বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ব্রিটেনের অধীনস্থ স্বাধীনতার স্বরূপ
১৬৪
ব্রিটেনের অধীনস্থ স্বাধীনতার স্বরূপ
১৯২৪ সনে মিশর সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে জাতীয়তাবাদী নেতৃবর্গ আর ব্রিটিশের মধ্যে আলাপ-আলোচনা বসল। এই আলোচনা ব্যর্থ হয়ে গেল, এবং তার ফলে ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত চটে গেলেন। এর ফলে যে-সব অভিনব কাণ্ড ঘটল তার কথা তোমাকে বলব, কিন্তু তার আগে একটি কথা তোমাকে মনে রাখতে হবে, তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’ পেয়েও কিন্তু মিশর রয়েছে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দখলে। শুধু যে ব্রিটিশ সেনাই মিশরে অবস্থিত ছিল তাই নয়, মিশরের নিজের সেনাবাহিনীটিও ছিল ব্রিটিশের কর্তৃত্বাধীন; এর বড়ো কর্তা একজন ইংরেজ, তাঁর পদবী হচ্ছে সেনাবাহিনীর সর্দার। পুলিশেরও প্রধান প্রধান কর্মচারীরা সকলেই ছিলেন ইংরেজ। মিশরে অবস্থিত বিদেশীদের স্বার্থরক্ষা করা হচ্ছে এই অজুহাত দিয়ে ব্রিটিশ সরকার রাজস্ব, বিচার এবং আভ্যন্তরীণ শাসন বিভাগটিকে নিজের কর্তৃত্বে রেখে চালাচ্ছিলেন; তার মানেই, দেশ শাসনের মধ্যে যে কটা বস্তুর গুরুত্ব খুব বেশি তার প্রত্যেকটাই ছিল এদের হাতে। মিশরবাসীরা স্বভাবতই দাবি করছিল, এই সব প্রভুত্ব ব্রিটিশের হাত থেকে খসিয়ে আনতে হবে।
১৯২৪ সনের ১৯শে নভেম্বর তারিখে সার্ লী স্ট্যাক বলে একজন ইংরেজকে কয়েকজন মিশরবাসী হত্যা করল। ইনি ছিলেন মিশরের সেনাবাহিনীর সর্দার, আবার সুদানেরও বড়োলাট ছিলেন ইনিই। স্বভাবতই এই হত্যা ব্যাপারে মিশরে এবং ইংলণ্ডে ইংরেজরা বিচলিত হয়ে উঠল। কিন্তু তার চেয়েও বোধ হয় ঢের বেশি বিচলিত হলেন মিশরের জাতীয়তাবাদী দল ওয়াফ্দ্-এর নেতারা—তাঁরা বুঝলেন, এবার তাঁদের উপরে একটা পাল্টা আক্রমণ না করে ব্রিটিশরা ছাড়ছে না। সে আক্রমণ হতেও দেরি হল না। তিনটি দিনও কাটল না, ২২শে নভেম্বর তারিখে মিশরের ব্রিটিশ হাই কমিশনার লর্ড অ্যালেনবি মিশর সরকারকে একটি চরমপত্র পাঠালেন, এতে বলা হল, মিশরকে অবিলম্বে এই কটি দাবি পূরণ করতে হবে:
১। ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
২। অপরাধীদের দণ্ড দিতে হবে।
৩। বিক্ষোভ প্রদর্শনাদি সর্বপ্রকার রাজনৈতিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা হবে।
৪। ৫,০০,০০০ পাউণ্ড ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৫। সুদানে মিশরের যত সৈন্য আছে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
৬। সুদানের যে অঞ্চলটিতে জলসেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে মিশরের স্বার্থের খাতিরে কতগুলো বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল, সে-সব বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।
৭। মিশরে অবস্থিত সমস্ত বিদেশীর স্বার্থরক্ষার যে অধিকার ও ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকার আয়ত্ত করে নিতে চান, তার সম্বন্ধে আর কোনোরকম আপত্তি বা আন্দোলন করা চলবে না। বিশেষ করে এর মানে ছিল, রাজস্ব বিচার আর আভ্যন্তরীণ শাসন বিভাগে ব্রিটিশের কর্তৃত্ব বজায় রাখা।
