বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ফরাসি বিপ্লব
১০১
ফরাসি বিপ্লব
১০ই অক্টোবর, ১৯৩২
তোমার কাছে ফরাসি বিপ্লবের বিষয়ে কিছু লেখা কঠিন বলে বোধ হচ্ছে—উপকরণের অভাবে নয়, তার প্রাচুর্যে। বিদ্রোহটা ছিল অপূর্ব, চির-আবর্তিত এক মহানাটক; তার অসাধারণ ঘটনাবলী আজও আমাদের রোমাঞ্চিত করে। রাজা আর রাজপুরুষদের রাজনীতি আলোচিত হয় গোপন কক্ষের মধ্যে, এক রহস্যের হাওয়ায় তারা পূর্ণ। ঘোমটার আড়ালে থাকে বহু পাপ, চাকচিক্যময় ভাষা ঢেকে রাখে বহু প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আকাঙ্ক্ষা ও লোভ। যখন এই দ্বন্দ্বের ফলে শুরু হয় যুদ্ধ, বহু তরুণ জীবনকে যখন মরণের মুখে পাঠানো হয় এই লোভের জন্যে, আমরা এসব নীচ অভিপ্রায়ের কথা শুনতে পাই না, পরিবর্তে আমাদের শোনানো হয় মহান আদর্শ, সৎ উদ্দেশ্যের কথা; তারা দাবি করে আমাদের চরম ত্যাগস্বীকার।
কিন্তু বিদ্রোহ হল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার উৎপত্তি মাঠে-ঘাটে, হাটে-বাজারে; তার কার্যপ্রণালী অমার্জিত। বিদ্রোহ যারা সৃষ্টি করে, রাজারাজড়াদের মতো তাদের শিক্ষালাভের সুযোগ হয় নি। তাদের ভাষা ভদ্র ও সুমার্জিত নয়, তার ভিতরে লুকিয়ে নেই অসংখ্য ষড়যন্ত্র ও শঠতা। তাদের সম্বন্ধে রহস্যের কিছু নেই, তাদের মনের কর্মধারা গোপন করার জন্যে ঘোমটার দরকার হয় না। মনের কথা দূরে যাক, তাদের শরীরেরও লাগে না বিশেষ আবরণ। বিদ্রোহের রাজনীতি রাজা ও রাজনৈতিকদের কাছে খেলার জিনিষ; কিন্তু এদের কারবার সত্যের সঙ্গে, আর তার পিছনে থাকে কর্কশ মনুষ্যচরিত্র ও অনশনের শূন্যোদর।
তাই, ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৪ পর্যন্ত নিয়তির লীলাময় এই পাঁচ বছর আমরা ফ্রান্সে ক্ষুধার্ত জনগণকে দেখতে পাই কর্মরত। ভীরু রাজনৈতিকদের তারাই জোর করে রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও ধর্মযাজকদের সুখসুবিধাজনক অধিকারগুলি বর্জন করতে বাধ্য করাল। দেবী-গিলোটিনের পূজোর বলি হল তারাই অতীতে যারা জনগণকে দাবিয়ে রাখত, এবং সদ্যলব্ধ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী বলে যাদের সন্দেহ করা হল তাদের উপর নৃশংস প্রতিহিংসা নিতে লাগল জনসাধারণ। এই জীর্ণবস্ত্র নগ্নপদ লোকগুলোই তাদের যেমন-তেমন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্রোহের স্বপক্ষে লড়াই করে ঐক্যবদ্ধ সমগ্র ইউরোপের সুশিক্ষিত সেনাদলকে হটিয়ে দিল। এই ফরাসিরা বিস্ময়কর কাজ করল বটে, কিন্তু কয়েক বছর অবিরত অত্যুদ্যম এবং সংগ্রামের ফলে বিদ্রোহ তার অন্তর্নিহিত শক্তি হারিয়ে ফেলে তার নিজের সন্তানদেরই গ্রাস করতে লাগল। তার পর এল প্রতিবিপ্লব প্রকৃত বিদ্রোহকে নষ্ট করে দিয়ে সে জনসাধারণকে—যারা অসমসাহসিক কার্য করে বহু দুঃখকষ্ট ভোগ করেছিল—পাঠিয়ে দিল ‘শ্রেষ্ঠ’ অভিজাত শ্রেণীর হাতে শাসিত হতে। এই প্রতিবিপ্লবের মধ্য থেকে আবির্ভূত হলেন নেপোলিয়ন—শাসক ও সম্রাট। কিন্তু প্রতিবিপ্লব বা নেপোলিয়ন, কেউই জনসাধারণকে তাদের পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারল না। কেউই বিদ্রোহের প্রধান বিষয়গুলি মুছে ফেলতে পারল না, কেউই পারল না ফরাসিজাতি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশবাসীদের মন থেকে কেড়ে নিতে সেদিনের স্মৃতি, যেদিন স্বল্পকালের জন্যে হলেও বন্দী কুকুর তার শিকল ছিঁড়ে ফেলেছিল।
বিদ্রোহের প্রারম্ভে প্রভুত্বের জন্যে বহু বিভিন্ন দল লড়েছিল। রাজার দল ষোড়শ লুইকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত রাখবার মিথ্যা আশা নিয়ে লড়েছিল। ছিল নরমপন্থীরা, রাজার শক্তি সীমাবদ্ধ করে দিয়ে শাসনপ্রণালী গড়বার চেষ্টায় আরও ছিল ‘গিরোঁদ-এর দল’ নামে একদল মধ্যপন্থী, এবং আর একদল চরমপন্থী—নাম তাদের ‘জ্যাকোবিন’। জ্যাকোবিন-মঠের কক্ষ তাদের পরামর্শ-স্থল ছিল বলে তাদের এই নাম। এই হল প্রধান দল কয়টি, তা ছাড়া তাদের প্রত্যেকটির ভিতরে ও দলের বাইরে ছিল বহু দুঃসাহসী। আর এইসমস্ত দলের পিছনে ছিল ফরাসি জনগণ, বিশেষ করে প্যারিসের নাগরিকেরা, বহু অজানা নেতার নেতৃত্বাধীন। বৈদেশিক রাজ্যে, বিশেষত ইংলণ্ডে ফরাসি ঔপনিবেশিকরা ছিল; তারা সম্ভ্রান্ত দল, বিদ্রোহের সময় পালিয়ে এসে নিত্যই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছিল। সমগ্র ইউরোপের শক্তি দাঁড়িয়েছিল বিদ্রোহী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে। পার্লামেণ্টের অধীন কিন্তু অভিজাত ইংলণ্ড এবং অন্যান্য দেশের রাজামহারাজারা জনসাধারণের এই উৎপাতে আশঙ্কিত হয়েছিলেন ও তাঁদের চেষ্টা ছিল তাকে দমনের।
রাজা ও তাঁর অনুবর্তী দল ষড়যন্ত্র করে নিজেদের সর্বনাশই ডেকে নিয়ে এলেন। জাতীয় মহাসভায় যারা দলে সবচেয়ে ভারি ছিল তারা হল নরমপন্থী, তারা চেয়েছিল ইংলণ্ড ও আমেরিকার মতো শাসনপ্রণালী। তাদের নেতা ছিলেন মিরাবো। প্রায় দু বছর সভায় এঁদেরই কর্তৃত্ব ছিল, এবং প্রথম যুগের সাফল্যে গর্বিত হয়ে এঁরা বহু দুঃসাহসিক ঘোষণা করেছিলেন ও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছিলেন শাসনপ্রণালীতে। ১৭৮৯ খৃস্টাব্দের ৪ঠা আগস্ট, বাস্তিলের পতনের কুড়ি দিন পরে, সভায় বেশ একটা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছিল। সভার আলোচ্য বিষয় ছিল, জায়গিরদারদের অধিকার ও সুবিধা। তখন ফরাসিদেশের হাওয়ায় হাওয়ায় একটা-কিছু ছিল যাতে জায়গিরদার প্রভুদেরও নূতন স্বাধীনতার উন্মাদনায় নেশা লেগে গিয়েছিল। সম্ভ্রান্তজনেরা এবং গির্জার নেতারা মহাসভার কক্ষে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের জায়গিরত্যাগের জন্যে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করতে লাগলেন। কাজটা হয়েছিল বেশ উদার, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে ওতে বিশেষ কিছু ফল হল না। মাঝে মাঝে (যদিও খুবই কদাচিৎ) বিশেষ সুখ-সুবিধাভোগী একটা দলের মনে এরকম উদার আকাঙ্ক্ষা হয় অথবা হয়তো সুবিধার