বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বিজ্ঞানের অগ্রগতি
১৮২
বিজ্ঞানের অগ্রগতি
কিন্তু বিজ্ঞানের কথা শুরু করবার আগে, বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নারীদের অবস্থার যে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে তার কথা তোমাকে আবার স্মরণ করিয়ে দেব। আইন সমাজ এবং প্রচলিত প্রথার বন্ধন থেকে নারীদের এই তথাকথিত ‘মুক্তিলাভের’ শুরু হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে, বড়ো বড়ো শিল্পের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যেখানে নারী শ্রমিক নিযুক্ত করা হত। সে বন্ধনমোচনের কাজ অতি ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে লাগল, তার পর যুদ্ধের সময়ে অবস্থার চাপে পড়ে তার গতি অতি দ্রুত হয়ে উঠল; এখন যদ্ধোত্তর যুগে সেটা প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে। আগের চিঠিতে তোমাকে তাজিকিস্তানের কথা বলেছি—সেখানেও এখন নারীরা চিকিৎসক হয়েছে, শিক্ষক হয়েছে, ইঞ্জিনীয়ার হয়েছে—মাত্র কয়েক বছর আগেও এরা পর্দার অন্তরালে বাস করত। তুমি এবং তোমার সমবয়সীরা সম্ভবত একে একটা স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই ধরে নেবে। অথচ এটা আসলে একটা অত্যন্ত অভিনব ব্যাপার শুধু এশিয়াতে নয়, ইউরোপেও। একশো বছরেরও কম সময় আগের কথা, ১৮৪০ সনে লণ্ডনে ‘পৃথিবীর দাসত্ব-বিরোধী সংঘের’ প্রথম অধিবেশন হয়। আমেরিকাতে তখন নিগ্রোদের দাসত্ব নিয়ে বহু লোক চঞ্চল হয়ে উঠেছিলেন; আমেরিকা থেকে প্রতিনিধি হিসাবে কয়েকজন নারী এই অধিবেশনে যোগ দিতে এলেন। সম্মেলনের কর্তারা সে নারী প্রতিনিধিদের সেখানে ঢুকতেই দিলেন না; তাঁদের যুক্তি কোনো নারীর পক্ষে একটা প্রকাশ্য সভায় যোগ দেওয়া অতি অশোভন ব্যাপার, নারীত্বের অবমাননাকর!
এবার বিজ্ঞানের কথা বলা যাক। সোভিয়েট রাশিয়ার পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনার আলোচনাপ্রসঙ্গে আমি তোমাকে বলেছি, সেখানে বিজ্ঞানের চেতনাকে সামাজিক ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছিল। গত দেড়শো বছর বা তার কাছাকাছি সময় যাবৎ এই চেতনাই পাশ্চাত্য সভ্যতার পিছনে কিছু পরিমাণে আত্মপ্রকাশ করে এসেছে—অবশ্য আংশিকভাবে মাত্র। বিজ্ঞানের প্রতিপত্তি যত বেড়েছে, অযুক্তি ভেল্কি এবং কুসংস্কারের উপরে রচিত যে-সব মতামত ছিল সেগুলোও ততই বাতিল হয়ে গিয়েছে; বিজ্ঞানবিরোধী রীতি-নীতি এবং কার্যক্রম যা ছিল তাদের সম্বন্ধে মানুষ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। অযুক্তি ভেল্কি এবং কুসংস্কারকে বৈজ্ঞানিক চেতনা একেবারেই পরাভূত করতে পেরেছে একথা অবশ্য বলছি না। সে দিন এখনও বহু দূরে। কিন্তু বিজ্ঞানের সে জয়যাত্রা অগ্রসর হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই তার অনেকগুলো খুব বড়ো বড়ো জয়-লাভ আমরা দেখেছি।
