বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/পূর্ব-এশিয়ায় ইউরোপের লোলুপ হস্ত

উইকিসংকলন থেকে

৭৯

পূর্ব-এশিয়ায় ইউরোপের লোলুপ হস্ত

১৯শে জুলাই, ১৯৩২

 আমার গত চিঠি শেষ করেছিলাম মালয়েশিয়ার পর্তুগীজদের আগমন দিয়ে। জলপথের আবিষ্কার এবং পর্তুগীজ ও স্পেনীয়দের মধ্যে সুদূর প্রাচ্যে আগে পৌঁছনোর যে প্রতিযোগিতা চলছিল সে সম্বন্ধে কয়েকদিন আগেই বলেছি। পর্তুগাল গেল পূর্বদিকে; স্পেন পশ্চিমে। পর্তুগাল আফ্রিকা ঘুরে ভারতে পৌঁছতে সমর্থ হল। স্পেন ভ্রমক্রমে আমেরিকায় পোঁছে গেল, এবং পরবর্তীকালে দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে মালয়েশিয়ার এসে পড়ল। আমরা এইসব বিচ্ছিন্ন সূত্রকে একত্রিত করে মালয়েশিয়ার কাহিনী বলে যেতে পারি।

 মশলা (মরিচ ইত্যাদি) জাতীয় জিনিষগুলি, তুমি বোধহয় জানো, বিষুবরেখার নিকটবর্তী গরম দেশে উৎপন্ন হয়, ইউরোপে এসব মোটেই হয় না। দক্ষিণ ভারত ও সিংহলে কিছু কিছু হয়। কিন্তু এসব মশলার বেশির ভাগই আসত মালাক্কা-নামধেয় মালয়েশীয় দ্বীপপুঞ্জে থেকে। এসব দ্বীপগুলি স্পাইস্ আইলাণ্ডস্ অথবা মশলা-দ্বীপপুঞ্জ নামেই পরিচিত। অতি প্রাচীন যুগ থেকে ইউরোপে এসব মশলার খুব বেশি চাহিদা ছিল, এবং এসব সেখানে নিয়মিত প্রেরিত হত। ইউরোপে পৌঁছনোর পরে এসব জিনিষ খুব দুর্মূল্য সামগ্রী হয়ে দাঁড়াত। রোমক যুগে মরিচ ছিল ওজনদরে সোনার সমান। যদিও ইউরোপে মশলার এত দাম ও চাহিদা ছিল, ইউরোপ নিজে সেসব জোগাড় করার কোনো চেষ্টা করে নি। বহুকাল যাবত এ ব্যবসা ছিল ভারতীয়দের হাতে, তার পরে আসে আরবদের হাতে। এই মশলার লোভই পর্তুগীজ ও স্পেনীয়দের পৃথিবীর দুই বিপরীত প্রান্তে আকৃষ্ট করেছিল; অবশেষে তাদের সাক্ষাৎ হল মালয়েশিয়ায়। স্পেন যখন প্রাচ্যের পথে আমেরিকায় গিয়ে বিশেষ লাভজনক কাজে বাস্ত ছিল, পর্তুগীজরা ততদিনে তাদের অনুসন্ধানে খানিকদূর অগ্রসর হয়ে গেছে।

 উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভাস্কো-ডা-গামার ভারত-আগমনের অনতিকাল পরে বহু পর্তুগীজ জাহাজ সেই পথে এল, এবং আরও পূর্বদিকে এগিয়ে গেল। ঠিক সেই সময়ে মালাক্কার নূতন সাম্রাজ্য মশলা ও অন্যান্য বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত করছে। সুতরাং অবিলম্বে পর্তুগীজদের সাথে এদের এবং মোটামটি সব আরব বণিকেরই বিরোধ বেধে গেল। পর্তুগীজদের রাজপ্রতিনিধি আলবুকার্ক ১৫১১ সালে মালাক্কা অধিকার করে মুসলমান-বাণিজ্যের সমাপ্তি ঘটালেন। এখন পর্তুগীজরাই ইউরোপীয় বাণিজ্যের ভার পেল, এবং তাদের রাজধানী লিসবন ইউরোপে মশলা এবং অন্যান্য প্রাচ্য-সামগ্রী সরবরাহ করার প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াল।

 এখানে লক্ষ্য করা দরকার যে যদিও আলবুকার্ক আরবদের নির্মম শত্রু ছিলেন, তিনি প্রাচ্যের অন্যান্য বণিকজাতির সঙ্গে বন্ধু ভাবাপন্ন হওয়ার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে যেসব চীনার সংস্পর্শে তিনি আসতেন, সকলকেই বিশেষ সৌজন্য দেখাতেন, এবং তার ফলে চীনে পর্তুগীজদের সম্বন্ধে অনুকূলে সংবাদ পৌঁছল। আরবদের প্রতি শত্রুতার কারণ ছিল সম্ভবত প্রাচ্য বাণিজ্যে তাদের প্রধান স্থান।

 ইতিমধ্যে স্পাইস্ আইল্যাণ্ড্‌সের অনুসন্ধান চলল, এবং ম্যাগেলান্ যিনি পরবর্তীকালে প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম এবং পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিলেন, মালাক্কাদ্বীপুঞ্জ আবিষ্কারকারী অভিযানের একজন ছিলেন। ষাট বছরেরও বেশি কাল ইউরোপে মশলার ব্যবসায়ে পর্তুগীজদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। তার পরে ১৫৬৫ সালে স্পেন ফিলিপাইন-দ্বীপপুঞ্জ অধিকার করল এবং এইরূপে প্রাচ্যসমুদ্রে দ্বিতীয় ইউরোপীয় শক্তির আবির্ভাব হল। কিন্তু স্পেনের আগমনে পর্তুগীজ বাণিজ্যের বিশেষ ক্ষতিবৃদ্ধি হল না, কারণ স্পেনীয়রা প্রধানত বণিকজাতি ছিল না। তারা প্রাচ্যদেশে সেনাবাহিনী ও মিশনারি পাঠিয়েছিল। ইতিমধ্যে পর্তুগাল মশলা ব্যবসায় এতদূর স্বায়ত্ত করে ফেলেছিল যে, পারশ্য এবং মিশর পর্যন্ত মশলার জন্য পর্তুগীজদের মুখাপেক্ষী ছিল। পর্তুগীজরা অপর কাউকে সরাসরি মশলা দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে বাণিজ্য পর্যন্ত করতে দিত না। এইরূপে পর্তুগালের সমৃদ্ধি বাড়ল, কিন্তু উপনিবেশ প্রসারের কোনো চেষ্টা তারা করে নি। তুমি জানো, পর্তুগাল দেশটা ছোটো এবং বিদেশে পাঠানোর মতো জনবল তার ছিল না। এক শো বছর ধরে সম্পূর্ণ ষোড়শ শতাব্দী যাবৎ—প্রাচ্যে এই ক্ষুদ্র দেশটি যা করেছিল তাই যথেষ্ট বিস্ময়কর।

 স্পেনীয়রা ফিলিপাইন-দ্বীপপুঞ্জ আঁকড়ে ধরে থাকল, এবং এদের থেকে যতদূর সম্ভব টাকা করা যায় তার চেষ্টা দেখতে লাগল। কর আদায় ছাড়া আর বিশেষ কিছু তারা করে নি। প্রাচ্যসমুদ্রে বিরোধ এড়ানোর জন্যে তারা পর্তুগীজদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করল। স্পেনীয় সরকার ফিলিপাইন—দ্বীপপুঞ্জকে স্পেনাধিকৃত আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করতে দিত না, পাছে মেক্সিকো ও পেরুর সোনা ও রুপো পূর্ব দেশে চলে যায়। বছরে মাত্র একখানা জাহাজ সেখানে গিরে ফিরে আসত। এর নাম ছিল ‘ম্যানিলা গ্যালিয়ন’, এবং কল্পনা করে দেখো, ফিলিপাইনস্থিত স্পেনীয়রা কী অধীর আগ্রহে এই বার্ষিক আগমনের প্রতীক্ষা করত। ২৪০ বছর ধরে এই ‘ম্যানিলা গ্যালিয়ন’ দ্বীপপুঞ্জ ও আমেরিকার মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করেছিল।