এই দাবি সাতটি লক্ষ্য করে দেখবার মতো বস্তু। কোথায় কজন লোক মিলে সার্ লী স্ট্যাককে খুন করেছে, অতএব ব্রিটিশ সরকার তৎক্ষণাৎ সমস্ত মিশর সরকার অর্থাৎ মিশরের সমস্ত প্রজার প্রতিই এমন একটা ভাব ধারণ করলেন যেন হত্যাটা তাঁরাই করেছেন—এত তাড়াতাড়ি হুকুম জারি করলেন যে, প্রকৃত অপরাধ কার সে সম্বন্ধে কোনো তত্ত্ব নির্ণয়ের পর্যন্ত অবসর রইল না। তাছাড়া এই ব্যাপারটাকে ভাঙিয়ে তাঁরা বেশ মোটা সোটা রকমের একটা টাকার দাঁও মেরে নিলেন; তার চেয়েও বড়ো কথা, এই হত্যাটাকেই উপলক্ষ্য করে তাঁদের সঙ্গে মিশর সরকারের যেখানে যা কিছু নিয়ে মতভেদ চলছিল স্রেফ গায়ের জোরেই তার অবসান করে নিলেন—মাসকয়েক মাত্র আগে এই কথাগুলো নিয়েই লণ্ডনে এঁদের আলোচনা ভেঙে গিয়েছিল। এতেও তাঁদের তৃপ্তি হল না, এর উপরে তাঁরা আবার লেজও জুড়লেন, দেশের মধ্যে কোনোরকম রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি চলতে দেওয়া হবে না—মানে দেশটার সাধারণ জীবনযাত্রার স্বাভাবিক পথে চলা বন্ধ হয়ে গেল।
সার্ লীর হত্যাকাণ্ড থেকে এত সব বিচিত্র ফল দাঁড়ালো, এটা বাস্তবিকই আশ্চর্য ব্যাপার—একটা মাত্র নরহত্যা থেকে ব্রিটিশজাতির এতখানি লাভের ব্যবস্থা করে নেওয়া, এ একটা রীতিমতো জোরালো এবং উর্বর বুদ্ধিশক্তির পরিচয়। তার চেয়েও মজার কথা হচ্ছে এই, যে-দুজন প্রধান কর্মচারীর (নামে মিশর সরকারের অধীন) উপরে অপরাধ এবং বিশৃঙ্খলা নিবারণের দায়িত্ব ছিল বলে ধরা যেতে পারত, কায়রোর পুলিশের বড়ো সাহেব আর জনসাধারণের নিরাপত্তা বাহিনীর ইউরোপীয় বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল, এঁরা দুজনেই ছিলেন ইংরেজ। সার্ লীর হত্যাকাণ্ড তাঁদেরও অক্ষমতার পরিচয়, এমন কথা কেউই ভেবে দেখল না। বেচারী মিশর সরকার এই খুনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের গভীর দুঃখ এবং অনুশোচনা প্রকাশ করেছিলেন; ব্রিটিশ সরকারের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল তাঁদেরই ঘাড়ে—যে রাগের বোঝাটা শুধু ভারীই নয়, বেশ হিসাব করে এবং ব্রিটেনের পক্ষে লাভজনক করেই তাকে তৈরি করা হয়েছিল।
ব্রিটিশদের এই কাজে প্রতিবাদ জানিয়ে জগলুল পাশা এবং তাঁর মন্ত্রিসভা অবিলম্বে পদত্যাগ করলেন। ১৯২৪ সনের সেই নভেম্বর মাসেই রাজা ফুয়াদ পার্লামেণ্ট ভেঙে দিলেন। ব্রিটেনেরই জিত—জগলুল এবং তাঁর ওয়াফ্দ্ দলকে তারা মন্ত্রিত্বের গদি থেকে সরিয়ে দিয়েছে, পার্লামেণ্টেরও শেষ হয়েছে, অন্তত তখনকার মতো। তাছাড়া সুদানও তাদের হাতে এসে গেছে: এখন তারা ইচ্ছা করলেই সুদানে নীল নদের জলস্রোত বন্ধ করে দিয়ে মিশরকে গলা টিপে মারতে পারে।
“একটা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের প্রয়োজন সিদ্ধ করে নেওয়া হচ্ছে”—এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মিশরের পার্লামেণ্ট লীগ অব নেশন্সের কাছে দরখাস্ত পাঠিয়েছিল। কিন্তু ইউরোপের বড়ো কটি শক্তির বিরুদ্ধে কেউ নালিশ করতে গেলে লীগ তৎক্ষণাৎ অন্ধ আর কালা হয়ে যায়।
সেই দিন থেকে শুরু করে মিশরে ক্রমাগত লড়াই আর ধ্বস্তাধ্বস্তি চলেছে—তার একদিকে রয়েছেন ওয়াফ্দ্ দল, বস্তুত তাঁরাই সমস্ত জাতিটার প্রতিনিধি; আর অন্যদিকে রয়েছেন রাজা ফুয়াদ আর ব্রিটিশ হাই কমিশনার, তাঁদের পিছনে রয়েছে অন্যান্য বিদেশী শক্তি এবং রাজসভার অনুগ্রহীত ফেউয়ের দল। এর বেশির ভাগ সময়ই দেশটাকে শাসন করা হয়েছে একাধিপত্যের নীতিতে। রাজা ফুয়াদ রীতিমতো স্বৈরতন্ত্রী রাজা হিসাবেই রাজ্য-শাসন করছেন, দেশের শাসনতন্ত্র যেটা ছিল তাকে কেউই মেনে চলছে না। মাঝে মাঝে পার্লামেণ্টের অধিবেশন ডাকা হয়েছে, প্রত্যেকবারই সে অধিবেশনের সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট বোঝা গেছে দেশসুদ্ধ লোকের সমর্থন রয়েছে ওয়াফ্দ্ দলের প্রতি; অতএব তখনই আবার সে পার্লামেণ্টকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই-সব কাণ্ড করার কোনো ক্ষমতাই ফুয়াদের হত না, যদি না ব্রিটিশরা তাঁর পিছনে থাকত এবং সেনাবাহিনী আর পুলিশবাহিনী ব্রিটিশের হাতের মুঠোয় থাকত। ভারতবর্ষের দেশীয় রাজ্যগুলো যেমন ব্রিটিশ রেসিডেণ্টের ইঙ্গিতে চলে, মিশরের—‘স্বাধীন’ মিশরেরও অবস্থা দাঁড়িয়েছে অনেকটা তারই মতো; সত্যকার ক্ষমতা যার হাতে পিছন থেকে সেই সুতো টেনে তাকে চালাচ্ছে।
