বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ভারতের গ্রাম, কৃষক ও ভূস্বামী
১১১
ভারতের গ্রাম, কৃষক ও ভূস্বামী
আগের চিঠিতে তোমাকে ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের নীতির কথা বলেছি। এই নীতির ফলে ভারতের কুটিরশিল্পগুলি নষ্ট হয়ে গেল; শিল্পীরা কৃষির কাজ ধরল, গ্রামে গিয়ে বাস শুরু করল। অন্য কোনো জীবিকা নেই এমন বহু সংখ্যক মানুষ গিয়ে চাপল জমির উপরে—ভারতের এইটেই হয়েছে বড়ো সমস্যা, এও তোমাকে বলেছি। প্রধানত এইজন্যেই ভারতবর্ষ গরিব দেশ হয়ে আছে। এই লোকগুলোকে যদি জমি থেকে খসিয়ে নিয়ে অন্যরকম উৎপাদনের কাজে লাগিয়ে দেওয়া যেত তবে শুধু যে দেশের অর্থসম্পদই বেড়ে যেত তাই নয়, জমির উপরে চাপটাও অনেক কমে যেত, এবং তার ফলে কৃষির অবস্থাও অনেক উন্নত হয়ে উঠত।
অনেকে বলেন, জমির উপরে এই যে অতিরিক্ত চাপ পড়েছে, এর হেতু ব্রিটিশ নীতি ততটা নয়; এর কারণ হচ্ছে, ভারতের লোকসংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। গত এক শো বছরে ভারতের লোকসংখ্যা অনেক বেড়েছে সত্যি, কিন্তু আরও প্রায় সমস্ত দেশেরই বেড়েছে। বরং ইউরোপে, বিশেষ করে ইংলণ্ডে বেলজিয়মে হল্যাণ্ডে জর্মনিতে লোকসংখ্যা বেড়েছে ভারতের তুলনায় অনেক বেশি হারে। কোনো দেশের বা সমস্ত পৃথিবীর লোকসংখ্যা কতটা বাড়ল, তার দরুন কী ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে প্রয়োজন সেখানে কী করেই বা এটা ঠেকিয়ে রাখা যায়? এটা একটা খুবই জরুরি সমস্যা। এখানে তার আলোচনা আমি করতে পারছি না, কারণ তাতে অন্য কথাগুলো একত্র জড়িয়ে গোল পাকিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ কথাটা আমি পরিষ্কার করেই বলে দিতে চাই, ভারতে জমির উপরে যে চাপ পড়েছে তার যথার্থ হেতু লোকসংখ্যার বৃদ্ধি নয়; তার হেতু হচ্ছে, কৃষি ছাড়া প্রজার আর অন্য কোনো জীবিকা নেই। অন্যান্যরকম জীবিকা ও শিল্প যদি গড়ে তোলা যায় তা হলে ভারতে এখন যা লোক আছে এদের বোধ হয় অতি সহজেই কাজে লাগিয়ে দেওয়া যায় বা আরও বাড়িয়ে তোলা যায়। হতে পারে, হয়তো পরে আবার এই লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে।
এবারে আমরা ভারতে ব্রিটিশ নীতির অন্য কয়েকটা দিক নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে গ্রামের কথা ধরা যাক।
ভারতের গ্রাম্য-পঞ্চায়েতের কথা আমি অনেকবার তোমাকে লিখেছি; বহিঃশত্রুর অনেক আক্রমণ এবং অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও এরা টিঁকে রয়েছে। বেশি দিনের কথা নয়, ১৮৩০ খৃস্টাব্দেও ভারতের একজন ব্রিটিশ গভর্নর, সার চার্ল্স্ মেট্কাফ্ এই গ্রাম্য-সমাজকে বর্ণনা করে বলেছেন:
“গ্রামগুলি ছোটো ছোটো প্রজাতন্ত্র; এদের যা কিছু প্রয়োজন প্রায় সমস্তই এদের নিজেদের মধ্যে আছে; বাইরের কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এদের প্রায় প্রয়োজনই হয় না। যেখানে অন্য কিছুই টিঁকে থাকে না সেখানেও এরা বেশ টিঁকে রয়েছে। গ্রামগুলির এই প্রজাসমাজ, এদের প্রতোকেই এক একটি ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্রবিশেষ—প্রজার সুখস্বাচ্ছন্দ্যের প্রভূত ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, এবং এর কল্যাণে প্রজারা প্রচুর পরিমাণে স্বাধীনতা ও স্বরাজ-ক্ষমতা ভোগ করতে পাচ্ছে।”
এই বর্ণনাতে পুরোনো গ্রাম-ব্যবস্থার সত্যিই বেশ প্রশংসা দেখা যাচ্ছে। জীবনযাত্রার যে ছবি এতে দেওয়া হয়েছে তাতে মনে হয়, এসব প্রায় কল্পনার স্বর্গলোক! গ্রামের লোকেরা প্রচুর পরিমাণে স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত, সেটা খবই ভালো জিনিষ ছিল সন্দেহ নেই। এ ছাড়াও অনেক ভালো বস্তু এর মধ্যে ছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোকেও আমাদের না দেখলে চলবে না। সমস্ত বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গ্রাম তার নিজস্ব স্বাধীন জীবন যাপন করত; এর ফলে কোনো ব্যাপারেই