বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/মহাসমরের পূর্বের শতবর্ষ
১০৭
মহাসমরের পূর্বের শতবর্ষ
১৮১৪ খৃষ্টাব্দে নেপোলিয়নের পতন হল। পরের বছরে এল্বা থেকে ফিরে আবার তাঁর পরাজয় ঘটেছিল বটে, কিন্তু তাঁর শাসনপ্রণালী ১৮১৪ অব্দেই ধ্বসে পড়েছিল। আর ঠিক এক শো বছর পরে ১৯১৪ সালে বাধল মহাযুদ্ধ, চার বছর ধরে জগৎ জুড়ে ঘটল ভীষণ ধ্বংসলীলা। এই একশোটি বছর আমাদের সবিশেষ পর্যালোচনা করতে হবে। গত পত্রেই এ যুগের কিছু আভাস আমি তোমাকে দিয়েছি। ভিন্ন ভিন্ন দেশে খণ্ড খণ্ড করে এ যুগটি আলোচনা করার আগে একটা পূর্ণাঙ্গ আভাস গ্রহণ করায় উপকার হবে বলেই মনে করি। এতে এই শত বর্ষের ঘটনাবলীর প্রধান ধারাটাকে অনুসরণ করা যাবে—তরুলতাগুলি তো দেখা যাবেই, পুরো অরণ্যটিও বাদ পড়বে না।
১৮১৪ থেকে ১৯১৪, এই এক শো বছর জানোই তো প্রধানত ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই পড়ে। অতএব ঠিক না হলেও একে আমরা ঊনবিংশ শতকই বলব।
ঊনবিংশ শতাব্দী একটি চমৎকার যুগ। কিন্তু এর আলোচনা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। বিরাট দৃশ্যপট এটি, আমরা এর এত কাছে বলেই হয়তো একে বৃহত্তর ও পূর্ণতর বোধ হয় আগের শতাব্দীগুলির তুলনার। এই সহস্র গ্রন্থির জট যখন আমরা ছাড়াতে চেষ্টা করব তখন এই বিপুলতা, এই জটিলতা সময়ে সময়ে আমাদের অবাক করে দেবে।
যান্ত্রিক অগ্রগতি এই শতাব্দীতেই দ্রুততম। শ্রম শিল্পের বিপ্লব সঙ্গে নিয়ে এল যন্ত্রশিল্পের বিপ্লবকে, মানুষের জীবনে যন্ত্র অত্যাবশ্যক হয়ে উঠল। পূর্বে মানুষ যা করত এখন যন্ত্রই সেগুলি করতে লাগল, ফলে কাজ করার দরূণ একঘেয়ে শ্রমের লাঘব হল, প্রাকৃতিক উপাদানগুলির উপর তার নির্ভরশীলতা দিল কমিয়ে, এমনকি অর্থও আনতে লাগল তার ঘরে। বিজ্ঞানের সাহায্যে যানবাহন-সমস্যা দ্রুত সরলতর হয়ে আসতে লাগল। রেলপথ এসে হটিয়ে দিল পুরোনো ঘোড়ার গাড়িকে। পাল-তোলা জাহাজের জায়গা জুড়ে নিল কলের জাহাজ, আর তার পরে এল বিরাট অর্ণবপোত—বিপুল, উত্তুঙ্গ—মহাদেশ থেকে মহাদেশে তারা দ্রুতবেগে ও যথানিয়মে পাড়ি দিয়ে বেড়াতে লাগল। শতাব্দীর শেষ ভাগে এল কলের গাড়ি, সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল হাওয়াগাড়ি—‘মোটর-কার’; আর সবশেষে বিমানপোত। আবার এমনি সময়েই মানুষ আর-এক নূতন বিস্ময়কে ব্যবহার ও অধিকার করতে লাগল—তড়িৎশক্তি; আবির্ভূত হল টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন। পৃথিবীর রূপ আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেল এর ফলে। যানবাহনের উন্নতি ও মানুষের যাত্রা সুগম ও দ্রুত হওয়ার ফলে পৃথিবী যেন সংকুচিত হয়ে ছোটো হয়ে গেল। আজ আমরা এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, খুব কমই ভাবি এদের কথা। কিন্তু এসব উন্নতি, এই পরিবর্তন আমাদের পৃথিবীতে নবাগত, গত এক শো বছরের মধ্যেই তাদের জন্ম হয়েছে।
