বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/পরিপ্রেক্ষা
২৩
পরিপ্রেক্ষা
অনন্ত যুগের মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রাপথের কোন্ জায়গায় এসে পৌঁচেছি আমরা? আগেই তো প্রাচীন মিশর, ভারত, চীন ও নোশসের বিষয়ে কিছু আলোচনা করেছি। দেখেছি, যে সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল পিরামিডের, মিশরের সেই পুরাতন ও অপূর্ব সভ্যতা কী করে ধীরে ধীরে হৃতবল হয়ে ক্রমে এক নিরাকার অপচ্ছায়ায় পরিণত হয়ে গেল, প্রকৃত প্রাণের স্পন্দন রইল না তাতে, রইল কেবল কাঠামোটা আর কতকগুলো স্মৃতিচিহ্ন। গ্রীস দেশের মধ্যাঞ্চল থেকে প্রতিবেশী-জাত এসে কী করে নোশসকে ধ্বংস করে ফেলেছিল তাও দেখেছি। সদ্যারদ্ধ ভারত ও চীনের অস্পষ্ট সুদূর প্রতিচ্ছবিও দেখেছি, উপকরণের অভাবে জানতে পারি নি বিশেষ কিছুই, তবুও উপলব্ধি করেছি সেকালের মহান সভ্যতাকে, আর বিস্মিত হয়েছি বহু সহস্র বছর আগেও সভ্যতার ক্ষেত্রে এই দেশদুটি কীভাবে সংযুক্ত ছিল, তাই দেখে। মেসোপটেমিয়াতেও স্বল্পকালের জন্যে কী করে সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, তার পরে সকল সাম্রাজ্য যে পথে গেছে সেই পথেই চলে যাচ্ছে, তারই আভাস পেয়েছি।
খৃষ্টের পাঁচ-শো ছ-শো বছর আগে বড়ো বড়ো মনীষী যাঁরা বিভিন্ন দেশে জন্মেছিলেন, তাঁদের কথাও কিছু কিছু বলেছি—বলেছি ভারতের বুদ্ধ আর মহাবীর, চীনের লাওসে আর কনফুসিয়স, পারশ্যের জরথুস্ট্র, আর গ্রীসের পাইথাগোরাসের কথা। বুদ্ধ পুরোহিতদের এবং ভারতের প্রাচীন বৈদিক ধর্মের তৎকালীন রূপকে আক্রমণ করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, কুসংস্কার ও পূজা-অর্চনাই জনগণের মন ভোলাচ্ছে এবং তাদের প্রতারিত করছে। জাতিবিভাগ ছিল তাঁর অপ্রিয় এবং তিনি সাম্যের প্রচার করে গিয়েছিলেন।
তার পরে আমরা ফিরে চলেছিলাম পশ্চিমে, এশিয়া ও ইউরোপ মিলেছে যেখানে, চলেছিলাম পারশ্য-গ্রীসের অদৃষ্টলেখার অনুসরণ করে—কী করে পারশ্যে গড়ে উঠল এক বিরাট সাম্রাজ্য আর ‘রাজার রাজা’ দারিয়ুস তাকে ভারতের সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্ত প্রসারিত করলেন; কী করে এই সাম্রাজ্যটি ছোট্ট গ্রীসকে চেয়েছিল গ্রাস করতে, কিন্তু সবিস্ময়ে দেখেছিল যে, এই ক্ষুদ্র দেশটিও উল্টে যুদ্ধ করতে এবং নিজেরটা ধরে রাখতে পারে। তার পরে চলেছিলাম গ্রীক ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিস্ময়কর সূত্র ধরে, একদল মনীষী যেখানে জন্মেছিলেন এবং সৃষ্টি করেছিলেন অতি উচুদরের সাহিত্য ও শিল্পকলা।
গ্রীসের স্বর্ণযুগ স্থায়ী হল না। মাসিডনের আলেকজাণ্ডার তাঁর দিগ্বিজয়ের ফলে গ্রীসের যশগৌরব বহদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রীসের উন্নত সভ্যতা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে লাগল। দিগ্বিজয়ী আলেকজাণ্ডার পারশিক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে ভারতের সীমান্তও অতিক্রম করেছিলেন। তিনি রণকুশল সেনাপতি ছিলেন সন্দেহ নেই কিন্তু ঐতিহ্য তাঁর নামের চারদিকে উপাখ্যানের মালা গেঁথে তুলে তাঁকে এমন একটা খ্যাতি দান করেছে যা তাঁর যথার্থ প্রাপ্য নয়। কেবল পাঠানুরাগীরাই কিছু জানে, সক্রেটিস বা প্লেটো বা ফিডিয়াস কিংবা সফোক্লিস অথবা গ্রীসের অন্যান্য মনীষীদের কথা, কিন্তু আলেকজাণ্ডারের নাম কে না শুনেছে?
আলেকজাণ্ডারের কীর্তি সে তুলনায় কম। পারশিক সাম্রাজ্য তখন প্রাচীন, অবলম্বনহীন—আর টিঁকবে বলে আশাও ছিল না। আলেকজাণ্ডারের ভারতবর্ষ আক্রমণ সামান্য দস্যু বৃত্তি মাত্র, তার মূলাও সামান্যই। আরও কিছুকাল বাঁচলে হয়তো আলেকজাণ্ডার সত্যিকারের কিছু একটা করে যেতে পারতেন। কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর সাম্রাজ্য শতধাবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তবু সাম্রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী না হলেও তাঁর নাম এখনও লুপ্ত হয় নি।
আলেকজাণ্ডারের আগমনের একটা বড়ো ফল হল, পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে এক নূতন যোগসূত্র স্থাপন। বহু সংখ্যক গ্রীক প্রাচ্যদেশে এসে পুরোনো নগরগুলিতে অথবা নবপ্রতিষ্ঠিত উপনিবেশে বাস স্থাপন করলেন। আলেকজাণ্ডারের আগেও পূর্ব-পশ্চিমে সংযোগ ছিল এবং বাণিজ্য চলত। কিন্তু তাঁর পরে সেটা বহুলপরিমাণে বেড়ে গেল।
আলেকজাণ্ডারের আক্রমণের আর একটা অনুমতি ফল সত্য হলে গ্রীকদের পক্ষে তা হয়েছিল অত্যন্ত অশুভ। বলা হয়েছে যে, মেসোপটেমিয়ার জলাভূমি থেকে গ্রীক-সমতলে তাঁর সৈন্যেরা ম্যালেরিয়াবাহী মশা নিয়ে গিয়েছিল, আর এইভাবে ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে গ্রীকদের করে তুলেছিল দুর্বল। গ্রীকদের অবনতির যেসব ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এটি তার অন্যতম। কিন্তু এ কেবল অনুমানমাত্র, এতে কতখানি সত্য নিহিত আছে কেউ তা জানে না।
আলেকজাণ্ডারের স্বল্পায়ু সাম্রাজ্যের অবসান হল, সে জায়গায় গড়ে উঠল কয়েকটি ছোটো রাজ্য। তার মধ্যে ছিল টলেমির শাসনাধীন মিশর আর সেলিউকস-অধিকৃত পশ্চিম-এশিয়া। টলেমি ও সেলিউকস উভয়েই ছিলেন আলেকজাণ্ডারের সেনাধ্যক্ষ। সেলিউকস ভারতবর্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষে হতাশ হয়ে দেখলেন যে, ভারতও সজোরে আঘাত ফিরিয়ে দিতে পারে। মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত ভারতের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চল জুড়ে এক শক্তিমান রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আগের একটা চিঠিতে তোমাকে চন্দ্রগুপ্ত, তাঁর সুবিখ্যাত ব্রাহ্মণ মন্ত্রী চাণক্য আর তাঁর লেখা অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধে বলেছি। সৌভাগ্যবশত ২২০০ বছর পূর্বের ভারতবর্ষের চমৎকার ছবি এ বইখানিতে পাওয়া যায়।
পিছন ফিরে দেখা আমাদের শেষ হল। পরের চিঠিতে আবার মৌর্য সাম্রাজ্য আর অশোকের কাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাব। আসলে এ কাজটা আমি চোদ্দ মাস আগে, ১৯৩১-এর ২৫শে জানুয়ারি, নাইনি জেলে থাকতে করব বলেছিলাম। এখনও সে কথা রাখা হয় নি।