বেশিদূর প্রগতির আশা ছিল না। প্রতিষ্ঠানের আয়তন ক্রমেই বাড়বে, তাদের মধ্যে যোগাযোগ থাকবে, পরস্পর-সাহায্য থাকবে, এর ফলেই প্রগতি আর উন্নতি আসে। ব্যক্তিই হোক বা জনসংঘই হোক, যতই সে নিজেকে নিয়ে একা একা থাকতে চাইবে ততই তার আত্মপরায়ণ, স্বার্থপর এবং সংকীর্ণচেতা হয়ে উঠবার সম্ভাবনা ঘটবে। শহরের লোকের তুলনায় গ্রামের লোকেরা অনেক সময়েই বেশি সংকীর্ণমনা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এইজন্যেই গ্রামসমাজগুলোর এতসব ভালো দিক থাকা সত্ত্বেও এরা প্রগতির কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে নি। বরং এগুলো ছিল পুরোনো ধরনধারণের স্থান ও অনুন্নত। কারুশিল্প এবং কারখানা গড়ে উঠেছিল প্রধানত শহরগুলোতেই। গ্রামে গ্রামে বহুসংখ্যক তাঁতি অবশ্য ছড়িয়ে ছিল।
গ্রাম্য-সমাজগুলি একা-একা নিজস্ব জীবন যাপন করত, অন্যদের সঙ্গেও বিশেষ সম্পর্ক রাখত না। এর প্রকৃত কারণ ছিল, পরস্পরের মধ্যে যাতায়াতের ব্যবস্থার অভাব। বিভিন্ন গ্রামকে একত্র সংযুক্ত করেছে এমন ভালো রাস্তা প্রায় ছিলই না। বস্তুত এই ভালো রাস্তাঘাটের অভাবেই দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে গ্রামগুলির ব্যাপারে বিশেষ হস্তক্ষেপ করা কঠিন ছিল। যেসমস্ত শহর বা গ্রাম বড়ো বড়ো নদীর তীরে বা কাছে অবস্থিত, সেসব জায়গায় তবু নৌকোয় করে যাতায়াত করা যেত; কিন্তু এভাবে যাতায়াত করা চলে এমন নদীর সংখ্যাও বেশি ছিল না। সহজ যানবাহনের এই-যে অভাব, এর ফলে দেশের মধ্যেকার ব্যবসাবাণিজ্যও তেমন বেড়ে উঠতে পারে নি।
অনেক বছর ধরে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একমাত্র উদেশ্য ছিল টাকা আয় করা আর অংশীদারদের লাভের টাকা তুলে দেওয়া। রাস্তাঘাটের জন্যে টাকা তারা সামান্যই ব্যয় করেছে; শিক্ষা স্বাস্থ্য হাসপাতাল এসবের জন্যে তো মোটেই ব্যয় করে নি। কিন্তু পরে যখন ব্রিটিশরা এ দেশে কাঁচামাল কেনা আর ব্রিটিশ কলের তৈরি মাল বেচার দিকে নজর দিল তখন যানবাহনের সম্বন্ধেও নূতন রকমের নীতি খাড়া করা হল। বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বেড়ে উঠছিল, এই বাণিজ্যকে গড়ে তোলবার জন্যে ভারতের সমদ্রোপকূলে নূতন নূতন শহর সৃষ্টি করা হল। যেমন—বোম্বাই, কলিকাতা, মাদ্রাজ, এবং তার পরে করাচি। এইসব শহরে তুলা প্রভৃতি কাঁচামাল এসে জমা হত, হয়ে বাইরের দেশে রপ্তানি হয়ে যেত; আবার বাইরে থেকে, বিশেষ করে ইংলণ্ড থেকে কলের তৈরি মাল এসে এখানে হাজির হত, হয়ে সমস্ত ভারতে ছড়িয়ে গিয়ে বিক্রি হত। পাশ্চাত্যদেশে লিভারপুলে ম্যাঞ্চেস্টার বার্মিংহাম শেফিল্ড্ প্রভৃতি যেসমস্ত বড়ো বড়ো শিল্পপ্রধান শহর গড়ে উঠছিল, তাদের সঙ্গে ভারতের এই নূতন শহরগুলোর অনেক পার্থক্য। ইউরোপের শহরগুলো ছিল পণ্য উৎপাদনের স্থান, আর বন্দর; সেখানে বড়ো বড়ো কারখানায় মাল তৈরি হচ্ছে, তার পর সেই মাল বিদেশে রপ্তানি হয়ে যাচ্ছে। ভারতবর্ষের নূতন শহরগুলোতে উৎপন্ন হত না কিছুই; এগুলো ছিল বিদেশী বাণিজ্যের গুদাম, আর বিদেশী শাসনের পরিচায়ক প্রতীক।
তোমাকে বলেছি, ব্রিটিশ নীতির ফলে ভারতবর্ষ ক্রমেই বেশি করে গ্রামপ্রধান হয়ে পড়ছিল, লোকেরা শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে বাস করছিল, কৃষি শুরু করছিল। তা সত্ত্বেও, এবং সে ব্যাপারটাকে ব্যাহত না করেই, সমুদ্রের ধারে ধারে এই নূতন শহরগুলো গজিয়ে উঠল। এদের সৃষ্টির ফলে গ্রামের অস্তিত্বের কোনো বাধা ঘটল না, মারা পড়ল ছোটো ছোটো শহর-বন্দরগুলো। জনসাধারণ যে গ্রামমুখী হতে চলেছিল সেটা চলতেই লাগল।
সমুদ্রতীরের এই নবগঠিত শহরগুলোকে দেশের অভ্যন্তরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে হয়েছিল; কারণ, দেশের ভিতর থেকে কাঁচামাল কুড়িয়ে এনে শহরে জমা করতে হবে; আবার শহর থেকে বিদেশী মালকে দেশের সর্বত্র পৌঁছে দিতে হবে। ও দিকে রাজধানী বা বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকেন্দ্র বলেও কতকগুলো শহরের পত্তন হল। এইরকম করে যানবাহনের ভালো ব্যবস্থার প্রয়োজন বেশ তীব্র হয়ে উঠল। রাস্তা তৈরি করা শুরু হল, তার পরে এল রেলপথ। প্রথম রেলপথ নির্মিত হয় ১৮৫৩ খৃষ্টাব্দে বোম্বাইতে।
