বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বিপন্ন চীন

উইকিসংকলন থেকে

১১৫

বিপন্ন চীন

২৪শে ডিসেম্বর, ১৯৩২

 গত চিঠিতে আমি বলেছি, কীরকম করে ১৮৬০ সনে ব্রিটিশ আর ফরাসিরা পিকিঙের অপরূপ গ্রীষ্ম-প্রাসাদটিকে ধ্বংস করেছিল। এরা বলে, চীনারা সন্ধিজ্ঞাপক নিশানের মর্যাদা রাখে নি, তাই তাদের শাস্তিস্বরূপই এটা করা হয়েছিল। হতে পারে হয়তো দু-চারজন চীনা সৈনিক সত্যিই এইরকম কোনো অন্যায় করেছে; কিন্তু তা হলেও ব্রিটিশ আর ফরাসিরা মিলে যে ইচ্ছাকৃত গুণ্ডামির নমুনা দেখিয়েছিল তা প্রায় মানুষের কল্পনার বাইরে। এ কাজ কয়েকজন অজ্ঞ সৈনিকের নয়, এ কর্তা-ব্যক্তিদেরই কাজ। এরকম কাণ্ড ঘটে কেন? ইংরেজ ও ফরাসিরা সভ্য, সংস্কৃতিসম্পন্ন জাতি, অনেক দিক থেকে এরাই আধুনিক সভ্যতার অগ্রগামী। ঘরোয়া জীবনে এরা সভ্য ও বিবেচক, তবু বাইরের আচরণে এবং অন্য জাতির সঙ্গে লড়াইয়ের বেলায় এরা সমস্ত সভ্যতা ভব্যতা একেবারেই ভুলে যায। আমার মনে হয়, পরস্পরের প্রতি ব্যক্তিদের আচরণ আর পরস্পরের প্রতি জাতিদের আচরণ, এ দুয়ের মধ্যে একটা অদ্ভূত তফাত আছে। ছোটো শিশুদের, ছেলেমেয়েদের আমরা শেখাই অতিরিক্ত স্বার্থপর হতে নেই, অন্যের মঙ্গল চিন্তা করবে, লোকের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করবে। এই কথা আমাদের শেখাবার জন্যেই আমাদের যত লেখাপড়ার আয়োজন; খানিক পরিমাণে এ আমরা শিখেও থাকি। তার পর আসে যুদ্ধ, সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেসমস্ত পুরোনো পড়া একদম ভুলে যাই, আমাদের মধ্যেকার জন্তুটা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন ভদ্রজাতিরাও অবিকল পশুর মতো আচরণ শুরু করে দেয়।

 এক গোত্রের দুটি জাতি, যেমন ফরাসি আর জর্মন, যখন পরস্পর লড়াই লাগায় তখনও এই ব্যাপার ঘটে। অবস্থা আরও অনেক ভয়ানক হয়ে ওঠে যখন যুদ্ধ বাধে দুটি ভিন্ন গোত্রের জাতির মধ্যে, ইউরোপীয় জাতিরা যখন এশিয়া আর আফ্রিকার লোকের সঙ্গে যুদ্ধ করতে নামে। তখন দুই পক্ষের দুই জাতি পরস্পরের সম্বন্ধে কেউই কিছুমাত্র জানে না, প্রত্যেকেই থাকে অপরের কাছে না-খোলা বইয়ের শামিল হয়ে। পরস্পরকে যেখানে জানি না সেখানে সমবেদনারও স্থান নেই। প্রত্যেকেরই মনে অন্যজাতির উপরে ঘৃণা আর দ্বেষ জমে উঠতে থাকে; তার পর যখন সে দুই জাতির মধ্যে যুদ্ধ বাধে, সেটা শুধু রাজনৈতিক যুদ্ধ থাকে না; হয়ে ওঠে তার চেয়েও অনেক খারাপ জিনিষ, জাতিগত যুদ্ধ। ভারতে ১৮৫৭ সনের বিদ্রোহে যে বিভীষিকার সৃষ্টি হয়েছিল, ইউরোপের প্রবল জাতিরা এশিয়া আর আফ্রিকাতে যে নিষ্ঠুরতা ও দুর্বৃত্ততার পরিচয় দিয়েছে, তার অনেকখানি ব্যাখ্যা হচ্ছে এই।

