বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব

উইকিসংকলন থেকে

১০২

বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব

১৩ই অক্টোবর, ১৯৩২

 রাজা লুই বিগত হলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগেও ফরাসিদেশে এসেছিল বহু অভাবিত পরিবর্তন। বিদ্রোহের উদ্দীপনায় আগুন হয়ে উঠেছিল সে দেশের লোকেদের রক্ত, শিরায় শিরায় এসেছিল তাদের আলোড়ন। প্রজাতান্ত্রিক ফরাসিদেশ এক দিকে; সমগ্র ইউরোপ, রাজকীয় ইউরোপ তার বিপক্ষে। ফরাসিরা এই রাজ্যগুলোকে দেখাতে প্রস্তুত, কেমন করে লড়ে স্বাধীনতার রবিকরদীপ্ত দেশপ্রেমিকেরা। প্রস্তুত তারা, শুধু নিজেদের জন্যে নয়, নৃপতিনিষ্পেষিত সব দেশের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করতে। ফরাসিরা ইউরোপের সব দেশে বলে পাঠাল তাদের শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, নিজেদের তারা ঘোষণা করল মানবের বন্ধু, রাজ-শাসনের শত্রু রূপে। স্বাধীনতার জননী ফরাসিদেশের মন্দিরে আত্মোৎসর্গ হল আনন্দের কারণ। আর এই প্রচণ্ড উৎসাহের সময় তাদেরই দীপ্ত প্রাণের হর্ষ বয়ে তাদের কাছে এল অপূর্ব এক সংগীত, প্রেরণা দিল তাদের সকল বাধা ছিন্ন করে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে। রাইন-নদী-তীরের সৈন্যদের উদ্দেশে লেখা রু দ্য লিল্-এর সেই সমরগীতির নাম তখন থেকে হল ‘মার্সাই’। আজও সে গান ফরাসিদের জাতীয় সংগীত।

“ফরাসিভূমির সন্তান-সবে, আয় রে আর রে আয়!
কীর্তিলাভের শুভ অবসর যায় রে বহিয়া যায়।
অত্যাচারের উদ্যত ধ্বজা রক্তে করিয়া স্নান
আমাদের ’পরে বৈর সাধিতে হয়েছে অধিষ্ঠান!
শুনিছ কি সবে কী ভীষণ রবে কাঁপায়ে জলস্থল
দম্ভের ভরে গর্জন ক’রে শত্রু সৈন্যদল।
তারা যে আসিছে কেড়ে নিতে বলে তোমার সকল ধন,
গ্রাসিতে শস্যক্ষেত্র, নাশিতে পুত্র ও পরিজন!
ধরো হাতিয়ার ফ্রান্সের লোক, বাঁধো দল, বাঁধো দল!
চল রে চল রে চল্।
মোদের শোণিতে হবে কি সিক্ত মোদের ক্ষেত্রতল!”

 রাজার দীর্ঘায়ু কামনা করে নয় তাদের গান। মাতৃভূমির প্রতি পুণ্যপ্রেম ও প্রিয় স্বাধীনতার গানই তারা গেয়েছিল:

“জন্মভূমির নির্মল প্রেম! ওগো চিরসম্বল!
তোমার-শত্রু-নাশে-উদ্যত এ বাহুতে দেহো বল।
ওগো স্বাধীনতা! প্রিয় স্বাধীনতা! হও ত্বরা পরকাশ!
আমাদের সাথে মিলিয়া আপন শত্রু করহ নাশ।”[]