ভারতের শিল্পগুলো ভেঙে নষ্ট হয়ে যাবার ফলে দেশের সর্বত্র যে নূতন অবস্থার আবির্ভাব হল তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেওয়াও পুরোনো ধরনের গ্রাম্য সমাজের পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল। তার পরে যখন দেশময় অনেক ভালো ভালো রাস্তা তৈরি হল, রেলপথ তৈরি হল, তখন তার ধাক্কার পুরোনো গ্রাম-ব্যবস্থা, এতদিন টিঁকে এসেও, এবার সম্পূর্ণভাবেই ভেঙে ধ্বসে বিনষ্ট হয়ে গেল। সমস্ত পৃথিবী তার দোরে এসে ধাক্কা দিয়েছে, সে-পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একা-একা টিঁকে থাকার সামর্থ্য আর সে ক্ষুদ্র গ্রাম্য গণতন্ত্রের রইল না। এক গ্রামে পণ্যের যে দর দাঁড়াচ্ছে তার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গেই অন্য গ্রামের পণ্যের দরকে নাড়া দিতে লাগল, কারণ এখন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে সহজেই পণ্য চালান করা যায়। এমনকি, দেখা গেল, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে যানবাহনের উন্নতি ঘটার ফলে কানাডাতে বা আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে গম কী দরে বিক্রি হল তার দ্বারাই ভারতবর্ষেও গমের বাজার-দর স্থির হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে ঘটনাচক্রের আবর্তানে ভারতবর্ষের গ্রামগুলোও সমস্ত পৃথিবীর পণ্যমূল্যের আওতায় এসে পড়ল। গ্রামের যে পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল সেটা ভেঙেচুরে খান খান হয়ে গেল; কৃষক অবাক হয়ে দেখল, কোথা থেকে একটা নূতন ব্যবস্থা এসে তার ঘাড়ে চেপে বসছে। আগে সে মাত্র তার গ্রামের বাজারের জন্যেই খাদ্যদ্রব্য ও অন্য সব জিনিষ উৎপাদন করত; এখন পণ্য উৎপাদন করতে লাগল পৃথিবীর বাজারের জন্যে। পৃথিবীব্যাপী উৎপাদন আর পণ্যমূল্যের ঘূর্ণির মধ্যে সে পড়ে গেছে, ক্রমেই সে আরও অধিকতরভাবে নীচে তলিয়ে যেতে লাগল। আগেও ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ হত—যখন মাঠের ফসল খেত নষ্ট হয়ে, অন্য কোনো খাদ্যের সংস্থান থাকত না, দেশের অন্য জায়গা থেকে খাদ্য আনাবারও ভালো ব্যবস্থা করা যেত না। সেটা ছিল খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ। এখন ঘটতে লাগল একটা অদ্ভুত ব্যাপার—খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে, হয়তো তার প্রাচুর্যও আছে, তবু তার মধ্যেও মানুষ অনাহারে মরে যাচ্ছে। ঠিক সেই জায়গাটিতে খাদ্য যদি নাও থাকে, অন্য জায়গা থেকে ট্রেনে করে বা অন্যরকমের দ্রুত যানে করে খাদ্য নিয়ে আসা সম্ভব; খাদ্য মজুত রয়েছে, কিন্তু নেই সে খাদ্য ক্রয় করবার মতো টাকা। কাজেই এই দুর্ভিক্ষ খাদ্যের নয়, এটা হচ্ছে টাকার দুর্ভিক্ষ। এর চেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার, অনেক সময়ে দেখা যাচ্ছে—ফসল খুব ভালো হয়েছে এবং শুদ্ধ তার ফলেই কৃষকের পরম দুর্দশা উপস্থিত। গত তিন বছরই এর নমুনা আমরা দেখেছি।
এমনি করে পুরোনোকালের গ্রাম-ব্যবস্থার অবসান হল; পঞ্চায়েতেরও আর অস্তিত্ব রইল না। এর জন্যে খুব বেশি পরিমাণ শোকপ্রকাশ করবার প্রয়োজন নেই; যে কালে এই ব্যবস্থাটা কার্যকরী ছিল, সে বহুদিন উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল; আধুনিক পরিবেশের সঙ্গে এর তাল মেলে নি বলেই এ টিঁকল না। কিন্তু ব্যবস্থাটা এখানে ভেঙেই পড়ল শুধু; নূতন পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে কোনো নূতনতর গ্রাম-ব্যবস্থার জন্ম হল না। এই নূতন সৃষ্টি, নূতন ব্যবস্থার কাজ এখনও বাকি রয়ে গেছে, সে ভার আমাদের উপরে। (বিদেশী শাসনের শৃঙ্খলে আমরা বাঁধা; সে শৃঙ্খল থেকে যে দিন মুক্তি পাব তার পরে আমাদের করবার কত কাজই যে জমে রয়েছে!)
