বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/প্যালেস্টাইন ও ট্রান্স-জর্ডন

উইকিসংকলন থেকে

১৬৭

প্যালেস্টাইন ও ট্রান্স-জর্ডন

২৯শে মে, ১৯৩৩

 সিরিয়ার পাশেই প্যালেস্টাইন, এর উপরে লীগ অব নেশন্‌সের নির্দেশে ব্রিটিশ সরকার একটা ম্যান্‌ডেট পেয়েছে। সিরিয়ার চেয়েও ছোটো এই দেশটি, এর মোট লোকসংখ্যা দশ লক্ষেরও কম। তবু মানুষের চোখে এর বিরাট প্রতিষ্ঠা, তার কারণ এর গৌরবময় অতীত ইতিহাস এবং কাহিনী। ইহুদি এবং খৃষ্টান দুই সম্প্রদায়েরই এটা তীর্থস্থান, খানিক পরিমাণে মুসলমানদেরও। এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে মুসলমান আরব; এরা স্বাধীন হতে এবং সিরিয়াতে যে আরব মুসলমানরা রয়েছে তাদের সঙ্গে একত্র মিলিত হয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু ব্রিটিশের কূটনীতির ফলে এখানেও একটি বিশেষ ধরনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ঘটিত সমস্যা গজিয়ে উঠেছে, সে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মানে ইহুদিরা। ইহুদিরা ব্রিটিশের পক্ষে, প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা অর্জনে তারা প্রাণপণে বাধা দিচ্ছে—তাদের ভয় স্বাধীন হলেই দেশে আরবদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। দুটি জাতের ধরনধারনে মিল নেই, তাই ঝগড়াবিবাদও এদের মধ্যে লেগেই আছে। আরবরা সংখ্যায় বেশি, ইহুদিদের ধনসম্পদ বেশি, তার উপরে তাদের পিছনে রয়েছে ইহুদি জাতের বিশ্বজোড়া সংগঠন। অতএব ইংলণ্ড আরবদের জাতীয়তাবাদকে রুখবার অস্ত্র হিসাবে খাড়া করে দিয়েছে ইহুদিদের ধর্মগত জাতীয়তাবাদকে; দিয়ে এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে যেন এদের দু’য়ের মধ্যে সদ্‌ভাব বজায় রাখবার এবং দেশে শান্তি রক্ষা করবার জন্যই তাদের এখানে থাকা প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদীদের অধীন অন্যান্য সব দেশেও এই পুরোনো খেলা আমরা দেখেছি; কত রূপে কতবার যে এর পুনরাবৃত্তি তারা করেছে, সে এক আশ্চর্য ব্যাপার।

 অদ্ভূত জাত এই ইহুদিরা। গোড়াতে এরা ছিল প্যালেস্টাইনের বাসিন্দা ছোটো একটি উপজাতি, বা কয়েকটি উপজাতির সমষ্টি। বাইবেলের ওল্ড্ টেস্টামেণ্টে এদের প্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায়। এদের ধারণা—এরাই হচ্ছে ঈশ্বরের প্রিয় জাতি; সেদিক থেকে এদের মনে একটু অহংকারও আছে। কিন্তু সে অহংকার পৃথিবীর সকল জাতিই কখনও না কখনও করেছে। বহুবার বহু বিজেতার হাতে এরা পরাজিত হয়েছে, তাদের পদানত হয়েছে, দাসে পরিণত হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় যে-সব অত্যন্ত সুন্দর এবং করুণ কবিতা আছে তার কতকগুলো হচ্ছে এই ইহুদিদেরই গান এবং বিলাপ অবলম্বন করে লেখা। বাইবেলের যে অনুবাদটি প্রচলিত, তার মধ্যেই এই-সব গান আর বিলাপোক্তি পাওয়া যায়। মূল হিব্রু ভাষাতেও বোধ হয় এই কবিতাগুলি ঠিক এই রকমই বা এর চেয়েও সুন্দর। একটি গান (Psalms) থেকে অল্প ক’টিমাত্র ছত্র আমি তোমাকে শুনিয়ে দিচ্ছি:

বাবিলনের সেই উপকূলে বসে বসে আমরা কাঁদতে লাগলাম,
তোমার কথা মনে পড়ে, হে সিয়ন।
আমাদের বীণাগুলোকে আমরা ঝুলিয়ে রেখে দিলাম,
সেখানে যে গাছগুলো ছিল তাদের শাখায়।

আমাদের যারা বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছিল, তারা আদেশ করল,
গান গাইতে হবে, সুর সৃষ্টি করতে হবে,
আমাদের সেই দুঃখকে নিয়ে—
বলল, “সিয়নের গান একটি আমাদের গেয়ে শোনাও!”
কিন্তু প্রভুর সেই গান, তাকে কী করে আমরা গাইব,
সেই অপরিচিত বিদেশের ভূমিতে?
তোমাকে যদি কখনও ভুলে যাই, হে জেরুজালেম,
সেদিন আমার দক্ষিণ হস্ত যেন ভুলে যায় তার শিল্পচাতুর্য,
তোমার কথা যদি কোনোদিন বিস্মৃত হই, আমার জিহ্বা
যেন আবদ্ধ হয়ে যায় আমার মুখের তালুর সঙ্গে;
হ্যাঁ, তাই যেন ঘটে, যদি আনন্দের মুহূর্তেও
জেরুজালেমই আমার মনে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে না জেগে থাকে।

 শেষ পর্যন্ত এই ইহুদিরা সমস্ত পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ল। দেশ বা জাতি বলতে এদের কিছু ছিল না; যেখানে যেত সেইখানেই লোকেরা এদের জেনে নিত বিদেশী বলে, অবাঞ্ছিত আগন্তুক বলে। শহরের মধ্যে বিশেষ বিশেষ নির্দিষ্ট অঞ্চলে এদের বাস করতে হত, অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে, যেন এদের সঙ্গে মিশে অন্যরা কলুষিত না হয়। এই অঞ্চলগুলিকে বলা হত ‘ঘেটো’। অনেকসময়ে এদের বিশেষ একরকমের পোশাক পরে চলাফেরা করতে হত। অন্যরা এদের অপমান করত, গালাগাল করত, নির্যাতন করত এবং নৃশংসভাবে হত্যা করত; ‘ইহুদি’ এই কথাটাই হয়ে উঠল একটা গালাগালের ভাষা, তার মানে কৃপণ এবং অর্থ পিশাচ মহাজন। অথচ এত সমস্ত অত্যাচার সহ্য করেও এই আশ্চর্য জাতিটা বেঁচে রইল; বেঁচে রইল শুধু নয়, তাদের নিজস্ব জাতিগত সংস্কৃতিগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে সুদ্ধ বাঁচিয়ে রাখল; বিপুল ধনসম্পত্তির সমৃদ্ধি অর্জন করল, এবং অসংখ্য মহামানবের জন্ম হল এদের মধ্য থেকে। আজকের দিনে বৈজ্ঞানিক, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, মহাজন, ব্যবসাদার হিসাবে এরাই পৃথিবীর শীর্ষ স্থান অধিকার করে বসে আছে; সমাজতন্ত্রবাদ আর সাম্যবাদের সবচেয়ে বড়ো নেতা যাঁরা তাঁরাও ছিলেন ইহুদি। এদের মধ্যে অধিকাংশই অবশ্য অতি দরিদ্র; পূর্ব ইউরোপের শহরগুলোতে এরা গাদাগাদি হয়ে বাস করছে, থেকে থেকেই এদের উপরে একটা করে ‘পোগ্রোম’ বা হত্যামহোৎসবও চলছে। এই গৃহহীন দেশহীন মানুষের জাত, বিশেষ করে এদের মধ্যে যারা গরীব তারা, কোনোদিনই তাদের সেই পুরোনো দিনের স্বপ্নকে ভুলে যায় নি; আজও তারা জেরুজালেমের স্বপ্ন দেখছে—তাদের কল্পনার সে জেরুজালেম, এত বড়ো এত তার জাঁকজমক, সত্যিকার জেরুজালেমের তা কোনোদিন নেই। জেরুজালেমকে তারা নাম দিয়েছে সিয়ন বা জিয়ন; তার মানে একটা প্রতিশ্রুত দেশবিশেষ—জিয়নিজ্‌ম্ মানেই হচ্ছে সেই অতীত দিনের আহ্বান, তার টানে আজও তারা জেরুজালেম এবং প্যালেস্টাইনের প্রতি সারাক্ষণ আকৃষ্ট হচ্ছে।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এই জিয়ন-বাদী আন্দোলন ক্রমে ক্রমে রূপ পরিগ্রহ করে দাঁড়াল একটা উপনিবেশ স্থাপনের আন্দোলনে; বহু ইহুদি প্যালেস্টাইনে চলে গিয়ে সেখানে বাসা বাঁধল। হিব্রু ভাষাটাকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলা হল। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সেনা প্যালেস্টাইন আক্রমণ করল। জেরুজালেমে যখন তারা গিয়ে প্রবেশ করছে এমন সময়ে, ১৯১৭ সনের নভেম্বর মাসে, ব্রিটিশ সরকার একটি ঘোষণা প্রচার করলেন, এর নাম দেওয়া হয়েছে ব্যালফোর ঘোষণা। এই ঘোষণাতে বলা হল, প্যালেস্টাইনে “ইহুদিদের একটি জাতীয় বাসস্থান” প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়াই ব্রিটিশ সরকারের অভিপ্রায়। পৃথিবীর সর্বত্র যে ইহুদিরা ছড়িয়ে রয়েছে তাদের সকলের সম্প্রীতি লাভ করাই সম্ভবত ছিল এই ঘোষণার উদ্দেশ্য; টাকাকড়ির ব্যাপারের দিক থেকে এর গুরুত্বও ছিল অনেকখানি। ইহুদিরা এই ঘোষণা শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হল। কিন্তু একটুখানি ছোট্টো ত্রুটি এর মধ্যে ছিল; ব্যাপারটা খুব ছোটো নয়, তবু মনে হল কী করে সেটি সকলের চোখ এড়িয়ে গেছে। সেটি হচ্ছে: প্যালেস্টাইন দেশটা নির্জন প্রান্তর নয়, জনশূন্য প্রজাশূন্য দেশ নয়। সে দেশে তার আগে থেকেই মানুষের বাস ছিল। অতএব ব্রিটিশ সরকার ইহুদিদের প্রতি এই যে মহৎ উদারতার ভাব দেখালেন, আসলে সেটা করা হল প্যালেস্টাইনে আগে থেকেই যেসব লোকের বাস ছিল তাদের ঘাড় ভেঙে। এদের মধ্যে আরব ছিল, অনারব ছিল; মুসলমান ছিল, খৃষ্টান ছিল। এরা সকলেই, মানে ইহুদি ছাড়া বস্তুত আর সকলেই, এই ঘোষণাবাক্যের তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করল। সমস্যাটা আসলে ছিল অর্থনৈতিক। এই লোকগুলো বুঝল, নবাগত ইহুদিরা এবার সমস্ত কাজেকর্মেই এদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে। ইহুদিদের পিছনে রয়েছে বিপুল ধনবল, অতএব অচিরাৎ তারাই হয়ে উঠবে সমস্ত দেশটার মালিক। তাদের মধ্যে থেকে ইহুদিরা খাদ্য কেড়ে নিয়ে যাবে, কৃষকদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে জমি—এই ভয়ে তারা অধীর হয়ে উঠল।