শিল্প এবং মানবজীবনে বিজ্ঞানের প্রয়োগের ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে কী প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পরিবর্তন এসেছিল, তার কথা তোমাকে আগেই লিখেছি। সমস্ত পৃথিবীর, বিশেষ করে পশ্চিম-ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকার রূপ এমন বদলে গেল যে দেখে আর চেনাই যায় না; এর আগের হাজার হাজার বছরে যেটুকু রূপ পরিবর্তন এদের ঘটেছিল সেও তুলনায় কিছুই নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের জনসংখ্যা যে বিরাট হারে বেড়ে গেল, সেইটাই তো একটা পরম বিস্ময়ের ব্যাপার। ১৮০০ সনে সমগ্র ইউরোপের মোট লোকসংখ্যা ছিল ১৮ কোটি। ধীরে ধীরে, বহু যুগ ধরে সে সংখ্যা এই অঙ্কে এসে পৌছেছিল। তার পর হঠাৎ তীরবেগে তার পরিমাণ বৃদ্ধির পথে ছুটে চলল—১৯১৪ সনে এর অঙ্ক দাঁড়াল ৪৬ কোটি। ঠিক এই সময়েই আবার ইউরোপ থেকে লক্ষ লক্ষ লোক অন্যান্য মহাদেশে, বিশেষ করে আমেরিকায়, চলে যাচ্ছিল; এদের সংখ্যাও আমরা ৪ কোটির মতো বলে ধরতে পারি। অতএব দেখা যাচ্ছে, মাত্র একশো বছরের অতি সামান্য বেশি কালের মধ্যে ইউরোপের জনসংখ্যা ১৮ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৃদ্ধিও বিশেষ করে দেখা গেল ইউরোপের শিল্পপ্রধান দেশগুলিতেই। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়াতে ইংলণ্ডের লোকসংখ্যা ছিল মাত্র পঞ্চাশ লক্ষ, পশ্চিম-ইউরোপের মধ্যে ইংলণ্ডই ছিল সর্বাপেক্ষা দরিদ্র দেশ। অথচ সে-ই হয়ে উঠল পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ, তার লোকসংখ্যা বেড়ে হল ৪ কোটি।
এই জনবদ্ধি ও ধনবৃদ্ধির মূলে ছিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে মানুষের নিজের ইচ্ছামতো চালাবার ক্ষমতার, বা সে প্রক্রিয়ার তত্ত্ব সম্বন্ধে জ্ঞানের বৃহত্তর ব্যাপ্তি; বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিল। মানষের জ্ঞান অনেক বেড়ে গিয়েছিল; কিন্তু তাই বলেই মনে করো না জ্ঞান বাড়লেই মানুষের বিজ্ঞতাও বাড়ে। প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে মানুষ নিয়ন্ত্রিত করতে, নিজের কাজে লাগাতে লাগল; অথচ জীবনে তাদের লক্ষ্য কী, বা কী হওয়া উচিত, সে সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট ধারণাই তখন তাদের নেই। বেশ জোরালো একখানা মোটর গাড়ি খুবই কাজের জিনিস, কামনার জিনিস; কিন্তু সে গাড়িতে করে কোথায় যাব সেটাও তো জানা থাকা চাই। ঠিকমতো যদি চালাতে না পারি তবে হয়তো সে খাদের মধ্যেই ঝাঁপ দিয়ে পড়বে। ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশান অব সায়ান্সের প্রেসিডেণ্ট গত বৎসর বলেছিলেন: “নিজেকে কী করে চালাতে হয় সেটা জানবার আগেই প্রকৃতিকে চালাবার ক্ষমতা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।”
বিজ্ঞানের সব সৃষ্টি—রেলওয়ে, এরোপ্লেন, বিদ্যুৎ, বেতার, আরও হাজার হাজার রকমের জিনিস আমরা প্রায় সকলেই ব্যবহার করি; কিন্তু কী করে তাদের সৃষ্টি হল সেটা একবারও ভেবে দেখি না। সেগুলোকে আমরা স্বাভাবিক বস্তু বলেই ধরে নিই, যেন আমরা কোনো একটা জন্মগত দাবির বলেই তাদের ব্যবহার করবার অধিকারী। আমরা একটা অতি উন্নত যুগে বাস করছি, আমরা নিজেরাও কী দারুণ রকম ‘উন্নত’, একথা ভেবেও আমরা বিরাট গর্ব অনুভব করি। অতীত সব যুগের তুলনায় আমাদের যুগটা একেবারেই ভিন্ন রকমের, সে বিষয়ে অবশ্য সন্দেহ নেই; সেযুগের তুলনায় এযুগটা অনেক বেশি উন্নত, এ কথা বললেও নিশ্চয়ই ভুল বলা হবে না। কিন্তু তাই বলেই, মানুষ বা দল হিসাবে আমরা আগের চেয়ে বেশি উন্নত হয়েছি, একথাটা সত্য নাও হতে পারে। ইঞ্জিনচালক একটা ইঞ্জিনকে চালাতে পারে, প্লেটো বা সক্রেটিস পারতেন না। অতএব প্লেটো বা সক্রেটিসের চেয়ে এই ইঞ্জিনচালকটি একজন অধিকতর উন্নত বা মহত্তর ব্যক্তি, একথা বললে আহাম্মকিরই চরম করা হবে। অথচ যান হিসাবে ইঞ্জিনটা প্লেটোর রথের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ধরনের বস্তু, এটাও খুবই সত্য কথা।
এখনকার দিনে অসংখ্য বই পড়ি আমরা; আমার আশঙ্কা হয় তার বেশির ভাগই বাজে বই। প্রাচীন কালের লোকেরা অতি অল্প বইই পড়তেন; কিন্তু সে বইগুলো ছিল ভালো বই, তাঁরা সেগুলোকে পড়তেনও খুব ভালো করে। ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের মধ্যে একজন ছিলেন স্পিনোজা—বিদ্যা এবং বিজ্ঞতার তিনি প্রতিমূর্তি। সপ্তদশ শতাব্দীর লোক, আমস্টারডমে বাস করতেন। শোনা যায় তাঁর গ্রন্থাগারে নাকি পুরো ষাটখানা বইও ছিল না।
অতএব একথাটা আমাদের জেনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে মানুষের জ্ঞান অনেক বেড়ে গেছে বলেই যে আমরাও মহত্তর বা বিজ্ঞতর হয়ে গেছি তার কোনো মানে নেই। সে জ্ঞানকে কী ভাবে ব্যবহার করা যায় সেটাও আমাদের জানতে হবে, তবেই তাকে আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারব। গাড়িখানা আমাদের ভালো, কিন্তু সে গাড়িতে চড়ে সামনে ছুট দেবার আগে জেনে নিতে হবে, কোথায় আমরা যেতে চাই। তার মানে, জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত, তার সম্বন্ধে কিছু ধারণা আমাদের থাকা দরকার। এখনকার অনেক লোকেরই সে ধারণা কিছুমাত্র নেই, নেই বলে তাদের কোনো দুশ্চিন্তাও দেখা যায় না। বিজ্ঞানের যুগে তারা বাস করছে, কিন্তু যে-সব ধারণা আর মতামত নিয়ে তারা চলে ফেরে কাজকর্ম করে সেগুলো অতি প্রাচীন, বিগত যুগের বস্তু। তার ফলে স্বভাবতই হাঙ্গামা বাধে, সংঘাতের সৃষ্টি হয়। চালাক বাঁদর হয়তো গাড়ি চালানো শিখতে পারবে, কিন্তু তার হাতে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
আধুনিক যুগের জ্ঞান অত্যন্ত জটিল এবং ব্যাপক ব্যাপার। হাজার হাজার গবেষক ক্রমাগত কাজ করে চলেছেন, প্রত্যেকে তাঁর নিজ বিভাগে বসে নানারকম পরীক্ষা চালাচ্ছেন, প্রত্যেকেই তাঁর নিজস্ব জমিটিতে সুড়ঙ্গ কাটছেন, কণা কণা করে জ্ঞান আহরণ করে জ্ঞানের প্রকাণ্ড পাহাড়কে আরও উঁচু করে তুলছেন। জ্ঞানের ক্ষেত্র এত বিশাল যে প্রত্যেকজন কর্মীকেই তাঁর নিজস্ব ধরনের কাজে একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে নিতে হয়। অনেক সময়ে দেখা যায়, জ্ঞানের অন্যান্য বিভাগ সম্বন্ধে তাঁর কোনো ধারণাই নেই; কোনো কোনো বিষয়ে হয়তো তাঁর অগাধ বিদ্যা, অথচ অন্য কতকগুলো বিষয়ে তাঁর একেবারে কোনো বিদ্যাই নেই। সেক্ষেত্রে মানুষের কার্যকলাপের সমগ্র ক্ষেত্রটির সম্বন্ধে একটা বিজ্ঞোচিত ধারণা করে নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে। প্রাচীন জগতে ‘সভ্যতা’ বা ‘শিক্ষা’ কথাটার যা অর্থ ছিল, সে অর্থে তিনি ‘সভ্য’ বা ‘শিক্ষিত’ মানুষ নন।
অবশ্য এমন মানুষও আছেন, যাঁরা এইরকম সংকীর্ণ বিশেষজ্ঞতার ঊর্ধে উঠে গিয়েছেন: তাঁরা নিজেরাও বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত, তবু একটা বৃহত্তর দৃষ্টি নিয়ে জগতকে দেখবার শক্তি তাঁরা রাখেন। যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা বা মানবসুলভ বাধাবিঘ্ন, সমস্ত কিছুকেই অগ্রাহ্য করে এঁরা এঁদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন; গত পনর বছর বা ঐরকম সময়ের মধ্যে মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডারে অপূর্ব সব রত্ন এঁরা উপহার দিয়েছেন। এ যুগের সবচেয়ে বড়ো বৈজ্ঞানিক বলা হয় অ্যালবার্ট আইন্স্টাইনকে। ইনি একজন জর্মন ইহুদি; নবসৃষ্ট হিটলার সরকার সম্প্রতি এঁকে জর্মনি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ তারা ইহুদিদের প্রতি প্রসন্ন নয়।
আইন্স্টাইন গণিতশাস্ত্রের সূক্ষ্ম হিসাব করে পদার্থবিদ্যার নূতন কতকগুলো মৌলিক সূত্র আবিষ্কার করেছেন, যার প্রভাব সমস্ত বিশ্বসংসারের উপরে দেখা যাচ্ছে। দুশো বছর ধরে নিউটনের সূত্রগুলোকেই আমরা বিনা দ্বিধায় সত্য বলে স্বীকার করে এসেছি। আইন্স্টাইনের আবিষ্কারে তারও কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটল। আইন্স্টাইনের এই সিদ্ধান্ত সত্য প্রমাণিত হয়েছে একটা অত্যন্ত আশ্চর্য উপায়ে। তাঁর সিদ্ধান্ত হল, আলোর বিকীরণের একটা বিশেষ রীতি আছে; সেটার সত্যতা পরীক্ষা করা যায় সূর্যগ্রহণের সময়ে। তার পর যখন একবার সূর্যগ্রহণ হল, দেখা গেল সত্যই আলোর রেখাগুলো সেই ভাবেই চলছে। অঙ্ক কষে যে সিদ্ধান্ত আইন্স্টাইন স্থির করেছিলেন, সেটা সত্য প্রমাণ হল বাস্তব পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।
আইন্স্টাইনের এই সিদ্ধান্তটি কী, তা আমি তোমাকে বোঝাতে চেষ্টা করব না। বিষয়টা অত্যন্ত জটিল, আর এর সম্বন্ধে আমার ধারণাও মোটেই স্পষ্ট নয়। এর নাম হচ্ছে ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’। বিশ্বজগতের স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আইন্স্টাইন দেখলেন, কাল এবং স্থান বলে যে ধারণা আমাদের আছে, তাকে আলাদা আলাদা করে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। অতএব তিনি এই দুটি ধারণাকেই বাতিল করে দিলেন, দিয়ে একটি নূতন তত্ত্ব প্রচার করলেন, এর মধ্যে স্থান এবং কাল, দুটিকেই তিনি একত্র গেঁথে দিলেন। এইটাই হল তাঁর আবিষ্কৃত স্থান-কালের তত্ত্ব।
আইন্স্টাইনের গবেষণা ছিল সমগ্র বিশ্ব-জগতকে নিয়ে। উল্টো দিকে আছেন আবার অন্য সব বৈজ্ঞানিকরা, এঁরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। ধরো একটা আলপিনের ডগা—এত ক্ষুদ্র জিনিস যে খালি চোখে তাকে প্রায় দেখাই যায় না। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার দ্বারা এঁরা প্রমাণ করলেন, এই পিনের ডগাটিও একদিক থেকে একটা আস্ত বিশ্ব-জগতেরই সামিল। এর মধ্যে আছে অসংখ্য অণু, তারা পরস্পরকে ঘিরে খালি ঘুরে বেড়াচ্ছে; প্রত্যেক অণুর মধ্যে আবার অনেক পরমাণু, তারাও পরস্পরকে ঘিরে ঘুরছে অথচ কেউ কাউকে স্পর্শ করছে না; এক একটি পরমাণুর মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো করে বিদ্যুতের টুকরো বা চার্জ বা যাই বল, এদের নাম প্রোটন আর ইলেকট্রন, এরাও সারাক্ষণই অতি প্রচণ্ড বেগে ছুটে বেড়াচ্ছে। এদেরও মধ্যে আবার ক্ষুদ্রতর অংশ আছে, তাদের বলে পজিট্রন, নিউট্রন, ডেণ্টন; হিসাব করে দেখা গেছে একটি পজিট্রনের আয়ুর গড়পড়তা দৈর্ঘ্য হচ্ছে এক সেকেন্দ্রের প্রায় একশো কোটি ভাগের এক ভাগ। এর