বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বল্‌শেভিকদের ক্ষমতালাভ

উইকিসংকলন থেকে

১৫১

বল্‌শেভিকদের ক্ষমতালাভ

৯ই এপ্রিল, ১৯৩৩

 বিপ্লবের সময়ে ইতিহাস যেন খুব বড়ো বড়ো লম্বা পা ফেলে হাঁটে। বাইরের জগতে অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে; জনসাধারণের মনে পরিবর্তন আসে তার চেয়েও বেশি। পুঁথিপত্রের শিক্ষা লাভের সুযোগ তাদের বেশি দূর নয়, কাজেই বই পড়ে বেশি কিছু তারা শেখেও না; তা ছাড়া বইয়ে সত্য কথা শেখায় যতটকু, গোপন করে তার চেয়ে অনেক বেশি। জনসাধারণের শিক্ষা হয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে; সে শিক্ষা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু সেই শিক্ষাই অধিকতর সত্য। বিপ্লবের সময়ে দেশের শাসনক্ষমতা নিয়ে জীবন ও মৃত্যু পণ করে লড়াই চলতে থাকে; সাধারণত যে ভণ্ডামির মুখোশ পরে মানুষরা তাদের সত্যকার মনোবৃত্তিকে গোপন করে রাখে সে মুখোশ যায় খুলে; তার পিছন থেকে বেরিয়ে পড়ে বাস্তব সত্তা, গোটা সমাজেরই ভিত্তিমূলে যে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাস্তব সত্য। রাশিয়াতে ১৯১৭ সনটি ছিল এমন একটি যুগসন্ধিক্ষণ; জনসাধারণ, বিশেষ করে শহর অঞ্চলের শিল্পজীবী শ্রমিকরা, যারা বিপ্লবের একেবারে মধ্যকার মানুষে, তারা বাস্তব ঘটনাচক্র থেকেই তাদের জীবনের শিক্ষা গ্রহণ করল; প্রায় দিন্‌কের দিন তাদের জ্ঞান আর মতামত বদলে যেতে লাগল। স্থায়িত্ব বা ভারসাম্য বলে কোথাও কিছু সে দিন ছিল না। মানুষের জীবনে জেগেছে গতির স্পন্দন, লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া; লোকেরা আর শ্রেণীরা যে যে দিকে পারে টানাটানি আর ঠেলাঠেলি করে বেড়াচ্ছে। তখনও অনেক লোক আশা করছে, জারের রাজত্ব আবার ফিরে আসবে, তাকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে ষড়যন্ত্র করছে; কিন্তু তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য দল এর পিছনে ছিল না, তাই এদের কথা আমরা বাদ দিয়েই যেতে পারি। বিরোধ প্রধানত বাধল অস্থায়ী সরকার আর সোভিয়েটের মধ্যে; যদিও তখনও সোভিয়েটের মধ্যে অধিকাংশ লোকই সে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা এবং আপোসের পক্ষপাতী। এই আপোসকামীদের ভয় ছিল, পাছে শাসনভার এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বোঝা তাদের ঘাড়ে এসে চাপে। “সরকারের পরিত্যক্ত জায়গা দখল করবে কে? আমরা? কিন্তু আমাদের হাত যে কাঁপে ......।” সোভিয়েটের একজন সভ্য তাঁর বক্তৃতায় এই উক্তি করেছিলেন। এরকম উক্তি শুনতে আমরাও অভ্যস্ত আছি; ভারতবর্ষেও কম্পিতবাহু এবং ভীরুহৃদয় বহু ব্যক্তির মুখে এরকম উক্তি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু তাই বলে সময় যে দিন সত্যই আসে, সবল বাহু আর সাহসী হৃদয়েরও অভাব হয় না সে দিন।

 অস্থায়ী সরকার আর সোভিয়েটের মধ্যে বিরোধ না বাধে, দুই পক্ষেরই আপোসকামীরা সেজন্যে অনেক চেষ্টা করছিলেন; কিন্তু সে বিরোধ না বেধে পারেই না। সরকারের অভিপ্রায় ছিল—যুদ্ধ চালিয়ে তারা মিত্রপক্ষকে খুশি রাখবে, রাশিয়ার ধনীশ্রেণীদের খুশি রাখবে তাদের যা-কিছু সম্পত্তি আছে সমস্ত যথাসম্ভব রক্ষা করে দিয়ে। জনসাধারণের সঙ্গে সোভিয়েটের সম্পর্ক বেশি নিবিড় ছিল। জনসাধারণ শান্তি চায়, কৃষকদের জন্যে জমি চায়; শ্রমিকরাও দিনে আট ঘণ্টার অনধিক কাজ প্রভৃতি অনেক ব্যবস্থা চায়—এসব সোভিয়েট টের পাচ্ছিল। অতএব দেখা গেল, সোভিয়েটের চাপে পড়ে সরকার বিহ্বল হয়ে গেছে, আবার সোভিয়েট নিজেও জনসাধারণের চাপে পড়ে বিহ্বল হয়ে পড়ল; কারণ, এইসব দল আর নেতাদের তুলনার জনসাধারণের মধ্যেই বিপ্লবের চেতনা অনেক বেশি জোরালো ছিল।

 সরকারকে টেনে সোভিয়েটের সঙ্গে আরও একটু খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা করা হল; কেরেন্‌স্কি-নামক একজন প্রতিবাদী আইনজীবী এবং সুবক্তা সরকারের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি হয়ে উঠলেন। অনেক চেষ্টার ফলে তিনি একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করলেন। সোভিয়েটের মধ্যে সংখ্যাগুরু দল ছিল মেন্‌শেভিকরা, তাদেরও কয়েকজন প্রতিনিধি এই সরকারে এসে যোগ দিলেন। জর্মনির বিরুদ্ধে একটা অভিযান করে ইংলণ্ড আর ফ্রান্সকে প্রসন্ন করতেও কেরেন্‌স্কি অনেক চেষ্টা করলেন। সে অভিযান ব্যর্থ হল; সেনাবাহিনী বা জনসাধারণের আর যুদ্ধ করবার আগ্রহ ছিল না।

 ইতিমধ্যে পেট্রোগ্রাডে নিখিল রাশিয়ার সোভিয়েট কংগ্রেসের অনেক অধিবেশন হল; প্রত্যেক অধিবেশনেই পূর্ব বারের চেয়ে বেশি চরমপন্থী মতামত প্রকাশ পেল। ক্রমেই বেশিসংখ্যক বল্‌শেভিক এই কংগ্রেসের সভ্য নির্বাচিত হতে লাগল। মেন্‌শেভিক আর সোশ্যাল রেভোল্যুশনারি (সমাজবিপ্লবী—কৃষকদের একটি দল) এই দুটি দলই এত দিন প্রবল ছিল, তাদের সংখ্যাগৌরব ক্রমে হ্রাস পেয়ে এল। বিশেষ করে পেট্রোগ্রাডের শ্রমিকদের মধ্যে বল্‌শেভিকদের প্রভাব খুব বেড়ে উঠল। দেশের সর্বত্র তখন বহু সোভিয়েট গড়ে উঠছে; সরকারের কোনো হুকুমই তারা মানতে রাজি নয়, যদি-না তাতে সোভিয়েটেরও স্বাক্ষর থাকে। রাশিয়াতে কোনো বলশালী মধ্যবিত্তশ্রেণী ছিল না; অস্থায়ী সরকার এত দুর্বল হবার সেও একটা বড়ো কারণ।

 রাজধানীতে যখন শাসনক্ষমতা নিয়ে এই কাড়াকাড়ি চলেছে, কৃষকরা ও দিকে নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে শুরু করল। আগেই বলেছি, মার্চ মাসের বিপ্লব নিয়ে এই কৃষকরা তেমন উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে নি; আবার এর বিরোধীও তারা ছিল না। তারা শুধু অপেক্ষা করছিল, দেখছিল জল কোন্ দিকে গড়ায়। কিন্তু বড়ো বড়ো ভূস্বামী আর জমিদারদের ভয় ধরল, তাদের জমি এবার কেড়েই নেওয়া হবে। সেই ভয়ে এঁরা এঁদের জমিকে ছোটো ছোটো খণ্ডে বিভক্ত করে বহু নকল মালিকের হাতে ছড়িয়ে দিলেন, যেন তারা জমিটাকে বেনামিতে তাঁদেরই জন্যে বজার রাখে। অনেক জমি বিদেশীদের হাতেও তুলে দিলেন তাঁরা। এমনি করে তাঁরা নিজেদের ভূসম্পত্তি টিঁকিয়ে রাখতে চেষ্টা করলেন। কৃষকদের এটা মোটেই পছন্দ হল না, তারা সরকারকে অনুরোধ জানাল, আইন করে সমস্ত রকমের জমি বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হোক। সরকার ইতস্তত করতে লাগলেন—এ অবস্থায় কী করা যায়? তাঁরা তো কোনো পক্ষকেই চটাতে চান না। কৃষকরা তখন নিজেরাই যা করবার করতে লেগে গেল। এপ্রিল মাসেই অনেক জায়গাতে তারা ভূস্বামীদের গ্রেপ্তার করল, তাঁদের জমি দখল করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল। এই ব্যাপারে প্রধান অংশ গ্রহণ করল রণক্ষেত্র থেকে প্রত্যাগত সৈন্যরা (তারা সকলেই কৃষকশ্রেণীর লোক)। এই আন্দোলন বাড়তে লাগল, ক্রমে একেবারে ব্যাপক ভাবেই জমি দখল করা হতে লাগল। জুন মাস নাগাদ দেখা গেল, সাইবেরিয়ার স্তেপ-অঞ্চল পর্যন্ত এর ধাক্কা গিয়ে পৌঁচেছে। সাইবেরিয়াতে কোনো বড়ো জমিদার ছিল না; কাজেই সেখানে কৃষকরা দখল করে বসল যত গির্জা আর মঠের জমি।

 এটা লক্ষ্য কোরো, এই-যে বড়ো বড়ো জমিদারিগুলো কেড়ে নেওয়া, এটা কিন্তু করছিল সম্পূর্ণভাবেই কৃষকরা, একেবারেই নিজের উদ্যমে। বল্‌শেভিক বিপ্লব এসেছে এরও অনেক মাস পরে। লেনিনের ইচ্ছা ছিল, সমস্ত জমি অবিলম্বে কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, কিন্তু সুশৃঙ্খল প্রণালীতে। যেখানে যেমন খুশি বিশৃঙ্খলভাবে জমি দখল করার তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিরোধী। এর বহু দিন পরে বল্‌শেভিকরা শাসনক্ষমতা হস্তগত করল, রাশিয়ার সমস্ত জমি তার আগেই কৃষকের মালিকানা সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।

 লেনিনের প্রত্যাবর্তনের ঠিক এক মাস পরে আর-একজন প্রসিদ্ধ নির্বাসিত নেতা পেট্রোগ্রাডে এসে পৌঁছলেন। ইনি হচ্ছেন ট্রট্‌স্কি। তিনি ফিরে এলেন নিউইয়র্ক থেকে। পথের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা তাঁকে আটকে দিয়েছিল। ট্রট্‌স্কি পুরোনো বল্‌শেভিক-দলের লোক ছিলেন না; তখন তিনি মেন্‌শেভিকও নন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তিনি লেনিনের পক্ষে যোগ দিলেন, পেট্রোগ্রাড-সোভিয়েটের সবচেয়ে প্রধান ব্যক্তি হয়ে উঠলেন। ট্রট্‌স্কি ছিলেন অতি চমৎকার বক্তা, খুব ভালো লেখক, এবং ঠিক একটা ইলেকট্রিক ব্যাটারির মতোই প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তাঁকে দলে পেয়ে লেনিনের শক্তি অত্যন্ত বেড়ে গেল।

 ট্রট্‌স্কি একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন, তার নাম ‘আমার জীবন’। এই বই থেকে একটি দীর্ঘ উক্তি আমি এখানে উদ্‌ধৃত করে দিচ্ছি। ‘মডার্ন সার্কাস’ নামক একটি গৃহে তিনি বহু সভায় বক্তৃতা করেছিলেন, এতে তারই একটি বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। এটা যে শুধু একটা সুন্দর রচনা তাই নয়, ১৯১৭ সনে সেই অদ্ভুত বিপ্লবের দিনে পেট্রোগ্রাডের অবস্থা কী ছিল, তারও একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং জীবন্ত চিত্র তাঁর এই লেখা থেকে আমরা পাচ্ছি:

 "নিশ্বাসে এবং প্রতীক্ষায় গৃহের বায়ু ভারাক্রান্ত; সে বায়ুমণ্ডল চিৎকারে এবং হর্ষধ্বনিতে একেবারে ফেটে পড়ত—মডার্ন সার্কাসের শ্রোতাদের এই ছিল বিশেষত্ব। আমার উপরে, আমার চার পাশে অসংখ্য মানুষ, বাহুতে বাহুতে বক্ষে বক্ষে মাথার মাথায় ঠেলাঠেলি করে দাঁড়িয়েছে। আমি বক্তৃতা করতাম অসংখ্য মানবদেহের মধ্যবর্তী একটি উষ্ণ গহ্বরের মধ্যে দাঁড়িয়ে; যখনই একটুখানি হস্তপ্রসারণ করি, সে হাত কারও-না-কারও অঙ্গ স্পর্শ করে; উত্তরে সে ব্যক্তি যেন কৃতজ্ঞ বিহ্বল হয়ে নড়ে ওঠে। দেখে বুঝি, আমার বক্তৃতার সাফল্য নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো হেতু নেই; বক্তৃতা আমার এখন বন্ধ করলে চলবে না, শুধু বলেই যেতে হবে। উচ্ছ্বসিত জনতার সেই সান্নিধ্য যে বৈদ্যুতিক চেতনার সঞ্চার করে তার আকর্ষণ রোধ করার সাধ্য কোনো বক্তারই নেই, তিনি যতই শ্রান্ত, অবসন্ন হোন না কেন। তারা জানতে চায়, বুঝতে চায়, পথের নির্দেশ পেতে চায়। এক-এক সময় মনে হত যেন এই জনতার উগ্র অনুসন্ধিৎসার স্পর্শ আমি আমার মুখের উপরে অনুভব করছি; জনতার সমস্ত মানুষ যেন একাগ্রতার নিবিড়তায় মিলে একটি দেহে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায়, আগে থেকে যেসমস্ত যুক্তি এবং বাক্য ভেবে রেখেছি, আমার মনের ব্যাকুল আবেগের চাপে তা ভেঙে বিলুপ্ত হয়ে যেত; তার পরিবর্তে নূতনতর কথা নূতন যুক্তি যেন আমার অবচেতন মনের তলদেশ হতে সুশৃঙ্খলভাবে বার হয়ে আসত—সে কথা বক্তার পক্ষে একেবারেই অপ্রত্যাশিত, অথচ শ্রোতাদের পক্ষে তারই প্রয়োজন ছিল। এই অবস্থায় আমার মনে হত যেন আমি নিজেই বাইরে দাঁড়িয়ে বক্তার কথা শুনছি, তার চিন্তাধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চেষ্টা করছি; ভয় হত যেন আমার সচেতন যুক্তির স্পর্শ লাগলে তিনি নিদ্রা-যোগে ভ্রমণকারীর মতো অতর্কিতে চমকে ছাদের কিনারা থেকে পড়ে খাবেন।

 “এই ছিল মডার্ন সার্কাসের সভার রূপ। এর আকৃতি-প্রকৃতি এরই নিজস্ব বস্তু—উৎসাহে জ্বলন্ত, বেদনায় কোমল, উদ্দীপনায় উন্মত্ত। শিশুরা নিশ্চিন্তমনে মাতাদের বক্ষোলগ্ন হয়ে দুগ্ধ পান করছে, সে মাতাদের কণ্ঠে তখন অনুমোদন বা ভয়প্রদর্শনের চিৎকার ধ্বনিত হচ্ছে। সমস্ত জনতাটারই রূপ ছিল এই ক্ষুধার্ত শিশু সে, শুষ্ক পিপাসিত ওষ্ঠ বিপ্লবের স্তনবৃন্তে সংলগ্ন করে দুগ্ধপান করছে। সে শিশু কিন্তু অতি দ্রুতগতিতে বড়ো হয়ে উঠল।”

 এইভাবে পেট্রোগ্রাডে এবং রাশিয়ার অন্যান্য শহরে ও গ্রামে বিপ্লবের নাটক অভিনীত হয়ে চলল, সে নাটকের দৃশ্যপটের ঘন ঘন পরিবর্তন হচ্ছে। সর্বত্রই দেখা গেল, যুদ্ধের দরুন যে নিদারুণ চাপ দেশের উপরে পড়ছিল তার ফলে আর্থিকব্যবস্থার একটা বিরাট ভাঙন আসন্ন হয়ে উঠেছে। অথচ তখনও ব্যবসাদারেরা তাদের যুদ্ধের বাজারের লাভ ঠিকই গুছিয়ে নিচ্ছে।

 কারখানা এবং সোভিয়েটগুলিতে বল্‌শেভিকদের শক্তি এবং প্রভাব ক্রমেই বেড়ে চলল। দেখেশুনে কেরেন্‌স্কি ভয় পেলেন; স্থির করলেন, এদের দমন করতে হবে। প্রথমটা লেনিনের নামে কুৎসা প্রচারের একটা চেষ্টা করা হল; বলা হল, তিনি জর্মনির গপ্তচর, রাশিয়ার মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবার জন্যেই জর্মন তাঁকে পাঠিয়েছে। সুইজারল্যাণ্ড থেকে তিনি কি জর্মনির মধ্য দিয়েই রাশিয়ায় আসেননি? জর্মন কর্তৃপক্ষের সাহায্য না থাকলে এলেন কী করে? মধ্যবিত্তশ্রেণীরা লেনিনের উপর অত্যন্ত বিরূপ হয়ে উঠল, তারা তাঁকে দেশদ্রোহী বলেই বুঝে নিল। লেনিনকে গ্রেপ্তার করবার জন্যেও পরোয়ানা বার করলেন কেরেন্‌স্কি—লেনিন বিপ্লবী বলে নয়, জর্মনির সহায়ক দেশদ্রোহী বলে। লেনিনের পূর্বেই ইচ্ছা ছিল, তাঁর সত্য একটা বিচার হোক, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর নামে এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করবেন। কিন্তু তাঁর সহকর্মীরা তাতে রাজি হলেন না, তাঁদের পীড়াপীড়িতে পড়ে লেনিন আত্মগোপন করলেন। ট্রট্‌স্কিকে গ্রেপ্তার করা হল; কিন্তু পরে পেট্রোগ্রাড সোভিয়েটের নির্বন্ধে পড়ে আবার তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হল। বল্‌শেভিক দলের আরও অনেকে গ্রেপ্তার হলেন, তাঁদের সংবাদপত্রগুলো জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হল; বল্‌শেভিকদের পক্ষপাতী বলে যাদের উপর সন্দেহ হল সেই শ্রমিকদের অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নেওয়া হল। এই শ্রমিকদের মনের ভাব ক্রমেই বেশি উগ্র এবং অস্থায়ী সরকারের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়ে উঠছিল; বার বার এরা সে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানিয়ে বড়ো বড়ো শোভাযাত্রা ইত্যাদি বার করছিল।