 প্যালেস্টাইনের গত বারো বছরের ইতিহাস, আরব আর ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষের কাহিনীতে ভরা। ব্রিটিশ সরকার প্রয়োজন বুঝে একবার এদের পক্ষ নিয়েছে, একবার ওদের পক্ষ নিয়েছে; তবে সাধারণত তারা ইহুদিদেরই পক্ষে। দেশটার প্রতি এমন ব্যবহার দেখানো হচ্ছে যেন সে একটা ব্রিটিশ উপনিবেশ মাত্র, তার স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কিছুমাত্র নেই। আরবরা স্বায়ত্তশাসন এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করছে; খৃষ্টানরা এবং অন্যান্য জাতিগুলোও তাদের পক্ষে রয়েছে। ম্যান্‌ডেট্ সম্বন্ধে এরা তাঁর আপত্তি জানিয়েছে; বাইরে থেকে আরও নূতন লোক আমদানি সম্বন্ধেও এদের আপত্তি, বলছে—আরও লোকের মতো জায়গা দেশে নেই। বাইরে থেকে জলস্রোতের মতো আগন্তুক ইহুদিরা দেশে এসে হাজির হচ্ছে দেখে তাদের ভয় এবং ক্রোধ আরও বেড়ে গেছে। এরা (আরবরা) খোলাখুলিই বলছে, “জিয়নিজ্‌ম্‌ হচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহকারী বন্ধু। জিয়নিস্ট নেতাদের মধ্যে যাঁরা দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাঁরাও বরাবরই বলে আসছেন, ইহুদিদের একটা শক্তিশালী জাতীয় বাসস্থান যদি তৈরি করে দেওয়া হয়, সেটা হবে ইংরেজদের অতি বৃহৎ সহায়,—ভারতবর্ষে আসবার পথটাকে সেই পাহারা দিয়ে রাখবে, কারণ আরবদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনা এবং কামনা দেখা দিয়েছে, সে হবে তাকে ব্যাহত করবার অস্ত্র।” অতর্কিতে এক-একটা জায়গাতে ভারতবর্ষের নাম কেমন করে গজিয়ে ওঠে—দেখেছ!

 আরবদের কংগ্রেস স্থির করলেন, ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে তাঁরা অসহযোগিতা অবলম্বন করবেন; ব্রিটিশরা একটা ব্যবস্থা-পরিষৎ খাড়া করবার চেষ্টায় ছিল, তার দরুন নির্বাচনটাকেই তাঁরা বয়কট করবেন। এই বয়কট অত্যন্ত সুষ্ঠু এবং সম্পূর্ণ হল, পরিষৎ মোটে তৈরিই করা গেল না। কয়েক বছর ধরে একটা অসহযোগের নীতি এঁরা চালিয়ে গেলেন। তার পর সে আন্দোলনে কিছু মন্দা পড়ল; দু-একটা দল ব্রিটিশের সঙ্গে খানিকটা সহযোগিতা শরু করল। কিন্তু তখনও নির্বাচিত পরিষৎ তৈরি করবার সামর্থ্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের হল না; হাই কমিশনার স্বয়ংই সর্বশক্তিমান সুলতানস্বরূপ হয়ে শাসন করতে লাগলেন।