সমস্ত ব্যাপারটাই হচ্ছে, শূন্যপথে যেমন গ্রহ-নক্ষত্রেরা পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঠিক তারই মতো ব্যাপার—তবে অনেকখানি ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে। মনে রেখো, অণু জিনিসটাই এত ছোটো যে সবচেয়ে শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও তাকে দেখা যায় না। আর পরমাণু, প্রোটন, ইলেকট্রন, এদের কথা তো কল্পনাতে আনাই কঠিন ব্যাপার। অথচ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার এতদূর উন্নতি এখন হয়েছে যে এই প্রোটন ইলেকট্রনদের সম্বন্ধেও রাশিকৃত তত্ত্ব আমরা জেনে ফেলেছি। সম্প্রতি পরমাণুকেও ভেঙে খণ্ড খণ্ড করা গেছে।
বিজ্ঞানের যে-সব তত্ত্ব এখন বেরিয়েছে তার কথা ভাবতে গেলেই মাথা ঘুরে যায়; তার মূল্য নিরূপণ করা তো খুবই শক্ত কাজ। এর চেয়েও আশ্চর্য কথা কিছু তোমাকে শোনাচ্ছি। আমরা জানি, আমাদের এই পৃথিবীটাকে আমরা এত বড়ো বলে মনে করি, অথচ এটাও সূর্যের একটা ক্ষুদ্র গ্রহ মাত্র; সে সূর্য নিজেই আবার একটা অতি মানমর্যাদাহীন ক্ষুদ্র নক্ষত্র। সৌরজগৎটাই হচ্ছে স্থান-মহাসমুদ্রে একটি জলবিন্দু মাত্র। নিখিল বিশ্বের এক স্থান থেকে আরেক স্থানের দূরত্ব এত বেশি যে, এর কোনো কোনো জায়গা থেকে আমাদের এখানে এসে পৌঁছতে আলোরও হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বছর লেগে যায়। রাত্রে যখন একটা তারা দেখি, কাকে দেখতে পাই জান? এই মুহূর্তে সে তারাটির যে রূপ আছে তাকে নয়। দেখি তার যে আলোর রশ্মিটি আমাদের কাছে এখন এসে পৌঁছচ্ছে, সে যখন সেই তারাটি ছেড়ে আমাদের দিকে যাত্রা করেছিল, সেই সময়ে তারাটির যে রূপ ছিল, তাকে। অতি দীর্ঘ তার সে যাত্রাপথ—সে পথ অতিক্রম করে আসতে হয়তো তার শত শত বা হাজার হাজার বছর লেগেছে। স্থান এবং কাল সম্বন্ধে আমাদের যে ধারণা আছে তা দিয়ে এর হদিশ মেলে না। সেই জন্যই আইন্স্টাইনের স্থান-কালের তত্ত্ব দিয়ে এ-সব ব্যাপার বোঝা অনেক বেশি সহজ হয়। স্থানকে বাদ দিয়ে যদি কালের কথা ভাবি, তবে অতীত আর বর্তমানে তালগোল পাকিয়ে যাবে। যে তারাটিকে আমরা এই মুহূর্তে দেখছি আমাদের কাছে সে বর্তমান; অথচ আসলে আমরা দেখছি তার অতীত রূপকে। কে জানে হয়তো-বা তার অস্তিত্বই বহুকাল আগে লুপ্ত হয়ে গেছে, তার সে আলোর রশ্মিটি যাত্রা শুরু করবার পরে কোনো একসময়ে।
বলেছি, আমাদের সূর্যটি একটি মানমর্যাদাহীন ক্ষুদ্র নক্ষত্র। এই রকম আরও প্রায় এক লক্ষ নক্ষত্র আছে, এদের সকলকে নিয়ে তৈরি হয় একটি নক্ষত্রপুঞ্জ। আমরা রাত্রে যে তারাগুলোকে দেখতে পাই তারা প্রায় সকলেই এই নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে। কিন্তু খালি চোখে আমরা এই তারাদের অতি অল্প কয়েকটিকেই দেখতে পাই। শক্তিশালী দূরবীক্ষণ দিয়ে আরও অনেক বেশি তারা দেখা যায়। এই বিজ্ঞানে যাঁরা পারদর্শী, তাঁরা হিসাব করে দেখেছেন, বিশ্বজগতে এই রকম নক্ষত্রপুঞ্জ আছে মোট প্রায় এক লক্ষ।
আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য বলছি। বৈজ্ঞানিকরা বলেন, এই বিশ্বজগতের আয়তন ক্রমেই বাড়ছে। গণিতশাস্ত্রবিদ্ সার্ জেম্স্ জীন্স্ একে তুলনা করেছেন একটা সাবানের বুদ্বুদের সঙ্গে; দিনদিনই সে বৃহুত্তর হচ্ছে, এই বিশ্বজগত সেই বুদ্বুদের বাইরের আবরণ। এই বুদ্বুদাকৃতি বিশ্বজগতের আয়তন এত বড়ো যে এর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে আলোরই বহু লক্ষ লক্ষ বছর লেগে যায়।