১৯২৪ সনের নভেম্বর মাসে পার্লামেণ্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ১৯২৫ সনের মার্চ মাসে নূতন পার্লামেণ্টের অধিবেশন হল। এর মধ্যে ওয়াফ্দ্ দলেরই সংখ্যাধিক্য। অধিবেশনের শুরুতেই এই পার্লামেণ্ট জগলুল পাশাকে চেম্বার অব্ ডেপুটিজ্-এর প্রেসিডেণ্ট বলে নির্বাচিত করল। ইংরেজদের এবং রাজা ফুয়াদের এটা পছন্দ হল না; অতএব ঠিক সেই দিনই সেই আনকোরা নূতন পার্লামেণ্টকে ভেঙে দেওয়া হল—একদিন মাত্র তখন তার বয়স। এর পর পুরো একটি বছরের মধ্যে আর পার্লামেণ্ট ডাকা হল না। শাসনতন্ত্র? ছিল, কিন্তু তাকে নিয়ে কে মাথা ঘামাচ্ছে। ফুয়াদ স্বৈরতন্ত্রী একাধিনায়ক হয়ে শাসন করতে লাগলেন; আসলে অবশ্য তাঁর পিছনে থেকে শক্তি যোগালেন ব্রিটিশ কমিশনার। দেশসুদ্ধ লোক এতে ক্ষেপে উঠল; রাজা ফুয়াদ আর ইংরেজদের মধ্যে যে মিতালি চলেছে তার বিরুদ্ধে লড়বে বলে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল এসে একত্র মিলিত হল—এই মিলন ঘটালেন সৈয়দ জগলুল। ১৯২৫ সনের নভেম্বর মাসে পার্লামেণ্টের সভ্যরা মিলে একটি অধিবেশন পর্যন্ত করলেন—সরকারের নিষেধ অগ্রাহ্য করেই; পার্লামেণ্ট বাড়িটিতে সৈন্য বসিয়ে রাখা হয়েছিল, অতএব এই সভা বসল অন্যত্র।
ফুয়াদ এবারে শুধু তাঁর প্রাসাদ থেকে একটা হুকুম জারি করেই দেশের গোটা শাসনতন্ত্রটাকে বদলে ফেলবার চেষ্টা করলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এটাকে আরও বেশি রক্ষণপন্থী করে তোলা, যেন ভবিষ্যতে পার্লামেণ্টকে আরও বেশি রকম হাতের মুঠোয় রেখে চালানো যায়, আর জগলুলের দলের বেশির ভাগ লোকেরই এতে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর এই চেষ্টার বিরুদ্ধে দেশে একেবারে অত্যন্ত তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়ে উঠল; স্পষ্টই বোঝা গেল, এই নূতন ব্যবস্থা অনুসারে যদি নির্বাচন ডাকা হয়, তবে দেশের লোক সে নির্বাচনে আদৌ যোগ দেবে না। দেখেশুনে রাজা ফুয়াদকে বাধ্য হয়েই হার মানতে হল; পুরোনো নিয়ম অনুসারেই নির্বাচন ব্যবস্থা করা হল। নির্বাচনের ফলে দেখা গেল, জগলুলের দলের লোক নির্বাচিত হয়েছেন ২০০ জন, বাইরের লোক মাত্র ১৪ জন! সমগ্র জাতির উপরে জগলুলের কী অসামান্য প্রতিপত্তি ছিল, বা মিশরের লোকরা কি চাইছিল, তার এর চেয়ে বড়ো প্রমাণ আর হতে পারে না। কিন্তু এর পরেও ব্রিটিশ কমিশনার (এর নাম লর্ড লয়েড, এককালে ইনি ভারতের একজন প্রাদেশিক লাট ছিলেন) বললেন, জগলুল প্রধানমন্ত্রী হওয়াতে তাঁর আপত্তি আছে। অতএব তখন আরেকজন লোককে প্রধানমন্ত্রী করা হল। এই ব্যাপারে ইংরেজদের হস্তক্ষেপ করতে যাবার কী প্রয়োজন ছিল বুঝে ওঠা শক্ত। সে যাক। নূতন যে মন্ত্রিসভা তৈরি হল তারও কিন্তু অনেকখানিই চলত জগলুলের দলের ইঙ্গিতে। অতএব নরমপন্থায় চলবার সমস্ত রকমের চেষ্টা-চরিত্র সত্ত্বেও প্রায়ই এর সঙ্গে লয়েডের ঝগড়া হতে লাগল। লয়েড ছিলেন অত্যন্ত দাম্ভিক এবং প্রভুত্বপরায়ণ ব্যক্তি; থেকে থেকেই তিনি হুম্কি ছাড়তেন, ব্রিটিশ রণতরী নিয়ে এসে তার গুঁতোয় মিশরকে শায়েস্তা করে ছাড়বেন।
