বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ভারতের শিল্পজীবীদের দুর্দশা

উইকিসংকলন থেকে

১১০

ভারতের শিল্পজীবীদের দুর্দশা

১লা ডিসেম্বর, ১৯৩২

 ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমাদের দেশে যেসব যদ্ধবিগ্রহ হয়েছিল সেসবের কথা বলা হল। এখন আমরা ঐ সময়কার অন্যান্য ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব। এক দিক থেকে সেগুলি যুদ্ধবিগ্রহের চেয়েও বড়ো ঘটনা। মনে রাখতে হবে যে, সেসব যুদ্ধে লাভ হয়েছে ইংলণ্ডের, কিন্তু তার ব্যয় বহন করতে হয়েছে ভারতবর্ষের। ইংরেজরা বারবার এই চালাকিটি করে এসেছে। যুদ্ধ করে তারা ভারতবর্ষকে জয় করেছে, আবার ভারতবাসীদের কাছ থেকেই তার খরচা উশুল করেছে। এমনকি আশপাশের রাজ্য—যেমন, ব্রহ্মদেশ কিংবা আফগানিস্থান—যাদের সঙ্গে কোনোকালে আমাদের ঝগড়া বিবাদ ছিল না, তাদের সঙ্গে ইংরেজ যখন যুদ্ধ করেছে তখনও ভারতবাসীকে রক্ত এবং অর্থ দিয়ে তার যুদ্ধজয়ে সহায়তা করতে হয়েছে। যুদ্ধবিগ্রহের সময় ধনসম্পত্তির ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী, সুতরাং এসব যুদ্ধে ভারতবর্ষের যথেষ্ট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া যুদ্ধের পরে বিজেতারা আবার পরাজিতের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় করে থাকে, ইতিপূর্বে সিন্ধুদেশে আমরা এর দৃষ্টান্ত দেখেছি। নানা কারণে দেশের সম্পদ বহুল পরিমাণে নষ্ট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দেশের সোনা রুপো পূর্ববৎ অকাতরে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির জঠরে পিয়ে প্রবেশ করতে লাগল এবং কোম্পানির অংশীদারদের মোটা লাভ ক্রমেই মোটা হয়ে উঠল।

 তোমাকে বোধকরি আগেই বলেছি যে, ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকে ইংরেজ বণিকদেরই ছিল আধিপত্য। এরা এক দিকে ব্যবসা করেছে, আর-এক দিকে নির্বিচারে টাকা লুটেছে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্তারা কত যে টাকা লুট করেছে তার পরিমাণ করা দুঃসাধ্য। ভারতবর্ষের দিক থেকে এক কাণাকড়িও লাভ হয় নি। সাধারণত ব্যবসার বেলায় লাভালাভটা দু পক্ষেই ভাগাভাগি হয়, কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ অর্থাৎ পলাশির যুদ্ধের পর থেকে লাভের অংশটা ষোলো আনাই গিয়েছে ইংলণ্ডের হাতে। এইভাবে ভারতবর্ষের বহু সম্পদ নষ্ট হল, আর সেই অর্থে ইংলণ্ডের শিল্পবাণিজ্য হূ হূ করে বেড়ে চলল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এই ধরনের একতরফা ব্যবসা আর নির্লজ্জ লুটপাট চলেছিল।

 ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ রাজত্বের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু। এখন থেকে ভারতবর্ষকে তারা কাঁচামাল সরবরাহের একটি বিরাট কেন্দ্ররূপে ব্যবহার করতে লাগল। সেসব মাল তাদের কারখানায় প্রেরিত হত। ক্রমে তাদের কারখানা-জাত দ্রব্যাদি এসে ভারতবর্ষের বাজার ছেয়ে ফেলল। এর ফলে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেল। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি যদিচ একটি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান মাত্র, তথাপি ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ দেশের শাসনভার তাদেরই উপর ন্যস্ত ছিল। অবশ্য, ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের দৃষ্টি ক্রমশই এ দিকে বেশি করে আকৃষ্ট হচ্ছিল। তার পরে ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে হল বিদ্রোহ। সে কথা তোমাকে গত চিঠিতে লিখেছি। বিদ্রোহের পরে ব্রিটিশ গভর্মেণ্ট ভারতবর্ষের শাসনভার সরাসরি নিজের হাতে নিয়ে নিল। কিন্তু তাতে শাসনপ্রণালীর কোনোই পরিবর্তন হল না। কারণ, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্ব যে ধনিকশ্রেণীর হাতে ছিল, ব্রিটেনের শাসনক্ষমতাও তাদেরই হস্তগত ছিল।

 ভারতবর্ষ এবং ইংলণ্ডের মধ্যে আর্থিক ক্ষেত্রে একের স্বার্থ অপরের স্বার্থের বিরোধী হতে বাধ্য। যখনই স্বার্থের সংঘাত ঘটেছে তখনই লাভের দিকটা ষোলো আনা ইংলণ্ডের পক্ষে গিয়েছে; কারণ, সর্ব ক্ষমতা তাদেরই হাতে ছিল। ইংলণ্ডে যখন শিল্পের প্রসার মোটে শুরু হয় নি তখনই একজন বিখ্যাত ইংরেজ লেখক ভারতে কোম্পানির শাসনের কুফল সম্বন্ধে উল্লেখ করেছিলেন। এঁর নাম অ্যাডাম স্মিথ, বলতে গেলে ইনিই অর্থনীতি-শাস্ত্রের জনক। ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘দি ওয়েল্‌থ্ অব নেশন্‌স্’ নামক সুবিখ্যাত গ্রন্থে তিনি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি সম্বন্ধে নিম্নলিখিত মন্তব্য করেছিলেন:

 “কেবলমাত্র কোনো বণিক-প্রতিষ্ঠানের দ্বারা পরিচালিত যে শাসনব্যবস্থা তার চেয়ে নিকৃষ্ট ব্যবস্থা আর হতে পারে না।...... শাসকহিসেবে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্তব্য, ইউরোপীয় দ্রব্যাদি ভারতবর্ষে নিয়ে যতটা সম্ভব শস্তা দরে বিক্রি করা আর ভারতীয় দ্রব্য এ দেশে এনে যথাসম্ভব উঁচু দরে বিক্রি করা। কিন্তু বণিক হিসেবে ঠিক এর উল্টোটা করাই তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। শাসক হিসেবে এদের মনে রাখা উচিত যে, শাসিতের কল্যাণেই শাসকের কল্যাণ। কিন্তু বণিকের স্বার্থ ঠিক তার উল্টো।”

 তোমাকে পূর্বেই বলেছি, ইংরেজ যখন এ দেশে আসে তখন আমাদের পুরোনো সামন্ততন্ত্র ভাঙতে শুরু করেছে। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের ফলে ভারতবর্ষের নানা অংশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষ তার কৃষিজাত শিল্পজাত দ্রব্যাদির জন্য যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছিল। এখানকার তাঁতে প্রস্তুত বস্ত্রাদি এশিয়া এবং ইউরোপের দেশসমূহে রপ্তানি হত। ভারতবর্ষের একজন বিখ্যাত অর্থনীতিজ্ঞ রমেশচন্দ্র দত্ত এসব কথা লিখে গিয়েছেন। পূর্ববর্তী কোনো কোনো চিঠিতে তোমাকে বলেছি যে, বহু প্রাচীন কালেও ভারতীয় বণিকরা বিদেশে বাণিজ্যবিস্তার করেছিল। চার হাজার বৎসর পূর্বে, মিশরের মমী ভারতীয় মসলিনের দ্বারা আবৃত হত। ভারতীয় শিল্পজীবীদের খ্যাতি প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য-দেশসমূহে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি রাজনৈতিক পতনের পরেও এইসব শিল্পজীবীরা বহুকাল তাদের শিল্পদক্ষতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। ইংরেজ এবং অন্যান্য বিদেশী বণিকরা যখন এ দেশে আসত তখন নিজেদের জিনিষ বিক্রি করতে আসত না, এ দেশ থেকে সুদৃশ্য দ্রব্যাদি নিয়ে গিয়ে নিজের দেশে বিক্রি করত আর প্রচুর লাভ করত। ইউরোপীয় বণিকরা প্রথমটায় কাঁচা মালের লোভে এ দেশে আসে নি, এসেছিল শিল্পজাত দ্রব্যের লোভে। এ দেশ জয় করবার আগে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রধান ব্যবসা ছিল ভারতে প্রস্তুত সুতোর, পশমের এবং রেশমের বস্ত্র নিজ দেশে নিয়ে বিক্রি করা। বিশেষ করে বয়নশিল্পেই ভারতবর্ষ বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেছিল। রমেশচন্দ্র দত্ত বলেছেন, “বয়নশিল্পই তখন আমাদের জাতীয় শিল্প ছিল, এবং মেয়েরা ঘরে ঘরে চরকায় সুতো কাটত।” ভারতীয় বস্ত্র শুধু ইংলণ্ডে নয়, ইউরোপের অন্যান্য দেশেও যেত। তা ছাড়া, চীন জাপান ব্রহ্মদেশ আরব পারশ্য এবং আফ্রিকার কোনো কোনো অংশে ভারতীয় বস্ত্রের প্রচলন ছিল।

 বঙ্গদেশের মুর্শিদাবাদ নগর সম্বন্ধে ক্লাইভ বলেছেন যে, “এই শহর লণ্ডন শহরের ন্যায় সুবিস্তীর্ণ এবং জনবহুল ছিল, তবে মুর্শিদাবাদ নগরে কোনো কোনো ব্যক্তি এরূপ প্রভুত ধনের অধিকারী ছিলেন যে তাঁদের ন্যায় বিত্তশালী ব্যক্তি তখন লণ্ডন শহরে ছিল না।” ক্লাইভ এ কথা বলেছেন ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ যে বৎসর পলাশির যুদ্ধে জয় ক’রে ইংরেজরা বাংলাদেশ অধিকার করে। দেখা যাচ্ছে, সেই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুহূর্তেও বাংলাদেশ ধনে জনে পরিপূর্ণ এবং বহু শিল্পবাণিজ্ঞোর কেন্দ্র। বিশেষ করে ঢাকা নগরী মসলিনের জন্যে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠেছিল; ঢাকাই মসলিন দেশদেশান্তরে রপ্তানি হত।

 এই থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে, ভারতবর্ষ তখন কৃষিজীবী অবস্থা ছাড়িয়ে শিল্পোন্নতির পথে অনেকখানি অগ্রসর হয়েছিল। অবশ্য ভারতবর্ষ প্রধানত কৃষিজীবী দেশ, বরাবর তাই ছিল, এখনও আছে এবং আরও বহু কাল তাই থাকবে। কিন্তু দেশটা যদিচ কৃষিপ্রধান এবং গ্রামপ্রধান তথাপি শহর এবং নগরও ধীরে ধীরে এখানে গড়ে উঠছিল। শিল্পজীবীর দল এসব শহরে এসে জমা হত। শহরে ছোটো ছোটো কারখানা ছিল, তার কোনো-কোনোটিতে শতাধিক কারুশিল্পী কাজ করত। অবশ্য পরবর্তীকালে আমাদের যান্ত্রিক যুগে যেসব বিরাট বিরাট কারখানার সৃষ্টি হয়েছে তার তুলনায় এগুলো কিছুই নয়। যন্ত্রযুগের আগে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে নেদারল্যাণ্ডে, এরকম ছোটো ছোটো বহু কারখানা ছিল।

 গোড়ার দিকে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় শিল্পকে কিছু কিছু উৎসাহ দিয়েছিল। কারণ, ওটা তাদের অর্থাগমের একটা পন্থা ছিল। ভারতীয় পণ্য বিদেশে প্রচলিত হওয়াতে এ দেশের সম্পদও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু ইংলণ্ডের শিল্পজীবীরা ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতায় ভীত হয়ে ঐসব পণ্যের উপর মোটা কর বসাবার জন্যে ব্রিটিশ সরকারকে চাপ দিতে লাগল। ভারতীয় কোনো কোনো দ্রব্যের ইংলণ্ডে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেল, সেসব জিনিষের ব্যবহার অত্যন্ত দোষাবহ বলে গণ্য হতে লাগল। আইনের সাহায্যে সেই বর্জন-নীতি খুব কড়াভাবে চালু করে দিল। আর, ভারতবর্ষে বিলিতি বস্ত্র বর্জন করবার কথা মুখে উচ্চারণ করলেও জেলে যেতে হয়! কেবলমাত্র ইংলণ্ড ভারতীয় দ্রব্য বর্জন করলেও আমাদের বিশেষ কিছু ক্ষতি হত না, কারণ ইংলণ্ড ছাড়া অন্যান্য বহু দেশে আমাদের পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা ছিল। কিন্তু ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মারফত ভারতবর্ষের বৃহত্তর অংশ তখন ইংলণ্ডের কর্তৃত্বাধীনে এসে গিয়েছিল। সেই সুযোগে তারা ভারতীয় শিল্পকে পঙ্গু করে এ দেশে ব্রিটিশ শিল্পবিস্তারের জনো আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। ও দিকে ব্রিটিশ পণ্যের উপর কোনোরূপ শুল্ক ছিল না, তারা বিনা বাধায় আমাদের দেশে প্রবেশ করতে লাগল। ভারতীয় কারুশিল্পীদের জোরজবরদস্তি করে বাধ্য করা হল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কারখানায় কাজ করতে। ইংরেজরা আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকেও পঙ্গু করবার জন্যে নানারকম বাধা সৃষ্টি করতে লাগল। দেশের মধ্যেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রব্যাদি প্রেরণ করতে হলে নানারকম শুল্ক দিতে হত।

 ভারতের বয়নশিল্প এতই উন্নত প্রণালীর ছিল যে, ইংলণ্ডের যন্ত্রে প্রস্তুত বস্ত্র তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠত না। ইংলণ্ডের বয়নশিল্পকে রক্ষা করবার জন্যে ভারতীয় পণ্যের উপর শতকরা আশি টাকা হারে শুল্ক বসানো হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগেও ভারতীয় রেশমি এবং অন্যান্য বস্ত্র ব্রিটিশ বস্ত্রাদির তুলনায় অল্প মূল্যে ইংলণ্ডের বাজারে বিক্রি হত। কিন্তু এটা বেশি দিন চলে নি, আমাদের ইংরেজ শাসকবর্গ ভারতীয় শিল্প বিনষ্ট করবার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছিল। এমনিতেও যন্ত্রশিল্পের যেমন দ্রুত উন্নতি হতে লাগল তাতে আমাদের কুটিরশিল্প বেশি দিন প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকতে পারত না। কুটিরশিল্পের চেয়ে যন্ত্রজাত দ্রব্য পরিমাণে অধিক এবং দামের দিক দিয়ে শস্তা হতে বাধ্য। ও দিকে ভারতীয় শিল্পজীবীরা যে আপন শিল্পপ্রসারের দ্বারা এই প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে তারও উপায় ছিল না। ইংলণ্ড জোর করে আমাদের শিল্পপ্রসারের সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

 যে ভারতবর্ষ বহু শতাব্দী ধরে বলতে গেলে প্রাচ্যদেশসমূহের ল্যাঙ্কাশায়ারের স্থান গ্রহণ করেছিল এবং অষ্টাদশ শতকে দেশে দেশে প্রচুর বস্ত্র সরবরাহ করেছে, সে এখন বয়নশিল্প ত্যাগ করে বিলিতি বস্ত্রের খদ্দের হয়ে দাঁড়াল। নূতন-উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো অনায়াসেই ভারতবর্ষে আসতে পারত, কিন্তু তা না এসে কেবলমাত্র যন্ত্রজাত পণ্যই এ দেশে আসতে লাগল। এতদিন ভারতীয় পণ্য বিদেশে যেত আর তার বিনিময়ে বিদেশ থেকে প্রচুর সোনারুপোর আমদানি হত। এখন ঠিক তার উল্টো ব্যাপার হল। বিদেশী মালের বিনিময়ে আমাদেরই সোনারুপো বিদেশে চালান হতে লাগল।

 বিদেশী বাণিজ্যের আক্রমণে আমাদের বস্ত্রশিল্পেই সর্বপ্রথম বিনাশপ্রাপ্ত হল। ইংলণ্ডে যান্ত্রিক শিল্পোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভারতের অন্যান্য শিল্পেরও একে একে পতন হতে লাগল। দেশের শিল্পবাণিজ্যকে রক্ষা করা এবং উৎসাহ দেওয়া দেশের গবর্মেণ্টের প্রধান কর্তব্য। কিন্তু রক্ষা করা বা উৎসাহ দেওয়া তো দূরের কথা, যখনই ব্রিটিশ স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত বেধেছে তখনই ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি নির্মমভাবে ভারতীয় শিল্পকে আঘাত করেছে। এইভাবে ভারতবর্ষে পোত-নির্মাণের কার্য বন্ধ হযে গেল, ধাতুদ্রব্যের ব্যবসা নষ্ট হল এবং আস্তে আস্তে কাঁচ এবং কাগজের ব্যবসাও লোপ পেয়ে গেল।

 গোড়ার দিকে শুধু বড়ো বড়ো বন্দর এবং তার নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহেই বিদেশী দ্রব্যের প্রচলন হয়েছিল। ক্রমে রাস্তাঘাট এবং রেলপথ নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশী পণ্য বহুদূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ করে তথাকার শিল্পেজীবীদের সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদসাধন করল। সুয়েজখাল খননের ফলে ভারতবর্ষ এবং ইংলণ্ডের মধ্যে ব্যবধান কমে গেল এবং পূর্বাপেক্ষা অল্প খরচে বিলিতি দ্রব্য আমদানির রাস্তা হল। ক্রমেই অধিকতর পরিমাণে যন্ত্রজাত বিদেশী দ্রব্য এসে আমাদের নগর গ্রাম সব ছেয়ে ফেলল। ঊনবিংশ শতকের প্রথম থেকে শেষ অবধি এই কাণ্ড চলেছে এবং আজ পর্যন্তও তার জের চলছে। গত কয়েক বৎসর যাবৎ এই বিদেশী পণ্যের বন্যাটাকে কিঞ্চিৎ রোধ করা গিয়েছে। এ বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করব!

 এই ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশ বাণিজ্য (বিশেষ করে বিলিতি-বস্ত্র ব্যবসায়) একে একে আমাদের সমস্ত হস্তচালিত শিল্পের বিনাশ সাধন করেছিল। এ ছাড়াও এই ব্যাপারের আর-একটা দিক আছে, সেটা আরও সাংঘাতিক। এই যে লক্ষ লক্ষ শিল্পজীবীর জীবিকার উপায়টি নষ্ট হল, তাদের তখন কী অবস্থা হয়েছিল। অগণিত লোক, যারা কেউ-বা তাঁতের কাপড় বুনে কিংবা অন্য কাজ করে জীবিকা অর্জন করত তাদের কী ঘটল? ইংলণ্ডে যখন প্রথম বড়ো বড়ো কারখানার পত্তন হল তখন ও দেশেও বহু শিল্পজীবীর এই দুর্দশাই হয়েছিল। তাদেরও যথেষ্ট দুর্ভোগ ভুগতে হয়েছে, কিন্তু মস্ত বাঁচোয়া যে এরা পরে ঐসব কারখানাতেই কাজ পেয়েছে এবং নূতন অবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। কিন্তু ভারতবর্ষে তো সে উপায় ছিল না। এখানে কারখানাই নেই। ইংরেজ চায় নি যে, ভারতবর্ষে শিল্পোন্নতি হয়; কাজেই এখানে কারখানা গড়ে তোলবার কোনো সুযোগসুবিধেই দেওয়া হয় নি। এখন এই দরিদ্র উপবাসক্লিষ্ট বেকার শিল্পজীবীরা অনন্যোপায় হয়ে কৃষিকার্যে ফিরে গেল। কিন্তু সেখানেই-বা অত লোকের স্থান হবে কেন? অত জমি কোথায়? খুব অল্পসংখ্যক শিল্পজীবীই চাষবাসের কাজে নিযুক্ত হল। বেশির ভাগ লোক ভূমিহীন শ্রমজীবীর ন্যায় চাকরির উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল। বহু লোক না খেতে পেয়ে মারা গেল। তখন যিনি এ দেশের বড়োলাট তিনি ১৮৩৪ খৃস্টাব্দে বলেছিলেন, “দেশময় যে দুঃখদুর্দশা দেখা দিয়েছে, জগতের ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। তাঁতিদের হাড়গোড়ে দেশের মাঠঘাট ছেয়ে গেছে।”

 এইসব তাঁতি এবং শিল্পজীবীর দল বেশির ভাগ থাকত শহরে-বন্দরে। এখন তাদের ব্যবসা উঠে যাবার ফলে এরা দলে দলে জমির খোঁজে গ্রামে ফিরে যেতে লাগল। এইভাবে শহরের লোকসংখ্যা কমে গিয়ে গ্রামগুলি জনাকীর্ণ হয়ে উঠল। অর্থাৎ এখন থেকে ভারতবর্ষে শহুরে-জীবনের চেয়ে গ্রাম্য-জীবনই প্রধান হয়ে উঠল। এই গ্রামমুখী গতি সারা ঊনবিংশ শতক ধরেই চলেছিল, এমনকি এখনও চলছে। কেবলমাত্র ভারতবর্ষেই এই অদ্ভুত ব্যাপারটি ঘটেছে। যন্ত্রচালিত শিল্পোৎপাদন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সর্বত্র লোকজন গ্রাম ছেড়ে বরং শহরের দিকেই ধাওয়া করেছে। ভারতবর্ষে হয়েছে এর উল্টো। শহর-বন্দরের লোকসংখ্যা কমে গিয়ে ক্রমেই সেগুলো নির্জীব হয়ে এসেছে। কৃষিজীবীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে লাগল এবং জীবনধারণ ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠল।

 প্রধান প্রধান শিল্পগুলো লোপ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোটোখাটো কুটিরশিল্পগুলিও একে একে উঠে যেতে লাগল। তুলো পেঁজা, রঙ করা, ছাপ দেওয়া, এমনকি চরকায় সুতো কাটা বন্ধ হয়ে গেল। আগে প্রতি ঘরে ঘরে যে চরকা দেখা যেত সে যেন হঠাৎ কোথার অদৃশ্য হয়ে গেল। গরিব চাষিদের যে উপরি-আয়টুকু ছিল তাও বন্ধ হল, কারণ বাড়ির মেয়েছেলেরাই সুতো কেটে পরিবারের খানিকটা আয় বৃদ্ধি করত। যান্ত্রিক শিল্পের আরম্ভকালে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলেও এইরূপ অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু সেখানকার পরিবর্তনটা হয়েছিল স্বাভাবিক উপায়ে অর্থাৎ পুরোনো প্রথার উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গেই আর-একটা নূতন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। কিন্তু ভারতবর্ষে সেই পরিবর্তনটা হল একটা অঘটনের মতো। পূর্বপ্রচলিত কুটিরশিল্পেগুলি উঠে গেল, অথচ তার জায়গায় নূতন কিছুর জন্ম হল না। ব্রিটিশ শিল্প রক্ষার জন্য ইংরেজ কর্তারাই তা হতে দিলেন না।

 ইংরেজরা যখন আমাদের দেশ অধিকার করে তখন ভারতবর্ষ শিল্পসম্ভারে সমৃদ্ধই ছিল। সাধারণ দৃষ্টিতে আশা করা যাচ্ছিল, ইংরেজরা আধুনিক কল-কারখানার সাহায্যে দেশের শিল্পকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করে তুলবে। কিন্তু ব্রিটিশ কূটনীতির ফলে দেশ উন্নতির পথে না এগিয়ে অবনতির পথে গেল। বরং যেটুকু দেশজ শিল্প ছিল তাও জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতবর্ষ পুরোপরি কৃষিজীবী দেশে পরিণত হল।

 অসংখ্য বেকার শিল্পজীবীকে এখন চাষবাসের উপর নির্ভর করতে হল। একেই জমিতে কুলোয় না, তার উপরে ক্রমেই অধিকসংখ্যক লোক এসে জমিতে ভর করতে লাগল। ভারতবর্ষের দারিদ্র্য সমস্যার এই হচ্ছে গোড়ার কথা, আমাদের সকল দুঃখদর্দশার মূল এইখানে। যতদিন না এই মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে ততদিন ভারতীয় চাষি এবং গ্রামবাসীদের দুঃখ কখনও দূর হবে না।

 অসংখ্য লোক জমি আঁকড়ে পড়ে আছে, চাষবাস ছাড়া আয়ের আর-কোনো পন্থা নেই, ফলে জমি ভাগ ভাগ করে এক-এক খণ্ডকে শতধাবিভক্ত করা হয়েছে। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, আর ভাগ করা চলে না। এক-একজন চাষির ভাগে যেটুকু জমি পড়েছে তাতে একটা পরিবারের ভরণপোষণ কিছুতেই চলতে পারে না। যে বৎসর খুব ভালো ফসল হয় সে বৎসরও এদের আধপেটা খেয়ে থাকতে হয়। আর তেমন ভালো ফসল খুব কম বছরেই হয়ে থাকে। প্রকৃতিদেবীর দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভর করতে হয়, মৌসুমী বৃষ্টির দিকে হা-পিত্যেশ করে চেয়ে থাকে। দুর্ভিক্ষ আর মহামারীতে লক্ষ লক্ষ লোক মারা যায়। বিপদে আপদে বেনিয়া কিংবা মহাজনের কাছে গিয়ে টাকার জন্যে হাত পাততে হয়। সেই ধারের টাকা জমে জমে এমন অবস্থা হয়েছে যে, তা শোধ করা এখন এদের পক্ষে অসাধ্য। প্রত্যেকটি চাষির জীবন দুর্বহ হয়ে উঠেছে। ইংরেজ শাসনের ফলে ভারতীয় জনগণের এমনি শোচনীয় অবস্থা হয়েছে।