বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/মানুষের অগ্রগতি

উইকিসংকলন থেকে

৫৬

মানুষের অগ্রগতি

১০ই জুন, ১৯৩২

 চার দিন আগে বেরিলি জেল থেকে তোমাকে চিঠি লিখেছি। ঠিক সেদিন সন্ধেবেলাতেই আমার উপরে হুকুম হল, তল্পিতল্পা গুটিয়ে এখান থেকে বেরোতে হবে—না, মুক্তি দেওয়ার জন্য নয়, অন্য জেলে আমাকে বদলি করা হবে। কাজেই ব্যারাকের বন্ধুদের কাছে বিদায় নিয়ে নিলাম। গত চারটি মাস এঁদের সঙ্গে কাটিয়েছি। চব্বিশ ফট উঁচু দেয়ালটাকে একবার শেষবারের মতো দেখে নিলাম, এরই আশ্রয়ে এতদিন ছিলাম। বাইরে বেরিয়ে এলাম, খানিকক্ষণের জন্য হলেও বাইরের জগৎটাকে একবার দেখা যাবে। আমার সঙ্গে আর-একজন বন্দীকেও বদলি করা হচ্ছিল। এরা কিন্তু আমাদের বেরিলি স্টেশনে নিয়ে গেল না, পাছে লোকে আমাদের দেখে ফেলে। আমরা যেন পর্দানশিন, কেউ দেখে ফেললে দোষ হবে। পঞ্চাশ মাইল মোটরে করে এনে মাঠের মাঝখানে ছোট্ট একটা স্টেশনে ওরা আমাদের তুলে দিল। মোটর-ড্রাইভটির জন্য আমি ওদের কাছে কৃতজ্ঞ। বহু মাস নির্জনবাসের পরে আলো-অন্ধকারে মানুষজনের ভিড় আর ছায়ামূর্তির মতো গাছের সারির ভিতর দিয়ে ছুটে যেতে ভারি ভালো লাগছিল; রাত্তিরের ঠাণ্ডা হাওযাতে প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল।

 আমাদের নিয়ে যাচ্ছে দেরাদুনে। গন্তব্যস্থলে পৌঁছবার আগেই আমাদের নাবিয়ে আবার মোটরে চাপানো হল, পাছে এখানেও লোকে আমাদের দেখে ফেলে।

 এখন দেরাদুনের ছোট্ট জেলটিতে আছি। বেরিলির চেয়ে এখানটাতে ভালো আছি বলতে হবে। জায়গাটা ঠাণ্ডা, বেরিলির মতো তাপ ১১২ ডিগ্রিতে ওঠে না। চার দিকের দেয়ালটা ওখানকার মতো উঁচু নয়, আর দেয়ালের বাইরে থেকে যে গাছগুলো উঁকি মারছে সেগুলো দেখতে ঢের বেশি সবুজ। দেয়াল ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে একটা তালগাছের মাথা দেখা যায়, মনটা খুশি হয়ে ওঠে, মালাবার এবং সিংহলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গাছের সারি ছাড়িয়ে দেখা যায় পাহাড়ের সারি—খুব বেশি দূরের পাল্লা নয়—তারই চূড়ায় গুঁড়ি মেরে পড়ে আছে মুসৌরি শহর। পাহাড়গুলি ভালো করে দেখা যায় না, গাছের সারিতে ঢাকা পড়ে গেছে; কিন্তু পাহাড়ের কাছে আছি এইটে ভাবতেই ভালো লাগে। আর রাত্তিরবেলায় বহু দূরে মুসৌরি শহরের আলোগুলি আকাশের তারার মতো ঝিক্‌মিক্ করছে, ভাবতে বেশ লাগে।

 চার বছর আগে—না তিন বছর হল?—তোমাকে এইসব চিঠি লিখতে শুরু করেছিলাম, তখন তুমি ছিলে মুসৌরিতে। এই তিন-চার বছরে কত কী ঘটে গিয়েছে, তুমিও কত বড়ো হয়ে গিয়েছে! খেয়াল-খুশি মতো যখন সময় পেয়েছি তখন এসব চিঠি লিখেছি, বেশির ভাগ চিঠি জেল থেকে লেখা। মাঝে মাঝে লেখায় ছেদ পড়েছে, বেশ কিছু কাল হয়তো লেখাই হয় নি। কিন্তু যতই লিখছি, নিজেরই আর তেমন মন উঠছে না। কেবলই ভয় হয়, তোমার কাছে বোধ করি এগুলো ভালো লাগছে না, হয়তো-বা রীতিমতো বোঝার মতো ঠেকছে। তা হলে আর লিখে দরকার কী?