তোমার বিস্মিত হবার ক্ষমতা যদি এখনও ফুরিয়ে গিয়ে না থাকে, তবে বাস্তবিকই বিস্ময়কর এই বিশ্বজগত সম্বন্ধে আরও একটি কথা শোনো। কেম্ব্রিজের একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ আছেন, তাঁর নাম সার্ আর্থার এডিংটন। তিনি বলেন, আমাদের এই বিশ্বজগত ক্রমশই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, ঠিক দম-ফুরিয়ে-যাওয়া ঘড়ির মতো। আবার যদি কোনো প্রকারে এতে দম দিয়ে না দেওয়া হয়, তবে একদিন এটা একেবারেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। অবশ্য এ-সব কাণ্ড ঘটতে লক্ষ লক্ষ বছর লাগবে, কাজেই আপাতত আমাদের ভয় পাবার কিছু নেই।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে বড়ো বিজ্ঞান ছিল পদার্থবিদ্যা আর রসায়ন। এদের সাহায্যে মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিকে বা বাইরের জগতকে নিজের ইচ্ছামতো চালাতে পারত। তার পর বিজ্ঞানভক্ত মানুষ ভিতরের দিকে চোখ ফেরাল, নিজেকেই বিশ্লেষণ করে দেখতে আরম্ভ করল। জীববিদ্যার কদর বাড়ল—এটা হচ্ছে মানুষ জীবজন্তু গাছপালার মধ্যে জীবন কী ভাবে থাকে তারই বিদ্যা। ইতিমধ্যেই এর আশ্চর্যরকম উন্নতি হয়েছে; জীবতত্ত্ববিদ্রা বলছেন, আর অল্পদিনের মধ্যেই ইনজেকশন দিয়ে বা অন্য উপায়ে মানুষের চরিত্র বা প্রকৃতি বদলে দেওয়া সম্ভব হয়ে যাবে। হয়তো তখন কাপুরুষকে সাহসী বীরে পরিণত করা যাবে; কিংবা হয়তো তখন সরকারপক্ষ তাঁদের যারা সমালোচনা করছে বা বিরোধিতা করছে তাদের ধরে ধরে ইনজেকশন দিয়ে দেবেন, সরকারি কাজে বাধা দেবার শক্তিটাকেই তাদের কমিয়ে দেবেন—এইটাই হওয়া বেশি সম্ভব, কি বল?
জীববিদ্যার ঠিক পরের ধাপই হচ্ছে মনস্তত্ত্ববিদ্যা। এর কারবার মন নিয়ে, মানুষের চিন্তা, অভিপ্রায়, ভয় আর কামনা নিয়ে। বিজ্ঞানের অভিযান এইভাবে নিত্য নূতন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছে, আমাদের নিজেদের সম্বন্ধে ক্রমেই বেশি কথা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে, হয়তো এইভাবে আমাদের নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবার শক্তিই যুগিয়ে দিচ্ছে। সুজননবিদ্যাও জীববিদ্যা থেকে একটি মাত্র পরের ধাপ। এটা হচ্ছে জাতির উন্নতি-বিধানের বিজ্ঞান। বিশেষ কতকগুলো জীবকে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানের কতখানি উন্নতি সাধন করা গেছে, সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। ব্যাঙ্কে কেটে দেখা হয়েছে, জীবের দেহে স্নায়ু এবং পেশীগুলো কীরকম-ভাবে কাজ করে। বেশি পাকা কলার উপরে অতি ক্ষুদ্র একরকম মাছি পড়ে, তার নামই হয়ে গেছে কলার-মাছি। এদের বিশ্লেষণ করে বংশানুক্রম সম্বন্ধে যত জিনিস জানা গেছে এমন আর কিছু থেকেই হয়নি। এই মাছিকে খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কী ভাবে এক-পুরুষের দোষগুণ বংশানুক্রমে পরবর্তী পুরুষেও আত্মপ্রকাশ করে। এই থেকে মানুষ-জাতির মধ্যেও পুরুষানুক্রমের গতিটাকে বোঝা অনেকখানি সহজ হয়েছে।
এর চাইতেও অদ্ভুত একটা জীব থেকে আমরা অনেকখানি জ্ঞান লাভ করেছি, সে হচ্ছে সাধারণ ফড়িং। আমেরিকার বৈজ্ঞানিকরা দীর্ঘকাল ধরে এবং অতি যত্নে ফড়িঙের গতিবিধি লক্ষ্য করেছেন; তার ফলে জানা গেছে, জীবজন্তুদের মধ্যে এবং মানুষের মধ্যেও স্ত্রী-পুরুষ ভেদ কী ভাবে নিষ্পন্ন হয়। জীবনের একেবারে প্রথম দিন থেকেই ক্ষুদ্র প্রাণ কী ভাবে পুরুষ বা স্ত্রী ভ্রূণে পরিণত হয়, ধীরে ধীরে পরিণত হয় ক্ষুদ্র একটি স্ত্রী বা পুরুষ জীবে, ক্ষুদ্র একটি বালক বা বালিকাতে—তার সম্বন্ধে এখন আমরা অনেক কথাই জানি।
এই রকমের আরেকটি জীব আমাদের সাধারণ পোষা কুকুর। রাশিয়ার একজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আছেন পাভ্লভ্; এখন তাঁর চুরাশি বছর বয়স তবু এখনও তিনি সমানে তাঁর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি খুব যত্ন করে কুকুরদের ভাবভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন; বিশেষ করে লক্ষ্য করলেন, খাদ্য দেখলে তাদের মুখ থেকে কীরকম করে লালা বেরোয়। কুকুরের মুখের লালার পরিমাণ পর্যন্ত তিনি মেপে দেখলেন। খাদ্য দেখলে কুকুরের এই জিভে জল আসা—এটা একটা স্বয়ংক্রিয় ব্যাপার, যাকে বলে একটি নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া (unconditioned reflex)। ঠিক যেমন ছোট্টো শিশু হাঁচে বা হাই তোলে বা আড়মোড়া ভাঙে—সেজন্য আগে থেকে শেখার তার দরকার হয় না। আগের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তার আটকায় না।
এর পর পাভ্লভ্ আপেক্ষিক প্রতিক্রিয়া (conditioned reflex) জন্মাবার চেষ্টা করলেন। তার মানে কুকুরকে তিনি শেখালেন বিশেষ একটি সংকেত হলেই সে খাদ্য প্রত্যাশ করতে পারে। এর ফলে সেই সংকেতটি কুকুরের মনে খাদ্যের কথা জাগিয়ে দিতে লাগল; খাদ্য কাছে নেই তবু শুধু সংকেত শুনেই কুকুরের মুখে লালা ঝরতে লাগল, যেন সত্যই খাদ্য তার সামনে হাজির।
কুকুর আর তার লালাস্রাব নিয়ে এই-যে গবেষণা, একে ভিত্তি করেই মানব-মনস্তত্ত্বের ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অতি শৈশবে মানুষের মধ্যে কতকগুলো নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া থাকে; তার পর বড়ো হবার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই বেশি করে আপেক্ষিক প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে জন্মাতে থাকে। বস্তুত যা কিছু আমরা শিখি, সবই শিখি এইভাবে। এইভাবেই আমাদের সব অভ্যাস গড়ে ওঠে, এইভাবেই আমরা ভাষা শিখি। আমাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের প্রতিক্রিয়া দ্বারা; তা অবশ্য মধুর ও তিক্ত দুরকমেরই হয়। যেমন, মানুষের একটা সাধারণ প্রতিক্রিয়া আছে, ভয়। পায়ের কাছে সাপ দেখলে, বা সাপের মতো চেহারার একটা দড়ির টুকরোও দেখলে, আমরা কিছু না ভেবেচিন্তেই তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে সরে যাই—সেজন্য পাভ্লভের গবেষণার তত্ত্ব জানা থাকবার প্রয়োজন হয় না।
পাভ্লভের গবেষণা মনস্তত্ত্ব-বিজ্ঞানের সর্বত্রই একটা বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। তাঁর কতকগুলো গবেষণা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর, কিন্তু এ নিয়ে এখানে আর আলোচনা করা যাচ্ছে না। তবু একটি কথা বলছি, মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে তত্ত্বান্বেষণের এছাড়া আরও কতকগুলো খুব ভালো প্রণালী আছে।