 স্পেন ও পর্তুগালের এই সাফল্য দেখে ইউরোপের অন্যান্য জাতি ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরছিল। পরে দেখতে পাবে, এই সময়ে সারা ইউরোপের উপরে স্পেনের প্রাধান্য। ইংলণ্ড ধরতে গেলে প্রথম শ্রেণীর শক্তিই ছিল না।

 নেদারল্যাণ্ড্‌সে, অর্থাৎ হল্যাণ্ড ও বেলজিয়ামের কিছু অংশে, স্পেনীয় প্রভুত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটেছিল। ওলন্দাজদের উপরে সহানভূতি এবং স্পেনের প্রতি ঈর্ষা-বশত ইংরেজরা গোপনে হল্যাণ্ডকে সাহায্য করেছিল। তাদের কোনো কোনো নাবিক মাঝ-সমুদ্রে যা করে বেড়াচ্ছিল, তাকে জলদস্যু বৃত্তি ছাড়া আর কিছু বলা চলে না; তাদের কাজ ছিল আমেরিকা থেকে আগত স্পেনীয় ধনপূর্ণ জাহাজ অধিকার করা। এই বিপজ্জনক কিন্তু লাভের ব্যবসায়ে নিযুক্ত ছিলেন সার ফ্রান্সিস ড্রেক, আর তাঁর ভাষায় এ কাজটা ছিল স্পেনের রাজার দাড়িতে ছ্যাঁকা দেওয়া।

 ১৫৭৭ সালে ড্রেক পাঁচটা জাহাজ নিয়ে রওনা হলেন স্পেনীয় উপনিবেশসমূহ লুণ্ঠন করার অভিপ্রায়ে। আক্রমণে সফল তিনি হলেন, কিন্তু চারটি জাহাজ হারালেন। একটি মাত্র জাহাজ—‘গোল্ডেন হিন্দ্’—প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছল, এবং এতে করে ড্রেক উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ইংলণ্ডে ফিরে এলেন। এইভাবে তিনি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করলেন, এবং ‘গোল্ডেন হিন্দ্’ হল এই অভিযানে দ্বিতীয় পোত। প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ম্যাগেলানের ‘ভিটোরিয়া’। প্রদক্ষিণে সময় লেগেছিল তিন বছর।

 স্পেনের রাজার দাড়িতে ছ্যাঁকা দেওয়া বেশি দিন ধরে চললে গোলযোগ অবশ্যম্ভাবী, এবং শীঘ্রই ইংলণ্ড ও স্পেনে যুদ্ধ বাধল। ওলন্দাজরা আগে থেকেই স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। পর্তুগালও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, কারণ কয়েক বৎসর ধরে স্পেন পর্তুগালের রাজা ছিলেন একই ব্যক্তি। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও বেশ একটু কপালজোরে সারা ইউরোপকে বিস্মিত করে ইংলণ্ড জয়ী হল। ব্রিটেন-অধিকারের জন্যে প্রেরিত ‘অজেয় আর্মাডা’ ধ্বংস হল, তোমার বোধহয় মনে আছে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের আলোচ্য বিষয় হল প্রাচ্য।