১৯২৭ সনে ব্রিটেনের সঙ্গে আপোষ-মীমাংসা করবার আরেক দফা চেষ্টা করা হল। কিন্তু ব্রিটেন যে-সব শর্ত দিল তা দেখে রাজা ফুয়াদের সেই অতি-নরমপন্থী প্রধানমন্ত্রী মশাইয়েরও চক্ষুস্থির হয়ে গেল। কাগজে-কলমে একটা ‘স্বাধীনতা’ দিয়ে তার তলায় আসলে যে বস্তুটি এতে খাড়া করা হচ্ছিল তাতে মিশর বস্তুত ব্রিটেনের একটা রক্ষাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়ে যাবে। অতএব এবারেও আলাপ-আলোচনা ভেঙে গেল।
এই সব আলাপ-আলোচনা যখন চলেছে, এমন সময়ে, ১৯২৭ সনের ২৩শে আগষ্ট তারিখে সত্তর বছর বয়সে, মিশরের মহান নেতা সৈয়দ জগলুল পাশার মৃত্যু হল। জগলুল মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর স্মৃতি বেঁচে রয়েছে। মিশরের পক্ষে সেটা একটা উজ্জ্বল এবং অমূল্য উত্তরাধিকারলব্ধ সম্পদ, মিশরের লোকে আজও তাঁর নামে স্বাধীনতার সমরে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠছে। তাঁর স্ত্রী মাদাম সফিয়া জগলুল আজও বেঁচে আছেন; সমগ্র জাতির প্রীতি ও শ্রদ্ধার পাত্রী তিনি, তারা তাঁকে নাম দিয়েছে ‘জাতির জননী’ বলে। কায়রো শহরে জগলুলের যে বাড়ীটি আছে তার নাম ‘জাতির বাড়ি’—দীর্ঘকাল ধরে সে বাড়িটি মিশরের জাতীয়তাবাদীদের প্রধান কর্মকেন্দ্র হয়ে রয়েছে।
জগলুলের পরে ওয়াফ্দ্ দলের নেতা হলেন মুস্তাফা নাহাস পাশা। ১৯২৮ সনের মার্চ মাসে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। দেশের আভ্যন্তরীণ শাসন ব্যাপারে, প্রজাদের নাগরিক অধিকার এবং অস্ত্র ধারণের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কয়েকটা সাদাসিদা রকমের সংস্কার সাধনের চেষ্টা করলেন। সামরিক আইনের আমলে ব্রিটিশরা এই অধিকারগুলো খর্ব করে দিয়েছিল। কিন্তু এই প্রস্তাব নিয়ে মিশরের পার্লামেণ্টে আলোচনা শুরু হতে না হতেই ইংলণ্ড থেকে শাসানি এসে পৌঁছল, এ-সব কিছুতেই করা চলবে না। মিশরের এটা একটা সম্পূর্ণ ঘরোয়া ব্যাপার, এ নিয়েও ইংলণ্ড এইভাবে হস্তক্ষেপ করতে আসবে এটা কেমন অদ্ভূত মনে হয়। কিন্তু লর্ড লয়েড যথাবিহিত প্রাচীন রীতিতে একখানা চরমপত্র ঝাড়লেন; মাল্টা থেকে বহু ব্রিটিশ রণতরী আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে এসে হাজির হল। নাহাস পাশা তখন খানিকটা নতি স্বীকার করলেন, এই প্রস্তাবের আলোচনাটাকে পার্লামেণ্টের পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত মুলতুবি রাখতে রাজি হলেন। সে অধিবেশন কয়েকমাস পরে হবার কথা।
কিন্তু পার্লামেণ্টের সে পরবর্তী অধিবেশন আর হল না। রাজা ছিলেন, ছিলেন ব্রিটিশ কমিশনার—একজন প্রগতিবিরোধিতার আর একজন সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক। পার্লামেণ্ট আর কখনও এ-সব দুষ্টামি করবার ফুরসৎ না পায়, এঁরাই তার ব্যবস্থা দেখলেন। এঁদের ষড়যন্ত্রটিকে গড়েও তোলা হল একটা অদ্ভুত উপায়ে। নাহাস পাশার প্রচণ্ড সুনাম ছিল তাঁর সচ্চরিত্রতা আর সাধুতার জন্য। কী একটা চিঠির নজির দেখিয়ে (পরে আবার প্রমাণ হয়েছে চিঠিটা জাল ছিল) হঠাৎ একদিন নাহাস পাশা এবং ওয়াফ্দ্ দলের একজন কপ্ট্ নেতার নামে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হল। রাজসভার ফেউয়েরা আর ব্রিটিশরা এই নিয়ে বিরাট একটা হৈ চৈ শুরু করে দিল। মিশরে শুধু নয়, অন্যান্য দেশে পর্যন্ত ব্রিটিশ দূতরা আর সংবাদপত্রের সংবাদদাতারা এই মিথ্যা অপবাদগুলো আড়ম্বরে প্রচার করতে লাগল। এই অভিযোগের ছুতো ধরে রাজা ফুয়াদ নাহাস পাশাকে হুকুম দিলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তাফা দাও। নাহাস পাশা বললেন দেব না। ফুয়াদ তখন তাঁকে বরখাস্ত করলেন। লয়েড-ফুয়াদ চক্রান্তের দ্বিতীয় অধ্যায়টির এবার পত্তন হল। প্রকাণ্ড একটা রাজনৈতিক চাল দিলেন এঁরা; একটি হকুমনামা জারি করে রাজা পার্লামেণ্টকে মুলতুবি করে দিলেন, শাসনতন্ত্রকে বদলে ফেললেন। শাসনতন্ত্রের যে ধারাগুলোতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং প্রজাদের অন্যান্য সব অধিকারের কথা ছিল, সেগুলোকে বাদ দিয়ে দেওয়া হল; রাজ্যে একনায়কতন্ত্র ঘোষণা করা হল। ইংলণ্ডের সমস্ত সংবাদপত্রে এবং মিশরে যে-সব ইউরোপীয় ছিল তাদের মধ্যে আনন্দ-উৎসবের ধুম পড়ে গেল।
একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হল, তবুও তাকে অগ্রাহ্য করে পার্লামেণ্টের সভ্যরা একত্র হয়ে সভা করলেন। নূতন সরকারকে অবৈধ বলে ঘোষণা করলেন। লয়েড এবং ফুয়াদ অবশ্য এ-সব ছোটোখাটো ব্যাপারকে আমলই দিলেন না। ‘আইন এবং শঙ্খলা’র কাজই তো হচ্ছে প্রগতিবিরোধ আর সাম্রাজ্যবাদকে টিঁকিয়ে রাখা, তাকে ভাঙার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া নয়।
নাহাস পাশার নামে সরকার অভিযোগ এনেছিলেন; কিন্তু সমস্ত প্রকারের সরকারি চাপ আর তদ্বির সত্ত্বেও সে মামলা টিঁকল না। তাঁর সম্বন্ধে যে-সব অভিযোগ আনা হয়েছিল সেগুলো সবই মিথ্যা প্রমাণিত হল। সরকার তখন হুকুম জারি করলেন (কী অপূর্ব সাধুত্ব আর বীরত্ব!), সে মামলার রায় কেউ ছেপে বার করতে পারবে না। রায়ের খবর অবশ্য ছড়িয়ে পড়তে দেরি হল না—দেশের সর্বত্র আনন্দ আর উল্লাসের ধুম পড়ে গেল।
দেশে তখন একনায়কতন্ত্র চলছে, তার পিছনে আছেন লয়েড আর ব্রিটিশ সেনাবাহিনী। ওয়াফ্দ্ দলকে মেরে ভেঙেচুরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবার চেষ্টা হল—ওয়াফ্দ্ দল মানেই মিশরের জাতীয়তাবাদীরা। দেশে রীতিমতো একটা ত্রাসের সৃষ্টি করা হল; সমস্ত রকম সংবাদের উপরে অত্যন্ত কড়া সেন্সর বসল। কিন্তু এত সব ব্যবস্থা সত্ত্বেও দেশের মধ্যে প্রকাণ্ড জাতীয় বিক্ষোভ-প্রদর্শন হতে লাগল; এই-সব কাজে দেশের মেয়েরাও একটা খুব বড়ো অংশ গ্রহণ করলেন। একবার তো প্রায় এক সপ্তাহ ধরেই একটা হরতাল চালানো হল, আইনজীবীরা এবং আরও অনেকে এতে যোগ দিলেন। কিন্তু এমনই সেন্সরের মহিমা, হরতালের সংবাদটা পর্যন্ত কোনো কাগজে ছেপে বার করতে পারল না।
এমনি করে ঝড়ঝাপটা হৈ চৈ’র মধ্য দিয়ে ১৯২৮ সনটি পার হয়ে গেল। এই বছরের শেষদিকে ইংলণ্ডের রাজনৈতিক জীবনে একটা পরিবর্তন ঘটল, মিশরের উপরেও তার প্রতিক্রিয়া সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল। ইংলণ্ডে একটি শ্রমিক দলের মন্ত্রিসভা গদি দখল করে বসেছিলেন; গদিতে বসে প্রথমেই তাঁরা যে কটি কাজ করলেন তার মধ্যে একটি হচ্ছে লয়েডকে মিশর থেকে সরিয়ে আনা—লয়েডের আচরণ ব্রিটিশ সরকারের কাছে পর্যন্ত অসহ্য হয়ে উঠেছিল। লয়েডকে সরিয়ে নেবার ফলে, ইংরেজদের সঙ্গে ফুয়াদের যে মিতালি ছিল সেটা কিছুকালের মতো ভেঙে গেল। ইংলণ্ডের সাহায্য ছাড়া ফুয়াদের এক পা চলবার সাধ্য ছিল না; অতএব ১৯২৮ সনের ডিসেম্বর মাসে তিনি আবার নূতন করে পার্লামেণ্ট নির্বাচনের অনুমতি দিলেন। এবারেও ওয়াফ্দ্ দল পার্লামেণ্টের প্রায় সবগুলো আসনই দখল করে বসল।
