বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/মধ্যযুগের অবসান
৭২
মধ্যযুগের অবসান
ত্রয়োদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর ইউরোপে আবার ফিরে যাওয়া যাক। সে সময়টা ছিল ভয়ংকর রকম বিশৃঙ্খলা, মারামারি, আর হানাহানির যুগ। ভারতবর্ষের অবস্থাও তখন বেশ শোচনীয়, তবে ইউরোপের তুলনায় তাকে শান্তিপূর্ণই বলা চলত।
মঙ্গোলীয়রা ইউরোপে বারুদ আমদানি করায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার তখন শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহী সামন্ত অভিজাতদের (noble) দমন করতে রাজারা আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্য নিলেন। এই কাজে তাঁরা শহরের নূতন বণিকশ্রেণীর কাছ থেকে যথেষ্ট সাহায্য পান। এই অভিজাতসম্প্রদায়ের কাজই ছিল নিজেদের ভিতরে অনবরত ছোটোখাটো যুদ্ধে লিপ্ত থাকা। এতে তাদের শক্তির হ্রাস ঘটেছিল, আশেপাশের পল্লীপ্রান্তকেও উদ্ব্যস্ত করে তুলেছিল। রাজা তাঁর ক্ষমতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এইসব ঘরোয়া যুদ্ধের অবসান ঘটালেন। কোনো কোনো জায়গায় রাজমুকুট দাবি করে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে গৃহযুদ্ধ বেধে যেত। যেমন, ইংলণ্ডে হাউজ অব ইয়র্ক আর হাউজ অব ল্যাঙ্কাস্টার, এই দুই পরিবারের সংঘর্ষ। উভয় দলেরই বিশিষ্টি চিহ্ন ছিল গোলাপ; একদলের শাদা, অপরের লাল। এই যুদ্ধগুলি তাই গোলাপের যুদ্ধ (Wars of the Roses) নামে খ্যাত। এই গহযদ্ধে বহু সামন্ত জমিদারের মৃত্যু হয়। ক্রুসেড অথবা ধর্মযুদ্ধেও এদের অনেকে মারা যায়। এইভাবে ক্রমে ক্রমে সামন্ত প্রভুরা আয়ত্তে আসে। কিন্তু এ থেকে বোঝায় না যে, সামন্ত জমিদারদের ক্ষমতা জনগণের কাছে হস্তান্তরিত হয়। বরং রাজা আরও প্রতাপান্বিত হতে লাগলেন। সাধারণ লোকের অবস্থা প্রায় সমানই রইল, তবে ঘরোয়া যুদ্ধের অবসানে তাদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হল। রাজা অবশ্য ক্রমে সর্বময় প্রভু ও একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন। তখনও রাজা ও নূতন বর্ণিকশ্রেণীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় নি।
যুদ্ধ ও হত্যালীলার চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়ে ১৩৪৮ সালের কাছাকাছি ইউরোপে দেখা দিল ‘করাল মহামারী’ (The Great Plague) রাশিয়া ও এশিয়া মাইনর থেকে ইংলণ্ড অবধি সারা ইউরোপে সেটা ছড়িয়ে পড়ল। গেল মিশরে, উত্তর-আফ্রিকায়, মধ্য-এশিয়ায়, অবশেষে বিস্তার লাভ করল পশ্চিমে। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মৃত্যুর তমসা’ (The Black Death)। লক্ষ লক্ষ লোক এরই কবলে প্রাণ দিল। ইংলণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়, চীন ও অন্যান্য জায়গাতেও মৃত্যুসংখ্যা অভাবনীয়। ভারতবর্ষ কিন্তু অদ্ভুতভাবে এর হাত থেকে বেচে গেল।
এই সর্বনাশের পর লোকসংখ্যা এত কমে যায় যে, ভূমি কর্ষণের লোকেরও অভাব ঘটে। সেই কারণেই মজুরের মজুরির অত্যন্ত হীন অবস্থা থেকে কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা দেখা যায়। কিন্তু আইনসভা তখন জমিদার ও মালিকদের অধিকারে। তারা লোককে অত্যন্ত অল্প মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করে আইন পাশ করায়। বেশি চাইবার অধিকারও দূর হয়। লাঞ্ছিত ও শোষিত কৃষক ও জনসাধারণের সহ্যের সীমা অতিক্রম করায় তারা বিদ্রোহ করে। সমস্ত পশ্চিম-ইউরোপ জুড়ে একের পর এক কৃষক বিদ্রোহ হতে থাকে। ১৩৫৮ সালে ফ্রান্সে ‘জ্যাকোয়ারি’ নামে খ্যাত বিদ্রোহ ঘটে। ইংলণ্ডে তখন ‘ওয়াট টাইলার’ এর বিদ্রোহ। ১৩৮১ সালে ইংরেজ-রাজের সামনে ওয়াট টাইলারকে মারা হয়। এসমস্ত বিদ্রোহ অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্যের নূতন আদর্শ তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। লোকের মনে তখন জেগেছে আত্মজিজ্ঞাসা—কেন তাদের এই দারিদ্র্য আর নিত্য উপবাস, আর অপরদের কেন এত ধনসম্পদ আর প্রাচুর্য? কেন কেউ প্রভু, কেউ হুকুমের দাস? কারও দেহে শৌখিন পোশাক, আর কারও দেহাবরণের জন্যে একটা ছেঁড়া ন্যাকড়াও জোটে না কেন? কর্তৃপক্ষের প্রভুত্বের নিকট নতিস্বীকারের পুরোনো আদর্শ—যার উপরে সমস্ত সামন্ততন্ত্রের প্রতিষ্ঠা—ভেঙে পড়বার উপক্রম হল। তাই বারবার হতে থাকল কৃষক-অভ্যুত্থান, কিন্তু দুর্বল সংগঠনের জন্যে তাদের সহজেই দমন করা হল, যদিও কিছুদিন পরেই তারা আবার মাথা চাড়া দিয়ে জেগে উঠেছিল।
ইংলণ্ড ও ফ্রান্স প্রায় সর্বক্ষণই পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে রত থাকত। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদের ভিতরে চলেছিল ‘শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ’। ফ্রান্সের পূর্বদিকে বারগাণ্ডি এক শক্তিশালী রাষ্ট্র, যদিও নামে ফ্রান্সের রাজার অনুগত। কিন্তু অনুগত রাষ্ট্রের তুলনায় বারগাণ্ডি ছিল অত্যন্ত উদ্ধত ও অশান্ত। ইংলণ্ড এই বারগাণ্ডি ও আরও কয়েকটি শক্তির সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে চতুর্দিক থেকে ফ্রান্সকে চেপে ধরল। পশ্চিমফ্রান্সের বেশ একটা বড়ো অংশ বহু দিন ধরে ইংরেজের অধিকৃত হয়ে রইল এবং ইংলণ্ডের রাজা নিজেকে ‘ফ্রান্সের রাজা’ বলতে শুরু করলেন। ফ্রান্স যখন দুর্দশার শেষ সীমায় পৌঁচেছে, যখন তার কোথাও আর আশাভরসা নেই, তখন একটি কিশোরী কৃষকমেয়ের রূপ ধরে তার সামনে এসে দাঁড়াল বিজয়ের সংকেত। তুমি তো আর্লেয়াঁর মেয়ে জোয়ান অব্ আর্কের কথা কিছু কিছু জানো, তুমি তো তার খুব ভক্ত। সেই মেয়ে তার ভগ্নোদ্যম দেশের লোকের হৃদয়ে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে বিরাট প্রচেষ্টায় উদ্বুদ্ধ করল, এবং তারই নেতৃত্বে দেশের মাটি থেকে তারা ইংরেজকে বিতাড়িত করল। কিন্তু এসবের জন্যে তার পুরা্কার মিলল ইন্কুইজিশনের বিচার, ও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর শাস্তি। ইংরেজ তাকে ধরে নিয়ে চার্চের কাছে দোষী প্রতিপন্ন করল, এবং রোয়েঁর প্রকাশ্য বাজারে ১৪৩০ সালে তাকে পুড়িয়ে মারল। বহু বৎসর পরে রোমান চার্চ দোষীর সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়ে পুরোনো ভুল শোধরাবার চেষ্টা করে। এবং আরও বহু পরে তাকে ‘সেণ্ট’, মহাপ্রাণ, এই আখ্যা দেওয়া হয়!
জোয়ান তার স্বদেশভূমিকে বিদেশীর হাত থেকে বাঁচানোর কথা বলেছিল। এ ছিল সম্পূর্ণ নূতন ধরনের কথা। তখনকার দিনের লোকেদের চিন্তাধারা সামন্ততান্ত্রিকতায় এত বেশি পূর্ণ ছিল যে, তারা জাতীয়তাবাদের কথা ভাবতে পারত না। কাজেই জোয়ানের কথা তাদের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করেছিল, তাকে তারা ভালো করে বুঝতে পারে নি। জোয়ান অব্ আর্কের সময় থেকেই দেখি ফ্রান্সে ক্ষীণ জাতীয়তাবাদের উদ্ভব।
ইংরেজকে দেশ থেকে তাড়ানোর পর ফ্রান্সের রাজা বারগাণ্ডির দিকে মন দেয়, কারণ বারগাণ্ডি তাকে বহু জ্বালিয়েছে। অবশেষে এই প্রতাপান্বিত অনুগত রাজ্যটি আয়ত্তাধীনে আসে, এবং ১৪৮৩ সালে ফ্রান্সের এক অংশ বলে গণ্য হয়। ফরাসি রাজা এবার বেশ ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে সে সামন্ত জমিদারদের হয় উৎখাত করেছে, নয়তো সম্পূর্ণ নিজের অধীনস্থ করেছে। ফ্রান্স বারগাণ্ডিকে আত্মসাৎ করবার পর এবার এল জর্মনির সঙ্গে তার বোঝাপড়ার পালা। এদের সীমান্তদেশ এবার পরস্পরের গায়ে লাগালাগি হয়ে গেল। তবে ফ্রান্সে ছিল কেন্দ্রীভূত বলশালী রাজতন্ত্র, আর জর্মান কতকগুলি ছোটো ছোটো রাষ্ট্রে বিভক্ত ও দুর্বল।
এদিকে ইংলণ্ড আবার তখন স্কটল্যাণ্ড অধিকারের চেষ্টায় ছিল। এও এক বহু দিনব্যাপী সংগ্রামের কাহিনী, এবং স্কটল্যাণ্ড বেশির ভাগ সময়ই ইংলণ্ডের বিপক্ষে ফ্রান্সের সঙ্গে যোগ দিত। ১৩১৪ খৃষ্টাব্দে রবার্ট্ ব্রুসের নেতৃত্বে স্কটল্যাণ্ডবাসী ‘ব্যানক্বার্ন’-এ ইংরেজকে পরাজিত করে।
এরও আগে, দ্বাদশ শতাব্দীতে, ইংলণ্ডের আয়র্ল্যাণ্ডকে জয় করবার প্রচেষ্টা শুরু হয়। সে আজ সাত শো বছর আগের কথা; এবং তখন থেকেই আয়র্ল্যাণ্ডে যুদ্ধ, বিদ্রোহ, সন্ত্রাস ও আতঙ্ক লেগেই ছিল। বিদেশী প্রভুর কাছে নতিম্বীকার করতে এই ছোট দেশটা কোনোমতেই রাজি হয় নি, তাই পুরুষানুক্রমে বিদ্রোহ করে সে নিজের স্বাতন্ত্র্যবোধকে ঘোষণা করেছে।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউরোপের আর একটি ক্ষুদ্র দেশ সুইজারল্যাণ্ড তার স্বাধীনতার অধিকার দাবি করে। এটি ছিল পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের একটি অংশ, অস্ট্রিয়া দ্বারা শাসিত। তুমি উইলিয়ম টেল্ আর তার ছেলের গল্প নিশ্চয় পড়েছ, কিন্তু সেটা বোধ হয় সত্যি নয়। বিরাট সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সুইস্ কৃষকদের বিদ্রোহের গল্প আরও চমৎকার। কিছুতেই তারা হার মানবে না। প্রথমে তিনটি ক্যাণ্টন অথবা জেলা বিদ্রোহ করে ও ১২৯১ সালে তাদের ‘চিরস্থায়ী দল’ নামে এক সংঘ গঠন করে। অন্য ক্যাণ্টনগুলিও যোগ দেয়, এবং ১৪৯৯ সালে সুইজারল্যাণ্ডে স্বাধীন সাধারণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। বিভিন্ন ক্যাণ্টনের সংঘ হওয়াতে এর নাম হয় ‘সুইস্ কন্ফেডারেশন’। তোমার মনে আছে তো, অগাস্ট মাসের প্রথম দিনে সুইজারল্যাণ্ডের কত পাহাড়ের চূড়ায় আমরা আগুন জ্বলতে দেখেছি? সেটা সুইস্দের জাতীয় দিবস, সুইস্-বিপ্লবের সমাবর্তন-উৎসবের দিন। এইদিনের আরম্ভে আগুন জ্বালিয়ে অস্ট্রিয়ান শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সংকেত করা হয়েছিল।
ইউরোপের পূর্বদিকে কন্স্টাণ্টিনোপ্লে তখন কী হচ্ছিল? তোমার নিশ্চয় মনে আছে, লাতিন-ধর্মযোদ্ধারা খৃষ্টোত্তর ১২০৪ সালে গ্রীকদের হাত থেকে এই শহরটা কেড়ে নেয়। ১২৬১ সালে গ্রীকরা এদের বিতাড়িত করে ‘পূর্ব-সাম্রাজ্যে’র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু মাথার উপরে তখন আরও বড়ো একটা বিপদ ঘনিয়ে আসছিল।
মঙ্গোলীয়রা যখন এশিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে এসেছিল, তাদের সামনে থেকে পঞ্চাশ হাজার অটোমান তুর্কি পলায়ন করেছিল। এরা ছিল সেলজুক তুর্কি থেকে বিভিন্ন। এরা ‘অথম্যান’ বা ‘ওস্মান’ নামে এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতাকে নিজেদের পূর্বপুরুষ বলে দাবি করত, তাই তাদের নাম ছিল ‘অটোম্যান’ বা ‘ওসমান্লি’ তুর্কি। এই অটোম্যানরা পশ্চিম-এশিয়ায় সেলজুকদের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই সেলজুক তুর্কিদের শক্তিহ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে অটোম্যানদের ক্ষমতা বাড়তে থাকে। তারা ক্রমশ অধিকার বিস্তার করতে থাকে। পূর্ববর্তী অনেকের মতো তারা কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ আক্রমণ করতে গেল না, বরং একে অতিক্রম করে ১৩৫৩ অব্দে গিয়ে প্রবেশ করল ইউরোপে। সেখানে তারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। বুলগেরিয়া ও সার্বিয়া অধিকার করে অ্যাড্রিয়ানোপ্লে তারা রাজধানী স্থাপন করল। এইভাবে অটোম্যান-সাম্রাজ্য কন্স্টাণ্টিনোপ্লের দুই ধার দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপে প্রসারিত হল। কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ বেষ্টিত হল বটে, কিন্তু এর অন্তর্গত হল না। এক হাজার বছরের পুরোনো গর্বিত পূর্ব-রোম-সাম্রাজ্যের চিহ্ন রইল শুধু এই ছোট্ট শহরটিতে, কার্যত আর কোথাও না। তুর্কিরা যদিও পূর্বসাম্রাজাকে অতি দ্রুত গ্রাস করছিল তবু তখন সুলতান ও সম্রাটদের মধ্যে বিশেষ সম্প্রীতি দেখা গেছে, পরস্পরের পরিবারে তাদের বিবাহাদিও চলেছিল। অবশেষে ১৪৫৩ সালে কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ তুর্কিদের হস্তগত হয়। এখন শুধু অটোম্যান তুর্কিদের কথাই বলব। সেলজুকরা ইতিমধ্যে যবনিকার অন্তরালে অদৃশ্য হয়েছে।
কন্স্টাণ্টিনোপ্লের পতন বহুদিন ধরে আশঙ্কিত হলেও এটা ইউরোপকে বড়োরকমের একটা নাড়া দিল। এর পতনের সঙ্গে সঙ্গে এক হাজার বছরের পুরোনো গ্রীক পূর্ব-সাম্রাজ্যের অবসান ঘটল এবং ইউরোপে মুসলিম আক্রমণের আর-একটা পর্বের সূচনা হল। তুর্কিরা অবিরত বিস্তার লাভ করে চলল, মাঝে মাঝে মনে হত বুঝি তারা সমগ্র ইউরোপকে অধিকার করে বসবে, কিন্তু তারা বাধা পেল এসে ভিয়েনার দ্বারদেশে।
সম্রাট জাস্টিনিয়ন ষষ্ঠ শতাব্দীতে ‘সেণ্ট সোফিয়া’র যে বিরাট ধর্মমন্দির নির্মাণ করেছিলেন, সেটা পরিণত হল ‘আরা সুফিয়া’ নামে এক মসজিদে, এর ধনসম্পত্তির কিছু লুণ্ঠনও হয়েছিল। ইউরোপ অত্যন্ত খেপে গেল বটে, কিন্তু কিছুই করতে পারল না। সত্যি কথা বলতে কী, তুর্কি সুলতানরা গোঁড়া গ্রীক চার্চ সম্পর্কে খুব সহিষ্ণু ছিলেন, এবং কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্-অধিকারের পরে সুলতান দ্বিতীয় মহম্মদ কার্যত নিজেকে গ্রীক চার্চের রক্ষাকর্তা বলে ঘোষণা করেছিলেন। মহামহিমান্বিত সুলেমান (Suleiman the Magnificent) নামে খ্যাত এক পরবর্তী সুলতান নিজেকে প্রাচা-সম্রাটদের প্রতিনিধি বিবেচনা করতেন, ও ‘সিজার’ উপাধি গ্রহণ করেন। পুরোনো ঐতিহ্যের এমন ক্ষমতা।
অটোম্যান তুর্কিরা কন্স্টাণ্টিনোপ্লের গ্রীকদের কাছে খুব অবাঞ্ছনীয় হয়েছিল বলে মনে হয় না। প্রাচীন সাম্রাজ্যের মুমূর্ষু দশা তারা দেখেছিল। পোপ এবং পাশ্চাত্য খৃষ্টধর্মাবলম্বীর চেয়ে তারা তুর্কিদেরই পছন্দ করেছিল। লাতিন-ধর্মবোদ্ধাদের সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা বিশেষ সুবিধের ছিল না। কথিত আছে যে, ১৪৫৩ সালে কন্স্টাণ্টিনোপ্লের বিগত অবরোধের সময় ‘বাইজানটিনা’র এক ধনী অভিজাত বলেছিলেন, “পোপের মস্তকাবরণের চেয়ে পয়গম্বরের পাগড়িও ভালো।”
তুর্কিরা একটা নূতন ধরনের বাহিনী গড়ে তোলে, একে বলত ‘যানিসারিজ’। খৃষ্টধর্মাবলম্বীদের কাছ থেকে দান হিসাবে তাদের সন্তানদের গ্রহণ করে এক বিশেষ শিক্ষায় শিক্ষিত করত। বাপ-মায়ের কাছ থেকে ছেলেদের আলাদা করে রাখা খুবই নিষ্ঠুর কাজ বটে, তবে এসব ছেলেদের একটা সুবিধে ছিল এই যে, ভালো শিক্ষা পেয়ে তারা একরকম অভিজাত সামরিক-শ্রেণীতে পরিণত হত। এই যানিসারিদের বাহিনী ছিল অটোম্যান সুলতানদের এক স্তম্ভস্বরূপ। ‘বানিসারি’ শব্দটি এসেছিল ‘যান’ (জীবন) ও ‘নিসার’ (উৎসর্গ) থেকে—অর্থাৎ এমন একজন যে তার জীবন উৎসর্গ করতে পারে।
ঠিক এইভাবে মিশরে ‘মামেলুক’ নামে যানিসারির মতোই এক বাহিনী গঠিত হয়। এই বাহিনী সর্বময় ক্ষমতা লাভ করেছিল, এমনকি এর মধ্য থেকে মিশরের সুলতান পর্যন্ত মনোনীত হত।
কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ অধিকারের পর অটোম্যান সুলতানরা যেন তাঁদের পূর্ববর্তী বাইজানটিনার সম্রাটদের বিলাস ও কলুষতার কদভ্যাসগুলি উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করেছিলেন। বাইজানটিনার অধঃপতিত সাম্রাজ্যের রীতিনীতি তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে তাদের সমস্ত শক্তিকে ক্রমে নষ্ট করে ফেলতে লাগল। তবে কিছুদিনের জন্যে তাদের শক্তির কাছে খৃষ্টীয় ইউরোপকে ভয়ে কম্পমান হতে হয়েছিল। মিশরকে পরাভূত করে তারা আব্বাসিদের দুর্বল ও হীনশন্তি প্রতিভূর কাছ থেকে ‘খলিফা’ উপাধি কেড়ে নেয়। সেই সময় থেকে কিছু দিন আগে পর্যন্তও অটোম্যান সুলতানরা নিজেদের ‘খলিফা’ বলে পরিচয় দিয়ে এসেছেন। মুস্তাফা কামাল পাশা ‘সুলতান’ ও ‘খলিফা’ দুয়েরই উচ্ছেদ করে এর অবসান ঘটান।
