বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বাস্তিল-এর পতন

উইকিসংকলন থেকে

১০০

বাস্তিল-এর পতন

৭ই অক্টোবর, ১৯৩২

 এতক্ষণ সংক্ষেপে অষ্টাদশ শতাব্দীর দুটো বিপ্লব সম্বন্ধে আলোচনা করা গেল। এবার আমার বক্তব্য হবে তৃতীয় বিপ্লব, অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লব সবন্ধে যৎকিঞ্চিৎ। তিনটি বিপ্লবের মধ্যে ফরাসি বিপ্লবই সবচেয়ে বেশি আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। ইংলণ্ডে প্রথমারদ্ধ শিল্পবিপ্লবের গুরুত্ব বিরাট, কিন্তু তার আগমন হয়েছিল ধীরে ধীরে, এবং সে আগমন অধিকাংশ লোকের নজরেই পড়ে নি। অল্প লোকেই তার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পেরেছিল। ফরাসি বিপ্লবের বেলা কিন্তু তা হয় নি। সমস্ত ইউরোপকে স্তব্ধ বিস্মিত করে বজ্রাঘাতের মতো তার স্ফুরণ। তখনও ইউরোপ অজস্র রাজা ও সম্রাটের পদানত ছিল। প্রাচীনকালের ‘পবিত্র রোমক সাম্রাজ্য’ অনেকদিন আগেই শেষ হয়েছিল, কিন্তু কাগজেকলমে তার অস্তিত্ব ছিল, এবং ইউরোপের ওপর তার প্রেতযোনির প্রভাব তখনও সম্পূর্ণ বিলপ্ত হয়ে যায় নি। ফরাসি-বিপ্লব-রূপ অদৃষ্টপূর্ব ভীতিপ্রদ দৈত্যের আবির্ভাব ঘটল রাজামহারাজা রাজসভা রাজপ্রাসাদ-সমন্বিত এই পৃথিবীর জনসাধারণেরই অন্তস্তল থেকে। কীটদষ্ট প্রাচীন রীতিনীতি, সম্প্রদায়বিশেষের বিশেষ অধিকার এই বন্যার স্রোতে ভেসে গেল। এর কল্যাণে একজন রাজার সিংহাসনচ্যুতি ঘটল এবং অন্যদেরও আশঙ্কা দেখা দিল। কাজেই রাজন্যগণ ও অন্যান্য বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ, যাঁরা এতদিন ধরে যে জনসাধারণকে অবহেলা ও পদদলিত করে এসেছেন, তাঁরা যে এই বিদ্রোহের সামনে কম্পিত হবেন তাতে বিস্মিত হবার কিছুই নেই।

 ফরাসি বিপ্লব আত্মপ্রকাশ করল আগ্নেয়গিরির আকস্মিক বিস্ফোরণের মতো। কিন্তু বিনা কারণে এবং দীর্ঘ বিবর্তন ব্যতীত বিপ্লব অথবা আগ্নেয়গিরি সহসা ফেটে বের হতে পারে না। আকস্মিক বিস্ফোরণ দেখে আমরা অবাক হই; কিন্তু ভূপষ্ঠের অতলে অগণিত বিভিন্ন শক্তি যুগযুগ ধরে পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করে বিভিন্ন অগ্নির সম্মিলন ঘটায়, তার পরে পৃথিবীর বহিরাবরণ যখন আর তাদের দমন করে রাখতে পারে না তখন তারা মৃত্তিকা বিদীর্ণ করে বেরিয়ে পড়ে। প্রচন্ত অগ্নিশিখা আকাশের দিকে ছোটে, গলিত লাভা গিরির গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। সেইরকম, বিপ্লবে যেসব শক্তি প্রকাশ পায় তাদের কর্মস্থল দীর্ঘদিন ধরে সমাজের ভিতরের স্তরেই গড়ে ওঠে। জল গরম করলে ফুটতে থাকে। কিন্তু ফোটার উত্তাপে এসে পৌঁছতে তার প্রয়োজন ক্রমশ উত্তরোত্তর গরম হওয়া।

