আছে বলে আমরা মনে করি তা সব সময়ে সত্যি নয়। মানচিত্রে এবং ভূপরিচয়ে আমরা সাধারণত নানান দেশ নানান রঙে রঞ্জিত দেখি—মানুষে মানুষে ওইরকম বৈষম্য আছে, কিন্তু মিলও আছে। কাজেই সীমারেখা আর মানচিত্রের নজির অনুসারে চললে আমরা অনেক সময় ভুল করব।
আমি যে ধরনের ইতিহাস পছন্দ করি সেইরকমটি লেখা আমার আয়ত্তের অতীত—তার জন্যে তোমার অন্য বই পড়তে হবে। তবু মাঝে মাঝে তোমাকে অতীতের কাহিনী এবং পুরাকালের প্রখ্যাতনামা লোকদের কথা শোনাবার ইচ্ছে রাখি।
আমার চিঠিগুলো তোমার মনে আরও জানবার ইচ্ছে জাগিয়ে দেবে কি না বা আদৌ তোমার ভালো লাগবে কি না, সে আমার জানা নেই। সেগুলো তোমার কাছে পৌঁছবে কি না সে সম্বন্ধেও আমার সন্দেহ আছে। মুসৌরিতে যখন ছিলে তখন সত্যিই বেশ কিছুটা ব্যবধান ছিল, এখন তুমি কাছেই রয়েছ অথচ যেন কতশত যোজন দূরে। তোমার কাছে তখন খুশিমতো চিঠি পাঠাতে পারতাম, আর খুব বেশি ইচ্ছে হলে তোমাকে দেখে আসাও সম্ভবপর ছিল। আজ আমাদের মাঝখানে কেবল যমুনা নদীর ব্যবধান, তবু নাইনি জেলের প্রাচীর তোমায় যেন কত দূরে সরিয়ে রেখেছে। চোদ্দ দিন অন্তর তোমার কাছে চিঠি লেখার অনুমতি পাই, দীর্ঘ চোদ্দ দিনের পর তোমার একটুখানি দেখা মেলে কেবল মিনিট কুড়ির জন্যে! তবু এ ব্যবস্থা যেন ভালোই—যা আমরা সহজে পাই তার মর্যাদা আমরা খুব কমই রাখি। তাই আমার মনে হয় যে কিছুদিনের জন্যে কয়েদখানায় বন্দী থাকা—শিক্ষারই একটা বিশিষ্ট অঙ্গ হওয়া উচিত। সুখের বিষয়, আমার দেশবাসী ভাইবোনেরা আজ অনেকেই এ শিক্ষা পাচ্ছে।
বলেছি তো, আমার ভয় আছে পাছে এ চিঠিগুলো তোমার ভালো না লাগে। তবু কী জানো, এ লিখছি আমি নিজেরই একটু আনন্দের জন্যে—চিঠির ভিতর দিয়ে মনে হয় তোমার যেন নাগাল পাচ্ছি, যেন তোমার সঙ্গে আমার আলাপ চলছে। প্রায়ই তোমার কথা ভাবি। আজকে তো বিশেষ করেই তোমার কথা মনে হচ্ছে। আজ নববর্ষের প্রথম দিন। খুব ভোরবেলায় আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে মনে হল পুরোনো বছরের আশা-আনন্দ-দুঃখ-দুরাশায়-মেশা আমাদের দিনগুলোকে। মনে হল, কী যেন যাদুমন্ত্রে বাপুজি যারবেদা জেল থেকে আমাদের জীর্ণ জাতীয়-জীবনে নূতন যৌবনের সঞ্চার করেছেন; তোমার দাদু এবং আরও অনেকের কথাও মনে হয়েছিল। বিশেষ করে ভাবছিলাম তোমার আর তোমার মার কথা; ইতিমধ্যে শুনলাম যে তোমার মাকে ওরা ধরে কয়েদখানায় আটকে রেখে দিয়েছে। নিশ্চয় উনি খুব খুশি হয়েছেন। আজ আমি যেরকম নববর্ষের উপহার চেয়েছিলাম ঠিক তেমনটি পেয়েছি।
তুমি বড়োই একলা পড়ে গেলে—না? প্রতি চোদ্দ দিন অন্তর তোমার মার সঙ্গে আর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তো তোমার—তখন উভয়পক্ষের বার্তাবহ হয়ে উঠবে তুমি। যে দিনগুলো অমনি অমনি কাটবে সেই সেই দিনেও চিঠি লিখতে লিখতে তোমার কথা ভাবব। কল্পনায় দেখব, তুমি বসেছ আমার পাশে, কতরকম আলাপ হচ্ছে তোমার আমার মধ্যে। দুজনে মিলে আমরা সেই পরাকালের স্বপ্ন দেখব আর ভাবব যে ভবিষ্যৎকে যেন অতীতের চেয়েও বড়ো করে গড়তে পারি আমরা। আজ নববর্ষের প্রথম দিনটাতে এসো আমরা দুজনে সাহস করে বলি যে, এ বছরও যেদিন পুরোনো হয়ে পড়বে সেদিন হিসেব মিলিয়ে দেখতে পাব যে এ বছরটা বৃথা অতিবাহন করি নি। ভারতের অতীত গৌরবের ইতিহাসে এ যেন একটা বিশিষ্ট স্থান পায়, যেন এ বছরটি আমাদের ভবিষ্যতের সেই স্বপ্নকে সার্থকতার পথে এগিয়ে দিতে পারে।