বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/মুসলমানগণের ভারত-আক্রমণ

উইকিসংকলন থেকে

৬৫

মুসলমানগণের ভারত-আক্রমণ

২৩শে জুন, ১৯৩২

 গতকাল তোমাকে চিঠি লেখা হয়ে ওঠে নি। লিখতে বসেছিলাম; জেলখানা আর পারিপার্শ্বিক সব-কিছু ভুলে গিয়ে কল্পনার রথে চড়ে একেবারে মধ্যযুগের পৃথিবীতে উধাও হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সহসা চমক ভাঙল। সেই অতীত যুগ থেকে পলকে ফিরে এলাম বর্তমান যুগে। খেয়াল হল, আমি জেলে রয়েছি। উপর থেকে আদেশ এসেছে, তোমার মা ও ঠাকুরমার সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ এক মাস বন্ধ থাকবে। হেতুটা কী তা আমাকে বলা হল না। কেনই-বা বলবে, আমি কয়েদী যে! এদিকে আজ দশ দিন যাবৎ এঁরা দেরাদুনে এসে অপেক্ষা করছেন; কিন্তু খামোকা, আমার সঙ্গে দেখা না করেই ওঁদের ফিরে যেতে হবে। এই তো ভদ্রতা। যাক, এ নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; জেল তো জেল, তা ভুললে চলবে না।

 যা হোক, এর পরে আর অতীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয় নি। তবে, আজ মন পাতলা হয়ে গেছে, তাই নূতন করে লিখতে বসেছি।

 অনেক কাল বাইরে-বাইরে ছিলাম, এবারে ভারতে ফিরে আসা যাক। মধ্যযুগের ইউরোপ আমরা দেখেছি। দেখেছি সামন্ততান্ত্রিক অত্যাচার এবং নানাবিধ গোলযোগ আর কুশাসনে লোকের দুরবস্থা, পোপ আর সম্রাটের দ্বন্দ্ব, ক্রুসেডের সময়ে খৃষ্টধর্ম আর ইসলামধর্মের বিরোধ, আর দেখেছি, কী করে দেশগুলো সব নূতন আকারে গড়ে উঠল। আচ্ছা, ভারতবর্ষের অবস্থা তখন কীরকম ছিল?

 মধ্যযুগের প্রথম দিককার ভারতের অবস্থা আমরা জানি। সুলতান মাহ্‌মুদ গজনি থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলেন উত্তর ভারতে, তাও দেখেছি। মাহ্‌মুদের লুণ্ঠন আর ধ্বংসকার্যে ভারতে স্থায়ী পরিবর্তন কিছু ঘটে নি। তবে উত্তর-ভারতের বহু সমৃদ্ধ নগর তিনি লুণ্ঠন করেছিলেন, ধ্বংস করেছিলেন অসংখ্য স্তম্ভ আর ইমারত। কেবলমাত্র সিন্ধুদেশ এবং পাঞ্জাবের কতকাংশ তিনি নিজের শাসনাধীন করেছিলেন; দাক্ষিণাত্য, বাংলাদেশ, কিংবা ভারতের অন্য কোনো অংশ তিনি গজনি-রাজোর অন্তর্ভুক্ত করেন নি। মাহ্‌মুদের আক্রমণের দেড় শো বছর পরেও মুসলিম রাজ্য কিংবা ইসলামধর্ম ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে নি।

 দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে, ১১৮৬ খৃষ্টাব্দে, আবার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে ভারত-আক্রমণ শুরু হয়। তখন গজনি-সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে এবং ঘোর-রাজ্যের আফগান শাসক সাহাবুদ্দিন ঘোরি পরাক্রান্ত হয়ে উঠেছেন। তিনি লাহোর অধিকার করে দিল্লির দিকে অভিযান করেন। দিল্লির অধিপতি ছিলেন পৃথ্বীরাজ চৌহান। উত্তর-ভারতের আরও কয়েকজন হিন্দু রাজার সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি সাহাবুদ্দিন ঘোরিকে বাধা দেন এবং যদ্ধে তাঁকে পরাজিত করেন। কিন্তু পর বৎসর সাহাবুদ্দিন ঘোরি বহু সৈন্য সংগ্রহ করে পুনরায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং পৃথ্বীরাজকে পরাজিত ও নিহত করেন।

 পৃথ্বীরাজ পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন। লোকে আজও তাঁর নাম করে থাকে। তাঁর সম্বন্ধে অনেক কাহিনী এ দেশে প্রচলিত আছে। কথিত আছে, কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের কন্যাকে তিনি হরণ করে নিয়েছিলেন। এই হেতু রাজা জয়চন্দ্র তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়ান এবং দুজনের মধ্যে এই শত্রুতাই সাহাবুদ্দিন ঘোরির জয়লাভের সহায়তা করেছিল।

 ১১৯২ খৃস্টাব্দে পৃথ্বীরাজকে পরাস্ত করে সাহাবুদ্দিন ভারতে মুসলমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন; ক্রমশ তা বিস্তার লাভ করতে লাগল। দেড় শো বছরের মধ্যে দক্ষিণ ভারতের বহুলাংশ তার অন্তর্ভুক্ত হল। কিন্তু শীঘ্রই আবার বাধা পড়ল। দাক্ষিণাত্যে গোটাকতক হিন্দু ও মুসলমান স্বাধীন রাষ্ট্র এই সময়ে মাথা তুলে দাঁড়ায়; এদের মধ্যে বিজয়নগরের হিন্দুরাজ্য প্রধান। প্রায় দু শো বছর মুসলমান সাম্রাজা কোণঠাসা হয়ে বইল। তার পরে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে আকবরের সময় থেকে আবার শুরু হল ইসলামের জয়যাত্রা, প্রায় সমগ্র ভারতে তার প্রতিপত্তি স্থাপিত হল।

 এই মুসলমান আক্রমণেরও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল ভারতবর্ষে। আক্রমণকারীরা সকলেই ছিল আফগান—আরব অথবা পারশ্যবাসী নয়, কিংবা পশ্চিম-এশিয়ার শিক্ষিত এবং সভ্য মুসলমানও নয়। সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে আফগানরা ভারতীয়দের সমকক্ষ ছিল না; কিন্তু তারা ছিল অধিকতর পরাক্রমশালী জাতি আর সজীব। ভারতীয়রা তখন অচল অসাড় জাতি, জীবনহারা। তারা প্রাচীনপন্থী, সাবেকি আমলের রীতিনীতিই আঁকড়ে ধরে ছিল; এমনকি যুদ্ধনীতিরও পরিবর্তন করে নি। তাই তো, সেকালের ভারত, সাহসী আর ত্যাগী হয়েও, মুসলমানদের নিকট পরাস্ত হয়েছিল।

 প্রথমে এই মুসলমানরা কী ক্রূর আর নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোকই-না ছিল! অবশ্য কারণও ছিল। একে তো তাদের দেশটাই ছিল কাঠখোট্টাগোছ, কোমলতার স্থান ছিল না সেখানে; তার উপরে আবার ওরা এসে পড়েছিল একটা অজানা অচেনা দেশে, চার দিকে শত্রু, প্রতিমূহর্তে বিদ্রোহের আশঙ্কা। এ অবস্থায় নিষ্ঠুর না হয়ে উপায় কী? লোককে দমিয়ে রাখতে হবে তো? তাই নির্বিচারে হত্যা চলল। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডে ধর্মের প্রশ্ন ছিল না কোনো; আসল ব্যাপার হল, বিজয়ী কর্তৃক পরাজিতের বিদ্রোহী মনোভাব নষ্ট করা। সাধারণতই দেখা যায়, এইসব নিষ্ঠুর কার্যের অজুহাত হিসাবে ধর্মকে দাঁড় করানো হয়ে থাকে, কিন্তু সেটা ঠিক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্ম ছিল একটা ছল, আসল কারণটা ছিল রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক। মধ্য-এশিয়ার যেসকল জাতি ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিল, ইসলামধর্মে দীক্ষিত হবার আগে থেকেই তো তারা ছিল নির্দয় নিষ্ঠুর। আসল কথা কী জানো? নূতন দেশ জয় করে তার উপরে আধিপত্য বজার রাখবার একটামাত্র উপায়ই তাদের জানা ছিল—সেটা হল ভয়প্রদর্শন।

