বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বহিঃপৃথিবীর সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক লোপ

উইকিসংকলন থেকে

৮১

বহিঃপৃথিবীর সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক লোপ

২৩শে জুলাই, ১৯৩২

 চীন শেষ করে একবার জাপানে যাওয়া যাক, পথে অল্পক্ষণ কোরিয়ায় দাঁড়িয়ে। অবশ্যই মঙ্গোলজাতি কোরিয়ায় শক্তিস্থাপন করেছিল। তাদের জাপান-আক্রমণের চেষ্টা সফল হয় নি। কুব্‌লাই খাঁ জাপানে অনেকগুলি অভিযান প্রেরণ করেছিলেন, কিন্তু তারা প্রতিবারেই বিতাড়িত হয়েছিল। যতদূর মনে হয় জলযুদ্ধে মঙ্গোলরা মোটেই সুবিধে পেত না। তারা ছিল প্রায় পূর্ণভাবে স্থলদেশের লোক। দ্বীপময় হওয়ার ফলে জাপান তাদের হাত থেকে বেঁচে গেল।

 চীন থেকে মঙ্গোলরা বিতাড়িত হওয়ার অল্প পরে কোরিয়ায় এক বিপ্লব হল, এবং যেসব শাসক মঙ্গোলদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন, তাঁদের বিতাড়িত হতে হল। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন ই তাই-জো নামে এক দেশভক্ত কোরীয়। নূতন রাজা হলেন তিনিই, এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ৫০০ বছরেরও উপর বর্তমান ছিল, ১৩৯২ সাল থেকে, অতি আধুনিক সময়ে জাপান কর্তৃক কোরিয়া অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত। সিউল রাজধানী হল; এখনও তাই আছে। এই ৫০০ বছরের কোরীয় ইতিহাস আলোচনা করা সম্ভব নয়। কোরিয়া (অন্য নাম চোসেন) প্রায় স্বাধীন দেশ হিসেবেই চলল, শুধু চীনের নামেমাত্র বশ্যতার ছায়ায়, এবং কালেভদ্রে কর দিয়ে। জাপানের সঙ্গে বহুবার যুদ্ধ বাধে এবং কয়েক ক্ষেত্রে কোরিয়া সফল হয়। কিন্তু এখন আর এই দুয়ে কোনো তুলনা চলে না। জাপান এখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ বিশাল সাম্রাজ্য, সাম্রাজ্যবাদীর যত দোষ, সবই তার আছে। বেচারা কোরিয়া এই সাম্রাজ্যের ক্ষুদ্র একটি অংশ, জাপানকর্তৃক শাসিত ও শোষিত, স্বাধীনতালাভের জন্যে তার বীরত্বপূর্ণ চেষ্টা আছে, কিন্তু সামর্থ্য নেই। কিন্তু এ সবই হল আধুনিক যুগের ইতিহাস, এবং আমরা এখনও রয়েছি সুদূর অতীতে।

 তোমার হয়তো মনে আছে, দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে শোগানই হয়েছিলেন জাপানের প্রকৃত শাসক। সম্রাট ছিলেন নামেমাত্র সম্রাট। প্রথম শোগান-শাসন যার নাম কামাকুরা শোগানেত, প্রায় ১৫০ বছর বর্তমান ছিল এবং দেশকে শান্তি ও শৃঙ্খলাপূর্ণ শাসনে রেখেছিল। শাসকবংশের অবশ্যম্ভাবী অবনতি ঘটল, ফলে এল অক্ষমতা, বিলাসিতা ও গৃহযুদ্ধ। সম্রাট নিজের ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করায় শোগানের সঙ্গে বিরোধ বাধল। সম্রাট বিফল হলেন, পুরোনো শোগানেতেরও পতন হল, এবং ১৩৩৮ সালে নূতন শোগানেতের উদ্ভব হল। এর নাম ছিল আশিকাগা শোগানেত এবং এর অস্তিত্ব ছিল ২৩৫ বছর। কিন্তু এ সময়টা ছিল বিরোধ ও যুদ্ধপূর্ণ। এটা ছিল চীনের মিঙদের প্রায় সমসাময়িক। এই শোগানদের একজন মিঙদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের জন্যে পরম উৎসুক ছিলেন, এবং এত দূর এগিয়েছিলেন যে নিজেকে মিঙ-সম্রাটের সামন্ত বলে পরিচয় দিতেন। জাপানি ঐতিহাসিকেরা জাপানের এই অপমানে সমধিক বিরক্ত, এবং এই লোকটিকে সমুচিত নিন্দা করেছেন।

