বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বিশ্ব-রাজনীতির মঞ্চে পশ্চিম-এশিয়ার পুনঃপ্রবেশ
১৬৫
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে পশ্চিম এশিয়ার পুনঃপ্রবেশ
২৫শে মে, ১৯৩৩
একদিকে মিশর আর আফ্রিকা, আরেকদিকে পশ্চিম-এশিয়া—এর মাঝখানে রয়েছে শুধু অতি সরু একফালি নীল জল। এই সুয়েজ খালকে পাড়ি দিয়ে চলো, দেখে আসি আরব প্যালেস্টাইন সিরিয়া আর ইরাককে। এরা সবই হচ্ছে আরব অঞ্চলের দেশ। আর এদের একটুখানি পরেই আছে পারশ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে পশ্চিম-এশিয়ার স্থান নগণ্য নয়; বহুযুগে বহুবার জগতের জীবন-চক্র একেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তার পর আবার এল একটা অন্ধকার যুগ; অনেক শো বছর ধরে এই দেশটি পৃথিবীর রাজনীতির ক্ষেত্র হতে দূরে সরে রইল। এটা হয়ে উঠল যেন একটা স্রোতহীন জলাশয়, বিশ্বজীবনের প্রখর স্রোত এর পাশ কাটিয়ে খর বেগে বয়ে চলল, কিন্তু এর নিষ্কম্প স্থির জলে একটি তরঙ্গও সৃষ্টি করতে পারল না। তার পর আবার এখনকার দিনে আমরা আরেকবার এর রূপের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি, মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলি আবার পৃথিবীর জীবনস্রোতের আবর্তে এসে পড়ছে; প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্ত্য জগতের মধ্যে যাতায়াতের রাজপথ আবার এরই বুকের উপর দিয়ে তৈরি হয়েছে। এই বস্তুটিকে আমাদের ভালো করে দেখে নেওয়া দরকার।
পশ্চিম এশিয়ার কথা ভাবতে গেলেই আমার মন প্রাচীন দিনের কাহিনীর অরণ্যে হারিয়ে যায়র; পুরোনো সেই দিনের এত সমস্ত কথা আর ছবি আমার মনে জেগে ওঠে, তার মোহ কাটানো আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এই মোহকে যতদূর পারি এড়িয়ে চলতে আমি চেষ্টা করব; তবুও একটি কথা আরেকবার তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি পাছে তুমি ভুলে যাও—সে হচ্ছে পৃথিবীর এই অংশটির মর্যাদার কথা; হাজার হাজার বছর ধরে, মানবজাতির ইতিহাসের একেবারে গোড়ার যুগ থেকেই, এই দেশটি পৃথিবীর মধ্যে এক অপূর্ব মর্যাদার স্থান দখল করে এসেছে। সাত হাজার বছর আগের ইতিহাসেও প্রাচীন চ্যাল্ডীয়া রাজ্যের অস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় (এই রাজ্যটি যেখানে ছিল সেইখানেই আধুনিক ইরাক অবস্থিত)। তার পরে এল বাবিলন; বাবিলনীয়দের পরে এল নিষ্ঠুর আসিরীয়দের যুগ, এদের রাজধানী ছিল বিশাল নিনেভে শহর। তার পর আবার সেই আসিরীয়রাও ধাক্কা খেয়ে সরে গেল; পারশ্য থেকে একটি নূতন রাজবংশ একটি নূতন জাতি এসে ভারতবর্ষের সীমান্ত থেকে শুরু করে মিশর পর্যন্ত সমগ্র মধ্য প্রাচ্য অঞ্চলব্যাপী তাদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করল। এঁরা হচ্ছেন পারশ্যের একিমেনিড্ রাজবংশ, এঁদের রাজধানী ছিল পার্সিপোলিস। এই বংশেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ‘বৃহৎ রাজা’র দল, কাইরাস, দারিয়ূস, জারেক্সেস—এঁরা ক্ষুদ্র রাজ্য গ্রীসকে জয় করবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। এঁদের আবার পতন হল যাঁর হাতে তিনি ছিলেন গ্রীসেরই সন্তান—ঠিক গ্রীসের