কন্স্টাণ্টিনোপ্লের পতনের দিনটি ইতিহাসে স্মরণীয়। একটা যুগের অবসান ও নূতন যুগের শুরু হিসাবে একে ধরা হয় যুগসন্ধি বলে। মধ্যযুগ শেষ হয়ে গেল। এক হাজার বৎসরের ‘অন্ধকারের যুগ’ শেষ হয়ে ইউরোপে দেখা দিল নূতন প্রাণের স্পন্দন। একেই বলা হয় ‘রেনেসাঁস’-এর গোড়ার দিক—সাহিত্য ও শিল্পের নবজন্ম। যেন বহুদিনের ঘুমের ঘোর কাটিয়ে মানুষ জেগে উঠল। বহু শতাব্দীর পর্দা ভেদ করে তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সেই প্রাচীন গ্রীসে, তার গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলির উপরে। এরাই তাকে জোগাল অনুপ্রেরণা। চার্চের শেখানো জীবনের যে ভয়াবহ আর গাম্ভীর্যময় রূপ মানবাত্মাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তারই বিরদ্ধে সমস্ত মনের মধ্যে এক বিদ্রোহের সুর বেজে উঠল। আবার দেখা দিল সুন্দরের প্রতি পুরোনো গ্রীক অনুরাগ, ইউরোপ বিকশিত হয়ে উঠল শিল্প ও ভাস্কর্যের নিপুণতম অবদানে।
অবশ্য এ সবই সহসা কন্স্টাণ্টিনোপ্লের পতন জনিতই নয়। সেরকম ভাবা ভারি ভুল হবে। তুর্কিদের দ্বারা শহরটি অধিকৃত হওয়ায় সমস্ত পরিবর্তনটা দ্রুতগতিতে ঘটেছিল বটে, কারণ বহুসংখ্যক জ্ঞানী ও গুণী লোক শহর ছেড়ে পশ্চিমে চলে যান। ঠিক যে সময় পশ্চিম রসগ্রহণে প্রস্তুত হয়েছিল, এঁরা ইতালিতে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন গ্রীক সাহিত্য-ভাণ্ডারের সেরা জিনিষগুলি। এ হিসেবে অবশ্য কন্স্টাণ্টিনোপ্লের পতন রেনেসাঁসকে আহ্বান করতে অল্প কিছুটা সাহায্য করেছিল।
কিন্তু এটা বিরাট পরিবর্তনের একটা ক্ষুদ্র নিমিত্তমাত্র। প্রাচীন গ্রীক সাহিত্য ও চিন্তাধারা ইতালি বা মধ্যযুগীয় পশ্চিমের কাছে কিছু নূতন জিনিষ ছিল না। লোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করত, জ্ঞানী লোকেরাও এসবের কথা আগেই অবগত ছিলেন। কিন্তু এসব খুব অল্প লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তখনকার জীবনাদর্শের সঙ্গে খাপ না খাওয়ায় বিস্তৃতি লাভ করতে পারে নি। ক্রমে মানুষের মনে প্রচলিত জীবনযাত্রার প্রতি সংশয় জাগল, নূতন আদর্শ ও চিন্তাধারার উন্মেষের ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে লাগল। এতদিনের জানা জিনিষ নিয়েই তারা আর সন্তুষ্ট হতে পারল না, আরও বেশি জানবার আকাঙ্ক্ষায় তারা নূতনের সন্ধানে মন দিল। আশা-আশঙ্কায় ভরা মনের এই অবস্থায় যখন তারা গ্রীসের পুরোনো pagan (প্যাগান) দর্শনকে আবিষ্কার করল, সেই সাহিত্যকে তারা পান করল আকণ্ঠ। মনে হল এতদিনের বাঞ্ছিত জিনিষ তারা খুঁজে পেয়েছে, একে আবিষ্কার করে তারা উৎসাহে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল।
রেনেসাঁসের প্রথম শুরু হয় ইতালিতে। পরে তার আবির্ভাব হয় ফ্রান্সে, ইংলণ্ডে ও অন্যান্য জায়গায়। এটা শুধু গ্রীক সাহিত্য ও ভাবধারার পুনরাবিষ্কার নয়, তার চেয়ে অনেক বৃহৎ অনেক মহৎ। ইউরোপে যা এতদিন প্রচ্ছন্নভাবে চলেছিল, এ হল তারই বহিঃপ্রকাশ। প্রকাশভঙ্গির আরও কত নব নব উন্মেষ দেখা দিয়েছিল। রেনেসাঁস তারই একটা রূপ।