ইংলণ্ডের শ্রমিক মন্ত্রিদল আবার মিশরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা আরম্ভ করলেন। আলোচনা চলবার জন্য ১৯২৯ সনে নাহাস পাশা লণ্ডনে গেলেন। পূর্ববর্তীদের তুলনায় শ্রমিক মন্ত্রিদল এবার কিছু বেশিদূর অগ্রসর হলেন, সংরক্ষিত বিষয়গুলির মধ্যে তিনটি সম্বন্ধে নাহাস পাশার অভিমতই তাঁরা মেনে নিলেন। কিন্তু চতুর্থ বিষয়টি ছিল সুদান-সমস্যা—এর সম্বন্ধে এবারেও দুপক্ষের মত মিলল না, কাজেই এবারেও আলোচনা ব্যর্থ হল। কিন্তু এবারে অন্য অন্য বারের তুলনায় দুপক্ষের মধ্যে অনেক বেশি পরিমাণ মতের মিল দেখা গিয়েছিল; আলোচনা ভেঙে যাবার পরেও তাই দুই পক্ষের সৌহার্দ্য ঠিক বজায় রইল; দু’পক্ষই প্রতিশ্রুতি দিলেন, পরে এই নিয়ে আবার তাঁদের আলোচনা হবে। মোটের উপর এটাকে নাহাস পাশা এবং ওয়াফ্দ্ দলের পক্ষে সাফল্যই বলা যায়; মিশরে যে-সব ব্রিটিশ এবং অন্যদেশীয় ব্যাবসাদার ও মহাজন বসে ছিল তাদের এটা মোটেই পছন্দ হল না। রাজা ফুয়াদেরও না। এর মাস কয়েক পরে, ১৯৩০ সনের জুন মাসে, রাজার সঙ্গে পার্লামেণ্টের বিরোধ বাধল; নাহাস পাশা প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করলেন।
এই ভাঙনের সুযোগে ফুয়াদ আবার তাঁর একাধিনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন—তাঁর রাজত্বকালের মধ্যে সেই তৃতীয়বার তাঁর একনায়কত্ব। পার্লামেণ্ট ভেঙে দেওয়া হল; ওয়াফ্দ্ দলের সংবাদপত্রগুলোর প্রকাশ নিষিদ্ধ হয়ে গেল; মোটের উপর বেশ দুর্দান্ত দাপটের সঙ্গেই তিনি তাঁর একনায়কী শাসন চালাতে লাগলেন। পার্লামেণ্টের দুটি ভাগ চেম্বার এবং সেনেট; দুই অংশেরই একেবারে প্রত্যেকজন সভ্য সরকারের আদেশ উপেক্ষা করে চললেন; জোর করে পার্লামেণ্ট-বাড়িতে ঢুকে সেখানে পার্লামেণ্টের একটা অধিবেশন করলেন। গাম্ভীর্যের সঙ্গে তাঁরা সকলে শপথ গ্রহণ করলেন, দেশের শাসনতন্ত্রের প্রতি তাঁদের নিষ্ঠা অচলা থাকবে; তাঁদের সমস্ত শক্তি নিয়ে সে শাসনতন্ত্রকে অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্য তাঁরা লড়বেন প্রতিশ্রুতি দিলেন—১৯৩০ সনের ২৩শে জুন তারিখে এই অধিবেশন হয়। দেশের সর্বত্র খুব বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হল; সৈন্যরা সেসব জোর করে ভেঙে দিল, রক্তপাতও প্রচুর হল। নাহাস পাশা নিজেও আহত হলেন। এমনি করে ব্রিটিশ কর্মচারীদের দ্বারা পরিচালিত সৈন্য আর পুলিশবাহিনী দেশের একনায়কী শাসনকে বাঁচিয়ে রাখল—দেশের সমস্ত লোক তখন ফুয়াদের উপরে অত্যন্ত চটে গিয়েছে; তাঁর পক্ষে আছে মাত্র মুষ্টিমেয় কজন অভিজাত আর ধনীব্যক্তি, এরা তখনও রাজাকে আঁকড়ে ধরে আছে। কেবল ওয়াফ্দ্ দল নয়, দেশের অন্যান্য সমস্ত দলও তখন এই একনায়কী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তুলেছেন—নরমপন্থী এবং উদারপন্থীরা পর্যন্ত: যদিও ভারতবর্ষেরই মতো মিশরেও এরা সাধারণ প্রজার তরফ থেকে কোনো রকম বিশেষ কড়া কার্যকলাপ চালানোর বিরোধী বলেই নিজেদের পরিচয় দিতেন।
আর কিছুদিন পরে, সেই ১৯৩০ সনের মধ্যেই রাজা একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করলেন; এতে নূতন একটি শাসনতন্ত্র জারি করা হল, তাতে পার্লামেণ্টের ক্ষমতা অনেক কমিয়ে রাজার নিজের ক্ষমতা অনেকখানি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের কাজ করতে হাঙ্গামা কিছুই ছিল না। শুধু একটি ঘোষণাপত্র জারি করে দাও, ব্যস, আর ভাবতে হবে না; কারণ রাজার পিছনে ঘোর কালো ছায়ামূর্তির বিভীষিকা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের শক্তি।
১৯২২ থেকে ১৯৩০ সন, মিশরের এই ন’বছরের ইতিহাস আমি তোমাকে কিছুটা খুঁটিয়েই বললাম; তার কারণ, আমার এটাকে একটা অদ্ভূত গল্প বলে মনে হয়। ১৯২২ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যে ঘোষণা করেছিলেন তার বয়ান অনুসারে বলতে হয়, এই ক’টা বছরই ছিল মিশরের ‘স্বাধীনতা’ ভোগের যুগ। মিশরের লোকেরা নিজেরা কী চাইছিল সে সম্বন্ধে কোনো সংশয়ই থাকতে পারে না। যখনই তারা মত প্রকাশ করবার সুযোগ পেয়েছে, মুসলমান এবং কপ্ট্ নির্বিচারে দেশের অধিকাংশ প্রজা ওয়াফ্দ্ দলকেই তাদের প্রতিনিধি বলে নির্বাচিত করে দিয়েছে। কিন্তু তাদের যা কাম্য ছিল সে হচ্ছে, বিদেশীরা, বিশেষ করে ব্রিটিশরা, দেশটাকে শোষণ করবার যে ক্ষমতা অধিকার করে বসে ছিল তাকে খানিকটা খর্ব করা। অতএব এই সমস্ত কায়েমী স্বার্থের মালিক বিদেশীরাও যতভাবে পারে তাদের সে কাজে বাধা দিচ্ছিল জোর করে, অত্যাচার করে, জালজয়াচুরি করে, ষড়যন্ত্র করে—দেশের সিংহাসনেও তারা এমন দেখেই একটা পুতুল রাজাকে বসিয়ে রেখেছিল, যে তাদের হুকুম ছাড়া এক পা চলবে না।
ওয়াফ্দ্ আন্দোলনটা চিরদিনই একটা খাঁটি জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়াদের আন্দোলন হয়ে রয়েছে। জাতীয় স্বাধীনতার জন্যই এঁরা লড়াই করেছেন, সামাজিক সমস্যা যেগুলো আছে তার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে যান নি। পার্লামেণ্ট যখনই চালু ছিল তখনই সে শিক্ষা এবং অন্যান্য বিভাগে খানিকটা করে ভালো কাজ করে গিয়েছে। বস্তুত জাতীয় সংগ্রাম চালাবার ফাঁকে ফাঁকেও এই সংক্ষিপ্ত সময়টুকুর মধ্যে পার্লামেণ্ট এদিকে যতটুকু কাজ দেখিয়েছে, এর আগের চল্লিশ বছরে ব্রিটিশ সরকার ততটা দেখায় নি। কৃষক জনসাধারণ ওয়াফ্দ্ দলের প্রতি অনুরক্ত—নির্বাচনগুলোর ফল এবং বড়ো বড়ো শোভাযাত্রার বহর দেখলেই সেকথা প্রমাণ হয়ে যায়। কিন্তু তবুও এই আন্দোলনটি মুখ্যত মধ্যবিত্ত শ্রেণীগুলিরই আন্দোলন; সামাজিক পরিবর্তন কামনা করে আন্দোলন চালালে তার ফলে দেশের জনসাধারণ যতখানি জেগে উঠতে পারত, এই আন্দোলনে ততটা হয় নি।
এই চিঠিটা এবার শেষ করব, কিন্তু তার আগে মিশরে নারীদের আন্দোলনের কথাটা তোমাকে বলে নিতেই হচ্ছে। বোধ হয় একমাত্র খাস আরব দেশ ছাড়া, আরব অঞ্চলের সমস্ত দেশগুলোতেই নারীদের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড জাগরণ এসেছে। অন্য বহু ব্যাপারের মতোই এইদিক দিয়েও ইরাক, সিরিয়া বা প্যালেস্টাইনের তুলনায় মিশর অনেক বেশি দূর এগিয়ে গেছে। তবু কিন্তু এর প্রত্যেকটা দেশেই নারীদের একটা করে সুসংহত আন্দোলন গড়ে উঠেছে; ১৯৩০ সনের জুলাই মাসে দামাস্কাস শহরে ‘আরব নারী কংগ্রেসে’র প্রথম অধিবেশন হয়ে গেছে। এঁরা রাজনৈতিক প্রশ্ন অপেক্ষা সংস্কৃতি এবং সমাজগত প্রগতির উপরেই ঝোঁক দিয়েছেন বেশি। মিশরে নারীরা রাজনীতি নিয়ে এঁদের চেয়ে একটু বেশি মাথা ঘামান। রাজনৈতিক শোভাযাত্রা প্রভৃতিতে তাঁরা যোগ দিয়ে থাকেন; একটি বেশ শক্তিশালী নারীদের ভোটাধিকার সংঘও এঁদের আছে। এঁরা দাবি করছেন, বিবাহের আইনকে এমনভাবে সংস্কার করা হোক যেন নারীদের অধিকার তাতে বেড়ে যায়; ব্যবসায় ও চাকরি প্রভৃতির ক্ষেত্রে নারীদের পুরুষের সমান সুযোগ ও অধিকার দেওয়া হোক, ইত্যাদি। এ বিষয়ে মুসলমান এবং খৃষ্টান নারীরা পরস্পরের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করে চলেছেন। অবগুণ্ঠন-প্রথা সর্বত্রই কমে যাচ্ছে, বিশেষ করে মিশরে। তুরস্কের মতো এখানে অবগুণ্ঠন এখনও একেবারে অন্তর্হিত হয়ে যায় নি, কিন্তু ক্রমেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ব্যাচ্ছে।
মন্তব্য (অক্টোবর ১৯৩৮):
১৯৩০ সন থেকে আরম্ভ করে মিশর রাজপ্রাসাদ থেকে নিয়ন্ত্রিত এক একনায়ক গভর্নমেণ্টের অধীনে ছিল। শুধু নামেমাত্র ইহা ‘সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র’ ছিল, কিন্তু বস্তুত ইহা গ্রেটব্রিটেনের একটি উপনিবেশের প্রায় শামিল ছিল, কেননা কায়রো ও আলেকজান্দ্রিয়াতে বিদেশী সৈন্য (ব্রিটিশ) অধিকৃত দুর্গ ছিল এবং সুয়েজখাল ও সুদানের নিয়ন্ত্রণভার ছিল ব্রিটেনের ওপর। এই ক’টি বছর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময় ছিল এবং তুলার মূল্য কমে যাওয়াতে মিশরের দুঃখকষ্টের অন্ত ছিল না।
১৯৩৫ সনে ফ্যাসিস্তপন্থী ইতালি আবিসিনিয়া আক্রমণ করল। এ ব্যাপারে মিশর এক নূতন বিপদের সম্মুখীন হল, সঙ্গে সঙ্গে নীলনদের ঊর্ধ্ব উপতাকায় ব্রিটিশ স্বার্থহানিরও সম্ভাবনা দেখা দিল। এর ফলে ইংলণ্ড ও মিশরের পারস্পরিক সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়ে গেল। শত্রুভাবাপন্ন ও বিদ্রোহী মিশরকে এখন পরাধীন করে রাখাটা ইংলণ্ড সমীচীন মনে করল না এবং মিশরের জননায়কগণ ইংলণ্ডকে সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে গণ্য করতে লাগল। পার্লামেণ্টের নির্বাচনে ওয়াফ্দ্ দল জয়ী হল এবং নাহাস পাশা প্রধানমন্ত্রী হলেন। আবিসিনিয়াতে ইতালির আক্রমণজনিত নূতন আবহাওয়ার (পরিবেশের) সৃষ্টি হওয়াতে মিশর ও ইংলণ্ডের মধ্যে মৈত্রী স্থাপিত হল এবং ১৯৩৬ সালের আগস্ট মাসে একটি সন্ধি স্বাক্ষরিত হল। পূর্বে মিশর যতখানি পাওয়ার জন্য দাবি করেছিল, শান্তির জন্য সে তার অনেকখানি ছেড়ে দিতে রাজী হল এবং এর জনাই সে সুয়েজখালের উপর ইংরেজ-আধিপত্য ও সুদানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেরূপ পূর্বে ছিল তাই চলতে দিতে সম্মতি দিল। তার উপরে মিশর তার পররাষ্ট্রনীতি ইংলণ্ডের পররাষ্ট্রনীতির অনুরূপ করে চলতে স্বীকৃত হল। অপরপক্ষে, ইংলণ্ড কায়রো ও আলেকজান্দ্রিয়া থেকে তার সৈন্যসামন্ত সরিয়ে আনল, মিশ্রিত বিচারালয়গুলি তুলে দেওয়ার জন্য সাহায্য করতে এবং মিশরের জাতিসঙ্ঘে (League of Nations) প্রবেশ সমর্থন করতে প্রতিশ্রুতি দিল।
এই নিষ্পত্তির ব্যবস্থায় খুবই উল্লাসের সৃষ্টি হল কিন্তু এসব আমোদ-উল্লাসের বাহ্যিক প্রদর্শনের সময় তখনও ঠিক আসে নি। রাজার পরিবর্তন হলেও রাজপ্রাসাদ (অর্থাৎ রাজশক্তি) ওয়াফ্দ্ দলকে পূর্ববৎ ঘৃণা করতে এবং ইহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে লাগল। পর্দার আড়ালে তখনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদই কাজ করতে লাগল। মিশরের ভূখণ্ডের অনেকখানি মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোকের দখলে এবং রাজপরিবারেরও এতে প্রচুর অংশ আছে। এই ভূ-স্বামিগণ প্রগতিমূলক আইন প্রণয়নের এবং গণশক্তির অভ্যুত্থানের একান্ত বিরোধী। তাই ক্রমাগত সংঘর্ষ চলতে লাগল—রাজা নাহাস পাশাকে পদচ্যুত করলেন এবং পার্লামেণ্ট ভেঙ্গে দিলেন।
শাসনকার্য রাজপ্রাসাদ থেকে (অর্থাৎ রাজা কর্তৃক) কিছুকাল চালিত হওয়ার পরে নূতন নির্বাচনের অনুষ্ঠান হল। এতে ওয়াফ্দ্ দল বেজায় হেরে গেল দেখে প্রত্যেকেই বিস্মিত হল। পরে জানা গেল যে, এই নির্বাচন বহুলাংশে একটা ভুয়া ব্যাপার ছিল এবং ভোটগণনার কাগজপত্রাদি মিথ্যা করে লিখান হয়েছিল। নাহাস পাশার নেতৃত্ব এখনও বেশ জনপ্রিয় আছে কিন্তু বর্তমানে গভর্নমেণ্ট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সহায়তায় রাজপ্রাসাদ থেকেই গুটিকয়েক রাজানুগ্রহপুষ্ট লোকের দ্বারা চালিত হচ্ছে।