 ১৯২৮ সনে আরবদের বিভিন্ন দল আবার আরব কংগ্রেসের মধ্যে এসে একত্র হল; ‘জনগণের স্বাভাবিক অধিকারের বলেই’ একটি গণতান্ত্রিক পার্লামেণ্টী শাসন প্রথার প্রতিষ্ঠা দাবি করল। নির্ভীকতার আরও বেশি পরিচয় দিল তারা একটি কথা বলে—“যে স্বৈরতন্ত্রী ঔপনিবেশিক শাসন বর্তমানে চালানো হচ্ছে, প্যালেস্টাইনের লোকেরা তা সহ্য করে চলতে পারে না, আর সহ্য করে চলবে না।” আরবদের জাতীয়তাবাদের এই নূতন উচ্চানসটির মধ্যে একটা বড়ো লক্ষ্য করবার জিনিস আছে; এরা অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর প্রতি অনেকখানি নজর দিয়েছে। এই বস্তুটা যেখানে দেখা যায়, সেইখানেই বুঝতে হবে, বাস্তব অবস্থার স্বরূপ সম্বন্ধে মানুষের চোখ ফুটেছে।

 ১৯২৯ সনের আগস্ট মাসে আরব এবং ইহুদিদের মধ্যে কতকগুলো খুব বড়ো বড়ো দাঙ্গা-হাঙ্গামা হল। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে, ইহুদিদের সংখ্যা এবং ধনসম্পদ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে দেখে আরবদের ক্রোধ এবং ভয় বেড়ে উঠেছিল, তা ছাড়া আরবরা যে স্বাধীনতার দাবি তুলেছে ইহুদিরা তাতে বাধা দিচ্ছিল। কিন্তু উপস্থিত যা নিয়ে হাঙ্গামা বাধল, সে হচ্ছে একটা বিশেষ বস্তু নিয়ে বিবাদ, সেটাকে বলা হয় ‘আর্তনাদের প্রাচীর’। প্রাচীন কালে হেরডের মন্দির যে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল, এটা সেই পুরোনো প্রাচীরের একটা অংশ। কাজেই ইহুদিদের কাছে এটা একটা পবিত্র বস্তু: একদা তারা জাতিহিসাবে অতি বৃহৎ ছিল, এটাকে তারা সেই যুগেরই একটা স্মৃতিস্তম্ভ বলে মনে করে। পরবর্তীকালে আবার সেখানে একটা মসজিদ তৈরি হয়েছিল, এই প্রাচীরটাও তারই ইমারতের একটা অংশে পরিণত হয়েছিল। ইহুদিরা এই প্রাচীরের কাছে এসে তাদের প্রার্থনা এবং স্তবস্তোত্র পাঠ করে, বিশেষ করে তাদের বিলাপোক্তিগুলোকে খুব চেঁচিয়ে আবৃত্তি করে—তাই থেকেই এর নাম হয়েছে ‘আর্তনাদের প্রাচীর’। মুসলমানরা কাজেই এতে আপত্তি করে; তাদের অন্যতম অতি-বিখ্যাত মসজিদের একটা অংশে এইরকম কাণ্ড করলে তাদেরই বা সইবে কেন।

 দাঙ্গা-হাঙ্গামা দমন করা হল; তখনও অন্য নানা পথে সংগ্রাম চলতে লাগল। এর মধ্যে মজার ব্যাপার ছিল এই প্যালেস্টাইনে খৃষ্টানদের যতগুলি সম্প্রদায় ছিল সকলেই এই সংগ্রামে আরবদের পূর্ণ সমর্থন করতে লাগল। মুসলমান এবং খৃষ্টানরা একত্র হয়ে বড়ো বড়ো হরতাল আর শোভাযাত্রা করতে লাগল। মেয়েরা পর্যন্ত এই আন্দোলনে বড়ো একটা অংশ গ্রহণ করল। এই থেকেই বোঝা যায়, সত্যকার বিরোধ যেটা সেটা ধর্ম নিয়ে নয়, তা ছিল নূতন আগন্তুক আর পুরোনো অধিবাসীদের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে। ম্যানডেটের দ্বারা ব্রিটিশদের উপরে যে কর্তব্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সে কর্তব্য তারা পালন করে নি; বিশেষ করে ১৯২৯ সনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা আগে থেকে নিবারণ করতে পারে নি, লীগ অব নেশন্‌স্ এজন্য ব্রিটিশ শাসকবর্গকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করলেন।

 অতএব প্যালেস্টাইন এখনও ব্রিটিশদের একটা উপনিবেশের শামিল হয়ে রয়েছে; অনেক বিষয়ে তার অবস্থা বরং পুরোদস্তুর উপনিবেশের চেয়েও অনেক খারাপ; আরবদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের লেলিয়ে দিয়ে ব্রিটিশরা এই অবস্থাটাকে টিঁকিয়ে রাখছে। ব্রিটিশ কর্মচারীতে প্যালেস্টাইন পরিপূর্ণ, দেশের সমস্ত বড়ো কর্মচারীর পদ ব্রিটিশরাই দখল করে বসে আছে। ব্রিটিশের অধীনস্থ দেশের সর্বত্রই যা অবস্থা হয়—শিক্ষার বিস্তারের জন্য প্রায় কোনো ব্যবস্থাই করা হয় নি, যদিও আরবরা শিক্ষার জন্য অত্যন্ত আগ্রহশীল। ইহুদিদের অনেক টাকাকড়ি, তাদের ভালো ভালো সব স্কুল হয়েছে, কলেজ হয়েছে। দেশে ইহুদিদের সংখ্যা ইতিমধ্যেই মুসলমানদের সংখ্যার একচতুর্থাংশের কাছাকাছিই দাঁড়িয়েছে; মুসলমানের তুলনায় তাদের আর্থিক শক্তিও অনেক বেশি। প্যালেস্টাইনে একদিন তারাই প্রভুত্বের আসন দখল করে বসবে, সেই দিনের প্রত্যাশা যেন তারা এখন থেকেই করছে। জাতীয় স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক শাসন-প্রথা চেয়ে আরবরা সংগ্রাম চালাচ্ছে। সে সংগ্রামে ইহুদিদের সহযোগিতা পাবার অনেক চেষ্টাই তারা করেছিল; কিন্তু সে আহ্বানে ইহুদিরা কর্ণপাত করে নি। তার চেয়ে বিদেশী শাসকের পক্ষ সমর্থন করাই তাদের বেশি পছন্দ; দেশের অধিকাংশ লোককে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে রাখার কাজে এরা তাকে সাহায্য করছে। সেই অধিকাংশ দলের মধ্যে বেশির ভাগ লোকই হচ্ছে মুসলমান—তারা এব‍ং খৃষ্টানরা ইহুদিদের এই মনোভাবকে অত্যন্ত বিরক্তির চোখে দেখছে, এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই।

ট্রান্স-জর্ডন

 প্যালেস্টাইনের পাশে, জর্ডন নদীর ওপারে আরেকটি ক্ষুদ্র রাজ্য আছে, যুদ্ধের পরে ব্রিটিশ সেটি সৃষ্টি করেছিল। এর নাম হচ্ছে ট্রান্স-জর্ডন। অতি ক্ষুদ্র একটুখানি দেশ, মরুভূমির একেবারে গায়ে; তার এক পাশে সিরিয়া অন্য পাশে আরব। রাজ্যটির মোট লোকসংখ্যা তিন লক্ষের মতো—মাঝারি আকারের একটা শহরের প্রায় সমান বলা যায়। ব্রিটিশ সরকার অনায়াসেই একে প্যালেস্টাইনের সঙ্গে জুড়ে এক করে দিতে পারতেন। কিন্তু একত্র করবার চেয়ে ভেঙে আলাদা করার নীতিটাই সাম্রাজ্যবাদীরা বেশি পছন্দ করে। ভারতবর্ষে আসবার ডাঙ্গা-পথ এবং বায়ু-পথের মধ্যে একটা ঘাঁটি হিসাবে এই রাজ্যটির একটা বড়ো স্থান আছে। একদিকে মরুভূমি আর একদিকে পশ্চিমের সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত উর্বর দেশ, মাঝখানে এটা হয়ে রয়েছে একটা সীমানার খুঁটি, সেদিক থেকেও এর গুরুত্ব কম নয়।

 রাজ্যটি ছোটো। কিন্তু আশপাশের বড়ো বড়ো দেশগুলোতে যেসব ঘটনার পরম্পরা চলেছে, এটিও তার হাত থেকে রেহাই পায় নি। দেশের প্রজারা সবাই চাইছে গণতান্ত্রিক পার্লামেণ্ট প্রতিষ্ঠিত হোক; কর্তারা সে প্রার্থনায় কান দিচ্ছেন না; অতএব প্রজারা আন্দোলন করছে এবং সে আন্দোলন এঁরা দমন করছেন, সেন্সর বসাচ্ছেন, নেতাদের নির্বাসিত করছেন। প্রজারাও সরকারি ব্যবস্থা অমান্য এবং বর্জন করে চলেছে, ইত্যাদি কাণ্ড এখানেও পুরোদমেই ঘটছে। ব্রিটিশরা একটি ভালো চাল চেলেছে এখানে। আমির আবদুল্লাকে (হেজাজের রাজা হুসেনের আরেকজন পুত্র, ফয়জলের ভাই) ট্রান্স-অর্জনের রাজা বানিয়ে দিয়েছে। তিনিও একেবারেই ব্রিটেনের হাতের পুতুল হয়ে আছেন, তারা যা বলে তাই করেন। কিন্তু কাজকর্ম চলছে তাঁরই নামে। প্রজাদের ক্রোধটা ঠিক ব্রিটেনের উপরে গিয়ে পড়ছে না, মাঝখানে তিনি আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন—এদিক থেকে ব্রিটেনের তিনি খুবই কাজে লাগছেন সন্দেহ নেই। যা কিছু ঘটে তার দরুন বেশির ভাগ দোষই পড়ছে তাঁর ঘাড়ে; প্রজারা তাঁর উপরে দারুন চটা। ভারতবর্ষে আমাদের অনেক ছোটো ছোটো দেশীয় রাজা আছে; আবদুল্লা-শাসিত ট্রান্স-জর্ডন রাজ্যের অবস্থা বস্তুত অনেকটা তাদেরই মতো।

