বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/প্রাচীন ভারতের গ্রাম্য পঞ্চায়েত
১০
প্রাচীন ভারতের গ্রাম্য পঞ্চায়েত
আমার এই প্রাচীনকালের ইতিবৃত্ত কিছুতেই এগোচ্ছে না। সোজা রাস্তায় না গিয়ে আমি ক্রমাগত অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। গত চিঠিতে প্রকৃত বিষয়ের অবতারণা করতে গিয়ে আমি ভারতের বিভিন্ন ভাষা সম্বন্ধেই কেবল আলোচনা করেছি।
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এবার আসা যাক। আজ যাকে আমরা আফগানিস্তান বলি, অনেকদিন পর্যন্ত সে দেশ ভারতের অন্তর্গত ছিল। এই উত্তর-পশ্চিম অংশের প্রাচীন নাম ছিল গান্ধার দেশ। ভারতের উত্তরভাগে সিন্ধু ও গঙ্গা নদীর তীরবর্তী সমতলভূমিতে আর্যরা দলে দলে এসে বসতি স্থাপন করে। এদের অনেকে এসেছিল পারশ্য ও মেসোপটেমিয়া থেকে। সেই প্রাচীন কালেও এই দুটো দেশে অনেক বড়ো বড়ো শহর গড়ে উঠেছিল। সুতরাং এ কথা সহজেই অনুমান করা যায় যে ভারতীয় আর্যরা বাড়িঘর তৈরি করার কৌশল বেশ ভালো করেই জানত। আর্যদের ভিন্ন ভিন্ন উপনিবেশের মাঝে মাঝে ছিল অরণ্যের অন্তরাল। বিস্তীর্ণ অরণ্যের প্রাচীর ভারতের উত্তর ও দক্ষিণ ভাগকে যেন পৃথক করে রেখেছিল। এই অরণ্য ভেদ করে আর্যদের খুব কম লোকই দক্ষিণে বসবাস করতে যেত। তবে কেউ কেউ যায় নি এমন নয়—কেউ গেছে আবিষ্কারের নেশায়, কেউ বাণিজ্য করতে, আবার কেউ কেউ গেছে আর্যসভ্যতা ও সংস্কৃতির বাহন হয়ে। জনশ্রুতি আছে, আর্যদের মধ্যে অগস্ত্যঋষিই সর্ব প্রথম দাক্ষিণাত্যে যান আর্যধর্ম ও সাধনার বাণী বহন করে।
পূর্ব থেকেই ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের ব্যবসাবাণিজ্য চলত। দক্ষিণের মশলাপাতি, সোনা ও মুক্তার লোভে অনেক বিদেশী বণিক সমুদ্র পার হয়ে ভারতে আসত। খুব সম্ভব চালও রপ্তানি হত। বাবিলনিয়ার বহু প্রাচীন প্রাসাদে মালাবারের সেগুন কাঠের তৈরি জিনিষ পাওয়া গেছে।
ধীরে ধীরে আর্যদের গ্রাম-ব্যবস্থা গড়ে উঠল। এই ব্যবস্থার মধ্যে প্রাচীন দ্রাবিড়সভ্যতার সঙ্গে নবীন আর্য সভ্যতার একটি সমন্বয় দেখা যায়। এই গ্রামগুলি ছিল প্রায় স্বাধীন, গ্রামবাসীদের প্রতিনিধিস্বরূপ পঞ্চায়েত গ্রামের সমস্ত ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত। কয়েকটি গ্রাম কিংবা ছোটোখাটো শহর এক-একজন রাজা বা প্রধানের অধিনায়কত্বে যুক্ত থাকত—এই নায়ক কখনও-বা প্রজাদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন, কখনও উত্তরাধিকারসূত্রে এই পদ লাভ করতেন। সর্বসাধারণের উপকারে লাগে এমন অনেক কাজ—যেমন ধরো, রাস্তাঘাট তৈরি করা, পান্থশালা প্রতিষ্ঠা করা কিংবা জলসেচনের জন্যে খাল কাটা—এসব কাজ কয়েকটা গ্রাম মিলে যৌথভাবে করত। রাজা রাষ্ট্রের অধিপতি ছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি তাঁর খেয়ালখুশিমতো কাজ করতে পারতেন না। প্রজাদের মতো তিনিও ছিলেন আর্য- বিধিবিধানের অধীন, অন্যায় করলে তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করবার কিংবা তাঁর শাস্তিবিধান করবার অধিকার ছিল প্রজাদের। ‘আমিই রাষ্ট্র’ এ কথা বলা চলত না। এসব থেকেই বুঝতে পারো যে, আর্য-উপনিবেশগুলির শাসনব্যবস্থা অনেকটা জনতান্ত্রিক ছিল, অর্থাৎ দেশের শাসনব্যবস্থা অনেকটা প্রজাদের আয়ত্তাধীন ছিল।
ভারতীয় আর্যদের সঙ্গে গ্রীসের আর্যদের তুলনা করা যাক। প্রভেদ ছিল অনেক, আবার উভয়ের মধ্যে মিলও ছিল খুব। দুই দেশেরই শাসনব্যবস্থাকে একহিসাবে প্রজাতন্ত্র বলে অভিহিত করা চলে। তবে একটা কথা সব সময় মনে রাখতে হবে। এই প্রজাতন্ত্র ছিল কেবল আর্যদের নিজেদের জন্য। যারা ক্রীতদাস, যাদেরকে ওরা নিচু জাত বলে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, তাদের কিন্তু এই শাসনব্যবস্থায় কোনো অংশগ্রহণের অধিকার ছিল না। তাদের না ছিল স্বাধীনতা, না ছিল স্বায়ত্তশাসন। বহুধাবিভক্ত জাতিভেদপ্রথা তখনকার দিনে আজকের মতো এমন উগ্ররূপে দেখা দেয় নি। তখন ভারতীয় আর্যদের সমাজে কেবলমাত্র চারটি বিভাগ ছিল। এই বিভাগকেই বলা হয় চাতুর্বর্ণ্য। যাঁরা ধ্যান-ধারণা, পূজা-অর্চনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে সময় কাটাতেন তাঁরা ব্রাহ্মণ; দেশশাসন করতেন ক্ষত্রিয়; যাঁরা ব্যবসাবাণিজ্য করতেন তাঁরা বৈশ্য; আর যাঁরা শারীরিক পরিশ্রম অর্থাৎ মজদুরি করে জীবিকানির্বাহ করতেন তাঁদের বলা হত শূদ্র। তা হলে দেখা যাচ্ছে কাজকর্মের বিভেদের উপরই ছিল জাতিভেদের প্রতিষ্ঠা। এমনও হতে পারে যে, পরাজিত অনার্যদের সংস্পর্শ থেকে নিজেদের দূরে রাখবার উদ্দেশ্যেই আর্যরা জাতিভেদের প্রবর্তন করেছিল। নিজেদের সভ্যতা নিয়ে আর্যদের মনে বেশ একটু দম্ভ ছিল, অনার্যদের তারা বর্বর বলে অবজ্ঞা করত—তাদের সঙ্গে মেলামেশা করত না। সংস্কৃতে ‘জাত’ অর্থে ‘বর্ণ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। এ থেকে এত বোঝা যায় যে ভারতবর্ষের আদিবাসীদের তুলনার আর্যদের গায়ের রঙ অনেক বেশি ফরশা ছিল।
এ কথা মনে রাখতে হবে যে, একদিকে আর্যরা শ্রমজীবীদের শূদ্র বলে সমাজের নিচুস্তরে স্থান দিয়েছে, দেশ শাসন করবার অধিকার তাদের দেয় নি; অন্যদিকে আবার নিজেদের মধ্যে তাদের প্রচুর স্বাধীনতা ছিল। দেশের শাসনকর্তা যাঁরা তাঁদের যথেচ্ছাচার করবার ক্ষমতা ছিল না, সে ক্ষেত্রে তাঁদের পদচ্যুত হতে হত। সাধারণত ক্ষত্রিয়রাই রাজা হত কিন্তু কখনও কখনও তার ব্যতিক্রম ঘটত—বিশেষ করে যুদ্ধবিগ্রহে যখন বিপদ আসত। এরূপ অবস্থায় ক্ষমতাশালী শূদ্রের পক্ষেও সিংহাসন দখল করা বিচিত্র ছিল না। আর্যদের অবনতি ঘটবার সঙ্গে সঙ্গে জাতিভেদপ্রথা অটল সংস্কারে দাঁড়িয়ে গেল। নানা ভেদবিভেদের ফলে দেশ দুর্বল হয়ে পড়ল—তাদের স্বাধীনতার পূর্ব আদর্শও তারা ভুলে গেল। অথচ এককালে একটা কথাই ছিল—আর্য কখনও দাসত্ব স্বীকার করে না। ‘আর্য’ নামের অবমাননার চেয়ে তারা মৃত্যুকেও শ্রেয় জ্ঞান করত।
আর্যদের নিবাসভূমি এই শহর ও গ্রামগুলি যেমন-তেমনভাবে গড়ে ওঠে নি। প্রত্যেকটি শহর ও গ্রাম গঠিত হত কোনো সুপরিকল্পিত প্রণালী অনুযায়ী। শুনলে অবাক হবে যে এই পরিকল্পনাগুলিতে জ্যামিতিক পদ্ধতি অনুসৃত হত। বৈদিক পূজা-অনষ্ঠানে দেখা যায় বেদি প্রভৃতি রচনায় অনেক ক্ষেত্রে জ্যামিতির ব্যবহার ছিল—এখনও অনেক হিন্দু পরিবারে পূজাপার্বণের সময় তার নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। গৃহ ও নগর-নির্মাণের সঙ্গে জ্যামিতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সেকালকার আর্য গ্রাম এক-একটি সুরক্ষিত শিবির, কারণ সর্বদাই তখন আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা। বহিঃশত্রুর আক্রমণ-আশঙ্কা না থাকলেও একই পদ্ধতি অনুসৃত হত—প্রস্থের চেয়ে দৈর্ঘ্যে বেশি চতুষ্কোণ একখণ্ড জমি, তার চারদিকে প্রাচীর, চারটি বড়ো চারটি ছোটো তোরণদ্বার, প্রাচীরাভ্যন্তরে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্মিত পথ ও বাড়িঘর; গ্রামের ঠিক মাঝখানে পঞ্চায়েত-ঘর—গ্রামবৃদ্ধদের আলাপ-আলোচনার স্থান। ছোটো ছোটো গ্রামে পঞ্চায়েত-ঘরের পরিবর্তে একটা বড়ো গাছের তলায় মোড়লরা বসত। প্রতি বছর গ্রামবাসীরা মিলে পঞ্চায়েত নির্বাচন করত।
অনেক জ্ঞানীগুণী লোক নগর বা গ্রামের সন্নিহিত কোনো অরণ্যে গিয়ে সরল জীবনযাত্রা যাপন করতেন বা শান্তভাবে জ্ঞানচর্চা ও কর্মে মনোনিবেশ করতেন। ক্রমে ক্রমে তাঁদের কাছে শিষ্যেরা এসে একত্র হত—এইভাবে এক-একজন গুরুকে কেন্দ্র করে এক-একটি আশ্রম গড়ে উঠত। এই তপোবনগুলিকেই সেকালকার বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে। এইসব বিদ্যালয়ে বড়ো বড়ো অট্টালিকার আড়ম্বর ছিল না, কিন্তু বহু দূর দেশ থেকেও বিদ্যার্থীরা এইরকম বিদ্যায়তনে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আসত।