 এর সমটাই মনে হয় বড়ো দুঃখের আর ভারি বোকামির কথা। কিন্তু যেখানেই এক দেশ অন্য দেশের উপরে, এক জাতি অন্য জাতির উপবে, এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীর উপরে প্রভুত্ব করছে সেইখানেই আসবে অসন্তোষ সংঘর্ষ আর বিদ্রোহ; সেইখানেই সে শোষিত দেশ জাতি বা শ্রেণী শোষকদের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্যে চেষ্টা করবে। একের হাতে অপরের এই শোষণ, এরই উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের আধুনিক কালের সমাজ। এর নাম ধনিকতন্ত্র, এবং এর থেকেই জন্ম হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের।

 ঊনবিংশ শতাব্দীতে বড়ো বড়ো কলকারখানা আর শিল্পের প্রগতির কল্যাণে পশ্চিম-ইউরোপের দেশগুলি এবং আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ধনশালী ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তারা মনে করতে লাগল, সমস্ত পৃথিবীর তারাই প্রভু, অন্যান্য জাতিগুলো তাদের চেয়ে অনেক ছোটো, অতএব তাদের জন্যে পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য। প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে তারা খানিকটা অধীন করে ফেলেছে; তারই জোরে তারা গর্বিত হয়ে উঠল, অন্যের উপরে মুরুব্বিয়ানা করতে শুরু করল। ভুলে গেল, সভ্য মানুষ যে হবে তার কেবল প্রাকৃতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করলেই হবে না, নিয়ন্ত্রিত করতে হবে তার নিজেকেও। এইজন্যেই দেখি, এই ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে প্রগতিবাদী জাতিগুলো অনেক দিক থেকে অন্যদের পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল তারাই অনেক সময়ে এমনসব আচরণ করছে যা করতে অনুন্নত অসভ্যরাও লজ্জা পায়। কেবল গত শতাব্দীতে নয়, আজকালও ইউরোপীয় জাতিগুলো এশিয়াতে এবং আফ্রিকাতে যে আচরণ করে বেড়াচ্ছে, এই থেকেই সম্ভবত তুমি তার অর্থ বুঝতে পারবে।

 এ কথা মনে করো না যে, আমি আমাদের নিজেদের বা অন্য জাতিদের সঙ্গে ইউরোপীয় জাতিদের তুলনা করে তাদের ছোটো প্রমাণ করতে চাইছি। সে ইচ্ছে আমার মোটেই নেই। দোষ ত্রুটি আমাদের সকলেরই আছে। আমাদেরই কতকগুলি দোষ তো একেবারে মারাত্মক; তা না হলে যতখানি অধঃপতন আমাদের হয়েছে এতখানি হয়তো হত না। এই চিঠি লিখতে লিখতেই যে প্রশ্নটি আমার মনকে জুড়ে রয়েছে সে হচ্ছে বাপুজির আসন্ন উপবাস; যাদের এখন ‘হরিজন’ বলা হচ্ছে আমাদের সেই দুর্গত শ্রেণীগুলোকে দেবমন্দিরে প্রবেশের অধিকার আদায় করে দেবার জন্যে তিনি উপবাস করবেন। মন্দিরে তারা যাক বা না যাক সে নিয়ে আমি বিশেষ মাথা ঘামাই নে। কিন্তু জোর করে তাদের বাইরে ঠেলে রাখবার মানেই হচ্ছে তাদের ছোটো বলে, অশুচি জীব বলে চিহ্নিত করে রাখা। কাজেই এই প্রশ্নটা একটা গুরুতর প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। আমাদের মধ্যে কোনো দুর্গত বা শোষিত শ্রেণী থাকবে না এরকম চরম ব্যবস্থা যত দিন আমরা সম্পূর্ণ করতে না পারছি ততদিন অন্যেরা যদি আমাদের প্রতি অনুরূপ ব্যবহার করেই তা নিয়েও নালিশ করবার কোনো অধিকার আমাদের নেই।

