বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ভারতে গান্ধীজির নেতৃত্ব

উইকিসংকলন থেকে

১৬০

ভারতে গান্ধীজির নেতৃত্ব

১১ই মে, ১৯৩৩

 ভারতবর্ষে সম্প্রতি যে-সব ব্যাপার ঘটে গেছে, তার কথা এবার তোমাকে কিছু বলতে হচ্ছে। দেশের বাইরের ঘটনার চেয়ে স্বভাবতই এই ঘটনাগুলো সম্বন্ধে আমাদের আগ্রহ বেশি; আমাকে নিজেকে সংযত রাখতে হবে যেন খুব বেশি খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়ে না বসি। কেবল আমাদের নিজেদের গরজ বলেই কথা নয় অবশ্য। আজকের দিনে জগতের সামনে যে কটি দেশের সমস্যা অতি বৃহৎ, ভারতবর্ষ তারই একটি হয়ে উঠেছে। সাম্রাজ্যবাদীদের রাজ্য যাকে বলে এই দেশটি তার একটি ইতিহাসবিশ্রুত দৃষ্টান্ত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গোটা কাঠামোটাই দাঁড়িয়ে আছে একে আশ্রয় করে; সাম্রাজ্য স্থাপনে ব্রিটেনের এই সকল প্রচেষ্টার দৃষ্টান্ত দেখে আরও বহু দেশ সাম্রাজ্য স্থাপনের দুঃসাহসিক পথে পা বাড়াতে প্রলুব্ধ হয়েছে।

 যুদ্ধের সময়ে ভারতবর্ষে যে-সব পরিবর্তন ঘটেছিল ভারতবর্ষ সম্বন্ধে আমার শেষ চিঠিতে তার কথা আমি তোমাকে বলেছি; বলেছি, কী করে ভারতের শিল্প-ব্যবসায় এবং ভারতের ধনিকশ্রেণী গড়ে উঠল, ভারতীয় শিল্প-প্রচেষ্টা সম্বন্ধে ব্রিটিশের নীতি কীরকম বদলে গেল। শিল্প এবং বাণিজ্যের দিক থেকে ভারতবর্ষ ব্রিটেনের উপরে যে চাপ দিচ্ছিল তার বহর ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল, সঙ্গে সঙ্গেই বেড়ে যাচ্ছিল রাজনীতির ব্যাপারেও তার চাপ। সমগ্র প্রাচ্য জগ‍ৎ জুড়েই তখন একটা রাজনৈতিক জাগরণের হাওয়া বইছে; যুদ্ধের পরে পৃথিবীময় দেখা দিয়েছে একটা চাপা অসন্তোষের লক্ষণ, একটা যেন রুগ্ন অবস্থা। ভারতবর্ষেও মাঝে মাঝেই বিপ্লবীদের সহিংস কার্যকলাপ আত্মপ্রকাশ করছে; সমস্ত মানুষের মন একটা বিপুল আশায় উদ্বেল হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সরকার নিজেও বুঝেছেন এবার কিছু একটা না করলে নয়, সে কাজ করবার ব্যবস্থাও খানিকটা তাঁরা করছেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁরা একটা তত্ত্বনির্ণয়ী কমিটি বসালেন, তার পর কতকগুলো সংস্কার সাধনের প্রস্তাব করলেন, সে প্রস্তাবগুলো মণ্টেগু-চেম্‌স্‌ফোর্ড রিপোর্টে প্রকাশিত হল। অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাঁরা নবজাগ্রত বুর্জোয়াশ্রেণীকে নানা রকমের টুক্‌রো-টাক্‌রা খাদ্য দিয়ে পরিপুষ্ট করে তুললেন, অবশ্য তার সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষ্য রাখলেন যেন শক্তি এবং শোষণের মূল কেন্দ্রস্থলগুলো তাঁদের নিজেদের আয়ত্তেই থেকে যায়।

 যুদ্ধের পরে অল্প কিছুদিন যাবৎ ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি হল, একটা বেশ রীতিমতো তেজীর বাজারই দেখা গেল কিছুদিন, ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড রকম লাভ তুলে নিল, বিশেষ করে বাঙলা দেশে পাটের কারবারে; বহুক্ষেত্রে এতে মূলধনের উপরে শতকরা বার্ষিক একশো টাকারও বেশি লভ্যাংশ দেওয়া হল। জিনিসপত্রের দর চড়তে লাগল; মজুরির হারও কিছুটা বাড়ল, তবে অতখানি নয়। পণ্য-মূল্য বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে প্রজারা জমিদারকে যে খাজনা দিত তারও হার বেড়ে গেল। তার পর এল মন্দার বাজার, ব্যবসায়-বাণিজ্যে ভাঙন ধরল। শিল্পজীবী মজুর আর কৃষক, দুয়েরই অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ল, দেশের সর্বত্র অসন্তোষ দ্রুত বেডে উঠল; শ্রমিকদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে উঠছিল, তার ফলে অনেক কারখানাতে ধর্মঘট হল। অযোধ্যাতে তালুকদারি প্রথার অধীনে প্রজাদের অবস্থা বিশেষ রকম খারাপ ছিল, সেখানে প্রায় নিজে থেকেই একটা প্রবল কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠল। শিক্ষিত নিম্নতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে বেকার সমস্যা বেড়ে গেল, তার ফলে তাদের দুঃখ-দুর্দশার অবধি রইল না।

