বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/মানষের জীবনসংগ্রাম

উইকিসংকলন থেকে

২২

মানুষের জীবনসংগ্রাম

২৮শে মার্চ, ১৯৩২

 বিশ্বের ইতিহাসের সূত্র ধরে আবার অতীতের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে নিই। সে এক জটিল সূত্র, জট খোলাও কঠিন, আবার তার সম্পূর্ণ আকার দেখতে পাওয়াও সহজ নয়। তার সামান্য এক ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলে তাকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিতেই আমরা সুনিপুণ। আমরা প্রায় সবাই ভাবি যে, আমাদের দেশের ইতিহাস অন্য সকল দেশের চেয়ে মহিমময় ও অনুধাবনযোগ্য। এ সম্বন্ধে একবার তোমাকে সতর্ক করে দিয়েছি, আবার দিচ্ছি, কারণ ঐ ফাঁদে পড়া বড়োই সহজ। এরকম ঘটনা যাতে না ঘটে সেইজন্যেই আমি এসব চিঠি তোমাকে লিখতে শুরু করি, তবুও মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে আমিও সেই একই ভুল করছি। আমার নিজের শিক্ষার মধ্যেই যদি গলদ থাকে, যে ইতিহাস আমি পড়েছিলাম তাই যদি এমন উল্টোপাল্টা হয়, তবে আর কী করা যাবে? সে দোষ আমি কারাগারে নির্জনে আরও পড়াশুনো করে সংশোধন করে নেবার চেষ্টা করেছি, হয়তো সফলও হয়েছি কতকটা। কিন্তু অল্পবয়সে মনের যাদুঘরে যেসব মানুষ ও ঘটনাবলীর ছবি ঝুলিয়েছিলাম আজ আর সেগুলোকে সরাতে পারছি না। আর এইসব ছবিগুলিই ইতিহাস সম্বন্ধে আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে রঙিয়ে রেখেছে, সে দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানের অসম্পূর্ণতার জন্য অনেকটা সীমাবদ্ধ। কাজেই লিখতে লিখতে আমি ভুল করব, বহু অপ্রয়োজনীয় ঘটনার উল্লেখ করব এবং প্রয়োজনীয় ঘটনার উল্লেখ করতে ভুলে যাব। কিন্তু এ চিঠিগুলো তো ইতিহাসের পুঁথির জায়গা নেবে বলে লেখা নয়। এরা হচ্ছে, আমাদের মধ্যে বহু কঠিন প্রাচীরমালা আর হাজার মাইল দূরত্বের ব্যবধান না থাকলে দুজনে বসে যে আলোচনা হত, তাই; অন্তত এদের সেইরকম বলে কল্পনা করেই আমি তৃপ্তিলাভ করি।

 যেসব প্রসিদ্ধ লোকেদের কথায় ইতিহাসের পাতা পূর্ণ, তাঁদের কথা তোমার কাছে না লিখে আমি পারব না। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনেতিহাস বেশ উপভোগ্য, আর তাঁরা যে কালে বাস করতেন সেই কালকে বুঝতে তাঁরা বিশেষ সাহায্য করেন। কিন্তু ইতিহাস তো কেবল বড়ো বড়ো লোক আর রাজামহারাজাদের কীর্তিকলাপ নয়। তাই যদি হত তবে ইতিহাস এতদিনে শেষ হয়ে যেত, কারণ, বিশ্বের নাটমঞ্চের উপর রাজারাজড়াদের ঘোরাফেরার পালা প্রায় থেমে গেছে। কিন্তু যাঁরা সত্যিকারের বড়ো তাঁদের প্রকাশ পেতে সিংহাসন বা রাজমুকুট অথবা মণিরত্ন লাগে না। রাজাদের রাজত্বটুকু বাদে আর কিছুই নেই, তাই ভিতরের নগ্নতাকে লুকিয়ে রাখতেই তাঁদের এত পোশাকপরিচ্ছদ লাগে, আর দুর্ভাগ্যবশত আমাদের অধিকাংশই সেই বাইরের চাকচিক্যে ভুলে যায়। অথচ এরা—

‘সামান্য রাজা ছাড়া আর কিছু নয় যে,
কিরীট দেখেই তারে রাজকীয় কয় যে!’

 প্রকৃত ইতিহাস কেবল এখান-সেখান থেকে গুটিকয় ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে আলোচনা করবে না; যারা জাতির সৃষ্টি করে, জীবনের অত্যাবশ্যক এবং বিলাসসম্ভার জোগাতে যাদের পরিশ্রম করতে হয়, আর যারা শতসহস্রভাবে পরস্পরের উপর প্রভাব বিস্তার করে, সেই জনগণের কথাই থাকবে তাতে। মানুষের এরকম ইতিহাস সত্যিই চমৎকার। মানুষ যুগে যুগে যে সংগ্রাম করে এসেছে প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক উপাদানের বিরুদ্ধে, বন এবং বন্য জন্তুর বিরুদ্ধে, আর স্বার্থ নিয়ে স্বজাতীয় যারা তাকে জয় করতে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে, তারই কাহিনী এ মানুষের জীবনসংগ্রামের কাহিনী। আর যেহেতু ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বেঁচে থাকতে হলে খাওয়া পরা থাকার জন্যে কতকগুলো জিনিষ অত্যাবশ্যক, তাই, যাদের এইসব সুবিধা আছে তারাই অন্যের উপর স্বীয় অধিকার বিস্তার করে এসেছে। শাসকদের কর্তৃত্বের ক্ষমতা ছিল, কারণ জীবনযাত্রার পক্ষে প্রয়োজনীয় বস্তুগুলিও তাদের ছিল। তাই তারা অন্যকে উপোস করিয়ে বশে আনবার শক্তিও অর্জন করেছিল। সেইজন্যেই আমরা বারংবার দেখেছি, কেমন করে বহু সংখ্যক জনতা মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোকের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে—এরা বিনা পরিশ্রমে অর্থোপার্জন করে নিচ্ছে, আর তারা পরিশ্রম করেও জীবিকা অর্জন করতে পারছে না।

 বর্বর আদিম মানুষ একলা শিকার করতে করতে ধীরে ধীরে এক সংসার গড়ে তোলে। আবার এইরকম বহু সংসার একত্র করে সৃষ্টি হয় গ্রামের, আর বিভিন্ন গ্রামের মজুর, বণিক আর কারিকরেরা মিলে দল বাঁধে। এমনি করে ধীরে ধীরে এক-একটি সমাজ গড়ে আর বেড়ে উঠেছে। সূত্রপাত এর একটি মানুষ, একটি বন্য জীবকে নিয়ে। তখন কোনোরকম সমাজ ছিল না! এর পরে এল সংসার, তার পরে পল্লী, আর কয়েকটি পল্লী নিয়ে একটি গ্রাম। কিন্তু কেন এই সমাজ গড়ে উঠল? জীবনসংগ্রামই তার মূল, কারণ আত্মরক্ষার সময় একলা যুদ্ধ করার চেয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ চালানোই অধিকতর কার্যকরী। তা ছাড়া অন্যান্য কাজেও সহযোগিতার দাম ছিল। একত্র কাজ করে তারা অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি খাদ্য এবং জীবনের অন্যান আবশ্যক জিনিষ জোগাড় করতে পারত। এই সংঘবদ্ধ হওয়ার ফলে বন্য বর্বর শিকারী থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক অর্থনৈতিক গোষ্ঠী বা সমাজ, একটা দলবদ্ধ জীবন। সম্ভবত বিরামহীন-জীবনসংগ্রাম-জাত এই দল থেকেই আবার উদ্ভূত হয়েছিল বৃহত্তর সমাজ। সুদীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে অবিরত দুঃখবিপদের মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, এই বৃদ্ধি ঘুরেফিরে এসেছে। কিন্তু মনে কোরো না যে, এই বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে বা তখনকার চেয়ে এখনকার পৃথিবী আরও আনন্দপূর্ণ। হয়তো আগের চেয়ে কিছু ভালো হয়েছে, কিন্তু তাই বলে সর্বাঙ্গসুন্দর এটা মোটেই হয় নি, চতুর্দিকে রয়েছে প্রভূত দুঃখকষ্ট।

