বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/পুরোনো ঋণ শোধের নতুন উপায়

উইকিসংকলন থেকে

১৭২

পুরোনো ঋণ শোধের নূতন উপায়

১৫ই জুন, ১৯৩৩

 মহাযুদ্ধের পরে ইউরোপ, এবং কতক পরিমাণ সমস্ত পৃথিবীটাই, যেন একটা ফুটন্ত কড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল, ভার্সাই সন্ধি এবং অন্যান্য সব সন্ধির ফলে অবস্থা বরং আরও খারাপ হল। ইউরোপের যে নূতন মানচিত্র রচনা করা হল তাতে আগের দিনের কয়েকটা জাতীয় সমস্যা মিটল; পোল, চেক এবং বাল্‌টিক অঞ্চলের জাতিগুলো স্বাধীনতা পেয়ে গেল। কিন্তু তারই সঙ্গে সঙ্গে আবার নূতন কতকগুলো জাতীয় সমস্যার সৃষ্টিও করা হল এতে: অস্ট্রিয়ার অন্তর্গত টাইরোলের খানিকটা চলে গেল ইতালির হাতে, ইউক্রেনের কতক অংশ হল পোল্যাণ্ডের অধীন; পূর্ব-ইউরোপে এই রকমের আরও কতকগুলো অন্যায় দেশ-বিভাগ করা হল। এর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত এবং সবচেয়ে বিশ্রী ব্যাপার হয়েছিল পোলিশ করিডর (পোল্যাণ্ডের সমদ্রতীর অবধি যাতায়াতের জন্য জর্মনির অন্তর্ভুক্ত প্রদেশের মধ্য দিয়া প্রস্তুত সংকীর্ণ পথ) এবং ডানজিগ্ সম্বন্ধে কৃত ব্যবস্থা। মধ্য এবং পূর্ব-ইউরোপকে ‘বল্‌কানে রূপান্তরিত’ করা হল—অনেকগুলো ছোটো ছোটো নূতন দেশ তৈরি করা হল সেখানে; তার মানেই আরও বেশি করে সীমান্তরেখা এবং আরও বেশি শুল্ক-প্রাচীর সৃষ্টি করা হল; এবং তারপর তাই নিয়ে পরস্পরের মধ্যে ঘৃণা আর বিদ্বেষের পথ খুলে দেওয়া হল।

 ১৯১৯ সনের এই সন্ধিগুলো তো রইলই তাছাড়া আবার রুমানিয়া পাকেচক্রে বেসারাবিয়া দখল করে বসল—এতদিন এটা ছিল দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ার একটা অংশ। এই নিয়ে তখন থেকেই সোভিয়েট রাশিয়া আর রুমানিয়ার সঙ্গে তর্কাতর্কি এবং কলহ চলছে। বেসারাবিয়ার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নীপার-তীরের আলসেস-লোরেন’।

 দেশ-বিভাগের এই-সব পরিবর্তনের চেয়েও বড়ো সমস্যা হচ্ছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের সমস্যা—মানে যুদ্ধের ব্যয় এবং ক্ষতির দরুন খেসারৎ বলে সে টাকাটা বিজয়ী মিত্রপক্ষকে চুকিয়ে দেবার দায় বিজিত জর্মনির ঘাড়ে চাপানো হয়েছে, তার সমস্যা। ভার্সাই সন্ধিতে এই টাকার কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক স্থির করে দেওয়া হয় নি; কিন্তু পরবর্তীকালে এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬,৬০০,০০০,০০০ পাউণ্ড বলে, কতকগুলো বার্ষিক কিস্তিতে এই টাকা জর্মনির শোধ করতে হবে। এই বিরাট পরিমাণ টাকা মিটিয়ে দেওয়া যে-কোনো দেশের পক্ষেই অসম্ভব; জর্মন যুদ্ধে পরাজিত এবং সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে, তার তো কথাই নেই। জর্মন এ সম্বন্ধে প্রতিবাদ জানাল, অবশ্য সে প্রতিবাদে ফল কিছুই হল না। শেষে উপায়ান্তর না দেখে সে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে টাকা ধার করে দুটি কি তিনটি কিস্তির টাকা মিটিয়ে দিল। এটা সে করল শুধু কিছু সময় পাবার উদ্দেশ্যে, যেন সেই অবসরে কথাটাকে নিয়ে আবার একটু আলাপ আলোচনা করে দেখতে পারে। বহু পুরুষ ধরে, একাদিক্রমে এই বৃহৎ টাকার অঙ্ক দিয়ে চলা তার পক্ষে সম্ভব নয়, এটা সে বেশ ভালো করেই জানত, অন্য দেশরাও অনেকেই বুঝত।