শেষ হয়ে আসছে দেখে এরকম ধর্মাচরণই শ্রেষ্ঠ পন্থা বলে তাঁরা মনে করেন। এই তো অল্প কয়েকদিন আগে অস্পৃশ্যতা দূর করার জন্যে বাপুজি যখন উপবাস আরম্ভ করলেন, যেন যাদুদণ্ডের সাহায্যে সহানভূতির একটা ঢেউ দেশের উপর দিয়ে চলে গেল, এ দেশের বর্ণ—হিন্দুর দল তখন এমনি একটা উদার পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। যে শিকল হিন্দুরা তাদের ভাইয়ের গলায় পরিয়ে নিয়েছিল তা খসে পড়ল, বহু যুগ ধরে অস্পৃশ্যদের জন্যে যে শতসহস্র দ্বার রুদ্ধ ছিল তা গেল খুলে।
তেমনি উৎসাহের এক আবেগে বিদ্রোহী ফরাসিদেশের জাতীয় মহাসভা সিদ্ধান্ত করে দাসত্ব-প্রথা, এবং জায়গিরদারদের সুবিধেগুলো তুলে দিল; সম্ভ্রান্তদের ও ধর্মযাজকদের কর ধার্য করার অধিকার, এবং খেতাব দানের প্রথা রদ করল। বিস্ময়কর এই যে, রাজা থাকতেও ধনীরা তাঁদের খেতাব হারালেন।
মহাসভা তখন ‘মানুষের অধিকার’ সম্বন্ধে এক ঘোষণা করতে গেল। এর কল্পনাটা বোধ হয় এসেছিল আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে। কিন্তু আমেরিকার ঘোষণা ছিল সরল সংক্ষিপ্ত, আর ফরাসিদেরটা হল জটিল ও সুদীর্ঘ। মানুষের অধিকার তাই যা তাকে এনে দেয় সাম্য, স্বাধীনতা ও সুখ। সে সময়ে এটা বড়ো দুঃসাহসিক বলে মনে হয়েছিল, আর পরবর্তী এক শো বছর ধরে সাধারণতন্ত্রী ইউরোপের ঐ ছিল সনদ। কিন্তু তবু আজ সে পুরোনো হয়ে গেছে, বর্তমান যুগের কোনো সমস্যারই সমাধান এতে হয় না। আইন অনুসারে সাম্য অথবা ভোটের অধিকার থাকলেই যে সব সময় প্রকৃত সাম্য, সুখ বা স্বাধীনতা পাওয়া যায় না, এবং আইন থাকা সত্ত্বেও যে শক্তিমানের হাতে তাদের নির্যাতন সম্ভব, তা আবিষ্কার করতে জনসাধারণের প্রচুর সময় লেগেছিল। ফরাসি-বিদ্রোহের আমলের তুলনায় আজ আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বহু উন্নতি ও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে এবং সম্ভবত অতি-রক্ষণশীল লোকেরাও আজ ‘মানুষের অধিকার’-পত্রের শূন্যগর্ভ বড়ো বড়ো কথায়-ভরা মূলনীতিগুলি মেনে নেবেন। কিন্তু অনায়াসেই আমরা দেখতে পাব, তাঁরা যে প্রকৃতই সাম্য বা স্বাধীনতা দিতে প্রস্তুত, এ তার অর্থ নয়। এই ঘোষণাটি সত্যই বেসরকারি সম্পত্তিকেও রক্ষা করল। জায়গির ও বিশেষ সুবিধাদি সম্বন্ধীয় অন্যান্য কারণে সম্ভ্রান্ত ধনী ও ধর্মযাজকদের জমি বাজেয়াপ্ত করা হল। কিন্তু সম্পত্তিকরণের অধিকার সে সময় বিবেচিত হত পবিত্র ও অলংঘনীয় বলে। তুমি বোধ হয় জানো, উন্নত ধরনের রাজনৈতিক চিন্তাধারানুসারে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগ করা একটা পাপ, এবং যথাসম্ভব তাকে দূরীভূত করা উচিত।
মানবাধিকারের ঘোষণা আজ আমাদের কাছে অসাধারণ একখণ্ড চিরকুট বলে মনে হতে পারে। কালকের মহান আদর্শ প্রায়ই আজকে নগণ্য বলে মনে হয়। কিন্তু তার ঘোষণার সময় সারা ইউরোপের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছিল এক শিহরণ; সে নিয়ে এসেছিল নিপীড়িত-পদদলিতদের কাছে এক মহত্তর যুগের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেদিনের রাজা তাকে পছন্দ করেন নি, এরকম কেলেঙ্কারীতে বিস্ময়াভিভূত হয়ে তিনি সেটাকে অনুমোদন করতে অস্বীকার করেন। তখনও তিনি ভার্সাইয়ে ছিলেন। তখনই প্যারিসের জনগণ নারীদলের নেতৃত্বে ভার্সাই প্রাসাদে এসে রাজাকে দিয়ে সনদ অনুমোদন তো করিয়ে নিলই, উপরন্তু তাঁকেও প্যারিসে জোর করে নিয়ে গেল। গত চিঠিটিতে এই অদ্ভূত মিছিলের উল্লেখই আমি করেছিলাম।
এই মহাসভা বহু প্রয়োজনীয় সংস্কারও করেছিল। ধর্মযাজকদের বিশাল সম্পত্তি রাজশক্তি বাজেয়াপ্ত করে নিল। ফরাসিদেশটা বিভক্ত হল আশি ভাগে, এবং বোধ হয় আজও এই বিভাগগুলি বর্তমান। পুরোনো জায়গিরদারদের শাসনসভার স্থান নিল উন্নততর আইনসভা। ভালোর জন্যেই এগুলো হয়েছিল, কিন্তু বেশি দূর এরা যেতে পারল না। জমি-যাচক কৃষক বা বুভুক্ষু নাগরিকেরা এর দ্বারা বিশেষ উপকৃত হল না। বিদ্রোহটাকে যেন দমিয়ে দেওয়া হল। আগেই বলেছি যে, জনগণ, কৃষকমজুর, নাগরিক, এদের স্থান ছিল না মহাসভাতে। মিরাবোর কর্তৃত্বে মধ্যবিত্তেরা চালাতেন এই সভা; আর যেই তাঁরা বুঝলেন তাঁরা যা চাইছিলেন তা পেয়েছেন, অমনি বিদ্রোহ থামিয়ে দেবার জন্যে হল তাঁদের চেষ্টা। এমনকি, তাঁরা রাজা লুইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে প্রদেশে চাষিদের গুলি করে হত্যা করতে লাগলেন। তাঁদের নেতা মিরাবোই হলেন রাজার গোপন উপদেষ্টা। আর যে জনসাধারণ ছারখার করে জয় করে নিয়েছিল বাস্তিল, নিজেদের শৃঙ্খলমুক্ত ভেবেছিল, তারা অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, ‘কী হল!’ তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন রইল আগেরই মতো সুদূরপরাহত, নূতন জাতীয় মহাসভা পূর্বতন জমিদারদের মতোই তাদের রাখতে লাগল দাবিয়ে।
মহাসভায় স্থান না পেয়ে বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থলস্বরূপ প্যারিসের নাগরিকেরা তাদের বিপ্লবীশক্তির আর-একটি উৎসরণ-পথ পেল। সে হল কম্যুন, অর্থাৎ প্যারিসের জনপদ। কেবল কম্যুনেই নয়, নগরের প্রতিটি অংশও, যেগুলির অধিকার ছিল ‘কম্যুনে’ তাদের কয়েকটি করে সভ্য পাঠাবার, জনগণের সঙ্গে সংযোগ রেখে স্থাপন করল একটি সংঘ। কম্যুন, বিশেষত এই নগরাংশগুলিই হল বিদ্রোহের পতাকাবাহী ও মধ্যবিত্তদের মহাসভার প্রতিদ্বন্দ্বী।
ইতিমধ্যেই বছর ঘুরে এল বাস্তিলের পতনের পর, আর প্যারিসের অধিবাসীরা করল এক বিপূল উৎসব তদপেলক্ষে ১৪ই জুলাই তারিখে। তার নাম হয়েছিল ‘সংঘের উৎসব’। প্যারিসের জনসাধারণ অযাচিতভাবে নগর সুসজ্জিত করার জন্যে পরিশ্রম স্বীকার করল সেদিন; কারণ তারা উপলব্ধি করেছিল যে, উৎসব তাদেরই।