 এই অর্থনৈতিক সমাজের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে জীবন জটিলতর হয়ে ওঠে। ব্যবসাবাণিজ্য বাড়ে। দানের পরিবর্তে আরম্ভ হয় বিনিময়, আর অর্থ এসে এই বিনিময়ের জগতে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে যায়। বাণিজ্যের অগ্রগতির পক্ষে এটা অত্যন্ত সুবিধাজনক, কারণ সোনারুপোর মুদ্রা আসাতে বিনিময়ের পথ সরল হয়ে যায়। পরবর্তী যুগে মুদ্রাও সব সময়ে ব্যবহৃত হয় না, তার নিদর্শনেই কাজ চলে যায়। একটুকরো কাগজই হয়ে ওঠে যথেষ্ট। এইভাবে সৃষ্টি হয় ‘ব্যাঙ্ক-নোট’ আর ‘চেক’-এর। এর মানে হচ্ছে, ধারে ব্যবসা চালানো। এই ধারের সুবিধা হল, এটা বাণিজ্যের উন্নতির সহায়। তুমি তো জানো, ‘চেক’ আর ‘ব্যাঙ্ক-নোট’ আজকাল বহুল পরিমাণে চলে, নির্বোধ না হলে কেউ থলিথলি সোনারূপো সঙ্গে নিয়ে বেড়ায় না।

 আমরা দেখছি, অস্পষ্ট অতীতের থেকে বেরিয়ে এসে এগিয়ে চলেছে ইতিহাস, মানুষ কৃষিজাত দ্রব্যাদি অপেক্ষাকৃত বেশি পরিমাণে উৎপাদন করছে ক্রমে ক্রমে, বিভিন্ন ব্যবসায়ক্ষেত্রে নৈপুণ্য অর্জন করছে, পরস্পরের সঙ্গে দ্রব্যবিনিময় চলছে, আর এইভাবে বিকাশলাভ করছে বাণিজ্য। যানবাহনের ক্রমিক উন্নতিও আমরা দেখছি, বিশেষ করে গত এক শতাব্দী ধরে, বাষ্পযানের অভ্যুদয়ের পর থেকে। উৎপন্ন দ্রব্যাদির বাহুল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের ধনবলও বর্ধিত হচ্ছে, তার ফলে কেউ কেউ পাচ্ছে আরও বিশ্রাম। অতএব যাকে সভ্যতা বলা হয় তারই হচ্ছে বিকাশ।

 এইসব ঘটছে, আর মানুষ গর্ব করছে প্রাগ্রসর আলোকপ্রাপ্ত নবযুগের এবং নবীন সভ্যতার, শিক্ষার এবং বিজ্ঞানের বিস্ময়ের। কিন্তু তবুও গরিবেরা গরিব দুঃখীই থাকছে, বিশাল জাতিরা পরস্পরের সঙ্গে হানাহানি করেই মরছে ও লক্ষ লক্ষ মানুষ মারছে, আর আমাদের দেশের মতো বিপুল সব দেশ রয়েছে বিদেশীর শাসননিপীড়িত হয়ে। নিজের সংসারের মধ্যেও যদি স্বাধীন হয়ে না থাকতে পারি তবে কী লাভ সেই সভ্যতায়? তবে কিনা, আমরা এখন কিছু একটা করব বলে দৃঢ় সংকল্প করেছি।

 কী সৌভাগ্য আমাদের যে, আমরা জন্মেছি এই উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে, যখন আমাদের প্রত্যেকে এই দুঃসাহসিক ব্রতে যোগ দিয়ে কেবল ভারতবর্ষ নয়, পরিবর্তনশীল সমগ্র বিশ্বকে দেখতে পাবার ক্ষমতা রাখে। মহাভাগ্যবতী তুমি। বিপুল বিদ্রোহ যখন রুশদেশে নবযুগ নিয়ে এল, সেই বছরের সেই মাসে তোমার জন্ম। আর স্বদেশের এক মহাবিপ্লবেরও সাক্ষী তুমি, হয়তো একদিন এরই নাটমঞ্চে করবে অভিনয়। জগৎ জুড়ে দেখা দিয়েছে পরিবর্তন। সুদূর প্রাচ্যে চীনের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছে জাপান। এদিকে পশ্চিমে, বলতে গেলে সারা পৃথিবীতে, পুরোনো নিয়ম শিথিল হয়ে এসেছে, ভেঙে পড়বে বলে ভয়! দেশে দেশে আলোচনা চলছে নিরস্ত্রীকরণের, এদিকে প্রত্যেকের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রত্যেকে সম্পূর্ণ সশস্ত্র হয়ে রয়েছে। জগৎ জড়ে এতকাল পুঁজিবাদীদের যে প্রাধান্য চলছিল তার দিন শেষ হয়ে আসছে। আর যাবেই যখন, তখন যেদিন সে যাবে, সঙ্গে নিয়ে যাবে বহু পাপ, বহু আবর্জনা।