বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/যুদ্ধের সময়ে ভারতবর্ষ
১৫৪
যুদ্ধের সময়ে ভারতবর্ষ
ভারতবর্ষ অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটা অংশ হিসাবে সোজাসুজিই বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভারতবর্ষের মধ্যে বা কাছে কোনো যুদ্ধ হয় নি। তাহলেও ভারতবর্ষের অগ্রগতির উপরে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ নানা প্রকারেই যুদ্ধের প্রভাব এসে পড়েছিল, ভারতবর্ষের জীবনযাত্রার অনেক বড়ো বড়ো পরিবর্তনও ঘটিয়েছিল। মিত্রপক্ষের সাহায্য করবার জন্য তার সমস্ত সম্পদকেই যথাসম্ভব কাজে লাগানো হয়েছিল।
ভারতবর্ষের যুদ্ধ এ নয়। জর্মন পক্ষের সঙ্গে ভারতবর্ষের কোনো ঝগড়া ছিল না; আর তুরষ্কের কথা যদি বলো, তার উপরে বরং ভারতবর্ষের প্রচুর সহানভূতিই ছিল। কিন্তু ভারতবর্ষ—ব্রিটেনের অধীন দেশ মাত্র; বাধ্য হয়েই তাকে তার সাম্রাজ্যবাদী অধীশ্বরীর পদসেবা করতে হয়। অতএব দেশের লোকের মনে প্রবল আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সেনারা—তুর্কি, মিশরবাসী এবং অন্যান্য জাতিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে গেল; পশ্চিম-এশিয়ার সর্বত্র ভারতের নাম অপ্রিয় করে দিয়ে এল।
আগের একটি চিঠিতেও বলেছি, যুদ্ধ যখন বাধে তখন ভারতের রাজনৈতিক চেতনার স্রোতে ভাঁটা চলেছে। যুদ্ধ বাধবার ফলে মানুষের মনোযোগ সেদিক থেকে আরও বেশি স’রে গেল; যুদ্ধ উপলক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার নানাবিধ বিধিনিষেধ জারি করেছিলেন, তার ফলেও বাস্তবক্ষেত্রে রাজনৈতিক আন্দোলন চালানো কঠিন হয়ে উঠল। যুদ্ধের সময়টা শাসন-কর্তৃপক্ষের কাছে সর্বত্রই সুবিধার মরশুম; যুদ্ধের দোহাই দিয়ে তারা অন্য সকলকেই নিষ্পেষিত করতে পারে, নিজেদের যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াতে পারে। স্বাধীন কার্যকলাপের অনুমতি দেওয়া হয় মাত্র একটি ক্ষেত্রে, তাদের নিজেদের বেলায়। সংবাদ ও চিঠিপত্রের উপরে সেন্সরের পাহারা বসানো হয়; তার জোরে সত্যকে গোপন করা হয়, অনেক সময়েই মিথ্যা কথা প্রচার করা হয় এবং সমালোচনার পথ রুদ্ধ করা হয়। বিশেষ প্রকারের আইন এবং অনুশাসন সৃষ্টি করে জাতীয়তাবাদীদের প্রায় সকলপ্রকার কার্যকলাপকেই নিয়ন্ত্রিত করে রাখা হয়। প্রত্যেক যুদ্ধরত দেশেই এই কাজ করা হয়েছিল; স্বভাবতই ভারতবর্ষেও হল। এখানে একটি ‘ভারত-রক্ষা আইন’ তৈরি করা হল। যুদ্ধ বা তার সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারেরই সমালোচনা যাতে জনসাধারণ করতে না পারে, তার কণ্ঠ এই আইনে ভালো করেই রোধ করে দেওয়া হল। তবুও কিন্তু মনে মনে এদেশের প্রায় সকল লোকই জর্মন পক্ষের এবং বিশেষ করে তুরষ্কের প্রতি সহানভূতিসম্পন্ন ছিল; কিংবা হয়তো এই বললেই ঠিক বলা হবে—মনে মনে সকলেই কামনা করছিল ব্রিটেন একটা বড়ো রকমের ঠ্যাঙানি খাক্। নিজেরা যারা প্রচুর ঠ্যাঙানি এতদিন খেয়ে এসেছে সেই অক্ষমদের পক্ষে এরকমের কামনা করা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এ কামনাকে বাইরে কেউ প্রকাশ করল না।
বাইরে অনেকে ব্রিটেনের প্রতি রাজভক্তি জানিয়ে উচ্চ চীৎকারে গগন বিদীর্ণ করতে লাগল। এই চীৎকারের বেশির ভাগই করছিল এদেশী-রাজ্যদের রাজারা; খানিকটা উচ্চারিত হচ্ছিল উচ্চতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীদের কণ্ঠে, সরকারের সঙ্গে যাদের ঘনিষ্ঠ সংশ্রব। কিছু পরিমাণে বুর্জোয়ারাও এদিকে আকৃষ্ট হয়েছিল, মিত্রপক্ষ গণতন্ত্র স্বাধীনতা এবং ক্ষুদ্র জাতিদের স্বাধীন অধিকার ইত্যাদি নিয়ে যে-সব লম্বা বুলি আওড়াচ্ছিলেন তাই শুনে। এদের ভরসা হয়েছিল, হয়তো এদের এই-সব আশ্বাসবাক্য এরা ভারতবর্ষকেও লক্ষ্য করে বলছে; আশা করছিলেন তখন যদি ব্রিটেনের সেই সংকটের মুহূর্তে ভারতবর্ষ তাকে সাহায্য করে, তবে হয়তো পরে একদিন ব্রিটেনও ভারতবর্ষকে তার যোগ্য পুরস্কার দিতে কুণ্ঠিত হবে না। আর সেটা হোক না হোক, নিজের ইচ্ছামত কিছুই তো করবার যো ছিল না তখন, কাজ চালাবার জন্য কোনো নিরাপদ পন্থাও ছিল না। অতএব এঁরা ভাবলেন যা পাওয়া যাচ্ছে সেই ছাই মুঠোকেই উড়িয়ে দেখা যাক যদি তলায় কিছু থাকে।