 এবার আবার চীনে ফিরে যাওয়া যাক। গ্রীষ্ম-প্রাসাদ ধ্বংস করে ব্রিটিশ আর ফরাসিরা খুব-একটা বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল। এর পরে তারা জোর করে চীনকে পুরোনো সন্ধির শর্তগুলোকে নতুন করে ঝালিয়ে দিতে বাধ্য করল, করে তার কাছ থেকে আবার কিছু সুযোগসুবিধা আদায় করে নিল। এই সন্ধি অনুসারে চীন সরকার সাংহাইতে চীনের বাণিজ্য শুল্ক বিভাগটিকে নূতন করে গড়ে নিলেন, এর কর্তা হল বিদেশী কর্মচারীরা। এই বিভাগটির নাম দেওয়া হল ‘রাজকীয় নৌবাণিজ্য-শুল্ক বিভাগ’।

 তাইপিং বিদ্রোহের ফলেই চীন দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং বিদেশীরা তাকে ঘায়েল করবার সুযোগ পাচ্ছিল; সে বিদ্রোহ তখনও শেষ হয় নি। শেষে ১৮৬৪ সনে একজন চীনা শাসনকর্তা একে একেবারে দমন করে দিলেন। এঁর নাম ছিল লি হুঙ চ্যাঙ; পরে ইনি চীনের একজন প্রধান রাজনীতিক হয়ে উঠেছিলেন।

 ইংলণ্ড এবং ফ্রান্স ভয় দেখিয়ে চীনের কাছ থেকে নানারকম সুযোগসুবিধা ও অধিকার আদায় করে নিচ্ছিল; ও দিকে উত্তর-চীনে রাশিয়া বেশ ভালো কাজ গুছিয়ে নিল অনেক বেশি সহজ উপায়ে। এর মাত্র অল্প কয়েক বছর আগে রাশিয়া কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ দখল করবার লোভে ইউরোপীয় তুর্কি দেশ আক্র‌মণ করে বসেছিল। রাশিয়ার শক্তি বেড়ে যাচ্ছে এই ভয়ে ইংলণ্ড এবং ফ্রান্স ছুটে এসে তুর্কির সঙ্গে যোগ দিল; ফলে রাশিয়া হেরে গেল। এই যুদ্ধের নাম ‘ক্রিমিয়ার যুদ্ধ’, এর কাল হচ্ছে ১৮৫৪-৫৬ সন। পশ্চিম দিকে বাধা পেয়ে রাশিয়া পূর্ব দিকে ফিরে তাকাল, এখানে তার ভাগ্যে ভালো ফলই জুটল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে চীনকে বুঝিয়েসুঝিয়ে সে প্রসন্ন করে ফেলল, চীন তাকে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে সমুদ্রতীরের একটি প্রদেশ দিয়ে দিল। এর মধ্যে ছিল ভ্লাডিভস্টক-নামক নগর ও বন্দর। রাশিয়ার এই কার্যোদ্ধার হয়েছিল একজন খুব বিচক্ষণ তরুণ সেনানীর জন্যে; তাঁর নাম মুরাভিয়েফ। এইভাবে শুধু বন্ধুত্বের জোরে রাশিয়া যে কাজ আদায় করে নিল, ইংলণ্ড আর ফ্রান্স তিনটি বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহ আর উন্মত্ত ধ্বংসলীলা চালিয়েও তা আদায় করতে পারে নি।

 ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে এই ছিল দেশের অবস্থা। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে মাঞ্চু-বংশের বিরাট চীন-সাম্রাজ্য প্রায় অর্ধেক এশিয়া জুড়ে প্রবল প্রতাপে অধিষ্ঠিত ছিল; সে সাম্রাজ্য তখন হীনবল, অবমানিত হয়ে পড়েছে। সুদূর ইউরোপ থেকে পাশ্চাত্যজাতিরা এসে চীনাদের পরাজিত লাঞ্ছিত করেছে; দেশের মধ্যে একটা বিষম বিদ্রোহ সাম্রাজ্যটাকেই প্রায় ভেঙে ফেলবার উপক্রম করে তুলেছিল। এইসমস্ত কাণ্ডের ফলে চীন একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। বোঝা গেল, কোথাও একটা বড়ো গোল বেধেছে। নূতনতর পরিস্থিতি আর বিদেশীর আক্রমণকে যাতে সামলানো যায় এমনভাবে দেশটাকে নূতন করে গড়ে নেবার কিছু চেষ্টাও করা হল। এক হিসেবে এই ১৮৬০ খৃষ্টাব্দটাকে প্রায় একটা নূতন যুগের আরম্ভকাল বলে ধরা যায়; কারণ, সেই প্রথম চীন বিদেশীর আক্রমণকে রোখবার জন্যে তৈরি হল। এই সময়ে চীনের প্রতিবেশী দেশ জাপানেও ঠিক এই কাণ্ডই চলছিল, তাকে দেখেও চীন খানিকটা উৎসাহ পেয়ে গেল। চীনের চেয়ে জাপানের সাফল্য হল অনেক বেশি; তবু কিছু দিনের মতো চীনও বিদেশী জাতিদের দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিল।

 চীনের একজন বড়ো বন্ধু ছিলেন বার্লিঙ্গেম-নামক একজন আমেরিকান; এঁকে মুখপাত্র করে সন্ধিবদ্ধ জাতিদের কাছে চীনের একটি দৌত্য পাঠানো হল। তাদের কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো শর্তও তিনি আদায় করে নিয়ে এলেন। ১৮৬৮ সনে আমেরিকার সঙ্গে চীনের একটি নূতন সন্ধি হল। এই সন্ধির মধ্যে একটা লক্ষ করবার মতো বস্তু আছে। এতে চীনা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রীতি ও অনুগ্রহের স্বরূপ চীনা শ্রমিকদের দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবার অনুমতি দিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তখন তার পশ্চিম প্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে গড়ে তুলতে ব্যস্ত, যুক্তরাষ্ট্রে মজুরের অভাব হয়েছিল। কাজেই তারা চীনা মজুরদের নিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু এতেও আবার নূতন বিপত্তির সৃষ্টি হল। শস্তায় চীনা মজুর আমদানি করা হচ্ছে বলে আমেরিকানরা আপত্তি তুলল, ফলে দুই দেশের সরকারের মধ্যে খিটিমিটি লেগে গেল। এর কিছু দিন পরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার চীন থেকে লোক আসা নিষিদ্ধ করে দিলেন। এই অপমানে চীনের প্রজা অত্যন্ত চটে গেল; তারা আমেরিকার পণ্য বর্জন করল। কিন্তু এটা অতি দীর্ঘ কাহিনী, বলতে বলতে আমরা বিংশ শতাব্দীতে এসে যাচ্ছি। এ কাহিনী এখানে থাক্।