 নামে এটি স্বাধীন রাজ্য। কিন্তু ১৯২৮ সনে ব্রিটিশদের সঙ্গে আবদুল্লার একটি সন্ধি হয়েছে, তাতে সামরিক এবং অন্যান্য ব্যাপারে যতরকম সম্ভব সুযোগ এবং অধিকার তিনি ব্রিটেনকে দিয়ে দিয়েছেন। ট্রান্স-জর্ডন বস্তুত পরিণত হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরই একটি অংশে। ব্রিটিশের অধীনে থেকে নূতন ধরণের স্বাধীনতা পাবার যে রীতি সৃষ্টি হয়েছে, এটি তারই আরেকটা ছোটো নমুনা। এই সন্ধি এবং মোটের উপর এই অবস্থাটার দরুনই প্রজারা অত্যন্ত ক্ষেপে উঠেছে, মুসলমান এবং খৃষ্টান, সকলেই। সন্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তারা আন্দোলন শুরু করল, সে আন্দোলন দমন করা হল; যে সংবাদপত্রগুলো সে আন্দোলনকে সমর্থন করছিল সেগুলোকে পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হল, আন্দোলনের নেতাদের নির্বাসনে পাঠানো হল। তার ফলে প্রজার বিরোধিতা আরও বাড়ল; একটি জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন হল, কংগ্রেস একটি ‘জাতীয়-সন্ধিপত্র’ রচনা করলেন এবং রাজার সন্ধিকে অন্যায় বা অবৈধ বলে ঘোষণা করলেন। তারপর যখন নূতন নির্বাচনের জন্য ভোটারের তালিকা তৈরি করবার চেষ্টা হল, দেশের প্রায় সমস্ত প্রজাই তাকে বয়কট করল, ভোটার বলে নাম লেখাতে অস্বীকার করল। আবদুল্লা এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অবশ্য হাল ছাড়লেন না, কোনোমতে দু-চার জন লোক দলে জুটিয়ে নিয়ে তাদের দিয়েই সন্ধিটাকে একটা লোক-দেখানো অনুমোদন করিয়ে নিলেন।

 ১৯২৯ সনে প্যালেস্টাইনে যখন গোলমাল চলেছিল, ট্রান্স-জর্জনেও তখন বড়ো বড়ো শোভাযাত্রা ইত্যাদি হয়েছে, ব্রিটিশ শাসন এবং ব্যালফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রজারা প্রতিবাদ জানিয়েছে।

 বিভিন্ন দেশের ঘটনাবলী সম্বন্ধে আমি তোমাকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখে যাচ্ছি; দেখে মনে হবে সেগুলো একটি মাত্র গল্পেরই বারবার পুনরাবৃত্তি। তবু সে গল্প বারবার করে বলছি, একটি কথা তোমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিতে চাই বলে; নিজের দেশে বসে সবাই আমরা মনে করি, প্রত্যেক জাতির নিজস্ব বিশেষত্বগুলো নিয়েই আমাদের আলোচনা করতে হবে; কিন্তু আসলে আমাদের দ্রষ্টব্য হচ্ছে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে যে ঘটনার স্রোত বয়ে চলেছে তারই গতি—সমস্ত প্রাচ্য জগৎ জুড়ে জাতীয়তাবাদের হাওয়া জেগে উঠেছে, তার সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা একই অস্ত্র সর্বত্র প্রয়োগ করছে। জাতীয়তাবাদের শক্তি বাড়ছে, বেড়ে যাচ্ছে তার প্রসার; তার সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীদের ফন্দি-ফিকিরেরও এক-আধটকু পরিবর্তন হচ্ছে; বাইরে থেকে তারা সে জাতীয়তাবাদীদের সন্তুষ্ট করবার একটা লোক-দেখানো ভড়ং করছে, এমন ভান দেখাচ্ছে যেন তাদের দাবিই মেনে নেওয়া হল, অন্তত নামে। ওদিকে আবার দেশে দেশে এই জাতীয় সংগ্রাম যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, তারই সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে সমাজের ভিতরকার সংগ্রাম, প্রত্যেক দেশের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীগুলোর মধ্যে শ্রেণীসংগ্রাম। সে সংগ্রামে সামন্ত শ্রেণী, এবং কিছু পরিমাণে বিত্তশালী শ্রেণীও ক্রমেই আরও বেশি করে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মন্তব্য (অক্টোবর ১৯৩৮):

