বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ভারতে হুন-উপদ্রব
৩৮
ভারতে হুন-উপদ্রব
গত চিঠিতে ভারতে নূতন এক উপদ্রবের কথা বলেছিলাম। সে হচ্ছে, হুন নামক এক জাতির উপদ্রব। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পার হয়ে ওরা ভারতে প্রবেশ করেছিল। ইতিপূর্বে রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাস আলোচনা প্রসঙ্গে একবার হুনদের উল্লেখ করেছিলাম। এত্তিলা নামে একটি লোক ছিল ইউরোপে এদের নেতা। এই লোকটি অনেক বৎসর রোম আর কন্স্টাণ্টিনোপ্লে নানা উপদ্রব আর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। এই হুনদেরই একটা শাখা ঐ সময়েই ভারতে আসে। ওরা মধ্য-এশিয়াবাসী এক বর্বর যাযাবর জাতি, শ্বেত-হুন নামে পরিচিত। অনেককাল যাবৎ এরা ভারতের সীমান্তে অত্যাচার করছিল, সম্ভবত পেছন থেকে আর-এক জাতির তাড়া খেয়ে হঠাৎ দলে দলে প্রবেশ করে ভারতে। গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্ত এই হুনদের আক্রমণে বাধা দেন, যুদ্ধে পরাস্ত করে একেবারে হটিয়ে দেন ওদের। কিন্তু বছর-বারো পরে হুনেরা আবার ফিরে আসে; ছড়িয়ে পড়ে গান্ধার এবং উত্তর-ভারতের অন্যান্য অংশে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের উপরে এরা অকথ্য অত্যাচার করেছিল।
পরবর্তী গুপ্ত-রাজাদের সঙ্গে হুনদের যুদ্ধ লেগেই ছিল; কিন্তু এদের একেবারে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় নি। হুনেরা মধ্য ভারতেও ছড়িয়ে পড়ল এবং তাদের দলপতি তোরামানকে রাজা করল। তোরামান লোকটি ভালো ছিল না। তার পত্রে মিহিরকুল ছিল নিতান্ত বর্বর আর দারুণ নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক। কহ্লন তাঁর কাশ্মীরের ইতিহাস ‘রাজতরঙ্গিণী’তে রাজা মিহিরকুলের নিষ্ঠুরতার কাহিনী বর্ণনা করেছেন: পাহাড়ের চূড়া থেকে হাতিগুলোকে নীচের উপত্যকায় ফেলে দেওয়া হত এবং এতে মিহিরকুল খুব আমোদ পেত। তার অত্যাচারে সমগ্র আর্যাবর্ত খেপে গেল। অবশেষে গুপ্ত-সম্রাট বালাদিত্য আর মধ্য-ভারতের রাজা যশোধর্মন সম্মিলিতভাবে মিহিরকুলকে আক্রমণ করলেন; যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে মিহিরকুল বন্দী হল। বালাদিত্য প্রকৃত বীরের মান রাখতে জানতেন, তাই তিনি মিহিরকুলকে মুক্তি দিয়ে এ দেশ ছেড়ে যেতে বললেন। কিন্তু মিহিরকুলের স্বভাব যাবে কোথায়? সে ঢুকিয়ে রইল কাশ্মীরে এবং পরে এক সময়ে সুযোগমতো বালাদিত্যকে আক্রমণ করল!
ভারতে হুনদের শক্তি খর্ব হল। কিন্তু হুন-বংশ একেবারে লোপ পেল না, কতক থেকে গেল, মিশে গেল আর্য অধিবাসীদের সঙ্গে। রাজপুতানা এবং মধ্য-ভারতের কোনো কোনো রাজপুত-বংশের মধ্যে অদ্যাপি শ্বেত-হুনদের রক্তের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
হুনেরা ভারতে বেশি দিন রাজত্ব করতে পারে নি, এমনকি পঞ্চাশ বৎসরও নয়। অতঃপর তারা শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করল। কিন্তু তাদের যুদ্ধবিগ্রহ এবং তার ভয়াবহতা আর্যদের মনে স্থায়ী চিহ্ন রেখে গেছে। ওদের জীবনযাত্রা ও শাসনপ্রণালী ছিল আলাদা ধরনের, ভারতীয় আর্যদের সঙ্গে খাপ খায় নি। আর্যরা স্বাধীনতাপ্রিয় জাতি; রাজাকেও জনগণের ইচ্ছার কাছে মাথা নোয়াতে হত; গ্রাম্য সংসদের হাতে ছিল প্রচুর ক্ষমতা। কিন্তু হুনদের সঙ্গে একত্র থেকে আর্যদের উন্নত আদর্শও খর্ব হয়েছিল।
গুপ্তবংশের শেষ সম্রাট বালাদিত্যের মৃত্যু হয় ৫৩০ খৃষ্টাব্দে। তিনি হিন্দু ছিলেন বটে, কিন্তু বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। এমনকি, একজন বৌদ্ধ শ্রমণকে তিনি গুরু মেনেছিলেন। গুপ্তযুগে কৃষ্ণপূজার খুব প্রচলন ছিল, কিন্তু তবুও বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে তার বিরোধ বাধে নি।
গুপ্ত-বংশ রাজত্ব করেছিল দু শো বছর-কাল। এর পরে সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ল; সবাই স্বাধীন, কেন্দ্রে কর্তৃত্ব ছিল না কারও। এ গেল উত্তরভারতের অবস্থা। ওদিকে দক্ষিণ ভারতে তখন বিরাট এক সাম্রাজ্য গড়ে উঠছে, চালুক্য-সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য স্থাপন করলেন পুলকেশী নামে এক রাজা; ইনি নিজেকে রামচন্দ্রের বংশধর বলে মনে করতেন। প্রাচ্যের দ্বীপসমূহে অবস্থিত উপনিবেশগুলির সঙ্গে দক্ষিণ অঞ্চলের লোকদের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং ভারত ও উপনিবেশগুলির মধ্যে সদাসর্বদাই যাতায়াত চলত। ভারতীয় জাহাজ নানা পণ্যদ্রবা নিয়ে পারশ্যেও যেত হামেশাই। চালুক্য সাম্রাজ্য আর পারশ্যের মধ্যে রাজদূতের বিনিময় ছিল।