 আদর্শবাদ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আনুকূল্যের ফলে বিপ্লবের সৃষ্টি হয়। নির্বোধ কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না বলে এসব জিনিষ দেখতে পান না। তাই তাঁরা ভাবেন, বিপ্লব সৃষ্টি করে আন্দোলনকারীরা। যারা প্রচলিত অবস্থায় অসন্তুষ্ট হয়ে পরিবর্তন চায় এবং তদনুসারে কর্মতৎপর হয়, তাদেরই বলা হয় আন্দোলনকারী। প্রত্যেক বৈপ্লবিক যুগে এদের অস্তিত্ব পূর্ণমাত্রায় থাকে। এদের নিজেদেরই উৎপত্তি অসন্তোষের বীজ থেকে। কিন্তু শুধু আন্দোলনকারীর কথা শুনে লক্ষ লক্ষ লোক কাজে মেতে উঠতে পারে না। অধিকাংশ লোকেই ধনসম্পত্তির নিরাপত্তাকে স্থান দেয় সবার ওপরে, এবং যা তাদের আছে সেসব তারা অকারণে বিপন্ন করতে চায় না। কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থা যখন এমন হয়ে দাঁড়ার যে, দুর্দশা দিন দিন বেড়েই চলে, এবং প্রাণধারণ পরিণত হয় দুর্বিষহ ভারে, তখন দুর্বল যে সেও সব-কিছু বিপন্ন করতে প্রস্তুত হয়। আর তখনই তারা আন্দোলনকারীর কথা কানে তোলে, কারণ তারা ভাবে, হয়তো তারই হাতে দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় আছে।

 আগের অনেক চিঠিতে আমি তোমাকে জনসাধারণের দুরবস্থা এবং কৃষক অভ্যুত্থানের কথা বলেছি। কৃষক-বিদ্রোহ ইউরোপ ও এশিয়ার সব দেশেই ঘটেছে, এবং তুমুল রক্তপাত ও নিষ্ঠুরভাবে পেষণ করে তাকে দমন করা হয়েছে। প্রচণ্ড দুর্দশায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চাষিরা ছুটেছে বিপ্লবের পথে, কিন্তু লক্ষ্যবস্তু সম্বন্ধে তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণাই নেই। এই চিন্তার অস্পষ্টতা এবং আদর্শের অভাবে প্রায়ই তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের বেলায় আমরা একটা নূতন জিনিষ দেখি, বৈপ্লবিক কর্মপ্রচেষ্টার জন্যে দুটি প্রয়োজনীয় বস্তুর যোগাযোগ বৈপ্লবিক কর্ম প্রচেষ্টার অনুকূল অর্থনৈতিক অবস্থা, এবং আদর্শবাদ। যেখানে এই যোগাযোগ ঘটে, প্রকৃত বিপ্লব সেখানেই আসে; এবং প্রকৃত বিপ্লব জীবন ও সমাজের প্রতিটি স্তরে আঘাত করে, রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক এবং ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়, সব কিছুর উপরেই। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ কয় বছরে আমরা ফ্রান্সে এই যোগাযোগ দেখতে পাই।

 তোমাকে আগেই বলেছি, এক দিকে ফরাসি রাজাদের বিলাসিতা, অকর্মণ্যতা ও দুর্নীতি, অন্য দিকে জনসাধারণের শোচনীয় দারিদ্র্য। ফরাসি জনসাধারণের মনে অসম্ভোষের বীজ সম্বন্ধে, এবং ভল্‌টেয়ার, রুশো, মঁতেস্ক্যু এবং আরও অনেকের রচিত ভাবধারার কথাও বলেছি। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও ভাবধারার সংগঠন, এই দুটি জিনিষ একই সঙ্গে চলল, এবং যথারীতি পরস্পরের উপরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। একটা জাতির সামনে আদর্শবাদ খাড়া করতে সময় লাগে, কারণ লোকে নূতন চিন্তাধারা গ্রহণ করে ধীরে ধীরে, এবং অতি অল্প লোকেই তাদের প্রাচীন সংস্কার ত্যাগ করতে উৎসুক হয়। অনেক সময় এমনও হয় যে, যতদিনে নূতন ভাবধারা মানুষের মনে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছে, এবং জনসাধারণ নূতন নূতন আদর্শ গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছে, ততদিনে এইসব ভাবধারাই পুরোনো হয়ে বাতিল হয়ে গেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিকদের ভাবধারার মূলে ছিল ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের আগের যুগ। কিন্তু প্রায় একই সঙ্গে ইংলণ্ডে শিল্পবিপ্লব আরম্ভ হয়েছিল, এবং শিল্প ও জীবনধারার এই পরিবর্তনের ফলে অনেক নূতন ফরাসি মতবাদই অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। আসল কথা এই যে, শিল্পবিপ্লবের প্রসার হয়েছিল পরে, এবং ফরাসি দার্শনিকরা ভবিষ্যতে কী আসছে বুঝে উঠতে পারেন নি। তবু তাঁদের যেসব ভাবধারার ওপরে ফরাসি-বিপ্লবের আদর্শবাদের অনেকাংশের ভিত্তি, নূতন যন্ত্রশিল্পযুগে তারা কিছু পরিমাণে পুরোনো হয়ে গিয়েছিল।