 অল্পদিনের মধ্যেই জর্মনির রাজস্ব-ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে ছত্রখান হয়ে পড়ল; যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি বাইরের ঋণ শোধ করা বা দেশের মধ্যেকার ব্যয় মেটানো, দুইই তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল। অন্যান্য দেশকে যে টাকা তার দেবার, সেটা দিতে হবে সোনা দিয়ে। নির্দিষ্ট তারিখে সে টাকা সে দিতে পারল না। অতএব কিস্তির খেলাপ হল। জর্মনির এলাকার মধ্যেই যে টাকা দেবার আছে, সেটা অবশ্য সরকার কারেন্সি নোট দিয়েই মিটিয়ে দিতে পারেন; অতএব তখন তাঁরা ক্রমেই আরও বেশি বেশি করে নোট ছাপতে শুরু করলেন। কিন্তু কাগজের নোট ছেপে টাকা তৈরি হয় না, তৈরি হয় ঋণপত্র। লোকেরা সে নোট ব্যবহার করে, কারণ তারা জানে চাইলেই সে নোট ভাঙিয়ে সোনা বা রূপো পাওয়া যাবে। এই নোটের পিছনে সবসময়েই খানিকটা সোনা ব্যাঙ্কে মজুত করে রাখতে হয়, তা নইলে নোটের দাম ঠিক থাকবে না। এই কাগজের টাকা খুবই কাজের জিনিস সন্দেহ নেই; প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য যতখানি সোনা বা রূপোর টাকা দেশে দরকার তার অনেকখানির প্রয়োজন এতে কমে যায়; ঋণ-মুদ্রারও পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু তাই বলে সরকার যদি কেবলই নোট ছেপে চলেন, পরিমাণের সীমা না রেখে এবং ব্যাঙ্কে সোনা কত মজুত রইল তার দিকে লক্ষ্য না রেখে সে নোট অবাধে বাজারে ছাড়তে থাকেন, তাহলে এই নোট-টাকার দাম কমে যেতে বাধ্য। তখন যত বেশি নোট ছাপা হবে ততই তার দাম কমবে, তাকে দিয়ে ঋণও ক্রমেই কম শোধ হবে। এই অবস্থাটার নাম হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। জর্মনিতে ১৯২২ এবং ১৯২০ সনে ঠিক এই ব্যাপারই ঘটেছিল। ব্যয় নির্বাহের জন্য জর্মন সরকারের আরও বেশি টাকার প্রয়োজন। অতএব তাঁরা ক্রমেই বেশি বেশি করে নোট ছাপতে লাগলেন। এর ফলে অন্য সমস্ত জিনিসপত্রেরই দর হু হু করে চড়ে গেল; শুধু জর্মন মার্কের দাম পাউণ্ড, ডলার বা মার্কের তুলনায় কমে যেতে লাগল। সুতরাং তখন জর্মন সরকারকে আরও বেশি করে মার্ক ছাপতে হল, তার ফলে আবার মার্কের দাম আরও নেমে গেল। এই ব্যাপার এত বেশিদূর গড়াল যে শেষপর্যন্ত একটা ডলার বা একটা পাউণ্ডের বাজার দর দাঁড়াল কোটি-কোটি মার্কের সমান। কাগজের মার্কের বস্তুত প্রায় কোনো মূল্যই রইল না। একখানা চিঠি পাঠাবার মতো একটা ডাক-টিকিটের দাম পড়তে লাগল দশ লক্ষ কাগজের মার্ক! সমস্ত জিনিসপত্রেরই দর এই রকম হয়ে উঠল, প্রতিমুহূর্তে সে দরের পরিবর্তন হতে লাগল।

 জর্মনির এই মুদ্রাস্ফীতি এবং মার্কের এই বিস্ময়কর মূল্য হ্রাস অবশ্য নিজে থেকে ঘটে নি। আর্থিক দুর্গতি থেকে মুক্তি পাবার জন্য জর্মন সরকার ইচ্ছে করেই এটা ঘটিয়েছিলেন; সে উদ্দেশ্য অনেকটা সিদ্ধও হয়েছিল। সরকার মিউনিসিপ্যালিটি এবং অন্যান্য ঋণী পক্ষদের জর্মনির মধ্যে যার যত দেনা ছিল, এই মূল্যহীন কাগজের মার্ক দিয়ে অতি সহজেই তাঁরা সমস্ত শোধ করে দিলেন। অন্য দেশের লোকের কাছে বা অন্য দেশের কাছে যে-সব দেনা তাঁদের ছিল সেটা অবশ্য এভাবে শোধ করা সম্ভব ছিল না; দেশের বাইরের কেউই এই কাগজের টাকা নিতে রাজি হবে না। জর্মনির মধ্যের লোককে এই টাকা গছানো সহজ, না নিতে চাইলে, আইনের ভয় আছে। এইভাবে সরকার এবং দেশের প্রত্যেকটি ঋণী ব্যক্তি অনেকখানি ঋণের বোঝা কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেললেন। কিন্তু এটা করতে গিয়ে জর্মনিকে অনেকখানি কষ্টই সয়ে নিতে হল। এই মুদ্রাস্ফীতির ফলে সমস্ত লোককেই কষ্ট পেতে হল, কিন্তু সকলের চেয়ে বেশি দুর্দশা হল মধ্যবিত্ত শ্রেণীদের; কারণ এদের সকলেরই বাঁধা মাইনে বা অন্যরকম বাঁধা আয়ের উপরে নির্ভর করে চলতে হয়। মার্কের দাম কমবার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য এদের মাইনেও কিছু বেড়েছিল, কিন্তু এত বেশি বাড়ে নি যাতে করে মার্কের দাম যে রকম হু হু করে নেমে যাচ্ছিল তার তাল সামলানো যায়। এই মুদ্রাস্ফীতির আঘাতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল দেশ থেকে; পরবর্তী কালে জর্মনিতে যে-সব আশ্চর্য কাণ্ড ঘটেছে তার কারণ বুঝতে হলে এই কথাটি আমাদের মনে রাখা দরকার। এই ক্ষুব্ধ উচ্ছিন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীরা এবার একটি শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হল, তাদের মন সবারই প্রতি বিরূপ, অতএব যে-কোনো মুহূর্তে তারা বিপ্লব ঘটিয়ে বসতে পারে। দেশের বড়ো বড়ো রাজনৈতিক দলগুলোকে আশ্রয় করে যে-সব বড়ো বড়ো বেসামরিক সেনাবাহিনী তখন গড়ে উঠছিল, এরা ক্রমে তার এক-একটাতে গিয়ে ভিড়ল; এদের অধিকাংশই গিয়ে জুটল হিটলারের নূতন দলটিতে যার নাম ন্যাশনাল-সোশ্যালিস্ট্ বা নাৎসী দল।