 ইংরেজ এবং ওলন্দাজ, দুই দলই সুদূর প্রাচ্যে অভিযান করে স্পেনীয় ও পর্তুগীজদের আক্রমণ করেছিল। স্পেনীয়রা সকলে ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে কেন্দ্রীভূত ছিল, ফলে তাদের পক্ষে দেশরক্ষা সোজা হল। কিন্তু পর্তুগীজদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়াল। তাদের প্রাচ্য সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল ৬০০০ মাইল, লোহিত সাগর থেকে মালাক্কা, অর্থাৎ মশলা-দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত। এডেনের কাছে, পারশ্য-উপসাগরে সিংহলে, ভারতের তটভূমির বহু স্থানে, এবং প্রাচ্য-দ্বীপপুঞ্জের সর্বত্র ও মালয় উপদ্বীপে তারা প্রতিষ্ঠিত ছিল। ক্রমে তারা তাদের প্রাচ্যসাম্রাজ্য হারাল; নগরের পর নগর, উপনিবেশের পর উপনিবেশ, ইংরেজ অথবা ওলন্দাজদের করায়ত্ত হল। এমনকি মালাক্কারও পতন ঘটল ১৬৪১ সালে। বাকি থাকল শত্রু ভারত এবং আর দুই-একটি জায়গায় কয়টি ক্ষুদ্র বসতি। পশ্চিম-ভারতে গোয়া এদের মধ্যে প্রধান; পর্তুগীজরা এখনও সেখানে আছে, এবং কয়েক বৎসর আগে যে পর্তুগীজ সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, এটা তার একটি অংশ। মহাপরাক্রমশালী আকবর পর্তুগীজদের কাছ থেকে গোয়া অধিকার করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনিও পারেন নি।

 এমনি করে পর্তুগাল প্রাচ্য ইতিহাস থেকে বিদায় নিল। এই ক্ষুদ্র দেশটি বহু দেশ গ্রাস করার জন্যে যে অস্বাভাবিক চেষ্টা করেছিল, তার ফলেই তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল। এর পরেও স্পেন ফিলিপাইন দখল করে রইল, প্রাচ্য রাজনীতিতে বিশেষ কোনো ভূমিকা গ্রহণ না করে। লাভজনক প্রাচ্যবাণিজ্য এবারে হল্যাণ্ড ও ইংলণ্ডের হস্তগত হল। এই দুটি দেশেই ব্যবসায়ীসংঘ গঠন করে এই চেষ্টার অনেকখানি কাজ সেরে রাখা হয়েছিল। ইংলণ্ডে ১৬০০ সালে রাজ্ঞী এলিজাবেথ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে এক সনদ দিয়েছিলেন। দু বছর পরে ওলন্দাজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হল। দুটি কোম্পানিই ছিল কেবল বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। তারা ছিল ব্যক্তিগত কোম্পানি, কিন্তু প্রায়ই রাষ্ট্রের সহায়তা পেত। তাদের আগ্রহ ছিল মালয়েশিয়ার মশলা-ব্যবসায়ের সম্বন্ধে। ভারতবর্ষে তখন মোগল সম্রাটদের বিপুল বিক্রম, এবং তাদের চটানো খুব নিরাপদ ছিল না।

 ওলন্দাজ এবং ইংরেজরা প্রায়ই পরস্পরের মধ্যে কলহ করত, এবং অবশেষে ইংরেজরা স্পাইস্ আইল্যাণ্ড্‌স্ থেকে সরে ভারতের দিকে বেশি মনোযোগ দিল। পরাক্রান্ত মোগলসাম্রাজ্য তখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, এবং তার সুযোগ নিয়ে বৈদেশিক ভাগ্যান্বেষীদের অগমন ঘটল। পরে দেখবে, কেমন করে ইংলণ্ড ও ফ্রান্স থেকে আগত এইসব ভাগ্যান্বেষী ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের অংশ নিজেদের অধিকারভুক্ত করার জন্যে বড়যন্ত্র ও যুদ্ধবিগ্রহ করেছিল।