বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/পার্লামেণ্টী রীতির ব্যর্থতা
১৯৩
পার্লামেণ্টী রীতির ব্যর্থতা
সম্প্রতি যে-সব ব্যাপার ঘটেছে আমরা তার একটু বিশদ আলোচনাই করলাম; আমাদের এই পরিবর্তনশীল জগৎকে এখনকার দিনে রূপ দিচ্ছে যে-সব শক্তি এবং প্রবৃত্তি, তারও অনেকগুলোর কথা বিচার করে দেখলাম। এর মধ্যে যে তথ্যগুলো বড়ো হয়ে চোখে পড়ে তার মধ্যে দুটি বস্তু আছে—তাদের নাম আমি আগেই করেছি, তবু তাদের নিয়ে আরও একটু আলোচনা করা দরকার। এই দুটির একটি হচ্ছে যুদ্ধোত্তর যুগে শ্রমিক আন্দোলন এবং প্রাচীন ধরণের সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা; অন্যটি হচ্ছে পার্লামেণ্টদের ব্যর্থতা বা বলহানি।
১৯১৪ সনে বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হল, শ্রমিক সংগঠনগুলোর শক্তিও তখন হ্রাস পেয়ে গেল, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে টুকরো হয়ে গেল—এর কথা তোমাকে বলেছি। এর মূলে ছিল যুদ্ধের আকস্মিক আবির্ভাব; সে সময়ে মানুষের মনে একটা হিংস্র জাতীয় উন্মাদনা জেগে ওঠে, ক্ষণিক একটা উন্মত্ততা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে। গত চার বছরে আবার আরেকটা ব্যাপার ঘটেছে, সেটা এর চেয়ে একেবারেই অন্য বস্তু, এবং এর চেয়েও বেশি শেখবার জিনিস তার মধ্যে আছে। এই চার বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে চলছে বাণিজ্য-সংকট; ধনিকতন্ত্রী পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড়ো সংকট আর কখনও দেখা যায় নি। এরই ফলে শ্রমিকদেরও দৈন্য আর দুর্দশা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ এই সংকটের আঘাতে শ্রমিক জনসাধারণের মধ্যে কোনো সত্যকার বিপ্লব-চেতনা জেগে ওঠে নি; সর্বত্র এবং ব্যাপকভাবে তো নয়ই। বিশেষ করে ইংলণ্ডে এবং যুক্তরাষ্ট্রে এর কোনোই আভাস পাওয়া যাচ্ছে না।
পুরোনো ধরনের ধনিকতন্ত্রের ভাঙন ধরেছে, সেটা সুস্পষ্ট। বাইরে থেকে দেখে যতদূর মনে হয়, পৃথিবীর অবস্থাটা সমাজতন্ত্রী রীতি প্রবর্তনের সম্পূর্ণ অনুকূল হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি কামনা করবার কথা যে মানুষদের, মানে শ্রমিকরা তাদেরই অধিকাংশের মনে বিপ্লব ঘটাবার কোনো ইচ্ছা নেই। এদের চেয়ে বরং বিপ্লব-কামনা বেশি প্রখর দেখা যাচ্ছে আমেরিকার রক্ষণপন্থী কৃষকদের মধ্যে, দেখা যাচ্ছে প্রায় সব দেশেরই নিম্নতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীদের মধ্যে; শ্রমিকদের তুলনায় এদেরই আগ্রহ-উদ্যম অনেক বেশি। সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে এটা জর্মনিতে; কিন্তু এর সাক্ষাৎ ইংলণ্ডে, যুক্তরাষ্ট্রে, এবং অন্যান্য দেশেও পাচ্ছি, অবশ্য কিছু কম পরিমাণে। আগ্রহের মাত্রার তফাৎ এদের মধ্যে আছে, তার কারণ এদের প্রত্যেকের জাতিগত বিশেষত্ব; সংকটের রূপ সকল দেশে সমান নয়, সেটাও এর একটা হেতু।