 সে যাই হোক, একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে, ফরাসি দার্শনিকদের এইসব আদর্শ ও মতবাদ বিপ্লবের উপরে প্রগাঢ় প্রভাব বিস্তার করেছিল। জন-বিদ্রোহ এর আগে অনেকবারই ঘটেছে। কিন্তু এবারে যা হল তা হচ্ছে সজাগ জনসাধারণের মিলিত বিদ্রোহ, অথবা সজাগভাবে পরিচালিত জনসাধারণের বিদ্রোহ। এইজন্যেই ফ্রান্সের এই বিরাট বিপ্লবের এতখানি গুরুত্ব।

 আগেই বলেছি, চতুর্দশ লুইয়ের পরে তাঁর প্রপৌত্র পঞ্চদশ লুই ১৭১৫ খৃস্টাব্দে রাজা হয়ে ঊনষাট বছর রাজত্ব করেন। প্রবাদ আছে, তিনি নাকি বলেছিলেন, “আমার পরেই সর্বনাশ আসছে,” এবং তাঁর আচরণও হয়েছিল সেইরকম। দেশকে তিনি অকাতরে রসাতলে পাঠালেন। ব্রিটেনের বিপ্লব ও ইংরেজ-রাজের শিরশ্ছেদ দেখেও তাঁর শিক্ষা হয় নি। তাঁর পরে ১৭৭৪ সালে রাজা হলেন তাঁর পৌত্র, ষোড়শ লুই। মস্তিষ্ক বলে কোনো পদার্থ তাঁর ছিল না। হাপ্‌স্‌বুর্গ-বংশীয় অস্ট্রিয়ান সম্রাটের ভগ্নী মারি আঁতোয়ানেৎ ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বুদ্ধি তাঁরও ছিল না, তবে একরোখা একটা শক্তি ছিল, যার ফলে তিনি স্বামীকে সম্পূর্ণরপে নিজের আজ্ঞাবহ করে রাখতে পেরেছিলেন। রাজাদের ভগবদ্দত্ত অধিকার সম্বন্ধে ধারণা তাঁর ছিল আরও বেশি পরিমাণে, এবং জনসাধারণকে তিনি ঘৃণ্য মনে করতেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে যা আরম্ভ করলেন তাতে রাজতন্ত্রের উপর লোকের বিদ্বেষের ভাব আরও বৃদ্ধি পেল। বিপ্লব আরম্ভ হওয়ার পরেও ফরাসি নরনারীর রাজতন্ত্র সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না, কিন্তু লুই এবং মারি আঁতোয়ানেতের নির্বুদ্ধিতার ফলে সাধারণতন্ত্রের আগমন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ল। কিন্তু এরকম ক্ষেত্রে বুদ্ধিমান লোকেরাও অনুরূপ আচরণ করে থাকেন। ১৯১৭ সালে, রুশ বিপ্লবের প্রাক্কালে, রাশিয়ার জার ও জার-পত্নী অতুলনীয় নির্বোধ আচরণ করেছিলেন। সংকট যতই ঘনীভূত হয়ে আসে, নির্বুদ্ধিতার পরিমাণও তত বেড়ে চলে, এবং তার ফলে ঘটে আত্মবিনাশ। লাতিন ভাষায় একটা সুপরিচিত কথা আছে—Quem deus vult perdere, prius dementat অর্থাৎ, ভগবান যাকে বিনষ্ট করতে চান, প্রথমে তাকে উন্মাদ করে দেন। এর প্রায় অবিকল অনুরূপ একটা কথা সংস্কৃতেও আছে—“বিনাশকালে বিপরীত বুদ্ধিঃ।”

 রাজতন্ত্র এবং একনায়কতন্ত্রের একটি প্রধান অবলম্বন হচ্ছে, যুদ্ধজয়ের যশ। স্বদেশে যখন গোলযোগ আরম্ভ হয়, রাজা অথবা দেশের কর্তৃপক্ষ তখন বিদেশে সামরিক অভিযানের প্রতি আকৃষ্ট হন, জনসাধারণকে অন্যমনস্ক করার জন্যে। কিন্তু ফ্রান্সের পক্ষে সামরিক অভিযানের ফল ভালো হয় নি। সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ে লোকের মনে রাজতন্ত্রের প্রতি বিরুদ্ধ ভাবের সঞ্চার হয়েছিল। রাজকোষের দেউলিয়া হবার সময় আসন্ন হয়ে আসছিল। আমেরিকার স্বাধীনতা-সমরে ফ্রান্সের যোগদানের অর্থ, ব্যয়বৃদ্ধি। এত টাকা আসে কোথা থেকে? অভিজাত ও যাজক-সম্প্রদায় ছিলেন বিশেষ অধিকারসম্পন্ন, তাদের প্রায় কোনোরকম করই দিতে হত না। কিন্তু টাকা তোলার বিশেষ প্রয়োজন ছিল, শুধু ধার-শোধ করবার জন্যে নয়, রাজার পারিবারিক বিলাসব্যসনের সমারোহের খরচ জোগাতে। জনসাধারণের অবস্থা তখন কেমন ছিল? এ সম্বন্ধে ইংরেজ-লেখক কার্লাইল ফরাসি বিপ্লব সম্বন্ধে যা বলেছিলেন তার খানিকটা তুলে দিচ্ছি। তাঁর লিখনভঙ্গি একট অদ্ভুত, কিন্তু কলমের টানে ছবি আঁকতে তিনি সিদ্ধহস্ত:

 “শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থাও ভালো নয়। দুর্ভাগ্য! এদের সংখ্যা দুই কোটি থেকে আড়াই কোটি। আমরা অবশ্য এদের পিণ্ডাকৃতি একাকার করে দেখতেই অভ্যস্ত—বিরাট কিন্তু অস্পষ্ট, দূরের জিনিষ। খুব সদয় হলে আমরা এদের ‘জনগণ’ বলে অভিহিত করে থাকি। জনগণই বটে; যদি কল্পনানেত্রে তাদের অনুসরণ করে তাদের মাটির কুটিরে পৌঁছতে পার তা হলে দেখতে পাবে, স্বতন্ত্র ব্যষ্টির সমাহার এই জনগণ। তাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র হৃদয় আছে, নানা দুঃখ বেদনা আছে; যে চর্মে তাদের দেহ আবৃত সে তাদের নিজেরই, তাতে আঘাত করলে রক্তও পড়ে।”

 এ বর্ণনা যে শধু ১৭৮৯ সালের ফ্রান্সের সম্বন্ধে খাটে তা নয়, ১৯৩২ সালের ভারতের সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। আমরাও ভারতের জনসাধারণকে একসঙ্গে স্তূপাকার করে রেখে দিই, এবং লক্ষকোটি চাষি ও শ্রমিককে হতভাগা কুৎসিৎদর্শন জানোয়ার বলেই মনে করি। তাদের ’পরে ‘সমবেদনা’ জানাই, এবং মুরুব্বিয়ানাভাবে তাদের উপকার করার কথা বলি। কিন্তু তাদের মানুষ বা ব্যক্তি বলে গণনা করি না, ভুলে যাই তারাও অনেকটা আমাদেরই মতো। তাদের মাটির কুঁড়েতে তারাও আমাদেরই মতো পৃথক পৃথক জীবনযাপন করে, তাদেরও ক্ষুধা ও শীতবোধ আছে, বেদনাবোধ আছে। আইনে অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা শাসনবিধির সম্বন্ধে বড়ো বড়ো কথা বলেন, কিন্তু আইন আর শাসনবিধির সৃষ্টি যে মানুষদের জন্যে তাদের কথা ভুলে যান। আমাদের দেশের লক্ষকোটি মাটির ঘরের এবং শহরের বস্তির অধিবাসীদের কাছে রাজনীতির অর্থ ক্ষুধার অন্ন, লজ্জানিবারণের বস্ত্র এবং মাথা গোঁজার আশ্রয়।

 ষোড়শ লুইয়ের অধীনে ফ্রান্সের এই অবস্থা ছিল। তাঁর রাজত্বের প্রথম দিকেই ক্ষুধিত জনসাধারণের দাঙ্গা ঘটেছিল। অনেক বছর ধরেই এমনি চলল, তার পরে বিরতি, তার পরে নূতন করে কৃষক-বিদ্রোহ। এই ধরনের এক দাঙ্গার সময়ে দিজ’র গভর্নর বলেছিলেন, “মাঠে ঘাস গজিয়েছে, সেখানে গিয়ে ঘাস চিবোগে যা!” বহু লোক পেশাদার ভিক্ষুকে পরিণত হল। সরকারি হিসেবমতো ১৭৭৭ সালে ফ্রান্সে এগারো লক্ষ ভিক্ষুক ছিল। এই দারিদ্র্য আর দুর্দশার কথা ভাবলে ভারতের কথাই মনে আসে।

 চাষিদের অভাব ছিল পটো জিনিযের—খাদ্য ও ভূমির। সামন্ত-রীতি অনুসারে জমির মালিক ছিলেন অভিজাত সম্প্রদায়, এবং জমির আয়ের একটা মোটা অংশ তাঁদের ভাগে পড়ত। চাষিদের ধারণা ছিল অস্পষ্ট, লক্ষ্যবস্তু ছিল অজ্ঞাতপ্রায়, কিন্তু তাদের জমির উপর আকাঙ্ক্ষা ছিল, এবং যে সামন্ত-রীতিতে তাদের পেষণ চলছিল তার ’পরে তাদের বিদ্বেষের অন্ত ছিল না। এমনি বিদ্বেষের ভাব তারা পোষণ করত অভিজাত ও যাজক-সম্প্রদায়ের প্রতি, এবং লবণ করের সম্বন্ধে (ভারতবর্ষের মধ্যে); কারণ লবণ করে গরিবদেরই বেশি কষ্ট ছিল।

 চাষিদের অবস্থা ছিল এইরকম, কিন্তু রাজা-রানীর টাকার খাঁইয়ের শেষ ছিল না। রাজকোষে টাকা ছিল না, ঋণ বেড়েই চলল। মারি আঁতোয়ানেতের নামকরণ হয়েছিল ‘মাদাম ডেফিসিট’ অর্থাৎ ‘দেউলিয়া মাদাম’। টাকা তোলার কোনো পন্থাই ছিল না। অবশেষে মরিয়া হয়ে ষোড়শ লুই ১৭৮৯ সালের মে মাসে স্টেট্‌স্-জেনারেল অর্থাৎ রাষ্ট্রসমিতিকে আহ্বান করলেন। দেশের তিনটি শ্রেণীর প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সমিতির গঠন—অভিজাত, যাজক এবং সাধারণ। গঠনের দিক দিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের হাউজ অব লর্ড্‌স্ ও হাউজ অব কমন্সের সঙ্গে সমিতির মিল ছিল, কিন্তু দুই সমিতিতে প্রভেদও ছিল প্রচুর। ব্রিটিশ পার্লামেণ্ট কয়েক শো বছর ধরে নিয়মিতভাবে মিলিত হয়ে আসছিল, ফলে তার একটা ঐতিহ্য ছিল, আইনকানুন ছিল, কর্ম পদ্ধতি ছিল। ফ্রান্সের রাষ্ট্রসমিতির অধিবেশন খুব কমই হত, ঐতিহ্যেরও বালাই ছিল না। দুটি সমিতিই উচ্চশ্রেণীর প্রতিভূ ছিল; ফ্রান্সের রাষ্ট্রসমিতির সাধারণ সভার চেয়ে ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্স সম্বন্ধে এ উক্তি আরও বেশি করে প্রযোজ্য। চাষিদের মুখপাত্র কোথাও ছিল না।

 ১৭৮৯ সালের ৪ঠা মে ভার্সাইতে রাজা রাষ্ট্রসমিতির উদ্বোধন করলেন। কিন্তু অল্প পরেই রাজা বুঝলেন এই তিন শ্রেণীর প্রতিনিধিদের একত্র করে তিনি কাজটা ভালো করেন নি। তৃতীয় শ্রেণী, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত-সম্প্রদায়, অবাধ্য হয়ে পড়ল, এবং যাতে তাদের সম্মতি ব্যতীত কর ধার্য করা যেতে না পারে, এই জোর দিতে লাগল। ইংলণ্ডে সাধারণ সভা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছিল, এরাও তাদের অনুকরণে নিজেদের অধিকার জানিয়ে দিল। তৎকালীন আমেরিকার উদাহরণও তাদের সামনে ছিল। একটা ভুল ধারণা তাদের ছিল; তারা ভাবত, ইংলণ্ড বুঝি স্বাধীন দেশ। আসলে ইংলণ্ডে প্রভুত্ব করত অভিজাত সম্প্রদায় এবং জমির মালিকরা। এমনকি পার্লামেণ্টও ছিল তাদের একায়ত্ত, কারণ ভোট দেবার ক্ষমতা ছিল অতি অল্প লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

 যাই হোক, তৃতীয় শ্রেণীর প্রতিনিধিরা যেটুকু করেছিলেন তাতেই রাজা অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি সভাকক্ষ থেকে তাদের তাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু প্রতিনিধিদের চলে যাওয়ার বাসনা মোটেই ছিল না। তাঁরা নিকটস্থ একটি টেনিস-কোর্টে মিলিত হয়ে শপথ গ্রহণ করলেন যে, একটা শাসনবিধির প্রবর্তন না করা পর্যন্ত তাঁরা বিচ্ছিন্ন হবেন না। এই প্রস্তাবই ‘টেনিস কোর্টের শপথ’ নামে পরিচিত। তার পরে আবার সংকট এল; রাজা বলপ্রয়োগের চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর নিজের সৈন্যদল তাঁর আদেশ পালনে অসম্মত হল। প্রতি বিপ্লবে এমন একটা মুহূর্ত আসে যখন সরকারের প্রধান অবলম্বন—সৈন্যদল—জনতার মধ্যে তাদের জাতির উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। লুই ভীত হয়ে হার স্বীকার করলেন, কিন্তু তাঁর চিরাচরিত নির্বুদ্ধিতাপরবশ হয়ে বিদেশী সৈন্যদলের সাহায্যে নিজের প্রজাদের গুলি করে মারার ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন। এ ব্যবহার জনসাধারণের অসহ্য হয়ে উঠল, এবং ১৭৮৯ সালের চিরস্মরণীয় ১৪ই জুলাই তারিখে তারা প্যারিসে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বহু কালের কারাগার বাস্তিল অধিকার করল এবং বন্দীদের মুক্তিদান করল।

 বাস্তিলের পতন ইতিহাসের একটি স্মরণীয় ঘটনা। এর থেকেই বিপ্লবের শুরু। সারা দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানের এই হল সংকেত। এর অর্থ দাঁড়াল, ফ্রান্সে প্রাচীন রীতি, সামন্তপ্রথা, রাজার একাধিপত্য, এবং সম্প্রদায় বিশেষের বিশেষ অধিকারের পরিসমাপ্তি। ইউরোপের যাবতীয় রাজন্যবর্গের পক্ষে এ হল অমঙ্গলের ভীতিপ্রদ ভীষণতার পদধ্বনি। ফ্রান্সেই সর্বাধিপতি রাজার ফ্যাশনের উৎপত্তি, এখন সেই দেশেই এই উল্টো অবস্থা দেখে ইউরোপ বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেল। কেউ-বা ভীতত্রস্ত হৃদয়ে এই ব্যাপার দেখল, কেউ পেল এতে নূতন আশা, ভবিষ্যতের শুভদিনের প্রতিশ্রুতি। এখনও পর্যন্ত ১৪ই জুলাই ফ্রান্সে জাতীয় উৎসবের দিন, এবং প্রতি বছর দেশের সর্বত্র এই উৎসব পালন করা হয়।

 ১৪ই জুলাই ক্রুদ্ধ জনতার কাছে বাস্তিল-দুর্গের পতন হল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এতই দৃষ্টিহীন যে, আগের রাত্রে, অর্থাৎ ১৩ই তারিখে, ভার্সাইতে রাজপ্রাসাদে এক উৎসবের আয়োজন হয়েছিল। নৃত্যগীতের প্রচুর বন্দোবস্ত ছিল, এবং বিদ্রোহী প্যারিসের উপর আগতপ্রায় জয়লাভের উদ্দেশে রাজা-রানীর সামনে স্বাস্থ্যপান করা হল। রাজতন্ত্র লোকের মনে যে কী গভীর ভিত করেছিল ভাবলে অবাক হতে হয়। বর্তমান যুগে আমরা সাধারণতন্ত্রে অভ্যস্ত, এবং রাজাদের খুব বেশি আমল দিই না। পৃথিবীতে যে কজন রাজা অবশিষ্ট আছেন তাঁরাও ভয়ে ভয়ে থাকেন, কখন তাঁদের অদৃষ্টে কী ঘটে। তবু অধিকাংশ লোকই রাজতন্ত্রের বিরোধী, কারণ তাতে করে শ্রেণীবিভাগ করে, এবং বড়োর পক্ষে ছোটোকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার সুযোগ বাড়ে। কিন্তু সে যুগে রাজাহীন রাজ্যের কথা লোকে কল্পনা করতেও পারত না। কাজেই লুইয়ের নির্বুদ্ধিতা এবং অপচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করার কথা তখনও ওঠেনি। আরও প্রায় বছর ধরে প্রজারা তাঁকে ও তাঁর অবিরাম ষড়যন্ত্র সহ্য করে চলল, এবং অবশেষে নিতান্তই যেদিন তিনি পলায়নের চেষ্টা করে ধরা পড়লেন, সেদিন ফ্রান্স স্থির করল রাজার আর প্রয়োজন নেই।

 কিন্তু তা পরের কথা। ইতিমধ্যে প্রাক্তন রাষ্ট্রসমিতি জাতীর সমিতিতে রূপান্তরিত হল, এবং মনে করা হল যে রাজার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ বা নিয়মতন্ত্রসম্মত হয়েছে। কিন্তু তিনি এ ব্যবস্থাকে ঘৃণা করতেন, এবং মারি আঁতোয়ানেৎ আরও বেশি ঘৃণা করতেন। তাঁদের উপরে প্যারিসের জনসাধারণের অত্যধিক প্রীতির অবকাশ ছিল না। তারা বরাবরই সন্দেহ করত যে, রাজা-রানী নানারকম ষড়যন্ত্র করার চেষ্টায় আছেন। তখন রাজা-রানীর বাসস্থান ছিল ভার্সাইতে এবং সে জায়গা প্যারিস থেকে অনেক দূরে হওয়ায় লোকের পক্ষে তাঁদের গতিবিধির উপর দৃষ্টি রাখা সম্ভব ছিল না। ভার্সাইতে বিলাসব্যসন ও ভোজের সমারোহ বিষয়ে নানারকম জনশ্রুতিও প্যারিসের ক্ষুধার্ত জনসাধারণকে ক্ষুদ্ধ ও উত্তেজিত করে তুলল। তার পরে একদিন রাজা-রানীকে অদৃষ্টপূর্ব এক শোভাযাত্রা সহকারে প্যারিসের তুইলারিতে নিয়ে যাওয়া হল।

 বিপ্লবের ইতিহাস পরের চিঠিতেও আমি বলব।