বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ভূম্যধিকার প্রথা
৫৩
ভূম্যধিকার-প্রথা
বর্তমান কালের ফ্রান্স, জর্মনি, রুশিয়া এবং ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশগুলো গড়ে ওঠবার প্রাথমিক ইতিহাস গত চিঠিতে আলোচনা করেছি। ঐ দেশগুলো সম্বন্ধে এখন আমাদের যে ধারণা, সেকালের লোকদের কিন্তু সেই ধারণা ছিল না। ইংরেজ, ফরাসি আর জর্মনদিগকে আমরা আলাদা-আলাদা জাতি হিসাবে দেখি; এরাও প্রত্যেকেই নিজের দেশকে মাতৃ কিংবা পিতৃভূমি বলে মনে করে থাকে। একেই বলে জাতীয়তাবোধ। এ যুগে পৃথিবীতে এই জাতীয়তাবোধ বিশেষ প্রবল। ভারতে আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধও জাতীয় যুদ্ধ। কিন্তু সেকালে এ জিনিষটা ছিল না। তবে খৃষ্টীয় সমাজ কিংবা কোনো-একটা বিশেষ খৃষ্টান-দল-ভুক্ত হবার একটা মনোভাব তখনও ছিল। ঠিক তেমনি আবার ঐস্লামিক সমাজের একটা পরিকল্পনা মুসলমানদেরও ছিল।
কিন্তু খৃষ্টীয় কিংবা ইসলাম-সমাজের এইসমস্ত ধারণা মোটেই স্পষ্ট ছিল না, জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কও ছিল না। এইসমস্ত ধারণা শুধু মাঝে মাঝে লোকের মনে অনুপ্রেরণা দিত এবং সেই অনুপ্রেরণাতেই লোকে নিজ নিজ ধর্মের জন্য লড়াই করত। পূর্বে বলেছি, জাতীয়তাবোধ তখন ছিল না; তার পরিবর্তে ছিল মানুষে মানুষে একটা অদ্ভুতরকমের সম্পর্ক। সেটা হল জমির স্বত্বভোগের সম্পর্ক। জমিবিলির ব্যবস্থা থেকে এই সম্পর্কটার উদ্ভব হয়েছিল। রোমের পতনের পর পাশ্চাত্যে পূর্বপ্রচলিত রীতি-নীতি লোপ পেয়েছিল; সর্বত্র কেবল অনাচার, অত্যাচার এবং অরাজকতা। ক্ষমতাবান লোকেরা সবকিছু দখল করে বসত, কিছুই ছাড়ত না; আবার হয়তো অধিকতর ক্ষমতাশালী লোক এসে তাদের হটিয়ে দিয়ে নিজেরাই ঐসমস্ত দখল করত। ক্ষমতাশালী এবং জমিদারশ্রেণীর লোকেরা নানা স্থানে দুর্গ তৈরি করেছিল; মাঝে মাঝে সৈন্যসামন্ত নিয়ে তারা গ্রামাঞ্চলে গিয়ে লুঠপাট করত; কখনও-বা অন্যান্য দুর্গের অধিকারীদের সঙ্গে লড়াই করত। দরিদ্র কৃষিজীবী আর শ্রমিকদের দুর্গতির সীমা ছিল না। এই গোলযোগের থেকেই সৃষ্টি হয় ভূম্যধিকার-পদ্ধতি।
কৃষিজীবীরা তো আর দলবদ্ধ ছিল না? তাই ঐসকল ক্ষমতাশালী দস্যুদের সঙ্গে তারা পেরে উঠল না। এদের রক্ষা করবার মতো কেন্দ্রে কোনো শক্তিশালী গভর্মেণ্টও ছিল না। অনন্যোপায় হয়ে এরা নিজেরাই একটা ব্যবস্থা করল; যেখানে দুর্গের মালিক এদের উপরে অত্যাচার করত সেখানে তার সঙ্গে কৃষিজীবীদের একটা আপোস-নিষ্পত্তি হল। কথা থাকল, উৎপন্ন শস্যাদির কতক অংশ তারা ঐ দুর্গাধিপতিকে দেবে, এবং কোনো কোনো ব্যাপারে তার অনুগত থাকবে; কিন্তু দুর্গাধিপতি তাদের সম্পত্তি লুঠপাট কিংবা কোনো অত্যাচার করতে পারবে না; অধিকন্তু অপরাপর দস্যু দুর্গাধিপতিদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে হবে। ছোটো আর বড়ো দুর্গের মালিকদের মধ্যেও আবার ঐ ধরনের একটা কথাবার্তা স্থির হল। কিন্তু ছোটো