 আমি চেয়েছিলাম অতীতটাকে একেবারে জীবন্ত করে তোমার চোখের সামনে তুলে ধরব, যাতে তুমি স্পষ্ট বুঝতে পারবে, আমাদের এই পৃথিবী কীভাবে ধীরে ধীরে বদলিয়েছে, ক্রমে ক্রমে এগিয়েছে; আবার কখনও-বা আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, বুঝি-বা পিছিয়েই যাচ্ছে। ভেবেছিলাম, তোমাকে দেখাব প্রাচীন কালের বিভিন্ন সভ্যতা কীভাবে জোয়ার জলের মতো কূল ছাপিয়ে এসেছে, আবার ভাঁটার টানে কোথায় মিলিয়ে গেছে। ইতিহাসের ধারা নদীর স্রোতের মতো যুগ যুগ ধরে অবিরাম বেগে ছুটে চলেছে—কোথাও বাধা পেয়ে, কোথাও পাক খেয়ে—কিন্তু কেবলই ছুটে চলেছে কোন অজানা সমুদ্রের পানে। আজও সেই চলার বিরাম নেই। ইচ্ছে ছিল হাত ধরে তোমাকে মানুষের সেই চলার পথ বেয়ে নিয়ে আসব, একেবারে সেই আদিলগ্ন থেকে যখন মানুষকে মানুষ বলেই চেনা যেত না। চলতে চলতে আসব একেবারে আজকের দিনের মানুষের কাছে, আপন সভ্যতার গর্বে যে গর্বিত, যদিও আমার মনে হয় যে এ অহংকারও মূর্খের অহংকার। তোমার বোধ হয় মনে আছে ঠিক সেভাবেই আমরা শুরু করেছিলাম। সেই মুসৌরিতে তোমাকে যেসব চিঠি লিখেছি তাতে বলেছিলাম, কীভাবে আগুন আবিষ্কার হল, কৃষিকার্যের পত্তন হল, শহর গড়ে উঠল এবং সমাজে শ্রমবিভাগ দেখা দিল। কিন্তু যতই এগিয়ে গিয়েছি ততই রাজ্য-সাম্রাজ্যের গোলকধাঁধায় পড়ে আসল গতিপথের খেই হারিয়ে ফেলেছি। আমরা শুধু ইতিহাসের স্রোতটা উপর উপর ছুঁয়ে এসেছি অর্থাৎ অতীতের কঙ্কালটাই কেবল তোমার সামনে ধরেছি। ইচ্ছে ছিল গায়ে রক্তমাংস জুড়ে দিয়ে সেটাকে জীবন্ত করে তোমাকে দেখাব।

 কিন্তু মনে হচ্ছে সে শক্তি আমার নেই, কাজেই সে কঠিন কাজটি তোমার আপন কল্পনার সাহায্যে নিজেকেই করে নিতে হবে। ভালো ভালো বই থেকে তুমি নিজেই তো অতীতের ইতিহাস পড়ে নিতে পারো, আমার আর লেখার দরকার কী? তবু নিজেকে সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত করতে পারছি নে বলেই লিখে চলেছি, বোধ করি পরেও লিখব। লিখব বলে তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, তা আমার মনে আছে; সেই কথা অবশ্যই রাখবার চেষ্টা করব। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো প্রলোভন হল, তোমার কাছে চিঠি লেখার আনন্দ। লিখতে বসলেই মনে হয়, তুমি আমার পাশে বসে আছ, আর আমরা দুজনে মিলে কথা বলছি।

 আদিম মানুষ যখন প্রথম জঙ্গল থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে এল সেই থেকে তার চলার শেষ নেই। ঐ চলার পথের কথাই বলছিলাম—বহু সহস্র বৎসরের দীর্ঘ পথ অতিক্রমণের কাহিনী। অথচ যদি পৃথিবীর কাহিনীর সঙ্গে তুলনা করো তবে এটা অতি যৎসামান্য সময়, কারণ তারও পূর্বে কত যুগ যুগ, কত অযুত বৎসর কেটে গেছে যখন মানুষের জন্মই হয় নি। কিন্তু আমাদের কারবার মানুষকে নিয়ে, কারণ তার আগে যতসব প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে তাদের চেয়ে সে শ্রেষ্ঠ। মানুষ শ্রেষ্ঠ কারণ তার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে একটি নতুন জিনিষের উদ্ভব হয়েছে। সেটি হচ্ছে মানুষের মন—তার কৌতূহল—অজানাকে জানবার আকাঙ্ক্ষা। সেই আদিকাল থেকে শুরু হয়েছে মানুষের জানবার প্রয়াস। একটি ছোট্ট শিশুকে লক্ষ্য করে দেখো, কী বিস্ময়ের দৃষ্টিতে সে তার চার দিকে তাকায়, আস্তে আস্তে চার দিকের লোকজন জিনিষপত্র চিনতে শুরু করে, দেখে দেখে শেখে। একটি ছোট্ট মেয়েকেই দেখো-না—সে যদি সুস্থমনা এবং কৌতূহলী হয় তবে হাজার বিষয়ে হাজার রকম প্রশ্ন করে উদ্ভ্রান্ত করবে। ঠিক তেমনি সেই আদি যুগে যখন ইতিহাসের কেবলমাত্র শুরু এবং মানষের সবে শৈশব তখন পৃথিবীটা ছিল তার চোখে একেবারে নূতন, বিস্ময়কর এবং বোধ করি ভয়াবহ। সেও তখন এমনি বিস্ময়ের দৃষ্টিতে চার দিকে তাকিয়েছে, কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য কত প্রশ্ন করেছে। নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করেছে। তা ছাড়া কাকে জিজ্ঞেস করবে, কে জবাব দেবে? সেই-যে বলেছি, মন—সে এক অত্যাশ্চর্য জিনিষ, তারই সাহায্যে ধীরে ধীরে ঠেকে ঠেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে, আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সে যা-কিছু সব লিখেছে। সেই আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের কৌতূহলের নিবৃত্ত নেই। বহু জিনিষ সে শিখেছে, কিন্তু এখনও ঢের শেখবার আছে। নূতনের সন্ধানে যতই সে এগিয়ে যাচ্ছে, বহুবিস্তৃত অজানার রাজ্য ততই চোখের সামনে দেখা দিচ্ছে। সে রাজ্যের শেষ সীমানা এখনও বহু বহু দূরে—মোটেই তার শেষ আছে কি না কে জানে!