যুদ্ধের পর প্রথম কটা বছর শ্রমিকদের মধ্যে যে উগ্র আগ্রহ, যে বিপ্লববুদ্ধি দেখেছিলাম, সেটা গেল কোথায়? শ্রমিকরা কেন এমন নিস্তব্ধ নিশ্চল হয়ে গেছে, ভাগ্যে যা আছে তাকেই বিনা তর্কে মেনে নিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে? জর্মনির সোশ্যাল ডেমোক্রাট দল কেন আত্মরক্ষার একটু চেষ্টাও না করে ভেঙে পড়ে গেল, নাৎসিরা তাদের চূর্ণ করে দিচ্ছে দেখেও তার প্রতিবাদ মাত্র করল না? ইংলণ্ডের শ্রমিকরা কেন এমন নরমপন্থী আর প্রগতিবিরোধী হয়ে উঠেছে? আমেরিকার শ্রমিকরা সে বিদ্যায় কেন এদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে? অনেকে শ্রমিক নেতাদেরই দোষ দেন; বলেন তারা অক্ষম, তারাই শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তাদের অনেকে সত্যই এই দোষে অপরাধী সন্দেহ নেই; এরা সুবিধা পেলেই দলত্যাগ করছে, শ্রমিক আন্দোলটাকে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির একটা সোপানস্বরূপ ব্যবহার করছে—এটা খুবই দুঃখের কথা। মানুষের প্রত্যেক কাজে প্রত্যেক ব্যাপারেই সুবিধাবাদীদের দর্শন মেলে; কিন্তু যেখানে সেই সুবিধাবাদের মানে হচ্ছে পদপিষ্ট দুর্দশাক্লিষ্ট লক্ষ কোটি মানুষের আশা আদর্শ আর আত্মোৎসর্গকে নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য কাজে লাগিয়ে নেওয়া, মানুষের ইতিহাসে তার চেয়ে বড়ো দুর্ভোগ্যের কাহিনী বেশি নেই।
নেতাদের হয়তো দোষ আছে। কিন্তু নেতারা তো বর্তমান অবস্থারই সৃষ্টিমাত্র। সাধারণত দেখা যায়, দেশের প্রকৃতি অনুসারে যেমন শাসক তার উপযুক্ত তেমনিতর শাসকই তার ভাগ্যে এসে জোটে; আন্দোলনের নেতা হয়ে বসেন যাঁরা, বিশ্লেষণ করলে শেষপর্যন্ত দেখা যাবে সেই আন্দোলনের সত্যকার কামনা তাঁদেরই মধ্যে রূপ পরিগ্রহ করেছে। আসল কথা, এই-সব সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিক নেতারা বা তাঁদের অনুগামীরা, কেউই এরা সমাজতন্ত্রবাদকে একটা জীবন্ত মতবাদ বলে গ্রহণ করেন নি, অবিলম্বে একে আয়ত্ত করা চাই এমন কামনাও তাঁদের মনে জাগে নি। এঁদের উচ্চারিত সমাজতন্ত্রবাদ ধনিকতন্ত্রী ব্যবস্থার সঙ্গে বড়ো বেশি জড়িয়ে পড়েছিল, মিশে গিয়েছিল। উপনিবেশে যে শোষণ চলছে তার লাভের একটা ক্ষুদ্র অংশ এদের হাতেও এসে পৌছত; জীবনযাত্রার মান উচ্চতর করবার ব্যাপারে এরা সেই ধনিকতন্ত্রের অস্তিত্বের উপরেই ভরসা করে থাকত। সমাজতন্ত্রবাদ এদের পক্ষে হল একটা দূরবর্তী আদর্শ, একটা স্বপ্নের স্বর্গলোক,—সে ভবিষ্যতের বস্তু, বর্তমানের নয়। স্বর্গের সেই প্রাচীন কল্পনারই মতো এর নামটাও হয়ে উঠল ধনিকতন্ত্রীদেরই স্বার্থসিদ্ধির উপায়।
এইজন্যই এই-সমস্ত শ্রমিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক, এবং এই শ্রেণীর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানরা সকলেই শুধু সংস্কার-সাধনের পর ক্ষুদ্র ব্যাপার নিয়েই খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে রইল, ধনিকতন্ত্রের কাঠামোর গায়ে কোথাও এতটুকু হস্তক্ষেপ করল না। এদের সে আদর্শবাদ কোথায় হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল; এরা ক্রমে পরিণত হল শুধু বিরাট বিরাট দপ্তরপন্থী প্রতিষ্ঠানে, তার প্রাণ বলে কিছু নেই, বিরাট দেহটার কোথাও একটুকু সত্যকার শক্তি নেই।
