বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/যুদ্ধের গতি

উইকিসংকলন থেকে

১৪৯

যুদ্ধের গতি

১লা এপ্রিল, ১৯৩৩

 ১৯১৪ সনে আগস্ট মাসের প্রথমে যুদ্ধ শুরু হল। পৃথিবীসুদ্ধ লোক চোখ মেলে তাকিয়ে রইল বেলজিয়মের আর ফ্রান্সের উত্তর-সীমান্তের দিকে। বিরাট জর্মন বাহিনী ক্রমেই এগিয়ে চলেছে; পথে যা-কিছু বাধা বিঘ্ন পড়ছে একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অল্প কিছুক্ষণের মতো ক্ষুদ্র বেলজিয়মই তার গতিকে স্তব্ধ করে দিল। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে জর্মনরা বেলজিয়ানদের মনে ভয় জন্মিয়ে দেবার চেষ্টা করল। বিভীষিকার সৃষ্টি হয় এমন সব কাজ করতে লাগল—এইসব কাজকে ভিত্তি করেই মিত্রপক্ষ তাদের নৃশংসতার গল্পগুলো তৈরি করতে পেরেছিল। জর্মন সেনা প্যারিস-শহরের দিকে চলল; তাদের সম্মুখে ফ্রান্সের সেনা যেন হটে গিয়ে গুটিয়ে যেতে লাগল, ইংরেজদের ক্ষুদ্র বাহিনী ধাক্কা খেয়ে এক পাশে ছিট্‌কে পড়ে রইল। যুদ্ধ শুরু হবার পর এক মাসের মধ্যেই মনে হল, প্যারিস-নগরীর আর রক্ষা নেই; ফরাসি সরকার পর্যন্ত তাঁদের সমস্ত দপ্তরখানা আর দরকারি জিনিসপত্র বোর্দো-শহরে স্থানান্তরিত করবেন বলে প্রস্তুত হলেন। জর্মনদের অনেকের ধারণা হল, যুদ্ধে তাদের বস্তুত জয় করা হয়ে গেছে। আগস্ট মাসের শেষ দিকে এই ছিল জর্মনির পশ্চিম-রণাঙ্গন অর্থাৎ ফরাসি রণাঙ্গনের অবস্থা।

 ইতিমধ্যে রাশিয়ার সেনা এসে পূর্ব-প্রাশিয়া আক্রমণ করেছে; পশ্চিম সীমান্ত থেকে জর্মনদের মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে নেবার যা-হোক-একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। ইংলণ্ডে আর ফ্রান্সে লোকেরা খুব বেশিরকম আশা করল, রাশিয়ার সে স্টীম রোলার এবার গড়িয়ে একেবারে বার্লিন পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছবে। কিন্তু রাশিয়ার সৈনাদের ভালো অস্ত্রশস্ত্র নেই, তাদের সেনানীরা একেবারেই অকর্মণ্য, এবং তাদের পিছনে রয়েছে জারের সরকার, দুর্নীতি আর ত্রুটিতে পরিপূর্ণ। জর্মনরা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের উপর গিয়ে পড়ল, পূর্ব-প্রাশিয়ায় হ্রদ এবং জলাভূমি অঞ্চলের মধ্যে বিরাট একটি রুশ বাহিনীকে ফাঁদে আট্‌কে ফেলল, তার পর তাকে একেবারে নিঃশেষে বিনষ্ট করে দিল। জর্মনদের এই বিরাট জয়ের নাম হল—ট্যানেনবুর্গের যুদ্ধ; এতে যে প্রধান সেনানীরা এই অভিযান চালিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ফন হিণ্ডেনবুর্গ; ইনি পারে জর্মন-প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেণ্ট হয়েছিলেন।

 অতি বৃহৎ রণজয়, কিন্তু এই জয় করতে গিয়ে অন্য দিক দিয়ে জর্মন সেনাকে ক্ষতিও সইতে হল অনেকখানি। এই যুদ্ধ জয় করবার জন্যে, এবং পূবদিকে রাশিয়ার অভিযানে একটু খানি ভয় পেয়ে গিয়েছিল ব’লে তারা তাদের অনেক সৈন্য ফ্রান্সের দিক থেকে রাশিয়ার দিকে এনে ফেলেছিল। এর ফলে পশ্চিম-রণাঙ্গনে জর্মনদের চাপ কিছুটা কমে গিয়েছিল; সেই সুযোগে ফরাসি সেনা একটা বিপুল উদ্যম দেখিয়ে আক্রমণকারী জর্মন সেনাকে পিছনে হটিয়ে দেবার চেষ্টা করল। ১৯১৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে মার্নের যুদ্ধ হল, এই যুদ্ধে ফরাসিরা জর্মন সেনাকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল হটিয়ে দিল। প্যারিস-শহর রক্ষা পেয়ে গেল, ফরাসি আর ইংরেজ সেনারও একটু দম ফেলবার অবকাশ মিলল।

 ফরাসিদের বাধা ভেঙে এগিয়ে যাবার আরও একটা চেষ্টা জর্মনরা করল, প্রায় সফলও হল; কিন্তু এবারও ফরাসিরা তাদের ঠেকিয়ে রাখল। তখন দুই দলের সৈন্যরাই মাটি খুঁড়ে তার মধ্যে ঢুকে বসল; নূতন একরকমের যুদ্ধ শুরু হল, এর নাম ট্রেঞ্চ-যুদ্ধ। এ একটা দাবার কিস্তির মতো ব্যাপার; তিন বছরেরও বেশি কাল ধরে, এবং খানিক পরিমাণে যুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যন্তই, পশ্চিম রণাঙ্গনে এই ট্রেঞ্চ-যুদ্ধ চলতে লাগল। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সেনাবাহিনী ছুঁচোর মতো গর্ত খুঁড়ে মাটির মধ্যে ঢুকে বসে রইল। নিছক ধর্না দিয়ে বসেই পরস্পরকে অবসন্ন করে ফেলতে চেষ্টা করতে লাগল। যুদ্ধের একেবারে শুরু থেকেই এই রণাঙ্গনে জর্মন এবং ফ্রান্সের যে সেনাবাহিনী এসে বসেছিল তার সংখ্যা বহু লক্ষ। ব্রিটিশ সেনার সংখ্যা প্রথমে অল্প ছিল, তার পর তারও সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলল, শেষে তারও হিসাব অনেক লক্ষের অঙ্কেই দাঁড়িয়ে গেল।