 পুরোনো মার্ক একেবারে সকল কাজেরই অযোগ্য হয়ে গেছে দেখে তখন সেটাকে বাতিল করে দেওয়া হল, ‘রেণ্টেন-মার্ক’ বলে একটা নূতন মুদ্রার প্রবর্তন করা হল। এটাকে আর অতিরিক্ত স্ফীত করা হল না; এর দাম এর সমপর্যায়ের সোনারই সমান রইল। এইভাবে তার নিম্নতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীদের একেবারে উচ্ছিন্ন করে দেবার পর জর্মনি আবার একটা নির্ভরযোগ্য মুদ্রামানের ব্যবস্থা করে নিল।

 জর্মনি যে অর্থসংকটে পড়েছিল তার ফলে পৃথিবী জুড়ে অনেক কাণ্ডই হয়ে গেল। জর্মনি মিত্রপক্ষকে ক্ষতিপূরণের টাকা মিটিয়ে দিতে পারল না। মিত্রপক্ষের দেশরা এই ক্ষতিপূরণের টাকাটা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিত; সবচেয়ে বড়ো ভাগটা উঠত ফ্রান্সের ঘরে। রাশিয়া এর অংশ গ্রহণ করত না; বস্তুত এতে তার যদি-বা কোনো দাবি থাকে সে দাবিও সে নিজে থেকেই ছেড়ে দিয়েছিল। জর্মনি টাকা দেবার কিস্তি খেলাপ করল দেখে ফ্রান্স এবং বেলজিয়ম সৈন্য পাঠিয়ে জর্মনির রূঢ় অঞ্চলটি দখল করে বসল। ভার্সাই সন্ধির শর্ত অনুসারে মিত্রপক্ষ আগে থেকেই রাইনল্যাণ্ড দখল করে নিয়েছিল। এবার, ১৯২৩ সনের জানুয়ারি মাসে, আরও একটা নূতন অঞ্চল ফরাসি আর বেলজিয়ানরা দখল করল। (ইংলণ্ড এই অভিযানে এদের সঙ্গী হতে অস্বীকার করেছিল)। এই রূঢ়-অঞ্চলটা রাইনল্যাণ্ডের একেবারে সংলগ্ন; এখানে খুব ভালো ভালো কয়লার খনি আর কারখানা আছে। ফরাসিদের মতলব ছিল, এখানকার এই কয়লা এবং অন্যান্য উৎপন্ন দ্রব্যই তাদের প্রাপ্য বাবদ হস্তগত করে নেবে। কিন্তু ইতিমধ্যে একটি মুশকিল দেখা দিল। জর্মন-সরকার স্থির করলেন, ফরাসিরা রূঢ় দখল করে নিয়েছে, তাঁরা নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ চালিয়ে তাদের বাধা দেবেন। রূঢ়ের যত খনির মালিক আর শ্রমিকদের প্রতি নির্দেশ দিলেন, কাজ বন্ধ করে দাও, ফরাসিদের কোনো রকমেই সাহায্য কোরো না। কাজবন্ধ করাতে এই খনির মালিক এবং শিল্পপতিদের যে লোকসান হল তার ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার তাঁদের লক্ষ লক্ষ মার্ক নগদ ধরে দিতে লাগলেন যেন ধর্মঘট অবাধে চলতে পারে। নয় কি দশমাস কাল ধরে এই লড়াই চলল, ফরাসি এবং জর্মন দুপক্ষেরই নিদারুণ অর্থব্যয় হল এর জন্য। এর পরে জর্মন সরকার নিস্ক্রিয় প্রতিরোধের নীতি প্রত্যাহার করলেন, ফরাসিদের সঙ্গে একত্র হয়েই রূঢ় অঞ্চলের সমস্ত খনি আর কারখানা চালাতে লাগলেন। ১৯২৫ সনে ফরাসিরা এবং বেলজিয়ানরা রূঢ় ছেড়ে চলে গেল।

 রূঢ়ে জর্মনরা যে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ চালিয়েছিল সেটা শেষপর্যন্ত সফল হয় নি; কিন্তু তাই থেকেই একথাটা স্পষ্ট প্রমাণ হল, যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণের সমস্যাটা আবার নূতন করে আলোচনা করে দেখা দরকার, ক্ষতিপূরণের টাকার পরিমাণটা এমন করে স্থির করা দরকার যাতে সেটা ন্যায়সঙ্গত হয়। অতএব তখন অল্পদিনের মধ্যে পর পর অনেকগুলো কনফারেন্স্ আর কমিটি বসানো হল; একটার পর একটা করে বহু নূতন পরিকল্পনা খাড়া করা হল। ১৯২৪ সনে হল ড’য়েজ্ প্ল্যান; পাঁচ বছর পরে, ১৯২৯ সনে হল ইয়ং প্ল্যান; আরও তিন বছর পরে, ১৯৩২ সনে, সংশ্লিষ্ট পক্ষরা সকলেই বস্তুত স্বীকার করলেন, ক্ষতিপূরণ বাবদ আর টাকা দেওয়ার কোনো কথাই উঠতে পারে না—ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাটাই সেই থেকে তুলে দেওয়া হল।

 ১৯২৪ সনের পর থেকে এই ক’বছর জর্মনি নিয়মিতভাবে ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে এসেছে। জর্মনির হাতে টাকা নেই, বাজারে সে দেউলিয়া, তবে সে টাকা দিল কি করে? দিল অতি সহজ উপায়ে—আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ধার করে। মিত্রপক্ষ (ইংলণ্ড, ফ্রান্স, ইতালি ইত্যাদি) আমেরিকার কাছে টাকা ধারতেন—সে টাকা তাঁরা যুদ্ধের সময়ে ধার নিয়েছিলেন। জর্মনি মিত্রপক্ষের কাছে টাকা ধারত ক্ষতিপুরণের সেনা বাবদ। অতএব আমেরিকা টাকা ধার দিল জর্মনিকে; জর্মন সেই টাকা মিত্রপক্ষকে দিল; অতএব মিত্রপক্ষ আবার আমেরিকাকে টাকা দিতে পারল। ভারি চমৎকার বন্দোবস্ত; দেখা গেল এই বন্দোবস্তে সকলেই সমান খুশি। বস্তুত প্রাপ্য টাকা আদায় করবার এছাড়া আর উপায়ও কিছু ছিল না। অবশ্য এই ধার-নেওয়া আর ধার-দেওয়ার সমস্ত ব্যাপারটাই নির্ভর করছিল একটি মাত্র বস্তুর উপরে—সেটি হচ্ছে আমেরিকার ক্রমাগত জর্মনিকে টাকা ধার দিতে থাকা। আমেরিকা টাকা দেওয়া বন্ধ করলে সমস্ত ব্যবস্থাটাই তৎক্ষণাৎ ধ্বসে পড়ে যেত।

 এই-সব ধার-দেওয়া আর ধার-নেওয়া মানে কিন্তু নগদ টাকার লেন-দেন নয়; এর সবটাই ছিল শুধু কাগজ-কলমের ব্যাপার। আমেরিকা একটা টাকার অঙ্ক জর্মনির নামে হিসাবে লিখে রাখত; জর্মনি সেইটা চালান করে দিত মিত্রপক্ষের নামে; মিত্রপক্ষ আবার সেটাকে ফিরে চালান করত আমেরিকার কাছে। টাকা চালাচালি মোটেই হত না আসলে; হত খালি খাতাপত্রে কতকগুলো হিসাব লেখালেখি। এই-সব সর্বস্বান্ত দরিদ্র দেশ, পুরোনো দেনার দরুন সুদের টাকাপর্যন্ত মিটিয়ে দেবার সামর্থ্য যাদের ছিল না, আমেরিকা এদের ক্রমাগত টাকা ধার দিয়ে যাচ্ছিল কেন? দিচ্ছিল তার কারণ আমেরিকা এদের কোনো রকমে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিল, যেন এরা একেবারে দেউলিয়া হয়ে না যায়। আমেরিকার ভয় ছিল ইউরোপ পাছে একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। সেটা হলে অন্য নানাবিধ বিপর্যয় তো দেখা দেবেই, আমেরিকার নিজের কাছে এদের যার যত দেনা আছে, সে টাকাও পাবার আশা তার চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। তাই বিজ্ঞ মহাজনের মতো আমেরিকা তার খাতকদের জীবিত এবং সবল করে রাখতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু এইভাবে ক্রমাগত টাকা ধার দিতে দিতে বছর কয়েক পরে আমেরিকা নিজেও বিরক্ত হয়ে উঠল; আর টাকা ধার দেওয়া বন্ধ করে দিল। ক্ষতিপূরণ আর ঋণ ইত্যাদি নিয়ে যে বিশাল ব্যাপারটি খাড়া করা হয়েছিল, সেটি তৎক্ষণাৎ একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল; কেউই আর কারও প্রাপ্য শোধ করতে পারল না; ইউরোপ আর আমেরিকার প্রত্যেকটি দেশ সেই বিপর্যয়ের ধাক্কায় একেবারে বিষম একটা পঙ্কদহে নিমজ্জিত হয়ে গেল।

 কাজেই দেখছ, যুদ্ধ-ক্ষতিপুরণ নিয়ে একটা বৃহৎ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, যুদ্ধের পর বারো বছরেরও বেশিদিন ধরে সে সমস্যার ছায়া ইউরোপের আকাশ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তারই সঙ্গে সঙ্গে আবার অন্যদিকে ছিল যুদ্ধ-ঋণের সমস্যা, অর্থাৎ জর্মনি ছাড়া অন্যান্য দেশদের যে ঋণ ছিল, তার। আগের একটা চিঠিতে বিশ্বযুদ্ধের আলোচনা-প্রসঙ্গে তোমাকে বলেছি, যুদ্ধের প্রথম দিকে ইংলণ্ড এবং ফ্রান্স যুদ্ধের ব্যয়ের সংস্থান করছিল, তাদের ক্ষুদ্রতর মিত্রজাতিদের টাকা ধার দিচ্ছিল। তারপর ফ্রান্সের টাকা ফুরিয়ে গেল, সে আর অন্যকে ধার দিতে পারল না। ইংলণ্ড কিন্তু তখনও ধার দিয়ে চলল। তারপর আবার ইংলণ্ডেরও সম্বল শেষ হয়ে গেল, তখন সেও আর ধার দিতে পারে না। তখন ধার দেবার মতো টাকা আছে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের; ইংলণ্ডকে, ফ্রান্সকে মিত্রপক্ষের অন্যান্য দেশকে, সে মুক্তহস্তে ধার দিতে লাগল, দিয়ে নিজেরই লাভ গুছিয়ে নিল। অতএব যুদ্ধ যখন শেষ হল তখন দেখা গেল, কতকগুলো দেশ ফ্রান্সের কাছে টাকা ধারে; অনেক দেশ ইংলণ্ডের খাতকের তালিকায় নাম লিখিয়েছে, এবং মিত্রপক্ষের প্রত্যেক দেশেরই আমেরিকার কাছে বহু টাকা দেনা। আমেরিকাই তখন একমাত্র দেশ যার অন্য কোনো দেশের কাছে দেনা নেই। সে তখন একটি বিরাট উত্তমর্ণ জাতি। যে মর্যাদা একদা ইংলণ্ডের ছিল সেটা এখন সেই দখল করে নিয়েছে; সমস্ত পৃথিবীরই মহাজন হয়ে বসেছে। কয়েকটা অঙ্কের হিসাব দিই, এ থেকে হয়তো ব্যাপারটা তুমি আরও স্পষ্ট বুঝতে পারবে। যুদ্ধের আগে আমেরিকা নিজেই ছিল ঋণী দেশ; অন্যান্য দেশের কাছে তার তখন ৩,০০,০০,০০,০০০ ডলার দেনা। যুদ্ধ যখন শেষ হল তখন তার এ ঋণ তো শোধ হয়েই গেছে; উলটে আমেরিকাই রাশিকৃত টাকা অন্যান্য দেশদের ধার দিয়ে বসে আছে। ১৯২৬ সনে অন্যান্য দেশদের কাছে আমেরিকার মোট পাওনার পরিমাণ ছিল ২৫,০০,০০,০০,০০০ ডলার।