এই হল ১৭৯০ ও ১৭৯১ জুড়ে বিদ্রোহের অবস্থা। মহাসভা তার বিপ্লবাত্মক শক্তি হারিয়ে ফেলল, সাধিত হল তার বহু পরিবর্তন, কিন্তু প্যারিসের নাগরিকদের মধ্যে তখনও বিদ্রোহের উদ্যম ধুমায়মান, কৃষকের দল তখনও তৃষাতুর চোখে মাটির দিকে তাকিয়ে। বেশিদিন এ ভাবে চলতে পারে না। হয় বিদ্রোহাগ্নি পূর্ণোদ্যমে জ্বলবে, নয়তো সম্পূর্ণরূপে যাবে নিভে। ১৭৯১তে শান্তিবাদী নেতা মিরাবোর অকালে মৃত্যু হল। রাজার সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন, জনসাধারণকে তিনি সংযত করে রাখতেন। ১৭৯১ খৃষ্টাব্দের ২১শে জুন বিদ্রোহের ভাগ্য নির্দেশ করে দিল একটি ঘটনা। সে হল ছদ্মবেশে রাজা লুই ও মারি আঁতোয়ানেতের পলায়ন। তাঁরা প্রায় সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলেন, কিন্তু ভার্দুর কাছে ভারেন্নিতে কতকগুলি কৃষক তাঁদের চিনে ফেলল। ধরা পড়ে তাঁরা ফের ফিরে এলেন প্যারিসে।
প্যারিসের লোকেদের দিক থেকে রাজা ও রানীর এই কাজ তাঁদের ভাগ্য-নির্ধারণ করে দিল। গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা যেতে লাগল বেড়ে, কিন্তু মহাসভার সভ্যেরা এই জনমতের থেকে ছিলেন এত দূরস্থিত ও এতই নরমপন্থী যে, লুইয়ের সিংহাসনচ্যূতিকামীদের তখনও তাঁরা গুলি করে হত্যা করেই চললেন। এ বিদ্রোহেতিহাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র পলাতক মারাট্কে কর্তৃপক্ষ খুঁজে বেড়াতে লাগলেন প্রকাশ্যভাবে রাজনিন্দার ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে। প্যারিসের নর্দমাগুলির মধ্যে লুকিয়ে তাঁর দেহে দেখা দিল কঠিন চর্মরোগ।
তবুও অদ্ভুত ব্যাপার! আরও এক বছর লুই রাজা বলে গণ্য হলেন। ১৭৯১ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় মহাসভা নিজের জীবনচরিতে পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিয়ে স্থান করে দিল ব্যবস্থাপক সমিতির। আগেরটির মতোই এটিও হল নরমপন্থী, চলতে লাগল সমাজের উচ্চস্থানীয়দেরই প্রতিনিধিত্বে। ফরাসিদেশের ক্রমবর্ধিষ্ণু উত্তাপের ছিল না এতে স্থান। এই বিপ্লবের উত্তাপ সঞ্চারিত হল জনসাধারণের মধ্যে, গণতন্ত্রকামীদের মধ্যে, জ্যাকোবিনদের মধ্যে উত্তরোত্তর বলীয়ান হয়ে।
ইতিমধ্যেই ইউরোপের শক্তিসমূহ সত্রাসে এই অদ্ভূত ঘটনাবলী নিরীক্ষণ করছিল। কিছু কালের জন্য প্রাশিয়া, রুশদেশ ও অস্ট্রিয়া অন্যত্র লুঠতরাজে ব্যস্ত ছিল। প্রাচীন পোল্যাণ্ডের অবসান ঘটাচ্ছিল তারা। কিন্তু ফরাসিদেশের ব্যাপার বহু দূর পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়ে পড়ছিল, তারাও শেষে এতে আকৃষ্ট হল। ১৭৯২ অঙ্গে যুদ্ধ বাধল ফরাসিদেশের সঙ্গে প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার। জেনে রাখো, এ সময়ে নেদারল্যাণ্ডের বেলজিয়াম-অংশটুকু ছিল অস্ট্রিয়া অধিকৃত, ফরাসিদেশ এবং তার মধ্যে সীমানাটা ছিল একই। বিজাতীয় সৈন্যদল ফরাসিরাজ্যে ঢুকে ফরাসি-সেনাদের হারিয়ে দিল। রাজাকে তাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে সন্দেহ করা হল (নিতান্ত অকারণেও নয়), রাজদলীয় সকলকেই সন্দেহ করা হল প্রতারণার অপরাধে। যতই বিপদ চার দিকে ঘিরতে লাগল, ফরাসিরা ততই হয়ে উঠল উত্তেজিত ও আতঙ্কিত। সর্বত্রই তারা দেখতে লাগল গুপ্তচর আর বিশ্বাসঘাতক। এই শঙ্কার সময়ে প্যারিসের বিদ্রোহী ‘কম্যুন’ নিল নেতৃত্ব, রাজসভার বিরুদ্ধে সামরিক আইন ঘোষণা করে রক্তনিশান উড়িয়ে দিল; তার পর ১৭৯২ অব্দের ১০ই আগস্ট রাজপ্রাসাদ আক্রমণের আদেশ দিল। তাঁর সুইস্ রক্ষীদের দিয়ে রাজা তাদের গুলি করে মারলেন। কিন্তু জয় হল জনগণেরই; ‘কম্যুন’ ব্যবস্থাপক সমিতিকে বাধ্য করল, রাজাকে সিংহাসন থেকে বিতাড়িত ও বন্দী করতে।