 কিছু দিনের মতো একটা ছেদ পড়ল, সেই ফাঁকে বিপ্লববিরোধী দল মাথা তুলে দাঁড়াল। কর্নিলভ নামক একজন বৃদ্ধ সেনাপতি একটি সেনাবাহিনী নিয়ে রাজধানীর দিকে যাত্রা করলেন; তাঁর উদ্দেশ্য, অস্থায়ী সরকার সুদ্ধ সমস্ত বিপ্লবটিকেই তিনি ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু শহরের কাছে পৌঁছে দেখলেন, তাঁর সমস্ত সৈন্য হাওয়া হয়ে উড়ে গেছে। বিপ্লবের পক্ষেই গিয়ে যোগ দিয়েছে তারা।

 ঘটনার স্রোত তখন দ্রুতবেগে বয়ে চলেছে। সোভিয়েট ক্রমেই সরকারের একটি বিশিষ্ট প্রতিবন্ধী হয়ে উঠছে; অনেক সময় সরকারি আদেশ পর্যন্ত সে নাকচ করে দিচ্ছে, বা তার উল্‌টো আদেশ জারি করছে। তখন স্মল্‌নি ইন্‌স্টিটিউটের বাড়িটাই হয়েছে সোভিয়েটের দপ্তরখানা; পেট্রোগ্রাডের বিপ্লবও সেইখান থেকেই চালানো হচ্ছে। এই স্মল্‌নি ইন্‌স্টিটিউট ছিল অভিজাতবংশের মেয়েদের জন্যে একটা বেসরকারি বিদ্যালয়।

 লেনিন পেট্টোগ্রাডের উপকণ্ঠে এসে পৌঁছলেন। বল্‌শেভিকরা স্থির করল, অস্থায়ী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেবার সময় এবার এসেছে। এই বিদ্রাহের সমস্ত বন্দোবস্ত করবার ভার দেওয়া হল ট্রট্‌স্কিকে। কোন্ কোন্ মর্মস্থল দখল করে নিতে হবে, কখন নিতে হবে, ইত্যাদি সমস্ত পরিকল্পনাই অতি যত্নে ছক কেটে কেটে স্থির করা হল। ৭ই নভেম্বরকে বিদ্রোহের দিন বলে ধার্য করা হল। সেই দিন রাশিয়ার সমস্ত সোভিয়েটের একটি যুক্ত অধিবেশন হবার কথা ছিল। লেনিনই এই দিনটিকে স্থির করলেন; যে যুক্তি দেখালেন সে চমৎকার। তিনি নাকি বলেছিলেন, “৬ই নভেম্বর করতে গেলে বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। বিদ্রোহ করতে হলে সমস্ত রাশিয়াকে একত্র ধরেই করতে হবে; ৬ই তারিখে কংগ্রেসের সমস্ত প্রতিনিধিরা এসে পৌঁছবেন না। আবার ৮ই করতে গেলেও খুব বেশি দেরি হয়ে যাবে—সে দিন দেখা যাবে কংগ্রেস রীতিমতো সুশৃংখল হয়ে অধিবেশন শুরু করেছে কিন্তু এইরকম খুব বৃহৎ একটা জনসংঘের পক্ষে দ্রুত এবং নিশ্চিত কাজ করা সহজ নয়। অতএব আমাদের কাজ উদ্ধার করতে হবে ৭ই তারিখে। কংগ্রেসের সভ্যরা সেই দিনই এসে মাত্র একত্র হবেন। আমরা তাদের গিয়ে বলব, “এই-যে, ক্ষমতা হস্তগত করেছি! এখন একে নিয়ে কী করবে তোমরা তাই বলো!” এই ছিল সেই তীক্ষ্ণবুদ্ধি কুশলী বিপ্লবীর যুক্তি; তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, বাইরের দৃষ্টিতে যেসব ঘটনা অতি তুচ্ছ, অনেক সময়ে তারই উপর বিপ্লবের সাফল্য অসাফল্য নির্ভর করে।[]

 ৭ই নভেম্বর এল। সোভিয়েটের সৈন্যরা গিয়ে সরকারি বাড়িগুলো দখল করল; বিশেষ করে টেলিগ্রাফ অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, সরকারি ব্যাঙ্ক্ ইত্যাদি স্থানগুলি। এদের কেউ বাধাই দিল না। একজন ব্রিটিশ চর এর সম্বন্ধে যে সরকারি বিবরণ ইংলণ্ডে পাঠালেন তাতে তিনি এর বর্ণনা দিলেন এই বলে; “অস্থায়ী সরকার শুধু শূন্যে মিলিয়ে গেল।”

 নতুন সরকারের বড়োকর্তা হলেন লেনিন; তিনি এর প্রেসিডেণ্ট, আর ট্রট্‌স্কি এর পররাষ্ট্রসচিব। পরদিন ৮ই নভেম্বর, লেনিন স্ম‌ল্‌নি ইন্‌স্টিটিউটে সোভিয়েট কংগ্রেসের অধিবেশনে এসে উপস্থিত হলেন। তখন সন্ধ্যাবেলা। কংগ্রেস বিপুল কোলাহল ক’রে তার নেতাকে অভ্যর্থনা করল। রীড-নামক একজন আমেরিকান সাংবাদিক সেদিন উপস্থিত ছিলেন; বক্তৃতামঞ্চে গিয়ে উঠবার সময় মহাত্মা লেনিন কে কেমন দেখাচ্ছিল তিনি তার এইরকম বর্ণনা দিয়েছেন:

 “বেঁটে জোয়ান চেহারা, কাঁধের উপরে একটা মস্ত বড়ো মাথা বসানো, ছোটো ছোটো চক্ষু, ঈষৎ চ্যাপ্‌টা নাক, বিস্তৃত প্রসন্ন মুখ, ভারী চিবুক; মুখে আপাতত কামানো, কিন্তু এর মধ্যেই আবার দাড়ি গজাতে শুরু করেছে—অতীত কালে এবং পরবর্তী কালে তাঁর সে দাড়ি সকলেরই পরিচিত ছিল। ঢোলাঢালা বেমানান পোশাক, ট্রাউজারটা অত্যধিক বড়ো। অজ্ঞ জনসাধারণ মুগ্ধ হতে পারে এমন চমকপ্রদ কিছুই তাঁর আকৃতিতে নেই। আশ্চর্য একজন জনপ্রিয় নেতা—তিনি নেতা হয়েছেন শুধু তাঁর বুদ্ধির জোরে। তাঁর মধ্যে কোথাও রূপের দীপ্তি নেই, রসিকতার লেশমাত্র নেই, অপরের সঙ্গে আপোস করে চলবার প্রবৃত্তি নেই। কারও অন্তরঙ্গ বন্ধুও হবার অভ্যেস নেই, দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এমন কোনোই ব্যক্তিগত অভ্যেস বা বাতিকও নেই। কিন্তু তাঁর আছে অত্যন্ত গভীর তত্ত্বকেও অতি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করবার ক্ষমতা, আছে যে-কোনো বাস্তব অবস্থার স্বরূপ বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা। অত্যন্ত তীক্ষ বুদ্ধি―সঙ্গে সঙ্গে সে বুদ্ধিকে পরিচালনার জন্য দুরন্ত দুঃসাহস।”

 একই বৎসরের মধ্যে দ্বিতীয়বার বিপ্লব সফল হল; এই দ্বিতীয় বিপ্লবটা তখন পর্যন্ত আশ্চর্যরকম বিনা হাঙ্গামায় সম্পন্ন হয়েছে। শাসনশক্তি হস্তান্তরিত হয়েছে, কিন্তু সেজন্য রক্তপাতের প্রায় প্রয়োজনই হয় নি। বরং মার্চের বিপ্লবে অনেক বেশি যুদ্ধ, অনেক বেশি নরহত্যা করতে হয়েছিল। মার্চের বিপ্লব ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং অসংযত; নভেম্বরের বিলম্ব করা হল সযত্নে-রচিত পরিকল্পনা অনুসারে। দরিদ্রতম শ্রেণীদের, বিশেষ করে শিল্পজীবী শ্রমিকদের প্রতিনিধিরাই একটি দেশের কর্তৃত্বভার আয়ত্ত করে বসল পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর কখনও হয় নি। কিন্তু তাই বলে সিদ্ধিলাভ তাদের পক্ষে খুব সহজও হল না। চার দিকে ঝড়ের মেঘ ভরে উঠছিল। সে ঝড় একেবারে দুর্দান্ত আক্রোশে তাদের উপর এসে ভেঙে পড়ল।

 লেনিন এবং তাঁর নবসৃষ্ট বল্‌শেভিক সরকারের সামনে তখন অবস্থাটা কী দাঁড়িয়েছে দেখা যাক। জর্মন-যুদ্ধ তখনও চলছে, যদিও রাশিয়ার সেনাবাহিনী তখন একেবারেই বিধ্বস্ত; জর্মনির সঙ্গে সে আরও যুদ্ধ করবে এমন সম্ভাবনা নেই। দেশের সর্বত্রই বিশৃঙ্খলা, ইতস্তত-বিচ্ছিন্ন সেনাদল এবং গুণ্ডা-ডাকাতের দল যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। ব্যবসাবাণিজ্য ইত্যাদি একেবারেই ভেঙে পড়েছে। দেশে খাদ্য নেই, লোকেরা অনাহারে পীড়িত। লেনিনের চার পাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন যুগের প্রতিনিধিরা, তারা বিপ্লবকে ভেঙে নষ্ট করতে উদ্যত। রাষ্ট্রের সংগঠনব্যবস্থা তখনও ধনিকতন্ত্রী, অতএব পুরোনো সরকারি কর্মচারী যারা আছে তাদের প্রায় কেউই এই নূতন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতে রাজি নয়; ব্যাঙ্ক্‌রা একে টাকা দিচ্ছে না; টেলিগ্রাফ অফিসের কর্মচারীরা পর্যন্ত এদের টেলিগ্রাম পাঠাতে রাজি হয় না। অত্যন্ত কঠিন অবস্থা, এতে অতিবড়ো সাহসী লোকেরও ভয় ধরে যায়।

 লেনিন এবং তাঁর সহকর্মীরা কিন্তু ভয় পেলেন না, কাজে লেগে গেলেন। তাঁদের প্রথম চিন্তা হল, জর্মনির সঙ্গে শান্তিস্থাপন করতে হবে; একটুও দেরি না করে তাঁরা যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করে ফেললেন। ব্রেস্ট্লিটভস্ক্‌ শহরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনা সভা বসল। জর্মনরা ভালো করেই জানত, বল্‌শেভিকদের আর যুদ্ধ করবার শক্তি নেই। সেই গর্ব এবং মূর্খতার বশে তারা অতি প্রচণ্ড এবং অপমানকর সমস্ত সন্ধির শর্ত দাবি করে বসল। বল্‌শেভিকরা শান্তিস্থাপনের জন্যে ব্যগ্র, কিন্তু জর্মনদের দাবির বহর দেখে তারাও স্তম্ভিত হয়ে গেল; তাদের অনেকে স্পষ্টই বলল, এ শর্ত মেনে নেওয়া চলতেই পারে না। লেনিন বললেন, তা হয় না, যেমন করে হোক সন্ধি করতেই হবে। একটি গল্প আছে শান্তি-আলোচনায় রাশিয়ার প্রতিনিধিদের মধ্যে ট্রট্‌স্কিও একজন ছিলেন। জর্মনরা জানাল, কোনো একটি ব্যাপারে তাঁকে সান্ধ্য-পরিচ্ছদ পরে যেতে হবে। ট্রট্‌স্কি‌ মুশকিলে পড়লেন; শ্রমিকদের প্রতিনিধি তিনি, তাঁর কী এইরকমের বড়োলোকি পোশাক পরে যাওয়া উচিত হবে? কী করবেন নির্দেশ চেয়ে তিনি লেনিনকে টেলিগ্রাম করলেন। লেনিন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, “শান্তিস্থাপনের যদি সুবিধা হয়, পেটিকোট পরেও যেতে পারো!”

 সোভিয়েট যখন সন্ধির শর্ত নিয়ে তর্কবিতর্ক করছে, জর্মনি সেই ফাঁকে পেট্রোগ্রাডের দিকে অভিযান শুরু করল; সন্ধির শর্তও আরও অনেক কঠিন করে তুলল। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েট লেনিনের উপদেশই মেনে নিল; ১৯১৮ সনের মার্চ মাসে ব্রেস্ট্‌লিটভস্ক্ শহরে তারা সন্ধিপত্রে সাক্ষর করল, যদিও অত্যন্ত অপ্রসন্ন মনে। এই সন্ধির ফলে পশ্চিম দিকে রাশিয়ার একটা প্রকাণ্ড অঞ্চল জর্মানির দখলে চলে গেল। তবুও যে-কোনো মূল্যে সন্ধি তখন স্বীকার করে নিতেই হয়েছিল; কারণ, লেনিনের ভাষায়, “রুশ সেনা সন্ধির স্বপক্ষেই ভোট দিয়েছিল, পা দেখিয়ে।”

 বিশ্বযুদ্ধে যত দেশ যোগ দিয়েছে সকলের সঙ্গেই একটা সর্বব্যাপী সন্ধিস্থাপন করা যায় কি না, সোভিয়েট প্রথমে সেই চেষ্টাই করেছিল। ক্ষমতা হাতে পাবার পরদিনই তারা সমস্ত পৃথিবীতে শান্তিস্থাপনের সংকল্প প্রকাশ করে একটি বিজ্ঞপ্তি বার করল; স্পষ্ট করেই বলল, জার যেসব গোপন সন্ধি করেছিলেন তার দরুন রাশিয়ার সমস্ত দাবি এবং অধিকার সোভিয়েট ছেড়ে দিচ্ছে। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ তুর্কিদেরই থাকবে; অন্যের জায়গাও রাশিয়া আর দখল করবে না। সোভিয়েটের এই আহ্বানে কেউই কর্ণপাত করল না, কারণ তখনও দুই পক্ষেরই মনে জয়ের আশা রয়েছে, দুই পক্ষই যুদ্ধজয়ের লাভটা হাতিয়ে নিতে উৎসুক। অবশ্য সোভিয়েট যে এই শান্তির কথা তুলল, এর পিছনে খানিকটা উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের বিজ্ঞাপনপ্রচার, তাতে সন্দেহ নেই। সমস্ত দেশেরই জনসাধারণ এবং যুদ্ধশ্রান্ত সেনার উপরে সে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল; যাতে তারাও অন্যান্য দেশে সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে তোলে। সোভিয়েটের লক্ষ্যই ছিল সমস্ত পৃথিবীময় বিপ্লব ঘটানো; সোভিয়েটের নেতাদের ধারণা ছিল, সেই হচ্ছে তাঁদের নিজেদের বিপ্লবটিকে টিকিয়ে রাখবার একমাত্র পন্থা। সোভিয়েটের প্রচারবানীর ফলে ফরাসি এবং জর্মন সেনা অনেকখানি বিচলিত হয়ে উঠেছিল, সে কথা- তোমাকে আগেই বলেছি।

 লেনিনের বিশ্বাস ছিল, জর্মনির সঙ্গে ব্রেস্ট্‌লিটভস্কে যে সন্ধি করা হল সেটা একটা সাময়িক ব্যাপার মাত্র, বেশি দিন সে টিঁকবে না। বাস্তবিকই এর ন’ মাস পরে পশ্চিম রণাঙ্গনে মিত্রপক্ষের হাতে জর্মনি পরাজিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই সোভিয়েট এই সন্ধিকে বাতিল করে দিল। লেনিনের শুধু উদ্দেশ্য ছিল, পরিশ্রান্ত শ্রমিকদের আর সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের একটু বিশ্রাম, একটু অবসর দেওয়া, যেন তারা একবার বাড়ি যেতে পারে, বিপ্লব দেশে কতখানি কাণ্ড ঘটিয়ে তুলেছে সেটা একবার নিজের চোখে দেখে আসতে পারে। তাঁর ইচ্ছা ছিল, কৃষকরা বুঝুক জমিদাররা আর নেই, জমি এখন তাদেরই হয়ে গেছে; শিল্পজীবী শ্রমিকরাও টের পাক যে, তাদের যারা এতদিন শোষণ করছিল তাদের আর অস্তিত্ব নেই। তা হলেই তারা বুঝবে, বিপ্লব থেকে যে লাভ তাদের হল তার মূল্য কতখানি; তখন সেই বিপ্লবকে রক্ষা করবার জন্যে তারা ব্যগ্র হয়ে উঠবে; তাদের আসল শত্রু কারা তাও আর তাদের অজানা থাকবে না। এই ছিল লেনিনের মনের অভিপ্রায়; তিনি ভালো করেই জানতেন দেশে গৃহস্থদের দিন আসন্ন হয়ে আসছে। তাঁর এই নীতির সার্থকতা পরে সগৌরবে প্রমাণিত হয়েছে। এই কৃষক এবং শ্রমিকরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে চলে গেল তাদের ক্ষেত আর কারখানায়; বল্‌শেভিক বা সমাজতন্ত্রবাদী এরা ছিল না, তবুও তারাই হয়ে উঠল বিপ্লবের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু এবং সমর্থক, কারণ বিপ্লবের ফলে যা তারা পেয়েছে তাকে আবার হারাতে তাদের ইচ্ছা ছিল না।

 জর্মনদের সঙ্গে যেমন করে হোক একটা বোঝাপড়া করবার চেষ্টা যখন তাঁরা করছিলেন, ঠিক তার সঙ্গে সঙ্গেই বল্‌শেভিক নেতারা দেশের আভ্যন্তরীণ অবস্থার দিকেও মনোযোগ দিলেন। বহুসংখ্যক প্রাক্তন সামরিক কর্মচারী এবং গুণ্ডাশ্রেণীর লোক মেশিনগান এবং রণসজ্জা নিয়ে দেশের মধ্যে ডাকাতি-ব্যবসা করে বেড়াচ্ছিল; বড়ো বড়ো শহরগুলোর মধ্যে পর্যন্ত এরা মানুষ খুন এবং লুটতরাজ করে বেড়াত। পুরোনো দিনের অ্যানার্কিস্ট দলেরও কিছু লোক ছিল, তারা সোভিয়েটের উপর প্রসন্ন নয়, তারাও নানান হাঙ্গামার সৃষ্টি করতে লাগল। সোভিয়েট কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত কঠোর হস্তে এইসমস্ত দস্যুদল এবং অন্যান্য বিঘ্নকারীকে বিচূর্ণ করে দিলেন।

 সোভিয়েট শাসনের একটা বড়ো বিপদের কারণ হল দেশের সমস্ত সিভিল সার্ভিসের কর্মচারীরা। এদের অনেকে বল্‌শেভিকদের অধীনে কাজ করতে বা কোনোরকমেই তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করল। লেনিন নিয়ম করলেন, যে কাজ করবে না সে খেতেও পাবে না; কাজ না করো, খাদ্যও নেই। যে সরকারি কর্মচারীরা সহযোগিতা করছিল না তাদের সকলকেই অবিলম্বে বরখাস্ত করা হল। ব্যাঙ্কাররা সিন্দুক খুলতে রাজি হয় নি, সে সিন্দুক ডিনামাইট দিয়ে খোলা হল। পুরোনো যুগের যে কর্মচারীরা সহযোগিতা করতে সম্মত হন নি তাঁদের সম্বন্ধে লেনিনের অবজ্ঞা কতখানি ছিল তার চরম দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় একটি ঘটনায়: দেশের প্রধান সেনাপতি তাঁর আদেশ পালন করতে অস্বীকার করলেন। লেনিন তাঁকে বরখাস্ত করলেন, এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ক্লিলেংকো নামক একজন তরুণ বল্‌শেভিক লেফ্‌ট্‌ন্যাণ্টকে প্রধান সেনাপতির পদে নিযুক্ত করলেন।

 এতসব পরিবর্তন সত্ত্বেও কিন্তু রাশিয়াতে পুরোনো ব্যবস্থার অনেকখানিই তখনও টিঁকে রইল। প্রকাণ্ড একটা দেশকে একেবারে হঠাৎ এক দিনে সমাজতন্ত্রী করে ফেলা সহজ নয়; খুব সম্ভবত রাশিয়াতেও এই কাজ সম্পূর্ণ করতে বহু বছর লেগে যেত, যদি-না ঘটনাচক্রে এর গতি দ্রুত হয়ে উঠত। কৃষকরা ভূস্বামীদের তাড়িয়ে দিয়েছিল; বহু ক্ষেত্রে শ্রমিকরাও তাদের পুরোনো মালিকদের আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে তাদের তাড়িয়ে দিল, কলকারখানা দখল করে বসল। সোভিয়েট সে কারখানা আবার সেই পুরোনো ধনিকতন্ত্রী মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দিতে পারে না, অতএব সে নিজেই এই কারখানাগুলি অধিকার করে নিল। এর কিছুদিন পরে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধের সময়ে অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো মালিকরা তাদের কারখানার কলকব্জা জখম করে দিতে চেষ্টা করল। তখন আবার সোভিয়েট সরকার এসে তাদের বাধা দিল, এবং কারখানাগুলোকে রক্ষা করবার জন্যেই সেগুলোকে নিজের অধিকারভুক্ত করে নিল। উৎপাদন-সঙ্গতিকে রাষ্ট্রের আয়ত্ত করে নেওয়া, এও একরকমের রাষ্ট্রায়ত্ত সমাজতন্ত্র, অর্থাৎ এতে কলকারখানা ইত্যাদি রাষ্ট্রের সম্পত্তি হয়ে যায়। এইভাবে সে কাজটি রাশিয়াতে অত্যত দ্রুতবেগে সম্পন্ন হতে লাগল। স্বাভাবিক অবস্থায় কিছুতেই এটা এত দ্রুত করা যেত না।

 সোভিয়েট শাসনের প্রথম ন’ মাসে রাশিয়াতে মানুষের জীবনযাত্রার বিশেষ কোনো তফাত হল না। বল্‌শেভিকরা সমালোচনা এমনকি বিশ্রী গালাগালিও নীরবে সহ্য করে চলল; বল্‌শেভিকবিরোধী পত্রিকাগুলি তখনও প্রকাশিত হচ্ছিল। সাধারণ লোকের তখন প্রায় উপবাসে দিন কাটছে। ধনীদের হাতে তখনও জাঁকজমক এবং বিলাসিতা করবার মতো প্রচুর অর্থ রয়েছে। নৈশ-প্রমোদাগারে তখনও ভিড় হচ্ছে, ঘোড়দৌড় এবং অন্যান্য খেলাধূলাও চলছে। বড়ো বড়ো শহরগুলিতে তখনও বহু ধনী বুর্জোয়া সগৌরবে বাস করছেন, সোভিয়েট সরকারের পতন হতে আর দেরি নেই বলে তাঁরা খোলাখুলিই আনন্দপ্রকাশ করছেন। জর্মনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাবার জন্যে এই ঘোর দেশপ্রেমিকরা একেবারে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন; এখন পেট্রোগ্রাডের অভিমুখে জর্মনদের অভিযান ক্রমেই এগিয়ে আসছে দেখে এঁরা রীতিমতো উৎসব লাগিয়ে দিলেন। জর্মন সেনা অচিরাৎ এসে তাঁদের রাজধানী দখল করে বসবে, ভাবতে তাঁদের মনে আর আনন্দ ধরে না। তাঁদের কাছে বিদেশীর অধীনতার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ের বস্তু ছিল সমাজবিপ্লব। এই ব্যাপার প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়, বিশেষ করে যেখানে শ্রেণীতে শ্রেণীতে সংগ্রাম।

 কাজেই তখন জীবনপ্রবাহ মোটামুটি প্রায় স্বাভাবিকই ছিল; সে সময়ে বল্‌শেভিক-শাসনের আতঙ্ক বলতেও কিছু ছিল না, তাতে সন্দেহ নেই। মস্কোর বিখ্যাত ব্যালে নৃত্য তখনও প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, নৃত্যশালায় তখনও মানুষের ভিড়ের কমতি নেই। জর্মনরা যখন পেট্রোগ্রাডের খুব কাছে এসে পড়ল তখন সোভিয়েট সরকারের দপ্তর মস্কোতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। তখন থেকে মস্কোই তাদের রাজধানী হয়ে রয়েছে। মিত্রপক্ষের রাজদূতরা তখনও রাশিয়া ছেড়ে যান নি। পেট্রোগ্রাড যখন জর্মনদের হাতে পড়বার উপক্রম হল, এঁরা পেট্রোগ্রাড থেকে পালিয়ে গিয়ে ভোলোগ্‌ডা-শহরে নিরাপদ আশ্রয় রচনা করলেন। এটি মফঃস্বলের একটি ছোট্ট শহর, যুদ্ধবিগ্রহের ধুমধড়াক্কা এর কাছেও পৌঁছয় না। এইখানে একত্র জড়ো হয়ে বসে তাঁরা নানারকমের আজগুবি গুজব শুনেতে লাগলেন আর ক্রমাগত বিচলিত এবং উত্তেজিত হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁরা কেবলই উদ্‌বিগ্নচিত্তে ট্রট্‌স্কিকে জিজ্ঞাসা করে পাঠাতেন, গুজব কি সত্য? এই প্রবীণ কূটনীতিকদের স্নায়বিক চাঞ্চল্যের ধাক্কায় ট্রট্‌স্কি শেষে বিরক্ত হয়ে উঠলেন, বললেন, “ভোলোগ্‌ডার এই সম্মানিত ব্যক্তিদের স্নায়বিক উত্তেজনা শান্ত করবার জন্যে আমি একটা ব্রোমাইড-মিক্‌চারের ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছি।” ব্রোমাইড একরকম ওষুধ; যে রোগীরা বাতিকে ভোগে বা অল্পে উত্তেজিত হয় তাদের স্নায়ু শান্ত রাখবার জন্যে ডাক্তাররা এই ওষুধ দেন।

 বাইরের দৃষ্টিতে মনে হবে, জীবনযাত্রা স্বাভাবিক শান্ত গতিতেই বয়ে চলেছে; কিন্তু বাইরের সেই প্রশান্তির তলায় বহু স্রোত এবং ঘূর্ণি তখন ফেনিয়ে উঠছিল। বল্‌শেভিকরা বেশি দিন টিঁকে থাকতে পারবে এ আশা সে দিন কেউই করে নি, তারা নিজেরাও নয়। সকলেই তখন কূটচক্রান্ত করতে ব্যস্ত। দক্ষিণ-রাশিয়াতে ইউক্রেনে জর্মনরা একটা তাঁবেদার-রাষ্ট্র খাড়া করেছে; সন্ধি হওয়া সত্ত্বেও তারা কেবলই যেন হুমকি দেখাচ্ছে, তাদের হাতে সোভিয়েটের রক্ষা নেই। মিত্রপক্ষ স্বভাবতই জর্মনির উপরে রুষ্ট; কিন্তু বল্‌শেভিকদের উপরে তাদের দ্বেষ হল আরও বেশি। ১৯১৮ সনের প্রথম দিকে আমেরিকার প্রেসিডেণ্ট উইল্‌সন সোভিয়েট-কংগ্রেসকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তিনিও যেন পরে সেজন্যে অনুতপ্ত হলেন, সোভিয়েটের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠলেন। অতএব রাশিয়ার মধ্যে যেসব বিপ্লববিরোধী ছিল তাদের কার্যকলাপকে মিত্রপক্ষ গোপনে উৎসাহ দিতে লাগল, টাকা দিয়ে সাহায্য করতে লাগল, অনেক সময়ে সে কাজে নিজেরাও গোপনে অংশগ্রহণ করতে লাগল। বিদেশী গুপ্তচরে মস্কো-শহর ছেয়ে গেল। ব্রিটেনের গুপ্তচর-বিভাগের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিটি—এঁকে বলা হত ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠ চর—এঁকে পর্যন্ত মস্কোতে পাঠানো হল, সেখানে গিয়ে ইনি সোভিয়েট-সরকারের কাজকর্মে বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন বলে। যেসব অভিজাত আর বুর্জোয়াদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তাঁরা ক্রমাগত বিপ্লববিরোধী প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করতে লাগলেন; মিত্রপক্ষ এঁদের টাকা জোগাতে লাগল।

 ১৯১৮ সনের মাঝামাঝি সময়ে এই ছিল অবস্থা। সোভিয়েটের জীবন তখন অতি সূক্ষ্ম সুতোর উপর ঝুলছে।

  1. বল্‌শেভিকদের ক্ষমতা দখল করবার দিন বলে ৭ই নভেম্বর তারিখটি লেনিনই স্থির করে দিয়েছিলেন, এই কথাটি আমাদের বলেছেন আমেরিকান সাংবাদিক রীড; ইনি সে সময়ে পেট্রোগ্রাডে ছিলেন। কিন্তু অন্য যাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা অনেকে এ কথা স্বীকার করেন না। লেনিন তখন আত্মগোপন করে রয়েছেন; তাঁর ভয় ছিল, অন্যান্য বল্‌শেভিক নেতারা হয়তো অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করব বলে বসে থাকবেন, এবং ঠিক ক্ষণটি এসেও নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তিনি সারাক্ষণ তাঁদের তাড়া দিচ্ছিলেন, কাজে নেমে পড়ো'। ৭ই তারিখে অবস্থা অনুকূল হয়ে উঠল, এবং তাই দেখে সেই দিনই এঁরা কাজ সম্পন্ন করে ফেললেন।