 স্বভাবতই চীনের সঙ্গে সম্বন্ধ বন্ধত্বপূর্ণ ছিল, এবং মিঙ-যুগের চীনা-সংস্কৃতিতে নূতন আগ্রহের উদয় হল। যা-কিছু চীনা তাই অধীত এবং আদৃত হত—শিল্প, কাব্য, স্থাপত্য, দর্শন, এমনকি যুদ্ধশাস্ত্র পর্যন্ত। এই সময়ে দুটি বিখ্যাত সৌধ নির্মিত হয়, কিন্‌কাকুজি (স্বর্ণপ্রাসাদ) এবং গিন্‌কাকুজি (রজত-প্রাসাদ)।

 শিল্পকলার উদ্বোধন ও বিলাসবাহুল্যের পাশাপাশি কৃষিজীবীদের দুঃখের শেষ ছিল না। তাদের উপর করভার ছিল অতি বিপুল এবং গৃহযুদ্ধের ব্যয়ের বোঝাও তাদের উপরেই পড়েছিল। দুর্দশা ক্রমেই বেড়ে চলল, এবং অবশেষে রাজধানীর বাইরে কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগের কোনো প্রভাব রইল না বললেই হয়।

 পর্তুগীজরা এল ১৫৪২ সালে এইসব যুদ্ধের সময়। জেনে রাখতে পারো, এই সময়েই জাপানে পর্তুগীজরা প্রথম আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি করে। এটা খুবই বিস্ময়কর, কারণ চীনে তাদের ব্যবহার জানা ছিল বহুকাল পূর্ব থেকে, এমনকি ইউরোপ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে শেখে চীনাদের কাছ থেকে, মঙ্গোলদের মারফত।

 অবশেষে শতবর্ষপ্রাচীন গহযুদ্ধ থেকে জাপানকে উদ্ধার করলেন তিনটি লোক; নরবুনাগা—একজন দাইমিও অথবা অভিজাত; হিদেয়োশি—একজন কৃষক, এবং তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু—একজন অতি বিশিষ্ট অভিজাত। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে সমগ্র জাপান আবার একীভূত হল। কৃষক হিদেয়োশি ছিলেন জাপানের একজন বিজ্ঞ রাজনীতিক। কিন্তু শোনা যায়, তিনি কুৎসিৎ ছিলেন—খর্বকায় এবং চ্যাপটা গড়নের দেহ, আর বানরের মতো মুখ।

 জাপানকে একতাবদ্ধ করে এই তিনজনের সমস্যা হল তার বৃহৎ সেনাবাহিনীর বিলিব্যবস্থা করা। আর-কিছু করার না থাকায় তাঁরা কোরিয়া আক্রমণ করলেন। কিন্তু পরিতাপ করতেও সময় লাগল না। কোরীয়রা জাপানি নৌবাহিনীকে পরাজিত করে দুই দেশের মধ্যস্থিত জাপানসমুদ্র অধিকার করল। এই সাফল্যের কারণ তাদের নূতন ধরনের জাহাজ লোহা দিয়ে মোড়া এবং কচ্ছপের পিঠের মতো তার ছাদ। এদের নামই ছিল ‘কচ্ছপ-পোত’। ইচ্ছেমতো এদের সামনে কিংবা পিছনে দাঁড় বেয়ে চালানো যেত। জাপানি রণপোতবাহিনী এদের হাতে বিধ্বস্ত হল।

 তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু, উপরোক্ত তিনজনের মধ্যে তৃতীয়জন, গৃহযুদ্ধের ফলে বিলক্ষণ লাভবান হয়েছিলেন। তিনি বিপুল ধনের মালিক হলেন এবং জাপানের প্রায় এক সপ্তমাংশ ভূমি তাঁর নিজস্ব সম্পত্তিতে পরিণত হল। তাঁর স্থাবর সম্পত্তির মধ্যস্থলে তিনি রেদো নগর নির্মাণ করেছিলেন, পরবর্তীকালে এরই নাম হয় টোকিও। ১৬০৩ সালে ইয়েয়াসু শোগান হলেন, এবং এই তৃতীয় ও শেষ শোগানেতের অর্থাৎ তোকুগাওয়া শোগানেতের রাজত্বকাল চলে ২৫০ বৎসর।

 এই সময়ে পর্তুগীজরা অল্পস্বল্প বাণিজ্য চালাচ্ছিল। ৫০ বছর ধরে তাদের কোনো ইউরোপীয় প্রতিদ্বদ্বী ছিল না; স্পেনীয়রা এল ১৫৯২ সালে, এবং ওলন্দাজ ও ইংরেজরা আরও পরে। সম্ভবত ১৫৪৯ সালে সেণ্ট্ ফ্রান্সিস জেভিয়ার কর্তৃক খৃষ্টধর্ম প্রচলিত হয়। জেসুইটদের ধর্মপ্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, এমনকি তাদের উৎসাহিত করা হত। এর কারণ অবশ্য রাজনৈতিক, কারণ বৌদ্ধ সংঘগুলি ছিল ষড়যন্ত্রের আড্ডা। এই কারণে এইসব শ্রমণদের দমন করে খৃষ্টান ধর্ম প্রচারকদের অনুগ্রহ দেখানো হয়। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই জাপানিরা অনুভব করল যে, এই মিশনারিরা বিপজ্জনক লোক, এবং অবিলম্বে তারা রীতিপরিবর্তন করে এদের বিতাড়িত করার চেষ্টা পেল। ১৫৮৭ সালেই এক খৃষ্টানবিরোধী আইন জারি করা হয়, তাতে সমস্ত মিশনারিদের বিশ দিনের মধ্যে জাপান ছেড়ে দিতে আদেশ দেওয়া হয়, অন্যথায় মৃত্যুদণ্ড। এর লক্ষ্যস্থল অবশ্য বণিকরা নয়। এও বলা হয়েছিল যে বণিকরা ব্যবসা চালাতে পারে, কিন্তু তাদের জাহাজে মিশনারি আনলে জাহাজ এবং তার সমস্ত মাল বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। এ আইনের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। হিদেয়োশি বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন। তাঁর সন্দেহ হয়েছিল যে মিশনারিরা এবং ধর্মান্তরিত জাপানিরা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে। সন্দেহ যে খুব অমূলক তাও নয়।

 এই ঘটনার অল্পকালের মধ্যেই একটা ব্যাপার ঘটল, যাতে হিদেয়োশি বলেন যে, তাঁর ভয় অমূলক নয়; তাঁর ক্রোধের অবধি রইল না। ম্যানিলা গ্যালিয়নের কথা তোমার মনে আছে, যা বছরে একবার করে ফিলিপাইন-দীপপুঞ্জ ও স্পেনীয় আমেরিকার মধ্যে যাতায়াত করত। একবার ঝড়ের ফলে জাহাজটা জাপানি উপকূলে এসে পড়ে। স্পেনীয় ক্যাপ্টেন একটা পৃথিবীর মানচিত্রে স্পেনরাজার বিশাল সাম্রাজ দেখিয়ে স্থানীয় জাপানিদের ভয় পাওয়ানোর চেষ্টায় ছিলেন। প্রশ্ন হল—স্পেন কী করে এত বড়ো সাম্রাজ্যের অধিকারী হল। তিনি উত্তর দিলেন যে, উপায় অতি সোজা। মিশনারিরা যায় প্রথমে, এবং পরে যখন বহু লোক ধর্মান্তরিত হয় তখন তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে শাসনবিভাগ বিধ্বস্ত করার জন্যে সৈনাদল পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই খবর এখন হিরোশির কাছে গেল তিনি খুশি হলেন না মোটেই, এবং মিশনারিবিদ্বেষ তাঁর বাড়ল বৈ কমল না। ম্যানিলা গ্যালিয়নকে তিনি ছেড়ে দিলেন, কিন্তু জনকয়েক মিশনারি ও তাঁদের দ্বারা ধর্মান্তরিত কয়েকজনকে প্রাণদণ্ড দিলেন।

 ইয়েয়াসু শোগান হয়ে বিদেশীদের প্রতি এর চেয়ে বেশি বন্ধুত্বভাব দেখিয়েছিলেন। বৈদেশিক বাণিজ্য, বিশেষ করে তাঁর নিজের বন্দর য়েদেতে, বাণিজ্যের প্রসার করতে তিনি বিশেষ সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু ইয়েরাসুর মৃত্যুর পর খৃষ্টান দমন-রীতি আবার আরম্ভ হল। মিশনারিদের তাড়িয়ে দেওয়া হল, এবং ধর্মান্তরিত জাপানিদের খৃষ্টধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হল। বাণিজ্যরীতিরও পরিবর্তন হল, বিদেশীদের রাজনৈতিক অভিসন্ধি সম্বন্ধে জাপানিরা এতই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, যে রূপেই হোক, বিদেশীদের দেশের বাইরে রাখতেই হবে।

 জাপানের এ প্রতিক্রিয়ার অর্থ সহজেই বোঝা যায়। শুধু বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে যে, ইউরোপীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে না মিশেও তাদের তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে তারা সাম্রাজ্যবাদীর নেকড়েকে ধর্মের মেষচর্মের অন্তরালে দেখতে পেয়েছিল। পরবর্তীকালে এবং অন্য দেশে ইউরোপীয়রা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির খাতিরে কেমন করে ধর্মের সহায়তা নিয়েছে তা সবাই জানে।

 এইবারে ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। সেটা হল জাপানের দ্বার-রোধ। বিশেষ চেষ্টায় স্বতন্ত্রীকরণ-রীতি অনুসৃত হল, এবং একবার আরম্ভ হয়ে বিস্ময়কর সম্পূর্ণতার সঙ্গে এ রীতি চলতে থাকে। কোনোরকম আপ্যায়ন না পেয়ে ১৬২৩ সালে ইংরেজরা জাপানে যাওয়া ছেড়ে দিল। পর-বৎসর সবচেয়ে যাদের বেশি ভয় করা হত সেই স্পেনীয়রা বিতাড়িত হল। আইন জারি হল যে, কেবলমাত্র অখৃষ্টানরা বাণিজ্যের জন্যে বাইরে যেতে পারবে। কিন্তু তারাও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে যেতে পারবে না। অবশেষে বারো বৎসর পরে, ১৬৩৬ সালে জাপানের দ্বার পুরোপরি বন্ধ হল। পর্তুগীজদের তাড়িয়ে দেওয়া হল; খৃষ্টান, অখৃষ্টান, কোনো জাপানিরই বাইরে গেলে আর ফেরার অধিকার রইল না, ফিরলে মৃত্যুদণ্ড! শুধু জনকতক ওলন্দাজ রইল, কিন্তু তাদের বন্দর ছেড়ে দেশের অভ্যন্তরে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। ১৬৪১ সালে এই ওলন্দাজদেরও নাগাসাকি-পোতাশ্রয়ে এক ক্ষুদ্র দ্বীপে অপসারণ করা হল, এবং প্রায় কয়েদির মতো তাদের সেখানে রাখা হল। এইভাবে প্রথম পোর্তুগীজ-আগমনের ঠিক নিরানব্বই বছর পরে জাপান বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেকে রুদ্ধ করল।

 ১৬৪০ সালে একটি পর্তুগীজ জাহাজ এল বাণিজ্য পুনরায় আরম্ভ করার অনুমতি চাইতে। অনুমতি মিলল না। জাপানিরা দূতসংঘ এবং নাবিকদের অধিকাংশকে হত্যা করল, এবং জনকয়েককে ছেড়ে দিল দেশে গিয়ে সংবাদ দেবার জন্য।

 ২০০ বছরের উপর জাপান বহিঃপৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকল, তার প্রতিবেশী চীন ও কোরিয়ার কাছ থেকেও। বাইরের জগতের সঙ্গে তার যোগসূত্র রইল দ্বীপের মধ্যে জনকয়েক ওলন্দাজ, এবং তীক্ষ দৃষ্টির মধ্যে কালেভদ্রে আগত দুই-একজন চীনা। এই সম্পর্কচ্ছেদ জিনিষটা অত্যন্ত অদ্ভুত জিনিষ। জানা ইতিহাসের কোনো কালে, কোনো দেশে এরকম ঘটনার আর-একটা উদাহরণ পাওয়া যায় না। এমনকি রহস্যময় তিব্বত অথবা মধ্য আফ্রিকাও তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা বিপজ্জনক; শুধু যে ব্যষ্টির পক্ষে বিপজ্জনক তাই নয়, জাতির পক্ষেও। কিন্তু জাপান সে বিপদ কাটিয়ে উঠল, এবং আভ্যন্তরীণ শান্তি ফিরে পেল, দীর্ঘ সংগ্রামের ক্ষতি ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠল। এবং অবশেষে যখন ১৮৫৩ সালে সে তার রুদ্ধ গৃহের দরজা জানলা খুলল তখন আর-একটি অদ্ভুত কাজ করল। সে অগ্রসর হল ভীমবেগে, এতদিনের নষ্ট সময়ের ক্ষতি অতি অল্প সময়ে পূরণ করে নিল, ইউরোপীয় জাতিদের সমান-সমান হল এবং তাদের খেলাতেই তাদের পরাজিত করল।

 কী নীরস ইতিহাসের এই নিরলঙ্কার রেখাচিত্রগুলি! যেসব অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি একে একে এর মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে, কী প্রাণহীন তারা। তবু কখনও কখনও, যখন প্রাচীন যুগে লেখা বই পড়া যায়, মৃত অতীতের মধ্যে যেন প্রাণসঞ্চার হয়, তাদের জীবনের রঙ্গমঞ্চ আমাদের অনেক কাছে এগিয়ে আসে, আর আমাদের মতোই রক্তমাংসের জীবত মানুষ, যারা ভালোবাসতে জানে, ঘৃণা করতে জানে, তারা এই রঙ্গমঞ্চে এসে দেখা দেয়। আমি লেডি মুরাসাকি নামে বহুশত বৎসর আগের এক ভদ্রমহিলার কথা পড়ছিলাম; এই চিঠিতে যেসব গহযুদ্ধের কথা লিখেছি, তারও বহুকাল পূর্বের লোক তিনি। তিনি জাপানের সম্রাটের রাজসভায় তাঁর অভিজ্ঞতার দীর্ঘ বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন; এই বইয়ের স্থানে স্থানে যখন পড়ি তখন এর চমৎকার ঘনিষ্ঠ বিবরণগুলির রচয়িত্রী আমার কাছে একান্ত জীবন্ত হয়ে ধরা দেন, এবং প্রাচীন জাপানের রাজসভার সসীম অথচ কলাবিদগ্ধ জগৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে।