বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/যুদ্ধোত্তর জগৎ
১৫৬
যুদ্ধোত্তর জগৎ
এতদিনে আমরা দীর্ঘপথের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছলাম; আধুনিক যুগের গোড়ায় এসে আমরা দাঁড়িয়েছি। এবার আমরা দেখব যুদ্ধোত্তর জগৎকে, মহাযুদ্ধের পরবর্তী যুগের জগৎকে। এটা আমাদের নিজেদের যুগ, তোমারও নিজের জীবনের যুগ! আমাদের যাত্রাপথের এইটাই শেষ ক্ষেপ; কালপ্রবাহের হিসাবে এর দৈর্ঘ্য অতি সামান্য। কিন্তু তবুও এটি বড়ো কঠিন যাত্রা। যুদ্ধ শেষ হয়েছে আজ ঠিক সাড়ে-চৌদ্দ বছর হল, ইতিহাসের যে দীর্ঘ দীর্ঘ যুগ আমরা পার হয়ে এসেছি তার তুলনায় এই ক্ষুদ্র কালটি কতটুকুই বা? কিন্তু আমরা নিজেরাই রয়েছি এর ঠিক মধ্যখানে নিমগ্ন হয়ে; এত কাছাকাছি থেকে ঘটনাচক্রের স্বরূপ সম্বন্ধে নির্ভুল ধারণা করা বড়ো কঠিন। যে রকম ভাবে দেখলে এর যথার্থ স্বরূপটি ধরা পড়বে, এখান থেকে আমরা সেভাবে একে দেখবার অবসর পাইনে; ইতিহাস আলোচনার জন্য মনের যে শান্ত নির্বিকারত্ব প্রয়োজন, তাও আমাদের আয়ত্ত করা সম্ভব হয় না। অনেক ব্যাপার নিয়েই আমরা অত্যন্ত বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠি তখন বহু ক্ষুদ্র জিনিস আমাদের চোখে মস্ত বড়ো হয়ে ওঠে: আবার অনেক সত্যকার বড়ো জিনিসেরও আমরা গুরত্বটা ঠিক বুঝতে পারি না। অসংখ্য গাছের ভিড় দেখে আমরা দিশাহারা হয়ে যাই, বনটা যে কোথায় সে আর চোখেই পড়ে না।
তার পর আরও এক মুশকিল আছে, জিনিসটার গুরুত্ব কতখানি, তা জানব কী করে? কোন্ মাপকাঠি দিয়ে একে মাপা যায়? একথা সহজেই বুঝি, কোন্ দৃষ্টি নিয়ে কোন সমস্ত ব্যাপারকে দেখব, তার উপরে অনেকখানিই ফল নির্ভর করে। একদিক থেকে দেখলে যে ঘটনাটা অত্যন্ত গুরুতর বলে মনে হয়, আরেক দিক থেকে দেখলে হয়তো সেইটাকেই মনে হবে একেবারে বাজে, তুচ্ছ ব্যাপার। তোমাকে যত চিঠি আমি লিখেছি তার মধ্যে এই কথাটিকে আমি খানিকটা এড়িয়ে চলেছি; এর সোজা এবং সম্পূর্ণ উত্তরটি তোমাকে আমি দিই নি। অথচ তা সত্ত্বেও যা কিছু আমি লিখেছি, তার সব কিছুর উপরেই আমার সাধারণ মতামতের একটা ছাপ পড়েছে। এই একই যুগ এবং ঘটনার কথা লিখতে গিয়ে আরেকজন লোক হয়তো একেবারেই ভিন্নরকমের কথা বলতেন।
ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি রকমের হওয়া উচিত, সে প্রশ্ন নিয়ে আমি এখানেও আলোচনা করব না। আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিটা গত ক’বছরে অনেকখানি বদলে গেছে। এই ব্যাপারটি এবং আরও বহু ব্যাপার সম্বন্ধে আমি যেমন আমার মত বদলে নিয়েছি, আরও বহু জনের মতও তেমনিভাবেই বদলেছে। তার কারণ, যুদ্ধের ধাক্কায় পৃথিবীর প্রত্যেক বস্তু এবং প্রত্যেক ব্যক্তিরই প্রকৃতিতে একটা অত্যন্ত জোর ঝাঁকুনি লেগেছে। প্রাচীন কালের যে জগৎ আমাদের ছিল যুদ্ধ তাকে একেবারেই ধূলিসাৎ করে দিয়ে গেছে; তার পর থেকেই সে প্রাচীন জগৎ আবার কষ্টেসৃষ্টে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। যে-সব ধারণা আর মতামত নিয়ে আমরা বড়ো হয়ে উঠেছিলাম সেগুলোতে আগাগোড়া ফাটল ধরেছে; আধুনিক সমাজ এবং সভ্যতার গোড়ায় আদৌ কোনো সত্য আছে কিনা, সেই বিষয়েই আমাদের মনে সংশয় জেগে উঠেছে। অসংখ্য তরুণ প্রাণের ভয়াবহ অপচয় ঘটতে দেখেছি আমরা, দেখেছি মিথ্যা ভাষণ, অত্যাচার, পাশবিক মনোবৃত্তি আর ধ্বংসলীলার তাণ্ডব; বিস্মিত হয়ে ভেবেছি এই কি সভ্যতার শেষ হয়ে গেল? রাশিয়াতে সোভিয়েটের আবির্ভাব হল, নূতন একটা বস্তু সে, নূতন একটা সমাজ-ব্যবস্থা, প্রাচীন ব্যবস্থার প্রতিবন্ধীর রূপে সে এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে। আরও বহু নূতন মতবাদ বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল। প্রকাণ্ড একটা ভাঙাচোরার যুগ ছিল সেটা, প্রাচীন কালের যত মতামত রীতিনীতি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল; মানুষের মন ভরে উঠল সংশয়ে আর সমস্যায়: যুগান্তর আর দ্রুত পরিবর্তনের যুগে সেটা না হয়েই পারে না।
এই-সব কারণেই যুদ্ধের পরবর্তী কালটাকে ঠিক ইতিহাসের বস্তু বলে মনে করা আমাদের পক্ষে একটু কঠিন। নানারকমের মতবাদ এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করতে সংশয় প্রকাশ করতে আমরা পারি; তার মধ্যে কোনো একটাকে সবাই প্রাচীন কালের বস্তু বলে জানে শুধু এই জন্যই সেটাকে মেনে নিতেও আমরা বাধ্য নই; কিন্তু তাই বলে মতবাদ আর সিদ্ধান্ত নিয়ে খালি নাড়াচাড়ার খেলা করে দিন কাটাবারও অধিকার আমাদের নেই, আমাদের নিজেদেরই যথাসাধ্য নিবিষ্ট মনে চিন্তা করে দেখতে হবে, আমাদের কী কর্তব্য সেটা স্থির করে নিতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা একটা যুগ পরিবর্তনের কাল, এই সময়েই বিশেষ করে আমাদের দেহ এবং মনের সমস্ত শক্তিকে কাজে লাগাবার প্রয়োজন আসে। এই হচ্ছে সময়, যখন দৈনদিন জীবনের বৈচিত্রহীন ধারা অকস্মাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে, নূতনতর আবিষ্কারের আহ্বান হাতছানি দিয়ে আমাদের ডাকতে থাকে, নবীন জগতের সৃষ্টির কাজে আমরা সবাই গিয়ে একটুখানি হাত লাগাবার অবসর পেয়ে যাই। এই রকম সময়েই চিরদিন দেশের যুবশক্তি এগিয়ে এসেছে, কাজ সম্পন্ন তারাই করতে পেরেছে। চিন্তাধারা আর পরিবেশ যখন বদলে যেতে থাকে যুবকরাই সহজে তার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে চলতে পারে; যারা বৃদ্ধ, যাদের মন কঠিন হয়ে গেছে, প্রাচীন মতামত আর রীতিনীতি যাদের মজ্জাগত, তারা সেটা পারে না।
যুদ্ধের পরবর্তী এই কালটিকে একটু ভালো করে বিশ্লেষণ করে দেখলে বোধ হয় ক্ষতি নেই। কিন্তু এই চিঠিতে আমি তোমাকে শুধু এর সম্বন্ধে মোটামুটি একটা সাধারণ ধারণাই দিয়ে দিতে চাই। নেপোলিয়নের পতনের পর ঊনবিংশ শতাব্দীর ইতিহাস নিয়ে আমরা যে আলোচনা করেছিলাম, নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে। ১৮১৫ সনের ভিয়েনা-সন্ধি এবং তার ফলাফলের কথা আমাদের স্বভাবতই মনে জাগে, ১৯১৯ সনের ভার্সাই সন্ধি এবং তার ফলাফলের সঙ্গে এর তুলনাও না করে আমরা পারি না। ভিয়েনার সন্ধির ফল ভালো হয় নি, ইউরোপে ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ বাধবে তার বীজ সেই সন্ধির মধ্যেই লাগানো হয়েছিল। সেবার ঠেকেও কিন্তু আমাদের কালের রাষ্ট্রনীতিবিদরা কিছুই শিখলেন না; ভার্সাইর সন্ধি করলেন তার চেয়েও বিশ্রী করে—এর স্বরূপ আমরা গত চিঠিতে দেখেছি। এই তথাকথিত সন্ধি বা শান্তি-পত্রের নিবিড় ছায়া যুদ্ধোত্তর যুগের পৃথিবীকে অন্ধকারে ঢেকে রেখেছে।
এই গত চৌদ্দটি বছরের মধ্যে পৃথিবীতে বড়ো ঘটনা কী ঘটেছে দেখা যাক। আমার হতে এই সময়কার সবচেয়ে বৃহৎ এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে সোভিয়েট ইউনিয়নের অভ্যুত্থান এবং সংহতিলাভ; এর নাম ইউ. এস্. এস্. আর. বা ইউনিয়ন অব সোস্যালিস্ট অ্যাণ্ড সোভিয়েট রিপাবলিক্স্। পৃথিবীতে টিঁকে থাকবার জন্য সোভিয়েট রাশিয়াকে কী কঠিন লড়াই করতে হরেছিল, তার কিছুটা কাহিনী তোমাকে আমি আগেই বলেছি। এত সমস্ত বাধাবিঘ্ন ঠেলেও যে সে জয়ী হতে পেরেছে, এইটাই হচ্ছে এই শতাব্দীর একটি আশ্চর্য ব্যাপার। এশিয়ার যতখানি জায়গা নিয়ে ভূতপূর্ব জার-সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল, তার সর্বত্র জুড়েই সোভিয়েট-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—সাইবেরিয়াতে একেবারে প্রশান্ত মহাসাগরের তীর পর্যন্ত; মধ্য এশিয়াতে ভারত সীমান্তের অত্যন্ত কাছে পর্যন্ত। গোড়াতে অনেকগুলো আলাদা আলাদা সোভিয়েট প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল; তার পর তারা সকলে একত্র সংঘবদ্ধ হয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে; এরই এখন নাম হয়েছে ইউ. এস্. এস্. আর। ইউরোপ আর এশিয়ার অতি বিরাট স্থান নিয়ে এই যুক্তরাষ্ট্র অবস্থিত; এর আয়তন পৃথিবীর ভূপরিমাণের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগের সমান। অতি বৃহৎ আয়তন, কিন্তু শুধু আয়তন দিয়েই রাষ্ট্রের মর্যাদার মাপ হয় না। রাশিয়া খুবই অনুন্নত দেশ ছিল, সাইবেরিয়া এবং মধ্য-এশিয়া ছিল আরও বেশি অনুন্নত। দ্বিতীয় যে আশ্চর্য ব্যাপারটি সোভিয়েটরা করল সে হচ্ছে এই দেশের রূপ পরিবর্তন; দেশ-উন্নয়নের অপূর্ব সব পরিকল্পনা খাড়া করে এই বিপুল দেশের অতি বৃহৎ অঞ্চলের রূপ তারা এমনই বদলে দিয়েছে যে তাদের দেখে আর চেনা যায় না। একটা জাতির দ্রুত অগ্রগতির এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর নেই। মধ্য-এশিয়ার অত্যন্ত পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলো পর্যন্ত এমনই বিদ্যুদ্বেগে উন্নত হয়ে উঠেছে, যে দেখে ভারতবর্ষে আমাদের ঈর্ষান্বিত হবার কথা। সবচেয়ে উন্নতি এরা দেখিয়েছে শিক্ষা এবং শিল্পে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনার সাহায্যে রাশিয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠার কাজ একেবারে হুড়মুড় করে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, বিরাট বিরাট সব কারখানা তৈরি করা হয়েছে সে দেশে। দেশের লোককে অবশ্য খুবই কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে এর জন্য; বিলাস এবং আরাম তো বটেই, প্রয়োজনের বস্তু থেকেও তাদের স্বেচ্ছায় বঞ্চিত হয়ে থাকতে হয়েছে, যেন তাদের আয়ের বৃহত্তর অংশ পৃথিবীর এই প্রথম সমাজতন্ত্রী দেশের প্রতিষ্ঠা এবং সংগঠনের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। এর বোঝা বিশেষ করে বহন করতে হয়েছে কৃষকদেরই।
এই সোভিয়েট দেশটি ক্রমাগত সামনে এগিয়ে চলেছে, আর পশ্চিম-ইউরোপের দেশগুলো নিত্য নূতন বিপদ আর সমস্যায় জড়িয়ে পড়ছে, এদের মধ্যেও তফাতটা বড়ো স্পষ্ট হয়েই চোখে পড়ে। বিঘ্ন-বিপদ তার যতই থাক, পশ্চিম-ইউরোপের ধন-ঐশ্বর্য এখনও রাশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। দীর্ঘ কাল তার সম্পদে কেটেছে, তার মধ্যে সে দেহে অনেকখানি মেদ সঞ্চয় করে নিয়েছে, এখন কিছুকাল তার উপরেই নির্ভর করে সে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু এর প্রত্যেকটি দেশই ঋণের ভারে পীড়িত, ভার্সাই সন্ধিতে জর্মনির উপরে যে ক্ষতিপূরণের দায় চাপানো হয়েছিল তার দরুন চিন্তাগ্রস্ত এবং এর ছোটো বড়ো সকল দেশের মধ্যেই ক্রমাগত রেষারেষি আর কলহ চলেছে। এই সমস্ত মিলে ইউরোপের অবস্থা ভয়াবহ করে তুলেছে। এই বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় আবিষ্কারের জন্য অবিরাম আলোচনা-বৈঠক বসছে, উপায় কিছুই আবিষ্কার করা যাচ্ছে না, দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠছে। আজকের দিনে সোভিয়েট রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিম-ইউরোপের তুলনা করতে যাওয়া, এ যেন যুবার সঙ্গে বৃদ্ধের তুলনা; যুবার কাঁধে ভারী বোঝা কিন্তু তার দেহ মন স্বাস্থ্য আর শক্তিতে ভরপুর; বৃদ্ধের জীবনে আশা বা উদাম বলে বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই, মনে তার আজও অহংকার আছে; কিন্তু সে অহংকারের বশে এগিয়ে চলেছে সে এই জীবনের নিশ্চিত অবসানেরই দিকে।
যুদ্ধের পরে মনে হয়েছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের এই ব্যাধির সংক্রমণ স্পর্শ করতে পারে নি। দশ বছর পর্যন্ত তার একেবারে অদ্ভুত সমৃদ্ধি দেখা গেল। টাকা-লগ্নীর বাজারে এককালে ইংলণ্ডই কর্তাব্যক্তি ছিল, যুদ্ধের সময় আমেরিকা তার সে স্থানটি দখল করে নিয়েছে। এখন আমেরিকাই হয়েছে সমস্ত পৃথিবীর মহাজন, পৃথিবীর সমস্ত দেশ তার কাছে টাকা ধারে। অর্থনীতির দিক থেকে বলা যায় পৃথিবীতে এখন তারই কর্তৃত্বের আসন। সমস্ত পৃথিবীর কাছ থেকে যে নজরানা মিলছে তার উপর নির্ভর করে বেশ সুখে স্বচ্ছন্দেই সে কাটিয়ে যেতে পারত; এর আগে ইংলণ্ডও কতকটা তাই করেছে। কিন্তু সেটা করার পথে আমেরিকার দুটি বড়ো মুশকিল ছিল। তার খাতক দেশে সকলেরই অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে, নগদ টাকায় ধার শোধ দেবার শক্তি তাদের নেই। অবশ্য অবস্থা ভালো থাকলেও এই বিরাট পরিমাণ দেনা নগদ টাকার মিটিয়ে দেবার সাধ্য তাদের হত না। ধার শোধ দেবার একমাত্র উপায় তাদের হচ্ছে, মালপত্র তৈরি করা এবং সেইগুলোই আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া। কিন্তু বিদেশী পণ্য তার বাজারে এসে হাজির হবে এটা আমেরিকার পছন্দ নয়; সে প্রকাণ্ড উঁচু রকমের রক্ষাশুল্কের পাঁচিল গেঁথে দিল—ফলে এর অধিকাংশ মালই আমেরিকায় ঢুকতে পেল না। তাহলে সে খাতক বেচারীরা তাদের দেনা শোধ করে কী করে? একটা ভারি চমৎকার পন্থা আবিষ্কার করে ফেলল আমেরিকা; সে নিজেই তাদের আরও বেশি টাকা ধার দেবে, যেন সেই টাকায় তারা প্রাপ্য সম্পদ মিটিয়ে দিতে পারে। ঋণ শোধ আদায় করবার অতি অপূর্ব উপায়; এতে মহাজন ক্রমেই আরও বেশি করে টাকা দিতে থাকবে, আর ঋণের মোট পরিমাণও ক্রমেই বেড়ে যেতে থাকবে। রকম দেখে স্পষ্টই বোঝা গেল, এই ঋণের বোঝা থেকে এই খাতক দেশগুলো কোনোদিনই মুক্ত হতে পারবে না। তার পর একদিন হঠাৎ আমেরিকা এদের টাকা ধার দেওয়া বন্ধ করে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গেই এদের কাগজপত্রে যেটুকু বা আর্থিক সংস্থান ছিল সবসুদ্ধ একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল। তার পর আবার আরও একটি ভারি আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। আমেরিকা, ধনসম্পদ সমৃদ্ধ আমেরিকা, টাকায় আর সোনায় তার ঘর একেবারে কানায় কানায় ভরা—হঠাৎ দেখা গেল সেই আমেরিকাতেই অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে; শিল্প-ব্যবসায়ের রথের চাকা গেছে থেমে, দেশের মধ্যে নিদারুন দৈন্য আর দুর্দশার রাজত্ব দেখা দিয়েছে।
আমেরিকা ধনের দেশ, তারই যখন এই দুর্দশা, ইউরোপের অবস্থা কি হয়েছিল বুঝতেই পারো। প্রত্যেক দেশই চেষ্টা করতে লাগল বিদেশী পণ্য কিনবে না; অত্যন্ত উঁচু হারে রক্ষাশুল্ক বসিয়ে আরও নানা ফিকির-ফন্দি খাটিয়ে, ‘স্বদেশী মাল কেনো’ বলে ধুয়ো তুলে, তারা বিদেশী পণ্য আসবার পথ বন্ধ করতে লাগল। প্রত্যেক দেশই তখন চাচ্ছে অন্যের কাছে শুধু নিজের মাল বেচবে, অন্যের মাল নিজে কিনবে না, অন্তত যথাসম্ভব কম কিনবে। ব্যবসায় এবং বাণিজ্য মানেই হচ্ছে পরস্পরের মধ্যে পণা-বিনিময়; কাজেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মৃত্যু না ঘটিয়ে এই ধরনের কাণ্ড বেশিদিন চালানো সম্ভব নয়। এই নীতিটির নাম হচ্ছে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। এর হিড়িক সমস্ত দেশেই লাগল; উগ্র জাতীয়তাবাদের অন্যান্য প্রকাশও দেখা যেতে লাগল। ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং শিল্পে মন্দা পড়ল; তারই সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক দেশের দৈন্য-দারিদ্র্য বাড়তে লাগল; বড়ো বড়ো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এই সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায় বলে বিদেশে শোষণের বহর আরও বাড়িয়ে দিল এবং নিজের দেশে শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দিতে লাগল। পৃথিবীর সর্বত্র সকল দেশেই প্রত্যেকে তার শোষণের বহর বাড়িয়ে নেবার কামনা এবং চেষ্টা করছে; সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে ক্রমেই সংঘাত বেড়ে লীগ অব নেশন্স্ বসে বসে অস্ত্র-বর্জনের বড়ো বড়ো বুলি আওড়াতে লাগল এবং কাজে আর কিছুই করল না; ওদিকে পৃথিবীতে যুদ্ধের করাল ছায়া ক্রমেই আসন্ন হয়ে আসতে লাগল। আবার সবাই বুঝল যুদ্ধ না বেধে যায় না; আবার পৃথিবীর সমস্ত দেশ যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে লাগল, নিজেদের মধ্যে দল গড়া শুরু করল।
দেখে শুনে মনে হচ্ছে, যে যুগে ধনিকতন্ত্রী সভ্যতা পশ্চিম-ইউরোপে আর আমেরিকায় প্রভুত্ব বিস্তার করেছিল এবং বাকি পৃথিবীটাকেও নিজের কর্তৃত্বের অধীন করে ফেলেছিল, সে যুগটার অবসান হতে আর বেশি দেরি নেই। যুদ্ধের পর প্রথম দশটা বছর সবাই ভেবেছিল, হয়তো ধনিকতন্ত্র আবার এই ধাক্কা সামলে সবল হয়ে উঠবে, আবার কিছুকালের মতো সুস্থ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু গত তিন বছরের ব্যাপার দেখে সে সম্বন্ধে সকলেই এখন অত্যন্ত সন্দিহান হয়ে উঠেছে। ধনিকতন্ত্রী দেশগুলোর মধ্যে পরস্পর রেষারেষি তো ক্রমে বিপজ্জনক অবস্থায় এসে পৌঁচোচ্ছেই, তা ছাড়া প্রত্যেকটি দেশের ভিতরেও বিভিন্ন শ্রেণীগুলোর, শ্রমিকশ্রেণী আর শাসনব্যবস্থা যাদের করায়ত্ত সেই ধনিক ও মালিক শ্রেণীর মধ্যে বিরোধ দিন দিন তীব্রতর হয়ে উঠেছে। অতএব বড়ো বড়ো দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ এবং প্রত্যেক দেশের মধ্যেই গৃহযুদ্ধ, দুইটি বিপদেরই আশঙ্কা এখন দেখা দিয়েছে। অবস্থা যেখানে অত্যন্ত খারাপ হয়ে উঠছে সেইখানেই মালিক শ্রেণী মরিয়া হয়ে একটা শেষ চেষ্টা করে দেখছে, শ্রমিক শ্রেণীর অভ্যুদয়টাকে কোনোমতে ভেঙেচুরে দেওয়া যায় কি না। এদের এই চেষ্টা রূপ গ্রহণ করছে ফ্যাসিজ্ম্-এ। ফ্যাসিজ্ম্ দেখা দিচ্ছে সেইখানেই, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিরোধ অতি তীব্র হয়ে উঠেছে; মালিক শ্রেণী এতদিন যে প্রভুত্বের আসনে বসে ছিল সে আসন তার করচ্যুত হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধের অতি অল্পদিন পরে, ইতালিতে ফ্যাসিজ্মের প্রথম আবির্ভাব হয়। শ্রমিকরা সেখানে ক্রমেই আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছিল, এমন সময় ফ্যাসিস্টরা এসে দেশের কর্তৃত্ব গ্রহণ করল, তাদের নেতা মুসোলিনি। সেই থেকেই তারা দেশের শাসনকর্তৃত্ব অধিকার করে রয়েছে। ফ্যাসিজ্ম্ মানে হচ্ছে একেবারে উলঙ্গ একনায়কত্ব। প্রজাতন্ত্রী রীতিনীতি সম্বন্ধে এরা খোলাখুলিই অবজ্ঞা প্রকাশ করে। ইউরোপের বহু দেশেই ফ্যাসিস্ট রীতিনীতি অল্পবিস্তর ছড়িয়ে পড়েছে; একনায়ক প্রথাও অনেক জায়গাতেই দেখা দিয়েছে। ১৯৩৩ সনের প্রথমভাগে জর্মনিতে ফ্যাসিজ্ম্ জয়লাভ করেছে। ১৯১৮ সনে জর্মনিতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার অবসান হয়েছে, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ধ্বংস করবার জন্য বর্বর চণ্ডনীতির একেবারে চরম প্রয়োগ চলেছে সেখানে।
কাজেই ইউরোপে এখন ফ্যাসিজ্ম্ এসে দাঁড়িয়েছে গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী শক্তিবর্গের মুখোমুখি হয়ে আর ওদিকে ধনিকতন্ত্রী দেশগুলোর পরস্পরের দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে, পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্য তৈরি হচ্ছে। প্রাচুর্য আর দৈন্যের পাশাপাশি অবস্থান, এই অপূর্ব দৃশ্য শুধু ধনিকতন্ত্রের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়; একদিকে রাশীকৃত খাদ্য পচে যাচ্ছে, ফেলে দেওয়া হচ্ছে এমনকি নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে, আর একদিকে মানুষ না খেয়ে শুকিয়ে মরছে।
ইউরোপের একটি প্রাচীন দেশ স্পেন: মাত্র কয়েক বছর হল সে নিজেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছে, তার হাপ্স্বুর্গ বুর্বোঁ-বংশীয় রাজাকে দিয়েছে তাড়িয়ে। ইউরোপের এবং পৃথিবীর রাজার সংখ্যাও একজন কমেছে।
গত চৌদ্দ বছরের তিনটি প্রধান ঘটনার কথা তোমাকে আমি বলেছি; সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা; অর্থনীতির ব্যাপারে সমস্ত পৃথিবীতে আমেরিকার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা এবং তার বর্তমান সংকট; ইউরোপের জটিল পরিস্থিতি। এই সময়কার চতুর্থ বৃহৎ ঘটনা হচ্ছে, প্রাচ্য জগতের দেশগুলির পূর্ণ জাগরণ এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তাদের উদগ্র প্রয়াস। প্রাচ্য জগত এবার স্পষ্ট করেই জগতের রাজনীতির রাজ্যে এসে পদার্পণ করেছে। এই প্রাচ্য দেশগুলোকে দুটি ভাগে ফেলা যেতে পারে; যেগুলিকে স্বাধীন দেশ বলে মনে করা হয়, আর যেগুলি উপনিবেশ-বিশেষ, অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী দেশের অধীন। এশিয়া এবং উত্তর-আফ্রিকার এই সবগুলি দেশেই জাতীয় চেতনা সবল হয়ে উঠেছে, স্বাধীনতার জন্য এদের আকাঙ্ক্ষাও স্পষ্ট এবং সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রত্যেক দেশেই বড়ো বড়ো আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে; অনেক স্থানে বিদ্রোহও হয়েছে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। এর বহু দেশকেই সোভিয়েট ইউনিয়ন সরাসরি সাহায্য করেছে, বা তার চেয়েও যেটা বড়ো কথা জাতীয় সংগ্রামের সংকটমুহূর্তে পিছনে এসে দাঁড়িয়ে এদের মনে সাহস এবং উৎসাহ যুগিয়েছে।
একটা জাতির পুনর্জন্ম লাভের সবচেয়ে আশ্চর্য দৃষ্টান্ত দেখাল তুরষ্ক; সবাই ভেবেছিল তার একেবারেই অবসান হয়ে গেছে। এর দরুন কৃতিত্ব অনেকখানিই মুস্তাফা কামাল পাশার প্রাপ্য; সমস্ত মানুষ সমস্ত পরিবেশ যখন তাঁর বিরুদ্ধে, তখনও এই বীর নেতা মাথা নত করতে রাজি হন নি। নিজের দেশকে শুধু বিদেশীর অধীনতা থেকে মুক্তই করেন নি তিনি, তাকে সম্পূর্ণ আধুনিক করে তুলেছেন, এমন ভাবে তার সমস্ত চেহারাটাকে বদলে দিয়েছেন যে দেখে আর চেনাই যায় না। সুলতান এবং খলিফার রাজত্বের তিনি বিলোপ সাধন করেছেন; মেয়েদের পর্দা এবং অন্যান্য বহু প্রাচীন প্রথাও তুলে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সোভিয়েটের নৈতিক এবং বাস্তব সমর্থন তাঁকে অনেকখানিই সাহায্য করেছিল। ব্রিটিশদের প্রভাব থেকে পারশ্য মুক্তিলাভের চেষ্টা করছিল, তাকেও সোভিয়েট অনেক সাহায্য করেছে। পারশ্যের একজন দুর্ধর্ষ লোকের আবির্ভাব হয়েছে, তাঁর নাম রেজা খাঁ। এখন তিনিই পারশ্যের রাজা। এই সময়েই আফগানিস্তানও সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে।
একমাত্র নিজ আরব ছাড়া, আরব অঞ্চলের সমস্ত দেশই বিদেশীর অধীন। আরবরা সবাই একত্র হবার দাবি জানিয়েছে, সে দাবি মেটানো হয় নি। আরবদেশের বৃহত্তর অংশটা স্বাধীন হয়ে গেছে, তার অধীশ্বর হচ্ছেন সুলতান ইব্নে সৌদ। ইরাক নামে স্বাধীন, কিন্তু কার্যত সে ব্রিটিশের প্রভাব এবং প্রভুত্বের অধীনে বাস করছে। প্যালেস্টাইন এবং ট্রান্স-জর্ডন এইদুটি ক্ষুদ্র-রাজ্য, ব্রিটিশ ম্যানডেট্; সিরিয়া ফরাসি ম্যানডেট্। সিরিয়াতে ফরাসিদের বিরুদ্ধে একটি আশ্চর্যরকম বীরোচিত বিদ্রোহ হয়েছিল, সে বিদ্রোহ খানিকটা সফলও হয়েছে। মিশরও অনেকবার বিদ্রোহ করেছে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সে দীর্ঘকাল ধরেই সংগ্রাম চালাচ্ছে। সে সংগ্রাম আজও চলছে, যদিও নামে এখন তাকে স্বাধীন বলা হয়। মিশরে এখন রাজত্ব করছেন একজন রাজা, কার্যত ইনি ব্রিটিশদেরই হাতের পুতুল। উত্তর-আফ্রিকার বহু দূর পশ্চিম-অঞ্চলে মরক্কো দেশও স্বাধীনতার জন্য বীরের মতো লড়াই করেছিল, তার নেতা ছিলেন আবদুল করিম। স্পেনীয়দের তিনি দেশ থেকে তাড়িয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পর ফ্রান্স তার সমস্ত শন্তি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান করল, তাঁকে একেবারে চূর্ণ করে দিল।
পৃথিবীতে একটা নূতন চেতনা এসেছে, প্রাচ্য জগতের অতি দূরবর্তী দেশগুলিতেও একই সঙ্গে সমস্ত নরনারীর মনকে নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তুলছে, এশিয়া আর আফ্রিকার দেশে দেশে স্বাধীনতা লাভের জন্য এই যুদ্ধগুলি তারই প্রমাণ। এদের মধ্যে আবার দুটি দেশ বিশেষ করে চোখে পড়ে, কারণ পৃথিবীর মধ্যেই এদের স্থান বড়ো। এরা হচ্ছে চীন আর ভারত। এর কোনো দেশে কোনো প্রগতিমূলক পরিবর্তন ঘটলে তার প্রভাব, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর যে বণ্টনব্যবস্থা রয়েছে তার উপরেও গিয়ে পড়ে; পৃথিবীর রাজনীতিতে তার ফলে বিরাট রকম পরিবর্তন না এসেই পারে না। এই জন্যই চীন এবং ভারতবর্ষে যে সংগ্রাম চলছে সেটা শুধু এই দুটি দেশের লোকদের ঘরোয়া সংগ্রাম নয়, তার চেয়ে ঢের বড়ো জিনিস। চীন যদি এই সংগ্রামে জয়ী হয়, তবে তার মানে হবে পৃথিবীতে আর একটি বিরাট রাষ্ট্রের আবির্ভাব। বর্তমানে যে তথাকথিত শক্তিসাম্য প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, এর ফলে তার অনেক খানিই ব্যতিক্রম ঘটবে; এবং তারই ফলে আবার চীনে এখন সাম্রাজ্যবাদীরা যে শোষণ চালাচ্ছে সেটাও নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। তেমনি আবার, ভারতবর্ষ যদি সংগ্রামে জয়লাভ করে, তাহলেও জগতে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হবে, অন্তত সে বৃহত্ত্বের সম্ভাবনা তার মধ্যে নিহিত রয়েছে; তাছাড়া তার প্রত্যক্ষ ফল যেটা সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যাবে সে হচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসান।
গত দশ বছরে চীনের ভাগ্যে বহু বিপর্যয় ঘটেছে। কুওমিন্টাঙ আর চীনা কমিউনিস্টদের মধ্যে একটা মৈত্রী স্থাপিত হয়েছিল, সেটা ভেঙে গেছে; তার পর থেকেই চীনে টুচুন আর ঐরকমের অন্যান্য দস্যু সর্দারদের উপদ্রব চলছে; বহু বিদেশী শক্তিও এদের পিছনে রয়েছে; চীনে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলেই তাদের লাভ। গত দুবছর যাবৎ জাপানিরা বস্তুত চীনের উপরে আক্রমণই চালাচ্ছে, তার কয়েকটি প্রদেশ দখলও করে নিয়েছে। এই অ-ঘোষিত যুদ্ধ এখনও চলছে। ইতিমধ্যে আবার চীনের অভ্যন্তরস্থ বহু অঞ্চল, কমিউনিস্ট হয়ে গেছে; সেখানে একপ্রকার সোভিয়েট শাসনতন্ত্রই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ভারতবর্ষে গত চৌদ্দ বছরে অনেক কাণ্ডই ঘটে গেছে; একটি উগ্র অথচ অহিংস জাতীয় সংগ্রামের আবির্ভাব হয়েছে। যুদ্ধের অতি অল্পদিন পরে, শাসন-ব্যবস্থায় এবার বড়ো বড়ো সংস্কার করে দেওয়া হবে এই আশায় যখন সকলে উল্লসিত, এমন সময়ে পাঞ্জাবে সামরিক আইন জারি করা হল, জালিয়ানওয়ালাবাগের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হল। ভারতের জনসাধারণ এতে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল; তুরস্ক এবং খলিফার প্রতি ব্রিটিশদের আচরণ দেখে মুসলমানরাও উত্তেজিত হয়ে পড়ল। এর ফলে এল অসহযোগ আন্দোলন। ১৯২০ থেকে ১৯২২ সন পর্যন্ত এই আন্দোলন চলল, এর নেতা ছিলেন গান্ধীজি। বস্তুত সেই ১৯২০ সন থেকেই আজও পর্যন্ত গান্ধীজিই ভারতের জাতীয় সংগ্রামের অবিসংবাদী নেতা হয়ে রয়েছেন। ভারতবর্যের এটা হচ্ছে গান্ধী-যুগ। তিনি যে অহিংস বিদ্রোহের নীতি প্রবর্তন করেছেন তার অভিনবত্ব এবং শক্তি দেখে সমস্ত পৃথিবী উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছে। কিছুদিন অপেক্ষাকৃত শান্ত কার্যকলাপ এবং প্রস্তুতির পরে ১৯৩০ সনে আবার স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করা হল, এবার কংগ্রেস স্পষ্ট করেই পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনকে তার লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছে। তখন থেকেই দেশে আইন অমান্য আন্দোলন চলেছে, জেলখানাগুলো মানুষে ভরে গেছে, আরও বহু ব্যাপার ঘটছে, এর কথা তুমিও জানো। ইতিমধ্যে ব্রিটিশরা যে নীতি অবলম্বন করেছে সেটা হচ্ছে, দু’টো একটা খুচরা সংস্কারের আয়োজন দেখিয়ে সম্ভব হলে দু’চার জন লোককে হাত করে নেওয়া, আর জাতীয় আন্দোলনটাকে একেবারে পিষে গুঁড়ো করে দেওয়া।
ব্রহ্মদেশে ১৯৩১ সনে বুভুক্ষা-ক্লিষ্ট কৃষকরা প্রকাণ্ড একটা বিদ্রোহ করেছিল। সে বিদ্রোহ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছে। জাভা এবং ইস্ট-ইণ্ডিজেও বিদ্রোহ হয়েছিল। শ্যামেও গোলমাল চলেছে, শাসন-ব্যবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে, রাজার ক্ষমতা অনেকটা সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফরাসি-ইন্দোচীনেও জাতীয় আন্দোলন জেগে উঠছে।
কাজেই দেখছ, প্রাচ্য জগতের সর্বত্রই জাতীয়তাবাদ বিকাশলাভের পথ খুঁজছে, কোনো কোনো স্থানে আবার একটু খানি কমিউনিজ্ম্ এর সঙ্গে এসে মিশেছে। এই দুটি মতবাদই সাম্রাজ্যবাদ-বিদ্বেষী; এছাড়া কিন্তু এদের মধ্যে প্রায় কোথাও মিল নেই। সোভিয়েট রাশিয়া তার নিজের মধ্যেকার এবং বাইরেরও সমস্ত প্রাচ্য দেশের প্রতিই অতি বিজ্ঞোচিত এবং উদার আচরণ দেখাচ্ছে; এর ফলে আজ অনেক দেশই তার বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি বহু অ-কমিউনিস্ট দেশও।
গত ক’বছরে পৃথিবীতে আরও একটি বৃহৎ ব্যাপার ঘটেছে, সে হচ্ছে নারীদের মুক্তি—আইন, সমাজ এবং প্রাচীন রীতিনীতির বহু বন্ধনে এতকাল তাঁরা বাঁধা ছিলেন, সে নাগপাশ এখন খুলে পড়েছে। পাশ্চাত্য জগতে এই বন্ধনমোচনের কাজ অনেকখানিই এগিয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের ধাক্কায়। কিন্তু তুরষ্ক থেকে শুরু করে ভারতবর্ষে চীনে, প্রাচ্যজগতেরও সর্বত্রই নারীরা এখন জেগে উঠেছেন, জাতীয় এবং সামাজিক সংস্কারের কাজে প্রকাণ্ড একটা অংশ গ্রহণ করছেন তাঁরা।
যে যুগে আমরা বাস করছি এই হচ্ছে তার পরিচয়। প্রতিদিনই আমরা সংবাদ পাচ্ছি, পৃথিবীতে কত কী পরিবর্তন হচ্ছে; বড়ো বড়ো ঘটনা ঘটছে; জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ বাধছে, পূঁজিবাদী ও সাম্যবাদী এবং ফ্যাসিজ্ম্ ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যে বিরোধ ঘটছে; মানুষের দারিদ্র্য বাড়ছে, বাড়ছে সর্বহারাদের দৈন্য, আর সবার উপরে পড়েছে যুদ্ধের করাল ছায়া, সে যুদ্ধ দিনদিনই আসন্ন হয়ে উঠছে।
ইতিহাসের এটি একটি অতি চাঞ্চল্যময় যুগ; এই যুগে বেঁচে থাকবার, এর জীবনযাত্রার অংশগ্রহণ করবার মধ্যে একটা আনন্দ আছে—সে অংশগ্রহণ মানে যদি দেরাদুনের জেলখানায় নিঃসঙ্গ-জীবন যাপন করা হয়, তবুও।