ভারতবর্ষে রাজভক্তির এই যে বাহ্যিক প্রকাশ, তখনকার দিনে ইংলণ্ডের লোক তা দেখে খুবই মুগ্ধ হল, নানা প্রকারে তারা এজন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করল। ইংলণ্ডে তখন কর্তৃপক্ষ যাঁরা ছিলেন তাঁরাও বললেন, হ্যাঁ, এবার থেকে ইংলণ্ডও ভারতবর্ষের দিকে ‘একটু নূতনতর দৃষ্টি’ নিয়ে চেয়ে দেখবে।
কিন্তু ভারতবর্ষে এবং অন্যান্য দেশে তখনও কিছু সংখ্যক ভারতবাসী ছিলেন, যাঁরা এই ‘রাজভক্তি’ প্রকাশ করলেন না। এদেশের অধিকাংশ লোকের মতো চুপ করে এবং নিষ্ক্রিয় হয়েও বসে বইলেন না তাঁরা। তাঁদের বিশ্বাস ছিল আয়ার্ল্যাণ্ডের সেই পুরোনো নীতিটিই সত্য, ইংলণ্ড মুশকিলে পড়লেই তাঁদের দেশের সুযোগ। বিশেষ করে জর্মনিতে এবং ইউরোপের অন্যান্য কয়েকটি দেশে কয়েকজন ভারতবাসী ছিলেন। এঁরা বার্লিনে এসে একত্র হয়ে ইংলণ্ডের শত্রু পক্ষকে সাহায্য করবার উপায় উদ্ভাবন করতে লেগে গেলেন, একটি কমিটিও তৈরি করলেন এজন্য। জর্মন সরকার তখন স্বভাবতই সকল প্রকার সাহায্য নিতে উদগ্রীব হয়ে আছে; এই ভারতীয় বিপ্লবীদের তারা সাগ্রহে অভ্যর্থনা করল। জর্মন সরকার এবং ভারতীয় কমিটি, এই দুই পক্ষের মধ্যে একটা রীতিমতো লিখিত চুক্তিপত্র তৈরি হল, উভয়েই তাতে স্বাক্ষর করলেন। এই চুক্তিপত্রে অনেক কথাই ছিল। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, ভারতীয়রা যুদ্ধে জর্মন সরকারকে সাহায্য করবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এই শর্তে যে, যুদ্ধে যদি জর্মনির জয় হয় তবে তখন জর্মনি ভারতবর্ষকে স্বাধীন করে দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। এর পর থেকে যতদিন যুদ্ধ চলল, তার আগাগোড়া সময়টাই এই ভারতীয় কমিটি জর্মনির পক্ষ হয়ে কাজ করে চললেন। ভারত থেকে যে-সব ভারতীয় সৈন্যদের বিদেশে পাঠানো হচ্ছিল তাদের মধ্যে এ প্রচারকার্য চালাতে লাগলেন; এদিকে একেবারে আফগানিস্তান এবং ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত এদের কার্যকলাপ বিস্তৃত হয়েছিল। কিন্তু এর দ্বারা শুধু ব্রিটেনকে অনেকখানি উদ্বিগ্ন করে তোলা ছাড়া আর বেশি কিছু এরা করে উঠতে পারলেন না। সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে অস্ত্রশস্ত্র পাঠাবার একটা চেষ্টাও এরা করেছিলেন, সে চেষ্টা ব্রিটিশরা বার্থ করে দিল। শেষপর্যন্ত যুদ্ধে জর্মনি হেরে গেল; এই কমিটি এবং সমস্ত আশাভরসারও সঙ্গে সঙ্গেই অবসান হয়ে গেল।
ভারতবর্ষের মধ্যেও বিপ্লবীদের কার্যকলাপ কিছু কিছু প্রকাশ পেল; স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল খাড়া করে অনেক ষড়যন্ত্র মামলার বিচার করা হল; বহু লোককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল, বহু লোককে দীর্ঘ কালের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হল। সেই সময়ে যাঁদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তাঁদের অনেকে আজও জেলে রয়েছেন—এই আঠারো বছর পরেও!
যুদ্ধ যত এগিয়ে চলল, অন্যান্য দেশের মতো এদেশেও অল্প কজন লোক বিরাটরকম লাভ করে নিতে লাগল; ওদিকে অধিকাংশ লোকের দুর্দশা ক্রমেই বাড়তে লাগল; লোকের মনে অসন্তোষও বেড়ে উঠল। যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার জন্য ক্রমেই আরও বেশি লোকের দরকার হতে লাগল; সেনাবাহিনীতে লোক সংগ্রহ করার তৎপরতাও ক্রমে খুবই বেড়ে গেল। সৈন্য সংগ্রহ করে যারা দেবে তাদের যতরকম সম্ভব লোভ আর পুরস্কারের আশা দেখানো হতে লাগল; জমিদারদের উপরে হুকুম হল তাদের প্রতোককে নিজের প্রজাদের ভিতর থেকে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য জোগাড় করে দিতে হবে। সেনাদল এবং সামরিক শ্রমিকদের লোক সংগ্রহ করবার জন্যে এই সব জবরদস্তির ব্যবস্থা বিশেষ করে প্রয়োগ করা হল পাঞ্জাবে। সৈন্য এবং শ্রমিকবাহিনী হিসাবে ভারতবর্ষ থেকে বিভিন্ন রণক্ষেত্রে যত লোক পাঠানো হয়েছিল তাদের মোট সংখ্যা দশ লক্ষেরও বেশি। এই ভাবে যাদের যুদ্ধের কাজে ভর্তি করে নেওয়া হল তারা এতে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হল; অনেকে বলেন যুদ্ধের পরে পাঞ্জাবে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল এইটাই তার অন্যতম কারণ।
আরও একটা দিক থেকে পাঞ্জাবকে ক্ষতি সইতে হল। বহু পাঞ্জাবী, বিশেষ করে শিখ দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কালিফোর্নিয়াতে এবং পশ্চিম-কানাডার অন্তর্গত ব্রিটিশ কলম্বিয়াতে চলে গিয়েছিল। এখন থেকে ক্রমাগতই সেখানে লোক যেতে লাগল; শেষে আমেরিকা এবং কানাডার কর্তৃপক্ষ এদের যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। এই আগন্তুকদের বাধা দেবার জন্য কানাডা সরকার আইন করলেন, যারা পথে জাহাজ না বদলে একেবারে একটানা এদেশের বন্দর থেকে কানাডার বন্দরে গিয়ে পৌঁছবে, কেবল তাদেরই কানাডাতে ঢুকতে দেওয়া হবে। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল শুধু ভারতীয় আগন্তুকদের সে দেশে যেতে না দেওয়া; চীনে বা জাপানে জাহাজ বদল না করে এদের কানাডাতে পৌঁছবার পথ ছিল না। দেখেশুনে বাবা গুর্দিৎ সিং নামক একজন শিখ একটি আস্ত জাহাজই ভাড়া করে নিলেন, তার নাম ‘কোমাগাতা মারু’। সেই জাহাজে করে বিরাট একদল লোক নিয়ে তিনি কলিকাতা থেকে সোজা কানাডার ভ্যানকুভার বন্দরে গিয়ে হাজির হলেন। কানাডার আইনকে তিনি এই ফন্দি খাটিয়ে এড়িয়ে গেলেন। তাহলেও কানাডা সরকার তাঁকে দেশে ঢুকতে দিতে রাজি হল না, এই জাহাজের কোনো আরোহীকেই তারা সেখানে নামতে দিল না। সেই জাহাজে করেই তাঁদের ফিরে আসতে হল; একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে এবং অত্যন্ত ক্রুদ্ধচিত্তে এঁরা ভারতে এসে পৌঁছলেন। কলিকাতার কাছে বজবজে পুলিশের সঙ্গে এদের বেশ একটি ছোটোখাটোরকমের যুদ্ধ হল, সে যুদ্ধে বহু লোক মারাও পড়ল, বিশেষ করে শিখদের পক্ষে। এর পরেও আবার এই শিখদের অনেককে পুলিশ সর্বত্র অনুসরণ করে বেড়াল, পাঞ্জাবের মধ্যেও সর্বত্র খুঁজে খুঁজে এদের গ্রেপ্তার করা হল। এই লোকগুলো পাঞ্জাবে জনসাধারণের মধ্যে বিদ্বেষ এবং অসন্তোষ প্রচার করে বেড়াল; ‘কোমাগাতা মারু’ সংক্রান্ত সমস্ত ব্যাপারটাই ভারতের সর্বত্র লোকের বিক্ষোভের কারণ হয়ে উঠল।
সেই যুদ্ধের দিনে কত কী ঘটেছিল তার সমস্ত বিবরণ জানতে পাওয়া কঠিন; কারণ সেন্সরের চাপে তখন অনেক রকম সংবাদই প্রকাশিত হতে পারত না, সুতরাং মানুষের মুখে মুখে নানারকমের অদ্ভূত গুজব ছড়াত। তবে এটকু জানা গেছে, সিঙ্গাপুরে একটি ভারতীয় রেজিমেণ্টের মধ্যে একটা বেশ বড়ো বিদ্রোহ হয়েছিল; অন্যানা বহু স্থানেও ছোটোখাটো রকমের হাঙ্গামা দেখা দিয়েছিল।
যুদ্ধের জন্য সৈন্য যোগান দেওয়া এবং অন্যান্য উপায়ে সাহায্য তো ছিলই; এ ছাড়া নগদ টাকা দিতেও ভারতবর্ষকে বাধ্য করা হল। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ভারতবর্ষের ‘দান’। একবার এইভাবে দেওয়া হল দশকোটি পাউণ্ড; আরেকবারও আরেকটা প্রচণ্ড পরিমাণ টাকা দেওয়া হল। দরিদ্র দেশের কাছ থেকে এইভাবে জোর করে টাকা আদায় করে নিয়ে তাকে আবার ‘দান’ বলে প্রচার করা, এতে প্রমাণ হয় ব্রিটিশ সরকারেরও রসবোধ আছে।
এখন পর্যন্ত যা বলেছি সে সবই হচ্ছে যুদ্ধের ছোটোখাটো ফলাফলের কথা, মানে ভারতবর্ষের দিক থেকে। কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির ফলে অনেক বড়ো একটা মৌলিক পরিবর্তনও এসে যাচ্ছিল। যন্ত্রের সময়ে অন্যান্য দেশের মতো ভারতবর্ষেরও বৈদেশিক বাণিজ্য একদম ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটেন থেকে ভারতবর্ষে যে বিপুল পরিমাণ মালপত্র আসত তার বেশিরভাগই আসা বন্ধ হয়ে গেল। ভূমধ্যসাগরে এবং আট্লাণ্টিক মহাসাগরে জর্মন সাবমেরিনগুলো সমস্ত জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে বেড়াচ্ছে; সে অবস্থায় ব্যবসায়-বাণিজ্য চালানো যায় না। অতএব বাধ্য হয়ে ভারতবর্ষকে নিজের ব্যবস্থা নিজে করতে হল, তার যা কিছু দরকার নিজেরই তৈরি করে নিতে হল। আবার যুদ্ধের কাজে দরকার হয় এমন বহু জিনিস তৈরি করে সরকারকেও যোগান দিতে হল তার। এর ফলে ভারতবর্ষে নানারকমের শিল্প অতি দ্রুত বেড়ে উঠল—কাপড়ের কল পাটের কল প্রভৃতি পুরোনো শিল্প এবং যুদ্ধকালীন বহু নূতন শিল্প দুইই। টাটার লোহা আর ইস্পাতের কারখানাটিকে সরকার এতদিন অবজ্ঞার চোখেই দেখে আসছিলেন, এবার তারও খাতির অত্যন্তরকম বেড়ে গেল। সে যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরি করবার ক্ষমতা রাখে। এখন কিছুটা সরকারি তত্ত্বাবধানেই সে কারখানাটিকে চালানো হতে লাগল।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের কটা বছর—ভারতবর্ষের যত ধনিক, ব্রিটিশ বা ভারতীয় সকলেই একটা মস্ত সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল, বিদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভয়ও বিশেষ ছিল না তাদের। এই সুযোগের তারা সম্পূর্ণ সদ্বহার করল, প্রচুর টাকা লাভ করে নিল, অবশ্য সে টাকা যোগাতে হল এদেশের দরিদ্র জনসাধারণকেই। জিনিসপত্রের দাম অত্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হল; সকল ব্যবসায়েরই অংশীদারদের লভ্যাংশ এত বেশি হারে দেওয়া হতে লাগল যে শুনলে বিশ্বাস হয় না। কিন্তু যাদের পরিশ্রমে এই লভ্যাংশ আর লাভের সৃষ্টি, সেই শ্রমিকদের দুর্দশা যেমন তেমনই থেকে গেল। তাদের মাইনে সামান্য একটু বাড়ল বটে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রীর মূল্য বাড়ল তার চেয়ে অনেক বেশি, সুতরাং তাদের অবস্থা বস্তুত আগের চেয়ে আরও খারাপই হয়ে পড়ল।
ধনিকদের কিন্তু সমৃদ্ধির আর সীমা রইল না। তাদের হাতে প্রচুর পরিমাণ লাভ, সেই টাকা জমিয়ে ফেলল তারা; জমিয়ে আবার সেই টাকা ব্যবসায়ে খাটাতে চাইল। তখন তাদের জোর বেড়েছে, সরকারের উপরে পর্যন্ত তারা চাপ দিতে লাগল এজন্য—ভারতবর্ষে এ ঘটনা এই প্রথম। এদের চাপ ছাড়াও অবশ্য শুধু ঘটনাপ্রবাহের চাপে পড়েই যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সরকারকে ভারতীয় শিল্পকে সাহায্য করতে হচ্ছিল। দেশে শিল্প-প্রতিষ্ঠা আরও বাড়ানো হবে, অতএব বাইরে থেকে আরও বেশি বেশি যন্ত্রপাতি এদেশে আমদানি হতে লাগল, তখন পর্যন্ত সে-সব যন্ত্রপাতি ভারতবর্ষে তৈরি করবার ব্যবস্থা ছিল না। অতএব দেখা গেল, ইংলণ্ড থেকে ভারতবর্ষে এখন কলের তৈরি পণ্যদ্রব্যের বদলে বেশি আসছে যন্ত্রপাতি।
এই-সব ব্যাপারের ফলে ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের নীতিরও অনেক পরিবর্তন হল; এর আগের একশো বছর ধরে যে নীতি তারা চালিয়েছিল সেটা বর্জন করে এবার তারা নূতন একটা নীতির প্রবর্তন করল। অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেছে, তার সঙ্গে তাল রেখে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদও একেবারেই ভোল বদলে ফেলল। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম যুগ কীরকম ছিল তোমাকে বলেছি। তোমার হয়তো সেকথা মনে আছে। প্রথমে ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর যুগ, তখন তারা শুধু লুটপাট করত আর নগদ টাকা নিয়ে যেত। তার পর এল দ্বিতীয় অধ্যায়; ব্রিটিশ রাজত্ব তখন এদেশে কায়েমী হয়ে বসেছে—সে যুগটা টিঁকে রইল একশো বছরেরও বেশি কাল, একেবারে মহাযুদ্ধের সময় পর্যন্ত। এই সময়কার নীতি ছিল ভারতবর্ষকে শুধু একটা কাঁচামাল যোগান দেবার ক্ষেত্র এবং ব্রিটেনের উৎপন্ন পণ্যদ্রব্য বিক্রি করবার বাজারে পরিণত করে রাখা। এদেশে যে কোনো বড়ো রকমের কল-কারখানা বসাবার চেষ্টাকে সর্বতোভাবে বাধা দেওয়া হত; ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক প্রগতির পথও রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এবার এই যুদ্ধের সময়ে এর তার তৃতীয় যুগ: ভারতবর্ষে বড়ো বড়ো কল-কারখানা বসানোর চেষ্টাকে ব্রিটিশ সরকার উৎসাহ এবং সাহায্য দিতে লাগল; ব্রিটেনের উৎপাদন-শিল্পের স্বার্থ তাতে কিছুটা ব্যাহত হবে, তা সত্ত্বেও। ল্যাংকাশায়ারের কাপড় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হত ভারতবর্ষে; অতএব ভারতবর্ষে যদি কাপড়ের কল বাড়িয়ে তোলা হয় তবে সেই পরিমাণে ল্যাংকাশায়ারের ব্যবসায়ের ক্ষতি হবে, একথা সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু তাই যদি হয়, তবে ল্যাংকাশায়ার এবং ব্রিটেনের অন্যান্য শিল্পের স্বার্থহানি স্বীকার করে নিয়েও ব্রিটিশ সরকার তাঁদের নীতির এই পরিবর্তন সাধন করলেন কেন? করলেন, যুদ্ধের দরুন নানা অবস্থার চাপে পড়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে। এই পরিবর্তন কেন করা হল তার সমস্ত কারণ আমি তোমাকে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিচ্ছি
(১) যুদ্ধের সময় বহু জিনিসপত্রের প্রয়োজন বেড়েছে, অতএব সেই প্রয়োজন মেটাতে স্বভাবতই এদেশে কল-কারখানার প্রতিষ্ঠাও অনেক বেড়ে গেছে।
(২) এর ফলে ভারতবর্ষের ধনিকদের সংখ্যা এবং শক্তি বেড়েছে, সুতরাং তারা তখন আবার আরও বেশি বেশি কল-কারখানা বসাবার সুবিধা আদায় করে নিতে চেয়েছে, যেন এইভাবে তাদের বাড়তি লাভের টাকাটাকে তারা আবার খাটাতে পারে। এদের কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চলবার মতো সাহস তখন ব্রিটেনের ছিল না; তা করতে গেলে হয়তো এরা সরকারের উপর একেবারে চটে যাবে; চটে গিয়ে দেশের মধ্যে যে-সব চরমপন্থী এবং বিপ্লবপন্থী প্রতিষ্ঠান তাদেরই দলে গিয়ে ভিড়বে—তাদেরও তখন শক্তি ক্রমে বেড়ে উঠছিল। অতএব ব্রিটিশ সরকার দেখলেন, যদি সম্ভব হয় তবে ব্যবসায়-বাণিজ্য বাড়াবার কিছু কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়েও এদের নিজের পক্ষে টেনে রাখাই যুক্তিসঙ্গত।
(৩) ইংলণ্ডের ধনিকদের হাতে যে বাড়তি টাকা জমে গিয়েছে সে টাকাও তারা আবার খাটাতে চায়; যে দেশের নিজস্ব কল-কারখানা বিশেষ নেই এমন দেশেই যাবার সুযোগ তারা খুঁজছে, কারণ সেইখানে গেলেই লাভ বেশি হবে। ইংলণ্ড শিল্পবাণিজ্যে অত্যন্ত উন্নত দেশ, সেখানে টাকা খাটিয়ে বিশেষ সুবিধার ভরসা নেই। লাভের হার কম দাঁড়াবে সেখানে; তাছাড়া শ্রমিক আন্দোলনও সুসংহত হয়ে উঠছে। শ্রমিকদের নিয়ে প্রায়ই মুশকিলে পড়তে হচ্ছে। অনুন্নত দেশে শ্রমিকদেরও তেমন কোনো শক্তি নেই; অতএব সেখানে মজুরি কম দিয়ে পারা যায়, লাভও বেশি থাকে। স্বভাবতই ব্রিটিশ ধনিকরা ব্রিটেনে টাকা না খাটিয়ে বরং ব্রিটেনের অধীনস্থ কোনো অনুন্নত দেশে এসে টাকা খাটানো বেশি পছন্দ করে; ভারতবর্ষ ঠিক তেমনি একটি দেশ। অতএব ব্রিটেন থেকে বহু মূলধন ভারতে এসে হাজির হল, এবং তার ফলেই এদেশে আরও বেশি কল-কারখানা প্রতিষ্ঠিত হল।
(৪) যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে এটা দেখা গিয়েছিল, শিল্পপ্রগতিতে যে-সব দেশ অত্যন্ত এগিয়ে গেছে তারাই সত্য করে যুদ্ধ চালাবার শক্তি রাখে। যুদ্ধে জারশাসিত রাশিয়ার শেষপর্যন্ত পরাজয় হয়েছিল তার কারণ, রাশিয়াতে শিল্পব্যবস্থা ভালো ছিল না, তাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে অন্যান্য দেশের উপর নির্ভর করে। ইংলণ্ডের ভয়, এর পরের বারে হয়তো তাকে যুদ্ধ করতে হবে সোভিয়েট রাশিয়ার সঙ্গে, ভারতের সীমান্তদেশে। ভারতবর্ষে তার নিজস্ব কল-কারখানা যদি না থাকে, তবে তখন ব্রিটিশ সরকার ভারত সীমান্তে ঠিকমত যুদ্ধ চালাতেই পারবে না। সেটা অত্যন্ত বিপদের কথা। অতএব সেজন্যও ভারতবর্ষে কলকারখানা বাড়িয়ে তুলতে হয়।
এই-সব কারণে বাধ্য হয়েই ব্রিটেনকে তার নীতি পাল্টাতে হল; ব্রিটিশ সরকার স্থির করলেন ভারতবর্ষে শিল্প-প্রতিষ্ঠা বাড়িয়ে তুলতে হবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বৃহত্তর প্রয়োজনেই এটা করা দরকার হয়ে উঠল; সেজন্য যদি ল্যাংকাশায়ার বা ব্রিটেনের আরও দু’চারটা শিল্পের কিছু ক্ষতি হয়ও, সে ক্ষতিও সইতে তাঁরা রাজি হলেন। বাইরে অবশ্য ব্রিটেন বলতে লাগল, এই পরিবর্তন করা হচ্ছে শুধু ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষকে অত্যন্ত বেশি ভালোবাসেন বলে নিছক তারই মঙ্গলের জন্য। নীতির এই পরিবর্তন যখন করা হবে স্থির হল, তারপরই অবশ্য ব্রিটেন এমন ব্যবস্থা করে নিল যাতে ভারতবর্ষের এই সব নূতন শিল্পের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতাটা ব্রিটিশ ধনিকদের হাতেই থেকে যায়। ভারতীয় ধনিকদের শুধু এই বাবসায়ের মধ্যে নেওয়া হল অতি ক্ষুদ্র অংশীদার হিসাবে, তাইতেই তাদের কৃতার্থ হওয়া উচিত।
যুদ্ধের সময়ে, ১৯১৬ সনে একটি ভারতীয় শিল্প কমিশন বসানো হল। দু‘ বছর পরে এঁরা রিপোর্ট দাখিল করলেন; তাতে বললেন শিল্প-প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সরকারেরই সকলকে সাহায্য করতে হবে এবং কৃষিকার্যেও আধুনিক শিল্প-তন্ত্রী কায়দাকানুন প্রবর্তন করতে হবে। আরও বললেন; দেশের মধ্যে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রচারের চেষ্টা করা দরকার। কর্মপটু শ্রমিক যাতে পাওয়া সম্ভব হয়, এই জন্যই এঁরা জনসাধারণের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা প্রচারের প্রয়োজন বোধ করেছিলেন; ইংলণ্ডেও কারখানা প্রতিষ্ঠার প্রথম যুগে এই ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়েছিল।
যুদ্ধের পরে এই কমিশনের পিঠপিঠ আরও অনেকগুলো কমিশন এবং কমিটি বসানো হল। একথাও বলা হল, বিদেশী পণ্যের উপরে শুল্ক বসিয়ে ভারতীয় শিল্পকে রক্ষা করতে হবে; এই শুল্কের নাম হচ্ছে রক্ষাশুল্ক। ভারতীয় শিল্পের পক্ষে এই সব ব্যাপারকে একটা বিরাট রণজয়ের শামিল বলেই লোকে মনে করল। বাস্তবিক পক্ষে এটা ছিলও তাই, অন্তত কতক পরিমাণে। কিন্তু একটু ভালো করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এর মধ্যেও অনেক মজার ফাঁকি ছিল। সরকারপক্ষ থেকে বলা হল, বিদেশ থেকে যাতে ভারতবর্ষে মূলধন আসতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে: বিদেশ থেকে অর্থ ছিল কার্যত ব্রিটেন থেকে। হুড়হুড় করে ব্রিটিশ মূলধন ভারতে এসে হাজির হল। কেবল যে বহু পরিমাণে এল তাই নয়, বাজার একেবারে দখলই করে ফেলল। বড়ো বড়ো কল-কারখানা যেগুলো হল তার প্রায় সমস্তই চলল ব্রিটিশ মূলধনের জোরে। অতএব ভারতবর্ষে রক্ষাশুল্ক আর রক্ষাকবচের মানে দাঁড়াল, এদেশে ব্রিটিশ মূলধনের স্বার্থরক্ষা। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ নীতির যে বিরাট পরিবর্তন করা হয়েছিল, দেখা গেল শেষ পর্যন্ত তার ফল ব্রিটিশ ধনিকদের পক্ষে বিশেষ মন্দ হয় নি। তারা বরং বেশ একটা নিরাপদে সংরক্ষিত বাজার হাতে পেয়ে গেছে, সেখানে সে অবাধে ব্যবসাবাণিজ্য বিস্তৃত করতে পারবে, শ্রমিকদের খুব কম মাইনেয় খাটিয়ে প্রচুর লাভ করে নিতে পারবে। আরও একটা দিক থেকে এতে তাদের সুবিধা হয়ে গেল। ভারতবর্ষ চীন মিশর প্রভৃতি দেশে মজুরির হার শস্তা। এই-সব দেশে এসে তারা তাদের মূলধন খাটাতে লাগল; তার পর ইংলণ্ডে গিয়েও ইংরেজ শ্রমিকদের উপর হুমকি দিল, তাদেরও মজুরি কমিয়ে দেওয়া হবে। তাদের বলল, ভারতবর্ষ চীন ইত্যাদি দেশে মজুরির হার এত কম; কাজেই সেখানে পণ্যের দরও অল্প; এখন ইংলণ্ডে মজুরি না কমাতে পারলে তো সে-সব দেশের পণ্যের সঙ্গে এঁটে ওঠা যায় না। তার পরও যেখানে ইংরেজ শ্রমিক তার মাইনে কমানোতে আপত্তি প্রকাশ করল, ধনিক তাকে বলল, তাহলে আর কী করা যাবে, অত্যন্ত দুঃখিত চিত্তেই তাকে তার ইংলণ্ডের কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে, দিয়ে মূলধনটা নিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসতে হবে!
ভারতবর্ষের শিল্প প্রভৃতিকে নিজের আয়ত্তে রাখবার আরও অনেক ব্যবস্থা ভারতের ব্রিটিশ সরকার করলেন। এটা অতি জটিল বিষয়, এর আলোচনাও আমি করতে চাই না। এর পূর্ব বিশদ বিশ্লেষণ আমাদের দরকারও নেই। একটি জিনিসের কথাই এখানে আমি বলছি। আধুনিক শিল্পের জীবনে ব্যাঙ্কের প্রচণ্ড প্রভাব, কারণ বড়ো বড়ো ব্যবসা চালাতে গেলে প্রায়ই মূলধন ধার করবার দরকার হয়। এই ধার না পেলে অতি বড়ো ব্যবসায়ও হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে। এই ধার দেয় ব্যাঙ্ক্; কাজেই বুঝতেই পার তাদের ক্ষমতা কতখানি। ব্যাবসায়ের জীবনমরণ তাদেরই হাতে। যুদ্ধ শেষ হবার অল্পদিন পরেই ব্রিটিশ সরকার দেশের সমগ্র ব্যাঙ্কিং প্রথাটিকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এলেন। এই ভাবে, এবং মুদ্রানীতির কারসাজিদ্বারা ভারত সরকার ভারতবর্ষের শিল্প এবং কারখানাগুলির উপরে অনেকখানি কর্তৃত্ব-ক্ষমতা নিজের হস্তগত করে নিয়েছেন। অধিকন্তু ভারতের বাজারে ব্রিটিশ পণ্য আরও বেশি চালু করবার জন্য তাঁরা Imperial Preference বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যজাত দ্রব্যের উপর বাণিজ্যশুল্কের ব্যাপারে অধিক সুবিধা দানের নীতি প্রবর্তন করেন। এর মানে হচ্ছে, রক্ষাশুল্ক হিসাবে যদি বিদেশী পণ্যের উপরে কর বসানো হয়, তবে সেখানে ব্রিটিশ পণ্যের উপরে কিছু কম হারে কর বসানো হবে বা মোটেই কর বসানো হবে না; যেন অন্য দেশগুলোর পণ্যের তুলনায় ব্রিটিশ পণ্য এখানে একটু বেশি সুবিধা পায়।
যুদ্ধের সময়ে ভারতের ধনিক শ্রেণীর এবং উচ্চতর বুর্জোয়াদের শক্তি ক্রমে বেড়ে উঠছিল। সে শক্তি রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যেও আত্মপ্রকাশ করতে লাগল। যুদ্ধের পূর্বে এবং প্রথমদিকে রাজনৈতিক আন্দোলন ঝিমিয়ে ছিল; তার সে তদ্রা ক্রমে কেটে গেল, স্বায়ত্তশাসন এবং অনুরূপ আরও নানা দাবি আবার ধ্বনিত হয়ে উঠল। দীর্ঘকাল কারাবাস শেষ করে লোকমান্য তিলক বাইরে বেরিয়ে এলেন। তোমাকে বলেছি জাতীয় কংগ্রেস তখন ছিল নরমপন্থীদের হাতে; ছোটো একটি বস্তু, তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বিশেষ কিছুই নেই। সাধারণের সঙ্গেও প্রায় কোনো যোগ নেই। রাজনীতির ক্ষেত্রে যাঁরা অগ্রণী তাঁরা কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না; তাঁরা প্রতিষ্ঠা করলেন হোম-রুল লীগ। এই রকমের দুটি লীগ প্রতিষ্ঠিত হল; একটি প্রতিষ্ঠা করলেন লোকমান্য তিলক, অন্যটি করলেন মিসেস্ অ্যানি বেসাণ্ট। কয়েক বছর ধরেই মিসেস বেসাণ্ট ভারতের রাজনীতি-ক্ষেত্রে একটি বিশিষ্ট স্থান গ্রহণ করে ছিলেন; তাঁর অপূর্ব বাগ্মিতা এবং অতিতীক্ষ্ণ যুক্তিতর্ক এদেশের মানুষের মনে আবার রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। তাঁর বক্তৃতা প্রভৃতিকে সরকার এতই বিপজ্জনক মনে করতেন যে তাঁকে অন্তরীণ পর্যন্ত করে রাখা হল। তাঁর আরও দুজন সহকর্মীর সঙ্গে তিনি কয়েক মাস অন্তরীণ হয়ে ছিলেন। কলিকাতায় কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে তিনি সভানেত্রীত্ব করেন, কংগ্রেসের তিনিই প্রথম নারী সভানেত্রী। এর কয়েক বছর পরে শ্রীযুক্তা সরোজিনী নাইডু কংগ্রেসের সভানেত্রী হন, কংগ্রেসের তিনি দ্বিতীয় নারী সভানেত্রী।
কংগ্রেসের মধ্যে তখন দুটি দল, নরমপন্থী আর চরমপন্থী। ১৯১৬ সনে এঁদের মধ্যে একটা আপোষ হল; ১৯১৬ সনের ডিসেম্বর মাসে লক্ষ্ণৌতে কংগ্রেসের অধিবেশন হল, সেখানে দুই দলই উপস্থিত হলেন। সে আপোষ কিন্তু বেশিদিন টিঁকল না। দু’ বছরের মধ্যেই আবার এঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হল। নরমপন্থীরা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন, সেই থেকে তাঁরা কংগ্রেসের বাইরেই রয়েছেন। এখন এঁরা নাম নিয়েছেন উদারপন্থী।
১৯১৬ সনের লক্ষ্ণৌ অধিবেশন থেকেই জাতীয় কংগ্রেসের পুনর্জীবন শুরু হয়েছে। সেই দিন থেকেই সে ক্রমশ অধিকতর শক্তি এবং প্রতিষ্ঠা অর্জন করে চলল; জীবনে সেই প্রথম সে সত্য ক’রে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠল। জনসাধারণ বলতে যা বুঝি তার সঙ্গে অবশ্য তার বিশেষ সংশ্রব ছিল না; তারাও একে নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাত না—সে সংশ্রব স্থাপন করেছেন গান্ধীজি এসে। কাজেই তখন তথাকথিত নরমপন্থী এবং চরমপন্থী, দুটি দলই অল্পবিস্তর একটিমাত্র শ্রেণীর লোক নিয়ে গঠিত ছিল, সে হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণী। অতি সামান্য ক’জন বিত্তশালী লোক, এবং যাঁরা সরকারি চাকুরেদের ঠিক গায়ে গায়ে রয়েছেন, এমন লোকদের সাক্ষাৎই নরমপন্থী দলের মধ্যে মিলত; মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অধিকাংশ এবং তাঁদের দলেরই বহু বেকার বুদ্ধিজীবী ব্যক্তির সমর্থন ছিল চরমপন্থীদের দিকে। এই বুদ্ধিজীবীরা (কথাটা দিয়ে আমি শুধু বোঝাচ্ছি অল্পবিস্তর শিক্ষিত ব্যক্তিদের) নিজেদের সংকল্পে দৃঢ় হয়ে রইলেন; বিপ্লবীদের দলেও এঁদের মধ্য থেকেই বহু লোক গিয়ে যোগ দিল। নরমপন্থী এবং চরমপন্থীদের উদ্দেশ্য বা আদর্শের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাত ছিল না। দুই দলই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে থেকে স্বায়ত্তশাসন লাভের কথা বলতেন; দুই দলই তখনকার মতো সে স্বায়ত্তশাসনের খানিক অংশ পেয়ে খুশী থাকতেও রাজি ছিলেন। তবে নরমপন্থীদের তুলনায় চরমপন্থীরা একটু বেশী অধিকার চাইতেন, একটু বেশি গরম ভাষায় কথা বলতেন। বিপ্লবীরা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়, তাঁরা অবশ্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতাই কামনা করতেন; কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা তাঁদের প্রায় আমলই দিতেন না। নরমপন্থী আর চরমপন্থীদের মধ্যে প্রধান প্রভেদ ছিল এই নরমপন্থীরা সঙ্গতিপন্ন দল, ‘আছে’ দের এবং যাঁরা ‘আছে’-দের কাছে কাছে ঘোরাফেরা করেন তাঁদের দল; আর চরমপন্থীদের দলে ‘নেই’-শ্রেণীর লোকও কিছু কিছু ছিল; তাছাড়া অধিকতর চরমপন্থী দল বলেই স্বভাবত এদের দলে দেশের যুবকরাও এসে জুটছিল, তাদের অধিকাংশেরই ধারণা ছিল হাতে কলমে কাজ করার বদলে বেশ গরম গরম কথা কিছু বলতে পারলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল। অবশ্য এই সাধারণ মন্তব্যটা কোনো পক্ষেরই প্রত্যেকটি ব্যক্তির প্রতি প্রযোজ্য নয়। তার প্রমাণ স্বয়ং গোপালকৃষ্ণ গোখলে, নরমপন্থী দলের একজন অত্যন্ত দক্ষ এবং আত্মত্যাগী নেতা ছিলেন তিনি, কিন্তু বিত্তশালী তিনি মোটেই ছিলেন না। তিনিই ভারত-ভৃত্য সমিতির (Servants of India Society) প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সত্যকার ‘নেই’-শ্রেণী যারা, সেই শ্রমিক আর কৃষকদের সঙ্গে নরমপন্থী বা চরমপন্থী কোনো দলেরই কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিলক নিজে অবশ্য জনসাধারণের কাছে খুবই প্রিয় ছিলেন।
১৯১৬ সনের লক্ষ্ণৌ কংগ্রেস আরও একটি পুনর্মিলনের জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে আছে, সে হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের মিলন। কংগ্রেস চিরদিনই সমগ্র জাতির ভিত্তি অবলম্বন করে চলেছে, কিন্তু কার্যত এটা ছিল হিন্দুদেরই প্রতিষ্ঠান, কারণ এর প্রায় সব সভ্যই ছিলেন হিন্দু। যুদ্ধের কয়েক বছর আগে, খানিকটা সরকারের কাছে প্রেরণা পেয়েই, মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের একটা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান খাড়া ক’রেছিলেন, এর নাম অল-ইণ্ডিয়া মুসলিম লীগ্। এর উদ্দেশ্য ছিল মসলমানদের কংগ্রেসের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। অল্পদিনের মধ্যেই কিন্তু মুসলিম লীগ্ কংগ্রেসের দিকে আকৃষ্ট হল; ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা কী হবে সে বিষয়ে লক্ষ্ণৌ কংগ্রেসে এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হয়ে গেল। এই চুক্তিটির নাম ছিল কংগ্রেস-লীগ্ পরিকল্পনা; এতে আরও অনেক কথার মধ্যে সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য কী অনুপাতে আসন সংরক্ষিত রাখা হবে তারও অঙ্ক স্থির করে দেওয়া হয়েছিল। এই কংগ্রেস-লীগ পরিকল্পনা তখন দুটি প্রতিষ্ঠানেরই কর্মসূচীতে পরিণত হল; সমগ্র দেশের দাবি এরই মধ্যে প্রকাশ লাভ করেছে বলে সকলেই স্বীকার করে নিলেন। এই পরিকল্পনাতে বুর্জোয়াদের অভিমতই ব্যক্ত হয়েছিল, কারণ সে সময়ে দেশে একমাত্র তাঁরাই রাজনীতির ব্যাপারে সচেতন। এই পরিকল্পনাকে আশ্রয় করে দেশে আন্দোলন বেড়ে উঠল।
মুসলমানরা রাজনীতির ব্যাপারে বেশি সচেতন হয়ে উঠলেন, কংগ্রেসের সঙ্গে এসে যোগ দিলেন, তার বড়ো কারণ ছিল ক্রোধ—তুরষ্কের সঙ্গে ব্রিটেন যুদ্ধ করছে দেখে তাঁরা চটে গিয়েছিলেন। তুরষ্কের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করা এবং সেকথা অতিশয় উচ্চরবে প্রকাশ করবার অপরাধে যুদ্ধের প্রথম দিকেই দুজন মুসলমান নেতাকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল, এঁরা হচ্ছেন মৌলানা মহম্মদ আলি এবং মৌলানা শৌকত আলি। মৌলানা আবুল কালাম আজাদকেও অন্তরীণ করা হয়েছিল, আরব দেশগুলির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বলে; তাঁর রচনাবলীর জন্য সেদেশে তিনি খুব জনপ্রিয় ছিলেন। এই-সব ব্যাপারে মুসলমানরা খুবই ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত হলেন, ক্রমেই বেশি করে সরকারের বিরোধী হয়ে উঠলেন।
ভারতবর্ষে স্বায়ত্তশাসনের দাবি বেড়ে উঠবার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশ সরকারও নানাবিধ ভরসা আর প্রতিশ্রুতি দিতে লাগলেন, এদেশে নানাবিধ তত্ত্বসন্ধান করতে লাগলেন, তাই দিয়ে লোকের মনোযোগ আটকে রাখলেন। ১৯১৮ সনের গ্রীষ্মকালে তখনকার ভারতসচিব এবং বড়োলাট দু’জনে মিলে একটি যুক্ত রিপোর্ট দাখিল করলেন, এঁদের দু’জনের নাম অনুসারে তার নাম হল মণ্টেগু-চেম্স্ফোর্ড রিপোর্ট। এই রিপোর্টে ভারতের শাসনব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন এবং সংস্কার সম্বন্ধে কতকগুলো প্রস্তাব এঁরা করলেন। এর সঙ্গে সঙ্গেই এই পরীক্ষামূলক প্রভাবগুলো নিয়ে দেশের মধ্যে প্রচণ্ড একটা তর্ক বিতর্ক শুরু হল। কংগ্রেস এগুলোর সম্বন্ধে অত্যন্ত আপত্তি প্রকাশ করলেন, বললেন এতে কিছুই দেওয়া হল না। উদারপন্থীরা এগুলোকে সাগ্রহে স্বীকার করে নিলেন, এবং এদের উপলক্ষ্য করেই তাঁরা কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন।
এই যখন ভারতের অবস্থা, এমন সময়ে যুদ্ধ শেষ হল। সর্বত্রই লোকের মনে একটা বিরাট আশা জাগল, এবার না-জানি কী পরিবর্তনই আসে। দেশের রাজনৈতিক হাওয়া গরম হয়ে উঠল; নরমপন্থীরা যে শান্ত কোমল মৃদুস্বরে কথা বলতেন, তাতে প্রচুর বিনয় থাকত এবং ফল কিছুই হত না; সে ভাষা অন্তর্হিত হয়ে গিয়ে তার জায়গাতে ধ্বনিত হতে লাগল চরমপন্থীদের ভীষণ চীৎকার, ঋজু সংগ্রামাত্মক এবং আত্মপ্রত্যয়ে ভরপুর তাদের ভাষা। নরমপন্থী আর চরমপন্থী দুই দলই রাষ্ট্রনীতির পুঁথির ভাষায় চিন্তা করতে লাগলেন, কথা বলতে লাগলেন, শাসনব্যবস্থার বাইরের রূপ কী হবে তার বিশ্লেষণে মগ্ন রইলেন; আর পিছনে বসে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন নিঃশব্দে এদেশের অর্থনৈতিক জীবনের উপরে তার মুষ্টির বাঁধনকে আরও দৃঢ়তর করে তুলতে লাগল।