 প্যালেস্টাইনে আরবি জাতীয়তাবাদ, ইহুদি ধর্মরাজ্যবাদ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে একটা ত্রয়ী-সংঘাত চলেছে এবং ক্রমশই তা জটিলতর হয়ে আসছে। জর্মনিতে নাৎসিদের ক্ষমতালাভের দরুন মধ্য-ইউরোপ হতে বহু সংখ্যক ইহুদি বিতাড়িত হয়েছে, ফলে প্যালেস্টাইনের উপর ইহুদিদের চাপ বেড়ে গেছে। আরবদের মনে আশঙ্কা বেড়ে গেল যে ইহুদিদের বাস্তুভূমিতে প্রত্যাবর্তনের হিড়িকে যে প্রবল বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে তারা একেবারেই ভেসে যাবে ও প্যালেস্টাইন ইহুদিদেরই কবলে চলে যাবে। আরবগণ এর বিরুদ্ধে লড়াই করল এবং তাদের মধ্যে কতকলোক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে লিপ্ত হল। পরবর্তী কালে অত্যুগ্র ইহুদি ধর্মরাজ্যবাদিগণ অনরূপ কার্যের দ্বারা প্রতিশোধ গ্রহণ করল।

 ১৯৩৬ সনের এপ্রিলে প্যালেস্টাইনের আরবগণ ধর্মঘট ঘোষণা করল। ইহা পণ্ড করার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সর্বপ্রকার বাবস্থা অবলম্বন করল—সামরিক বাহিনী নিয়োগ করে নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণ করল—তা সত্ত্বেও ইহা ছয় মাস চলেছিল। সুবিদিত নাৎসি দৃষ্টান্তের অনুকরণে বড়ো বড়ো বন্দীশালা (Concentration Camps) গড়ে উঠল। এসব প্রচেষ্টা বিফল হল; তার পর সরকার প্যালেস্টাইনের ঘটনাবলী তদন্ত করার জন্য একটা রাজকীয় কমিশন (Royal Commission) নিয়োগ করল। এই কমিশন রিপোর্টে জানিয়ে দিল, অন্যের আদেশে (এখানে লীগ অব্‌ নেশন্‌সের) এদেশ শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ নিষ্ফল হয়েছে এবং এ দায়িত্ব পরিত্যাগ করাই সংগত। কমিশন আরও প্রস্তাব করল যে, দেশটি এরূপ তিন ভাগে বিভক্ত করা দরকার—আরবদের নিয়ন্ত্রণাধীনে একটা বড়ো অঞ্চল, ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণাধীনে সমদ্রতীরবর্তী একটা ছোটো অঞ্চল, এবং তৃতীয় আর একটি অঞ্চল—যার মধ্যে থাকবে জেরুজালেম শহর ও সেটি থাকবে ব্রিটিশ কর্তৃত্বাধীনে। আরব হোক আর ইহুদি হোক, প্রায় প্রত্যেকেই এরূপ দেশবিভাগের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল কিন্তু অনেক ইহুদি আবার এটাকে কার্যক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখতে রাজী হল। যাহোক, আরবগণ এ পরিকল্পনার কাছ দিয়েও ঘেঁষল না এবং তাদের জাতিগত বৈরিতা বেড়েই চলল। গত কয়েকমাসের মধ্যে এটা একটা বিরাট জাতীয় আন্দোলনের রূপপরিগ্রহ করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ শত্রুতাচরণ করছে এবং ক্রমশ প্যালেস্টাইনের বড়ো বড়ো অঞ্চলগুলি ব্রিটিশ কবলমুক্ত হয়ে আরবি জাতীয়তাবাদীদের হাতে গিয়ে পড়ছে। দেশটাকে পুনর্বার দখল করার জন্য ব্রিটিশ সরকার নূতন সৈন্যদল প্রেরণ করেছে এবং সেখানে এখন একটা ভীতি ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি বিরাজমান।

 দুর্ভাগ্যক্রমে আরবগণ অতিমাত্রায় সন্ত্রাসবাদের আশ্রয় নিয়েছে; ইহুদিগণও কতকাংশে আরবগণেরই পদ্ধতি অনুকরণ করছে। ব্রিটিশ সরকার নৃশংস হত্যা ও ধ্বংসলীলার প্রচণ্ড নীতি অবলম্বন করে চলেছে—উদ্দেশ্য, স্বাধীনতাকামী জাতীয় আন্দোলন এভাবে দাবিয়ে দেবে। আয়ার্ল্যাণ্ডের ‘ব্ল্যাক ও ট্যান’ (Black and Tan) যুগে অবলম্বিত পন্থার চেয়েও জঘন্যতর পন্থা এখন প্যালেস্টাইনে অনুসৃত হচ্ছে এবং খবরবার্তা আদান-প্রদানের উপর কড়া সেন্সরশিপের (বার্তা-নিয়ন্ত্রণ) ব্যবস্থা থাকাতে ওখানকার ঘটনাবলী বাকী জগতের অগোচর। তবুও যতটুকু কোনো প্রকারে বহির্জগতে বেরিয়ে আসছে ততোটুকুই যথেষ্ট খারাপ। আমি এইমাত্র পড়লাম—ব্রিটিশ সামরিক কর্মচারিগণ সন্দেহভাজন আরবদের দলবদ্ধভাবে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করা প্রকাণ্ড বড়ো লোহার খাঁচায় পুরে রাখে—এরূপ প্রতিটি খাঁচায় ৫০ থেকে ৪০০ জন বন্দী থাকে, আর এদের আত্মীয়স্বজনেরা এদের খাদ্যাদি জোগায়, ঠিক যেমন পিঞ্জরাবদ্ধ পশুদের প্রতি মানুষ আচরণ করে।

 ইতিমধ্যে সমগ্র আরব্যজগৎ ঘৃণায় ও ক্রোধে জ্বলে উঠেছে এবং প্রাচ্যজগতের মুশ্লিম অ-মুশ্লিম উভয় অঞ্চলই স্বাধীনতার সংগ্রামে লিপ্ত একটা জাতিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এরূপ পাশবিক প্রণালী অবলম্বিত হচ্ছে দেখে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে উঠেছে। এই লোকগুলি অবশ্যই অনেক জঘন্য ও হিংসাত্মক কাজ করেছে বটে কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে তারা প্রকৃতপক্ষে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সামরিক শক্তিকর্তৃক নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হচ্ছে।

 মহা দুঃখ ও পরিতাপের কথা হচ্ছে যে, দুটি নিপীড়িত জাতি, ইহুদি ও আরবগণ পরপর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। ইহুদিগণ যে ভয়াবহ অগ্নি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চলেছে ইউরোপে—যেখানে তাদের অগণিত নরনারী বাস্তুহারা ভবঘুরের দলে পরিণত হচ্ছে, যাদের কোনও দেশেই ঠাঁই নাই—তাতে প্রত্যেকেই তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাবে। প্যালেস্টাইনের প্রতি তারা কেন আকৃষ্ট হচ্ছে তাও বেশ বোঝা যায়। এবং এটাও ঠিক যে ইহুদি আগন্তুকগণই ঐ দেশের উন্নতিবিধান করেছে, ওখানে শিল্প-বাণিজ্যের গোড়াপত্তন করেছে ও সাধারণ জীবনযাত্রার মান উচ্চস্তরে উঠিয়েছে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে প্যালেস্টাইন হচ্ছে আসলে আরবভূমি এবং তাকে ওরূপ থাকতেই হবে এবং আরবগণকে তাদের দেশে অমনভাবে নির্যাতিত ও বিধ্বস্ত করা চলবে না। স্বাধীন প্যালেস্টাইনে এই দুই জাতি, পরস্পরের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থে অন্যায় হস্তক্ষেপ না করে, পরস্পরের সাথে ভালোভাবে সহযোগিতা করে, একটি সমুন্নত দেশ গড়ে তুলতে পরস্পরকে সাহায্য করতে পারত।

 দুর্ভাগ্যবশত, ভারত ও প্রাচ্যদেশে আসার নৌ ও বায়ু-পথের মধ্যে অবস্থিত বলে প্যালেস্টাইন ব্রিটিশ সম্রাজ্য-পরিকল্পনার মধ্যে একটি গুরুতর প্রয়োজনীয় স্থান অধিকার করে রয়েছে। এই পরিকল্পনাকে কার্যে পরিণত করার ব্যাপারে আরব ও ইহুদি উভয় জাতিকেই শোষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আগেকার দেশবিভাগ পরিকল্পনাটি পরিত্যক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং একটি বড়ো আরবীয় যুক্তরাষ্ট্র—যাতে ইহুদিদের স্বায়ত্তশাসিত এলাকাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে—গঠিত হওয়ার কথাবার্তা চলছে। যাহোক এটা সুনিশ্চিত যে প্যালেস্টাইনে আরব জাতীয়তাবাদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না এবং কেবলমাত্র আরব-ইহুদি-সহযোগিতা ও সাম্রাজ্যবাদ অবলোপরূপ সূদৃঢ় ভিত্তির উপরেই দেশটির ভবিষ্যৎ রচিত হতে পারে।