বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/নেপোলিয়ন (২)
১০৫
নেপোলিয়ন (২)
গত চিঠিতে যেখানে থেমেছিলাম তার পর থেকে আবার নেপোলিয়নের কাহিনীর জের টানতে হবে।
নেপোলিয়ন যেখানেই যেতেন তাঁর সঙ্গে ফরাসি বিপ্লবের কী-একটা যেন থাকত; তাই যে দেশের লোকেদের তিনি পরাভূত করেছিলেন তাদের খুব বেশি অনিচ্ছা ছিল না তাঁর অধীনে আসতে। তাদের উপরে গুরুভার হয়ে বসেছিল যে প্রাচীন সামন্ত-শাসকের দল তাদের উপরে উত্যক্ত হয়ে উঠেছিল এরা। এতে নেপোলিয়নের প্রচুর সুবিধা হল, তাঁর সদম্ভ পদক্ষেপের সামনে ধ্বসে পড়ল জায়গির-প্রথা। বিশেষ করে, জর্মনিতে জায়গির-প্রথার অবসান হল; স্পেনে উচ্ছেদ সাধিত হল তথাকথিত পাপী-দলনার্থ প্রতিষ্ঠিত কুখ্যাত বিচারালয় ‘ইন্কুইজিশন’-এর। কিন্তু যে জাতীয়তাবোধকে তিনি জাগিয়ে তুললেন অজ্ঞাতভাবে তাই পরে তাঁর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁকে পরাস্ত করল। বড়ো বড়ো রাজারাজড়াকে তিনি হারাতে পারতেন, কিন্তু সমগ্র জনগণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জেতা তাঁর অসাধ্য। স্পেনীরেরা রুখে উঠল, বহু বছর ধরে শুষে নিল তাঁর শক্তি, তাঁর রসদপত্র। জর্মনরাও নেপোলিয়নের অন্যতম শত্রু ব্যারন ফন স্টীনের নেতৃত্বে নিজেদের প্রস্তুত করে নিল, বাধল সেখানে মুক্তিযুদ্ধ। এইভাবে নৌশক্তির সঙ্গে একত্রিত এই নবজাগ্রত জাতীয়তাবোধেই তাঁর পতন হল। তবে এমনিতেও তাঁর ডিক্টেটরি চাল বোধ হয় ইউরোপের পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠত। অথবা হয়তো এ বিষয়ে নেপোলিয়নের পরবর্তী উক্তিই সত্য: “আমার পতনের জন্যে নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই দোষ দেওয়া যায় না। আমিই আমার প্রবলতম শত্রু, আমার ভাগ্যবিপর্যয়ের একমাত্র কারণ।”
বড়ো অদ্ভূত সব ত্রুটি ছিল এই লোকটির প্রতিভায়। ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’এর একটা ভাব ছিল তাঁর, হৃতগৌরব ঐসব রাজারাজড়ারা তাঁকে নিজেদের সমকক্ষ বলে মনে করবে, এই ছিল তাঁর বাসনা। অযোগ্যতা সত্ত্বেও নিজের ভাইদের অন্যায়রকম পদোন্নতি করে দিরেছিলেন। ওঁদের মধ্যেই একটু ভালো ছিলেন লুসিয়েঁ। ১৭৯৯ অব্দে কু-দেতার সময়ে নেপোলিয়নের অবস্থা যখন সঙ্গীন, তিনি তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। অবশ্য পরে ঝগড়া করে তিনি ইতালিতে চলে যান। আর-সমস্ত ভাইরা ছিলেন নির্বোধ, দাম্ভিক, তবু নেপোলিয়ন তাঁদের রাজার গদিতে বসিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের পরিবারের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবার মতো নীচ প্রবৃত্তি ছিল তাঁর। তবে তাঁদের সকলেই তাঁর সঙ্গে চাতুরী করেছিলেন, তাঁর বিপদের সময়ে সবাই তাঁকে ছেড়ে যান। নিজের একটা বংশ প্রতিষ্ঠিত করতে নেপোলিয়ন বরাবরই ছিলেন উৎসুক। সমৃদ্ধির আগেই, ইতালিতে গিয়ে খ্যাতি অর্জনের আগেই, তিনি জোসেফিন দ্য বোহার্নে নামে রূপসী, চপলমতি একটি মেয়েকে বিয়ে করেন। এ বিয়েতে সন্তানাদি না হওয়ায় তিনি বিষম নিরাশ হয়ে পড়েন, কারণ বংশ-প্রতিষ্ঠার দিকে তাঁর বরাবরের ঝোঁক। তাই ভালোবাসা সত্ত্বেও জোসেফিনকে ত্যাগ করে আর-একজনকে বিয়ে করার সংকল্প করেন। রুশদেশের এক ‘গ্র্যাণ্ড ডাচেস’কে বিয়ে করতে চাওয়ায় জার তাতে অসম্মত হলেন; কারণ, ইউরোপের প্রভু হলেও নেপোলিয়ন যে রুশ-রাজবংশে বিয়ে করবেন, এ তাঁর স্পর্ধা বলেই মনে হয়েছিল। নেপোলিয়ন তখন অস্ট্রিয়ার হাপ্স্বুর্গ-সম্রাটকে একরকম বাধ্যই করলেন তাঁর মেয়ে মারি লুইকে দিতে। এইবারে তাঁর একটি ছেলে হয়, কিন্তু মারি ছিলেন বৃদ্ধিহীনা, স্নেহহীনা। নেপোলিয়নকে তিনি একটুও ভালোবাসতেন না, নিজেকে অযোগ্য বলেই প্রমাণ করেছিলেন তিনি। নেপোলিয়ন বিপন্ন হলে তিনি তাঁকে ত্যাগ করে গেলেন, ভুলে গেলেন তাঁকে চিরদিনের মতো।
বড়োই আশ্চর্য লাগে যে, সাধারণের চেয়ে বহু উচ্চে দাঁড়িয়েও এই লোকটি প্রাচীন রাজাদের ফাঁকা জৌলুসের এত ভক্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু তবুও তিনি প্রায়ই বৈপ্লবিক মনোভাব নিয়ে এই রাজাদের উপহাস করতে ছাড়তেন না। স্বেচ্ছায় তিনি বিপ্লব থেকে সরে এসেছিলেন। নূতন, পরোনো কোনো যুগধর্মই তাঁর মনোমতো হল না, তিনি রয়ে গেলেন ঠিক মধ্যস্থলে।
ধীরে ধীরে তাঁর বিজয়গৌরব দুঃখময় সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তাঁর নিজের মন্ত্রীরাই বিশ্বাসঘাতকতা করল, তাঁর বিরুদ্ধে চালাতে লাগল ষড়যন্ত্র। তালিরাঁ রুশ-সম্রাট জারের সঙ্গে কুমন্ত্রণায় লিপ্ত হল। আর ফুশে ইংলণ্ডের সঙ্গে। নেপোলিয়ন তাদের ধরে ফেললেন, কিন্তু আশ্চর্যের কথা, তাদের ধমকে দিয়েই ছেড়ে দিলেন, পদচ্যুতও করলেন না। বার্নাদোৎ নামে তাঁর জনৈক সেনানায়ক তাঁরই বিরদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর কঠিন শত্রু হয়ে দাঁড়াল। ভাই লুসিয়েঁ আর মা বাদে নিজের পরিবারের আর সকলেই যথাপূর্ব দুর্ব্যবহার ও বিরুদ্ধাচরণ করে চলল। ফ্রান্সে অশান্তি ধূমায়িত হয়ে ওঠে, নেপোলিয়নের শাসনও হয়ে ওঠে কঠোরতর, নিষ্করুণ; বহু লোক বিনা বিচারে কারারুদ্ধ হয়। তাঁর ভাগ্যের জ্যোতিষ্ক এবারে সুনিশ্চিত ভাবে অস্তাচলে হেলে পড়েছে, আর সেই দুরবস্থা দেখে ‘বহু মূষিক জাহাজ ছেড়ে পলায়ন করে’। তাঁর শরীরমনও ক্ষয়ে আসে, যদিও বয়সে তিনি তখনও তরুণ। যুদ্ধের ঠিক মাঝখানে তাঁর হঠাৎ ভীষণ শূল-বেদনা শুরু হয়। শক্তিসামর্থ্যও আসে কমে। অল্পবয়সের চট্পটে-ভাব কিছু কিছু থাকলেও এখন তাঁর পদক্ষেপ আরও ভারি হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে দ্বিধা, ইতস্ততভাব জাগে, আর তাঁর রণসজ্জা, ব্যূহ ইত্যাদিও জটিলতর হয়ে আসে।
১৮১২ অব্দে ‘গ্রাঁদ আর্মি’ নামে শক্তিশালী এক সেনাদল নিয়ে তিনি রুশদেশ আক্রমণ করতে চললেন। রুশীয়দের হারাতে হারাতে বিনা বাধায় এগিয়ে চললেন। রুশীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক, তারা কেবলই পিছু হটে। শুধু শুধুই গ্রাঁদ আর্মি তাদের সন্ধান করে মস্কো পৌঁছয়। জার হার মানতে ইচ্ছুক হলে নেপোলিয়নের পুরোনো সহকারী ও সেনাপতি বার্নাদোৎ ও জর্মন জাতীয় নেতা ব্যারন ফন স্টীন—যাকে নেপোলিয়ন নির্বাসিত করেছিলেন—এই দুটি লোক তাঁকে তা করতে বারণ করল। ধোঁয়া দিয়ে শত্রু তাড়াবার জন্যে রুশীয়েরা নিজেদের প্রিয় নগরী মস্কোতে আগুন লাগিয়ে দিল। এ খবর সেণ্ট্ পিটার্স্বার্গে যখন পৌঁছয় স্টীন তখন খাবার টেবিলে বসে তার গ্লাস তুলে বলেছিল, এর পূর্বেও আমার সম্পত্তি আমি ৩।৪ বার হারিয়েছি। এসব ফেলে দিতে আমাদের অভ্যেস হয়ে আসা চাই। মরতে যখন হবেই তখন এসো, আমরা সবাই বীরের মতো মরি।”
শীতের সূচনা তখন। দগ্ধ মস্কো ত্যাগ করে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত করলেন। অতএব শ্রান্ত হয়ে ফিরে চলল গ্রাঁদ আর্মি তুষারের মধ্য দিয়ে—পাশে পাশে, পিছনে পিছনে রুশ কশাকেরা চলল তাদের খোঁচা দিয়ে দিয়ে উদ্ভ্রান্ত করতে করতে, কেউ দল ছাড়া হয়ে পড়লেই আর নিস্তার ছিল না তাদের হাতে। সুতীব্র শীত আর কশাকদের কবলে প্রাণ গেল হাজার হাজার। গ্রাঁদ আর্মি হয়ে উঠল প্রেতের শোভাযাত্রার মতো—নগ্নপদ, জীর্ণবাস, তুহিনাহত, পরিক্ষীণ সৈন্যদল। সৈন্যদের সঙ্গে নেপোলিয়ন স্বয়ং চললেন পায়ে হেঁটে। ভীষণ হৃদয়বিদারক এ যাত্রা, বিপুল বাহিনী ক্ষয়িষ্ণু হয়ে চলে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাত্র ফিরে এল অবশেষে।
এই রুশ-অভিযানের ফলে ক্ষতি হল অপরিমেয়। ফ্রান্সের পুরুষ-শত্তি নিঃশেষিত হয়ে গেল; নেপোলিয়নকেও বৃদ্ধ, অতিসতর্ক, রণবিমুখ করে তুলল। চার দিকে ঘিরে রইল শত্রুদল, আর অল্পবয়সের সেই রণজয়কৌশল বর্তমান থাকা সত্ত্বেও বেড়াজাল যেন চার দিক থেকেই লাগল এগিয়ে আসতে। ওদিকে তালিরাঁর কূটচক্রান্ত ক্রমেই বেড়ে চলেছে, বহু বিশ্বাসী সহকর্মীও নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উন্মুখ। শ্রান্ত হতাশ মনে ১৮১৪ অব্দে সিংহাসন ত্যাগ করলেন নেপোলিয়ন।
নেপোলিয়ন সরে দাঁড়াতে ইউরোপের শক্তিসমুদয়ের এক বিরাট অধিবেশন বসল ভিয়েনাতে, ইউরোপের এক নূতন মানচিত্র গঠনের জন্যে। ভূমধ্যসাগরের মধ্যে ছোট্ট দ্বীপ এল্বাতে নেপোলিয়নকে পাঠিয়ে দেওয়া হল। আর-এক বুরবোঁ, এক লুই—গিলোটিনে নিহত সম্রাটের ভাই সে—কোথায় ছিল নির্জনে, তাকে ডেকে এনে সপ্তদশ লুই নাম দিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া হল। আবার ফিরে এল বারবোঁদের কাল, নিয়ে এল তার সঙ্গে বিগত দিনের অত্যাচারলীলা। অতএব বাস্তিলের পতনের পর পঁচিশ বছর ধরে যা ঘটেছিল, মোটামুটি এই তার সারাংশ। ভিয়েনার ইতিমধ্যে চলল রাজায় মন্ত্রিতে আলোচনা ঝগড়া-বিবাদ, আর বিশ্রামের সময়টুকুতে প্রচুর আমোদপ্রমোদ। তাঁদের এখন খুব আরাম। এক বিভীষিকা দূর হয়েছে, আবার তাঁরা স্বচ্ছন্দে নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। কৃতঘ্ন তালিরাঁ এই রাজমন্ত্রীর ভিড়ে খুব জনপ্রিয় হয়ে পড়ল, এই মহাসভায় তার প্রতিপত্তি হল প্রচুর। অস্ট্রিয়ার বৈদেশিক মন্ত্রী মেতের্নিশও নাম কিনলেন রাজনৈতিক কূটচালে নিপুণ বলে।
বছর-খানেকের মধ্যেই এল্বায় নেপোলিয়ন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন, বুরবোঁ-রাজত্বও ফ্রান্সকে অস্থির করে তুলল। ১৮১৫ খৃস্টাব্দের ২৬শে ফেব্রুয়ারি ছোট্ট একটা নৌকোয় করে পালিয়ে, বলতে গেলে একলাই নেপোলিয়ন রিভিয়েরা নদীর কূলে কান্নিতে এসে নামলেন। চাষিদের হাতে তাঁর সম্বর্ধনা হল প্রচুর। তাঁর বিরুদ্ধে যে সৈনাদলকে পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের ‘ক্ষুদে সেনাপতি’কে আবার দেখে ‘সম্রাটের জয় হোক’ এই ধ্বনির মধ্যে তাঁর পক্ষেই যোগ দিল। কাজেই জয়গৌরবমণ্ডিত রূপে তিনি ফিরে এলেন প্যারিসে, বুরবোঁ-রাজা ততক্ষণে পলাতক। কিন্তু ইউরোপের আর-সব রাজধানীতে তখন আতঙ্ক, বিমূঢ়তা। ভিয়েনায় তখনও মহাসভা চলছিল, সেখানে নাচ গান ভোজ হঠাৎ থেমে গেল। শঙ্কাকুল রাজা-মন্ত্রীর ফল সব ছেড়েছুড়ে মন দিলেন নেপোলিয়নকে ধংস করার একমাত্র কাজে। সমগ্র ইউরোপ তাঁর বিরুদ্ধে এগিয়ে এল। কিন্তু ফরাসিদেশ তখন রণক্লান্ত আর ছেচল্লিশ বছর বয়সেই নেপোলিয়ন ভেঙে পড়েছেন, তাঁর স্ত্রী মারি লুইও তাঁকে ভুলে গেছেন। প্রথম কয়েকটা যুদ্ধে তিনি জিতলেন বটে, কিন্তু অবতরণের ঠিক একশো দিন পরে ওয়েলিংটন আর ব্লুশির নায়কত্বে ইংরেজ ও প্রুশীয় সেনাদলের হাতে ব্রুসেল্সের কাছে ওয়াটার্লুতে ঘটল তাঁর চরম পরাজয়। তাঁর ফিরে আসার পর এই ‘শতদিন’ চিরস্মরণীয়। কঠিন যুদ্ধ হয়েছিল ওয়াটার্লুতে, জয়পরাজয় ছিল বহুক্ষণ অনির্দিষ্ট। নেপোলিয়নের দূরদৃষ্ট! জয়লাভের সুযোগ তাঁর যথেষ্ট ছিল, কিন্তু তবুও তো কিছুকাল পরে সারা ইউরোপের কাছে তাঁকে হার মানতেই হত। পরাজিত হলে তাঁর পক্ষীয় অনেকে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চাইল। আর যুদ্ধ করা বৃথা, অতএব এই দ্বিতীয় বার তিনি সিংহাসন ত্যাগ করলেন, আর ফরাসি বন্দরে দাঁড়ানো এক ইংরেজ জাহাজে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে বললেন, অবশিষ্ট জীবনটুকু তিনি শান্তিতে ইংলণ্ডে কাটাতে চান।
কিন্তু ইউরোপ বা ইংলণ্ডের কাছ থেকে উদার বা ভদ্র ব্যবহার আশা করা তাঁর পক্ষে ভুল হয়েছিল। তারা তাঁকে বড়ো ভয় করত, আর এল্বা থেকে তাঁর পলায়নের নমুনা দেখেই তারা বুঝেছিল যে তাঁকে খুব সাবধানে এঁটে রাখতে হবে। তাই তাঁর আপত্তি অগ্রাহ্য করে অল্প কয়েকটি সঙ্গী দিয়ে তাঁকে বন্দীরূপে দক্ষিণ আটলাণ্টিকের সুদূর সেণ্ট-হেলেনা দ্বীপে পাঠানো হল। ‘ইউরোপের বন্দী’ বলে তাঁকে গণ্য করা হত, সেণ্ট-হেলেনায় তাঁকে চোখে-চোখে রাখার জন্যে একাধিক শক্তি তাদের প্রতিনিধি পাঠাল, কিন্তু আসলে তাঁকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব রইল ইংলণ্ডের হাতে। বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন সেই সুদূর দ্বীপেও তাঁকে পাহারা দেবার জন্যে নিয়োগ করা হয়েছিল ছোটোখাটো একটি সেনাবাহিনী। সে সময়ে সেখানে নিযুক্ত রুশীয় কমিশনার কাউণ্ট বাল্মেন সেণ্ট-হেলেনার যে অংশে নেপোলিয়ন অবরুদ্ধ ছিলেন তার বর্ণনা দিয়েছেন: “বিষাদময়, নিভৃততম, দুর্গম, রক্ষণের পক্ষে খুব অনুকূল, আবার তেমনিই দূরতিক্রম্য, আর অতীব নির্বান্ধব......।” দ্বীপের ইংরেজ শাসনকর্তা ছিল একটা বর্বর, নেপোলিয়নের প্রতি তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অশিষ্ট। দ্বীপের সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর জায়গায় একটা ভাঙাচোরা বাড়িতে তাঁকে রাখা হত, নানারকম বিরক্তিকর বিধিনিষেধ চাপানো ছিল তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের উপর। মাঝখানে তাঁর ভালোরকম খাওয়াও জটেত না। ইউরোপের কোনো বন্ধুর সঙ্গে তাঁর সংবাদ আদানপ্রদান করা বারণ ছিল, এমনকি তাঁর নিজের ছোট্ট ছেলেটি, সমৃদ্ধির সময়ে তিনি যাকে ‘রোমের রাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন, তার কোনো খবরও তাঁর কাছে পৌঁছত না।
নেপোলিয়নের প্রতি কদর্য ব্যবহার সত্যই আশ্চর্যজনক। কিন্তু সেণ্ট-হেলেনার শাসনকর্তা তো তার উপরওয়ালাদের যন্ত্র মাত্র, আর ইংরেজ-সরকারের স্বেচ্ছাকৃত অভিসন্ধিই ছিল বোধ হয় ওঁকে অপমানিত, লাঞ্ছিত করার। জরাজীর্ণা তাঁর মা সেণ্ট-হেলেনায় তাঁর সঙ্গে যোগদান করতে চাইলে বিশ্বের মহাশক্তিগুলি বলে উঠল, ‘না!’ এই নীচ ব্যবহার তাঁর প্রতি করা হয় সম্ভবত তিনি ইউরোপে তখনও যেরকম ভীতির সঞ্চার করতেন তারই প্রতিদানস্বরূপ, যদিও তিনি তখন ছিন্নপক্ষ, দূরাবস্থিত এক দ্বীপে অসহায় বন্দী।
সাড়ে পাঁচ বছর সেণ্ট-হেলেনার তাঁকে এমনি জীবন্মৃত অবস্থায় থাকতে হয়েছিল। প্রাণোদ্বেল, উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেই মানুষকে ঐ পাহাড়ে দ্বীপে প্রতিদিনের অপমান-লাঞ্ছনার মধ্যে কত কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে তা কল্পনা করা কঠিন নয়। ১৮২১ খৃস্টাব্দের মে মাসে তাঁর মৃত্যুর পরেও শাসনকর্তার ঘৃণা তাঁর পিছন পিছন চলেছিল, ফলে এক সামান্য কবরে তাঁর স্থান হয়। কিন্তু এই দুর্ব্যবহার-অত্যাচারের কাহিনী কেমন ধীরে ধীরে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল (সে যুগে সংবাদবহনে প্রচুর সময় লাগত), এর বিরুদ্ধে বহু দেশে, এমনকি ইংলণ্ডেও তুমুল প্রতিবাদ উঠল। ইংরেজবৈদেশিক মন্ত্রী কাস্ল্রি এই অত্যাচারের জন্যে দায়ী বলে জনপ্রিয়তা হারালেন, অবশ্য তাঁর আভ্যন্তরীণ নীতির কঠোরতাও এর অপর এক কারণ। এতে তাঁর প্রাণে এত বেজেছিল যে, তিনি আত্মহত্যা করলেন।
বড়ো বড়ো লোকেদের বিচার করা দুঃসাধ্য। আর, এক দিক থেকে নেপোলিয়ন যে মহৎ ও অসামান্য ছিলেন তাও নিঃসংশয়ে স্বীকার্য। তিনি ছিলেন প্রাকৃতিক কোনো শক্তির মতোই মৌলিক—নানান কল্পনায় পরিপূর্ণ, কিন্তু সে কল্পনার বা নিঃস্বার্থ উদ্দেশ্যগুলির মূল্য তিনি কোনোদিন চিন্তা করেন নি। অর্থ দিয়ে, যশ দিয়ে তিনি মানুষকে অভিভূত করবার চেষ্টা করেছেন। কাজেই শক্তি-সম্মান কমে এলে পর যাদের তিনি এ-যাবৎ সাহায্য করে এসেছেন তাদেরই ধরে রাখবার মতো আর-কোনো আদর্শ রইল না, তাই কাপুরুষের মতো তাঁকে ছেড়েও গেল অনেকে। দীনদরিদ্রের স্বীয় দুর্ভাগ্য নিয়েই তৃপ্ত থাকবার উপায় বলেই তিনি ধর্মকে গণ্য করতেন। খৃষ্টধর্ম সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন, “সক্রেটিস আর প্লেটোকে যে ধর্ম গোল্লায় পাঠায় তাকে আমি কেমন করে বরণ করি?” মিশরে থাকতে ইসলামধর্মের প্রতি তিনি কিঞ্চিৎ পক্ষপাতিত্ব দেখান, যাতে তাদের জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেন নিশ্চয় সেইজন্যেই। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে অধার্মিক, কিন্তু তবুও ধর্মকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন, কারণ তাকে তিনি বর্তমান সামাজিক বিধিব্যবস্থার অবলম্বন বলে মনে করতেন। তিনি বলেছিলেন, “ধর্ম স্বর্গের সঙ্গে একটা সাম্যের কল্পনা এনে দেয়, তার ফলে দরিদ্রেরা আর ধনীদের উপর অত্যাচার করে না। ধর্মের সার্থকতা রোগে টিকা দেওয়ার মতো। অসাধারণের প্রতি সে আমাদের অন্তরকে কৃতজ্ঞ রাখে, আবার হাতুড়েদের হাত থেকেও সে আমাদের রক্ষা করে। সম্পত্তির অসাম্য ছাড়া সমাজ বাঁচতে পারে না। আবার ধর্ম ছাড়া এই অসাম্যের অস্তিত্বও থাকে না। যখন একজন চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়-তে তৃপ্ত তখনই যদি আর-একজন অনশনক্লিষ্ট অবস্থায় থাকে, কোনো পরমশক্তিতে বিশ্বাস রাখলে তবেই সে বাঁচতে পারে; সে বাঁচতে পারে যদি মনে করে, পরলোকে ভাগ-বাঁটোয়ারা অন্যরকম হবে।” শক্তির গর্বে গর্বিত হয়ে তিনি বলেছিলেন, “আকাশ যদি আমাদের ওপর ভেঙে পড়ে, হাতিয়ারের ফলায় তাকে আমরা ধরে রাখব।”
মহাপুরুষের আকর্ষণী শক্তি ছিল তাঁর, অনেকের কাছ থেকে তিনি লাভ করেছিলেন বিশ্বস্ততা ও সৌহার্দ্য। আকবরেরই মতো তাঁর দৃষ্টির মধ্যে ছিল আকর্ষণের একটা ক্ষমতা। তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, “চোখ দিয়েই আমি যুদ্ধ জয় করেছি, অস্ত্র দিয়ে নয়।” সারা ইউরোপে যিনি বাধিয়ে দিলেন রণতাণ্ডব তাঁর পক্ষে এ উক্তি বিস্ময়কর। আরও পরে নির্বাসিত অবস্থায় তিনি নাকি বলেছিলেন যে, বাহুবলে কোনো ফল হয় না, মানুষের অন্তরের তেজস্বিতা তলোয়ারের চেয়েও বড়ো। তিনি বলতেন, “জানো, সবচেয়ে বেশি আমায় কী অবাক করে দেয়? কোনো-কিছুর সংগঠনে বাহুবলের অক্ষমতা। জগতে মাত্র দুটি শক্তি আছে—মনোবল আর অস্ত্রবল। ধীরে ধীরে অস্ত্রবল হেরে যাবে মনোবলের কাছে।” কিন্তু তাঁর পোষাত না ঐ ধীরে ধীরে কিছু করা। সব-কিছুই তাড়াহুড়ো করে করাই ছিল তাঁর অভ্যাস, আর গোড়ার থেকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন হাতিয়ারের জোরকেই। ঐ হাতিয়ারের জোরেই ঘটেছিল তাঁর উত্থান ও পতন। তিনি এও বলেছিলেন, “এই যুদ্ধ জিনিষটাই অসামরিক। এমন দিনও আসবে যখন কামান-সঙিন ছাড়াই যুদ্ধে জেতা যাবে।” তাঁর জীবনে গ্রহের ফেরের প্রভাব ছিল অনেক—তাঁর অভ্রংলিহ উচ্চাশা, রণজয়ে সাফল্য, এই ‘হঠাৎ বড়ো’ লোকটির প্রতি ইউরোপের ঘৃণা ও ভয়, তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যেও শান্তিতে থাকতে দেয় নি। যুদ্ধে মানুষের প্রাণকে উৎসর্গ করতে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন; কিন্তু তবুও জানা যায়, কাউকে কষ্টভোগ করতে দেখলে তিনি নাকি অভিভূত হয়ে পড়তেন।
দৈনন্দিন জীবনে তিনি ছিলেন সরল। অতিমাত্রায় কিছুই তিনি করতেন না—কাজ ছাড়া। তাঁর মতে “মানুষ যত কমই খাক না কেন, খাওয়া তার বড়ো বেশি হয়। অতিভোজনে অসুখ হতে পারে, কিন্তু অল্পভোজনে হয় না।” এই অনাড়ম্বর জীবনই ছিল তাঁর চমৎকার স্বাস্থ্য ও উচ্ছল প্রাণশক্তির উৎস। তিনি যখন খুশি, যেখানে খুশি, যত খুশি ঘুমতে পারতেন, সকালে-বিকালে এক শো মাইল ঘোড়ায় চড়া তাঁর পক্ষে কিছুই ছিল না।
তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন তাঁকে ইউরোপীর মহাদেশের ওপারে নিয়ে গেল, তিনি ইউরোপকে ভাবতে লাগলেন এক দেশ, এক রাজ্য-রূপে—একই রীতি, একই শাসনের অন্তর্গত। “সব জাতকে আমি একত্রিত করব” সে-হেলেনার নির্বাসন-কালে এই স্বপ্ন তাঁর মনে এসেছিল, কিন্তু তার মধ্যে অহং-ভাবটা আর ছিল না—আগেই হোক পরেই হোক, এই (ইউরোপীয় জাতিগুলির) ঐক্য ঘটনাচক্রে সাধিত হবেই। তার সূচনা দেখা দিয়েছে; আর আমার শাসনপ্রণালীর অবসানে এ সম্ভব হতে পারে একমাত্র একটি মহাজাতি-সভা বা ‘লীগ অব নেশন্স্’-এর সাহায্যে।” তার পরে এক শো বছর কেটে গেছে, ইউরোপ আজও পরীক্ষা চালাচ্ছে ‘লীগ অব নেশন্স্’ নিয়ে।
তাঁর যে ছেলেকে তিনি ‘রোমের রাজা’ নাম দিয়েছিলেন, যার সংবাদ তাঁর কাছ থেকে নিষ্ঠুরভাবে চেপে রাখা হত, তার জন্যে তিনি এক শেষ দলিল লিখে রেখে যান। তাঁর বড়ো আশা ছিল তাঁর ছেলেই একদিন রাজা হবে, তাই তাঁকে তিনি লিখে গিয়েছিলেন শান্তিতে শাসন চালাতে, হিংসার পথ যেন সে অবলম্বন না করে। অস্ত্র দিয়ে ইউরোপকে ভয় দেখাতে আমি বাধ্য হয়েছিলাম, কিন্তু আজকের পন্থা হচ্ছে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে জয়লাভ।” কিন্তু ছেলের অদৃষ্টে ছিল না রাজ্যশাসন। পিতার মৃত্যুর এগারো বছর পরে যৌবনেই সে ভিয়েনা-শহরে মারা যায়।
কিন্তু এসব চিন্তা তাঁর মনে আসে পরে, নির্বাসিত অবস্থায়। তখন তিনি অনেক সংযত হয়েছেন, আর তা ছাড়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বোধ হয় ভাবীকালের মানুষদের প্রভাবিত করা। তাঁর প্রতিপত্তির দিনে তিনি ছিলেন কাজের মানুষ, দার্শনিক হবার সময় তাঁর ছিল না। তাঁর পূজা ছিল শক্তির বেদিমূলে; তাঁর একমাত্র প্রকৃত ভালোবাসা ছিল শক্তির প্রতি—সে ভালোবাসা রুক্ষ নয়, শিল্পীমনের প্রকাশ ছিল তাতে। “আমি ভালোবাসি শক্তি,” তিনি বলেছিলেন, “হ্যাঁ, কিন্তু শিল্পীর মতো, যেমন বীণ্কার তার বীণাকে ভালোবাসে, সুর তান প্রকাশ করবার জন্যে। কিন্তু অতিমাত্রায় শক্তির সাধনা বিপজ্জনক, তার সাধক পুরুষ বা জাতির এক সময়ে ঠিক পতন হবেই।” কাজেই নেপোলিয়নের পতন হল, বোধ হয় ভালোই হল।
ইতিমধ্যে ফরাসিদেশে চলে বুরবোঁ-রাজত্ব। কিন্তু একটি উক্তি প্রচলিত আছে যে, বুরবোঁরা কোনোদিন কিছু শেখে নি, তাই ভোলেও নি কিছু। নেপোলিয়নের মৃত্যুর নয় বছর পরে, ফ্রান্স অতিষ্ঠ হয়ে তাদের সরিয়ে দিল। আর-এক রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হল, আর নেপোলিয়নের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ভেঁদোম-স্তম্ভ থেকে অপসৃত তাঁর মূর্তিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হল। তাঁর দুঃখিনী জরাজীর্ণা দৃষ্টিহীনা মা তখন বলেছিলেন, “আবার সম্রাট ফিরে এসেছেন পারিসে।”