 যুদ্ধোত্তর যুগের প্রথম দিকে এই ছিল দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা; এইটাকে মনে রাখলে সহজেই বুঝতে পারবে দেশের রাজনৈতিক ঘটনার প্রবাহ কোন দিকে চলেছিল। দেশের মনে তখন একটা বিদ্রোহের ভাব এসেছে, নানা রকমে সেটা বাইরে আত্মপ্রকাশ করছে। শিল্পজীবী শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয়েছে, ট্রেড্-ইউনিয়ন গড়েছে, তার পর তাই থেকেই গড়ে উঠেছে একটা নিখিল ভারতীয় ট্রেড-ইউনিয়ন কংগ্রেস; ছোটো ছোটো জমিদাররা আর জমির মালিক কৃষকরা সরকারের আচরণে ক্ষুব্ধ, তাঁরা দেশের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপকে প্রীতির চোখে দেখছেন; কৃষক প্রজারা পর্যন্ত গল্পের সেই কেঁচোর মতো মরিয়া হয়ে রুখে দাঁড়াতে চাইছে; মধ্যবিত্ত শ্রেণীরা, বিশেষ করে তার বেকার লোকরা, নিঃসংশয়েই রাজনীতি নিয়ে মেতে উঠছে, তাদের মধ্যে অল্প কিছু লোক বিপ্লবী দলেই গিয়ে যোগ দিচ্ছে। হিন্দু, মুসলমান শিখ সকলেরই তখন সমান দূরবস্থা, কারণ অর্থনৈতিক দুর্দশা জাতি বা ধর্মের বিভেদকে খাতির করে চলে না। কিন্তু এরও উপরে আবার মুসলমানদেরই তখন মনের অবস্থা খারাপ; তুরস্কের বিরুদ্ধে ব্রিটেনকে যুদ্ধ করতে দেখে তাদের মনে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লেগেছিল, আশঙ্কা হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার বুঝি এবার সত্যই জাজিরাত-উল-আরব অর্থাৎ আরব দেশের দ্বীপগুলোকে এবং পবিত্র নগরী মক্কা মদিনা এবং জেরুজালেমকে (জেরুজালেম হচ্ছে ইহুদি, খৃস্টান এবং মুসলমান তিন সম্প্রদায়েরই তীর্থস্থান) দখল করে নেয়।

 অতএব যুদ্ধের পরে ভারতবর্ষের লোকেরা প্রতীক্ষা করে রইল; তারা ইংরেজের প্রতি প্রসন্ন নয়, হয়তো-বা ঝগড়া বাধাতেই উৎসুক, মনে খুব বেশি আশাও তারা রাখে না, তবু তারা ফলের প্রত্যাশা করছে। ব্রিটিশ সরকার এবার কী নীতি অবলম্বন করেন তাই দেখবার জন্য সবাই পরম আগ্রহে অপেক্ষা করছিল; মাস কয়েকের মধ্যেই তাঁদের সে নূতন নীতির প্রথম ফলটি দেখা দিল—বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করবার জন্য বিশেষ ধরনের আইন প্রণয়ন করা হবে, এই প্রস্তাবের রূপে। কিছু বেশি স্বাধীনতা চেয়েছিলাম আমরা, তার বদলে এল কিছু বেশি উৎপীড়নের ব্যবস্থা। এই বিলগুলো রচনা করা হয়েছিল একটি কমিটির রিপোর্ট অনুসারে; এর নাম রাউলাট বিল। কিছু দিন না যেতেই দেশের সর্বত্র এগুলো ‘কালো বিল’ বলেই পরিচিত হয়ে গেল; প্রত্যেকটি ভারতবাসী তারস্বরে এর নিন্দা করতে লাগল, নরমপন্থীদের মধ্যে যারা একেবারে নরমতম, তারাও সুদ্ধ। এই আইনে সরকার এবং পুলিশের হাতে বিপুল ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হচ্ছিল; এর বলে যে কোনো লোককে তাঁরা অপরাধী বলে, এমন কি সন্দেহভাজন বলে মনে করবেন, তাদেরই গ্রেপ্তার করতে পারবেন, বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখতে পারবেন, বা গোপন আদালত বসিয়ে বিচার করতে পারবেন। এই সময়ে এই বিলের স্বরূপ বর্ণনা করে একটি বাক্য রচিত হয়েছিল, কথাটি প্রসিদ্ধ হয়ে আছে: ‘না উকিল, না আপীল, না দলিল।’ এই আইনের বিরুদ্ধে দেশের প্রতিবাদ যখন ক্রমেই প্রচণ্ডতর হয়ে উঠছে, এমন সময় আবির্ভাব হল একটি নূতন বস্তুর: রাজনৈতিক গগনের দিকচক্রবালে ক্ষুদ্র একটি মেঘবিন্দু দেখা গেল, তার পর সেই মেঘ বেড়ে বেড়ে এবং দ্রুত বিস্তারলাভ করে ক্রমে সমস্ত ভারতবর্ষের আকাশ ছেয়ে ফেলল।

 এই নূতন বস্তুটি হচ্ছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যুদ্ধের মধ্যেই গান্ধীজি দক্ষিণ-আফ্রিকা থেকে ভারতবর্ষে ফিরেছিলেন, সবরমতীতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে তাঁর অনুচরদের নিয়ে সেইখানে বসবাস করছিলেন। রাজনীতির প্রবাহ থেকে দূরেই সরে ছিলেন তিনি; যুদ্ধের জন্য সৈন্য সংগ্রহ করতে সরকারকে সাহায্য পর্যন্ত করেছিলেন। ভারতবর্ষে অবশ্য দক্ষিণ-আফ্রিকার সেই সত্যাগ্রহ-সংগ্রামের পর থেকেই তাঁর নাম সকলের অত্যন্ত পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। বিহারের চম্পারন জিলায় ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা দীনদরিদ্র চাষি প্রজাদের উপর অকথ্য অত্যাচার করছিল; ১৯১৭ সনে তিনি সেই প্রজাদের হয়ে লড়াই শুরু করলেন, অত্যাচারের অবসান ঘটালেন। তার পরে আবার তাঁকে সংগ্রাম করতে হল গুজরাটে কয়রা অঞ্চলের চাষিদের জন্য। ১৯১৯ সনের প্রথম দিকে তিনি অত্যন্ত পীড়িত হয়ে পড়েন। অসুখ ভালো করে সেরেছে কি সারে নি, এমন সময়ে রাউলাট বিল নিয়ে সমস্ত দেশ জুড়ে তুমুল আন্দোলন জেগে উঠল। দেশসুদ্ধ লোকের মিলিত প্রতিবাদের সঙ্গে এবার গান্ধীজিও তাঁর কণ্ঠ মেলালেন।

 অন্যদের কণ্ঠ থেকে কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বরের কোথায় যেন একটা তফাত ছিল। সে স্বর শান্ত, অনুচ্চ, তবু জনতার উন্মত্ত চীৎকার আর গর্জন ছাপিয়েও সে ধনি মানুষের কানে এসে পৌঁছয়; কোমল এবং নম্র তাঁর কথা, তবু যেন তার মধ্যে কোথায় খানিকটা ধারালো ইস্পাত লুকিয়ে আছে; অত্যন্ত বিনয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে তিনি কথা বলেন, অথচ সে কথার মধ্যে অত্যন্ত কঠিন এবং ভয়ানক কী একটার আভাস পাওয়া যায়; তাঁর কথার প্রতিটি শব্দ প্রতিটি অক্ষর তাৎপর্যে পরিপূর্ণ, তার মধ্যে থেকে একটা মৃত্যুপণ করা সংকল্প আত্মপ্রকাশ করছে। শান্তি এবং মৈত্রীর বাণী নিয়ে তিনি এসে দাঁড়ালেন, সে বাণীর পিছনে রয়েছে শক্তি, রয়েছে বাস্তব কর্মের স্পন্দনশীল ছায়া, রয়েছে দৃঢ় সংকল্প, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা কিছুতেই চলবে না। আজ তাঁর সে স্বর শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি; গত চৌদ্দ বছরে সে স্বর আমরা বহুবারই শুনেছি। কিন্তু সেই ১৯১৯ সনের ফেব্রুয়ারি আর মার্চ মাসে, আমাদের কানে তাঁর সে বাণী তখন নূতন ছিল; তাকে নিয়ে কী করব আমরা ভেবে পাই নি, তবু তার ধ্বনি আমাদের মনে সেদিন আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এ একেবারে আলাদা জিনিস, আমরা যে কোলাহল-সর্বস্ব রাজনীতিকে চিনতাম এ তা নয়। সে রাজনীতিতে থাকে শুধু প্রতিপক্ষের প্রতি নিন্দার বিষোদ্‌গার, শুধু দীর্ঘ দীর্ঘ বক্তৃতা, তার শেষে সেই নিত্য একধরনের অর্থহীন মূল্যহীন প্রতিবাদ প্রস্তাব, সে প্রস্তাবকে কেউই বিশেষ কাজের কথা বলেও মনে করে না। দেখ্‌লাম, গান্ধীজির এ রাজনীতি কথার রাজনীতি নয়, কাজের রাজনীতি।

 বেছে বেছে কতকগুলো আইনকে ভেঙে কারাদণ্ড বরণ করতে প্রস্তুত আছেন, এমন লোকদের নিয়ে গান্ধীজি একটি ‘সত্যাগ্রহ সভা’ গঠন করলেন। তখনকার দিনে এটা একটা অভিনব ব্যাপার; আমাদের মধ্যেই অনেকে আগ্রহে অধীর হয়ে উঠলেন, অনেকে আবার ভয়ে পিছিয়েও গেলেন। আজ এটা একটা অতি সাধারণ ব্যাপার; আমাদের মধ্যে অধিকাংশের পক্ষে তো এটা জীবনধারার একটা নিশ্চিত এবং নিয়মিত অংশই হয়ে উঠেছে।

 চিরদিনই যা তাঁর নিয়ম, প্রথমে গান্ধীজি বড়োলাটকে একটি অতি বিনীত নিবেদন এবং সাবধানবাক্য পাঠিয়ে দিলেন। তার পর যখন দেখলেন ব্রিটিশ সরকার একেবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছেন, সমগ্র ভারতবর্ষের মিলিত প্রতিবাদ সত্ত্বেও তাঁরা এই আইন তৈরি করবেনই, তখন তিনি বললেন, সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে একটি শোকপ্রকাশের দিন পালন করা হোক—এই বিল যেদিন আইনে পরিণত হবে তার পরের রবিবারটি দেশব্যাপী হরতাল হবে, সমস্ত কাজকর্ম সভাসমিতি সেদিন বন্ধ থাকবে। এটা হল সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূচনা। অতএব ১৯১৯ সনের ৬ই এপ্রিল, রবিবার দিন দেশের সর্বত্র সমস্ত শহরে এবং সমস্ত গ্রামে হরতাল হল। এই ধরনের সমগ্র ভারতব্যাপী অনুষ্ঠান এর আগে আর কখনও হয় নি। অনষ্ঠানটি হয়েছিল আশ্চর্যরকম ফলপ্রসূ, সমস্ত জাতি সমস্ত সম্প্রদায়ের লোকেই এতে যোগ দিয়েছিল। আমরা যারা এই হরতাল ঘটাবার আয়োজন করেছিলাম, এর সাফল্য দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলাম। আমরা এর আবেদন জানাতে পেরেছিলাম মাত্র অতি অল্প সংখ্যক লোকের কাছে, শহর অঞ্চলে। কিন্তু বাতাসে তখন নূতন ভাবের জোয়ার এসেছে; কী করে জানি না এর বার্তা এই বিশাল দেশের দূরতম প্রদেশের গ্রামে গ্রামে পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ভারতের ইতিহাসে সেই প্রথম, শহরের কর্মী আর গ্রামের অধিবাসীরা একত্র হয়ে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ঘটিয়ে তুলল, একেবারে সমগ্র জনগণের সে অনুষ্ঠান।

 দিল্লীর লোকেরা ৬ই এপ্রিল তারিখটা বুঝতে ভুল করেছিলেন, সেখানে হরতাল হল তার আগের রবিবারে, ৩১শে মার্চ তারিখে। দিল্লীর হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে সেটা ছিল একটা অপূর্ব সৌহার্দ্য আর মৈত্রীর যুগ; অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখা গেল সেদিন—আর্য সমাজের প্রবীণ নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ দিল্লীর প্রসিদ্ধ জুম্মা-মসজিদে দাঁড়িয়ে বিরাট জনতার কাছে বক্তৃতা করছেন। সেই ৩১শে মার্চ তারিখে পুলিশ এবং সৈন্যরা দিল্লীর রাস্তায় বিশাল জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেবার চেষ্টা করল, জনতার উপরে গুলি ছুঁড়ল, কয়েকজন মারাও গেল তাতে। চাঁদনী চকে দেখা গেল, দীর্ঘদেহ সন্ন্যাসীর পরিচ্ছদে অপরূপ মহিমা-দীপ্ত স্বামী শ্রদ্ধানন্দ বুকের জামা খুলে ফেলেছেন, অনাবৃত বক্ষে এবং নিষ্কম্প নেত্রে গুর্খাদের সঙীনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। গুর্খারা তাঁকে মারল না; এই ঘটনায় সমস্ত ভারতবর্ষের চমক লেগে গেল। কিন্তু দুঃখের কথা এই, এর পর আটটি বছরও কেটে যেতে না যেতে সেই স্বামী শ্রদ্ধানন্দ নিহত হলেন; একজন ধর্মান্ধ মুসলমান বন্ধুর ছদ্মবেশে গিয়ে তাঁকে ছুরির আঘাতে হত্যা করল, তখন তিনি রোগশয্যায় শায়িত।

 ৬ই এপ্রিলের সেই সত্যাগ্রহ দিবসের পরই ঘটনার স্রোত দ্রুত এগিয়ে চলল। ১০ই এপ্রিল অমৃতসরে হাঙ্গামা হল। পঞ্জাবের নেতা ডক্টর কিচলু এবং ডক্টর সত্যপালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার দরুণ শোকপ্রকাশ করে একটি নিরস্ত্র জনতা অনাবৃতমস্তকে শোভাযাত্রা করেছিল, তাদের উপরে সৈন্যরা গুলি চালাল, অনেক লোক মারা গেল। তখন সে জনতাও প্রতিশোধ নিতে উন্মত্ত হয়ে উঠল, অফিসে বসে কর্ম-রত পাঁচ-ছ’জন নিরীহ ইংরেজকে হত্যা করল, তাদের ব্যাঙ্কের বাড়ি পুড়িয়ে দিল। এর পরেই পঞ্জাব প্রদেশ একটা ঘন যবনিকার অন্তরালে চলে গেল। চিঠিপত্র ও সংবাদের উপরে কড়া পাহারা বসিয়ে পঞ্জাবকে বাকি ভারতবর্ষ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হল; পঞ্জাবের আর কোনো খবরই প্রায় বাইরে এসে পৌঁছল না, বাইরে থেকে কারও সেখানে যাওয়া বা সেখান থেকে বেরিয়ে আসাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠল। সামরিক আইন জারি করা হল সেখানে; একটানা অনেক মাস ধরে তার পীড়ন পঞ্জাবকে সইতে হল। তার পর অতি ধীরে ধীরে, বহু সপ্তাহ বহু মাস উৎকণ্ঠিত প্রতীক্ষার পর একদিন সে যবনিকা উঠে গেল; তখন আমরা জানতে পেলাম কী ভয়াবহ ব্যাপার সেখানে ঘটে গেছে।

 পঞ্জাবে সেই সামরিক আইনের যুগে যে-সব বীভৎস কাণ্ড ঘটেছিল, তার বিশদ বিবরণ এখানে আমি বলব না। অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ১৩ই এপ্রিল তারিখে যে হত্যানুষ্ঠান হয়েছিল, তার কথা পৃথিবীসুদ্ধ লোক জানে; হাজার হাজার মানুষ হত এবং আহত হয়েছিল সেখানে, সেই মৃত্যুর ফাঁদ থেকে পালাবার কোনো পথই ছিল। অমৃতসর কথাটাই এখন প্রায় ‘নরহত্যা’র সমার্থক হয়ে গেছে। সে হত্যাকাণ্ডটা খুবই দুষ্কর্ম সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চেয়েও বহুগুণে কুৎসিত ব্যাপার পঞ্জাবের সর্বত্র তখন ঘটেছে।

 তার পর বহু বছর চলে গেছে, আজও সেই সমস্ত বর্বরতা আর বীভৎস আচরণকে ক্ষমা করা আমাদের পক্ষে কঠিন। কিন্তু এর অর্থ বোঝা কিছুমাত্র কঠিন নয়। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের শাসন তারা যেভাবে চালাচ্ছে, তারই গুণে তারা সারাক্ষণ মনে করে তারা একেবারে আগ্নেয়গিরির ধারে বসে রয়েছে। ভারতবর্ষের মনকে, হৃদয়কে তারা বোঝে নি, বোঝবার চেষ্টাও করে নি কোনোদিন। আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থেকেই তারা চিরকাল জীবন যাপন করছে; নির্ভর করছে শুধু তাদের যে বিশাল এবং জটিল সংগঠন আছে আর তার পিছনে তাদের যে শক্তি আছে, তারই উপরে। কিন্তু তাদের এত সমস্ত আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যেও তাদের মনে অপরিচিতের সম্বন্ধে একটা ভয় জেগে রয়েছে; ভারতবর্ষে তারা দেড় শো বছর ধরে রাজত্ব করছে, তবু এটা এখনও তাদের কাছে অপরিচিত দেশ। ১৮৫৭ সনের বিদ্রোহের স্মৃতি আজও তাদের মনে স্পষ্ট; তারা সারাক্ষণ মনে করছে, তারা একটা অজ্ঞাত দেশে, শত্রুর দেশে বাস করছে, যে-কোনো মুহূর্তে সে দেশ তাদের আক্রমণ করবে, ছিঁড়ে টুক্‌রো টুক্‌রো করে ফেলবে। এই হচ্ছে তাদের সাধারণ মনোভাব। কাজেই তারা যখন দেখল দেশে একটা প্রকাণ্ড আন্দোলন জেগে উঠছে, আর সে আন্দোলনও তাদেরই বিরুদ্ধে, স্বভাবতই তাদের ভয় বেড়ে গেল। ১০ই এপ্রিল অমৃতসরে যে নৃশংস কাণ্ড ঘটেছিল তার সংবাদ যখন লাহোরে পঞ্জাবের ঊর্ধ্বতন কর্মচারীদের কানে গিয়ে পৌঁছল, তাঁরা ভয়ে একেবারেই বিহ্বল হয়ে পড়লেন! ভাবলেন, এবারও ঠিক ১৮৫৭ সনের মতোই আরেকটা অতিবৃহৎ নরঘাতী বিদ্রোহ শুরু হল, ভারতবর্ষে যত ইংরেজ আছে সকলেরই এবার প্রাণ গেল। ভেবে তাঁদের মাথার ঠিক রইল না, স্থির করলেন বিভীষিকা সৃষ্টি করেই একে থামিয়ে দিতে হবে। জালিয়ানওয়ালাবাগ, সামরিক আইন এবং আরও যত ব্যাপার তখন ঘটেছিল, সে সমস্তই হচ্ছে এদের এই মানসিক বিকৃতি থেকে সৃষ্ট।

 এদের ভয় পাবার কারণ সত্যই কিছু ছিল না। তবু ভয়ার্ত মানুষ যদি উচ্ছৃংখল আচরণ করেই ফেলে, তার অর্থটা সহজেই বোঝা যায়, যদিও সে আচরণকে তাই বলে সমর্থন করা চলে না। কিন্তু ভারতবর্ষের লোক আরও বেশি আশ্চর্য ও ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল তখন, যখন দেখা গেল এই কাণ্ডের বহু মাস পরেও জেনারেল ডায়ার অতি অবজ্ঞার সুরে তাঁর সে আচরণের সাফাই দিচ্ছেন। অমৃতসরে ডায়ারই গুলি চালিয়েছিলেন, তার পর সেই হাজার হাজার আহত নরনারীকে একেবারে বর্বরোচিত অবহেলাভরে সেখানেই ফেলে রেখেছিলেন। বলেছিলেন “তাদের শুশ্রূষা করা আমার কাজ নয়।” ইংলণ্ডে সামান্য দু চারজন লোক এবং সরকার তাঁর এই কাজের অতি মৃদ সমালোচনাও করলেন; কিন্তু ব্রিটেনের শাসকশ্রেণীর সাধারণ অভিমত এবিষয়ে কী তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল হাউস অব লর্ডসের একটি বিতর্ক সভায়—সেখানে ডায়ারের উপরে একেবারে প্রশংসার অজস্র পুষ্পবৃষ্টি করা হল। এর প্রত্যেকটি ব্যাপারই ভারতবর্ষের রোষবহ্নিতে ইন্ধন জোগাতে লাগল; পঞ্চাবের অনাচার নিয়ে দেশের সর্বত্র তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হল। পঞ্জাবে বস্তুত কী ঘটেছিল, তার তথ্য নির্ণয় করবার জন্য সরকার এবং কংগ্রেস, দুই পক্ষ থেকেই অনুসন্ধান কমিটি বসানো হল। সমস্ত দেশ এদের রিপোর্টের প্রতীক্ষা করে রইল।

 সেই বছর থেকেই ১৩ই এপ্রিল তারিখটি ভারতবর্ষের একটি জাতীয় দিবস হয়ে রয়েছে; ৬ই এপ্রিল থেকে ১৩ই এপ্রিল পর্যন্ত এই আটটি দিন হয়েছে তার জাতীয় সপ্তাহ। জালিয়ানওয়ালাবাগ এখন ভারতের একটা রাজনৈতিক তীর্থক্ষেত্র। চমৎকার একটি ফুলের বাগানে পরিণত করা হয়েছে একে, একদিন এর নামেই যে আতঙ্ক মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলত তারও অনেকখানিই অন্তর্হিত হয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতি অত সহজে মরে না। সেদিনের কাহিনী আমরা ভুলি নি।

 দৈবের আশ্চর্য বিধানে সে বছর কংগ্রেসেরও অধিবেশন বসল অমৃতসরেই; ১৯১১ সনের ডিসেম্বর মাস সেটা। এই কংগ্রেসে তেমন বড়ো কোনো সিদ্ধান্ত স্থির হল না, কারণ সবাই তখন অনুসন্ধান কমিটি কী রিপোর্ট দেন তার জন্য প্রতীক্ষা করছে। তবুও একটা কথা স্পষ্টই বোঝা গেল: কংগ্রেসের পরিবর্তন ঘটেছে। জনসাধারণের ছোঁয়াচ লেগেছে তার মধ্যে; এসেছে একটা নূতন প্রাণশক্তির জোয়ার, পূরোনো কালের কংগ্রেসী যাঁরা ছিলেন তাঁদের কারও কারও পক্ষে সেটা অস্বস্তিকরও। সেই কংগ্রেসে দেখা গেল লোকমান্য তিলককে, চিরদিনের মতোই উদ্ধত শির তাঁর, কোনো আপোষ-মীমাংসার তিনি ধার ধারেন না। সেই তাঁর জীবনে শেষবার কংগ্রেসে যোগদান; পরের বার কংগ্রেসের অধিবেশন হবার আগেই তিনি মারা গেলেন। সেখানে গেলেন গান্ধীজি, জনগণের প্রিয় নেতা, কংগ্রেস এবং ভারতের রাজনীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল তিনি যে একনায়কত্ব করে চলেছেন, সেই তাঁর প্রথম যাত্রা। এলেন আরও বহু নেতা, জেলখানা থেকে তাঁরা সদ্য বেরিয়ে এসেছেন—সামরিক আইনের শাসনকালে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ষড়যন্ত্রের মামলাতে জড়িয়ে ফেলে এঁদের প্রতি দীর্ঘ কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল; এবার যুদ্ধবিরতি উপলক্ষে এঁদের দণ্ড মাপ করা হয়েছে। এলেন বিখ্যাত আলি ভ্রাতৃদ্বয়—বহু বৎসর বন্দী থেকে তাঁরা সেইমাত্র ছাড়া পেয়েছেন।

 এর পরের বছরই কংগ্রেস যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল, গান্ধীজির নির্দিষ্ট অসহযোগের কর্মসূচীকে গ্রহণ করে। কলকাতায় কংগ্রেসের একটি বিশেষ অধিবেশন করে একে গ্রহণ করে নেওয়া হল; তার পর নাগপুরে বার্ষিক অধিবেশনে সেটা অনুমোদন করা হল। এই যুদ্ধ যে প্রণালীতে চলল সেটি সম্পূর্ণরূপেই শান্তিপূর্ণ, এর নামই ছিল অহিংস সংগ্রাম; এর গোড়ার কথা হচ্ছে, ভারতবর্ষকে শাসন এবং শোষণ করার কাজে সরকারকে আমরা কোনোরকম সাহায্যই করব না। একেবারেই অনেকগুলো জিনিস আমাদের বর্জন করতে হবে; যেমন, এই বিদেশী সরকারের প্রদত্ত সমস্ত উপাধি এবং খেতাব বর্জন, সরকারি চাকরি প্রভৃতি বর্জন, উকিল এবং মামলাকারী উভয়েরই আদালত বর্জন। সরকারি স্কুল এবং কলেজ বর্জন, মণ্টেগু চেম্‌স্‌ফোর্ডকৃত সংস্কার-ব্যবস্থার ফলে নূতন যে কাউন্সিল তৈরি করা হয়েছে সেগুলো বর্জন। এর পরে ক্রমে অসামরিক এবং সামরিক বিভাগের চাকরিও বর্জন করা হবে, কর দেওয়া বন্ধ করা হবে। গঠন-প্রচেষ্টার দিকে খুব জোর দেওয়া হল হাতে সুতো কাটা আর খদ্দরের উপরে, আর সরকারি আদালতের পরিবর্তে সালিশী আদালত প্রতিষ্ঠা করার উপরে। এই কর্মসূচীর আর দুটি অতান্ত বড়ো কথা ছিল—হিন্দু মুসলমানের ঐক্যসাধন আর হিন্দুদের মধ্যে অস্পৃশ্যতার উচ্ছেদ।

 কংগ্রেস তার নিজের গঠনতন্ত্রও বদলে নিল। এবার সে সত্যকার একটি কর্মক্ষম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল; জনসাধারণও এর সভ্য হতে পারবে তারও ব্যবস্থা করা হয়ে গেল।

 এতদিন কংগ্রেস যা করে এসেছে, তার থেকে এই কর্মসূচী একেবারেই ভিন্ন বস্তু। বস্তুত সমস্ত পৃথিবীতেই এটা হল একটা অভিনব বস্তু; কারণ দক্ষিণ আফ্রিকাতে যে সত্যাগ্রহ হয়েছিল তার গণ্ডি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। এর মানে হল, কতক লোককে তখনই অত্যন্ত গুরুতর ক্ষতি বরণ করে নিতে হবে, যেমন আইনজীবীদের ব্যবসায় পরিত্যাগ করতে হবে, ছাত্রদের সরকারি কলেজে পড়া বন্ধ করে দিতে হবে। এর স্বরূপ বিচার করা সেদিন কঠিন ছিল, কারণ এর সঙ্গে তুলনা করে এর দাম যাচাই করা যায় এমন দ্বিতীয় বস্তু হাতের কাছে ছিল না। প্রাচীন এবং অভিজ্ঞ কংগ্রেসী নেতারা একে দেখে ইতস্তত করছিলেন, সংশয়াচ্ছন্ন হয়েছিলেন, এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ব্যক্তি ছিলেন লোকমান্য তিলক, তিনি এর অল্প কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছেন। কংগ্রেসের অন্যান্য বড়ো নেতা যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মতিলাল নেহরুই প্রথম দিকে গান্ধীজির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তবুও সাধারণ কংগ্রেসকর্মীরা বা রাস্তার লোকেরা বা দেশের জনসাধারণ কী মত পোষণ করছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশমাত্র ছিল না। গান্ধীজির আহ্বানে তারা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, যেন সম্মোহিত হয়ে পড়ল, ‘মহাত্মা গান্ধী কী জয়’ বলে উচ্চ চীৎকার করে অহিংস অসহযোগের এই নূতন মন্ত্রে তাদের অচল নিষ্ঠা ঘোষণা করল। মুসলমানরাও এবিষয়ে অন্যদের সমানই উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন। বস্তুত আলি-ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত খিলাফৎ-কমিটি কংগ্রেসেরও বহু আগেই এই কর্মসূচীকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। জনসাধারণের উৎসাহ দেখে এবং প্রথমদিকে এই আন্দোলন যে সাফল্য অর্জন করল তাই দেখে, দু’ দিন না যেতেই পুরোনো কংগ্রেসী নেতারাও প্রায় সকলেই এসে এর মধ্যে প্রবেশ করলেন।

 এই আন্দোলনের দোষ ও গুণ কী ছিল, বা কোন্ দার্শনিক যুক্তির উপরে এর প্রতিষ্ঠা, সে আলোচনা এই চিঠিপত্রে করা সম্ভব নয়। সেটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং জটিল আলোচনা; একমাত্র এই আন্দোলনের সৃষ্টিকর্তা গান্ধীজি নিজে ছাড়া অন্য কেউই বোধ হয় সে নিয়ে সুষ্ঠুরকম আলোচনা করবার শক্তি রাখে না। তা হোক, এসো আমরা বাইরের লোকের দৃষ্টি নিয়েই একে তাকিয়ে দেখি, এত দ্রুতবেগে এবং এত সাফল্যের সঙ্গে এটা দেশে বিস্তারলাভ করল কী করে, সেটা উপলন্ধি করবার চেষ্টা করি।

 আমি তোমাকে বলেছি, বিদেশীর শোষণ আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীগুলোর মধ্যে বেকার সমস্যা বৃদ্ধির ফলে জনসাধারণের আর্থিক দৈন্য দিনদিনই বেড়ে যাচ্ছিল। কী করে এর প্রতিকার হতে পারে? জাতীয় চেতনা বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে লোকে বুঝল, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা তাদের চাইই। স্বাধীনতা পাওয়া তাদের প্রয়োজন—শুধু পরাধীন এবং অ-স্বাধীন হয়ে থাকাটা হীনতার পরিচায়ক বলেই নয়; তিলকের ভাষায় সে স্বাধীনতা “আমাদের জন্মগত অধিকার সুতরাং তাকে আমাদের অর্জন করতেই হবে” কেবল এই বলেও নয়; আমাদের দেশবাসীর কাঁধ থেকে দারিদ্র্যের বোঝাটাকে নামিয়ে ফেলবার জন্যেও স্বাধীনতা আমাদের প্রয়োজন। স্বাধীনতা অর্জন করব আমরা কী করে? নিজেই সে একদিন হেঁটে এসে হাজির হবে, এই ভেবে চুপ করে প্রতীক্ষায় বসে থাকলে সে আসবে না, এটা সহজ কথা। এটাও স্পষ্টই বোঝা যায়, কংগ্রেস এতদিন ধরে যে নিছক আর্তনাদ আর ভিক্ষা-প্রার্থনার নীতি অল্পবিস্তর চেঁচামেচি করে চালিয়ে এসেছে, সেটা একটা জাতির পক্ষে অমর্যাদাকর তো বটেই, তাতে কাজ উদ্ধার হবারও কোনো আশা নেই। এই-সব কাণ্ড-কারখানার ফলে কেউ কোথাও সাফল্য লাভ করেছে, নিছক কান্নাকাটি শুনেই শাসক বা ক্ষমতার অধিকারী শ্রেণী তার হাতের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে কোথাও নেই। ইতিহাসে বরং এই কথাই সর্বত্র দেখা যাচ্ছে, যে-সব জাতি বা শ্রেণী পরের দাস হয়ে ছিল তারা স্বাধীনতা অর্জন করেছে সহিংস বিদ্রোহ এবং বিপ্লবের মধ্য দিয়েই।

 ভারতের লোকদের পক্ষে সশস্ত্র বিদ্রোহ করবার কথা উঠতেই পারে না। আমাদের অস্ত্রহীন করে রাখা হয়েছে, আমাদের মধ্যে খুব বেশির ভাগ লোকই অস্ত্র ব্যবহার করতে পর্যন্ত জানে না। তাছাড়া শুধু হিংস্র শক্তির লড়াইই যদি করতে হয়, ব্রিটিশ সরকারের বা যে কোনো রাষ্ট্রেরই, শক্তি সুসংহত—তার বিরুদ্ধে যেটকু শক্তি সংগ্রহ করা সম্ভব তার চেয়ে তার জোর অনেক বেশি। সেনাবাহিনীও বিদ্রোহ করতে পারে; কিন্তু নিরস্ত্র জনসাধারণ বিদ্রোহ করতে পারে না, সশস্ত্র সৈন্যের সম্মুখীন হয়ে লড়তে পারে না। অন্যদিকে আবার ব্যক্তিগতভাবে বিভীষিকা সষ্টি করা, বোমা বা পিস্তল দিয়ে দুচারজন সরকারি কর্মচারীকে খুন করা—এটাও একটা দেউলিয়া নীতি। এতে দেশের লোকের মানসিক অবনতি ঘটায়; আর ব্যক্তিহিসাবে মানুষে এতে যতই ভয় পাক না কেন, একটা শক্তিশালী সুসংহত সরকারকে এর দ্বারা বিধ্বস্ত করে দেওয়া যাবে, এমন কল্পনা করাই পাগলামি। এই ধরনের ব্যক্তিগত খুনখারাবি করার নীতি রাশিয়ার বিপ্লবীরাও পরিত্যাগ করেছিলেন, সেকথা তোমাকে বলেছি।

 তাহলে বাকি রইল কী? রাশিয়ার বিপ্লব-প্রচেষ্টা সফল হয়েছে, সে শ্রমিকদের প্রজাতন্ত্র স্থাপন করেছে; তার কাজের প্রণালী ছিল জনসাধারণের জাগরণ এবং তার পিছনে সেনাবাহিনীর সমর্থন। কিন্তু রাশিয়াতেও সোভিয়েটরা জয়লাভ করেছে এমন একটা মুহূর্তে যখন যুদ্ধের ফলে সমস্ত দেশটা এবং তার পুরোনো শাসন-ব্যবস্থাটা ভেঙে একেবারে ছত্রখান হয়ে পড়েছে, এদের বাধা দেবার মতো কেউ বড়ো একটা বেঁচেই ছিল না। তাছাড়া ভারতবর্ষে অতি অল্প দু’একজন লোকই তখন রাশিয়া বা মার্ক্‌স্‌বাদের নাম শুনেছে, বা শ্রমিক এবং কৃষকদের কথা ভাবতে শিখেছে।

 অতএব দেখা গেল, এর কোনো পথই আমাদের জন্যে খোলা নয়; মনে হল, হীন দাসত্বের এই অসহ্য দুর্গতি থেকে মুক্তি পাবার কোনো আশাই আমাদের নেই। যাঁদের মনে কিছুমাত্র স্পর্শচেতনা ছিল তাঁরা ভয়ানক হতাশ হলেন। নিজেদের একেবারেই অসহায় ভাবতে লাগলেন। ঠিক এই মুহূর্তটিতে এলেন গান্ধীজি, তাঁর অসহযোগের কর্মসূচীটিকে সামনে মেলে ধরলেন। আয়ার্ল্যাণ্ডের সিন্‌ফিন্‌ আন্দোলনের মতো এই কর্মসূচীও আমাদের শেখাল নিজের উপরে নির্ভর করতে, নিজেদের শক্তিকে গড়ে তুলতে; সরকারকে চাপ দিয়ে কথা শোনাবার কায়দা হিসাবে এর শক্তি প্রচুর, সেও সহজেই বোঝা যায়। ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, ভারতবাসীরা নিজেরাই সরকারকে সকল কাজকর্ম চালাতে সাহায্য করছে, ভারত সরকার অনেকখানিই টিঁকে আছে তাদের সেই সহযোগিতার উপর নির্ভর করে। এদের এই সহযোগিতা যদি সে আর না পায়, সমস্ত ব্যাপারে তাকে যদি আমরা বর্জন করে চলতে পারি, তবে যুক্তির দিক থেকে অন্তত বলব, সরকারের সমস্ত কাঠামোটি অনায়াসে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে এটা কিছুই অসম্ভব নয়। এমন কি অতদূর পর্যন্ত যদি অসহযোগ আমরা নাও করি, তবু যেটুকু করব তাইতেই সরকার অত্যন্ত রকম ফাঁপরে পড়ে যাবেন, এবং তারই সঙ্গে সঙ্গে এদিকে জনগণেরও শক্তি অনেক বেড়ে উঠবে—এতেও সন্দেহ নেই। সে অসহযোগ হবে সম্পূর্ণরূপে অহিংস; তবু কিন্তু এটা সুদ্ধমাত্র অ-প্রতিরোধই নয়। সত্যাগ্রহ মানে হচ্ছে, যাকে আমরা অন্যায় বলে মনে করছি তাকে নিশ্চিতভাবে প্রতিরোধ করা, অবশ্য অহিংস উপায়ে। কার্যত এটা হচ্ছে একটা অহিংস বিদ্রোহ, অত্যন্ত সুসভ্য রীতিতে একটা যুদ্ধঘোষণা, অথচ, রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলবার শক্তি এ রাখে। জনসাধারণকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে তুলবার এটা একটা অতি চমৎকার উপায়; দেখে মনে হল, ভারতীয় প্রজার নিজস্ব প্রকৃতি ও প্রতিভার সঙ্গে এর আশ্চর্য মিল আছে। এতে আমরা যথাসম্ভব সদ্‌ব্যবহারই দেখিয়ে বলব, অপরাধ এবং ত্রুটি যা কিছু সমস্ত গিয়ে পড়বে বিপক্ষের ঘাড়ে। আমরা এতদিন ভয়ে সংকুচিত হয়ে থাকতাম, এর দ্বারা সে ভয়কে আমরা জয় করব, মুখ তুলে সকলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে শিখব, যা এর আগে কোনো দিন তেমন করে পারি নি; আমাদের মনের কথা সম্পূর্ণ এবং সরলভাবে খুলে বলতে পারব। আমাদের মনের উপরে একদিন যে জগদ্দল পাথর চেপে বসে ছিল সেটা এবার সরে যাবে, বাক্য এবং কার্যের এই নবলব্ধ স্বাধীনতা আমাদের মনকে আত্মপ্রত্যয়ে আর শক্তিতে পরিপূর্ণ করে তুলবে। শেষকথা, এই ধরনের সংগ্রামে চিরদিনই অতি তীব্র জাতিগত বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়ে এসেছে; এই নূতন পথটা হবে শক্তির পথ, এতে সেরকম বিদ্বেষ-সৃষ্টির সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে, সুতরাং দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদের চরম মীমাংসা করাও সহজতর হয়ে উঠবে।

 অসহযোগের এই অভিনব কর্মসূচী, এর সঙ্গে আবার রয়েছে গান্ধীজির অপূর্ব ব্যক্তিত্ব; অতএব একে দেখে দেশসুদ্ধ লোকের মন আকৃষ্ট হল, আশায় ভরে উঠল, এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। অসহযোগের মন্ত্র দেশে ছড়িয়ে পড়ল, আর এর স্পর্শ লাগামাত্রই এতদিন যে হীন দুর্বলতা আমাদের ঘিরে ছিল সেটা অন্তর্হিত হয়ে যেতে লাগল। নবরূপে-জাত এই কংগ্রেস দেশের প্রাণস্বরূপ ব্যক্তি যিনি যেখানে ছিলেন সকলকেই নিজের ক্রোড়ে আকর্ষণ করে নিল; দিন দিন এর শক্তি আর মর্যাদা বাড়তে লাগল।

 ইতিমধ্যে মণ্টেগু-চেম্‌স্‌ফোর্ড রচিত শাসন-সংস্কারের পরিকল্পনা অনুসারে নূতন রকমের সব কাউন্সিল আর অ্যাসেম্বলি তৈরি করা হয়েছে। নরমপন্থীদের তখন নাম হয়েছে উদারপন্থী; তাঁরা এই-সব ব্যাপারকে সাদরে অভ্যর্থনা করে নিয়েছেন; এই শাসন-ব্যবস্থার অধীনে মন্ত্রী এবং অন্যান্য কর্মচারীর পদ অধিকার করে বসেছেন। তাঁরা বস্তুত সরকারেরই গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে গেছেন, দেশের লোকও আর তাঁদের সমর্থন করছে না। কংগ্রেস এই-সব আইন-সভাকে বর্জন করেছে, দেশের লোকে এগুলোর দিকে মোটে দৃষ্টিপাতই করছে না। এর বাইরে দেশের প্রতি শহরে শহরে গ্রামে গ্রামে যে সত্যকার সংগ্রাম তখন চলেছে, সকলের দৃষ্টি আবদ্ধ হয়ে রয়েছে তারই দিকে। সেই প্রথম বহু সংখ্যক কংগ্রেসকর্মী গ্রামগুলিতে গিয়ে হাজির হয়েছেন, সেখানে কংগ্রেস কমিটি প্রতিষ্ঠা করেছেন, গ্রামবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলছেন।

 অবস্থা ক্রমেই চরমে উঠছিল। ১৯২১ সনের ডিসেম্বর মাসে দুই পক্ষে সংঘাত বাধল—বাধবেই জানা কথা। এই সংঘাতের আপাত-উপলক্ষ্য ছিল প্রিন্স অব ওয়েলসের (ইংলণ্ডের যুবরাজের) ভারতে আগমন। কংগ্রেস একে বর্জন করল। ভারতের সর্বত্র দলে দলে লোককে গ্রেপ্তার করা হল, হাজার হাজার ‘রাজনৈতিক বন্দী’তে সমস্ত জেলখানা ভরে গেল। আমাদের মধ্যে অনেকেই সেই প্রথমবার স্বাদ পেলাম, জেলখানার মধ্যে গেলে কেমন লাগে। কংগ্রেসের নবনির্বাচিত সভাপতি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হল; তাঁর স্থানে কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করলেন হাকিম আজমল খাঁ। স্বয়ং গান্ধীজিকে কিন্তু তখন গ্রেপ্তার করা হল না। আন্দোলন ক্রমেই বাড়তে লাগল; যত লোক গ্রেপ্তার হবার জন্য সেধে এগিয়ে গেল, দেখা গেল তাদের সংখ্যা সর্বত্রই, যারা গ্রেপ্তার হচ্ছে তাদের চেয়ে অনেক বেশি। বড়ো বড়ো প্রসিদ্ধ নেতারা এবং কর্মীরা জেলে চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের জায়গাতে এসে বসতে লাগল যত নূতন অনভিজ্ঞ এবং বহু ক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত লোক (অনেক সময় পলিশের গুপ্তচররা পর্যন্ত!); তার ফলে কাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিংসাও অনুষ্ঠিত হল। ১৯২২ সনের প্রথম দিকে যুক্তপ্রদেশে গোরক্ষপুরের কাছে চৌরীচৌরাতে একদল কৃষক আর পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হল; শেষ পর্যন্ত কৃষকরা পুলিশের থানাটিকেই পুড়িয়ে দিল—থানার মধ্যে কয়েকজন পুলিশের লোক ছিল, তাদের সুদ্ধ। এই ব্যাপারে এবং আরও কয়েকটি ঘটনার ফলে গান্ধীজি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। এই-সব ব্যাপারে প্রমাণ হল, আন্দোলনের মধ্যে হিংসাত্মক বৃত্তি এসে পড়ছে। গান্ধীজির কথামতো কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যেকার আইন ভাঙার অংশটুকু বন্ধ করে দিলেন। এর অল্পদিন পরেই গান্ধীজি নিজেও গ্রেপ্তার হলেন, বিচারে তাঁর প্রতি ছ’বছর কারাদণ্ডের আদেশ হল। সেটা ১৯২২ সনের মার্চ মাসের কথা। অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম অধ্যায় এইখানে শেষ হল।