 ইংলণ্ড, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি ঋণী দেশগুলোর পক্ষে এই যুদ্ধ-ঋণ একটা দুর্বহ বোঝা হয়ে উঠেছিল; কারণ এর সমস্তটাই সরকারি ঋণ, সে ঋণ শোধ দেবার দায় এই-সব দেশের শাসন-কর্তৃপক্ষের। আমেরিকার কাছ থেকে এরা ঋণশোধের কিছু বিশেষ রকম সুবিধাজনক শর্ত আদায় করতে চেষ্টা করলেন, খানিকটা অনুগ্রহ পেলেনও। তবু সে ঋণের বোঝা ঘাড় থেকে নামে না। জর্মনি যতদিন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে চলল, ততদিন এই ঋণী দেশরাও সেই টাকাটাই (আসলে সেটা আমেরিকারই প্রদত্ত ঋণ-মুদ্রা) আমেরিকার কাছে পাঠিয়ে দিতে পারলেন। কিন্তু জর্মনির কাছ থেকে ক্ষতিপুরণের টাকা আদায় যখন অনিয়মিত হয়ে উঠল বা বন্ধ হয়ে গেল, তখন এঁদের পক্ষেও ঋণ শোধ করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে উঠল। ইউরোপের এই ঋণী দেশরা তখন ধুয়ো তুললেন, জর্মনির প্রদত্ত ক্ষতিপূরণ আর এঁদের দেয় যুদ্ধ-ঋণ, দুটো বস্তু আসলে পরস্পর সংশ্লিষ্ট; ওটা যদি বন্ধ হয়ে যায় তবে এটা দেওয়াও কাজেকাজেই বন্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকা কিন্তু দুটোকে একত্র মিলিয়ে ফেলতে রাজি হল না। বলল, আমরা টাকা ধার দিয়েছি, সে টাকা আমরা ফেরৎ চাই—ব্যস্। জর্মনির দেয় ক্ষতিপূরণ তো একেবারেই আলাদা জিনিস। সে ক্ষতিপূরণ তোমরা পেলে কি না পেলে তার সঙ্গে আমাদের টাকার সম্পর্ক কী? আমেরিকার এই মনোভাবে ইউরোপের দেশরা অত্যন্ত চটে গেল, তার নামে খুব কঠিন কঠিন কুকথা বলতে লাগল। আমেরিকা একটা শাইলক, তার এক পাউণ্ড মাংস না আদায় করে সে ছাড়বে না এই তো? অনেকে, বিশেষ করে ফ্রান্স, - রব তুললেন, কেন, আমেরিকার কাছ থেকে যে টাকা আমরা ধার করেছিলাম সে তো যুদ্ধের জন্যই খরচ করা হয়েছে, যুদ্ধটা আমাদের সকলেরই ব্যপার, আমেরিকারও তাতে ভাগ ছিল। কাজেই এখন সেটাকে একটা সাধারণ দেনা বলে মনে করা আমেরিকার মোটেই উচিত হয় না। ওদিকে আবার, যুদ্ধের পরে ইউরোপে যে নিদারুণ রেষারেষি আর চক্রান্ত-ষড়ষন্ত্রের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল তার রকম দেখে আমেরিকাও অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে উঠল। সে দেখল, ফ্রান্স ইংলণ্ড ইতালি তখনও তাদের সেনাবাহিনী আর নৌবাহিনীর পিছনে অজস্র টাকা ঢেলে চলেছে; কতকগুলো ছোটো ছোটো দেশকেও অস্ত্রসজ্জা করবার জন্য টাকা ধার দিচ্ছে। তা, অস্ত্রসজ্জা করবার বেলায় যদি এত টাকাই ইউরোপের এই দেশদের থেকে থাকে, তবে আমেরিকাই বা এদের কাছে তার যা প্রাপ্য আছে সেটা ছেড়ে দেবে কিসের খাতিরে? আর ছেড়ে যদি দেয়, তবে তো সে টাকাটাও নিশ্চয়ই যাবে এদের অস্ত্রসজ্জার তহবিলে। এই হল আমেরিকার যুক্তি; অতএব সেও পণ ক’রে রইল, তার পাওনা টাকা সে আদায় করবেই।

 ক্ষতিপূরণের টাকার মতো, যুদ্ধ-ঋণের এই টাকাও শোধ করে দেওয়া এমনিতেই খুব কঠিন ছিল। আন্তর্জাতিক ঋণ শোধ হতে পারে নগদ সোনা দিয়ে, বা মালপত্র এবং কাজ (যেমন যানবাহন, জাহাজ চলাচল ইত্যাদি বহু রকমের কাজ) দিয়ে। এই বিরাট পরিমাণ টাকা শুধু সোনা দিয়ে মিটিয়ে দেওয়া তো একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার; অত সোনা জুটবে কোথা থেকে। তার উপর আবার ক্ষতিপূরণ এবং যুদ্ধ-ঋণ দুটোর বেলাতেই জিনিসপত্র বা কাজ দিয়ে দেনা শোধ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল; কি আমেরিকা কি ইউরোপের দেশরা, সকলেই তখন প্রকাণ্ড উঁচু উঁচু বাণিজ্য-শুল্কের প্রাচীর তুলে বসে আছে, সে পাঁচিল ডিঙিয়ে বিদেশী মালপত্র ঢোকবারই পথ নেই। এর ফলে একটা অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি হল; দেনা শোধের আসল মুশকিল হল এইখানেই। অথচ এই অবস্থাতেও কোনো দেশই তার শুল্ক-প্রাচীর এতটুকু নিচু করতে বা তার প্রাপ্য টাকা বাবদ মালপত্র নিতে রাজি হল না; সে করতে গেলে তার নিজের দেশের শিল্পের ক্ষতি হবে। অদ্ভূত একটা দুষ্ট-চক্র।