তো আর নিজে চাষি নয়? সুতরাং বড়োকে উৎপন্ন শস্যের ভাগ দেবে কোথা থেকে? তাই স্থির হল, যদ্ধসংক্রান্ত ব্যাপারে সে বড়োকে সাহায্য করবে; যখনই প্রয়োজন হবে সে লড়বে। ছোটো হল বড়ো দুর্গাধিপতির প্রজা, সুতরাং বড়ো রক্ষা করবে তাকে। এইভাবে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অনুসারে ব্যবস্থাটা ধাপে ধাপে চাষি থেকে দুর্গাধিপতি এবং দুর্গাধিপতি থেকে রাজা পর্যন্ত পৌঁছল। কিন্তু সেখানেই শেষ হল না। লোকে মনে করতে লাগল, স্বর্গেও ভূম্যধিকারব্যবস্থা রয়েছে, ঈশ্বর তার সর্বময় কর্তা।
ক্রমে ইউরোপে এই ব্যবস্থাই দাঁড়িয়ে গেল। বস্তুত তখন না ছিল কোনো কেন্দ্রীয় গভর্মেণ্ট, না ছিল পুলিশের ব্যবস্থা। জমির মালিকই ছিল শাসনকর্তা, সর্বেসর্বা; তার জমিতে যারা বাস করত তাদের উপরে তারই আধিপত্য, ওদের রক্ষণাবেক্ষণের দায় তার। ছোটোখাটো একজন জায়গিরদার আর কি। তার অধীনস্থ লোকদের বলা হত ভূমিকর্ষণকারী প্রজা। একেও আবার দায়ী থাকতে হত উপরওয়ালা জমিদারের কাছে; যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে হত।
এমনকি, বিশপ, ধর্মযাজক প্রভৃতি খৃষ্টধর্মোপাসক-সমাজেও এই জায়গিরপ্রথা বিদ্যমান ছিল। ধর্মযাজকরা ছিলেন এক একজন জায়গিরদার। জর্মনিতে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ ধনসম্পত্তি আর জমিজমা বিশপ প্রভৃতি ধর্মযাজকদের হাতেই ছিল। পোপ নিজেই ছিলেন একজন ভূম্যধিকারী জমিদার।
দেখা যাচ্ছে, এই জমিদার-প্রথায় শ্রেণীবিভাগ ছিল। সমাজে মানুষে-মানুষে সাম্যের ভাব কোথাও ছিল না। সর্বনিম্ন স্তরে ছিল চাকরান—জমির প্রজা বা চাষি—তার পরে ছোটো জায়গিরদার, বড়ো জায়গিরদার, বড়ো জমিদার এবং রাজা। সমগ্র সমাজের ভার বইতে হত ঐ নিম্নস্তরের প্রজাকে। খৃষ্টীয়ধর্মোপাসক-সমাজেও ছিল এই ব্যবস্থা। ছোটো বড়ো কোনো জমিদারই শস্যোৎপাদন কিংবা অন্য কোনো পরিশ্রমের কাজ করত না। এতে তাদের মানের লাঘব হত। ওদের প্রধান কাজ ছিল যুদ্ধ করা; আর যখন যুদ্ধবিগ্রহের সুযোগ ঘটত না, তখন মত্ত থাকত শিকারে কিংবা অপর কোনো ক্রীড়ামোদে। মূর্খ আর নিরক্ষর ছিল এই জমিদারগুলো: লড়াই করা আর মদ খাওয়া ছাড়া অন্যপ্রকারের আমোদ আহ্লাদের কথা ওদের মাথায় আসত না। খাদ্য এবং অন্যান্য প্রযোজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদনের ভার ছিল চাষি আর কারিগরশ্রেণীর লোকের উপরে। এই ব্যবস্থায় সবার উপরে ছিল রাজা, যেন ঈশ্বরের একজন খাস প্রজা।
এই হল ভূম্যধিকার-প্রথার মূল কথা। জমিদারগণ তাদের প্রজাদের রক্ষা করবে, হিতাহিতের প্রতি লক্ষ্য রাখবে, এই ছিল উদ্দেশ্য; কিন্তু আদতে তারা যা খুশি তাই করত। উপরওয়ালারা কিংবা রাজা কারও কাজে হস্তক্ষেপ করত না, ওদিকে চাষিরাও পারত না তাদের বাধা দিতে। চাষিদের কোনো ক্ষমতা ছিল না; সুতরাং জমিদারগণ ওদের কাছ থেকে জোর করে সব-কিছু আদায় করত, প্রজাদের দুর্দশার সীমা থাকত না। সর্বদেশে সর্বকালে জমির মালিকদের