নয়, মাসিডোনিয়ার সন্তান—আলেকজাণ্ডার। আলেকজাণ্ডারের জীবনের একটি বিচিত্র কাহিনী আছে: এশিয়া এবং ইউরোপের এই মিলন-ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে তিনি একটি অভিনব পরিকল্পনা প্রকাশ করলেন, বললেন, এই দুই মহাদেশের বিয়ে দেবেন। তিনি নিজে পারশ্য-রাজের কন্যাকে বিবাহ করলেন (অবশ্য তাঁর আরও কয়েকটি স্ত্রী তখনই বর্তমান ছিলেন); তাঁর সেনানী এবং সৈনিকদের মধ্যেও হাজার হাজার লোক পারশি মেয়ে বিবাহ করল।
আলেকজাণ্ডার মধ্য প্রাচ্যে গ্রীক সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা করলেন; বহু শতাব্দী ধরে ভারতসীমান্ত থেকে মিশর পর্যন্ত সমস্ত দেশ জুড়ে সে সংস্কৃতির প্রভাব অক্ষুণ্ণ হয়ে রইল। এই সময়েই রোমেরও শক্তির অভ্যুত্থান হল, ক্রমে ক্রমে সে শক্তি এশিয়ার দিকে প্রসারিত হল। তার বিস্তারে বাধা দিল একটি নবজাত পারশ্য সাম্রাজ্য—সসানিদ রাজাদের সাম্রাজ্য। রোম সাম্রাজ্য যেটা ছিল সেইটেই ভেঙে দু’টক্রো হয়ে গেল, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সাম্রাজ্য হল এদের নাম। কালক্রমে এই প্রাচ্য সাম্রাজ্যের রাজধানী হল কনস্টাণ্টিনোপ্ল্। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্ত্যের মধ্যে প্রাচীন কাল থেকে সংগ্রাম চলে এসেছে, পশ্চিম এশিয়ার এই সমতলভূমিতেও সে সংগ্রাম চলতে লাগল। এই যজ্ঞের প্রধান দুই পক্ষ ছিল কনস্টাণ্টিনোপ্লের বাইজান্টিনা সাম্রাজ্য, আর পারশোর সসানিদ সাম্রাজ্য। আর এই সমস্তটা যুগ ধরেই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বণিকের দল উটের পিঠে মালপত্র বোঝাই দিয়ে এই সমতলভূমি অতিক্রম করে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্ত্য আর পাশ্চাত্ত্য থেকে প্রাচ্য দেশে যাতায়াত করতে লাগল; কারণ মধ্য-প্রাচ্যের এই অঞ্চলটিই ছিল তখনকার দিনে পৃথিবীর বড়ো বড়ো যাত্রাপথের অন্যতম।
পশ্চিম এশিয়ার এই দেশে জগতের তিনটি প্রধান ধর্মমতের জন্ম হয়েছে—জুডা-ধর্ম (মানে ইহুদিদের ধর্ম), জয়থুস্ট্রীয় ধর্ম (আধুনিক পারশীরা যে ধর্মমত মানেন), আর খৃস্টান ধর্ম। এবার আরবের মরুভূমিতে চতুর্থ একটি ধর্মমতের সৃষ্টি হল, অল্পদিনের মধ্যেই পৃথিবীর এই অংশটিতে সে ধর্ম অন্য তিনটিকে হারিয়ে দিয়ে বড়ো হয়ে উঠল। তার পর এ বাগদাদের আরব সামাজা, প্রাচ্য-পাশ্চাত্ত্যের পুরোনো যুদ্ধটাও এবার নূতন রূপ গ্রহণ করল—এবার যুদ্ধ আরবদের সঙ্গে বাইজান্টিনার। বহুদিন অতি প্রখর অস্তিত্ব যাপন করবার পর আরব-সভ্যতা ভেঙে পড়ল সেলজুক তুর্কিদের আগমনে; শেষপর্যন্ত চেঙ্গিস খাঁর পরবর্তী আগন্তুক মোগলদের হাতে সে সভ্যতা একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে গেল।
মোগলদের আসবার আগেই কিন্তু এশিয়ার পশ্চিম সমুদ্রকূলে পাশ্চাত্য দেশের খৃষ্টান আর প্রাচ্য জগতের মুসলমানদের মধ্যে একটা মর্মান্তিক সংগ্রাম শুরু হয়ে গিয়েছিল। এই যুদ্ধের নাম ক্রুসেড; কখনও চলে কখনও বা থামে এমনি করে এই যুদ্ধ পুরো আড়াই শো বছর ধরে চলতে লাগল, প্রায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝখান পর্যন্ত এর জের চলল। এই ক্রুসেডকে বলা হয় ধর্মযুদ্ধ; বাস্তবিক ছিলও তাই। কিন্তু তবু ধর্ম এই