 অবশ্য একমাত্র ইউরোপের দেশরাই যে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে টাকা ধারত, এমন নয়। আমেরিকার ব্যাঙ্কাররা এবং ব্যবসায়ীরা কানাডা এবং লাতিন আমেরিকাতেও (তার মানে দক্ষিণ এবং মধ্য-আমেরিকা এবং মেক্সিকো) বিপুল পরিমাণ টাকা লগ্নী করেছিল। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আধুনিক শিল্প এবং কল-কারখানার শক্তির দাপট দেখে লাতিন আমেরিকার এই দেশগুলি একেবারে মোহিত হয়ে গিয়েছিল। অতএব তারা প্রাণপণ করে তাদের শিল্প প্রচেষ্টা বাড়িয়ে তুলতে লেগে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের টাকার অভাব নেই, সেখান থেকে হুড়হুড় করে টাকা আসতে লাগল। এরা ক্রমে এত টাকা ধার করে বসল, যে তার দরুন সুদ মিটিয়ে দেওয়াই তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল; লাতিন আমেরিকাতে বহু ডিক্‌টেটর গজিয়ে উঠল। আমেরিকা থেকে যতক্ষণ টাকা ধার পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ এদের অসুবিধার কিছুই ছিল না; ঠিক যেমন জর্মনিকে যতদিন আমেরিকা ধার দিয়ে দিয়ে চলছিল ততদিন সুবিধাই ছিল। তার পর একদিন আমেরিকা লাতিন আমেরিকাকে টাকা ধার দেওয়া বন্ধ করল; সঙ্গে সন্ধ্যে ইউরোপের মতো সেখানেও ভাঙনের হিড়িক পড়ে গেল।

 লাতিন আমেরিকাকে কী পরিমাণ টাকা আমেরিকা ধার দিচ্ছিল এবং তার পরিমাণ কীরকম দ্রুতগতিতে বেড়ে উঠছিল, দুটি অঙ্ক দিয়ে তোমাকে সেটা একটুখানি বুঝিয়ে দিচ্ছি। ১৯২৬ সনে এই টাকার মোট পরিমাণ ছিল ৪,২৫,০০,০০,০০০ ডলার। ঠিক তিন বছর পরে, ১৯২৯ সনে এর পরিমাণ দাঁড়াল ৫,৫০,০০,০০,০০০ ডলারেরও বেশি।

 অতএব যুদ্ধ-পরবর্তী এই কটি বছর আমেরিকাই ছিল সমস্ত পৃথিবীর মহাজন, তাতে সন্দেহ নেই। ধনী, সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ আমেরিকা—এত টাকা তখন তার হয়েছে যে টাকার ভারেই তার ফেটে পড়বার উপক্রম। পৃথিবীতে তখন তারই কর্তৃত্ব; ইউরোপের দিকে এবং তার চেয়েও বেশি করে এশিয়ার দিকে, সে অত্যন্ত অবজ্ঞার চোখে তাকাচ্ছে; তার দৃষ্টিতে এরা সেকেলে বুড়ো, জরাগ্রস্ত এবং কলহপরায়ণ, ভীমরতিতে পেয়েছে এদের। ১৯২০ সনের পর থেকে আমেরিকার সমৃদ্ধি ক্রমে চরমে উঠল; সে সময়ে তার কী পরিমাণ টাকা হয়েছিল তার একটা আন্দাজ তোমাকে দিচ্ছি। ১৯১২ সনে আমেরিকার মোট জাতীয় সম্পদের পরিমাণ ছিল ১,৮৭,২৩,৯০,০০,০০০ ডলার; পনর বছর পরে ১৯২৭ সনে এর পরিমাণ দাঁড়াল, ৪,০০,০০,০০,০০,০০০ ডলার। ১৯২৭ সনে তার লোকসংখ্যা ছিল ১১৭০ লক্ষের মতো; অতএব জনপ্রতি সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩,৪২৮ ডলার। এত তাড়াতাড়ি তার সমৃদ্ধি বেড়ে চলেছে যে এই-সব অঙ্ক প্রত্যেক বছরই বদলে যাচ্ছে। এর আগের একটি চিঠিতে ভারতবর্ষ এবং অন্যান্য দেশের বার্ষিক আয় তুলনা করে দেখিয়েছি, সে চিঠিতে আমি আমেরিকার ঘরের অঙ্কটা অনেক ছোটো বলে দেখিয়েছিলাম। কিন্তু সে অঙ্কটা ছিল বার্ষিক আয়ের অঙ্ক, মোট সম্পদের পরিমাণ নয়। তাছাড়া খুব সম্ভবত সে অঙ্কটাও এর আগের কোনো বছরের। ১৯২৭ সনের যে অঙ্কটা এখানে দেখালাম, সেটা, আমেরিকার প্রেসিডেণ্ট কুলিজ সাহেবের প্রদত্ত একটা বিবরণ থেকে তৈরি করা হয়েছে—১৯২৬ সনের নভেম্বর মাসে কুলিজ এই বিবরণ প্রকাশ করেন।

 আরও কয়েকটা অঙ্ক এই সঙ্গেই তোমাকে শুনিয়ে দিই। এর সবগুলোই ১৯২৭ সনের অঙ্ক। যুক্তরাষ্ট্রে মোট পরিবার ছিল— ২,৭০,০০,০০০। এদের যতগুলি ইলেট্রিক-আলোওয়ালা বাড়ি ছিল তার মোট সংখ্যা ১,৫৯,২৩,০০০। ১৭,৭৮০,০০০টি টেলিফোন চালু ছিল। মোটর গাড়ি ব্যবহার হত ১,৯২,৩৭,১৭১ খানা; সমস্ত পৃথিবীতে যত মোটরকার চলত এটা তার একশো ভাগের ৮১ ভাগ। পৃথিবীতে মোট যত মোটরগাড়ি সে বছর তৈরি হয়েছে, একা আমেরিকাতেই তৈরি হয়েছে তার শতকরা ৮৭ খানা; পৃথিবীতে মোট পেট্রোলিয়ামের মধ্যে শতকরা ৭১ ভাগ উৎপন্ন হয়েছে আমেরিকায়; যত কয়লা উৎপন্ন হয়েছে তার শতকরা ৪৩ ভাগ হয়েছে আমেরিকাতেই। অথচ আমেরিকাতে মোট যা লোক ছিল তার পরিমাণ ছিল পৃথিবীর লোকসংখ্যার শতকরা ৬ জন। অতএব সেখানে মানুষের জীবনযাত্রার সাধারণ মানটাই ছিল অত্যন্ত উঁচু। তবু কিন্তু যতখানি উঁচু সেটা হওয়া সম্ভব ছিল ততটা উঁচু নয়; কারণ বহু ধনই গিয়ে সঞ্চিত হচ্ছিল অল্প কয়েক হাজার লক্ষপতি এবং কোটিপতির হাতে। এই ‘বড় ব্যবসাদাররাই’ দেশটাকে শাসন করছিলেন। এঁরাই প্রেসিডেণ্টকে নির্বাচন করেন; এঁরাই আইন বানান; আবার এঁরাই বহু ক্ষেত্রে সে আইন ভেঙে থাকেন। এই বড়ো ব্যবসার ক্ষেত্রে অত্যন্তরকম দুর্নীতির রাজত্ব চলত; কিন্তু আমেরিকার লোকরা তা নিয়ে মাথা ঘামাত না—তারা মোটের উপর যতক্ষণ সুখস্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারছে ততক্ষণ তাদের কী যায় আসে।

 ১৯২০ সনের পরবর্তী কালে আমেরিকার যে সমৃদ্ধি দেখা গিয়েছে, তার সম্বন্ধে এই অঙ্কগুলো আমি তোমাকে শোনালাম দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে। তার প্রথমটি হচ্ছে, আধুনিক শিল্পপ্রধান সভ্যতার জোরে এই দেশটি যে প্রচণ্ড সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, তার সঙ্গে ভারতবর্ষ চীন প্রভৃতি শিল্প-বিমুখ পশ্চাৎপদ দেশদের তুলনা করে দেখানো। আরেকটা উদ্দেশ্য, এই সমৃদ্ধি এবং এর পরবর্তী কালে আবার সেই আমেরিকাতেই যে বিষম সংকট এবং ভাঙন দেখা গিয়েছে, এদের মধ্যে তুলনা করা। এই সংকটের কথা আমি তোমাকে পরে বলব।

 সংকট এল আরও পরে। ১৯২৯ সন পর্যন্ত সকলেই ভাবছিল, ইউরোপ আর এশিয়া যে দুর্গতিতে পড়েছে আমেরিকা বুঝি তার হাত এড়িয়েই যেতে পারল। পরাজিত দেশগুলোর অবস্থা তো নিতান্তই খারাপ হয়ে উঠেছিল। জর্মনির দৈন্য-দুর্দশার কথা আমি তোমাকে খানিকটা বলেছি। মধ্য-ইউরোপের অধিকাংশ ছোটো ছোটো দেশের, বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার অবস্থা হল তার চেয়েও বহু গুণে বেশি খারাপ। তার উপর আবার অস্ট্রিয়াতে মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছিল; পোল্যাণ্ডেও তাই। এদের দু জনকেই নিজেদের মুদ্রামান বদলে ফেলতে হল।

 কিন্তু দুর্দশা যে শুধু পরাজিত দেশগুলোরই হল, তা নয়। বিজয়ী দেশগুলোও ক্রমে ক্রমে এর আবর্তে এসে জড়িয়ে পড়ল। দেনাদার হয়ে থাকাটা ভালো কথা নয়, এটা চিরদিনেরই জানা কথা। এবারে একটা নূতন এবং অদ্ভুত জ্ঞান এরা লাভ করল: পাওনাদার হওয়াটাও বিশেষ সুখের কথা নয়। জর্মনির কাছ থেকে এই বিজয়ী দেশদের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রাপ্য ছিল; এই ক্ষতিপুরণকে উপলক্ষ্য করেই এদের বিষম বিপদ উপস্থিত হল; আবার সে ক্ষতিপূরণের টাকা পাবার ফলেই এরা আরও বেশি করে বিপন্ন হয়ে পড়ল। তার কাহিনী আমি তোমাকে পরের চিঠিতে বলছি।