রীতিই এই। জমিদার বরাবর ভদ্র আখ্যা পেয়ে এসেছে; সমাজে তার যথেষ্ট প্রতিপত্তি, বিস্তর ক্ষমতা, তা সে দস্যুতা করে জমির মালিক হলেও! চাষি, উৎপাদক কিংবা শ্রমিকের কাছ থেকে যত বেশি সম্ভব আদায় করাই তার কাজ। আইনও জমিদারদের পক্ষে, কেননা, সে আইন তো তারা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছে। এই কারণেই অনেকে মনে করেন, ভূসম্পত্তি কোনো একজনের হাতে না থেকে সমাজ-গাষ্ঠীর অধীনে থাকা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্র অথবা সমাজ-গোষ্ঠীর হাতে জমি থাকার মানে, তাতে সকলেরই সমান স্বত্ব, কোনো একজন লোক অন্যভাবে শোষণ করতে কিংবা অসংগত সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
কিন্তু এই ধারণা তখন কোথায়? আমরা যে সময়ের কথা বলছি তখন কেউ এই দিক থেকে কথাটা ভাবে নি। নিতান্ত দুরবস্থা সহ্য করা ছাড়া সাধারণ লোকের কোনো উপায় ছিল না। বশ্যতা যদি মজ্জাগত হয়ে যায়, লোকে সব-কিছু সহ্য করতে পারে।
তা হলে তখন সমাজে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? এক দিকে জমিদার ও তার অনুগৃহীতের দল, অপর দিকে নিতান্ত গরিব ও অসহায় জনগণ। ভূম্যধিকারীর অট্টালিকা ও দুর্গের চার দিকে গরিবদের বস্তি। এ যেন দুটো পৃথিবী, একটার সঙ্গে আর-একটার যোগ নেই। জমির মালিক চাষি প্রজাদের গরু, বাছুরের শামিল মনে করত। কখনও কখনও নিম্নস্তরের যাজক সম্প্রদান চাষিদের পক্ষ অবলম্বন করত বটে, কিন্তু সাধারণত তারা জমিদারদের পক্ষ সমর্থন করত। আর তা করবেই-বা না কেন? বিশপরা নিজেরাই যে ছিল এক-একজন ভূম্যধিকারী।
ভারতে ঠিক এইরূপ ভূম্যধিকার প্রথা না থাকলেও কতকটা এই ধরনের ব্যবস্থা ছিল। আজও ভারতীয় রাজ্যগুলোতে তার অনেক পদ্ধতি প্রচলিত আছে। জাতিভেদ প্রথাই তো সমাজে নানা শ্রেণীর সৃষ্টি করেছে। চীনদেশে কোনো কালে এই ধরনের স্বৈরশাসনব্যবস্থা (Autocracy) ছিল না। সে দেশে সরকারি কর্মচারী-নিয়োগের যে পরীক্ষাব্যবস্থা ছিল তাতে করে যে-কোনো লোক সর্বোচ্চ পদের অধিকারী হতে পারত।
ভূম্যধিকার-প্রথায় সাম্য কিংবা স্বাধীনতার স্থান ছিল না। ছিল অধিকার আর কর্তব্যের প্রশ্ন। অধিকার হিসাবে জমিদার তার পাওনাটা ষোলো আনাই আদায় করে নিত, কিন্তু পরিবর্তে চাষিদের প্রতি কর্তব্যটা যেত ভুলে। এমনটাই হয়, অধিকার সাব্যস্ত করতে ভুল হয় না, যত অবহেলা কর্তব্যপালনের বেলা। ইউরোপে এবং ভারতবর্ষে আজকালও এমন অনেক জমিদার আছে যারা প্রজাদের কাছ থেকে শুধু শুধু প্রচুর খাজনা আদায় করে থাকে, বাধ্যবাধকতার কোনো ধার ধারে না।
ইউরোপের প্রাচীন বর্বরজাতিরা ছিল স্বাধীনতাপ্রিয়; কিন্তু ক্রমে ওদের মধ্যেও ভূম্যধিকারপ্রথা প্রচলিত হল। অথচ এই প্রথা স্বাধীনতার বিরোধী। ঐ বর্বরজাতিরা তাদের নেতা বা রাজা নির্বাচন করত, তাকে শাসনে রাখত। কিন্তু এখন দেখছি, সর্বত্র স্বেচ্ছাচারতন্ত্র বা অটোক্র্যাসির যুগে নির্বাচনের ব্যবস্থা পেয়েছে লোপ। এই পরিবর্তন কেন হল, বলতে পারি না। সম্ভবত খৃষ্টীয় ধর্ম সমাজ কর্তৃক গণতন্ত্রবিরোধী মতের প্রচার এর জন্য দায়ী। রাজাকে মনে করা হত পৃথিবীতে ঈশ্বরের ছায়া; এমতাবস্থায় সর্বশক্তিমান পরমেশ্বরের ছায়াকে অমান্য করা কিংবা তার সঙ্গে তর্ক বিতর্ক করা কি সম্ভব? স্বর্গ-মর্ত দুইই এই ভূম্যধিকার-প্রথার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিল।
প্রাচীনকাল থেকে ভারতে স্বাধীনতার যে আদর্শ বিদ্যমান ছিল, কালক্রমে তা লোপ পেয়ে যায়। তবে মধ্যযুগের প্রথমভাগেও ঐ আদর্শ লোকের মনে কিয়ৎপরিমাণে জাগরূক ছিল, শুক্রাচার্যের ‘নীতিসার’ এবং দাক্ষিণাত্যের শিলালিপি থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যায়।
ক্রমে ইউরোপে নূতন নূতন আদর্শ ও ব্যবস্থার সূত্রপাত হল, ধীরে ধীরে স্বাধীনতার আলো দেখা দিল। জমিদার এবং চাষি ক্রীতদাস ছাড়াও সমাজে অন্যান্য শ্রেণীর লোক ছিল, যেমন—কারিগর ও ব্যবসায়ী। এরা জায়গির প্রথার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী এবং কারিগরদের প্রাধান্য বেড়ে গেল, অর্থশালী হয়ে উঠল তারা; লর্ড, জমিদার প্রভৃতি ওদের কাছ থেকে টাকাকড়ি ধার করতে শুরু করল। ওরা ধার দিলে বটে, কিন্তু পরিবর্তে কতকগুলো সুবিধা ও অধিকার আদায় করে নিলে; তাতে করে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল ওরা। ফলে কী হল জানো? এখন আর লর্ডদের দুর্গের আশেপাশে চাষি বা ক্রীতদাসদের ছোটো ছোটো কুঁড়েঘরগুলি রইল না; দেখা গেল, গির্জা, ক্যাথিড্রাল কিংবা সমিতি ও সভাগৃহকে কেন্দ্র করে ছোটো ছোটো শহর গড়ে উঠছে। ব্যবসায়ী এবং কারিগরশ্রেণীর লোকেরা নানা সমিতি বা মিলনগৃহ স্থাপন করত, কালক্রমে ওগুলো থেকেই টাউন হলের সৃষ্টি হয়েছে।
এই-যে নগরগুলো গড়ে উঠছিল—কলোন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, হ্যামবুর্গ ইত্যাদি, এগুলো খাড়া হল ভূম্যধিকারীদের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে। ওখানে গড়ে উঠছিল একটা নূতন শ্রেণী, নূতন সমাজ—বণিক আর ব্যবসায়ীর সমাজ। এই শ্রেণী ছিল বিত্তশালী, জমিদাররা পাত্তা পেত না ওদের কাছে। এই শ্রেণীই চলল বহুকাল। লর্ড আর জমিদারদের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতে হত রাজাকে, তাই অনেক সময়ে রাজা ঐসমস্ত নগরগুলোর পক্ষই সমর্থন করত।
আমি অনেক দূর এগিয়ে গেছি। তখনকার দিনে যে জাতীয়তাবোধ বলে কিছু ছিল না, সে কথাটাই তোমাকে বলতে শুরু করেছিলাম। ঊর্ধ্বতন প্রভু বা লর্ডের প্রতি কর্তব্য আর বাধ্যবাধকতা ছাড়া লোকে আর-কিছু জানত না, এমনকি রাজার সম্পর্কেও তাদের কোনো সঠিক ধারণা ছিল না। জমিদার যদি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তাদের কী আসে যায়?—তারা সমর্থন করবে জমিদারকে। সুতরাং দেখতে পাচ্ছ, জাতীয়তাবোধের সঙ্গে এই ধারণার মিল নেই কোনো।
তবে ন্যাশন্যালিটি অর্থাৎ জাতীয়তাবোধের উন্মেষ হল কবে?—সে অনেক কাল পরের কথা।