 তাইপিং বিদ্রোহ ভালো করে দমিত হতে-না-হতে মাঞ্চু-সম্রাটের বিরুদ্ধে আবার একটি বিদ্রোহ শুরু হল। এর ঘটনাস্থল ঠিক চীনে নয়, বহুদূর পশ্চিমে, তুর্কিস্তানে—এশিয়ার একেবারে মধ্যপ্রদেশ সেটা। এর অধিবাসীরা অধিকাংশই ছিল মুসলমান। ১৮৬৩ সনে এই মুসলমান উপজাতিরা বিদ্রোহ করে বসল, এদের নেতা ছিল ইয়াকুব বেগ নামে এক ব্যক্তি। চীনা কর্তৃপক্ষকে এরা দেশ থেকে তাড়িয়ে দিল। আমাদের পক্ষে এই স্থানীয় বিদ্রোহটি দেখবার মতো দুটো কারণে। রাশিয়া এই সুযোগে কিছু কাজ গুছিয়ে নিতে চাইল; চীনের খানিকটা স্থান সে দখল করে বসল। এটা অবশ্য ছিল ইউরোপীয়দের একটা প্রচলিত চাল। চীন যখনই কোনোরকম মুশকিলে পড়ত তখনই এরা এই কর্ম করে বসত। কিন্তু সবাই দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল, চীন এতে রাজি হল না, এবং শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে সে জায়গাটকে আবার উগরে দিতে হল। এটা সম্ভব হয়েছিল চীনা সেনাপতি সো-সুং-তাঙ-এর অপূর্ব অভিযানের ফলে। এই সেনাপতিটি সমস্ত কাজই করতেন অতি ধীরেসুস্থে। মধ্য-এশিয়াতে বিদ্রোহী ইয়াকুব বেগের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধযাত্রা করলেন। ভারি আস্তে আস্তে এগিয়ে চললেন, বিদ্রোহীদের কাছে গিয়ে পৌঁছতে তাঁর পথেই অনেক বছর লেগে গেল। এমনকি দু-দুবার তিনি পথের মধ্যে দীর্ঘকালের মতো সৈন্যদলকে থামিয়ে দিলেন, দিয়ে জমি চাষ করে শস্যের ফসল তুলে নিলেন। সৈনাদলকে খেতে হবে তো! সৈন্যদলের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করাটা সর্বত্রই একটা বড়ো সমস্যা; তাঁর কাছে এটা নিশ্চয়ই একটা অতি কঠিন সমস্যা ছিল; কারণ, পথে তাঁকে গোবি মরুভূমি পার হয়ে যেতে হবে। সেনাপতি সো অভিনব উপায়ে সে সমস্যার সমাধান করে নিলেন। তার পর তিনি ইয়াকুব বেগকে যুদ্ধে হারিয়ে দিলেন, বিদ্রোহও শেষ করে দিলেন। কাশগর তুর্‌ফান ইয়ারকন্দ প্রভৃতি স্থানে তিনি যে অভিযান চালিয়েছিলেন, রণনীতির দিক থেকে সেটা নাকি অপূর্ব।

 মধ্য-এশিয়াতে রাশিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়াটা বেশ ভালোই হল। কিন্তু এর অল্পদিন পরেই আবার চীন সরকারকে নূতন হাঙ্গামায় পড়তে হল। বিরাট সাম্রাজ্য, অথচ তার বন্ধন তখন শিথিল হয়ে আসছে। এবার বিপত্তি উঠল সে সাম্রাজ্যের আর-এক দিকে আনামে। আনাম ছিল চীনের অধীন সামন্ত রাজা। ফরাসিরা এর দিকে হাত বাড়াল, অতএব লাগল চীনে আর ফ্রান্সে যুদ্ধ। এবারও চীন সবাইকে অবাক করে দিল; যুদ্ধে সে বেশ অনায়াসে জিতে গেল, ফরাসিদের ভয়ে মোটেই ঘাবড়ে গেল না। ১৮৮৫ সনে বেশ ভদ্র শর্তেই দুয়ের মধ্যে সন্ধি হয়ে গেল।

 চীনের এই নবজাগ্রত শক্তির পরিচয় পেয়ে সাম্রাজ্যবাদী জাতিরা বেশ একটু মুষড়ে পড়ল। ভাবল, ১৮৬০ সনের আগে পর্যন্ত যে দুর্বলতা চীনের ছিল, এবার বুঝি সে দুর্বলতা তার ঘুচেই যায়। দেশেও সংস্কারের কথাবার্তা উঠল; অনেকেই মনে করলেন, এত দিনে চীনের ভাগ্যে আবার মোড় ফিরল। এইজন্যেই ১৮৮৬ সালে ইংলণ্ড যখন ব্রহ্মদেশ দখল করে নিল, সঙ্গে সঙ্গেই চীনকে সে প্রতিশ্রুতি দিল, প্রতি দশ বছর অন্তর চীনের প্রাপ্য রাজ-কর সে চীনকে পাঠিয়ে দেবে।

 বাস্তবিক পক্ষে চীনের কিন্তু মোড় ফিরতে তখনও অনেক দেরি। তখনও তার ভাগ্যে প্রচুরপরিমাণ অসম্মান আর গৃহবিবাদ তোলা রয়েছে। চীনের যেখানে বস্তুত গলদ ছিল সে শুধু তার সেনা বা নৌ বাহিনীর দুর্বলতা নয়, তার দুর্দশার মূল কারণ ছিল অনেক বেশি গভীর। তার সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন-ব্যবস্থা তখন ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়ছে। আমি আগেই বলেছি, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে চীনের অবস্থা অতি খারাপ হয়েছিল; মাঞ্চুদের বিরুদ্ধে তখন বহু গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠছিল। বিদেশী বাণিজ্য আর শিল্পপ্রধান দেশগুলোর সংস্পর্শের ফলে তার অবস্থা আরও মন্দ হয়ে উঠল। ১৮৬০ সনের পর কিছুদিন যাবৎ চীনের সর্বত্র যে শক্তির পরিচয় দেখা দিয়েছিল তার তলায় সত্য প্রায় কিছুই ছিল না। এখানে সেখানে উৎসাহী রাজকর্মচারীরা ছিটেফোঁটা রকমের সমাজ-সংস্কার করছিলেন, এর মধ্যে বিশেষ করে অগ্রণী ছিলেন লি হুঙ চ্যাঙ। কিন্তু এদের সে চেষ্টা প্রকৃত সমস্যার মূল পর্যন্ত গিয়ে পৌঁচাচ্ছিল না; যে রোগের দরুন চীন অবসন্ন হয়ে পড়েছে তাকে সারাবার সাধ্যও এর ছিল না।

 এই ক‘বছর ধরে চীন বাইরে যে শক্তির পরিচয় দেখিয়েছিল তার প্রধান কারণ ছিল, সমস্ত দেশের মাথার উপরে একজন শক্তিমান শাসকের আবির্ভাব। ইনি এক জন মহীয়সী নারী, সম্রাট-মাতা জু সি। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি শাসনভার হাতে তুলে নেন; প্রকৃত সম্রাট তাঁর পুত্র তখন একেবারেই শিশু। সাতচল্লিশ বছর কাল ধরে তিনি দক্ষহস্তে চীনদেশ শাসন করলেন। বেছে বেছে সব যোগ্য কর্মচারী নিযুক্ত করলেন, তাঁর নিজের দক্ষতা ও শক্তির খানিকটা দিয়ে তাঁদের অনুপ্রাণিত করে তুললেন। প্রধানত তাঁর বাক্তিত্ব ও তাঁর নীতির ফলেই চীন একটা মহত্তর শক্তির খেলা সেদিন দেখিয়েছিল—এমন শক্তির পরিচয় সে বহুকাল দেয় নি।

 এই সময়েই কিন্তু আবার সংকীর্ণ সমুদ্ররেখার অন্য পারে জাপান একেবারে আশ্চর্য কাণ্ড শুরু করে দিয়েছিল; এমনভাবে তার সমস্ত জীবনধারাকে বদলে ফেলছিল যে, তাকে আর দেখে চেনাই যায় না। অতএব চলো এবার আমরা জাপানকে দেখতে যাই।