এ শতাব্দী ইউরোপের শতাব্দী, অথবা পশ্চিম-ইউরোপের শতাব্দী, বিশেষত ইংলণ্ডের। সেখানে শ্রমশিল্পের ও যন্ত্রশিল্পের হয়েছিল সূচনা ও প্রসার, পশ্চিম-ইউরোপের অগ্রগতিতে তা অনেক সাহায্য করল। নৌশক্তি ও বাণিজ্যে ইংলণ্ডই ছিল সবার উপরে, কিন্তু ধীরে ধীরে পশ্চিম-ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলি তার সমকক্ষ হয়ে উঠল। এই যান্ত্রিক সভ্যতার ফলে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র উন্নত হল, রেলপথ চলল পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর অবধি, বিরাট দেশটিকে করে তুলল ঐক্যবদ্ধ এক জাতি। নিজেদের নানা সমস্যা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তারা এত ব্যস্ত ছিল যে ইউরোপ ও পৃথিবীর অবশিষ্টাংশ সম্বন্ধে মাথা ঘামাতে পেরে উঠল না। গত চিঠিতে ‘মন্রো নীতি’ সম্বন্ধে তোমাকে তো কিছু শুনিয়েছি। মন্রোর সেই বাণী ইউরোপের লোলুপ দৃষ্টির থেকে দক্ষিণ-আমেরিকাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিকে বলা হয় ‘লাতিন-রাষ্ট্র’, কারণ স্পেন ও পর্তুগালবাসীরা এদের প্রতিষ্ঠাতা। আর ফ্রান্স, ইতালি এবং এই দুটি দেশ হচ্ছে ইউরোপের লাতিন জাতি। ইউরোপের উত্তর-ভাগের দেশগুলি আবার ‘টিউটন জাতি’; ইংরেজ টিউটন জাতির অ্যাংলো-স্যাক্সন শাখা। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ঔপনিবেশিকেরা এই অ্যাংলো-স্যাক্সন শাখা থেকেই উৎপন্ন, যদিও পরে সকল দেশের লোকেই ওখানে গিয়েছে।
বাণিজ্যশিল্প ও যন্ত্রশিল্পে পৃথিবীর অন্যান্য অংশ তখনও ছিল পিছিয়ে, পশ্চিমের নবীন যন্ত্রসভ্যতার সঙ্গে পাল্লা দিতে তারা তখন অক্ষম। পুরোনো কুটিরশিল্পের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি ও সুপ্রচুর পরিমাণে মালপত্র তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এই তৈরি করায় লাগে কাঁচা মাল, আর পশ্চিম-ইউরোপে তার অল্পই পাওয়া যায়। তা ছাড়া তৈরি হওয়ার পরে তাদের বিক্রি করতে হবে, সেজন্যে চাই বাজার। সুতরাং পশ্চিম-ইউরোপকে সন্ধান করে বেড়াতে হল এমন দেশের যারা কাঁচা মালও জোগাবে, আর উৎপন্ন দ্রব্যাদিও কিনবে। এশিয়া আর আফ্রিকা ছিল দুর্বল, ইউরোপ তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, যেমন করে বাজপাখি ধরে তার শিকার। এই সাম্রাজ্যের প্রতিযোগিতার ইংলণ্ড তার নৌশক্তি ও বাণিজ্যশক্তির ফলে সহজেই প্রথম হয়ে গেল।
তোমার স্মরণ থাকবে, ইউরোপের চাহিদা মেটানোর জন্যে মশলা ও অন্যান্য বস্তু কিনবার উদ্দেশ্য নিয়ে ইউরোপীয়েরা ভারত এবং প্রাচ্যে প্রথম আসে। এমনি করে প্রাচ্যের মাল চলত ইউরোপে ও প্রাচ্যদেশের তাঁতে বোনা বহু জিনিষ চলত পশ্চিমে। কিন্তু এখন যন্ত্রযুগের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে সব গেল পাল্টে। পশ্চিম-ইউরোপের শস্তা মাল এল প্রাচ্যদেশে, ভারতের প্রাচীন কুটিরশিল্প ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ইচ্ছে করে নষ্ট করল, যাতে বিলিতি মালের ব্যবসার উন্নতি হয় এ দেশে।