নবজাত কমিউনিস্ট দলের অবস্থা ছিল অন্যরকম। শ্রমিকদের জন্য একটি নূতন বাণী এরা বহন করে এনেছিল, তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে তার যোগ অনেক বেশি, তার আহ্বানের জোরও অনেক বেশি প্রচণ্ড। সে বাণীর পিছনেও ছিল একটি চিত্তাকর্ষক পশ্চাৎপট—সোভিয়েট ইউনিয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অথচ তবুও এই আহ্বানে সাড়া প্রায় মিললই না। ইউরোপ বা আমেরিকার শ্রমিক জনসাধারণ এর দিকে আকৃষ্ট হল না। ইংলণ্ডে এবং যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রতিষ্ঠা আশ্চর্যরকম অল্প। জর্মনিতে এবং ফ্রান্সে কিছুটা প্রতিষ্ঠা এর মিলল; কিন্তু জর্মনিতে অন্তত তার দরুন সিদ্ধিলাভ এর কী সামান্য ঘটল তার বিবরণ আমরা দেখেছি। আন্তর্জাতিক বিস্তৃতির দিক থেকে দুটি প্রকাণ্ড পরাজয় এর ঘটেছে, একবার চীনে ১৯২৭ সনে, আর একবার জর্মনিতে ১৯৩৩ সনে। অথচ এই বাণিজ্য মন্দার যুগে, যখন পৃথিবীতে বারবার করে সংকট ঘটছে, শ্রমিকরা অল্প মাইনে পাচ্ছে, বেকার হয়ে থাকছে, এই সময়েও কমিউনিস্ট দল কিছু করে উঠতে পারল না কেন? কেন, সেটা বলা শক্ত। কেউ কেউ বলেন, এর জন্য দায়ী শুধু তাদেরই চালের ভুল, কর্মনীতির ভুল পন্থা। অন্যরা বলেন, কমিউনিস্ট দলের সঙ্গে সোভিয়েট সরকারের সম্পর্ক বড়ো বেশি নিবিড় ছিল; তাই যতখানি আন্তর্জাতিক রূপ এদের কর্মনীতির থাকা উচিত ছিল সেটা হয় নি, সে কর্মনীতির মধ্যে অনেক বেশি পরিমাণে আত্মপ্রকাশ করেছে সোভিয়েটেরই নিজর জাতীয় কুটনীতি। হতে পারে, কিন্তু তবুও একে একটা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বলে মনে করা কঠিন।
কমিউনিস্ট দল বলতে যা বোঝার, শ্রমিকদের মধ্যে তার তেমন প্রতিষ্ঠা ঘটল না। কিন্তু কমিউনিজ্মের মতবাদগুলো ব্যাপকভাবেই ছড়িয়ে পড়ল, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীদের মধ্যে। পৃথিবীর সর্বত্র, এমনকি ধনিকতন্ত্রের যারা সমর্থক তাদের মনেও, একটা প্রত্যাশা বা একটা ভয় জেগে উঠেছিল, এই সংকটের ফলে হয়তো কমিউনিজ্মের প্রতিষ্ঠাই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে। পুরোনো ধরনের ধনিকতন্ত্রের দিন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, একথা সকলেই বুঝতে পারছিল। নিজম্ব ধনসংগ্রহের এই রীতি, বাক্তিগত লাভান্বেষণের এই নীতি, যার কোথাও কোনো সুসংহত পরিকল্পনা নেই, অপচয় বিরোধ আর থেকে থেকে সংকটের আবির্ভাবই যার বিশেষত্ব, একে এবার যেতেই হবে। এর জায়গাতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে কোনো প্রকারের একটা পরিকল্পিত সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থা বা সমবায় ব্যবস্থা। তার মানে এ নয় যে শ্রমিক শ্রেণীর জয়ও হতেই হবে; কারণ মালিক শ্রেণীদের কল্যাণার্থেই একটা আধা-সমাজতন্ত্রী রূপ দিয়েও রাষ্ট্রকে গড়ে নেওয়া যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত সমাজতন্ত্র আর রাষ্ট্রায়ত্ত ধনিকতন্ত্র আসলে প্রায় একই বস্তু; আসল কথাটা হচ্ছে, সে রাষ্ট্রকে চালাচ্ছে কে, তার থেকে লাভই বা হচ্ছে কার—সমগ্র সমাজের, না বিশেষ একটা মালিক শ্রেণীর।
বুদ্ধিজীবীরা এই-সব তর্কবিতর্ক করতে লাগলেন; এদিকে পাশ্চাত্ত্য জগতের শিল্পতন্ত্রী দেশগুলোতে নিম্নতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীরা বা ক্ষুদে বুর্জোয়ারা কাজে নেমে গেল! এই শ্রেণীগুলোর মনে একটা অস্পষ্টরকম ধারণা ছিল যে ধনিকতন্ত্র বা ধনিকতন্ত্রীরা তাদের শুষে নিচ্ছে, এদের বিরুদ্ধে কিরকম একটা বিদ্রোহের ভাবও তাদের মনে ছিল। কিন্তু এর চেয়েও ঢের বেশী ভয় করত তারা শ্রমিক শ্রেণীকে, কমিউনিস্টরা যদি ক্ষমতা দখল করে বসে, তখন কী হবে? এই-যে ফ্যাসিজ্মের ঢেউ জাগল, ধনিকরা সাধারণত এর সঙ্গেই একটা মিটমাট করে নিল; কারণ তারা বুঝতে পারছিল কমিউনিজ্মের প্লাবনকে ঠেকিয়ে দেবার এ ছাড়া আর অন্য উপার নেই। কমিউনিজ্মের ভয়ে যারা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল, ক্রমে ক্রমে তাদের প্রায় সকলেই এসে এই ফ্যাসিজ্মের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করল। এইভাবে, যেখানেই ধনিকতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছে, কমিউনিজ্মের আবির্ভাব বা তার সম্ভাবনাকে আসন্ন বলে জেনেছে, সেখানেই ফ্যাসিজ্ম্ অল্প বা বিস্তর পরিমাণে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে পার্লামেণ্টী শাসনরীতি ভেঙেচুরে খান খান হয়ে পড়ে যাচ্ছে।
চিঠির গোড়াতে দ্বিতীয় যে বৃহৎ ব্যাপারটির কথা বলেছিলাম, এই থেকেই তার কথাও এসে পড়ছে: সে হচ্ছে পার্লামেণ্টগুলোর ব্যর্থতা বা বলহানি। ডিক্টেটরি শাসন এবং প্রাচীনধরনের গণতন্ত্রের ব্যর্থতা সম্বন্ধে আগের চিঠিগুলোতে অনেক কথা তোমাকে বলেছি। এটা খুব স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে রাশিয়াতে, ইতালিতে, মধ্য-ইউরোপে। জর্মনিতেও এখন এর প্রকাশ দেখা যাচ্ছে; সেখানে নাৎসীরা শাসনক্ষমতা দখল করে বসবার অনেক আগেই পার্লামেণ্টী শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। আমরা দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেণ্ট রুজভেল্টের হাতে কংগ্রেস একেবারে সম্পূর্ণ ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। ফ্রান্স এবং ইংলণ্ডে পর্যন্ত এই ব্যাপার দেখা দিয়েছে; ইউরোপের মধ্যে এই দুটি দেশেই গণতন্ত্র সবচেয়ে দীর্ঘদিন এবং সবচেয়ে দৃঢ়প্রতিষ্ঠ হয়ে টিঁকে ছিল। ইংলণ্ডের অবস্থাটা দেখা যাক।
ইংরেজদের কাজকর্মের রীতি-নীতি ইউরোপ মহাদেশের রীতিনীতির চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত। এরা সবসময়েই পুরোনো ঢংটাকে লোকচক্ষে টিঁকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে; তার ফলে দেশের মধ্যে কোথাও পরিবর্তন ঘটেছে সেটাও বাইরে থেকে বিশেষ বোঝা যায় না। সাধারণ দৃষ্টিতে যে দেখছে তার মনে হবে ব্রিটিশ পার্লামেণ্ট আগে যেমন ছিল এখনও তাইই আছে। আসলে কিন্তু এর পরিবর্তন হয়েছে অনেকখানি। আগের দিনে হাউজ অব কমন্স্ সরাসরিই কর্তৃত্ব করত; তার সাধারণ সভ্যদেরও কথার অনেকখানি দাম ছিল। আর এখন মন্ত্রীসভা বা সরকারপক্ষই প্রত্যেকটি বৃহৎ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থির করেন, হাউজ অব কমন্স্ শুধু সে সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে ‘হাঁ’ বা ‘না’ বলবার