 কালক্রমে ভারতীয়দের সংস্পর্শে এই দুর্দান্ত জাতির স্বভাব কোমল হল, সভ্যতার ছোঁয়াচ লাগল। বিদেশী আক্রমণকারীর মনোভাব আর রইল না, নিজেদের ভারতীয় বলেই মনে করতে লাগল। বিয়ে-সাদিও হল এ দেশের মেয়েদের সঙ্গে; আক্রমণকারী আর আক্রান্তের মধ্যে প্রভেদটা কমে এল ধীরে ধীরে।

 ভারতবর্ষের ইতিহাসে গজনির সুলতান মাহ্‌মুদ তো শ্রেষ্ঠ ধ্বংসকারীরূপে প্রসিদ্ধিলাভ করেছেন; হিন্দু-বিদ্বেষীও তাঁকে বলা হয়। কিন্তু শুনে অবাক হবে, তাঁর অধীনে এক হিন্দু-সেনাবাহিনীও ছিল, এবং ঐ বাহিনীর সেনানায়কও ছিল একজন হিন্দু—নাম তিলক। এই তিলক এবং তার সৈন্যবাহিনীকেই মাহ্‌মুদ গজনি পাঠিয়েছিলেন বিদ্রোহী মুসলমানদের দমন করতে। তবেই দেখো, মাহ্‌মুদের উদ্দেশ্যটা ছিল দেশ-জয়। তিনি ভারতবর্ষে যেমন মুসলমান সৈন্যের সাহায্যে মূর্তিপূজাপন্থীদের দমন করেছেন, তেমনি আবার মধ্য-এশিয়ায় হিন্দু সৈন্যের সহায়তায় মুসলমানদের হত্যা করতে কশুর করেন নি।

 ইসলামধর্ম ভারতকে একটা নাড়াচাড়া দিলে। ইদানিং ভারতবর্ষের সমাজ তথাকথিত অচলায়তনে পরিণত হয়েছিল, সর্বপ্রকার অগ্রগতির ধারা ছিল রুদ্ধ। ইসলাম এনে দিল জীবনীশক্তি, অগ্রগতির উদ্যম। হিন্দু-শিল্পকলার অবনতি ও বিকৃতি ঘটেছিল; উত্তর-ভারতে একটা নূতন শিল্পকলার জন্ম হল—সজীব ও সতেজ; একে ইন্দো-মুসলিম শিল্পকলা বলা যেতে পারে। মুসলমানরা যে নূতন ভাবধারা আমদানি করল ভারতীয় স্থপতিবিশারদগণ অনুপ্রাণিত হল তাতে; ইসলামের সরল ও অনাড়ম্বর জীবনাদর্শের ছাপ পড়ল স্থাপত্যে।

 মুসলমান-আক্রমণের ফলে উত্তর ভারত থেকে দলে দলে লোক দক্ষিণ ভারতে চলে গেল। মাহ্‌মুদের লুণ্ঠন আর হত্যাকাণ্ডের পর উত্তর ভারতে দারুণ আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল। লোকে মনে করত, যেখানে ইসলাম সেখানেই নৃশংসতা আর ধ্বংস। সুতরাং নূতন আক্রমণ যখন শুরু হল, যতসব গুণীজ্ঞানী লোক চলে গেল দাক্ষিণাত্যে; ফলে সেখানকার আর্যসভ্যতায় খুব একটা সজীবতা ও উদ্দীপনা এসে গেল।

 দাক্ষিণাত্যের কথা ইতিপূর্বে তোমাকে কিছু কিছু বলেছি। ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শুরু করে দু শো বছর কাল চালুক্য-সাম্রাজ্য প্রাধান্য বিস্তার করেছিল পশ্চিম আর মধ্য-ভারতে, অর্থাৎ মারাঠাদেশে। হিউয়েন শাঙ সম্রাট দ্বিতীয় পুলকেশীর রাজসভায় এসেছিলেন। তার পরে এল রাষ্ট্রকূটরা; ওরা চালুক্যদের পরাস্ত করে দাক্ষিণাত্যে রাজত্ব করেছিল প্রায় দু শো বছর, অষ্টম শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত। রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে সিন্ধুর আরব-রাজাদের বেশ সদ্ভাব ছিল; বহু আরব-ব্যবসায়ী আর পর্যটক এসেছিল ওদের রাজসভায়। জনৈক পর্যটক তৎকালীন (নবম শতাব্দী) রাষ্ট্রকূট-সম্রাট সম্বন্ধে বলে গেছেন যে, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চারজন সম্রাটের মধ্যে একজন। তাঁর মতে অন্য তিনজন শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন, বোগদাদের খলিফা, চীনের সম্রাট আর হুন অর্থাৎ কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের সম্রাট। এ থেকে সেই সময়কার এশিয়ার লোকদের ধারণারই পরিচয় পাওয়া যায়। খলিফার বোগদাদ-সাম্রাজ্য তখন ক্ষমতা ও খ্যাতির শীর্ষদেশে; সুতরাং আরব-পর্যটক যে তাঁর সঙ্গে রাষ্ট্রকূট-সাম্রাজ্যের তুলনা করেছেন, তাতে বোঝা যায়, ঐ রাজ্যও খুব সমৃদ্ধ আর শক্তিশালী ছিল। দশম শতাব্দীতে চালুক্য-বংশ আবার পরাক্রমশালী হয়ে উঠল এবং ৯৭৩ খৃষ্টাব্দে রাষ্ট্রকূটদের পরাস্ত করে রাজত্ব করল দু শো বছর, ১১৯০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। একজন চালুক্য সম্রাটের সম্বন্ধে কাহিনী প্রচলিত আছে যে, তাঁর স্ত্রী স্বয়ম্বর সভায় তাঁকে স্বামীরূপে বরণ করেছিল। এই প্রাচীন আর্যরীতি যে এতকাল প্রচলিত ছিল এটা আশ্চর্যের বিষয়।

 আরও দক্ষিণ-পূর্বে তামিলদেশ। খৃষ্টীয় তৃতীয় শতক থেকে নবম শতক অবধি এই ছয় শো বছর পহ্লবী-বংশের রাজত্ব ছিল এখানে; ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শ-দুই বছর পহ্লবীরা সমগ্র দাক্ষিণাত্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এই পহ্লবীরাই মালয় এবং প্রাচ্যের দ্বীপসমূহে উপনিবেশ অভিযান প্রেরণ করেছিল, সে কথা তোমার মনে থাকবে-বা। পহ্লব-সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কাঞ্চী বা কাঞ্জীভরম্।

 এর পরে চোল বংশের আধিপত্য। চোল-সাম্রাজ্যের কথা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। রাজরাজ এবং রাজেন্দ্র এই দুই সম্রাটের আমলে চোল সাম্রাজ্য খুব পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিল। ওঁরা বিরাট নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন এবং সিংহল, ব্রহ্ম আর বঙ্গদেশ জয় করতে গিয়েছিলেন। এঁদের প্রধান কীর্তি, গ্রামা পঞ্চায়েত প্রথার প্রচলন। নীচ থেকে শুরু করে উপর অবধি এই প্রথায় কাজ হত। গ্রাম্য সমিতিগুলো নির্বাচন করত বিভিন্ন কার্যনির্বাহক সমিতি আর জেলা-সমিতি; কতকগুলো জেলা নিয়ে গঠিত হত একটা প্রদেশ। আমি অনেক চিঠিতেই এই স্বায়ত্তশাসন-প্রথার উল্লেখ করেছি; আর্য শাসনব্যবস্থার মূলে ছিল এই প্রথা।

 উত্তর-ভারত যখন আফগানদের আক্রমণে বিপর্যস্ত, দক্ষিণ ভারতে তখন চোল বংশের প্রাধান্য। কিন্তু আশ্চর্য, শীঘ্রই চোল বংশ হীনবল হয়ে পড়ে এবং তাদেরই অধীন একটা ছোটো রাজা স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে। এই রাজ্যের নাম পাণ্ডা-রাজ্য, মাদুরা ছিল এর রাজধানী। এখানে কয়াল একটি প্রসিদ্ধ বন্দর ছিল। ভেনিসবাসী প্রসিদ্ধ পর্যটক মার্কোপোলো ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে দুবার কয়াল-বন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর লিখিত বিবরণে কয়ালনগরের সমৃদ্ধির উল্লেখ আছে; আরব ও চীন দেশের বাণিজ্য জাহাজে বন্দর ভর্তি থাকত। মার্কো জাহাজে করেই চীন থেকে এখানে এসেছিলেন। মার্কোর বিবরণে সূক্ষ্ম মসলিন-বস্ত্রের উল্লেখ আছে, তৈরি হত ভারতের পূর্ব উপকূলে। মাদ্রাজের উত্তরে তেলেগু-রাজ্যের রানী ছিলেন রুদ্রমণি দেবী; ইনি চল্লিশ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। মার্কোপোলো এঁর খুব প্রশংসা করেছেন। ওঁর বিবরণে আর-একটা খবর আছে—আরব ও পারশ্য থেকে বিস্তর ঘোড়া দক্ষিণ ভারতে আমদানি হয়েছিল, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের জলবায়ু অশ্ব-উৎপাদনের উপযোগী ছিল না। লোকে বলে, ভারতের মুসলমান-আক্রমণকারীরা যে ভালো যোদ্ধা ছিল তার একটা কারণ, তাদের ঘোড়াগুলো খুব তেজী ছিল। এশিয়ায় অশ্ব-উৎপাদনের ভালো ভালো স্থানগুলো গুদেরই অধীনে ছিল কিনা।

 ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চোল বংশের পতনের পর পাণ্ডা-রাজ্যই ছিল প্রভাবশালী তামিল-রাজ্য। চতুর্দশ শতকের প্রথম ভাগে ১৩১০ খৃষ্টাব্দে মুসলমান-আক্রমণের ঢেউ এসে পৌঁছল দাক্ষিণাত্যে; অচিরে পাণ্ডা-রাজ্য মুসলমানদের বশীভূত হল।

 এই চিঠিতে দক্ষিণ-ভারতের ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা গেল, অবশ্য এর অনেক কথা আমি আগেও তোমাকে লিখেছি। পহ্লব, চালুক্য, চোল প্রভৃতি কত কত বংশের রাজত্ব, সব যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। তবে সমগ্রভাবে যদি এই যুগের ইতিহাসের দিকে তাকাও, মোটামটি ব্যাপারটা বুঝতে বেগ পেতে হবে না। অশোক সারা ভারতবর্ষে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, তুমি জানো; তা ছাড়া সমগ্র আফগানিস্থান এবং মধ্য-এশিয়ার কতকাংশও তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর রাজত্বের পর দাক্ষিণাত্যে অন্ধ্র-সাম্রাজ্যের উদ্ভব হয়; এর প্রতিপত্তি বজায় ছিল চার শো বছর। এই সময়েই আবার উত্তর-ভারতে ছিল কুষাণ সাম্রাজ্য। তেলেগু অন্ধ্র-বংশ হীনবল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তামিল পহ্লব-বংশের আবির্ভাব হয়; এই বংশ রাজত্ব করল দীর্ঘ ছয় শো বছর। পহ্লবীরা মালয়ে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। তার পরে চোল বংশের রাজত্ব। শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল এদের; তাই তো সমুদ্রেও আধিপত্য ছিল চোলদের, জয় করেছিল তারা দূরদূরান্তের দেশ। তিন শো বছর রাজত্বের পর চোল বংশের অন্তর্ধান; তার স্থান অধিকার করে পাণ্ডা-রাজ্য। রাজধানী মাদুরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াল, কয়াল হল বাণিজ্যপ্রধান বন্দর।

 এই হল দক্ষিণ আর পূর্ব-ভারতের ইতিহাস। পশ্চিমে মহারাষ্ট্র-অঞ্চলে প্রথমে ছিল চালুক্যবংশের রাজস্ব; পরে রাষ্ট্রকূট এবং তার পর আবার চালুক্যদের আধিপতা।

 অনেকগুলো বংশের নাম উল্লেখ করতে হল। একটা বিষয় লক্ষা করবে, এইসকল রাজ্য দীর্ঘকাল স্থায়ী ছিল, এবং উঁচুদরের সভ্যতা বিস্তার করেছিল। আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ছিল এদের এবং সেজন্যেই ইউরোপের রাজ্যগুলোর চেয়ে এরা বেশি দিন টিঁকে ছিল, শান্তিতেও ছিল। কিন্তু কী জানো, সমাজের কাঠামোটা জীর্ণ হয়ে এসেছিল, তাই চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমভাগে যখন দক্ষিণদিকে মুসলমান সৈনারা অগ্রসর হতে লাগল, ওটা ভেঙে পড়তে সবুর সইল না।