বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/বিশ্ব আলোচন
১০৬
বিশ্ব আলোচন
এতদিন কর্তৃত্বের পর জগতের রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হল নেপোলিয়নকে। তার পর এক শো বছরেরও বেশি কেটে গেছে, পুরোনো বিবাদ-বিসংবাদের ঝড়ে যে ধুলো উড়ছিল তা আবার মাটিতে থিতিয়ে গেছে। কিন্তু আগেই বলেছি, তাঁর সম্বন্ধে আজও লোকের মতভেদ ঘোচেনি। হয়তো অধিকতর শান্তিময় অন্য কোনো যুগে নেপোলিয়নের জন্ম হলে তিনি কেবল সেনাপতি বলেই পরিচিত হতেন, চিরকাল হয়তো অলক্ষ্যেই রয়ে যেতেন সবার। কিন্তু বিপ্লব আর পরিবর্তন, এগুলিই তাঁকে সুযোগ দিয়েছিল জোর করে এগিয়ে যাবার, সে সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন নি। তাঁর পতন ও ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে অন্তর্ধানের পর ইউরোপবাসীরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল নিশ্চয়, যুদ্ধের প্রতি তাদের তখন এমনি বিতৃষ্ণা! পুরো একপুরুষ ধরে তারা শান্তির মুখ দেখে নি, তাই শান্তিই ছিল তখন তাদের একমাত্র কাম্য। ইউরোপের রাজামহারাজারাই স্বস্তি অনুভব করল সবচেয়ে বেশি, নেপোলিয়নের নামে যারা এতকাল ছিল থরহরি কম্পমান।
বহুদিন ধরে তো ফ্রান্স আর ইউরোপেই কাটালাম, এখন ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমরা বেশ এগিয়ে গেছি। একবার পৃথিবীটা ঘুরে দেখে আসি, নেপোলিয়নের পতনের পর তার আকার কীরকম হয়েছে।
তোমার মনে পড়বে, ইউরোপে তখন পুরোনো রাজারা ও তাঁদের মন্ত্রীর দল ভিয়েনার সম্মিলনে সমবেত। যাঁকে তাঁদের ভয় তিনিই আর নেই; আবার তাঁরা পুরোনো খেলার মাততে পারেন, লক্ষকোটি মানুষের ভাগ্যনির্ধারণ করতে পারেন তাঁদের খেয়ালখুশি অনুসারে। জনসাধারণ কী চায় তা জেনে কী যায়-আসে? কী আসে-যায় দেশের প্রাকৃতিক ও ভাষানুযায়ী সীমারেখা কীভাবে হওয়া উচিত তা জেনে? রুশদেশের জার, ইংলণ্ড (প্রতিনিধি—কাস্ল্রি), অস্ট্রিয়া (প্রতিনিধি—মেতের্নিশ) ও প্রাশিয়া, এঁরাই ছিলেন শ্রেষ্ঠ শক্তির প্রতীক। আর তা ছাড়া চতুর, সুরসিক, জনপ্রিয় তালিরাঁ তো ছিলই—অতীতে নেপোলিয়নের মন্ত্রী, পরে বুরবোঁ-রাজার। নৃত্যগীত-পানাহারের মধ্যে এঁরা নেপোলিয়নের দ্বারা আমূল-পরিবর্তিত ইউরোপের মানচিত্রকে আবার নূতন ছাঁচে ঢালাই করতে লাগলেন।
বুরবোঁ অষ্টাদশ লুইকে আবার ফরাসিদেশের উপর চাপানো হল। স্পেনে ‘ইন্কুইজিশন’ হল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত। ভিয়েনার মহাসভায় সমাগত রাজন্যদের পছন্দ হত না গণতন্ত্র, তাই হল্যাণ্ডে তাঁরা আর প্রাচীন ওলন্দাজ-গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করলেন না। পরিবর্তে তাঁরা ‘নেদারল্যাণ্ড্স্’ নাম দিয়ে হল্যাণ্ড আর বেলজিয়মকে করলেন একই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। স্বতন্ত্র রাজ্য পোল্যাণ্ডকে গ্রাস করল প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, ও প্রধানত রাশিয়া। ভেনিস ও উত্তর-ইতালি গেল অস্ট্রিয়ার কবলে। সুইজারল্যাণ্ড ও রিভিয়েরার মধ্যে ইতালি ও ফ্রান্সের এক-এক খণ্ড করে মিলিয়ে স্থাপিত হল সার্ডিনিয়া-রাজ্য। মধ্য-ইউরোপে এক অদ্ভূত জর্মন-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল বটে, তবে তার শীর্ষে রইল প্রাশিয়া আর অস্ট্রিয়া। অন্যান্য অনেক পরিবর্তনও সাধিত হল। তাই ভিয়েনা-মহাসভার পণ্ডিতেরা এখানে-সেখানে জনগণকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে বিজাতীয় এক-এক ভাষা ব্যবহার করাতে লাগলেন, অর্থাৎ পরবর্তী যুদ্ধবিগ্রহের বীজ বপন করা হল।
১৮১৪-১৫ অব্দ ব্যাপী ভিয়েনার মহাসম্মেলনের বিশেষ লক্ষ্য ছিল, নৃপতিবর্গের নিরাপত্তারক্ষা। ফরাসি বিপ্লব এনে দিয়েছিল তাদের প্রাণের ভয়। রাজারা এবার নির্বোধের মতো ভাবল, বিপ্লবী মতবাদের বিস্তারকে তারা বন্ধ করতে পারবে। রাশিয়ার জার, অস্ট্রিয়ার সম্রাট ও প্রাশিয়ার অধিপতি এক ‘পুণ্য সন্ধি’র প্রতিষ্ঠা করলেন নিজেদের ও অন্যান্য নরপতিদের নিরাপদে রাখবার জন্যে। দেখে মনে হয় যেন চতুর্দশ কি পঞ্চদশ লুইয়ের সময়ে আমরা ফিরে এসেছি। সারা ইউরোপে, এমনকি ইংলণ্ডেও সকল স্বাধীন মতামতের কণ্ঠরোধের চেষ্টা। ইউরোপের প্রাগ্র্যসর জনগণ কতই-না জানি কষ্ট অনুভব করেছিল জেনে যে, ফরাসি বিপ্লবের এত দুঃখসহন বৃথাই গেছে!
পূর্ব-ইউরোপে তুরস্কদেশ তখন অতিমাত্রায় দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তুর্কি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়েও মিশর তখন অর্ধস্বাধীন। ১৮২১ খৃস্টাব্দে গ্রীস বিদ্রোহ ঘোষণা করল তুরস্কের বিরুদ্ধে, আর আট বছর যুদ্ধের পর ইংলণ্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার সাহায্যে অর্জন করল তার স্বাধীনতা। এই যুদ্ধেই গ্রীসের পক্ষে সেচ্ছাসেবক হয়ে ইংরেজ কবি বায়্রনের মৃত্যু হয়। গ্রীসের উদ্দেশে তাঁর সুন্দর কয়েকটি কবিতা আছে, জানো বোধ হয়।
১৮৩০ অব্দে ইউরোপে আরও দুটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। বুরবোঁদের অত্যাচারে নিপীড়িত ফরাসিদেশ আবার তাদের তাড়িয়ে দিল। কিন্তু গণতন্ত্রের পরিবর্তে এলেন আর-এক নূতন রাজা। এঁর নাম লুই ফিলিপ। এঁর ব্যবহার ছিল অপেক্ষাকৃত ভালো, কতকটা প্রজাদের মতামত নিয়েই চলতেন। ১৮৪৮ পর্যন্ত রাজত্ব করতে তিনি সমর্থ হলেন, তার পরে ঘটল আর-একটি বৃহত্তর অসন্তোষের অভিব্যক্তি।
১৮৩০ সালে বেলজিয়মেও বিদ্রোহ ঘটল, ফলে হল হল্যাণ্ড ও বেলজিয়মের বিচ্ছেদসাধন। গণতন্ত্র-স্থাপনে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শক্তিগুলির ছিল তীব্র অমত, তাই এক জর্মন ‘প্রিন্স্’কে বেলজিয়মের সিংহাসনে বসানো হল। আর-একজন হলেন গ্রীসের রাজা। জর্মনির প্রদেশগুলিতে এইসব গ্রিসদের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে, কোনো সিংহাসন খালি হলেই তাঁদের মেলে। ইংলণ্ডের বর্তমান রাজবংশও যে জর্মনির হ্যানোভার-বংশ থেকে উদ্ভূত তা তুমি জানো।
১৮৩০ খৃষ্টাব্দকে ইউরোপীয় বিদ্রোহের বছরই বলা চলে—জর্মনি, ইতালি, পোল্যাণ্ড, সর্বত্রই বিদ্রোহ। কিন্তু রাজারা তাদের দমন করে ফেললেন। রুশীয়রা পোল্যাণ্ডে অত্যাচার করল নিষ্ঠুরভাবে, পোলিশভাষার ব্যবহারও নিষিদ্ধ হল। ইউরোপে ১৮৪৮ অব্দে যে বিদ্রোহ হয়েছিল, ১৮৩০ হয়ে রইল তারই ভূমিকাস্বরূপ।
এই তো গেল ইউরোপের কথা। আটলাণ্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমে ধীরে ধীরে প্রসারলাভ করছিল। ইউরোপীয় রেষারেষি ও যুদ্ধবিবাদের থেকে তফাতে নিজেদের অধিকারে অপর্যাপ্ত ভূখণ্ড পেয়ে সে প্রগতির পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছিল ইউরোপের সমকক্ষ হতে। দক্ষিণ আমেরিকায় ঘটছিল বহু পরিবর্তন, একে নেপোলিয়নের পরোক্ষ-ক্রিয়া বলা যেতে পারে। নেপোলিয়ন স্পেন জয় করে যখন নিজের ভাইকে সিংহাসনে বসান, দক্ষিণ আমেরিকার স্পেনীয় উপনিবেশগুলি বিদ্রোহ করেছিল। এমনি করে প্রাচীন স্পেনীয় রাজবংশের প্রতি উপনিবেশবাসীদের এই ভক্তিই তাদের স্বাধীনতার সুযোগ এনে দেয়। তবে এ হল আকস্মিক কারণ—আসলে কিছু দিন পরে হলেও এ বিদ্রোহ বাধত; কারণ, দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছিল স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এই মুক্তিরণের বীর নেতা সাইমন বলিভার অভিহিত হবেছিলেন ‘মুক্তিপথপ্রদর্শক’ বলে। তাঁরই নামানুসারে দক্ষিণ আমেরিকার ‘বলিভিয়া’-রাষ্ট্রের নাম। নেপোলিয়নের পতনের পরে স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্পেনীয় আমেরিকা চালাল তার সংগ্রাম, নেপোলিয়ন সরে গেলেও থামল না তা, সমভাবেই চলল নূতন স্পেনের বিরুদ্ধে অনেক বছর ধরে। এই বিদ্রোহীদের দমন করতে কোনো কোনো ইউরোপীয় রাজা প্রতিবেশী স্পেনকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এই অন্যের ব্যাপারে মাথা ঘামানো একদম থামিয়ে দিল যুক্তরাষ্ট্র। তার তৎকালীন সভাপতি মন্রো ইউরোপীয় শক্তিগগুলিকে স্পষ্ট করে বলে দিলেন যে, আমেরিকার যে-কোনো অংশে যদি তারা হস্তক্ষেপ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়তে হবে তাদের। এতে ভয় পেয়ে গেল ইউরোপীয় শক্তিগুলি, আর তার পর থেকে বরাবরই তারা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে দূরেদূরেই থেকেছে। সভাপতি মন্রোর এই ভীতি-প্রদর্শন ইতিহাসে ‘মন্রো নীতি’ নামে খ্যাত হয়ে আছে। ইউরোপের লুব্ধ দৃষ্টি থেকে দক্ষিণ-আমেরিকাকে স্বীয় পক্ষপুটে বহু দিন রক্ষা করে এসেছে, বাড়বার সুযোগ দিয়েছে এ। ইউরোপের কাছ থেকে দক্ষিণ আমেরিকা রক্ষা পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রক্ষকটির হাত থেকে তাকে রক্ষা করার জন্যে কেউই ছিল না—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের হাত থেকে। আজ যুক্তরাষ্ট্রই দক্ষিণ আমেরিকাকে শাসন করে চলেছে, আর ক্ষুদ্রতর গণতন্ত্রগুলির অধিকাংশই সম্পূর্ণ তার হাতের মুঠোয়।
সুবৃহৎ দেশ ব্রেজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ। এও স্পেনীয় আমেরিকার সম-সময়েই স্বাধীন হয়েছিল। অতএব ১৮৩০ অব্দে সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকাই ইউরোপের কবল থেকে নিষ্কৃতি পেল। উত্তর আমেরিকায় অবশ্য কানাডা ছিল ইংরেজের হাতে।
এবার এশিয়ায় একবার ঘুরে যাই। ভারতবর্ষে ইংরেজের এখন একাধিপত্য। ইউরোপে যখন নেপোলিয়ন-ঘটিত যুদ্ধগুলি চলছিল ইংরেজ তখন এখানে দৃঢ় করে তাদের স্থান গড়ে নিয়েছে, যবদ্বীপেও বিস্তার করেছে প্রভুত্ব। মহীশূরের টিপু সুলতান পরাস্ত হলেন, ১৮১৯ অব্দে মারাঠাশক্তির ঘটল চরম পরাজয়। পাঞ্জাবে কিন্তু তখনও শিখ-অধিকার, রণজিৎসিংহের নেতৃত্বে। সারা ভারত জুড়ে ইংরেজরা অগ্রসর হচ্ছিল ধীরে ধীরে। পূর্বাঞ্চলে আসাম অধিকৃত হল, আরাকান ও ব্রহ্মদেশ প্রস্তুত হয়ে রইল পরবর্তী গ্রাসের জন্যে।
ভারতে যখন ইংরেজ প্রভুত্ব বিস্তার করছে, মধ্য এশিয়ায় তখন আর একটি ইউরোপীয় শক্তির প্রসার হচ্ছিল—সে রুশদেশ। চীন ও পূর্বাঞ্চলে প্রশান্ত মহাসাগরের কূল স্পর্শ করেছিল তার অধিকার। এ দিকেও মধ্য-এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির মধ্য দিয়ে আফগানিস্থানের সীমান্তে এসে সে উপস্থিত। ভারতের ইংরেজ-শক্তি এই দৈত্যের আগমনে শঙ্কিত হয়ে অকারণে আফগানিস্তানের সঙ্গে লড়াই বাধিয়ে বসল। কিন্তু এতে তাদের ক্ষতি হল বিস্তর।
চীনের শাসনভার ছিল মাঞ্চুদের হাতে। বিদেশ থেকে ধর্ম বা বাণিজ্য উপলক্ষ্য করে কেউ এলেই এরা তাকে সন্দেহের চোখে দেখত, চেষ্টা করত বাইরে রাখবার জন্যে। কিন্তু বিদেশীরা এর প্রবেশদ্বারে খুব হৈ-হল্লা চালাল, বিশেষ করে আফিমের ব্যবসা যাতে বেশ ভালো চলে তারই জন্যে সেটাকে তারা খুব উৎসাহ দিতে লাগল। ব্রিটেন ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের অধিকার ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ছিল একচেটিয়া। চীন-সম্রাট আফিমের প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে আদেশ দিলেন, কিন্তু তলে তলে চলল গোপন অন্যায় ব্যবসা বিদেশীদের কারসাজিতে। ফলে হল ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ। তার ‘আফিমের যুদ্ধ’ এ নাম ঠিকই হয়েছিল, ইংরেজরা জোর করে চীনাদের আফিম ধরাল।
১৬৩৪ অব্দে জাপানের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কাহিনী তোমাকে আগেই শুনিয়েছি। ঊনবিংশ শতকের প্রারম্ভেও সকল বিদেশীর কাছে সে রুদ্ধই ছিল। কিন্তু এই বেড়ার মধ্যে প্রাচীন শোগান-বংশ দুর্বল হয়ে এসেছিল, তাই নূতন যুগধর্ম জাগ্রত হয়ে পুরোনোর অবসানের সূচনা করছিল। আরও দক্ষিণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইউরোপীয় শক্তিগুলি এক-এক করে সমস্ত ভূখণ্ড অধিকার করে নিচ্ছিল। ফিলিপাইন-দ্বীপপুঞ্জ তখনও স্পেনের অধিকারে। ইংরেজ ও ওলন্দাজেরা পর্তুগীজদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। ভিয়েনার মহাসভার পর ওলন্দাজেরা যবদ্বীপ ও অন্যান্য দ্বীপগুলি ফিরে পেল। সিঙ্গাপুর ও মালয়-উপদ্বীপে ইংরেজ স্বীয় শক্তি প্রসারিত করতে ব্যস্ত, ও দিকে চীনের কাছে মধ্যে মধ্যে উপঢৌকন পাঠানো সত্ত্বেও আনাম, শ্যাম ও ব্রহ্মদেশ তখনও স্বাধীন।
ওয়াটার্লু থেকে ১৮৩০ খৃষ্টাব্দ, এই পনেরো বছরের মধ্যে এই ছিল মোটামুটি পৃথিবীর রাজনৈতিক অবস্থা। ইউরোপই যে পৃথিবীর প্রভুরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিল, এ কথা নিশ্চিত। ইউরোপেও প্রতিক্রিয়ারই জয় হল। সম্রাটেরা, রাজারা, এমনকি ইংলণ্ডের পার্লামেণ্টও মনে করল, সমস্ত স্বাধীন মতামতকে তারা চূর্ণ করেছে। এই মতগুলিকে তারা বোতলে পুরে আটকে রাখতে চেয়েছিল। তাই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তারা অকৃতকার্য হল, বারংবার ঘটতে লাগল বিদ্রোহ।
রাজনৈতিক পরিবর্তনই এই ঘটনাচক্রের নিয়ন্তা বলে মনে হয়। কিন্তু ইংলণ্ডের শ্রমশিল্পের বিপ্লব বা ‘ইণ্ডাস্টিরাল রেডলিউশনে’র সঙ্গে উৎপাদন বিতরণ ও যানবাহনের রীতিতে যে ঘোর বিপ্লব বেধেছিল তার প্রাধান্য ঢের বেশি। নিঃশব্দে অথচ অদম্যভাবে এই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, লক্ষ লক্ষ লোকের দৃষ্টিভঙ্গিতে আনছিল পরিবর্তন, বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম্বন্ধও যাচ্ছিল বদলে। যন্ত্র-ঘর্ঘরের মধ্য হতে আবির্ভূত হচ্ছিল নব নব কল্পনার, নূতন এক জগতের হচ্ছিল সৃষ্টি। ইউরোপ ক্রমেই নিপুণ ও ভয়ংকর, ক্রমেই লোভী ও রাজকীয় এবং নিষ্ঠুর হয়ে উঠছিল, যেন তার হাওয়ায় মেশা নেপোলিয়নের তেজ। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সংগ্রাম করতে বদ্ধপরিকর এক মনোভাবেরও সৃষ্টি হচ্ছিল ইউরোপেই।
এ যগের সাহিত্য, কাব্য, সংগীত, তারাও মানুষের মনকে মুগ্ধ করে। তবে, আর আমার কলমকে আমি ছুটে চলতে দিতে পারি না। আজকের কাজ সে যথেষ্ট করেছে।