 বহু কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। অস্ত্র ছিল না, বস্ত্র ছিল না, আহার ছিল না, আবরণ ছিল না। নাগরিকদের অনেক সময় অনুরোধ করা হয়েছে, তাদের জুতোজামা সৈন্যদের দিয়ে দিতে। দেশপ্রেমিক তারা, অনেক দুষ্প্রাপ্য আহার ছেড়ে দিয়েছে সৈন্যদের প্রয়োজনে। প্রায়ই উপবাস করতে হয়েছে অনেককে। চামড়া, রান্নার সরঞ্জাম, কড়া, বালতি প্রভৃতি চাওয়া হত তাদের কাছে। প্যারিসের রাস্তায় কামারশালায় ঠকাঠক্ পড়ত হাতুড়ির ঘা, নাগরিক-নাগরিকারা সবাই সাহায্য করত অস্ত্র-প্রস্তুত করণে। কষ্ট হত খুব, কিন্তু তাতে কী যায়-আসে—স্বাধীনতা-কিরীটিনী জন্মভূমি ফরাসিদেশ যখন বিপন্ন, জীর্ণবসন, শত্রু যখন তার দ্বারে দিয়েছে হানা? ফরাসি তরুণেরা, তারই উদ্ধারকল্পে এল বেরিয়ে, ক্ষুধাতৃষ্ণা অগ্রাহ্য করে এগিয়ে গেল জয়যাত্রায়। কার্লাইল বলে গেছেন, “নিত্য আহার ও ব্যবহারের জিনিষ ছাড়া আর কিছুতে মানুষের সংঘবদ্ধ আস্থা ক্কচিৎ দেখা যায়। যখন যায় তখনই তার ইতিহাস হয় চিত্তোদ্বেলক, অবিস্মরণীয়।” এই-যে আস্থা এসেছিল বিদ্রোহী নরনারীদের মনে এক বিরাট লক্ষ্যের ওপর, এবং যে ইতিহাস তারা গড়েছিল, যে ত্যাগস্বীকার তারা করেছিল সেই স্মরণীয় দিনে, আজও তা আমাদের জাগিয়ে তোলে, শিরায় শিরায় আনে আলোড়ন।

 সামরিক শিক্ষায় অর্ধশিক্ষিত এই বিপ্লবী সৈন্যদল ফরাসিদেশের মাটি থেকে সমস্ত বিজাতীয় সেনাবাহিনীকে তাড়িয়ে দিল, অস্ট্রিয়াবাসীদের হাত থেকে মুক্ত করল নেদারল্যাণ্ড্‌স্ (বেলজিয়ম ইত্যাদি)। শেষবারের মতো হাপ্‌স্‌বুর্গেরা ছেড়ে গেল নেদারল্যাণ্ড্‌স্‌। ইউরোপের শিক্ষিত, পেশাদার সৈনিকেরা এই বিপ্লবী সেনাদলের কাছে দাঁড়াতে পারল না। তারা লড়ত সন্তর্পণে, টাকার জন্যে, আর বিপ্লবী সৈনিকেরা লড়ত আদর্শের জন্যে। জয়লাভের জন্যে অনেক বিপদ ঘাড়ে নিতে পারত তারা। প্রথম দল চলত ধীরে ধীরে পাহাড়ের মতো বোঝা সঙ্গে করে, দ্বিতীয় দলের বইবার কিছুই ছিল না, গতিও তাই ছিল দ্রুততর। এই বিপ্লবী সেনাদের কৌশল রণশাস্ত্রে নূতন এক আদর্শ হল, যুদ্ধও তারা করত নূতন পন্থায়। পুরোনো কায়দা তারা বদলে ফেলল, পরবর্তী শতবর্ষের সৈন্যদের তারাই হল আদর্শ। কিন্তু এই সৈন্যদের আসল জোর ছিল তাদের উদ্দীপনায়, তাদের দুঃসাহসে। তাদের মূলমন্ত্ররূপ আমরা ‘দাঁতোঁ’র সুবিখ্যাত বাণীই উল্লেখ করতে পারি:

 “মাতৃভূমির শত্রুদের হটাতে হলে চাই সাহস, সর্বদা ও সর্বত্র চাই সাহস, বারেবারে ফিরে ফিরে চাই সাহস।”

 যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ইংলণ্ড তার নৌসেনার বলে হয়ে উঠল বলীয়ান। গণতান্ত্রিক ফরাসিদেশ গড়ে তুলেছিল বিরাট স্থলসেনা, জলযুদ্ধে সে ছিল দুর্বল। ইংলণ্ড সকল ফরাসিবন্দর অবরোধ করতে লাগল। যেসব ফরাসি দেশত্যাগ করে ইংলণ্ডে বসতি স্থাপন করেছিল তারা ফরাসিদেশে ফরাসি-গণতন্ত্রের রাশি রাশি জাল মুদ্রা পাঠাল। এইভাবে ফরাসি আয়ব্যয় ও মুদ্রাব্যবস্থা নষ্ট করবার চেষ্টা করতে লাগল তারা।