আমাদের ‘আনন্দভবন’[১]এর ঠিক উল্টোদিকেই ভরদ্বাজ-আশ্রম। তুমি তো এই আশ্রম কতবার দেখেছ। তুমি হয়তো এও শুনে থাকবে যে ভরদ্বাজ-মুনি ছিলেন সেই প্রাচীন রামায়ণের কালের একজন জ্ঞানী। রামচন্দ্র বনবাসের সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। শোনা যায় হাজার হাজার শিষ্য ও ছাত্র তাঁর সঙ্গে তপোবনে বাস করত। ভরদ্বাজের অধ্যক্ষতায় একে পুরোপরি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ই বলা যেতে পারে। সেকালে এ আশ্রম ছিল ঠিক গঙ্গার ধারেই—আজকাল অবশ্য গঙ্গার ধারা প্রায় মাইলখানেক দূরে সরে গেছে। আমাদের বাগানের কোনো কোনো জায়গায় বালির পরিমাণ খুব বেশি—কে জানে হয়তো এই বাগানের ভিতর দিয়েই ছিল প্রাচীন গঙ্গার ধারাপথ।
এই সময়টা ছিল আর্যদের গৌরবময় যুগে। খুবই দুঃখের বিষয়, এ যুগের ইতিহাস আমরা জানি না, যতটুকু জানি তা অপ্রামাণিক গ্রন্থ থেকে। তখনকার আর্যপ্রদেশ ও রাজত্বগুলির নাম ছিল দক্ষিণ বিহারে মগধ; উত্তর-বিহারে বিদেহ; কাশী অথবা বারাণসী, কোশল, এর রাজধানী ছিল অযোধ্যা—আজকাল যার নাম ফয়জাবাদ; গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী দেশ পাঞ্চাল। পাঞ্চাল দেশের সবচেয়ে বড়ো দুটি শহরের নাম ছিল মথুরা ও কান্যকুব্জ। পরবর্তী কালের ইতিহাসে এই দুটি শহর কম বিখ্যাত ছিল না। দুটি শহরই এখনও পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে, কেবল কান্যকুব্জের নাম বদলে হয়েছে কনৌজ। এই শহরটি কানপুরের কাছে। আর ছিল উজ্জয়িনী; আজকাল উজ্জয়িনী গোয়ালিয়র রাজ্যের একটি সামান্য শহরমাত্র।
পাটলিপুত্র অথবা পাটনার কাছে ছিল বৈশালী। এই বৈশালী ছিল ইতিহাসপ্রখ্যাত লিচ্ছবিকুলের রাজধানী। বৈশালীতে ছিল সাধারণতন্ত্র, প্রজাদের প্রতিনিধি সংসদ থেকে নির্বাচিত একজন নায়ক দেশ শাসন করতেন।
কালক্রমে বড়ো বড়ো শহর গড়ে উঠতে লাগল। ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শিল্পেরও যথেষ্ট প্রসার হতে আরম্ভ করল। শহরগুলি হল ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র। তপোবনের শিক্ষাকেন্দ্রগুলির আকার আয়তন ও জনসংখ্যাও ক্রমে ক্রমে বেড়ে উঠতে লাগল। এইসব আশ্রমে থাকতেন আচার্যরা ও তাঁদের শিষ্যসম্প্রদায়; এমন বিষয় ছিল না যা নিয়ে তাঁরা চর্চা না করতেন। যত বিদ্যা সে যুগে জানা ছিল সবই শিক্ষা দেওয়া হত। এমনকি ব্রাহ্মণেরা যুদ্ধবিদ্যা পর্যন্ত শিক্ষা দিতেন। তুমি তো মহাভারতে পাণ্ডবদের গুরু দ্রোণাচার্যের কথা পড়েছ। দ্রোণ ছিলেন ব্রাহ্মণ, তিনি তাঁর ক্ষত্রিয় শিষ্যদের অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধবিদ্যাও শিক্ষা দিয়েছিলেন।
- ↑ লেখকের পৈত্রিক বাড়ি