তোমাকে এই অল্পক’টা উদাহরণ দিলাম, যেন এর থেকেই তুমি খানিকটা ধারণা করতে পার বিজ্ঞানের কাজ কীরকম প্রণালীতে চলে। আগের দিনের দার্শনিকদের রীতি ছিল বড়ো বড়ো সব বিষয় নিয়ে আব্ছা অস্পষ্ট কথা বলে যাওয়া; অথচ সে বিষয়কে পুরোপরি বিশ্লেষণ করা বা উপলব্ধি করা সহজ নয়, হয়তো বা সম্ভবই নয়। এদের কথা নিয়ে লোকেরা খালি তর্কের পর তর্ক করত, তর্ক করতে করতে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠত; কিন্তু তাদের সে তর্ক এবং যুক্তির সত্য-মিথ্যা যাচাই করবার কোনো চরম উপায় ছিল না, সুতরাং শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা না-স্বর্গে না-মর্তে হয়েই শূন্যে ঝুলে থাকত, ব্যাপারটার কোনো মীমাংসাই হত না। পরলোক সম্বন্ধে যুক্তিজাল বিস্তার করতেই এঁরা এত বেশি ব্যস্ত থাকতেন, যে এই পৃথিবীতে যে-সব সাধারণ বস্তু রয়েছে তাদের দিকে তাকিয়ে দেখতেও তাঁরা লজ্জাবোধ করতেন। কিন্তু বিজ্ঞানের রীতি ঠিক এর বিপরীত। অতি সামান্য, অকিঞ্চিৎকর ব্যাপার বলে যেগুলোকে মনে হয়, বৈজ্ঞানিকরা তাকেই অত্যন্ত যত্নসহকারে পর্যবেক্ষণ করেন, তাই থেকেই অতি বড়ো বড়ো তথ্যের সন্ধান মিলে যায়। তার পর সেই সব তথ্যের ভিত্তিতে এঁরা সূত্র রচনা করেন; সে সূত্রকে আবার আরও নূতনতর পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষার দ্বারা যাচাই করে নেওয়া হয়।
আমি বলছি না—বিজ্ঞান কখনও ভুল করে না। ভুল সে অনেক করে, তখন আবার তাকে গোড়ার দিকে ফিরে যেতে হয়। আবার গোড়া থেকে শুরু করে। কিন্তু তবুও কোনো প্রশ্নকে বিচার করতে হলে বৈজ্ঞানিক পন্থাটাই হচ্ছে একমাত্র নির্ভুল পন্থা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের মনে অহঙ্কার ছিল, নিজেকে সে স্বয়ং-সম্পূর্ণ মনে করত। এখন তার সে অহঙ্কার একেবারেই নেই। যতখানি সিদ্ধিলাভ তার হয়েছে তার জন্য সে গৌরব বোধ করে। কিন্তু জ্ঞানের যে বিশাল এবং চির-বিস্তারণশীল সমুদ্র তার সম্মুখে আজও অনুত্তীর্ণ পড়ে রয়েছে, তার দিকে তাকিয়েও সে সসম্ভ্রমে মস্তক অবনত করছে। জ্ঞানীব্যক্তি জানেন তাঁর জ্ঞান কত সামান্য; মূর্খ ব্যক্তিই ভাবে তার অজানা কিছু নেই। বিজ্ঞানের অবস্থাও তাই। সে যত সামনে এগিয়ে চলেছে, তার গোঁড়ামিও ততই কমে যাচ্ছে; তাকে কোনো প্রশ্ন করলে তার জবাব দিতে সে ততই বেশি দ্বিধাবোধ করছে। এডিংটন বলেছেন: “বিজ্ঞানের প্রগতি কতদূর হল সেটা মাপতে হবে, কতকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমরা দিতে পারছি তা দিয়ে নয়; কতকগুলো প্রশ্ন আমরা করতে পারছি তাই দিয়ে।” হয়তো তাই। তবু বিজ্ঞান এখন ক্রমেই বেশি করে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে, জীবনের স্বরূপ আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, যথাযোগ্য লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত একটা মহত্তর জীবন যাপন করবার শক্তি আমাদের যুগিয়ে দিচ্ছে—সে জীবনযাপন করতে আমরা চাইব কি না কে জানে। অযৌক্তিকতার অস্পষ্ট জটিলতা নিয়ে বিজ্ঞানের কারবার নয়; সে জীবনের অন্ধকার কোণগুলিকেও আলোকের ধারায় উদ্ভাসিত করে তোলে, সনাতন সত্যের মুখোমুখি এনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়।