অধিকারী। অবশ্য ‘না’ বলে সরকারপক্ষকে গদি থেকে নামিয়ে দেবার ক্ষমতা তার আছে; কিন্তু সেটা একটা অতি প্রচণ্ড ব্যাপার। অতদূর যেতে হাউজ প্রায়ই চায় না, কারণ সে করতে গেলে নানারকম হাঙ্গামার সৃষ্টি হবে, নূতন করে সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত করতে হবে। কাজেই সরকারপক্ষের যদি হাউজ অব কমন্সের মধ্যে একটা সংখ্যাধিক্য থাকে, তবে সে প্রায় যা তার ইচ্ছা তাইই করে বেড়াতে পারে, তার সে কাজে হাউজের সম্মতি আদায় করতে পারে এবং এইভাবে সে কাজটাকে আইনসঙ্গত করে নিতে পারে। অতএব দেখছ সত্যিকার ক্ষমতা ব্যবস্থাপক সভার হাত থেকে স্খলিত হয়ে শাসনবিভাগের হাতে চলে গিয়েছে, এখনও যাচ্ছে।
তার উপরে আবার, পার্লামেণ্টের কাজের চাপ আজকাল এত বেড়ে গেছে, এত অসংখ্য জটিল সমস্যার সমাধান তাকে করতে হচ্ছে, যে পার্লামেণ্টে কাজের একটা নূতন রীতিই এখন দাঁড়িয়ে গেছে: যে-কোনো ব্যবস্থা বা আইনের শুধু মূল নীতিগুলোই পার্লামেণ্ট নিজে স্থির করে দিচ্ছে, খুঁটিনাটিগুলো সম্পূর্ণ করে নেবার ভার ছেড়ে দিচ্ছে শাসনবিভাগের বা তার বিশেষ কোনো শাখা-বিভাগের হাতে। এর ফলে শাসনবিভাগের হাতে বিপুল ক্ষমতা এসে পড়েছে, সংকটের মুহূর্তে সে এখন সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতোই কাজ করতে পারে। রাষ্ট্রের বৃহত্তর কার্যাবলীর সঙ্গে পার্লামেণ্টের সম্পর্ক এইভাবে ক্রমেই আরও ক্ষীণ হয়ে আসছে। এর প্রধান কর্তব্য এখন কমতে কমতে এসে দাঁড়িয়েছে শুধু সরকারি কার্যকলাপের সমালোচনা করা, প্রশ্ন এবং তথ্য জিজ্ঞাসা করা, আর সরকারপক্ষ সাধারণ যে নীতি ধরে চলেছেন তাকে শেষপর্যন্ত অনুমোদন করা। হ্যারল্ড জে লাস্কি বলেছেন: “আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাটা এখন পরিণত হয়েছে শাসনবিভাগের ডিক্টেটরিতে; পার্লামেণ্ট বিদ্রোহ করতে পারে এই ভয়েই সে যা একটু সংযত হয়ে থাকছে।”
১৯৩১ সনের আগস্ট মাসে শ্রমিক মন্ত্রীসভা হঠাৎ ভেঙে গেল; এমন অদ্ভূত উপায়ে এটা ঘটানো হল যে তাই থেকেই বোঝা যায় পার্লামেণ্টের এ-ব্যাপারে হাত কত সামান্য ছিল। সাধারণত ইংলণ্ডে মন্ত্রীসভার পতন ঘটে, হাউজ অব কমন্সে সে ভোটে হেরে গেছে বলে। ১৯৩১ সনে হাউজের সামনে কোনো কথাই তোলা হল না এ নিয়ে কী ঘটছে তাও কেউ জানত না, ক্যাবিনেটের নিজের সভ্যদেরও অনেকেই নয়। প্রধানমন্ত্রী র্যাম্জে ম্যাকডোনাল্ড অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে খানিক গোপন পরামর্শ করলেন; এঁরা গিয়ে রাজার সঙ্গে দেখা করলেন; তার পরই ব্যস, পুরোনো মন্ত্রীসভা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল, নূতন একটি মন্ত্রীসভার নাম সংবাদপত্রে ঘোষণা করে দেওয়া হল। পুরোনো মন্ত্রীসভার কোনোকোনো সভ্য সংবাদপত্র পড়েই এই-সব ব্যাপারের কথা প্রথম জানতে পারলেন। এর সমস্তটাই অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং অত্যন্ত গণতন্ত্রবিরোধী ব্যাপার; শেষ পর্যন্ত হাউজ অব কমনস্, এটাকে অনুমোদন করেছিল, কিন্তু তাই বলেই সেকথাটা মিথ্যা হয়ে যাবে না। গণতন্ত্র নয়, এটা ছিল ডিক্টেটরি শাসনের রীতি।
শ্রমিক মন্ত্রীসভা রাতারাতি সরে গিয়ে তার জায়গাতে এল একটি ‘জাতীয় মন্ত্রীসভা’; রক্ষণশীলদের হল তাতে প্রাধান্য, এবং জনকয়েক উদারনৈতিক ও শ্রমিকদলের লোক এই দলে ভিড়িয়ে দিয়ে এটাতে জাতীয় রং ফলানোর চেষ্টা করা হল। যদিও শ্রমিকদল র্যামজে ম্যাকডোনাল্ডকে দল থেকে বহিষ্কৃত করে, নেতারূপে মেনে নিতে অস্বীকার করল, তবু তিনিই রইলেন প্রধানমন্ত্রী। ‘জাতীয় সরকার’ বলতে শুধু বোঝায় এমন একটা সরকারকে, যার মধ্যে বিত্তশালী শ্রেণীরা, সম্পত্তির মালিকরা সকলেই তাদের মধ্যেকার মতবিরোধ পরিত্যাগ করে এসে একত্রিত হয়েছে, সমাজতন্ত্রী পরিবর্তনকে ঠেকিয়ে দেবার জন্য। সে সমাজতন্ত্রী পরিবর্তন অত্যন্ত বেশি ব্যাপক হয়ে পড়বে, মালিক শ্রেণীদের প্রতিষ্ঠাকে বিপন্ন করে তুলবে, বা তাদের উপরে অত্যন্ত ভারী একটা বোঝা চাপিয়ে দেবে এই আশংকা যখন প্রবল হয়ে ওঠে, তখনই হয় এই ধরনের জাতীয় সরকারের সৃষ্টি। ১৯৩১ সনের আগস্ট মাসে ইংলণ্ডে এই অবস্থাই দাঁড়িয়েছিল; এমন একটা সংকটের সৃষ্টি তখন হল যার ধাক্কায় শেষপর্যন্ত পাউণ্ড সোনা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ল এবং এরই প্রতিক্রিয়া হিসাবে ধনিকতন্ত্রীরা তাদের সবখানি শক্তি নিয়ে দল বেধে দাঁড়াল সমাজতন্ত্রকে রুখবার জন্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত জনসাধারণকে এরা ভয় দেখাল, শ্রমিকরা যদি জেতে তবে তাদের যার যা কিছু সঞ্চয় আছে সমস্তই হাতছাড়া হয়ে যাবে। এই ভয়ে এই ক্ষুদ্র বুর্জোয়া শ্রেণী একেবারে বিহ্বল হয়ে গেল, জাতীয় সরকার বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে গেলেন। ম্যাকডোনাল্ড আর তাঁর দলবলরা লোককে বোঝালেন এই জাতীয় সরকার যদি না থাকে তবে কমিউনিজ্মের হাত থেকে দেশের আর অব্যাহতি নেই।
এমনি করে ইংলণ্ডেও পুরোনো দিনের গণতন্ত্রের ভাঙন লেগেছে, পার্লামেণ্ট দিন দিন ক্ষীণপ্রাণ হয়ে পড়ছে। মানুষকে উত্তেজিত উন্মত্ত করে তোলে এমন কোনো গভীর সংকট, যেমন ধর্ম নিয়ে বিরোধ, বা জাতি এবং গোষ্ঠীগত বিরোধ (আর্য জর্মন বনাম ইহুদি), সর্বোপরি অর্থনৈতিক বিরোধ (আছেদের আর নেইদের মধ্যে),—যখন এসে উপস্থিত হয়, তখনই গণতন্ত্রের গাড়ি উল্টে পড়ে যায়। আয়ার্ল্যাণ্ডের কথা মনে করে দেখো: ১৯৯৪ সনে যখন আল্স্টার আর বাকি আয়ার্ল্যাণ্ডের মধ্যে ধর্ম ও জাতিগত বিরোধ শুরু হল, ব্রিটেনের রক্ষণপন্থী দল পার্লামেণ্টের সিদ্ধান্তও মেনে নিতে সাফ অস্বীকার করে বসল, এমনকি গৃহযুদ্ধেরও উস্কানি দিতে লাগল। এইই হয়; বাইরের দৃষ্টিতে যেটা গণতন্ত্রী রীতিপদ্ধতি সেটা দিয়ে যতক্ষণ মালিক শ্রেণীদের প্রয়োজন সিদ্ধ হচ্ছে ততদিন তারাও নিজের স্বার্থ রক্ষা করবার খাতিরেই একে ব্যবহার করতে থাকে। কিন্তু সে-গণতন্ত্র যখন ব্যাঘাত ঘটায়, তাদের যে-সব বিশেষ সুযোগ-সুবিধা আর স্বার্থ আছে তার পরিপন্থী হয়ে ওঠে, সেই মুহূর্তেই তারা তাকে পরিত্যাগ করে, ডিক্টেটার রীতিনীতি প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। ভবিষ্যতে কোনোদিন ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের অধিকাংশ সভ্য ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন সাধনের স্বপক্ষেই মত প্রকাশ করে বসবে এমন হওয়া কিছুই অসম্ভব নয়। সেদিন যদি সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কায়েমী স্বার্থের উপরে আঘাত হানতে চেষ্টা করে, তবে সে স্বার্থের মালিকরা হয়তো খোদ পার্লামেণ্টকেই অগ্রাহ্য করে চলবে, বা তার সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশে বিদ্রোহ পর্যন্ত উস্কে তুলতে চেষ্টা করবে—১৯১৪ সনে আল্স্টারের ব্যাপার নিয়ে ঠিক তাইই তারা করেছিল।
অতএব দেখা যাচ্ছে, পার্লামেণ্ট এবং গণতন্ত্র যতক্ষণ বর্তমান অবস্থাটাকে টিঁকিয়ে রাখবার সহায়ক, ততক্ষণই শুধু মালিক শ্রেণীরা তাকে বাঞ্ছনীয় বলে মনে করে। অবশ্য এই গণতন্ত্র সত্যকার গণতন্ত্র নয়; এ শুধু গণতন্ত্র-বিরোধী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গণতন্ত্রী মতামতের অপব্যবহার। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে সত্যকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অবসর আসে নি, কারণ ধনিকতন্ত্র আর গণতন্ত্রের মধ্যে মূলতই একটা বিরোধ রয়েছে। গণতন্ত্রের যদি কোনো অর্থ থাকে তবে সে অর্থ হচ্ছে সাম্য; কেবল ভোট দেবার সমান অধিকার নয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবনেই সকল মানুষের সমান অধিকার। আর ধনিকতন্ত্র হচ্ছে ঠিক তার বিপরীত; সেখানে অর্থনৈতিক ক্ষমতাটা অল্প কজন লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকবে। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে নেবে। তারা নিজেরা একটা বিশেষ সুবিধার আসন দখল করে বসে আছে, সেই আসনকে নিরাপদ রাখবার জন্যই তারা আইন তৈরি করে; সে আইন যে ভাঙবে সেই গণ্য হবে আইন এবং শৃঙ্খলার বিঘ্নকারী বলে, সমাজের কাছে সে শাস্তি পেতে বাধ্য। এই ব্যবস্থার কোনোখানেই সাম্যের স্থান নেই; মানুষকে যেটুকু স্বাধীনতা এখানে দেওয়া হয় তারও সীমা ধনিকতন্ত্রী আইনকানুনের দ্বারাই নির্দিষ্ট; সে আইনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ধনিকতন্ত্রকে টিঁকিয়ে রাখা।
ধনিকতন্ত্র আর গণতন্ত্রের মধ্যে এই বিরোধ এদের প্রকৃতিগত এবং চিরন্তন বস্তু; বিভ্রান্তকারী প্রচারবাণী আর পার্লামেণ্ট ইত্যাদি গণতন্ত্রের বাহ্যিক অনুষ্ঠান দিয়ে একে অনেকসময়ে প্রচ্ছন্ন করে রাখা হয়—মালিক শ্রেণীরা অন্যান্য শ্রেণীদের দিকে এক আধ টুক্রো রুটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তাই দিয়েই তাদের অল্পবিস্তর সন্তুষ্ট করে রাখে। কিন্তু তার পর এমন একটা সময় আসে যখন তাদের হাতেও আর ছুঁড়ে দেবার মতো রুটি অবশিষ্ট নেই, এই দুই দলের মধ্যে বিরোধটাও তখন চরমে ওঠে, কারণ এবার সংগ্রাম আসল জিনিসটিকেই নিয়ে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্য নিয়ে। সেই অবস্থাটি যখন আসে, তখন ধনিকতন্ত্রের সমর্থকরা, যারা এত দিন বহু বিভিন্ন দলকে নিয়ে খেলা করে এসেছে, সবাই মিলে একত্র দল বেধে দাঁড়ায়—তাদের সকলেরই সকল কায়েমী স্বার্থের যে বিপদ আসন্ন হয়ে উঠেছে তাকে রুখতে চেষ্টা করে। উদারপন্থী দল এবং এদের অনুরূপ সব দলই অন্তর্হিত হয়ে যায়; গণতান্ত্রিক অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানগুলিকেও বাতিল করে দেওয়া হয়। ইউরোপ আর আমেরিকাতে এখন এই অবস্থাটিই এসে উপস্থিত হয়েছে; ফ্যাসিজ্ম্ এই অবস্থাটিরই প্রতীক—অধিকাংশ দেশই কোনো না কোনোরূপে সে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে বসেছে। শ্রমিক শ্রেণীকে সর্বত্র এখন নিছক আত্মরক্ষার জন্যই লড়তে হচ্ছে, ধনিকতন্ত্র তার সবখানি শক্তি সংহত করে রুখে দাঁড়িয়েছে, তার সে নূতন এবং প্রবল সংহতির সঙ্গে যুদ্ধ করবার মতো শক্তি শ্রমিক শ্রেণীর নেই। অথচ আশ্চর্যের কথা, সে ধনিকতন্ত্র নিজেও টলমল করছে, নূতন জগতের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। এটা প্রায় নিশ্চিত, এবারকার এই যুদ্ধের পরে যদি সে বেঁচেও থাকে, তাও সে থাকবে অনেকখানি পরিবর্তিত এবং অনেকখানি কঠোরতর রূপ নিয়ে। এবং সেটাও আবার স্বভাবতই হবে এই দীর্ঘ সংগ্রামেরই আরেকটি নূতনতর অধ্যায়ের সূচনামাত্র। ধনিকতন্ত্রের রূপ যে দেশে যেমনই হোক না কেন, তার আমলে যে শিল্পপ্রচেষ্টা, মানুষের যে জীবনধারা আধুনিক কালে চলেছে, তার সমস্তটাই একটা বিরাট রণক্ষেত্র: যেখানে দুই পক্ষের বাহিনীর মধ্যে ক্রমাগত সংগ্রাম চলেছে।
অনেকে ভাবেন, অল্প কয়েকজন করে বিচক্ষণ ব্যক্তির হাতে যদি এক-একটা দেশের শাসনকর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া হত, তবে এই সমস্ত অশান্তি বিরোধ ও দুঃখ কষ্ট কিছুই আর পৃথিবীতে থাকত না। ভাবেন, এই সমস্ত-কিছুরই মূলে রয়েছে শুধু রাজনীতিবিদ আর রাষ্ট্র-ধুরন্ধরদের বোকামি বা বজ্জাতি। এঁদের ধারণা, সাধু পুরুষরা যদি শুধু একবার এসে একত্র হন, তবে নীতিপূর্ণ উপদেশ দিয়ে এবং তাদের রীতিনীতির ভুল কোথায় সেটা দেখিয়ে দিয়েই এই দুর্বৃত্তদের এঁরা অনায়াসে শুধরে নিতে পারতেন। কিন্তু এটা একটা অত্যন্ত ভুল ধারণা; দোষ মানুষের নয়, দোষ হচ্ছে ব্যবস্থার—এই ব্যবস্থাটাই ভুল। সে ব্যবস্থা যতদিন টিঁকে থাকবে, ততদিন এই লোকগুলোও এখন যেমনভাবে চলছে তেমনিভাবেই চলতে বাধ্য হবে। একটা জাতির উপরে আরেকটা বিদেশী জাতি এসে রাজত্ব করে; একই জাতির মধ্যেও একটা অর্থনৈতিক শ্রেণী অন্য শ্রেণীদের উপরে প্রভুত্ব করে। কিন্তু যেখানেই একটা দল এইভাবে একটা প্রভুত্ব বা প্রতিষ্ঠার আসন দখল করে বসেছে, সেইখানেই দেখা যাচ্ছে আত্মপ্রবঞ্চনা এবং ভণ্ডামির ক্ষমতা এদের অসাধারণ—যুক্তিতর্ক দিয়ে নিজেকেই এরা বুঝিয়ে দেয়, যে বিশেষ সুযোগগুলো তারা ভোগ করছে সেগুলো তাদেরই বিশেষ গুণপনার ন্যায্য পুরস্কার মাত্র। এই কথাতে যদি কেউ আপত্তি করে, তবেই বুঝতে হবে সে ব্যক্তি একটা অত্যন্ত পাজি ছুঁচো বদমায়েস লোক; সমাজের গোছানো ঘরকে অগোছালো করে দেওয়াই তার মতলব। প্রভুত্ব অধিকার করে বসেছে যে মানুষের দল, তার সে সুযোগ-সুবিধাগুলো সে অন্যায় করে ভোগ করছে, সেগুলো তার শান্তশিষ্টভাবেই ছেড়ে দেওয়া উচিত, এমন কথা তাকে বিশ্বাস করানো একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। এক আধজন ব্যক্তিকে হয়তো-বা একথা বোঝানো যেতে পারে, গেলেও সে অতি ক্কচিৎ; কিন্তু দলসুদ্ধকে? কিছুতেই না। অতএব বাধে সংঘাত বাধে সংগ্রাম, আসে বিপ্লব, মানুষের উপরে নেমে আসে দুঃখ আর দুর্দশার অফুরন্ত বর্ষণ।