 পূর্ব অর্থাৎ রুশ রণাঙ্গনে সৈন্যদের চলাচল হচ্ছিল অনেক বেশি। রুশ সেনারা বারবার অস্ট্রিয়ানদের হারিয়ে দিছিল, আবার নিজেরা প্রত্যেক যুদ্ধেই জর্মনদের কাছে হেরে যাচ্ছিল। এই রণাঙ্গনে হতাহতের সংখ্যা একেবারে বিপুল হয়ে উঠল। তাই বলে মনে কোরো না, পশ্চিম-রণাঙ্গনে ট্রেঞ্চ-যুদ্ধ চলছিল বলে নরহত্যা সেখানেও বিশেষ কম হচ্ছিল। মানুষের জীবন নিয়ে যেন পরম হেলাভরেই ছিনিমিনি খেলা হচ্ছিল; শত্রু-সেনা যেখানে ট্রেঞ্চ খুঁড়ে কায়েমি হয়ে বসেছে সেই স্থানগুলি দখল করবার জন্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল; অথচ ফল হচ্ছিল না কিছুই।

 আরও বহু জায়গাতে রণক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। তুর্কিরা সুয়েজখাল আক্রমণ করতে চেষ্টা করল, কিন্তু বাধা পেয়ে হটে গেল। মিশরের কথা তো আগেই বলেছি; ১৯১৪ সনের ডিসেম্বর মাসে মিশরকে ব্রিটেনের রক্ষণাধীন দেশ বলে ঘোষণা করা হল। তার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটেন সেখানকার নবসৃষ্ট ব্যবস্থাপক সভাকে মুলতুবি করে দিল, দেশের মধ্যে যেসব লোকের উপর তাদের সন্দেহ ছিল তাদের ধরে নিয়ে জেলখানা পূর্ণ করে ফেলল। জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রগুলোর কণ্ঠরোধ করা হল; পাঁচজনের বেশি লোক একত্রিত হওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেল। মিশরে চিঠিপত্র সেন্সরের যে ব্যবস্থা প্রবর্তিত করা হল, লণ্ডনের টাইমস পত্রিকা তার বর্ণনা দিয়েছিল “বর্বরের মতো নিষ্করুণ” বলে। বস্তুত যুদ্ধের আগাগোড়া সমস্ত সময়টা ধরেই মিশরে সামরিক আইন চালু রাখা হয়েছিল।

 তুর্কির নড়বড়ে সাম্রাজ্য, তার দুর্বল জাযগা বেছে বেছে বহু স্থানে ব্রিটেন আক্রমণ করে বসল—ইরাকে, পরে আবার প্যালেস্টাইনে আর সিরিয়াতে। আরব দেশে আরবদের জাতীয় চেতনা জেগে উঠছিল তারই সুযোগ নিল ব্রিটেন; প্রচুর পরিমাণে টাকা আর মালমশলা ঘুষ দিয়ে তুরষ্কের বিরুদ্ধে আরবদের একটা বিদ্রোহ ঘটিয়ে তোলবার ব্যবস্থা করল। এই বিদ্রোহের মূলে খুব বড়ো হাত ছিল কর্ণেল টি. ই. লরেন্সের; ইনি ছিলেন আরবদেশে ব্রিটেনের একজন চর। এই ঘটনায় পরবর্তী কালে তিনি একজন রহস্যময় ব্যক্তি বলে প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছেন, এশিয়ার বহু আন্দোলনেই নিজে গোপনে থেকে অনেকখানি অংশ গ্রহণ করেছেন।

 তুরষ্কের একেবারে কেন্দ্রস্থলে সরাসরি আঘাত হানা কিন্তু শুরু হল ১৯১৫ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে। ব্রিটিশ নৌবহর দার্দানেলিস-প্রণালী আক্রমণ করল, সেই পথে উঠে গিয়ে তারা কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ দখল করবে। এ যদি তারা করে উঠতে পারত তবে কেবল যুদ্ধে তুর্কির অংশগ্রহণই শেষ হয়ে যেত না, পশ্চিম এশিয়াতে জর্মনির প্রভাবও আর পৌঁছবার পথ পেত না। কিন্তু যুদ্ধে তারা হেরে গেল। তুর্কিরা বিপুল বিক্রমে লড়াই করল, এবং তাদের এই জয়ের কৃতিত্বের একটা বড়ো ভাগ মুস্তাফা কামাল পাশার প্রাপ্য। প্রায় এক বছর ধরে ব্রিটিশরা গ্যালিপলিতে এই চেষ্টা চালাল, তার পর অনেক সৈন্য ও অর্থ সেখানে বিসর্জন দিয়ে ফিরে এল

 পশ্চিম এবং পূর্ব-আফ্রিকাতে জর্মনদের যেসব উপনিবেশ ছিল, মিত্রপক্ষ তাদেরও আক্রমণ করল। এই উপনিবেশগুলি আর জর্মনির মধ্যে যোগাযোগের কোনো রাস্তাই ছিল না; জর্মনি থেকে কোনো রাস্তাই তারা পেল না। একে একে তারা সকলেই পরাজিত হল। চীনে কিয়াওচাও-প্রদেশটা জর্মনদের ‘কনসেশন’ (ইজারা) ছিল, জাপান অতি সহজেই সেটা দখল করে নিল। বাস্তবিক জাপানেরই তখন মজা। দূর-প্রাচ্যে যুদ্ধবিগ্রহ তেমন কিছু ছিল না। অতএব জাপান এই সুযোগটাকে কাজে লাগাল, একমাত্র জুলুম আর চোখ-রাঙানির চোটেই চীনের কাছ থেকে নানা রকমের ইজারা এবং সুযোগসবিধা আদায় করে নিল।

 ইতালি অনেক মাস ধরে যুদ্ধের গতি নিরীক্ষণ করে দেখল, কোন পক্ষের জিতবার সম্ভাবনা তাই বুঝে নেবার চেষ্টা করল। তার পর যখন তার স্থির ধারণা হল মিত্রপক্ষেরই জিতবার ভরসা দেখা যাচ্ছে তখন মিত্রপক্ষ তাকে যে ঘুষ দিতে চাচ্ছিল তা গ্রহণ করতে রাজি হয়ে গেল, মিত্রপক্ষের সঙ্গে তার একটা গোপন সন্ধি হল। ১৯১৫ সনের মে মাসে ইতালি যথারীতি মিত্রপক্ষের সঙ্গে যোগ দিল। দু বছর ধরে ইতালি আর অস্ট্রিয়া পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করে চলল, বিশেষ ফল কোনোদিকেই কিছু দেখা গেল না। তার পর জর্মনরা অস্ট্রিয়াকে সাহায্য করতে এল; এদের মিলিত আক্রমণে ইতালি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। জর্মনি আর অস্ট্রিয়ার মিলিত বাহিনী প্রায় ভেনিস শহর পর্যন্ত গিয়ে হাজির হল।

 ১৯১৫ সনের অক্টোবর মাসে বুল্‌গেরিয়া জর্মনির পক্ষে যোগ দিল। এর অল্পদিন পরেই অস্ট্রিয়া জর্মনির সেনা বুল্‌গেরিয়ার সঙ্গে একত্র হয়ে সার্বিয়াকে একেবারে ধূলিসাৎ করে দিল। সার্বিয়ার রাজা হতাবশিষ্ট সেনা সঙ্গে নিয়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন, মিত্রপক্ষের জাহাজে এসে আশ্রয় নিলেন। সার্বিয়া জর্মনির অধীন হয়ে গেল।

 রুমানিয়া বল্‌কান যুদ্ধের সময় যে কাণ্ড করেছে তার পর থেকেই তার সুবিধাবাদী ব’লে একটা বিশেষ খ্যাতি রটে গিয়েছিল। দু বছর সে লক্ষ্য করে দেখল মহাযুদ্ধের গতি কোন্ দিকে যায়; তার পর ১৯১৬ সনে আগস্ট মাসে মিত্রপক্ষের সঙ্গে যোগ দিল। এর শাস্তি পেতেও তার দেরি হল না; জর্মন সেনা ঝড়ের মতো তার উপরে গিয়ে পড়ল, তার সমস্ত বাধাকে নিঃশেষে চূর্ণ করে দিল। রুমানিয়াও অস্ট্রিয়া-জর্মনির অধীনে চলে গেল।

 এমনি করে কেন্দ্রস্থ দুটি দেশ অস্ট্রিয়া আর জর্মনি বেলজিয়ম, ফ্রান্সের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের খানিক অংশ, পোল্যাণ্ড, সার্বিয়া এবং রুমানিয়া অধিকার করে নিল। ছোটোখাটো রণাঙ্গনগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জয় হল। কিন্তু যুদ্ধের প্রধান ক্ষেত্র ছিল পশ্চিম-রণাঙ্গনে আর সমুদ্রে, সেখানে তারা বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারছিল না। পশ্চিম রণাঙ্গনে দুই প্রতিপন্থী সেনাবাহিনী মরণ-আলিঙ্গনে দৃঢ়বদ্ধ হয়ে বসে রইল। সমুদ্রে মিত্রশক্তিরই শক্তি অপরাজেয়। যুদ্ধের প্রথম দিকে কতকগুলো জর্মন ক্রুজার ইতস্তত ঘুরে বেড়িয়েছিল, মিত্রপক্ষের জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করেছিল। এদের একটি হচ্ছে সেই বিখ্যাত ‘এম্‌ডেন’, সে মাদ্রাজে পর্যন্ত এসে গোলা ফেলে গিয়েছিল। কিন্তু এটা মূল ব্যাপার থেকে বিচ্ছিন্ন একটা ক্ষুদ্র ঘটনামাত্র; সমুদ্রপথগুলিতে সর্বত্রই মিত্রপক্ষ কর্তৃত্ব করছিল, সে কর্তৃত্ব এতে কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হল না। এই কর্তৃত্বের জোরেই তারা চেষ্টা করছিল, বাইরে থেকে কোনোরকম খাদ্যদ্রব্য বা অন্য বস্তু এই কেন্দ্রীয় জাতিদের কাছে গিয়ে পৌঁছতে দেবে না। এদের এই অবরোধ জর্মনি এবং অস্ট্রিয়ার পক্ষে একেবারে অগ্নিপরীক্ষাস্বরপ হয়ে উঠল; তাদের খাদ্যদ্রব্যের অভাব দেখা দিল, সমস্ত লোক অনাহারে মরবে এমনি একটা সম্ভাবনা আসন্ন হয়ে উঠল।

 ওদিকে জর্মনিও তার সাবমেরিন দিয়ে মিত্রপক্ষের জাহাজ ডুবিয়ে দিতে আরম্ভ করল। এই সাবমেরিনের যুদ্ধে সে এতটা কৃতিত্ব দেখাল যে, ইংলণ্ডের খাদ্যের জোগান কমে গেল, দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা ঘটল। ১৯১৫ সনের মে মাসে একটি জর্মন সাবমেরিন ইংলণ্ডের বিখ্যাত আটলাণ্টিক-যাত্রী জাহাজ লুসিটানিয়াকে ডুবিয়ে দিল; এই জাহাজে বহু লোক ডুবে মারা গেল। অনেক আমেরিকানও এই জাহাজের সঙ্গে মারা গিয়েছিল; কাজেই এই ব্যাপারে আমেরিকাতেও প্রচণ্ড বিক্ষোভের সৃষ্টি হল।

 আকাশপথেও জর্মনি ইংলণ্ডকে আক্রমণ করল। বিপুলদেহ জেপেলিন উড়োজাহাজ চাঁদনী রাতে এসে লণ্ডনে এবং যেসব জায়গাতে অস্ত্রশস্ত্রের কারখানা ছিল সেখানে বোমা ফেলে যেতে লাগল। পরের দিকে এই বোমা ফেলার কাজ হতে লাগল এরোপ্লেন দিয়ে; প্লেনের ঘর্ঘর শব্দ, বিমানধ্বংসী কামানের আওয়াজ, প্রাণ বাঁচাবার জন্যে মানুষের ছুটোছুটি করে মাটির তলায় গুদাম-ঘরে আর আশ্রয়কক্ষে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া, এ সমস্তই একেবারে অভ্যস্ত ব্যাপার হয়ে উঠল। জর্মনরা অসামরিক লোকদের উপরে বোমা ফেলেছিল বলে ব্রিটিশ জাতি রাগে খেপে উঠল। রেগে ওঠা অন্যায়ও নয়, কারণ এটা সত্যই খুব ভয়ানক আচরণ। কিন্তু ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে বা ইরাকে যখন ব্রিটিশ এরোপ্লেনরা বোমা ফেলে যায় বা বিশেষ করে সেই শয়তানির চরম আবিষ্কার কাল-বিলম্বী বোমা (time bomb) ফেলে, ব্রিটেনের লোকরা কিছুমাত্র ক্রুদ্ধ হয় না। একে বলা হয় শান্তিরক্ষার কাজ, তথাকথিত শান্তির সময়েও এ কাজ চালানো হয়ে থাকে।

 এমনি করে যুদ্ধ এগিয়ে চলল, মাসের পর মাস অতিক্রম করে—দাবানল যেমন পতঙ্গের পালকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় তেমনি করে লক্ষ মানুষের জীবনকে ভস্মসাৎ করে যত এগিয়ে চলল ততই সে আরও বেশি করে ধংসলীলা আর বর্বরতার অনুষ্ঠান করতে লাগল। জর্মনরা বিষ-বাষ্প বার করল; দু দিন না যেতে দুই পক্ষই বিষ-বাষ্প ব্যবহার শুরু করল। বোমা ফেলবার জন্যেই এরোপ্লেনের ব্যবহার বাড়ল; তার পরেই এল ট্যাঙ্ক্। ট্যাঙ্কের ব্যবহার প্রথম করে ব্রিটেন; বিশালাকৃতি যন্ত্রদানব এরা, শুঁয়োপোকার মতো গতিতে সমস্ত কিছুকে দ’লে চলে যায়। সমস্ত রণক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাতে লাগল, আর তাদের পিছনে তাদের নিজের দেশে নারী আর শিশুরা ক্ষুধা এবং অভাবের তাড়নায় জর্জর হয়ে উঠল। বিশেষ করে জর্মনি আর অস্ট্রিয়াতে অবরোধের ফলে খাদ্যাভাব ভয়ানক তীব্র হয়ে উঠল। সবসুদ্ধ এটা দাঁড়িয়ে গেল একটা সহনশক্তির পরীক্ষা; এই পরীক্ষায় কোন্ পক্ষ অপর পক্ষের পরেও টিঁকে থাকতে পারবে? কোনো পক্ষের সেনাই কি সত্যি করে অপর পক্ষকে অবসন্ন করে ফেলতে পারবে? মিত্রপক্ষ জর্মনিকে অবরোধ করেছে, জর্মনির মনের জোর কি তাতে ভাঙ্‌বে? অথবা কি জর্মনদের সাবমেরিন-অভিযানের ফলে ইংলণ্ডই অনাহারে কাতর হবে, তার মনের এবং সংকল্পের জোর শিথিল হয়ে আসবে? প্রত্যেক দেশেরই পিছনে রয়েছে আত্মত্যাগ এবং দুঃখভোগের একটা বিরাট কাহিনী। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগল, এই ভয়াবহ আত্মবলি আর দুঃখভোগ এ কি বৃথাই যাবে? আমাদের মৃত আত্মীয়দের কি ভুলে যাব আমরা, শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করব? যুদ্ধের আগের দিনকে মনে হচ্ছে যেন সে কত যুগ যুগ আগের কথা; যুদ্ধ কেন বেধেছিল সে কথাও ভুলে গেল লোকে। স্ত্রীপুরুষনির্বিশেষে সমস্ত মানুষের মন শুধু, একটি কথাতেই আচ্ছন্ন হয়ে রইল—প্রতিশোধ নিতেই হবে, জয়লাভ করতেই হবে।

 মৃতদের আহ্বান, সে বড়ো নিদারুণ ডাক; তাদের পরম প্রিয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্যেই তারা নিজেদের বলি দিয়ে গেছে। পুরুষ হোক নারী হোক, যার মধ্যে কিছু মাত্র চেতনা বোধ আছে, সে কী করে এই ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে? যুদ্ধের এই শেষ ক’টি বছর, চারি দিক তখন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। যুদ্ধরত দেশদের প্রতিটি অধিবাসীর গৃহে মৃতজনের জন্য বিলাপ শোনা যাচ্ছে; মানুষের মনে মনে এসেছে ক্লান্তি, এসেছে মনোভঙ্গের বেদনা; কিন্তু তখনও মানুষের আর কী করবার ছিল, সংকল্পের উল্কাদ্যুতিকেই মাথার উপর তুলে ধরা ছাড়া? এই কবিতাটি পড়ো, এটি মেজর ম্যাক্‌ক্রে নামক একজন ব্রিটিশ সেনানীর লেখা। পড়ো, তার পর ভেবে দেখো, যুদ্ধের সেই অন্ধকার এবং ক্লান্তিময় দিনে তাঁর দেশবাসী নরনারী যারা এই কবিতা পড়েছিল তাদের মনে কতবড়ো নাড়া লেগেছে, এবং মনে রেখো বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন ভাষায় এরূপ কবিতা লেখা হয়েছিল:

আমরা মৃতের দল। বেশিদিনের কথা নয়
আমরাও ছিলাম বেঁচে, প্রভাতের স্পর্শ পেয়েছি, দেখেছি সূর্যাস্তের রক্তরাগ,
ভালোবেসেছি, ভালোবাসা পেয়েছি, আজ আমরা শুয়ে আছি
ফ্ল্যাণ্ডার্সের রণক্ষেত্রে।
শত্রুর সাথে আমাদের যে বিরোধ তাই তোমরা চালিয়ে যাও;
আমাদের বাহুর শক্তি ফুরিয়ে গেছে, তোমাদের ’পরে দিয়ে যাই
হাতের মশাল; অর্জন কোরো একে উঁচু করে রাখবার কৃতিত্ব।

এই নির্ভারের মর্যাদা যদি না রাখো, আমরা যারা মরে গেলাম,
আমরা ঘুমাব না, তখনও নয়, যখন পপির ফল ফুটে উঠবে
ফ্ল্যাণ্ডার্সের রণক্ষেত্রে।

 ১৯১৬ সনের শেষ দিকে দেখা গেল, বিজয়লক্ষী মিত্রপক্ষের দিকেই হেলে যাচ্ছেন। নূতন ট্যাঙ্ক্‌বাহিনীর জোরে তারা পশ্চিম-রণক্ষেত্রে এগিয়ে আক্রমণ চালাতে পারছে; ইংলণ্ডে বোমা ফেলতে আসছিল যে জেপেলিন উড়োজাহাজরা, তারা বিপন্ন হচ্ছে। জর্মন সাবমেরিনের পাহারা সত্ত্বেও নিরপেক্ষ দেশদের জাহাজে করে প্রচুর খাদ্যদ্রব্য ইংলণ্ডে এসে পৌঁচচ্ছে। ১৯১৬ সনের মে মাসে উত্তর সাগরে একটি নৌযুদ্ধ হল (জোট্‌ল্যাণ্ডের যুদ্ধে), মোটের উপর এতে ব্রিটেনেরই খুব সুবিধা হয়ে গেল। জর্মনির চার দিকে যে অবরোধ বসানো হয়েছিল তার ফলে ইতিমধ্যে অস্ট্রিয়া আর জর্মনির প্রজাদের পক্ষে অনশন আসন্ন হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল যেন কালের গতিই কেন্দ্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে চ’লে গেছে। এখন খুব তাড়াতাড়ি এই জয়কে সম্পূর্ণ করে তোলা দরকার। জর্মনি কয়েকবার শান্তিস্থাপনের প্রস্তাবও করে পাঠাল, কিন্তু মিত্রশক্তি সে কথা মোটে কানেই তুলল না। বিভিন্ন দেশকে নিজেদের মধ্যে কীভাবে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়া হবে সে বিষয়ে নানাবিধ গোপন চুক্তি করে করে মিত্রপক্ষের সরকাররা নিজেদের বেশ আবদ্ধ করে ফেলেছে; এখন পূর্ণ জয়লাভ না করে তৃপ্ত হবার আর তার উপায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্ট উড্রো উইল্‌সনও শান্তিস্থাপন করবার চেষ্টা কয়েকবার করলেন, সে চেষ্টা ব্যর্থ হল।

 জর্মন রণনায়করা তখন স্থির করলেন, সাবমেরিনের আক্রমণ আরও তীব্র করে তুলবেন, অনাহারের তাড়নাতেই ইংলণ্ডকে হার মানতে বাধ্য করবেন। ১৯১৭ সনের জানুয়ারি মাসে তাঁরা ঘোষণা করলেন, সমুদ্রের বিশেষ কতকগুলো অংশে গেলে নিরপেক্ষ দেশের জাহাজকেও তাঁরা ডুবিয়ে দেবেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, এই নিরপেক্ষ দেশরাও যেন ইংলণ্ডে খাদ্যের জোগান দিতে না পারে। এই ঘোষণা শুনে আমেরিকা অত্যন্ত চটে গেল। তার জাহাজও এইভাবে ডুবিয়ে দেওয়া হবে এটা সে সহ্য করতে পারে না। এর ফলে যুদ্ধে তার যোগদান অনিবার্য হয়ে উঠল। বস্তুত সাবমেরিন-আক্রমণ চালাবার বেলায় কোনো বাছবিচার রাখবেন না, এই সিদ্ধান্ত যখন জর্মন সরকার করেছিলেন তখন তার ফলে এ সম্ভাবনাও নিশ্চয়ই তাঁদের অজানা ছিল না। হয়তো তাঁরা বুঝেছিলেন, অন্যকোনো পথ তাঁদের আর খোলা নেই, অতএব এটকু ঝুঁকিও নিতেই হবে। অথবা হয়তো ভেবেছিলেন, এমনিতেই তো আমেরিকার মহাজনরা মিত্রপক্ষকে প্রচুর সাহায্য করছেন। যাই হোক, ১৯১৭ সনের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ঘোষণা করল। তার রণসম্ভার প্রচুর; তা ছাড়া সে তখনও একেবারেই তরতাজা; অন্যান্য দেশেরা সকলেই শ্রান্ত। কাজেই আমেরিকা যুদ্ধে নামতেই জর্মনদের পরাজয় একেবারে নিশ্চিত হয়ে উঠল।

 তা ছাড়া, আমেরিকা যুদ্ধে নামার আগেই আরও একটা অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল। ১৯১৭ সনের মার্চ মাসে প্রথম রুশ বিপ্লব অনুষ্ঠিত হল; ১৫ই মার্চ জার সিংহাসন ত্যাগ করলেন। এই বিপ্লবের কথা আমি তোমাকে আলাদা করে লিখব। এখনকার মতো এইটুকু শুধু জেনে নাও, এই বিপ্লবের ফলে যুদ্ধের গতিতে একটা প্রকাণ্ড পরিবর্তন এল। রাশিয়ার পক্ষে তখন আর জর্মনির সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ চালানো সহজ নয়, আদৌ সম্ভব কি না তাই সন্দেহ। তার মানেই হল, পূর্ব-রণাঙ্গন নিয়ে জর্মনির আর দুশ্চিন্তার কারণ রইল না। পূর্ব-অঞ্চলের সমস্ত, অন্তত অধিকাংশ সেনাকে সে তখন পশ্চিম-পণাঙ্গনে চালান করতে পারে, সেখানে ফরাসি আর ব্রিটিশ সেনার উপরে নিয়ে ফেলতে পারে। হঠাৎ পরিস্থিতিটা জর্মনির পক্ষে খুবই সুবিধাজনক হয়ে উঠল। রাশিয়াতে এই বিপ্লব হবে, এই সংবাদটা যদি বিপ্লবের অন্তত ছ-সাত সপ্তাহ আগেও জর্মনি জানতে পেত তা হলে কী হত? তা হলে হয়তো জর্মন তার সাবমেরিন আক্রমণের নীতি পরিবর্তন করত না, সুতরাং আমেরিকাও হয়তো নিরপেক্ষই থেকে যেত। রাশিয়া আর রণক্ষেত্রে নেই এবং আমেরিকা নিরপেক্ষ হয়ে আছে, এরকম সুযোগ পেলে জর্মনি ব্রিটিশ আর ফরাসি সেনাকে একেবারে চূর্ণ করে দিতে পারত, এটা খুবই সম্ভব। যে অবস্থা বস্তুত ছিল তাইতেই দেখা গেল, পশ্চিম রণাঙ্গনে জর্মনদের শক্তি অনেক বেড়ে গিয়েছে; জর্মন সাবমেরিন মিত্রপক্ষ আর নিরপেক্ষ দুই দেশেরই বহু জাহাজ ধ্বংস করে তাদের বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

 বাইরের দৃষ্টিতে মনে হবে, রুশ বিপ্লবে জর্মনিরই সুবিধা হয়ে গেল। কাজে কিন্তু দেখা গেল, জর্মনির আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা-সৃষ্টির একটা প্রধান কারণ ছিল এই বিপ্লব। প্রথম বিপ্লবের পর আট মাসের মধ্যেই এল দ্বিতীয় বিপ্লব, এর ফলে ক্ষমতা পড়ল গিয়ে সোভিয়েট আর বল্‌শেভিকদের হাতে। তাদের কথা ছিল, শান্তি চাই। সমস্ত যুদ্ধরত দেশের সেনাদের উদ্দেশ করে তারা বলতে লাগল, এবার যুদ্ধ থামাও; তাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল, এ যুদ্ধ আসলে ধনিকদের যুদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদীদের সংকল্প সিদ্ধ করবার জন্যে শ্রমিকদের কামানের খাদ্যস্বরূপ ব্যবহার করা হচ্ছে, শ্রমিকরা যেন কিছুতেই এটা ঘটতে না দেয়। এদের এইসব উক্তি আর আবেদনের খানিকটা অন্তত অন্যান্য দেশের যে সৈন্যেরা রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিল তাদের কানে গিয়ে পৌঁছল; সেখানে এর প্রভাবও হল অসামান্য। ফরাসি সেনার মধ্যে অনেকবার বিদ্রোহ হল, কর্তৃপক্ষ সে বিদ্রোহ কষ্টেসৃষ্টে দমন করে রাখলেন। জর্মন সেনার মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল আরও বেশি; কারণ, বিপ্লবের পরে তাদের অনেকগুলি সেনাদল বস্তুত রাশিয়ার সেনার প্রতিই বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিল। এইসব সেনাদলকে যখন পশ্চিম-রণাঙ্গনে চালান করা হল, এরা সেই নূতন বাণীকে সেখানে বহন করে নিয়ে গেল, অন্যান্য সেনাদলের মধ্যেও এই বাণী প্রচার করল। জর্মনি তখন রণশ্রান্ত, একান্তরকম ভগ্নোৎসাহ; রাশিয়া থেকে যে বীজ তার জমিতে এসে পড়ল তাকে সাগ্রহে গ্রহণ করে নেবে বলে সে জমি আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে আছে। এইভাবে রুশ-বিপ্লব জর্মনির মধ্যেই দুর্বলতার সৃষ্টি করে দিল।

 জর্মনির সামরিক কর্তৃপক্ষ কিন্তু এইসব অশুভ লক্ষণ দেখেও দেখলেন না। ১৯১৮ সনের মার্চ মাসে তাঁরা সোভিয়েট রাশিয়ার উপরে একটি অত্যন্ত কঠোর এবং অপমানকর সন্ধি চাপিয়ে দিলেন। সোভিয়েটদের এই সন্ধি মেনে নিতেই হল, কারণ তাদের তা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না, আর তখন তাদের যে করেই হোক যুদ্ধ বন্ধ করা দরকার। ১৯১৮ সনের মার্চ মাসেই পশ্চিম-রণাঙ্গনেও জর্মনি তার শেষ বড়ো অভিযান শুরু করল। ইংরেজ এবং ফরাসি সেনার রেখা ভেদ করে জর্মনবাহিনী এগিয়ে চলল, চলার পথে এদের বহু সেনাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেল, আবার সেই মার্ন-নদীর তীরে গিয়ে হাজির হল; সাড়ে তিন বছর আগে এইখান থেকেই তাদের হটে যেতে হয়েছিল। প্রকাণ্ড একটা বীরত্বের খেলা সন্দেহ নেই, কিন্তু এই তাদের শেষ অভিযান—জর্মনির শক্তি তখন নিঃশেষ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে আটলাণ্টিক পার হয়ে আমেরিকা থেকে বহু সৈন্য এসে পৌঁছল; এবং বহু তিক্ত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ফলে এবার পশ্চিম-রণাঙ্গনে মিত্রপক্ষের যত সেনা ছিল, ব্রিটিশ আমেরিকান ফরাসি ইত্যাদি সবাইকে একটিমাত্র চরম কর্তৃপক্ষের অধীন করে দেওয়া হল—যেন এদের মধ্যে যথাসাধ্য সহযোগিতা আর কর্মের ঐক্য থাকতে পারে। পশ্চিম-রণাঙ্গনে মিত্রপক্ষের সমস্ত সেনার উপরে প্রধান সেনাপতি হলেন ফ্রান্সের মার্শাল ফশ। ১৯১৮ সনের মাঝামাঝি এসেই দেখা গেল, যুদ্ধের গতি একেবারেই উল্‌টো পথে চলছে; এখন মিত্রপক্ষই এগিয়ে এসে আক্রমণ চালাচ্ছে, ক্রমাগত সামনে এগিয়ে চলেছে, জর্মন সেনা তাদের ধাক্কায় কেবলই পিছনে হটে যাচ্ছে। অক্টোবর মাসে বোঝা গেল, যুদ্ধ শেষ হতে আর দেরি নেই। যুদ্ধ-বিরতির কথাও উঠল।

 ৪ঠা নভেম্বর তারিখে কিয়েল্ বন্দরে জর্মন নৌসেনার মধ্যে বিদ্রোহ হল। এর পাঁচ দিন পরে বার্লিনে জর্মন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল। ঠিক সেই দিন, সেই ৯ই নভেম্বরই কাইজার দ্বিতীয় উইল্‌হেলম্ অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং লজ্জাকর ভাবে জর্মনি থেকে পালিয়ে হল্যাণ্ডে চলে গেলেন; তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই হোহেনজোলার্ন-রাজবংশেরও শেষ হয়ে গেল। চীনের মাঞ্চু-রাজাদের মতো এঁরাও ‘এসেছিলেন বাঘের মতো গর্জন করে, চলে গেলেন সাপের লেজের মতো নিঃশব্দে।’

 ১৯১৮ সনের ১১ই নভেম্বর যুদ্ধবিরতি-পত্র স্বাক্ষর করা হল, যুদ্ধ থামল। এই যুদ্ধবিরতি-পত্র রচিত হয়েছিল আমেরিকার প্রেসিডেণ্ট উইল্‌সনের নির্ধারিত ‘চৌদ্দ দফা শর্ত’কে আশ্রয় করে। এই চৌদ্দ দফার মধ্যে কতকগুলি বড়ো বড়ো কথা ছিল; যেমন, ছোটো ছোটো জাতিদেরও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে, সকল দেশেরই রণসজ্জা হ্রাস করতে হবে, কেউ কারও সঙ্গে গোপন কূট-চক্রান্ত চালাতে পারবে না, সকল জাতিরই রাশিয়াকে সাহায্য করতে হবে, এবং একটি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত করা হবে। পরে আমরা দেখব, বিজয়ী পক্ষ এই চৌদ্দ দফার অনেকগুলি শর্তই কেমন অনায়াসে ভুলে গিয়েছিল।

 যুদ্ধ শেষ হল। কিন্তু ইংলণ্ডের নৌবহর জর্মনিকে অবরোধ করে বসে ছিল, সে অবরোধ তখনও সরিয়ে নেওয়া হল না; জর্মনির অনাহার-পাঁড়িত নারী ও শিশদের কাছে তখনও খাদ্য পৌঁছতে দেওয়া হল না। শত্রুর প্রতি বিদ্বেষ এবং সে দেশের ক্ষুদ্র শিশুদের পর্যন্ত শাস্তি দেওয়ার এই অপূর্ব অনুষ্ঠান—ব্রিটেনের বিখ্যাত সব রাষ্ট্রনীতিক এবং জননেতারা, বড়ো বড়ো সংবাদপত্ররা এমনকি তথাকথিত উদারপন্থী পত্রিকারা পর্যন্ত একে সমর্থন করতে লাগল। বস্তুত ইংলণ্ডে তখন প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন একজন উদারপন্থী—লয়েড জর্জ। সওয়া-চার বছর ব্যাপী এই যদ্ধের ইতিহাস উন্মত্ত পাশবিকতা এবং নৃশংসতার কাহিনীতে পরিপূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধ থামবার পরেও নিছক পাশবিক প্রতিহিংসার বশে জর্মনির এই অবরোধ চালিয়ে যাওয়া, এর তুলনা বোধ হয় সে ইতিহাসেও আর নেই। যুদ্ধ তখন শেষ হয়ে গেছে, অথচ তখনও একটা সমগ্র জাতি অনাহারে মরে যাচ্ছে, তার ক্ষুদ্র শিশুরা পর্যন্ত ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে মরছে, জেনেশুনে ইচ্ছে করে এবং জোর করে তাদের কাছে খাদ্য পৌঁছতে দেওয়া হচ্ছে না। যুদ্ধ আমাদের মনকে কতখানি বিকৃত করে তোলে, কতখানি উন্মত্ত বিদ্বেষবুদ্ধি দিয়ে ভরে তোলে, দেখলে তো? জর্মনির বয়োবৃদ্ধ চ্যান্সেলর বেথ্‌মান্‌ হল্‌ভেগ বলেছিলেন, “ইংলণ্ড আমাদের উপরে যে অবরোধের বেড়া চাপিয়ে রেখেছে, নিষ্ঠুরতার সে মার্জিত রূপকে একেবার নারকীয় ছাড়া আর-কিছুই বলা চলে না; আমাদের সন্তানদের এবং পরবর্তী বংশধরদের মধ্যেও এর ক্ষতচিহ্ন চিরদিন বেঁচে থাকবে।”

 বড়ো বড়ো রাষ্ট্রনায়করা আর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা এই অবরোধকে অনুমোদন করছিলেন; সাধারণ ব্রিটিশ সৈনিকরা, যারা নিজেরা সে যুদ্ধ করেছিল, তারা কিন্তু এ দৃশ্য সইতে পারল না। সন্ধির পরে রাইন্‌ল্যাণ্ডের কোলন শহরে একটি ব্রিটিশ বাহিনীকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল; এই বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত ইংরেজ সেনাপতি প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে “জর্মন নারী এবং শিশুদের যে কষ্ট সইতে হচ্ছে তা দেখে ব্রিটিশ সৈনিকদের মনে কতখানি বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে” তার খবর জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। যুদ্ধবিরতির পরেও সাত মাসের বেশি কাল ধরে ইংলণ্ড জর্মানিকে এইভাবে অবরোধ করে রেখেছিল।

 এই দীর্ঘ কাল ধরে যুদ্ধ দেখে দেখে যুদ্ধরত জাতিদের মানুষেরা পশুর মতোই হয়ে উঠেছিল। বহু লোকের মন থেকে নীতি-দুর্নীতির বোধ লুপ্ত হয়ে গেল; বহু সাধারণ লোকেরও মন স্বাভাবিকত্ব হারিয়ে অর্ধ-অপরাধীর মন হয়ে উঠল। নৃশংসতা নরহত্যা এবং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা কথায় মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল; তাদের সমস্ত মন ভরে গিয়েছিল শুধু, ঘৃণা বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসাপ্রকৃতিতে।

 যুদ্ধের জমা-খরচের হিসাব দেখেছ? সে হিসাব পুরোপরি আজও কেউ জানে না; এখনও সে হিসাব করে দেখা হচ্ছে! তার থেকে গোটাকতক অঙ্ক আমি তোমাকে শোনাচ্ছি; শুনে বুঝবে, এখনকার দিনে যুদ্ধে বলতে কী বোঝায়।

 যুদ্ধে নোট যত লোক হতাহত হনেছে তার হিসাব এইরকম পাওয়া গেছে:

মৃত বলে জানা গেছে এমন সৈনিক ...   ...   ১,০০,০০,০০০
মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছে এমন সৈনিক ...   ...   ৩০,০০,০০০
মৃত অসামরিক লোক ...   ...   ১,৩০,০০,০০০
আহত ...   ...   ২,০০,০০,০০০
বন্দী ...   ...   ৩০,০০,০০০
যুদ্ধের ফলে পিতৃমাতৃহীন শিশু ...   ...   ৯০,০০,০০০
যুদ্ধের ফলে বিধবা ...   ...   ৫০,০০,০০০
আশ্রয়প্রার্থী সর্বস্বান্ত ...   ...   ১,০০,০০,০০০

 এই প্রকাণ্ড অঙ্কগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো, কল্পনা করতে চেষ্টা করো, মানুষের কতখানি দুঃখকষ্টের কাহিনী এই অঙ্কের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। অঙ্কগুলোকে যোগ করে দেখো। কেবল হত ও আহতেরই মোট সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে চার কোটি ষাট লক্ষ; যুক্তপ্রদেশের মোট লোকসংখ্যার প্রায় সমান!

 আর এর ব্যয়ের অঙ্ক? সে আজও গুণে শেষ করা যায় নি! আমেরিকাতে একবার হিসাব করে বলা হয়েছিল, মিত্রপক্ষের মোট বার পড়েছে ৪০,৯৯,৯৬,০০,০০০ পাউণ্ড—প্রায় পঞ্চান্ন হাজার কোটি টাকা। জর্মনদের পক্ষে মোট ব্যয় হয়েছে ১৫,১২,২০,০০,০০০ পাউণ্ড—প্রায় সওয়াকুড়ি হাজার কোটি টাকা। দুই পক্ষের মোট ব্যয় পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকা! এইসব অঙ্কের পুরোপুরি ধারণা করে ওঠাই আমাদের পক্ষে শক্ত, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এর একেবারেই কোনো মিল নেই। দেখলে মনে হয় যেন জ্যোতিষের অঙ্ক কষছি, পৃথিবী থেকে সূর্যের বা নক্ষত্রের দূরত্বের হিসাব মাপছি! বহু দিন আগে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, বিজয়ী ও বিজিত, যুদ্ধরত কোনো জাতিই আজও সেই যুদ্ধকালীন ব্যয়ের পরবর্তী ফলের ধাক্কা সামলে উঠতে পারছে না—এতেও আশ্চর্য হবার কিছুই নেই।

 যুদ্ধের অবসান ঘটাবার জন্যে, ‘পৃথিবীতে গণতন্ত্রের আসন নিরাপদ করবার জন্যে’, ‘ছোটো ছোটো জাতিদেরও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্যে’, ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সকলের আয়ত্ত করে দেবার জন্যে’, এবং সাধারণভাবেই স্বাধীনতা ও অনেক বড়ো বড়ো আদর্শের জন্যে অনুষ্ঠিত এই যুদ্ধ শেষ হল; ইংলণ্ড ফ্রান্স আমেরিকা ইতালি এবং এদের ক্ষুদ্রতর উপগ্রহরা (রাশিয়ার অবশ্যই আর এদের মধ্যে স্থান নেই) জয়ী হল। এদের এইসব বৃহৎ এবং মহৎ আদর্শকে এরা কীভাবে ও কতখানি কার্যে পরিণত করেছে তা আমরা পরে দেখব। ইতিমধ্যে ইংরেজ কবি সাদে’'র কবিতা থেকে কয়েকটি ছত্র উদ্ধৃত করি। অনেক আগের দিনের আর-একটা যুদ্ধজয় সম্বন্ধে তিনি কবিতাটি লিখেছিলেন:

সবাই শুনে বলল, ডিউক কী মহাবীর,
এমন বিরাট যুদ্ধ করল জয়!
"কিন্তু তাতে লাভ কী হল এ পৃথিবীর?”
ছোট্টো ছেলে পিটারকিন্‌ যে কয়।
ডিউক বলে, “সেটা তো ঠিক নেই জানা,
কিন্তু ভারি জবর আমার জয়খানা!”