জমি আর কৃষকের উপরে ব্রিটিশ নীতির পরোক্ষ ফল কী হয়েছে তারই আলোচনা এতক্ষণ করলাম। এই পরোক্ষ ফলগুলোই যথেষ্ট পরিমাণে সাংঘাতিক। এবারে দেখা যাক, জমি সম্বন্ধে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বাস্তব নীতিটা কী ছিল—যে নীতির ফল প্রত্যক্ষভাবে কৃষককে এবং জমির সঙ্গে যাদের সম্পর্ক ছিল তাদের সকলকেই ভুগতে হয়েছে। আলোচনাটা জটিল, এবং বেশ একটু নিরস। কিন্তু আমাদের সমস্ত দেশটাই এই দরিদ্র কৃষকে পরিপূর্ণ; তাদের কী কী অভিযোগ, কী করে আমরা তাদের কিছু কাজে লাগতে পারি, তাদের ভাগ্যকে একটু ভালো করে তুলতে পারি, সেটা জানবার জন্যে একটু কষ্ট স্বীকার আমাদের করতেই হবে।
জমিদার, তালুকদার, প্রজা—এই নামগুলো আমরা শুনি। প্রজা হয় অনেক রকমের; আবার কোল-রায়ত, মানে প্রজার প্রজাও আছে। এর সমস্ত খুঁটিনাটি তত্ত্বের গোলকধাঁধায় আমি তোমাকে ফেলব না। মোটামুটি বলা যায়, এখনকার জমিদাররা হচ্ছেন মধ্যস্থ দালাল, মানে কৃষক এবং রাষ্ট্রের মাঝখানে আছেন এঁরা। কৃষক এঁদের প্রজা, জমি ব্যবহারের দরুন সে এদের খাজনা বা একরকমের কর দেয়; কারণ জমিটাকে জমিদারের সম্পত্তি বলেই ধরে নেওয়া হয়। এই খাজনা থেকে একটা অংশ জমিদার রাজস্ব বলে রাষ্ট্রকে দিয়ে দেন, তাঁর নিজের হাতে যে জমি রয়েছে তার কর বাবদ এইভাবে জমি থেকে উৎপন্ন ফসল তিন ভাগ হয়ে যাচ্ছে—একটা অংশ নেন জমিদার, একটা পায় রাষ্ট্র, আর বাকি একটা অংশ থেকে যায় কৃষক-প্রজার ভাগে। এই তিনটি অংশই যে সমান এমন মনে করো না। কৃষক জমি চাষ করে, জমিতে যা-কিছু ফসল হয় তা তারই শ্রমের—চাষ বপন এবং আরও নানারকম কাজের ফলে। তার শ্রমের এই ফল ভোগ করার অধিকার স্বভাবতই তার নিজের। রাষ্ট্র সমগ্র সমাজের প্রতিনিধি; সমস্ত প্রজার কল্যাণের জন্য তাকে কতকগুলো দরকারি কাজ করতে হয়, যেমন—সমস্ত ছেলেপিলেদের শিক্ষার ব্যবস্থা সে করবে, ভালো ভালো রাস্তাঘাট তৈরি ও অন্যান্য যানবাহনের ব্যবস্থা করবে, হাসপাতাল বসাবে, স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা করবে, পার্ক ও যাদুঘর তৈরি করবে, আরও নানারকমের কত কাজকর্ম তাকে করতে হবে। এর জন্যে তার টাকা চাই, এবং জমির যা ফসল হয় তা থেকে একটা অংশ সে আদায় করে নেবে এটাও ন্যায্য কথা। সে অংশ কতখানি হবে, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা প্রশ্ন। রাষ্ট্রকে প্রজা যা দেয় সেটা বস্তুত তার কাছেই আবার ফিরে চলে আসে, অন্তত আসা উচিত—রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য-বিধান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রতিভূ হচ্ছে একটা বিদেশী সরকার, কাজেই আমরা স্বভাবতই এই রাষ্ট্রকে ভালো চোখে দেখছি না। কিন্তু স্বাধীন ও যথাযথভাবে সুসংহত যে দেশ, সেখানে রাষ্ট্র বলতে সমস্ত প্রজাকেই বোঝায়।
জমির ফসলের দুটো অংশের বিলি আমরা করলাম—একটা অংশ পাচ্ছে কৃষক, আর একটা পাচ্ছে রাষ্ট্র। আমরা দেখেছি, তৃতীয় একটা অংশ চলে যাচ্ছে জমিদার বা মধ্যস্থ দালালের হাতে। এমন কী কাজ তিনি করেন যার দরুন এটা তিনি পান বা পেতে পারেন? একেবারে কিছুই নয়, বা বস্তুত প্রায় কিছুই নয়। উৎপাদনের কাজে কিছুমাত্র সাহায্য করেন না তিনি, অথচ না করেই তাঁর খাজনা বলে ফসলের একটা বৃহৎ অংশকে নিয়ে নিচ্ছেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে, গাড়ির তিনি হয়ে আছেন একটি পঞ্চম চাকা—অপ্রয়োজনীয় শুধু নয়, রীতিমতো একটা জঞ্জাল, জমির উপরে একটা বৃহৎ বোঝা। আর এই অনাবশ্যক বোঝার ভার সবচেয়ে বেশি পীড়ন করছে যাকে সে হচ্ছে চাষি স্বয়ং—নিজের আয়ের একটা অংশ তাকে এঁর হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। এই জন্যই অনেকে মনে করেন, জমিদার বা তালুকদার একটা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক মধ্যস্থ ব্যক্তি। জমিদারি প্রথাটাই খারাপ, এবং এটাকে এমন ভাবে বদলে ফেলতে হবে যেন এই মধ্যস্থ ব্যক্তিরা একেবারেই লোপ পেয়ে যায়।
বাঙলা, বিহার, যুক্তপ্রদেশ, প্রধানত ভারতবর্ষের এই তিনটি প্রদেশেই বর্তমানে জমিদারি প্রথা প্রচলিত আছে।
অন্য সব প্রদেশে এরকম কোনো মধ্যস্থ দালাল নেই, চাষি-প্রজা সাধারণত তাদের ভূমি-রাজস্বটা সরাসরিই রাষ্ট্রকে দিয়ে দেয়। সাধারণত এদের বলা হয় কৃষক ভূস্বামী; কোথাও-বা বলা হয় জমিদার, যেমন পাঞ্জাবে। কিন্তু যুক্তপ্রদেশ, বাঙলা ও বিহারের বড়ো বড়ো জমিদার আর এরা কিন্তু এক নয়।
এই দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে, এবার আমি তোমাকে আর একটি কথা বলব। বাংলা, বিহার ও যুক্তপ্রদেশে যে জমিদারি প্রথা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, যাকে নিয়ে আজকাল এত আলোচনা আন্দোলন চলেছে, সেটা ভারতবর্ষে একেবারেই একটা নূতন বস্তু। এর সৃষ্টি করেছে ব্রিটিশরা, তাদের আসবার আগে এর অস্তিত্ব ছিল না।
প্রাচীনকালে এ দেশে এরকম কোনো জমিদার, ভূস্বামী বা মধ্যস্থ মালিক ছিল না। চাষিরা তাদের ফসলের একটা অংশ সোজাসুজি রাষ্ট্রকে দিয়ে দিত। অনেক সময় গ্রাম্য পঞ্চায়েত গ্রামের সমস্ত চাষির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত। আকবরের কালে তাঁর বিখ্যাত রাজস্ব-মন্ত্রী ছিলেন রাজা টোডরমল; তিনি খুব ভালো করে সমস্ত দেশটার একটা জরিপ করিয়ে নিলেন। চাষির কাছ থেকে সরকার বা রাষ্ট্র ফসলের এক-তৃতীয়াংশ আদায় করে নিত; চাষি ইচ্ছে করলে নগদ টাকাতেও রাজস্ব জমা দিতে পারত। মোটের উপর, প্রজার উপরে করের বোঝা খুব বেশি ছিল না; করের চাপ বাড়ানোও হত খুব আস্তে আস্তে। তার পর মোগল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল। কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তি কমে গেল, সে আর ঠিকমতো রাজস্ব আদায় করতে পারে না। তখন রাজস্ব আদায়ের একটা নূতন পন্থা আবিষ্কার করা হল। কর আদায়ের জন্যে কর্মচারী নিযুক্ত হতে লাগল; এরা মাইনে পাবে না, পাবে আয়ের অংশ; যা কর আদায় করল তার দশ ভাগের এক ভাগ এরা নিজের পারিশ্রমিক বলে নিয়ে নেবে। এদের নাম দেওয়া হল রাজস্ব-ঠিকাদার। অনেক সময়ে জমিদার বা তালুকদারও এদের বলা হত। কিন্তু মনে রেখো, আজকাল এই নাম বলতে যা বোঝায় তখন তা বোঝাত না।
কেন্দ্রীয় সরকার ধ্বংসের পথে যত এগিয়ে চলল, রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাটাও ততই আরও খারাপ হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা দাঁড়াল, এক-একটা অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের ঠিকাদারি কাজটাকেই নিলামে তুলে দেওয়া হত; যে সবচেয়ে বেশি দর দেবে সেই এই পদ পাবে। তার মানে হল, যে লোকটি এই পদ কিনে নিল, দুর্ভাগা প্রজাকে শোষণ করে যতখানি সম্ভব আদায় করে নেবারও পুরো স্বাধীনতা সে পেয়ে যেত, এবং এই ক্ষমতার ব্যবহারও এরা যথাসাধ্য করত। এদের আবার এই পদ থেকে সরিয়ে দেবার মতো শক্তি সরকারের ছিল না, ফলে এই রাজস্ব-ঠিকাদারের পদটা ক্রমে পুরুষানুক্রমিক হয়ে উঠল।
বাঙলাদেশে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি প্রথম যে তথাকথিত আইনসম্মত অধিকার পেল, বাস্তবিকপক্ষে সেটাও ছিল মোগল সম্রাটের নামে এই রাজস্ব আদায়ের ঠিকাদারি মাত্র। ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে কোম্পানিকে দেওয়ানি মঞ্জুর করা হয়। এর ফলে কোম্পানি দিল্লির মোগল সম্রাটের অধীনস্থ দেওয়ান বলে গণ্য হল। কিন্তু আসলে এর সবই ছিল কথার ফাঁকি। ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে পলাশির যুদ্ধ হল, তার পর থেকেই বাঙলাদেশে ব্রিটিশরা সর্বেসর্বা হয়ে উঠল, বেচারি মোগলসম্রাটের প্রায় কোথাও কোনো ক্ষমতাই আর থাকল না।
ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি আর তার কর্মচারীরা সকলেই ছিল ভয়ংকররকম অর্থলোভী। এরা বাঙলাদেশের রাজকোষ শূন্য করে দিল, যেখানে যার হাতে টাকার সন্ধান পেল তাই জোরজবরদস্তি করে কেড়ে নিতে লাগল। বাঙলা ও বিহার প্রদেশকে নিংড়ে যতখানি সম্ভব রাজস্ব আদায় করে নিতে এরা চেষ্টা করল। ছোটো ছোটো অনেক রাজস্ব-ঠিকাদার খাড়া করল, তাদের উপরে ধার্য রাজস্বের পরিমাণ অত্যন্ত বেশিরকম বাড়িয়ে দিল। খুব অল্পকালের মধ্যেই ভূমি-রাজস্বের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেওয়া হল। এই রাজস্ব আদায় করাও হত একেবারে নিমর্মভাবে, ঠিক সময়মতো যে রাজস্ব জমা দিতে পারত না তারই জমি কেড়ে নেওয়া হত। রাজস্ব-ঠিকাদাররাও আবার তেমনিভাবে চাষির উপরে উৎপীড়ন ও লুণ্ঠন চালাতে লাগল, রাজস্বের নামে তাদের যথাসর্বস্ব শুষে নেওয়া হল, জমি থেকে তাদের উৎখাত করে তাড়ানো হতে লাগল। পলাশির যুদ্ধের পর বারো বছরও কাটল না, দেওয়ানি পাবার পর চার বছরও পার হল না—এক দিকে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির এই রাজনীতি আর-এক দিকে অনাবৃষ্টি, দুয়ে মিলে বাঙলা আর বিহার জুড়ে এক ভয়ানক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করল। এই দুর্ভিক্ষে এদের মোট প্রজার এক-তৃতীয়াংশ মারা গেল। এর আগের একটা চিঠিতে আমি তোমাকে এই ১৭৬৯-৭০ খৃষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষের কথা বলেছি। এও বলেছি যে, এই দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তার রাজস্ব একেবারে পুরোমাত্রায় আদায় করে চলেছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা এই কাজে যে অপূর্ব দক্ষতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেখিয়েছিল তার জন্যে তাদের নাম সসম্মানে স্মারণ করবার যোগ্য হয়ে আছে! কোটি কোটি মানুষ, স্ত্রীপুরুষশিশু মারা গেছে; তা যাক, তবু সেই মৃতদেহগুলোর কাছ থেকেও তারা টাকা আদায় করে নিচ্ছিল—ইংলণ্ডের বড়ো বড়ো ধনী ব্যক্তিরা বয়েছেন, তাঁদের প্রাপ্য মুনাফা ঠিকমতো মিটিয়ে দিতে হবে তো!
আরও কুড়ি বছর বা তারও বেশিকাল ধরে এই ব্যাপার চলল। দুর্ভিক্ষের মধ্যেও ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি টাকা আদায় করতে লাগল, সোনার দেশ বাঙলা শ্মশান হয়ে গেল। বড়ো বড়ো রাজস্ব-ঠিকাদাররা পর্যন্ত ভিখারি হয়ে গেল; গরিব চাষিদের অবস্থা কী দাঁড়াল তা এর থেকেই ধারণা করা যায়। অবস্থা ক্রমে এত খারাপ হয়ে উঠল যে, শেষ পর্যন্ত ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিরও ঘুম ভাঙল, তারা এই দোষ সংশোধনের চেষ্টা শুরু করল। এই সময়ে গভর্নর-জেনারেল ছিলেন লর্ড কর্ণওআলিশ, তিনি নিজেও ছিলেন ইংলণ্ডের একজন বড়ো ভূস্বামী। তিনি চাইলেন, এ দেশেও ব্রিটেনের মতো একদল ভূস্বামী সষ্টি করে দেবেন। কিছুদিন থেকে রাজস্ব-ঠিকাদাররা ঠিক ভূস্বামীর মতোই আচরণ করছিল। কর্নওআলিশ এদের সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত করে ফেললেন। ভূস্বামী বলেই এদের স্বীকার করে নিলেন। এর ফলে সেই প্রথম, ভারতবর্ষে এই নূতন ধরনের ভূস্বামীর আবির্ভাব ঘটল; চাষিরা হয়ে গেলে একেবারেই এদের অধীনস্থ প্রজা মাত্র। ব্রিটিশ সরকার এই ভূস্বামী বা জমিদারদের কাছ থেকে সোজাসুজি রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করে নিল। প্রজাদের সঙ্গে যা-খুশি তাই ব্যবস্থা করে নেবার স্বাধীনতা এদের দিয়ে দেওয়া হল। ভূস্বামীর অত্যাচার আর শোষণ থেকে রক্ষা পাবার কোনো উপায়ই আর গরিব প্রজার থাকল না।
১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে বাঙলা ও বিহারের জমিদারদের সঙ্গে কর্নওআলিশ এই বন্দোবস্ত করেন, একে বলা হয় ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’। ‘বন্দোবস্ত’ কথাটার মানে হচ্ছে, কোন, জমিদার সরকারকে কত টাকা ভূমি-রাজস্ব দেবে তার পরিমাণ নির্ধারণ। বাঙলায় ও বিহারে এই রাজস্বের পরিমাণ একেবারে চিরকালের মতো স্থির করে দেওয়া হল; এর আর কোনো দিন কোনো নড়চড় হবে না। এর পরে উত্তর-পশ্চিমে অযোধ্যা এবং আগ্রাতে ব্রিটিশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল, ব্রিটিশের নীতিও তখন বদলে নেওয়া হল। সেখানে তারা জমিদারদের সঙ্গে বাঙলাদেশের মতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করলেন না, করলেন ‘মেয়াদী বন্দোবস্ত’। প্রত্যেক মেয়াদী বন্দোবস্তই একটা নির্দিষ্ট কাল অন্তর অন্তর—সাধারণত এর সময় ছিল ত্রিশ বছর—নূতন করে স্থির করা হত, ভূমি-রাজস্ব বাবদ জমিদারের কত দিতে হবে তার পরিমাণও নূতন করে ধার্য করে দেওয়া হত। প্রত্যেক নূতন বন্দোবস্তেই সাধারণত রাজস্বের পরিমাণ কিছু বেড়ে যেত।
দক্ষিণ ভারতে, মাদ্রাজ ও তার কাছাকাছি অঞ্চলে, জমিদারি প্রথা ছিল না। সেখানে প্রজাই ছিল ভূস্বামী; ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিও সরাসরি প্রজার সঙ্গেই বন্দোবস্ত করলেন। কিন্তু সমস্ত জায়গার মতো সেখানেও তাঁদের অপরিসীম অর্থলোভ প্রকট হয়ে উঠল; কোম্পানির কর্মচারীরা অত্যন্ত উঁচু হারে ভূমি-রাজস্ব ধার্য করে দিলেন এবং সে রাজস্ব অতি নিষ্ঠুরভাবে আদায় করা হতে লাগল। রাজস্ব না দিলে প্রজার জমি তৎক্ষণাৎ কেড়ে নেওয়া হত। কিন্তু সে বেচারি যাবে কোথায়? জমির উপরে বহু লোক নির্ভর করে আছে, ফলে জমির জন্যে রয়েছে কাড়াকাড়ি। বহু অন্নহীন মানুষ সর্বদাই মিলত, যারা যে-কোনো শর্তে জমি বন্দোবস্ত নিতে রাজি আছে। এর ফলে প্রায়ই বিশৃংখলার সৃষ্টি হত; চিরকাল কষ্ট সয়ে সয়ে নিরীহ প্রজারও শেষে এক-এক সময়ে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেত, তখন হত কৃষক-বিদ্রোহ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বাংলাদেশে আর-একটি নূতন ধরনের অত্যাচার শুরু হল। কতকগুলো ইংরেজ এ দেশে এসে ভূস্বামী হয়ে বসল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নীলের ব্যবসা করা। এরা এদের প্রজাদের সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর শর্তে নীলচাষের ব্যবস্থা করে নিল। প্রজা তার জমির একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশে নীলের চাষ করতে বাধ্য থাকবে, এবং তার পর সেই নীল তাকে তার ইংরেজ-ভূস্বামীর কাছে একটা নির্দিষ্ট দরে বেচতে হবে। এই ভূস্বামীদের নাম ছিল নীলকর। এই প্রথাটাকে বলা হত ‘নীলকর-প্রথা’। প্রজাদের উপরে যেসমস্ত শর্ত দেওয়া হত তা এত কঠিন যে, তা যথাযথ পালন করা প্রজার পক্ষে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে উঠত। এর উপর আবার ব্রিটিশ সরকার এলেন নীলকরদের সাহায্য করতে। এমনসব বিশেষ রকমের আইনকানুন তৈরি করে দিতে লাগলেন যার ফলে গরিব প্রজা শর্তের কথা অনুযায়ী নীলের চাষ করতে বাধ্য হত। এইসমস্ত আইন এবং এদের অন্তর্গত শাস্তি-ব্যবস্থার ফলে এই নীলকরদের প্রজারা অনেক ব্যাপারে একেবারে নীলকরদের দাস বা ভূমিদাসে পরিণত হয়ে গেল। নীলকুঠির কর্মচারীদের নামেই এরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যেত, কারণ সে ইংরেজ বা ভারতীয় কুঠিয়ালরা কিছুরই পরোয়া করে চলত না, স্বয়ং সরকার বাহাদুর ছিলেন তাদের রক্ষক। অনেক সময় নীলের বাজারদর নেমে যেত; প্রজার পক্ষে তখন ধান বা ঐরকম অন্য কোনো ফসলের চাষ করায় অনেক বেশি লাভ; কিন্তু সে চাষ করবার অধিকার তাদের থাকত না। চাষির দুঃখদুর্দশার আর অন্ত রইল না। শেষে এক দিন অত্যাচারে অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়ে সেই নিরীহ কেঁচোও ফণা তুলে উঠল। নীলকরদের বিরুদ্ধে চাষিরা বিদ্রোহ করল, একটা নীলকুঠি তারা লুট করে নিল। সে বিদ্রোহ দমন করা হল অত্যন্ত কঠোর হস্তে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে দেশে কৃষকদের অবস্থা কেমন ছিল তার একটা চিত্র আমি এই চিঠিতে তোমাকে দিতে চেষ্টা করলাম—হয়তো একট বেশি লম্বাই হয়ে গেল চিঠিটা। আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি কীরকম করে ভারতের চাষির অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়ে এসেছে; কীরকম করে যে যে দিক দিয়ে তার সংস্পর্শে এসেছে, সকলেই তাকে খানিকটা শুষে নেবার ব্যবস্থা করেছে— রাজস্ব-আদায়কারী, ভূস্বামী, বেনিয়া, নীলকর ও তার কর্মচারী, এবং সকলের চেয়ে বড়ো বেনিয়া ব্রিটিশ সরকার স্বয়ং—কখনও ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মারফত পরোক্ষভাবে, কখনও সোজাসুজিই। তার কারণ, এইসমস্ত শোষণেরই মূলে ছিল ভারতে ব্রিটিশদের নীতি, এই নীতি এরা সংকল্প করেই চালাচ্ছিল। কুটিরশিল্পগুলোকে ভেঙে নষ্ট করে দেওয়া হল, তার জায়গাতে নূতনরকম শিল্প গড়ে তোলার কোনো চেষ্টাই করা হল না; বেকার শিল্পীকে তাড়া করে গ্রামে ফিরিয়ে নেওয়া হল, এবং তার ফলে জমির উপরে প্রজার চাপ ক্রমেই বাড়তে লাগল; ভূস্বামী প্রথা ও নীলকর-প্রথার আমদানি করা হল; ভূমি রাজস্বের পরিমাণ অত্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে প্রজার উপরেও অত্যন্ত বেশি হারে খাজনা ধরা হল এবং সেটা নির্মমহস্তে আদায় করা হতে লাগল। দারিদ্র্যের চাপে প্রজা বাধ্য হয়ে বেনিয়া মহাজনদের কাছে টাকা ধার করলে এবং তার লৌহমুষ্টি থেকে আর কোনোদিনই সে নিজেকে মুক্ত করতে পারল না। যথাসময়ে খাজনা ও রাজস্ব দিতে না পারার দরুন অসংখ্য প্রজাকে জমি থেকে উৎখাত করে দেওয়া হল এবং সকলের উপরে পুলিশ, তহশিলদার, জমিদারের গোমস্তা আর নীলকরের গোমস্তা, সবাই মিলে প্রজার চার দিকে এমনই একটা স্থায়ী বিভীষিকার রাজত্ব গড়ে তুলল যে, তার মন বা আত্মা বলতে যেখানে যেটুকু ছিল সমস্ত ভেঙে মরে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। অপরিহার্য দুর্দশা এবং ভয়াবহ সর্বনাশ ছাড়া এর ফল কী হওয়া সম্ভব?
এক-একটা ভয়ানক দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ লোক মারা গিয়েছে। এবং এইটেই আশ্চর্য, যখন দেশে খাদ্যের অভাব, খাদ্য না পেয়ে যখন বহু লোক শুকিয়ে মরে যাচ্ছে, এমন সময়েও এ দেশ থেকে গম ও অন্যান্য খাদ্যশস্য অন্য দেশে চালান হয়ে গিয়েছে। বড়োলোক বণিকের লাভ করা চাই তো? সত্যিকার দুর্দশা ঘটেছে খাদ্যের অভাবে নয়, খাদ্য হয়তো দেশের অন্য স্থান থেকে ট্রেনে করে আনা যেত। লোক মরেছে সে খাদ্য কিনবার অর্থের অভাবে। ১৮৬১ খৃস্টাব্দে উত্তর ভারতে, বিশেষ করে আমাদের এই প্রদেশে একটা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হল; শোনা যায়, সে দুর্ভিক্ষে সমস্ত অঞ্চলটির মোট লোকসংখ্যার মধ্যে শতকরা ৮১২ জনই মারা গিয়েছিল। পনরো বছর পরে, ১৮৭৬ সনে, এবং তার পর পুরো দু বছর ধরে আর-একটা ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়। এর ক্ষেত্র ছিল উত্তর মধ্য এবং দক্ষিণ-ভারত। এবারেও সবচেয়ে বেশি লোক মরল যুক্তপ্রদেশে; মধ্যপ্রদেশে এবং পাঞ্জাবের কতক অংশেও বহু লোক মারা গেল। এই দুর্ভিক্ষে মোট লোক মরেছিল প্রায় এক কোটি! এর কুড়ি বছর পরে ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে প্রায় এই একই অঞ্চলে আবার দুর্ভিক্ষ হয়; ভারতবর্ষের ইতিহাসে তার চেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আর হয় নি। এই সাংঘাতিক দুর্দৈবের ফলে উত্তর ও মধ্য ভারত একেবারেই নিঃস্ব সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। ১৯০০ খৃস্টাব্দেও আবার দুর্ভিক্ষ হয়।
চল্লিশ বছরের মধ্যে চারটি বিরাট দুর্ভিক্ষ হয়েছে। একটিমাত্র ছোট্ট অনুচ্ছেদের মধ্যে তোমাকে তার হিসেব দিলাম। এই ইতিবৃত্তের মধ্যে যে কতখানি দুঃখদুর্দশা আর বিভীষিকার কাহিনী লুকিয়ে আছে তার বর্ণনা আমি তোমাকে দিতে পারব না, তুমিও সে বুঝবে না। বস্তুত তুমি তা বুঝতে পার এও বোধ হয় আমি ঠিক চাই নে; কারণ, বুঝলে তোমার মন ভরে উঠবে ক্রোধে আর অপরিসীম বিদ্বেষে। এই বয়সেই তোমার মন বিদ্বেষে ভরে যাক, এ আমি চাই নে।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নাম শুনেছ তুমি—এই মহীয়সী ইংরেজ মহিলাই প্রথম যুদ্ধে আহত সৈনিকদের শুশ্রূষার সুব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বহুকাল পূর্বে, ১৮৭৮ খৃস্টাব্দে তিনি লিখেছিলেন: “পূর্বাঞ্চলে—কেবল পূর্বাঞ্চলে নয়, সম্ভবত সমস্ত পথিবীতেই—সর্বাপেক্ষা করুণ দৃশ্য যা মানুষের চোখে পড়ে, সে হচ্ছে আমাদের প্রাচ্য-সাম্রাজ্যের কৃষকের আকৃতি।” বলেছিলেন, “আমাদের রচিত আইনগুলোর ফলে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উর্বর দেশে সৃষ্টি হচ্ছে একটা প্রাণহারী স্থায়ী অর্ধ-অনশনের—এমন বহু স্থানে, যেখানে তথাকথিত দুর্ভিক্ষের অস্তিত্বমাত্র নেই।”
সত্যই তো, আমাদের কৃষাণদের চোখ গেছে গর্তে ঢুকে, সে চোখে ভীত আশাহীন দৃষ্টি—এর চেয়ে আর মর্মান্তিক দৃশ্য কী হতে পারে। এই এতকাল ধরে শোষণের কী বিপুল বোঝাই না আমাদের চাষিরা বহন করে এসেছে! আর এ কথা যেন না ভুলি, আমরা যারা তাদের চেয়ে একটু সচ্ছল অবস্থায় আছি তার সেই বোঝারই অন্তর্গত। কী দেশী কী বিদেশী, সকলেই আমরা এই চিরপীড়িত কৃষাণকে শুষে মোটা হবার চেষ্টা করেছি, তার কাঁধে চেপে বসে আছি। বোঝার চাপে তার সে কাঁধ যদি ভেঙেই পড়ে, আশ্চর্য হবার কী আছে
কিন্তু সব শেষে এতকাল পরে তার জন্যে বুঝি এসেছে একটুখানি আশার আলো, এল বুঝি শুভ দিনের আভাস, এল দুঃখমোচনের আশ্বাস। একজন ছোট্ট মানুষ এসে দাঁড়ালেন তার সামনে; সহজ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন একেবারে তার চোখের মধ্যে, তার বিশীর্ণ সংকুচিত অন্তরের অন্তস্তলে; তার দীর্ঘকাল সঞ্চিত বেদনাকে নিলেন অনুভব করে। তাঁর সে দৃষ্টিতে ছিল যাদু; তাঁর স্পর্শে ছিল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ; তাঁর কণ্ঠম্বরে ছিল সহানভূতি, ছিল আগ্রহ, ছিল অসীম প্রেম, ছিল মৃত্যুপণ-করা বিশ্বাস। তাঁর দিকে চেয়ে দেখল, তাঁর কথা শুনল চাষি, শুনল মজুর—যারা এতদিন পায়ের তলায় ছিল পড়ে, শুনল তারা সবাই; তাদের মৃত প্রাণ আবার নূতন করে বেঁচে উঠল রোমাঞ্চিত হয়ে, অপূর্ব এক আশা তাদের মধ্যে জেগে উঠল, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে তারা হেঁকে বললে, “মহাত্মা গান্ধীকি জয়!” উৎপীড়নের অবসাদের গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে পা বাড়াল তারা। কিন্তু যে প্রাচীন যন্ত্র এতকাল ধরে তাদের পিষে এসেছে সেও তো অত সহজে তাদের ছেড়ে দেবে না! সে যন্ত্র আবার নড়ে উঠল, তৈরি করতে লাগল নূতন নূতন অস্ত্র; তাদের পিষে ফেলবার জন্যে কত নূতন নূতন আইন আর অর্ডিন্যান্স, বাঁধবার জন্যে কত নূতন ধরনের শৃঙ্খল। তার পর? কী হল তার পরে? সেটা আমার আজকের গল্প বা কাহিনীর অন্তর্গত নয়। সেটা আগামী কালের কথা; সেই কাল যখন আজ হয়ে উঠবে তখনই সেটা জানতে পাব আমরা। কিন্তু তার সম্বন্ধে কি সংশয় আছে কারও মনে!