সকলেই জানে, সেই রক্তনিশান আজ সাম্যবাদের নিশান, কুলিমজুরের ‘ঝাণ্ডা’। পূর্বে তাকে জনসাধারণের বিরুদ্ধে সামরিক আইন-সূচক হিসাবে ব্যবহার করা হত। সঠিক বলতে পারি না, তবু মনে হয়, প্যারিস-কম্যুনই প্রথম জনসাধারণের পক্ষ থেকে ঐ নিশান তুলেছিল, আর ঐ থেকেই মজুরদের নিশানরূপে তার পরিণতি হয়ে থাকবে।
রাজার বিতাড়ন ও শৃঙ্খলদশাতেই ও ব্যাপারের শেষ হল না। প্যারিসের নাগরিকেরা রক্ষীদের হাতে তাদের সহকর্মীদের হত্যায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, বিশ্বাসহন্তা ও গুপ্তচরদের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে, যাদের সন্দেহ করল তাদের দিয়েই কারাগার ভর্তি করতে লাগল। যারা ধরা পড়ল তাদের অনেকেই নিঃসন্দেহ দোষী ছিল, কিন্তু বহু নির্দোষও তাদের সঙ্গে ধৃত হয়েছিল। কিছুদিন পরে আবার ভয়ঙ্কর ভাবে ক্ষেপে উঠে নাগরিকেরা বন্দীদের ধরে কৃত্রিম বিচারের অভিনয়ের পরে তাদের অধিকাংশকেই হত্যা করল। এই ‘সেপ্টেম্বর হত্যালীলা’য় যাদের বলি দেওয়া হল তাদের সংখ্যা এক হাজারেরও উপর। প্যারিসের জনতা এই প্রথম রক্তের আস্বাদ পেল বহুল পরিমাণে। এ তৃষ্ণার তৃপ্তির জন্যে আরও বহু রক্তপাত হবার আয়োজন হল।
এই সেপ্টেম্বরেই প্রাশিয়ান ও অস্ট্রিয়ান সেনাদলের প্রথম পরাজয় ঘটল ফরাসিদের হাতে। ভাল্মির এই যুদ্ধটা আপাতদৃষ্টিতে ছোটো হল বটে কিন্তু এর ফল হল বিরাট; বিদ্রোহের অবসান ঘটাল এই যুদ্ধ।
১৭৯২ খৃষ্টাব্দের ২১শে সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রতিনিধি সভা বসল। সমিতির স্থান নিল এই নূতন সভা। পূর্বতন সমিতিদ্বয়ের চেয়ে এ হল অধিকতর উন্নত, কিন্তু তবুও কম্যুনের তুলনায় এ পড়ে রইল কিছু পিছিয়ে। এর প্রথম কাজ হল, প্রজাতান্ত্রিক শাসন ঘোষণা। অনতিকাল পরেই হল ষোড়শ লুইয়ের বিচার। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল তাঁকে, রাজত্বের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাঁকে নিজের শির দিয়ে করতে হল। গিলোটিনে হল তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ ১৭৯৩ খৃস্টাব্দের ২১শে জানুয়ারি। ফরাসিদের আর ফেরার পথ রইল না, ইউরোপের রাজামহারাজাদের অগ্রাহ্য করে তারা চলল এগিয়ে। রাজ-শোণিত-স্নাত সেই গিলোটিনের সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়েই বিপ্লবের নেতা দাঁতোঁ জনতাকে সম্বোধন করলেন ও অন্য দেশের রাজাদের প্রতি ঘোষণা করলেন তাঁর সদম্ভ আহ্বান। তিনি বললেন: “ইউরোপের রাজারা দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলে তাদের ছুঁড়ে দেব আমরা একটি রাজার এই মাথা।”