বিশাল এশিয়ার উপর বসে রইল ইউরোপ। উত্তরে রুশ-সাম্রাজ্য সমগ্র মহাদেশ জুড়ে এগুতে লাগল। দক্ষিণের সব-সেরা রত্নটির উপর কঠিন মুঠি চেপে রাখল ইংলণ্ড—সে রত্ন ভারতবর্ষ। পশ্চিমে তুর্কি সাম্রাজ্যের ধ্বংসোন্মুখ অবস্থা, তুরস্ককে বলা হত ‘ইউরোপের রোগী’। পারশ্য নামেমাত্র স্বাধীন হয়ে রইল ইংলণ্ড ও রুশদেশের কবলে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বাংশই, অর্থাৎ ব্রহ্মদেশ, ইন্দোচীন, মালয়, যবদ্বীপ, সুমাত্রা, বোর্নিও, ফিলিপাইন-দ্বীপপুঞ্জ ইউরোপ শোষণ করে নিল, বাকি রইল কেবল শ্যামদেশের একাংশ। সুদূর পূর্বে চীনদেশের দিকে সমস্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলি ছোঁ মারছিল, একটির পর একটি স্বীকৃতি তার কাছ থেকে জোর করে আদায় করে নেওয়া হচ্ছিল। একমাত্র জাপান খাড়া দাঁড়িয়ে ইউরোপের সমশক্তিরূপে তার মখোমুখি হল। তার নিভৃত আবাস থেকে বেরিয়ে এসে নূতন যুগধর্মের সঙ্গে নিজেকে সে আশ্চর্যরকম তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিয়েছিল।
মিশর বাদে আফ্রিকার বাকি অংশ ছিল পিছিয়ে। ইউরোপকে সে বিশেষ কোনোরকম বাধা দিতে পারল না। তাই সাম্রাজ্যের জন্যে এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় ইউরোপের শক্তিগুলি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে খণ্ড খণ্ড করে ফেলল। ইংলণ্ড অধিকার করে নিল মিশর, কারণ ও দেশটি ভারতে যাবার পথেই পড়ে আর ব্রিটিশ নীতির প্রধান আকাঙ্ক্ষা হল ভারতবর্ষে স্বীয় অধিকার বজায় রাখা। ১৮৬৯ অব্দে সুয়েজখাল কাটা হল, এতে ইউরোপের পক্ষে ভারতবর্ষ আরও সুগম হয়ে এল। এর ফলে ইংলণ্ডের কাছে মিশরের মূল্যও গেল বেড়ে, কারণ মিশরের হাত ছিল এই খালের ব্যাপারে, ভারতে যাবার সমুদ্রপথ ছিল তারই নিয়ন্ত্রণে।
সুতরাং এই যন্ত্র বিপ্লবের পরিণামরূপে ধনতান্ত্রিক সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবী জুড়ে, সর্বত্রই কর্তৃত্ব রইল ইউরোপের। আর, ধনতন্ত্রের ফল হল সাম্রাজ্যবাদ। তাই এই শতকটিকে ‘সাম্রাজ্যবাদী শতাব্দী’ বলা চলে। কিন্তু এই নূতন যুগটির সাম্রাজ্যবাদ প্রাচীন রোম, চীন, ভারত, আরবীয়, বা মঙ্গোলদের সাম্রাজ্যবাদ থেকে অনেক পৃথক। এ সাম্রাজ্য এক নূতন ধরনের, কাঁচা মাল ও বাজার, এই এদের একমাত্র কাম্য। নূতন শ্রমশিল্পবাদেরই সন্তান এই নূতন সাম্রাজ্যবাদ। সেকালে বলা হত, ‘বাণিজ্য পতাকার অনুসরণ করে’, আর অনেক সময় বাইবেলের অনুসরণ করেছে এই পতাকা। ধর্ম বিজ্ঞান দেশপ্রেম, সব-কিছুরই ঐ এক উদ্দেশ্য হল—বাণিজ্যশিল্পে যারা পশ্চাৎপদ, যারা দুর্বল, তাদের দূর করে দিয়ে যন্ত্রের প্রভুরা, কোটিপতিরা দিন দিন অর্থবৃদ্ধি করবেন। সত্য ও প্রেমের নামে খৃষ্টান মিশনারিরা গিয়ে এই সাম্রাজ্যবাদের খুঁটি গাড়ত আর তাদের কোনো অনিষ্ট হলেই তাদের দেশবাসীরা দেশ-জয়ের পেত বিপুল সুযোগ।
শ্রমশিল্প ও সভ্যতার পিছনে এই ধনতান্ত্রিক দল সহজেই সাম্রাজ্যবাদের কোঠায় পা দিল; আবার এই ধনতন্ত্রই পথ দেখাল মানুষের মনে নিবিড়ভাবে জাতীয়তাবাদ সঞ্চারিত হওয়ার; তাই এই শতাব্দীটিকে ‘জাতীয়তাবাদী শতাব্দী’ আখ্যাও দেওয়া যায়। এই জাতীয়তাবাদ কেবল প্রদেশের প্রতি প্রেম নয়, অন্য সকলের প্রতি ঘৃণাও এর অঙ্গ। নিজের ভূখণ্ডটুকুকে মহাগৌরবমণ্ডিত করে অন্যের অংশের প্রতি সঘৃণ দৃষ্টিপাতের পরিণাম যে হবে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাত ও সংগ্রাম, এ অবশ্যম্ভাবী। শ্রমশিল্পে ও সাম্রাজ্যবাদে নানা ইউরোপীয় রাজ্যের পরস্পরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা একে আরও ঘোরালো করে তুলল। ১৮১৪-১৫ সালে ভিয়েনার মহাসভায় নির্ধারিত ইউরোপের মানচিত্র হল আর-এক বিরক্তির বস্তু। এই মানচিত্র অনুসারে কতকগুলি দেশকে দমন করে, বলপূর্বক অন্যের কবলে রাখা হয়েছিল। পোল্যাণ্ড জাতি হিসাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বিবেচনাশূন্যরূপে নির্বাচিত এক সাম্রাজ্য, তাতে নানা জাতির লোক পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে বলকান্-উপদ্বীপে তুর্কি-সাম্রাজ্যে বহু লোক ছিল যারা জাতিতে তুর্কি নয়। ইতালিকে খণ্ডে খণ্ডে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল, তার কয়েক খণ্ড ছিল অস্ট্রিয়ার অধিকারে। যুদ্ধ ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বারবার ইউরোপের এই আকৃতি বদলাবার চেষ্টা হতে লাগল। গত চিঠিতে ভিয়েনা-সিদ্ধান্তের অব্যবহিত পরে যেসব পরিবর্তন ঘটেছিল তাদের উল্লেখ করেছি। এ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইতালি, উত্তরে অস্ট্রিয়া ও মধ্যে পোপের অধিকার থেকে নিজেকে মুক্ত করল, পরিণত হল একজাতিরূপে। এর পরেই আবার ঘটল প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জর্মনির ঐক্যবন্ধন। জর্মনির হাতে ফরাসিদেশের ঘটল বিষম পরাভব ও লাঞ্ছনা। তার দুটি সীমান্তদেশ আলসাস আর লোরেন কেড়ে নেওয়া হল। সেদিন থেকে তার চিন্তা হল, কী করে ‘রেভাঁশ’ (প্রতিশোধ) নেওয়া যায়। পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই নেওয়া হয়েছিল শোণিতাপ্লুত এক ভীষণ প্রতিশোধ।
ইংলণ্ড তার প্রাধান্যের সুযোগের ফলে ছিল সবচেয়ে ভাগ্যবান। লোভনীয় সব কিছুই পড়েছিল তারই ভাগে, যা পেয়েছিল তাই নিয়েই সে ছিল তৃপ্ত। নূতন ধরনের এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ ছিল ভারতবর্ষ, তাকে জয় করার ফলে তার থেকে এক সোনার প্রস্রবণ অশ্রান্তধারায় বয়ে চলেছিল ইংলণ্ডের দিকে। অন্যসমস্ত সাম্রাজ্যস্থাপনোন্মুখ দেশগুলি ইংলণ্ডকে ঈর্ষা করত তার এই ভারতাধিকারের জন্যে। অন্য কোথাও তারা এই ভারতবর্ষের আদর্শে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিল। ফরাসিরা কিয়ৎপরিমাণে কৃতকার্য হয়েছিল, জর্মনরা বড়ো দেরি করে ফেলেছিল বলে তাদের ভাগে আর ছিল না বিশেষ কিছুই। কাজেই সারা পৃথিবী জুড়ে চলছিল এই রাজনৈতিক সংঘাত। বৃহত্তর ভূখণ্ড-গ্রাসের প্রয়াসী ইউরোপের এই মহাশক্তিদের প্রত্যেকটিই তার ফলে নিজেদেরই মধ্যে লাগাচ্ছিল গোলমাল। বিশেষ করে ইংরেজ ও রুশীয়দের মধ্যে বারবার বাধছিল ঝগড়া, কারণ মধ্য-এশিয়া থেকে ইংলণ্ডের এত সাধের ভারতবর্ষ অধিকার করবার সম্ভাবনা ছিল রুশীয়দের। তাই রুশদেশের অগ্রগতিকে সংযত করার দিকে ইংলণ্ড ছিল সদাসতর্ক। এই শতকের মাঝামাঝি রুশেদেশ যখন তুরস্ককে হারিয়ে কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ প্রত্যাশা করছিল, ইংলণ্ড তুরস্কের পক্ষে যোগ দিয়ে রুশীয়দের হটিয়ে দিয়েছিল। তুরস্কের প্রতি ভালোবাসা ছিল বলে ইংলণ্ড এ কাজ করে নি, করেছিল ভারতবর্ষ-হারানোর ও রুশদের ভয়ে।
ইংলণ্ডের বাণিজ্যঘটিত শ্রেষ্ঠতা ক্রমেই কমে আসতে লাগল, জর্মনি ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র তার কাছে ঘেষে আসবার সঙ্গে সঙ্গে। শতাব্দীর শেষ দিকে এল চরম বোঝাপড়ার অবস্থা। এইসব ইউরোপীয় শক্তির বিপুল উচ্চাশা রাখবার মতো স্থান এই ছোট্ট পৃথিবীটুকুতে ছিল না। প্রতোকে পরস্পরকে করত ভয়, ঘৃণা, হিংসা; আর সেইজন্যে প্রত্যেকেই অন্যের চেয়ে বেশি সৈন্য ও রণপোত তৈরির চেষ্টা করতে লাগল। এই ধ্বংসের যন্ত্র-নির্মাণে চলল ভীষণ প্রতিযোগিতা। অন্য দেশগুলির সঙ্গে যুদ্ধ করবার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মিত্রতা স্থাপিত হতে লাগল, শেষে ইউরোপে এইরকম দুটি মিত্রশক্তি পরস্পরের মাখোমুখি দাঁড়াল—একটির নায়ক ফরাসিদেশ, ইংলণ্ডও একে গোপনে সাহায্য করত আর একটির পুরোভাগে জর্মনি। ইউরোপ হল এক রণশিবির। শ্রমশিল্পে, বাণিজ্যে, অস্ত্রশস্ত্রে চলল আরও ভয়ংকর প্রতিযোগিতা। আর প্রত্যেকটি পাশ্চাত্যদেশে এক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ জাগানো হল, তার ফলে প্রতিটি লোক ঘৃণা করতে লাগল অন্য দেশের অধিবাসীদের, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে রইল সদাসর্বদা।
এই অন্ধ জাতীয়তাবাদই ইউরোপে প্রাধান্য বিস্তার করল। এটা সত্যিই অদ্ভূত, কারণ যানবাহনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দেশগুলি নিকটতর হয়ে এসেছিল, অনেক বেশি লোক এখন পর্যটন করত। মনে করা সম্ভব যে, কোনো লোক তার প্রতিবেশীদের যত বেশি জানবে তার কুসংস্কার ততই কেটে যাবে, সংকীর্ণতার পরিবর্তে আসবে উদার দৃষ্টিভঙ্গি। কিঞ্চিৎপরিমাণে তা হয়েছিল বটে, কিন্তু বর্তমান শ্রমশিল্প ও ধনতন্ত্রবাদী সমাজের আকারই এমন যে, জাতিতে জাতিতে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে, মানুষে মানুষে সংঘাত তার ফলে অবশ্যম্ভাবী।
প্রাচ্যেও জাগ্রত হচ্ছিল জাতীয়তাবাদ। অত্যাচারী বিদেশী শাসককে বাধা দেওয়ার রূপ নিচ্ছিল এ। প্রথমে পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন জমিদার বংশ বিদেশী শাসনকে বাধা দিল, কারণ তাদের ভয়, নিজেদের পদ থেকে চ্যুত হবার অবস্থা হয়েছে তাদের। তারা সফল হল না, না হবারই কথা। নূতন জাতীয়তাবাদ উঠল, ধার্মিক দৃষ্টিভঙ্গি মেশানো। আস্তে আস্তে এই ধর্মের রঙ মিলিয়ে গেল, পাশ্চাত্য-প্রথানুযায়ী একজাতীয়তাবাদের আবির্ভাব হল। বিদেশী শাসন থেকে অব্যাহত রইল জাপান, অর্ধসামন্ততান্ত্রিক একজাতীয়তাবাদ প্রচারিত হতে লাগল।
প্রথম থেকেই ইউরোপীয় আক্রমণকে এশিয়া বাধা দিয়েছিল, কিন্তু ইউরোপীয় অস্ত্রশস্ত্রের ক্ষমতা যেদিন বোঝা গেল সেদিন থেকে বাধাদানে তেমন আর জোর রইল না। তদানীন্তন ইউরোপে বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক অগ্রগতি তার সেনাদলকে যেরকম শক্তিমান করে তুলেছিল, প্রাচ্যে তখন সেরকম কিছুই ছিল না। পূর্বের দেশগুলি নিজেদের শক্তিহীনতা অনুভব করে বেদনার সঙ্গে মাথা নোয়াল তাদের সামনে। কোনো কোনো লোকে বলে, প্রাচী অধ্যাত্মবাদী আর প্রতীচী জড়বাদী। এ ধরনের মত ভ্রান্তিজনক। প্রাচী-প্রতীচীর মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য ছিল অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে, ইউরোপ যখন আক্রমণকারীরূপে এসেছিল—সে হচ্ছে প্রাচ্যদেশের মধ্যযুগীয় ধারা ও প্রতীচীর যান্ত্রিক অগ্রগতি। ভারতবর্ষ ও পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য দেশ প্রথমে চমকে গিয়েছিল—কেবল পশ্চিমের রণকৌশলেই নয়, তার বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক উন্নতিতেও। এর ফলে তারা উপলব্ধি করেছিল নিজেদের দৈন্য। তা সত্ত্বেও জাতীয় ভাব দিন দিন বেশি করে জাগতে লাগল, বাড়তে লাগল বিদেশীদের আক্রমণে বাধাদানের ও তাদের বিতাড়নের আকাঙ্ক্ষা। বিংশ শতকের প্রারম্ভে একটা ঘটনা সারা এশিয়ার মনে পরিবর্তন আনে। সে হল জাপানের হাতে জারশাসিত রাশিয়ার পরাজয়। ইউরোপের অন্যতম সুবৃহৎ শক্তিকে ছোটো জাপানের পক্ষে হারিয়ে দেওয়ার খবর অধিকাংশ লোককেই চমকে দিল। এশিয়াতেই এ চমক সবচেয়ে বেশি লেগেছিল। সবাই জাপানকে দেখতে লাগল যেন সমগ্র এশিয়ার প্রতিনিধি, পশ্চিমের আক্রমণের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। জাপান সে সময়ে খুব জনপ্রিয় হয়ে পড়ল সারা পূর্বাঞ্চলে। আসলে জাপান যে মোটেই এশিয়ার প্রতিনিধি ছিল না সে তো ঠিকই—যে-কোনো ইউরোপীয় শক্তির মতোই সেও স্বার্থের জন্যেই যুদ্ধ করছিল। মনে আছে, জাপানের জয়-সংবাদ এলে আমি কীরকম উৎফুল্ল হয়ে উঠতাম। বয়সে তখন আমি তোমার মতোই হব।
এমনি করে পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদ যতই সমরোন্মুখ হয়ে উঠতে লাগল, প্রাচ্যেও তার বিরুদ্ধে বাধা দেবার জন্যে জেগে উঠল জাতীয়তার ভাব। সারা এশিয়া জুড়ে, পশ্চিমে আরবদের দেশ থেকে সুদূর পূর্বে মঙ্গোলীয়দের দেশ পর্যন্ত, প্রথমে ধীরে ধীরে ও পরে চরম রূপ নিল জাতীয় আন্দোলন। ‘জাতীয় কংগ্রেসে’র সূচনা হল ভারতবর্ষে। শুরু হল এশিয়া জুড়ে বিদ্রোহ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর এ আলোচনা আমাদের শেষ হতে এখনও অনেক বাকি। কিন্তু এ চিঠিখানা বেশ দীর্ঘ হয়ে পড়েছে, এবারে থামা উচিত।