যুদ্ধের কারণ নয়, উপলক্ষ্য মাত্র। তখনকার দিনে প্রাচ্য জগতের তুলনায় ইউরোপের লোকেরা অনেক পিছিয়ে পড়ে ছিল; ইউরোপের সেটা ‘অন্ধকার যুগ’। কিন্তু ইউরোপ তখন জেগে উঠছে; প্রাচ্য জগতের সমৃদ্ধি বেশি, সভ্যতা মহত্তর; ইউরোপকে সে চুম্বকের মতোই আকর্ষণ করছে। প্রাচ্য জগতের প্রতি এই আকর্ষণ নানারূপে আত্মপ্রকাশ করছিল, তার মধ্যে এই ক্রুসেডই ছিল সবচেয়ে গরিষ্ঠ রূপ। এই যুদ্ধের ফলে পশ্চিম-এশিয়ার দেশগুলির কাছ থেকে ইউরোপ অনেক কিছুই শিখে নিল। শিখল বহু সূক্ষ্মকলা শিল্পকলা আর বিলাসের বহু প্রণালী; তার চেয়েও বড়ো কথা, শিখল কাজ এবং চিন্তার বহু বৈজ্ঞানিক ধারা আর পদ্ধতি।
ক্রুসেড সদ্য শেষ হয়েছে কি হয়নি এমন সময়ে মোগলরা এসে বন্যার মতো কাঁপিয়ে পড়ল পশ্চিম এশিয়ার উপরে, সঙ্গে নিয়ে এল ধ্বংসের সংহারমূর্তি। তবু কিন্তু মোগলদের শুধুই ধ্বংসের পূজারী বলে জেনে রাখলে আমাদের ভুল হবে। চীন থেকে রাশিয়া পর্যন্ত যে বিরাট অভিযান তারা চালিয়েছিল, তারই ফলে বহু দূর দূর দেশের মানুষের একত্র সমন্বয় ঘটেছিল, বেড়ে গিয়েছিল বাণিজ্যের প্রসার আর মানুষে-মানুষে মিলন। এরা যে বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করল তার শাসনে যাত্রীদল চলাচলের পুরোনো পথগুলো আর বিপদসকুল রইল না; যাত্রীরা সে পথে নিরাপদে নির্ভয়ে যাতায়াত করতে লাগল—শুধু বণিক নয়, কূটতন্ত্রী রাষ্ট্রদূত, ধর্ম প্রচারক ইত্যাদি সকল প্রকারের মানুষই সে পথ বেয়ে দীর্ঘযাত্রায় বেরিয়ে পড়তে পারল। প্রাচীন জগতের এই সব রাজপথ চলে গিয়েছে মধ্য প্রাচ্য প্রদেশের একেবারে বুকের উপর দিয়ে; অতএব সে দেশ হয়ে উঠল এশিয়া আর ইউরোপের মধ্যেকার বন্ধনসূত্র।
তোমার হয়তো মনে পড়বে, এই মোগলদের সময়েই মার্কো পোলো তাঁর স্বদেশ ভেনিস থেকে সমস্ত এশিয়া পাড়ি দিয়ে চীনে গিয়েছিলেন। তাঁর লেখা একটি বই আছে; তাঁর লেখা ঠিক নয়, তিনি বলে গিয়েছিলেন এবং অন্য লোকে লিখে গিয়েছিলেন। এই বইয়ে তিনি তাঁর ভ্রমণের কাহিনী বলেছেন; এই জন্যই আমরাও তাঁর নাম জেনে রেখেছি। কিন্তু আরও বহু লোক নিশ্চয়ই এই রকমের দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করেছিলেন, কিন্তু সে ভ্রমণের কথা তাঁরা লিখে রেখে যান নি, বা লিখে থাকলেও হয়তো সে বই বিনষ্ট হয়ে গেছে, কারণ সে যুগে বই হাতে লিখেই রাখা হত। মালপত্র নিয়ে বণিক আর যাত্রীর দল সারাক্ষণই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করত; সে যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য, কিন্তু নিছক ভাগ্য এবং দুঃসাহসিক অভিযানের অম্বেষণেও বহু লোক সে বণিকদলের সঙ্গী হত। প্রাচীন কালের আরও একজন খুব বড়ো ভ্রমণকারীর নাম মার্কো পোলোর মতোই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। এঁর নাম হচ্ছে ইবন বতুতা। জাতে আরব, মরক্কোর অন্তর্গত তাঞ্জিয়ার শহরে চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমদিকে এঁর জন্ম হয়। কাজেই তিনি ছিলেন মার্কো পোলোর ঠিক এক-পুরুষ পরের লোক। বিশাল জগতের বুকে তাঁর এই বিচিত্র ভ্রমণে যেদিন তিনি প্রথম বার হলেন তখন তিনি মাত্র একুশ বছরের তরুণ যুবা; পথের সম্বল বলতে তাঁর ছিল শুধু নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, আর ছিল একজন মুসলমান কাজী বা ধর্মোপদেষ্টা বিচারকের শিক্ষা। মরক্কো থেকে তিনি সোজাসুজি উত্তর-আফ্রিকা পার হয়ে এসে পৌঁছলেন মিশরে; সেখান থেকে গেলেন আরবে, সিরিয়াতে, পারশ্যে; তার পর গেলেন আনাতোলিয়াতে (তুরস্ক), তার পর দক্ষিণ-রাশিয়া (তখন সে দেশে মোগলবংশীয় খাঁ-দের রাজত্ব) তার পর কন্স্টাণ্টিনোপ্লে (সেটা তখনও বাইজান্টিনা সাম্রাজ্যের রাজধানী), সেখান থেকে মধ্য-এশিয়াতে এবং ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষের উত্তর থেকে দক্ষিণে পাড়ি দিয়ে তিনি গেলেন মালাবার এবং সিংহলে; সেখান থেকে চীনে। ফেরার পথে আফ্রিকার মধ্যে ইতস্তত ঘুরে বেড়ালেন, সাহারা মরুভূমি পর্যন্ত পার হলেন। এখনকার দিনে আমাদের যানবাহনের এতরকম সুবিধা, তবু এই যুগেও এরকমের ভ্রমণ কাহিনীর জোড়া মেলা কঠিন। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রায় অর্ধেকটাতে পৃথিবীর অবস্থা কোথায় কীরকম ছিল তার বিস্ময়কর বিবরণ আছে এই ভ্রমণ-কাহিনীর মধ্যে; তখনকার দিনে দেশভ্রমণ যে কতখানি সাধারণ ব্যাপার
ছিল তারও প্রমাণ এই কাহিনী থেকেই পাওয়া যায়। আর যাই হোক, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যে-কজন অতিবড়ো ভ্রমণকারীর আবির্ভাব হয়েছে, ইব্ন্ বতুতার নাম তাঁদের মধ্যে ধরতেই হবে।
ইব্ন্ বতুতার বইয়ে তিনি যে-সব জাতি আর দেশ দেখেছিলেন, তাদের সম্বন্ধে ভারি চমৎকার সব তথ্য লিখে গেছেন। মিশর তখন সমৃদ্ধ দেশ, কারণ পাশ্চাত্ত্য জগতের সঙ্গে ভারতবর্ষের যত বাণিজ্য সমস্তই তখন চলত মিশরের পথে; তার পক্ষে এটা ছিল একটা খুবই লাভের ব্যাপার। সেই লাভের টাকার তারা কায়রোকে প্রকাণ্ড শহর করে গড়ে তুলল, চমৎকার সুন্দর সব স্মৃতিস্তম্ভ দিয়ে তাকে সাজানো হল। ভারতবর্ষের জাতিভেদ প্রথা, সতীদাহ, অতিথিকে পান-সুপারি দিয়ে অভ্যর্থনা করবার প্রথা—এর সমস্ত কথাই ইব্ন্ বতুতা তাঁর বইয়ে লিখে গেছেন। তাঁর বই থেকেই জানতে পাই, তখন ভারতীয় বণিকরা বিদেশের বন্দরে বন্দরে বিরাট বাণিজ্য চালাত, পৃথিবীর সমুদ্রে সমুদ্রে ভারতের বাণিজ্য জাহাজ চলাচল করত। কোথায় কোথায় তিনি সুন্দরী নারী দেখেছেন, তারা কীরকমের পোশাক পরে, কোন্ রকমের সুগন্ধি আর অলংকার ব্যবহার করে, তার বিবরণ তিনি খুব লক্ষ্য করে দেখেছেন এবং লিখে গেছেন। দিল্লী শহরের বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, দিল্লী হচ্ছে, “ভারতবর্ষের প্রাণকেন্দ্র; যেমন বিশাল তার আয়তন তেমনই জমকালো তার সমৃদ্ধি; সৌন্দর্য আর শক্তির তার মধ্যে একত্র মিলন ঘটেছে।” ভারতবর্ষে তখন পাগ্লা সুলতান মহম্মদ তুগ্লক রাজত্ব করছেন। হঠাৎ রাগের মাথায় তিনি তাঁর রাজধানী দিল্লী থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন দক্ষিণ-ভারতের দৌলতাবাদ শহরে; তার ফলে এই ‘বিশাল এবং জমকালো’ শহরটি পরিণত হল একটি মরুভূমিতে—“শূন্য এবং জনহীন, দু’চারজন মাত্র তার মধ্যে ইতস্তত বাস করছে—”সেই দু’চারজন মানুষও অতি ভয়ে ভয়ে শহরে এসে ঢুকেছিল বহু দীর্ঘকাল পরে।
ব্যস, ইব্ন্ বতুতার কথা বলতে বলতে আসল কথাটা ছেড়েই চলে গেছি। প্রাচীন কালের এই ভ্রমণ-কাহিনীগুলো আমাকে বড়ো বেশি মুগ্ধ করে ফেলে।
যাক, এটা দেখা গেল, চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত এই মধ্য-প্রাচ্য বা পশ্চিম-এশিয়া পৃথিবীর জীবনযাত্রায় একটা বৃহৎ স্থান অধিকার করে ছিল, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্ত্য জগতের মধ্যে এইটেই ছিল প্রধান যোগসূত্র। এর পরের একশো বছরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটল। অটোম্যান তুর্কি কনস্টাণ্টিনোপ্ল্ দখল করল, মধ্য-প্রাচ্যের এই সমস্ত দেশগুলিতে তাদের রাজ্য বিস্তার করল, মিশরও বাদ গেল না। দুই মহাদেশের মধ্যে যে বাণিজ্য চলত, এরা তার মোটেই পক্ষপাতী ছিল না। তার এক কারণ, এই বাণিজ্য প্রধানত চালাত ভিয়েনা আর জেনোয়ার অধিবাসীরা, ভূমধ্যসাগরে এরাই ছিল তুর্কিদের প্রতিদ্বন্দ্বী। আর বাণিজ্যও তখন নূতন পথে চলা শুরু করেছে; ইউরোপ থেকে এশিয়াতে আসবার নূতন সব সমুদ্র-পথ খোলা হচ্ছে; আগের দিনে বাণিজ্য চলত সার্থবাহ বণিকদলের হাতে, ডাঙার পথে, এখন তার জায়গা দখল করছে এই সমুদ্র-পথ। পশ্চিম-এশিয়ার উপর দিয়ে যে স্থলপথ ছিল, হাজার হাজার বছর ধরে সে পথ মানুষের অশেষ কল্যাণ সাধন করেছে। এবার সে পথে লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেল; যে দেশের মধ্য দিয়ে সে পথ চলে গিয়েছে, জগতের রঙ্গমঞ্চেও তার স্থান আর লোকচক্ষুর গোচরে রইল না।
প্রায় চার শো বছর ধরে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপর্যন্ত, সমুদ্র-পথগুলিই হয়ে রইল পৃথিবীর প্রধান পথ; ডাঙা পথের তুলনায় এরাই গৌরব আর মর্যাদা পেল অনেক বেশি, বিশেষ করে যেখানে রেলপথ নেই। পশ্চিম-এশিয়াতে রেলপথ ছিল না। বিশ্ব-যুদ্ধ বাধবার অল্প কিছুদিন আগে প্রস্তাব উঠল, কনস্টাণ্টিনোপ্ল্ থেকে বাগদাদ পর্যন্ত একটি রেললাইন তৈরি করা হবে। এই প্রস্তাবের পিছনে ছিলেন জর্মন সরকার। জর্মনি এই রেলওয়ে তৈরি করতে যাচ্ছে শুনে অন্যান্য দেশগুলো ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল, কারণ এর ফলে মধ্য-প্রাচ্যে জর্মনির প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে যুদ্ধ বাধল, সে রেললাইন আর তৈরি হল না।
১৯১৮ সনে যুদ্ধ শেষ হল। পশ্চিম-এশিয়াতে তখন ব্রিটেনই সর্বেসর্বা। তখন কিছু দিন ব্রিটিশ রাজনীতি-ধুরন্ধরদের চোখেও ধাঁধা লেগেছিল, ভারতবর্ষ থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল একটি মধ্য-প্রাচ্যদেশীয় সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্নও তাঁরা দেখছিলেন। সেটা অবশ্য হয়ে উঠল না। বলশেভিক রাশিয়া, কামাল পাশা, এবং আরও অনেক ব্যাপারের ধাক্কায় ব্রিটেনের সে স্বপ্ন ভেঙে গেল। তখনও কিন্তু ব্রিটেন পাকেচক্রে এর অনেকখানি জায়গাই হাত করে বসে রইল। ইরাক প্যালেস্টাইন ব্রিটেনের প্রভাবাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীনই রয়ে গেল। সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সে বিরাট কামনা তার পূর্ণ হয় নি; তবু কিন্তু ব্রিটেন এখনও তার সেই পুরোনো দিনের নীতিটি অক্ষুণ্ণ রেখেছে—ভারতবর্ষে আসবার সমস্ত পথ আর প্রণালী এখনও তারই হাতের মুঠোয় পরে রেখেছে। মনে এই উদ্দেশ্য ছিল বলেই যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সেনা মেসোপটেমিয়া আর প্যালেস্টাইনে গিয়ে লড়াই করেছে, তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে আরবদের সাহায্য করেছে। এই জন্যই যুদ্ধের পরে মোসুলের কথা নিয়ে ইংলণ্ড আর তুরস্কের মধ্যে বিষম বিবাদ বেধেছিল। ইংলণ্ড আর সোভিয়েট রাশিয়ার মধ্যে যে এখন এত মন-কষাকষি, তারও একটা প্রধান কারণ হচ্ছে এইটেই; ভারতবর্ষে আসবার পথের পাশে, দেয়ালের উপরে পা ঝুলিয়ে বসে থাকবে রাশিয়ার মতো একটা শক্তিশালী দেশ, এটা ভাবতেই ব্রিটেনের গা বিষিয়ে ওঠে।
বাগদাদ রেলওয়ে আর হেজাজ রেলওয়ে—এই দু’টি রেললাইন তৈরি করা নিয়ে যুদ্ধের আগে অনেক ঝগড়া-ঝাঁটি হয়েছিল। লাইন দুটি এখন তৈরি হয়ে গেছে। বাগদাদ রেলওয়েটি বাগদাদ শহরকে ভূমধ্যসাগর আর ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। হেজাজ রেলওয়েটি আরবের মদিনা শহর থেকে চলে এসে আলেপ্পোতে বাগদাদ রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে (আরবদেশের মধ্যে হেজাজের গুরুত্ব হচ্ছে সবচেয়ে বেশি, কারণ মক্কা আর মদিনা, মুসলমানদের এই দুটি তীর্থস্থানই এই অঞ্চলের অন্তর্গত)। কাজেই দেখা যাচ্ছে, রেলপথ তৈরি হবার ফলে পশ্চিম এশিয়ার বহু বড়ো বড়ো শহরই এখন ইউরোপ আর মিশরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, সেখান থেকে সহজেই এই সব শহরে আসা যায়। আলেপ্পো শহরটিও ক্রমে প্রকাণ্ড একটি রেলওয়ে জংশনে পরিণত হচ্ছে; তিনটি মহাদেশের রেলপথ এখানে এসে একত্র হবে—একটা পথ আসবে ইউরোপ থেকে, একটা আসবে এশিয়া থেকে বাগদাদ হয়ে, আর একটা আসবে আফ্রিকা থেকে কায়রো হয়ে। এশিয়ার পথটিকে যদি বাগদাদের পরে আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে হয়তো সে একেবারে ভারতবর্ষ পর্যন্ত এসেই পৌঁছতে পারবে। আফ্রিকার পথটি সম্বন্ধে কর্তাদের মনের ইচ্ছা, সেটিকে কায়রো থেকে সমস্ত আফ্রিকা মহাদেশ পার হয়ে একেবারে সুদূর দক্ষিণ প্রান্তে কেপ টাউন অবধি নিয়ে পৌঁছে দেওয়া। কেপ থেকে কায়রো পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাঙা লাইনটি তৈরি করা—এর স্বপ্ন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা বহুদিন ধরেই দেখে আসছেন; এবার সে স্বপ্ন সিদ্ধ হবার ভরসাও অনেকখানিই দেখা যাচ্ছে। একে রাঙা বললাম, তার কারণ—দীর্ঘ পথের আগাগোড়াই এই পথটি চলে যাবে ব্রিটিশ অধিকারের মধ্য দিয়ে, মানচিত্রে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ছবিটাই শুধু লাল রঙে ছাপা হয়ে থাকে।
ভবিষ্যতে কিন্তু এই সমস্ত সংকল্প কাজে পরিণত হতে পারে, নাও হতে পারে—রেলওয়ের এখন দু’টি প্রবল প্রতিবন্ধী যানের আবির্ভাব হয়েছে, মোটর গাড়ি আর এরোপ্লেন। ইতিমধ্যে একথাটা মনে রাখতে হবে, বাগদাদ আর হেজাজ লাইন, পশ্চিম-এশিয়ার এই দু’টি নূতন রেলওয়েরই কর্তৃত্ব বেশির ভাগ ব্রিটিশদের হাতে রয়েছে; ব্রিটিশের নীতি ছিল, নিজেদের আয়ত্বাধীনে ভারতবর্ষে যাবার একটা নূতন সংক্ষিপ্ত রাস্তা বানিয়ে নেওয়া, সে নীতি এরাই সফল করে তুলেছে। বাগদাদ রেলওয়ের খানিকটা গিয়েছে সিরিয়ার মধ্য দিয়ে। সিরিয়া আছে ফরাসিদের অধিকারে। ফরাসিদের অনুগ্রহের উপরে এই নির্ভর করে থাকাটা ব্রিটিশের পছন্দ নয়; তাদের ইচ্ছা, এর বদলে প্যালেস্টাইনের মধ্য দিয়ে তারা নূতন একটা লাইন খুলবে। আরবেও নূতন একটা ছোটো রেললাইন খোলা হচ্ছে, এটা লোহিতসাগরের তীরস্থিত বন্দর জেড্ডা থেকে মক্কা পর্যন্ত যাবে। প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী মক্কায় যান, তাঁদের এতে খুব সুবিধা হবে।
রেলপথের কল্যাণে পশ্চিম এশিয়ার এই দেশগুলোর সঙ্গে বাইরের জগতের যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে, এই গেল সে রেলপথের কথা। যে কাজের জন্য এর সৃষ্টি সে কাজ এখনও সারা হয় নি তবু কিন্তু এরই মধ্যে রেলওয়ের উপকারিতা খানিকটা কমে যাচ্ছে; তাকে হটিয়ে দিয়ে তার জায়গা এসে দখল করছে মোটর গাড়ি আর এরোপ্লেন। মরুভূমির পথে চলতে মোটর গাড়ির কিছুমাত্র কষ্ট নেই; যাত্রিদলের যে-সব পায়ে হাঁটা পথে হাজার হাজার বছর ধরে উটেরা অসীম ধৈর্যসহকারে মন্থর গতিতে পথ চলত, এখন সেখানে ধুলো উড়িয়ে হাওয়ার বেগে ছুটে চলেছে মোটর গাড়ি। রেলওয়ে চালাবার খরচ অনেক, সে বসাতে সময়ও লাগে প্রচুর। মোটর গাড়ি সস্তায় মেলে, যখন দরকার তখনই সে চলতে পারে। মোটর গাড়ি বা লরি অবশ্য খুব লম্বা দৌড়ের পথ সাধারণত চলে না; ছোটো খানিকটা জায়গা, খুব বেশি হলে শ’খানেক মাইল পথের মধ্যেই তারা ঘুরে ফিরে ক্ষেপ দিয়ে থাকে।
দূরপাল্লার পথের জন্য রয়েছে এরোপ্লেন। এটাও রেলওয়ের তুলনায় সস্তা, চলেও অনেক বেশি তাড়াতাড়ি। যানবাহনের প্রয়োজনে এরোপ্লেনের ব্যবহার পৃথিবীতে খুবই দ্রুতবেগে বেড়ে চলবে, এতে সংশয়ের কিছুমাত্র অবকাশ নেই। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে আয়োজনের অনেকখানি উন্নতি দেখা যাচ্ছে; প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড উড়োজাহাজ নিয়মিতভাবে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ক্ষেপ দিচ্ছে। এই-সব বড়ো বড়ো বায়ু-পথেরও একটা চৌমাথা হয়ে উঠেছে পশ্চিম-এশিয়া; বিশেষ করে বাগদাদ শহর তার কেন্দ্র।
লণ্ডন থেকে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত যে ব্রিটিশ ইম্পিরিয়াল এয়ারওয়েজ চলে গেছে সেটা, আমস্টারডাম থেকে বাটাভিয়া পর্যন্ত যে কে, এল্, এম্ ডাচ লাইন চলে গেছে সেটা এবং প্যারিস থেকে ইন্দোচীন পর্যন্ত বিস্তৃত ফরাসি এয়ার লাইন (এয়ার ফ্রান্স), এই তিনটারই ঘাঁটি বাগদাদে আছে। মস্কো ও ইরানও বাগদাদের সাথে বায়ু-পথে সংযুক্ত। (ইউরোপ থেকে) চীন ও সুদূর প্রাচ্যের বিমানের যাত্রীকে বাগদাদের উপর দিয়ে যেতে হয়। বাগদাদ থেকে বিমান কায়রো পর্যন্তও যায়—তদ্বারা উহা আফ্রিকার বিমানপথের মারফতে কেপ টাউনের সঙ্গেও যুক্ত।
এসব বিমানপথের বেশির ভাগ থেকেই বিশেষ কিছু আয় হয় না, বরং এদের প্রচুর সরকারি সাহায্য দিতে হয়, কারণ সাম্রাজ্যগুলোর নিকট এখন বিমানশক্তির বিশেষ কদর। বৈমানিকশক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নৌ-শক্তির গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে। যে ইংলণ্ড পূর্বে তার নৌ-শক্তির এতো বড়াই করত ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে খুবই নিরাপদ মনে করত, আত্মরক্ষার ব্যবস্থার দিক থেকে বিবেচনা করলে সেও আর এখন একটি দ্বীপমাত্র নয়। ফ্রান্স বা অন্য যে কোনও দেশের মতোই আকাশ থেকে আক্রমণ চালিয়ে তাকেও ঘায়েল করা সহজসাধ্য হয়েছে। তাই সব বড়ো বড়ো দেশগুলিই বিমানশক্তিতে প্রবল হয়ে উঠতে চাইছে, পূর্বে সমুদ্র-পথের আধিপত্য নিয়ে দেশে দেশে যে রেষারেষি চলত, তার জায়গা এখন দখল করেছে বিমানশক্তির রেষারেষি। শান্তির সময়ে বায়ুপথে যাত্রী-চলাচলের যে ব্যবস্থা আছে, প্রত্যেক দেশই উৎসাহ আর সরকারি সাহায্য দিয়ে তাকে বাড়িয়ে তুলছে; কারণ, এর ফলে এমন কতোজন সুশিক্ষিত বৈমানিক তৈরী হবে যাদের যুদ্ধ বাধলে কাজে লাগানো চলবে। অ-সামরিক বিমানবিভাগ সামরিক বিমানবিভাগ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কাজেই অসামরিক বিমানবিভাগের উন্নতি খুব দ্রুতভাবে করা হচ্ছে এবং ইউরোপ ও আমেরিকাতে শত শত বিমান-বর্ত্ম গড়ে উঠেছে। এব্যাপারে যেখানে যতটুকু উন্নতি হয়েছে তার বেশির ভাগই হয়েছে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে, সোভিয়েট ইউনিয়নেও এর যথেষ্ট উন্নতি দেখা যাচ্ছে—দূরদূরান্তে অবস্থিত এই রাষ্ট্রের অংশগুলোর উপর দিয়ে বহু বিমানপথের বিমানগুলো যাতায়াত করে থাকে।
এখন এসেছে বিমানশক্তির যুগ—এযুগে পশ্চিম-এশিয়া আবার নূতনভাবে গুরুত্ব লাভ করেছে, তার কারণ এস্থানের উপর দিয়ে বহু সুদূরপ্রসারী বিমানপথ চলে গেছে। পুনরায় ইহা বিশ্বের রাজনীতিক্ষেত্রে প্রবেশলাভ করে মহাদেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কথাতে এটাও বোঝা যাচ্ছে যে এদেশ এখন বড়ো বড়ো দেশগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও বিরোধের রঙ্গভূমিতে পরিণত হয়েছে, কেননা, তাদের পরস্পরের আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সংঘাত হয় এবং প্রত্যেকেই অপরের উপর টেক্কা মারতে চেষ্টা করে। এই কথাটা আমরা যদি মনে রাখি তাহলেই মধ্য-প্রাচ্যে এবং অন্যত্র ব্রিটিশের ও অন্যান্য জাতির কার্যকলাপের মূলে যে কূটনীতি রয়েছে তার অনেকখানিই আমরা বুঝে নিতে পারব।
ভারতে যাবার এই নূতন সদর রাস্তার ঠিক উপরেই মোসুল অবস্থিত, তাছাড়া এখানে তেল আছে। বিমানশক্তির যুগে এখন তেল আগের চেয়েও অধিক প্রয়োজনীয় জিনিস হরে পড়েছে। ইরাকেও মূল্যবান তেলের খনি আছে, এবং সেটাও এই বিমান পথগুলির একেবারে মাঝখানে পড়েছে। কাজেই ইরাককে আপন আয়ত্তে রাখাটা যে ব্রিটেনের পক্ষে কতটা আবশ্যক সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। পারশ্যে বহু তেলের খনি আছে; অনেকদিন ধরে ঐ খনিগুলির তেল তুলে নিচ্ছে একটা ইংরেজ কোম্পানি; এর নাম হল এ্যাংলো-পার্শিয়ান অয়েল কোম্পানি। ব্রিটিশ সরকার এই কোম্পানির একটি অংশীদার।
তেল বা পেট্রোলের প্রয়োজন ও গুরুত্ব বেড়ে চলেছে এবং এর দ্বারা সাম্রাজ্যিক নীতি প্রভাবিত হচ্ছে। বস্তুত আধুনিক সাম্রাজ্যবাদকে ‘তেলের সাম্রাজ্যবাদ’ বলে অভিহিত করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আবার নূতন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, আবার বিশ্ব-রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে এসে পড়ছে যে-সব কারণে তার কয়েকটা কারণ নিয়ে আমি এই চিঠি আলোচনা করলাম। কিন্তু এই সব-কিছুরই পশ্চাতে রয়েছে সমগ্র এশিয়া মহাদেশ বা প্রাচ্যের জাগরণ।