 বিদেশী যদ্ধই ছিল সবার উপর, দেশের সকল শক্তি লাগত তাতেই। বিপ্লবের পক্ষে এসকল যুদ্ধ ভয়ংকর, কারণ সামাজিক সমস্যা থেকে মনোযোগকে তারা সরিয়ে নিয়ে যায় শত্রুদলনের দিকে, এবং বিপ্লবের মুখ্য উদ্দেশ্য নষ্ট হয়। যুদ্ধের উদ্যম স্থান নেয় বিপ্লবোদ্যমের। ফরাসিদেশেও এই ব্যাপারই ঘটেছিল, এবং আমরা দেখতেও পাব, তার শেষ অবস্থা হল এক বিরাট সেনানায়কের নেতৃত্বাধীনতা।

 স্বদেশেও লাগল গোলমাল। পশ্চিম-ফ্রান্সে ‘ভেঁদে’-গ্রামে চাষিরা বাধাল বিপ্লব,— অংশত চাষি-সম্প্রদায় নূতন সৈন্যদলে ঢুকতে অস্বীকার করার জন্যে, আর অংশত রাজতত্ত্ব ও দেশত্যাগী ফরাসিদের চেষ্টায়। বিপ্লব আসলে চালাচ্ছিল প্যারিসের নাগরিকেরা। চাষিরা রাজধানীতে এই দ্রুত পরিবর্তন বুঝতে না পেরে পিছিয়ে পড়েছিল। বিপুল নৃশংসতার সঙ্গ্যে ‘ভেঁদে’-বিপ্লব দমন করা হল। যুদ্ধের সময়, বিশেষত গৃহবিবাদের সময়, মানুষের নীচ প্রবৃত্তিগুলিই জাগরূক থাকে, করুণা হয়ে দাঁড়ায় গৃহহারা ভবঘুরের মতো। বিপ্লবের বিরুদ্ধে এক আন্দোলন দেখা দিল ‘লিয়ঁ’তে। সেটাকে দমন করা হল এবং প্রস্তাব আনা হল যে, শাস্তিস্বরূপ মহানগরী লিয়ঁকেই ধ্বংস করা হোক। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে লিয়ঁ—তার আর অস্তিত্ব রাখা হবে না। ভাগ্যক্রমে এ প্রস্তাব গৃহীত হয় নি, তবু অত্যাচার লিয়ঁকে কম সহা করতে হয় নি।

 ইতিমধ্যে প্যারিসে কী ছিল? কার আধিপত্য ছিল সেখানে? নবনির্বাচিত এক কম্যুন ও তার বিভাগগুলিই কর্তৃত্ব করছিল শহরের উপর। জাতীয় প্রতিনিধি সভায় বিভিন্ন দলের মধ্যে শক্তির শ্রেষ্ঠতা নিয়ে সংঘর্ষ চলছিল, তার মধ্যে প্রধান ছিল গিরোঁদি বা নরমপন্থীয় দল ও জ্যাকোবিন বা চরমপন্থীর দল। জ্যাকোবিনরাই জিতল, ও ১৭৯৩ খৃস্টাব্দের প্রারম্ভে অধিকাংশ গিরোঁদীদের সভা থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হল। প্রতিনিধি-সভা এখন জায়গিরদারি ঘুচিয়ে দেখার জন্যে শেষ পন্থা অবলম্বন করল। জায়গিরদাররা যেসমস্ত জমি অধিকার করে ছিল তা ফিরিয়ে দেওয়া হল স্থানীয় কম্যুন ও জনপদগুলিকে—অর্থাৎ সেগুলি সাধারণের সম্পত্তি হয়ে গেল।

 জ্যাকোবিনদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি সভা দুটি সমিতি স্থাপন করল, জনহিত ও জননিরাপত্তার জন্যে—এবং তাদের হাতে প্রভূত ক্ষমতা ন্যস্ত করল। এই সমিতিদ্বয়, বিশেষত জনসাধারণের নিরাপত্তার ভারপ্রাপ্তটি, বিশেষ শক্তিমান হয়ে উঠল। লোকে তাদের ভয় করতে লাগল। প্রতি-পাদবিক্ষেপে তারা এগিয়ে নিয়ে চলল প্রতিনিধি-সভাকে যতদিন পর্যন্ত না বিপ্লব গড়িয়ে পড়ল ভয়ঙ্কর সশস্ত্র বিদ্রোহের অতল গহ্বরে। সকলের মনে ছায়াপাত করে রইল ভয়—বিদেশী শত্রুর ভয়, বিশ্বাসঘাতক ও গুপ্তচরের ভয়, আরও বহু। ভয় মানুষকে অন্ধ ও মরিয়া করে তোলে, প্রতিনিধি সভাও ভয়ার্ত হয়ে ১৭৯৩ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে এক ভীষণ আইন পাশ করল—সন্দেহের আইন। যাকেই সন্দেহ করা হল তারই নিরাপত্তা গেল চুকে। আর কেই-বা রইল সন্দেহের বাইরে? একমাস পরে সভার বাইশ জন গিরোঁদী প্রতিনিধিকে বিপ্লবী-বিচার-সভার আদেশ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হল।

 সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা হল এমনি করে। প্রতিদিন পণ্ডিতদের যাত্রা চলল গিলোটিনের পথে। প্রতিদিন প্যারিসের পাষাণ-পথ দিয়ে এই বলির মানষদের বয়ে নিয়ে গাড়িগুলো—টাম্‌ব্রিল্‌ নাম তাদের—ক্যাঁচ্ ক্যাঁচ্ করতে করতে চলত—পথিকেরা বিদ্রূপ করত দুর্ভাগাদের। প্রতিনিধি-সভাতেও নেতৃদলের বিরুদ্ধে কিছু বলা ছিল বিপজ্জনক; তাতে সন্দেহের সৃষ্টি করত, আর সন্দেহের পরিণাম হত বিচার ও গিলোটিন। জনহিত ও নিরাপত্তা -সমিতির হাতেই চালিত হত প্রতিনিধি সভা। বাঁচা-মরার ভার ছিল এই সমিতির হাতে, সে ক্ষমতা কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে তারা অসম্মত হল। প্যারিসের কম্যুনের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলল তারা, যাদের সঙ্গেই মতে মিলল না তাদের বিরুদ্ধেই তুলল আপত্তি। শক্তির অসম্ভব ক্ষমতা মানষকে ধ্বংস করবার। অতএব, সমিতি চলল বিপ্লবের মেরুদণ্ড কম্যুনকে ধুলোয় লুটিয়ে দিতে। আগে ভাঙল বিভাগগুলিকে, তার পর অবলম্বনহীন কম্যুনকে। এইভাবেই বিপ্লব নিজেকে ক্ষয় করে ফেলে। প্যারিসের বিভাগগুলি ছিল জনসাধারণের পরিচালিত গণসভার যোগসূত্র, ছিল সেই ধমনী যার মধ্য দিয়ে বয়ে যেত বিপ্লবের শোণিত, বিপ্লবকে দিত প্রাণ ও শক্তি। সুতরাং ১৭৯৪ অব্দের গোড়ার দিকে কম্যুনকে ধ্বংস করে ফেলার অর্থই হল এই ধমনীর ছেদন। এর পর থেকে প্রতিনিধি সভাই স্থাপিত হল শাসনের শিখরে—তাদের সঙ্গে জনসাধারণের ছিল না কোনো যোগ, ভয় দেখিয়ে তারা সবাইকে বশ করত। এই হল প্রকৃত বৈপ্লবিক যুগের অবসান। আরও ছ মাস ধরে চলল আতঙ্কের জের ও বিপ্লবের শেষ পালা। কিন্তু এসবের সমাপ্তি তখন অনতিদূরে।

 এই ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময়ে কে ছিল প্যারিস ও ফ্রান্সের অধিনায়ক? বহু নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। ক্যামিল দেমুল্যাঁ, ১৭৮১ খৃস্টাব্দে বাস্তিল আক্রমণের নেতা, আরও অনেক কাজে তিনি গ্রহণ করেছেন বিপুল অংশভার। আতঙ্কের যুগে কোমল ও করুণাপূর্ণ নীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়াতে তিনিও হয়েছিলেন গিলোটিনের কবলিত। অল্প কয়েক দিন পরে তাঁর তরুণী পত্নী লুসিল্ তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন, তাঁকে হারিয়ে থাকার তুলনায় মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে। কবি ফাব্‌র্‌ দেলান্তিন্, ফুকিয়ে তিঁভিল,—জনগণের শান্তিদাতা। মহত্ত্বে ও কর্মক্ষমতায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন এদের মধ্যে মারাট—শার্লো কোর্দে নামে একটি মেয়ে তাঁকে হত্যা করে। দাঁতোঁ এরই মধ্যে দুবার আমি তাঁর উল্লেখ করেছি—সিংহের মতো বীর দাঁতোঁ—জনপ্রিয় বাগ্মী দাঁতোঁ—গিলোটিনেই তাঁর জীবনান্ত হয়। আর সবশেষে সবচেয়ে খ্যাতিমান রোবেস্পিরের জ্যাকোরিনদের নেতা, শঙ্কার সময় প্রতিনিধি-সভার চালক বললেই চলে। বিভীষিকার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি, তাঁর কথা স্মরণ করে অনেকে শিউরে ওঠে। কিন্তু তবুও এঁর সততা, এঁর দেশপ্রীতি নিঃসংশয়ে স্বীকার্য। অসাধুতা-মুক্ত বলে তাঁর প্রসিদ্ধি ছিল। জীবনযাত্রারা যেমন তাঁর অতি সাধাসিধে ছিল, তেমনি তিনি ছিলেন আত্মকেন্দ্রিক। তাঁর সঙ্গে মতে যার না মিলবে সেই দেশের ও বিপ্লবের শত্রু। তাঁর সহকর্মী, বিদ্রোহের বহু সেরা লোককে তাঁরই আজ্ঞায় গিলোটিনে যেতে হয়। শেষে তাঁরই অনুসারী প্রতিনিধি-সভা রুখে দাঁড়াল তাঁর বিরুদ্ধে। অত্যাচারী দুর্বৃত্ত বলে তাঁকে অভিহিত করে তারা উচ্ছেদ করল তাঁর ও তাঁর দুর্ধর্ষতার।

 বিপ্লবের সকল নেতাই ছিলেন যুবাপুরুষ—বুড়োদের দ্বারা বিপ্লব ক্কচিৎ হয়। নেতা হিসেবে এঁরা প্রধান হলেও এই মহানাটকের অংশভার কারোরই, এমনকি রোবেস্পিয়েরেরও ছিল না বিরাট। বিপ্লবের বিপুলতার তুলনায় তাঁরা যেন সংকুচিত হয়ে যান। কারণ বিপ্লব ছিল তাঁদের হাতে। দুগে যুগে সামাজিক দুরবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশা ও অত্যাচার যা ধীরে ধীরে অলক্ষ্যে গড়ে তোলে, এ সেই মানব-ভূকম্পেরই একটি।

 ঝগড়াঝাঁটি আর গিলোটিনে পাঠানো ছাড়া প্রতিনিধি সভা যে আর কিছুই করে নি তা নয়। একটা প্রকৃত বিপ্লব থেকে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ বিপুল। বৈদেশিক যুদ্ধবিগ্রহে তার অনেকখানিই শোষিত হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তবুও অবশিষ্ট ছিল বেশ-কিছু, তাই দিয়েই বহু গঠনমূলক কার্যাবলী হয়েছিল। জাতীয় শিক্ষাপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন হল। আজ স্কুলে ছোটো ছেলেরা যে ‘মেট্রিক’-প্রণালী শেখে, এই সময়েই তা উদ্ভাবিত হল; তাতে দৈর্ঘ্য প্রস্থ আকৃতি ইত্যাদি পরিমাপে সুবিধেও হল যথেষ্ট। সভ্যজগতের প্রায় সকল অংশেই এ প্রণালী এখন বিস্তার লাভ করেছে, কেবল রক্ষণশীল ইংলণ্ড এখনও তার গজ-ফার্লং-পাউণ্ড-হন্দরের এ-যুগে-অচল প্রাচীন প্রণালীগুলিকে আঁকড়ে রেখেছে। আর ভারতে আমাদের এই জটিল পরিমাপ শিখতে তো হচ্ছেই, তা ছাড়া নিজেদের মন-সের ছটাকও আছেই।

 মেট্রিক-প্রণালীর পরে এল এক গণতান্ত্রিক দিনপঞ্জী। তার মতানুযায়ী অব্দ শুরু হল গণতন্ত্র-ঘোষণা-দিবস ১৭৯২ খৃষ্টাব্দের ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে। সাত দিনের সপ্তাহ হল দশ দিনের ‘দশাহ’, দশম দিন হল ছুটির দিন। মাসের সংখ্যা বারোটিই রইল, কেবল তাদের নামগুলো গেল বদলে। কবি ফাব্‌র্ দেলান্তিন্ ঋতু অনযায়ী মাসগুলিকে সুন্দর সুন্দর নাম দিলেন। বসন্তের মাসতিনটির নাম হল—স্ফুটনিকা, কুসুমিকা ও সুপর্ণিকা। নিদাঘমাসত্রয়ের নাম দূতনিকা, তপনিকা ও ফলনিকা। শরতের সাড়া পাওয়া গেল ক্রয়নিকা, কুহেলিকা ও তুহিনিকা-তে। আর শীত—সুতস্বিকা, কোয়েলিকা ও মলয়িকা। গণতন্ত্রের অবসানের পর এ পঞ্জিকা আর বেশি দিন চলে নি।

 এরই মধ্যে একবার খৃস্টানধর্মের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন জেগে ওঠে, প্রস্তাব হয় ‘যুক্তি’র পূজা করার—সত্যের মন্দির হয় স্থাপিত। দ্রুতবেগে প্রদেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল এ আন্দোলন। ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দের নভেম্বরে স্বাধীনতা ও যুক্তির উদ্দেশে এক উৎসব হয় প্যারিসের নোতর্‌দাম্ ক্যাথিড্রালে, একটি সুন্দরী স্ত্রীলোককে যুক্তিদেবীরূপে সাজিয়ে বসানো হয়। কিন্তু রোবেস্পিয়ের এসব ব্যাপারে ছিলেন প্রাচীনপন্থী। তিনিও এগুলিকে সমর্থন করলেন না, দাঁতোঁও না। জনকল্যাণকারী জ্যাকোবিন-সমিতি ছিল এর বিরুদ্ধে; অতএব আন্দোলনের পাণ্ডাদের গিলোটিন করা হল। শক্তি ও গিলোটিনের মাঝে কোনো মধ্যপথ ছিল না। এই মুক্তি ও যুক্তি-উৎসবের প্রতিবাদস্বরূপ রোবেস্পিয়ের আর একটি উৎসবের আয়োজন করলেন—পরমব্রহ্মের উদ্দেশে। প্রতিনিধি সভার ভোটে স্থির হল ফরাসিদেশ বিশ্বাস রাখে পরমব্রহ্মে। রোমান ক্যাথলিক ধর্মই আবার ধীরে ধীরে আদরণীয় হয়ে উঠল।

 পারিসের বিভাগগুলি আর কম্যুন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর অবস্থা চরম পরিণতির দিকে এগুচ্ছিল। জ্যাকোবিনরাই ছিল শীর্ষস্থানীয়, তারাই চালাত শাসন; কিন্তু তারাও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে বসল। যুক্তি-মুক্তি-উৎসবের নেতা হিবার ও তাঁর সমর্থকদের গিলোটিন হওরে পরে প্রথমে ভাঙন ধরে জ্যাকোবিন-দলে তার পর গিলোটিন হল ফাব্‌র্ দেলান্তিনের; আর তার পর যখন ১৭৯৪ খৃষ্টাব্দে দাঁতোঁ ও ক্যামিল দেমুল্যাঁ ও অন্যেরা প্রতিবাদ জানালেন রোবেস্পিয়েরের বিরুদ্ধে এত লোককে গিলোটিনে পাঠানোর জন্যে, তাঁদেরও হল অবসান। ১৭৯৪ অব্দের এপ্রিল মাসে দাঁতোঁর গিলোটিন অতি সত্বর সেরে ফেলা হল, পাছে লোকেরা বাধা দেয়, ও সেইসঙ্গেই বিপ্লব শেষ হল প্যারিস ও অন্য প্রদেশবাসীদের পক্ষে; বিপ্লবসিংহের পতন হল, শন্তির শিখরে দাঁড়াল এক সংকীর্ণ ক্ষুদ্র দল। শত্রুপরিবৃত, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এই দল চার দিকেই দেখতে লাগল শঠতা, আতঙ্ককে প্রবলতর করাই হল তার আত্মরক্ষার একমাত্র পন্থা।

 বিভীষিকা বাড়ল, অভিযুক্তদের দিয়ে গিলোটিন-গামী টাম্‌ব্রিলগুলো ভরাট হতে লাগল এবার সবচেয়ে বেশি। জুনে নূতন আইন দ্বারা মিথ্যাসংবাদ প্রচার, জনসাধারণকে উত্তেজিত করা, নৈতিক অবনতি ঘটানো ও জনসাধারণের বিবেকবুদ্ধিকে খর্ব করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড সাব্যস্ত করা হল। রোবেস্পিয়ের ও তাঁর সহচরদের সঙ্গে যার মতভেদ হবে সেই আইনের এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়বে। দলকে-দল একসঙ্গে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হত—এক-এক বারে দেড়শো জন বা তারও বেশি দাগি আসামী, রাজতন্ত্রী, একসঙ্গে এক সময়ে এদের সকলের বিচার হত।

 ছেচল্লিশ দিন টিঁকে ছিল এই নূতন আতঙ্ক। অবশেষে তপনিকার নবম দিনে (২৭শে জুলাই, ১৭৯৪) চাকা ঘুরল। প্রতিনিধি সভা সহসা রোবেস্পিয়ের ও তার সহচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল, ও ‘শয়তান নিপাত যাক’ ধ্বনির মাঝে তাঁকে গ্রেফার করল। একটি কথাও বলবার অধিকার দিল না। পরদিন, যেখানে তিনি এত লোককে পাঠিয়েছিলেন সেই গিলোটিনে, একটা টাম্‌ব্রিল্ তাঁকেই নিয়ে গেল এবং এখানেই সমাপ্ত হল ফরাসি বিপ্লব।

 রোবেস্পিয়েরের পতনের পরে এল প্রতিবিপ্লব। মধ্যপন্থীরাই এল সবার সামনে, আর জ্যাকোবিনদের উপর পড়ে তাদেরই সন্ত্রস্ত করে তুলল তারা। ‘রক্ত-বিভীষিকা’র শেষে এল ‘শুভ্র-বিভীষিকা’র যুগ। পনেরো মাস পরে ১৭১৫-এর অক্টোবর মাসে প্রতিনিধি সভা ধ্বসে পড়ল, পাঁচটি সভ্যের এক সমিতিই হল শাসনকেন্দ্র। অবশ্য এটা হল একটা ‘বুর্জোয়া’ শাসন এবং জনসাধারণকে দাবিয়ে রাখাই হল এর চেষ্টা। চার বছরেরও উপর এই সমিতি ফরাসিদেশ শাসন করে, আর গণতন্ত্রের ক্ষমতা ও আত্মসম্মান ছিল এতই যে, আভ্যন্তরীণ সকল গোলযোগের পরও বিদেশে সে বিজয়যুদ্ধ চালায়। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি আন্দোলনের সূত্রপাত হয় কিন্তু তাদের থামিয়েও দেওয়া হয় জোর করে। এদের একটিকে থামায় গণতন্ত্র-সৈন্যদলের একটি তরুণ সেনানায়ক—নেপোলিয়ন বোনাপার্টি, প্যারিসের জনতাকে লক্ষ্য করে সে গুলি চালাতে সাহস করে—মেরেও ফেলে কয়েকজনকে। ইতিহাসে এ ঘটনার নাম ‘গোলাগুলির ফুৎকার’। প্রাচীন বিপ্লবী সেনাই যখন প্যারিসের জনগণের উপর গুলি চালাতে পারল তখন স্পষ্টই বোঝা যায়, বিপ্লবের ছায়া বলেও আর কিছুর ছিল না অস্তিত্ব।

 কাজেই বিপ্লবের হল শেষ, আদর্শবাদীর বহু স্বপ্ন ও দরিদ্রের বহু আশারও শেষ হল তারই সঙ্গে। কিন্তু তবুও যে লাভের জন্যে শুরু হয়েছিল এ অভিযান তার অনেক-কিছু হল লব্ধ। কোনো প্রতিবিপ্লবই ফিরিয়ে আনতে পারল না দাসত্বকে, ফরাসিদের বুর্‌বোঁ- রাজবংশের উত্তরাধিকারীরাও চাষিদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া তাদের জমি নিতে পারল না ফিরিয়ে। আগের চেয়ে জনসাধারণ গ্রামেই হোক নগরেই হোক অনেক সুখেস্বচ্ছন্দে বাস করতে লাগল। প্রকৃতপক্ষে আতঙ্কের সময়েও সে প্রাগ্‌বিদ্রোহ যুগের চেয়ে সুখে ছিল বিদ্রোহের সন্ত্রাসজনক পরিণতি তার বিরুদ্ধে ছিল না; ছিল তাদের বিরুদ্ধে যারা সমাজে তার উপরে, যদিও শেষ দিকে কয়েকটি গরিব লোককেও কিছুটা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল।

 বিদ্রোহের হল পতন, কিন্তু গণতান্ত্রিক মতবাদ সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল, আর তার সঙ্গে গেল মানবাধিকার ঘোষণা পত্রের মূলতত্ত্ব।

  1. সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত-কৃত অনুবাদ।