 এই-যে মানুষের অনন্ত জিজ্ঞাসা, সেটা কী? কী সে জানতে চায়, কোথায়ই বা সে চলেছে? হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এ প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করেছে। ধর্ম বলো, দর্শন বলো, বিজ্ঞান বলো, সকলেই এ প্রশ্নের বিচার করেছে, অনেক রকমের জবাবও দিয়েছে। সেসব জবাবের কথা বলে তোমাকে মিছামিছি ভোগাতে চাই নে, তার কারণ আমি নিজেই ওসব ব্যাপার ভালো করে বুঝি নে। ধর্ম মোটামুটি এর জবাব দেবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তার মধ্যে গোঁড়ামি আছে। কারণ, ধর্ম মানুষের মনকে আমল না দিয়ে জোর-জবরদস্তিতে তার মতামতকে মানুষের ঘাড়ে চাপাবার চেষ্টা করেছে। আর বিজ্ঞান আমতা-আমতা করে কিছু বলেছে, সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলে নি। বিজ্ঞান স্বভাবতই মানুষের মনকে প্রাধান্য দেয় এবং সত্যকে যুক্তিবিচার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। বলা বাহুল্য, আমি নিজে বিজ্ঞানের পদ্ধতিটাকেই গ্রহণীয় বলে মনে করি।

 মানুষের এই অনন্ত জিজ্ঞাসা সম্বন্ধে সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলবার ক্ষমতা আমাদের নেই; তবে এইটুকু দেখা গেছে, মানুষের জ্ঞানপিপাসা দুটি বিভিন্ন ধারায় বয়ে চলেছে। মানুষ যেমন বাইরের দিকে তাকিয়েছে তেমনি অন্তরের দিকেও। বহিঃপ্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছে, আবার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও বোঝবার চেষ্টা করেছে। মূলতঃ দেখতে গেলে জিনিষটা একই, কারণ মানুষ প্রকৃতিরই অংশবিশেষ। প্রাচীন ভারত এবং গ্রীসদেশের জ্ঞানীব্যক্তিরা বলেছেন, ‘আত্মানং বিদ্ধি’, অর্থাৎ নিজেকে জানো। পুরাকালে ভারতীয় আর্যগণ যে বিপুল অধ্যবসায়ের সঙ্গে জ্ঞানান্বেষণে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন তার ইতিহাস উপনিষদগ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। আর প্রকৃতিকে জানবার যে চেষ্টা সেটা বিজ্ঞানরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এবং বিজ্ঞান এ বিষয়ে কতদূর অগ্রসর হয়েছে বর্তমান পৃথিবীই তার প্রমাণ। বিজ্ঞানের বাহু ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে এবং জ্ঞানের এই দুই ধারাকে এক জায়গায় সংযুক্ত করবার চেষ্টা করছে। দূরতম নক্ষত্রের প্রতিও তার নিশ্চিত দৃষ্টি প্রসারিত হয়েছে, এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অত্যাশ্চর্য অণুপরমাণুর সন্ধান আমাদের জানিয়েছে, যার থেকে এই বিশ্বের সব কিছু সৃষ্টি হয়েছে।

 মানুষের মনই তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে এই অনন্ত জিজ্ঞাসার পথে। বিশ্বপ্রকৃতিকে যত বেশি করে জানতে পেরেছে ততই বেশি করে তাকে নিজের প্রযোজনে লাগিয়েছে, আর সেই পরিমাণে তার শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্য অনেক সময় সে শক্তির অপব্যবহারও সে করেছে। বিজ্ঞানের সাহায্যে সে সাংঘাতিক সব মারণাস্ত্র আবিষ্কার করেছে, তাতে আপন জনকেই বিনাশ করেছে এবং যে সভ্যতা সে এত যত্নে গড়ে তুলেছিল তাকেই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে।