বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/পারশ্য এবং গ্রীস
১৫
পারশ্য এবং গ্রীস
তোমার চিঠি আজ পেলাম। মা ও তুমি দুজনেই ভালো আছ জেনে খুশি হয়েছি। কিন্তু তোমার দাদুর অসুখে যে সারছে না, ওঁর জ্বরটা ছাড়লে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত। উনি সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন, এখন এ বয়সে যে শান্তি এবং বিশ্রাম দরকার তাও পাচ্ছেন না।
তুমি যে দেখছি লাইব্রেরি থেকে অনেক বই পড়ে ফেলেছ, আমার কাছ থেকে আরও সব বইয়ের নাম চেয়েছ। কিন্তু ইতিমধ্যে কী কী বই পড়েছ তার নাম তো আমাকে লেখ নি? বই পড়ার অভ্যাস খুবই ভালো; কিন্তু যারা তাড়াতাড়ি অনেক বই পড়ে ফেলে তাদের বেলায় একটু সন্দেহ হয়। মনে হয় বোধ করি ভালো করে পড়ে নি, কোনোরকমে চোখ বুলিয়ে গেছে, আজ পড়ছে তো কাল ভুলে যাচ্ছে। পড়বার মতো বই যদি হয় তবে তা বেশ যত্ন করে খুঁটে খুঁটে পড়াই ভালো। এমন বইও অনেক আছে যা মোটে পড়বার যোগ্যই নয়। এত বইয়ের মধ্যে থেকে ভালো বই বেছে নেওয়া কিছু চাট্টিখানি কথা নয়। তুমি হয়তো বলবে আমাদের লাইব্রেরি থেকেই যখন বই বেছে নিয়েছ তখন নিশ্চয় ভালো বই-ই হবে, কারণ তা নইলে আমরা এসব বই রাখব কেন? তা বেশ, বেশ, পড়ে যাও, আমি জেল থেকে তোমাকে যতটা পারি সাহায্য করব। শরীরে মনে তুমি কত তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠছ আমি অনেক সময়ে তাই ভাবি। তোমার কাছে যেতে ভারি ইচ্ছে করছে। এই-যে আমি তোমাকে যেসব চিঠি লিখছি, তোমার হাতে পৌঁছতে পৌঁছতে হয়তো তোমার বিদ্যে এসব চিঠির বিদ্যেকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে ততদিনে হয়তো চাঁদ[১] বড়ো হয়ে উঠবে, সে-ই তখন পড়বে। তা হলেই হল; একজন কেউ এর মর্ম বুঝলেই হল।
এবারে এসো গ্রীস এবং পারশ্যদেশের কথা একটু বলি, এই দুই দেশের মধ্যে যেসব যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছিল তার কথা একটু আলোচনা করা যাক। আগের এক চিঠিতে গ্রীসদেশের নগররাষ্ট্রগুলির কথা বলেছি; পারশ্যদেশের এক রাজা যে বিরাট এক সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন তারও উল্লেখ করেছি। গ্রীকরা এ রাজার নাম দিয়েছিল দারিয়ুস। দারিয়ুসের সাম্রাজ্য শুধুই যে বহু বিস্তৃত ছিল তাই নয়, খুব সুশৃঙ্খলও ছিল। এশিয়া মাইনর থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত এর সীমানা বিস্তার লাভ করেছিল। মিশররাজ্য এবং এশিয়া মাইনরের কতকগুলি গ্রীক নগরীও এই সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। এই বিরাট সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চমৎকার রাজপথ তৈরি হয়েছিল। তার সাহায্যে নিয়মিতরূপে সম্রাটদপ্তরের সংবাদপ্রেরণের ব্যবস্থা হত। কী কারণে দারিয়ুস স্থির করলেন গ্রীস দেশের নগর-রাষ্ট্রগুলি জয় করতে হবে। সেই সূত্রে এই দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ যুদ্ধে ঘটেছিল।
হিরোডটাস নামক একজন গ্রীক ঐতিহাসিকের লেখা থেকে আমরা এইসব যুদ্ধের বিবরণ পেয়েছি। এই যদ্ধের অল্পকাল পরেই তাঁর জন্ম হয়। অবশ্য গ্রীকদের প্রতি তিনি একটু পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন, তা হলেও তাঁর লেখা বিবরণগুলি বেশ চিত্তাকর্ষক। আমার এই চিঠিতে তাঁর ইতিহাস থেকে কিছু কিছু কথা উদ্ধৃত করব।
পারশ্যরাজের প্রথমবারের অভিযান সফল হয় নি। কারণ দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে গিয়ে তাঁর বহু সৈন্য রোগাক্রান্ত হয়ে এবং খাদ্যাভাবে মারা যায়। এমনকি গ্রীস পর্যন্ত তারা গিয়ে পৌঁছতেই পারে নি, তার আগেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিল। তার পরে আবার খৃষ্টপূর্ব ৪৯০ অব্দে দ্বিতীয় অভিযান হল। পারশ্যসৈনারা এবার স্থলপথে না গিয়ে সমুদ্রপথে অগ্রসর হল। এথেন্সের নিকটবর্তী ম্যারাথন-নামক একটি স্থানে তারা অবতরণ করল। এথেন্সবাসীরা তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল, কারণ পারশ্যসাম্রাজ্যের তখন বিষম প্রতিপত্তি। এমনকি ভয়ে তারা তাদের বহুকালের পুরোনো শত্রু স্পার্টার সঙ্গে মিতালি করবার চেষ্টা করল। বিদেশী শত্রুর আক্রমণ থেকে দেশরক্ষার জন্য তাদের সাহায্য প্রার্থনা করল। স্পার্টার সাহায্য এসে পৌঁছবার আগেই কিন্তু এথেন্সবাসীরা পারশ্যসেনাকে যুদ্ধে হারিয়ে দিল। এই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ম্যারাথনের যুদ্ধ হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব ৪৯০ অব্দে।
গ্রীসদেশের ছোট্ট একটি নগর-রাষ্ট্র কিনা এত বড়ো সাম্রাজ্যের সেনাদলকে হারিয়ে দিল—ভাবলে একটু অদ্ভুত ঠেকে। কিন্তু ব্যাপারটা বাইরে থেকে যতটা অদ্ভুত মনে হয়, আসলে ততটা নয়। গ্রীকরা লড়াই করেছিল নিজের ঘরের পাশে আপন দেশ রক্ষার জন্য; আর পরাশ্যসেনা দেশ ছেড়ে রাজ্য ছেড়ে এসেছিল অনেক দূরে। তার উপরে আবার তাদের পাঁচমিশালি সৈন্যদল, সাম্রাজ্যের সব অংশ থেকে জড়ো-করা। ওরা মাইনে-করা সৈন্য, লড়াই করেছে পয়সার খাতিরে। গ্রীসদেশ জয় হোক বা না হোক তা নিয়ে ওরা বড়ো একটা মাথা ঘামায় নি। অপর পক্ষে এথেন্সবাসীরা যুদ্ধ করেছে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। স্বাধীনতা হারানোর চেয়ে তারা মৃত্যুকেও শ্রেয় মনে করেছে। যারা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে মরণপণ করে তারা কখনও পরাজিত হয় না।
কাজেই দারিয়ুসকে ম্যারাথনের যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করতে হল। তাঁর মৃত্যুর পরে জেরিক্সিস হলেন পারশ্যের সম্রাট। জেরিসিক্সও মনে মনে গ্রীসজয়ের আশা পোষণ করেছিলেন। রাজা হয়ে তিনি গ্রীস-অভিযানের আয়োজন শুরু করলেন। এইখানে হিরোডটাসের লেখা একটি রোমাঞ্চকর কাহিনী তোমাকে বলব। আর্তাবানাস ছিলেন জেরিক্সিসের পিতৃব্য। তিনি বুঝেছিলেন যে, গ্রীস-অভিযান অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল ব্যাপার—কাজেই তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করেছিলেন। জেরিক্সিস তাঁকে যে জবাব দিয়েছিলেন হিরোডটাসের বিবরণ থেকে এখানে তা উদ্ধৃত করে দিচ্ছি:
আপনি যা বলছেন তার মধ্যে যুক্তি আছে বটে, কিন্তু চারদিকে যদি কেবল বিপদ দেখে আঁৎকে উঠি তা হলে চলবে কেন? সব বিপদকে গ্রাহ্য করলে চলে না। সংসারে সকল ব্যাপারকে যদি একই মাপকাঠিতে যাচাই করতে যাই তা হলে কোনো কাজ করাই সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের জুজুটার ভয়ে সারাক্ষণ সশঙ্ক থেকে লাভ কী? না-হয় খানিকটা দুঃখভোগের হাত এড়ানো গেল। এর চেয়ে আমি বলি, আশাবাদী হয়ে ভবিষ্যতের সম্মুখীন হওয়াই শ্রেয়, তাতে যদি দুঃখভোগ করতে হয় সেও ভালো। সঠিক পন্থা নির্দেশ না করে কেবল যদি প্রত্যেক প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন তা হলে আপনিও দুঃখ পাবেন, অপর পক্ষও পাবে। প্রত্যেক কার্যেই সফলতা এবং বিফলতার সম্ভাবনা সমপরিমাণে থাকে। ভবিষ্যতের দাঁড়িপাল্লাটা কোন দিকে থাকবে মানুষ তা কেমন করে জানবে? তার পক্ষে সেটা জানা সম্ভব নয়। কিন্তু সফলতা তারাই অর্জন করে যারা এগিয়ে গিয়ে কাজে হাত দেয়। আর যারা ভীরু, যারা কেবল চুলচেরা হিসেব করে, তাদের পক্ষে সফলতার আশা সুদূরপরাহত। পারশ্যরাজ্য যে বিরাট শক্তি অর্জন করেছে সে কথা একবার ভেবে দেখুন। আমার যেসব পূর্বপুরুষ পারশ্যের সিংহাসনে বসেছেন তাঁরা যদি আপনার অনুরূপ মতামত পোষণ করতেন, কিংবা আপনার মতো পরামর্শদাতা যদি তাঁদের জুটত তা হলে আজকে পারশ্যরাজা এতদূর বিস্তৃত হতে পারত না। তাঁরা বিপদকে বরণ করতে প্রস্তুত ছিলেন বলেই আমাদের এই উন্নত অবস্থা। বৃহৎ জিনিষ লাভ করতে হলে কঠিন বিপদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
অনেকটা অংশ উদ্ধৃত করেছি, তার কারণ অন্যসব বিবরণের চেয়ে এই কথাগুলির দ্বারাই আমরা পারশ্যরাজকে ভালো করে বুঝতে পারি। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য দেখা গেল, আর্তাবানাস ঠিক পরামর্শই দিয়েছিলেন, গ্রীসদেশে পারশ্যসেনার পরাজয় হল। জেরিক্সিস পরাজিত হলেন বটে, কিন্তু তাঁর কথার মূল সুরটি যথার্থই সত্য, তার থেকে আমাদের সকলেরই কিছু শিক্ষণীয়
আছে। এই-যে আজকে আমরা বৃহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজে নেমেছি, মনে রাখতে হবে, লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে বহু কঠিন বিপদের মধ্য দিয়ে আমাদিগকে যেতে হবে।
সম্রাট জেরিক্সিস তাঁর বিরাট সৈন্যদল নিয়ে এশিয়া মাইনরের ভিতর দিয়ে রওনা হলেন। তার পরে দার্দানেলিস-প্রণালী অতিক্রম করে ইউরোপে পদার্পণ করলেন। তখন দার্দানেলিসের নাম ছিল হেলেস্পণ্ট্। পথিমধ্যে জেরিক্সিস ট্রয়নগরের ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শন করেছিলেন, সেই যেখানে প্রাচীনকালের গ্রীক বীরেরা হেলেনকে উদ্ধার করবার জন্য লড়াই করেছিলেন। হেলেস্পণ্ট্ প্রণালী পার হবার উদ্দেশ্যে সৈন্যদের জন্য বিরাট সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। পারশ্যসৈন্যদল যখন সেতু পার হয়ে যাচ্ছে তখন জেরিক্সিস তীরবর্তী একটি পাহাড়ের চূড়ায় মর্মর সিংহাসনে বসে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। হিরোডটাস লিখেছেন:
সমস্ত হেলেস্পণ্ট্ জাহাজে পরিপূর্ণ এবং এবিডসের তীরভূমি ও প্রান্তরসমূহ লোকে লোকারণ্য, সেই দৃশ্য দেখে জেরিক্সিস বললেন, ‘আমি আজ সত্যই সুখী’; কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, তিনি কাঁদতে লাগলেন। পিতৃব্য আর্তাবানাস—সেই যিনি প্রথমে জেরিক্সিসকে গ্রীস-অভিযান থেকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করেছিলেন—তিনি তাঁকে কাঁদতে দেখে বললেন, ‘রাজন্, অল্প সময়ের মধ্যে তোমার এ কী মতিপরিবর্তন! এইমাত্র তুমি নিজ মুখে আহ্লাদ প্রকাশ করছিলে আর পরমুহূর্তেই দেখছি তোমার চোখে জল।’ জৌরক্সিস বললেন, ‘এই দৃশ্য দেখে হঠাৎ আমার মনে হল মানুষের জীবন কী ক্ষণস্থায়ী! এই-যে চতুর্দিকে অগণিত মানুষ দেখছি, একশত বৎসর পরে এর একজনও পৃথিবীতে জীবিত থাকবে না’।
যা হোক, সেই বিরাট সৈনাদল স্থলপথে অগ্রসর হল আর বহুসংখ্যক জাহাজ সমুদ্রপথে তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলল। কিন্তু সমুদ্রের দেবতা বোধহয় গ্রীকদের পক্ষেই যোগ দিয়েছিলেন, কারণ হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় উঠে বেশির ভাগ জাহাজ একেবারে বিনষ্ট হয়ে গেল। ওদিকে এত বড়ো বিরাট সৈন্যদল দেখে গ্রীকরা সত্যই ভয় পেয়ে গেল। তাদের পুরাতন আত্মকলহ সব ভুলে গিয়ে তারা সমবেতভাবে আক্রমণকারীর প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হল। প্রথম দিকটায় পশ্চাৎঅপসরণ করে তারা থার্মোপোলি-নামক স্থানে পারশ্যসেনাকে ঠেকাবার চেষ্টা করল। সেই স্থানটি একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ গিরিপথ—তার একদিকে পাহাড়, অপরদিকে সমুদ্র। কাজেই এখানে অল্পসংখ্যক লোকও একটি বৃহৎ সেনাদলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত। মাত্র তিন শত স্পার্টান-সমেত গ্রীক বীর লিওনিডাস মরণপণ করে সেই গিরিপথ রক্ষার জন্য দণ্ডায়মান হলেন। ম্যারাথনের যুদ্ধের ঠিক দশ বৎসর পরে সেই স্মরণীয় দিনে এইসব বীর সন্তান দেশমাতৃকার সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছিল। পারশ্যসেনার গতিরোধ করে তারা গ্রীক সৈন্যদলকে পশ্চাদপসরণের সুযোগ দিল। সেই সংকীর্ণ গিরিপথে এক-একজন এসে শত্রুর গতিরোধ করছে, প্রাণ দিচ্ছে, তৎক্ষণাৎ আর একজন তার স্থান গ্রহণ করছে। পারশ্যসেনার অগ্রগতি একেবারে রুদ্ধ। লিওনিডাস এবং তাঁর তিন শত সঙ্গীর প্রত্যেকে থার্মোপোলির রণক্ষেত্রে ধরাশায়ী হল—তবে পারশ্যসেনা অগ্রসর হতে পারল। খৃষ্টপূর্ব ৪৮০ অব্দে এই ঘটনা ঘটেছিল অর্থাৎ ঠিক দু হাজার চার শো দশ বৎসর পূর্বে; কিন্তু আজও তাদের সেই অজেয় বিক্রমের কথা ভাবলে দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। থার্মোপোলিতে গেলে লোকে আজও দেখতে পাবে লিওনিডাস এবং তাঁর সঙ্গীদের বাণী খোদিত রয়েছে প্রস্তরফলকে—
হে পথিক, যাও, স্পার্টায় গিয়ে বলো, তাদের আজ্ঞা পালন করে আমরা অবহেলে প্রাণ বিসর্জন করলাম।
যে অমিত বিক্রম মত্যুকেও জয় করে তার তুলনা নেই। লিওনিডাস এবং থার্মোপোলি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, সুদূর ভারতবর্ষে আমরাও যখন সে কথা ভাবি আমাদেরও প্রাণে রোমাঞ্চ জাগে। এখন ভেবে দেখো দেখি, আমাদেরই দেশের নরনারী, আমাদেরই পূর্বপুরুষ, যাঁরা ইতিহাসের প্রারম্ভকাল থেকে হাসিমুখে মৃত্যুকে উপেক্ষা করেছেন, অসম্মান এবং দাসত্বের চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছেন, শত নির্যাতনেও যাঁরা মস্তক অবনত করেন নি—ভেবে দেখো, তাঁদের কথা মনে হলে আমাদের কতখানি গর্ব হওয়া উচিত। চিতোর এবং চিতোরের অতুলনীয় ইতিহাসের কথা ভেবে দেখো, রাজপুত নরনারীর অত্যাশ্চর্য বীরত্বের কাহিনী একবার স্মরণ করো। আর এই আজকের দিনেই দেখো-না—আমাদেরই সঙ্গীদল, আমাদেরই মতো ধমনীতে যাঁদের উষ্ণ রক্ত-স্রোত বইছে—ভারতের মুক্তিসংগ্রামে তাঁরাও তো মৃত্যুভয়ে ভীত হন নি।
থার্মোপোলিতে বাধা পেয়ে কিছুকালের জন্য পারশ্যসেনার অগ্রগতি বন্ধ রইল, কিন্তু বেশি দিন নয়। গ্রীকরা কেবলই পিছু হটে যেতে লাগল; কোনো কোনো গ্রীকনগরী শত্রুর কাছে বশ্যতা স্বীকার করল। গর্বিত এথেন্সবাসীরা কিন্তু আত্মসমর্পণ করার চেয়ে নগর ত্যাগ করে যাওয়াই শ্রেয় মনে করল। সমস্ত অধিবাসী একযোগে নগর ত্যাগ করে চলে গেল, বেশির ভাগই পালাল সমুদ্রপথে। পারশ্যসেনা সেই জনমানবহীন নগরীতে প্রবেশ করে সব পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। কিন্তু গ্রীকদের নৌবহর তখনও অক্ষত রয়েছে। স্যালামিস্-নামক স্থানে বিরাট এক জলযুদ্ধ হল, তাতে পারশ্য-নৌবহর সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে গেল। এই পরাজয়ের আঘাতে সম্রাট জেরিক্সিস ভগ্নমনোরথ হয়ে পারশ্যে ফিরে এলেন।
এর পরেও কিছুকাল পারশ্য সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ ছিল, কিন্তু ম্যারাথন এবং স্যালামিসেই পতনের সূচনা দেখা দিয়েছিল। কী করে পতন ঘটল পরে সে কথা বলব। এত বড়ো সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে দেখে সে যুগের লোকেরা নিশ্চয় খুব বিস্মিত হয়েছিল। হিরোডটাস এই পতনের কারণ সম্বন্ধে চিন্তা করেছিলেন এবং এ বিষয়ে একটি নীতিসূত্রও উদ্ধার করেছিলেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক জাতির ইতিহাসে তিনটি পর্যায় আছে—প্রথম পর্যায়ে সাফল্য, দ্বিতীয় পর্যায়ে সাফল্যজনিত অহমিকা এবং অন্যায়ের প্রশ্রয়, সর্বশেষে এরই ফলে অধঃপতন।
- ↑ শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের কন্যা চন্দ্রলেখা