বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/যুদ্ধ: ১৯১৪-১৯১৮

উইকিসংকলন থেকে

১৪৮

যুদ্ধ: ১৯১৪-১৯১৮

৩১শে মার্চ, ১৯৩৩

 এই যুদ্ধের কথা আমি কী লিখব তোমাকে; এই বিশ্বযুদ্ধ বা মহাযুদ্ধ, চার বছরেরও বেশি কাল ধ’রে যে সমস্ত ইউরোপকে এবং এশিয়া আর আফ্রিকার বহু স্থানকে শ্মশানে পরিণত করল, লক্ষ লক্ষ যুবককে তাদের প্রস্ফুট যৌবনেই নিশ্চিহ্ন করে মুছে নিয়ে গেল? যুদ্ধের কথা ভাবতে তো আরাম লাগে না! অতি কুৎসিত ব্যাপার এটা। তবুও অনেকসময়েই আমরা তাকে প্রশংসা করি, তার চিত্র অতি উজ্জ্বল রঙে অঙ্কিত করে দেখাই; বলি, ধাতু যেমন আগুনে পুড়ে বিশুদ্ধ হয়, আরামে আর বিলাসে জীবন যাপন করে করে যে জাতির মানুষেরা দুর্বল এবং নীতিহীন হয়ে পড়েছে, যুদ্ধের আগুনে পড়ে সেই নিরুদ্যম জাতিরাও আবার পবিত্র এবং শক্তিমান হয়ে ওঠে। দুর্দমনীয় বীরত্ব আর মনোমুগ্ধকর আত্মোৎসর্গের কত উদাহরণ দেখাই, যেন যুদ্ধ থেকেই এই গুণগুলো জন্মলাভ করেছে!

 এই যুদ্ধ কেন বেধেছিল, তার কতকগুলো কারণ আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চেষ্টা করেছি; বলেছি কীরকম করে ধনিকতন্ত্রী শিল্পজীবী দেশদের ধনলোভ, সাম্রাজ্যবাদী জাতিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সংঘাতের সৃষ্টি হল এবং যুদ্ধও অপরিহার্য হয়ে উঠল। বলেছি কীভাবে এর প্রত্যেক দেশেরই বড়ো বড়ো শিল্পপতিরা ক্রমাগতই তাঁদের শোষণ কার্য চালাবার মতো নূতন নূতন সুযোগ আর স্থান অন্বেষণ করতে লাগলেন; মহাজনরা আরও বেশি বেশি টাকা আয় করতে চাইল, রণসজ্জা-নির্মাতারা আরও বেশি লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। অতএব এই ব্যক্তিরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন; এঁদের আদেশে এবং এঁদেরই প্রতিনিধিস্থানীয় দেশের প্রবীণ রাজনীতিকদের নির্দেশে প্রত্যেক দেশ পরস্পরকে হত্যা করতে মেতে উঠল। যেসব কারণে এই যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে তার সম্বন্ধে এই যুবকদের অধিকাংশই কিছু জানত না, সমস্ত দেশেরই সাধারণ লোকেরাও সে সম্বন্ধে একেবারেই অজ্ঞ ছিল। বস্তুত এ যুদ্ধ তাদের ভালোর জন্যে নয়; যুদ্ধে হার হোক বা জিত হোক, তাদের ভাগ্যে এতে লোকসানই লেখা রয়েছে। এটা হচ্ছে একান্তই বড়োলোকদের একটা খেলা; সাধারণ লোকদের জীবন, বিশেষ করে যুবকদের জীবনকে তারা সে খেলার ঘুঁটি করে নিয়েছিল। কিন্তু তবুও জনসাধারণ যুদ্ধ করতে প্রস্তুত না হলে যুদ্ধ চলতে পারে না। আমি তোমাকে বলেছি, ইউরোপ মহাদেশের সকল দেশে কন্‌স্‌ক্রিপ্‌শন বা জোর করেই সকল প্রজাকে সৈন্য বানিয়ে নেওয়ার প্রথা ছিল না, সেটা এল আরও পরে, যুদ্ধ চলতে চলতে। কিন্তু কেবল রাষ্ট্রের হকুম বা জবরদস্তি দিয়েও সমস্ত লোককে এভাবে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা যায় না, যদি তারা নিজেরা সত্যই যুদ্ধ করতে মোটামুটি অনিচ্ছুক থাকে।

 অতএব সমস্ত যুদ্ধরত দেশেই জনসাধারণের উদ্যম এবং দেশপ্রেমকে উত্তেজিত করে তোলবার বিপুল আয়োজন করা হল। দুই পক্ষই অপর পক্ষকে ‘আক্রমণকারী’ বলে অভিহিত করতে লাগল; এমন ভাব দেখাল যেন তারা নিজেরা কেবলমাত্র আত্মরক্ষা করবার জন্যেই অস্ত্রধারণ করেছে। জর্মনি বলল তার চার দিকেই শত্রুর দল তাকে ঘিরে রয়েছে, তাকে গলা টিপে মারবার চেষ্টা করছে। বলল, দোষ ফ্রান্স আর রাশিয়ার, তারাই গায়ে প’ড়ে এসে তাকে আক্রমণ করেছে। ইংলণ্ড তার আচরণের সাফাই দিল ক্ষুদ্র বেলজিয়মের রক্ষা-রূপ সৎকার্যের দোহাই দিয়ে—সে বেচারী নিরপেক্ষ দেশ অথচ জমনি বর্বরের মতো এসে তাকে আক্রমণ করেছে, এ চোখ চেয়ে দেখা যায়! যুদ্ধে যত দেশ নেমেছিল সকলেই নিজেকে অতি সজ্জন ব’লে প্রচার করল, সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিল শত্রু পক্ষের ঘাড়ে। প্রত্যেক দেশেরই জনসাধারণের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়ে দেওয়া হল, তাদের স্বাধীনতা একান্তই বিপন্ন হয়ে পড়েছে, তাকে যদি রক্ষা করতে চায় তো তাদের যুদ্ধ না করে উপার নেই। বিশেষ করে সংবাদপত্রগুলি খুব তোড়জোড় ক’রে সমস্ত জায়গাতে এই যুদ্ধের পরিবেশ গড়ে তুলল, তার মানে প্রজাদের মনে শত্রুদেশদের সম্বন্ধে একটা অত্যন্ত তাঁর ঘৃণা আর বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিল।

 এই উন্মত্ততার বন্যা এত প্রবল হয়ে উঠল যে তার বেগে আর সমস্ত কিছু‍ই ভেসে চলে গেল। অজ্ঞ জনতার মনে হুজুগ আর আবেগ ফেনিয়ে তোলা শক্ত নয়; কিন্তু বিদ্বান এবং বুদ্ধিমান লোকেরাও এই নেশায় মেতে উঠলেন। কি পুরুষ কি নারী, যে-সব লোককে সাধারণত ধীর এবং স্থির বুদ্ধি-সম্পন্ন বলে মনে করা হয়—দার্শনিক লেখক অধ্যাপক বৈজ্ঞানিক—যুদ্ধরত সমস্ত দেশের এইরকম লোকরাও সকলেই যেন ভালোমন্দের জ্ঞান হারিয়ে রক্তের পিপাসায় উম্মত্ত হয়ে উঠলেন, শত্রু জাতির লোকদের প্রতি দ্বেষে জ্বলে মরতে লাগলেন। পাদ্রিসাহেবরা ধর্মের সেবক, তাঁদের আমরা মনে করি শান্তির উপাসক; তাঁরাও অন্যদের মতোই কিংবা হয়তো অন্যদের চেয়েও বেশি রক্তপিপাসু হয়ে উঠলেন। এমনকি যুদ্ধবিরোধী এবং সমাজতন্ত্রবাদী ব’লে যাঁরা পরিচিত ছিলেন তাঁদেরও মাথা ঠিক রইল না, তাঁরাও সকলেই তাঁদের সমস্ত নীতি বিসর্জন দিয়ে বসলেন। সকলেই—কিন্তু একেবারে সকলে নয়। প্রত্যেক দেশেই অতি সামান্য দু’চারজন লোক ছিলেন যাঁরা এই হুজুগের নেশায় মেতে উঠতে রাজি হলেন না, এই যুদ্ধের উন্মাদনা থেকে নিজেদের সংযত করে রাখলেন। দেশের লোকেরা তাঁদের টিটকারি দিল, কাপরুষ ব’লে ঘৃণা করল, যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি হন নি এই অপরাধে এঁদের অনেককে জেলে পর্যন্ত পাঠানো হল। এঁদের অনেকে ছিলেন সমাজবাদী, অনেকে আবার ছিলেন যাজকশ্রেণীভুক্ত, যেমন ‘কোয়েকার’রা—যুদ্ধ বস্তু্টার সম্বন্ধেই এঁদের নৈতিক আপত্তি আছে। একটা কথা আছে, আজকালকার দিনে যখন যুদ্ধ বাধে, যুদ্ধরত জাতিদের সমস্ত মানুষ একেবারে পাগল হয়ে যায়—অতি সত্য কথা।

 যুদ্ধ শুরু হতেই সমস্ত দেশের সরকারপক্ষ যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সত্যকে গোপন করতে এবং যতরকমে সম্ভব মিথ্যা কথা প্রচার করতে লেগে গেলেন। সাধারণ লোকের ব্যক্তিগত অধিকারগুলোকেও খর্ব করে দেওয়া হল। অপর পক্ষের বক্তব্যটাকে একেবারেই তাদের কাছে পৌঁছতে দেওয়া হল না। কাজেই সাধারণ লোকেরা শুনতে লাগল ব্যাপারটার মাত্র এক তরফের কাহিনী; সে কাহিনী অত্যন্তরকম বিকৃত; অনেক সময়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানানো। এর ফলে জনসাধারণকে ভুল বুঝিয়ে রাখাও খুব শক্ত হল না।

 যুদ্ধ যখন শুরু হয় নি তখনও এইসব সংকীর্ণমনা জাতীয়তাবাদীদের প্রচারবাণী আর সংবাদপত্রের মিথ্যা বার্তা প্রচারের দ্বারা লোককে বিভ্রান্ত করে যুদ্ধের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। যুদ্ধ ব্যাপারটাকেই খুব মহৎ বস্তু বলে বর্ণনা করা হত। জর্মনিতে, বা ঠিক বলতে গেলে প্রাশিয়াতে তো যুদ্ধকে এইভাবে বৃহৎ আদর্শ করে তোলাই ছিল স্বয়ং কাইজার থেকে শুরু করে সমস্ত শাসন কর্তৃপক্ষদের একেবারে ব্রতবিশেষ। পণ্ডিতরা বড়ো বড়ো বই লিখে প্রমাণ করলেন, যুদ্ধ অতি উচিত কাজ, একটা ‘জৈবিক প্রয়োজন’ অর্থাৎ মানুষের জীবনকে এবং প্রগতিকে চালু রাখবার জন্যেই যুদ্ধ হওয়া আবশ্যক। কাইজারের নাম বিখ্যাত হয়ে গেল, কারণ তিনি সর্বদাই নিজেকে লোকচক্ষুর সামনে ধরে রাখতেন। ইংলণ্ড এবং অন্যান্য দেশেও অবশ্য সামরিক এবং অন্যান্য দলের উচ্চস্তরের লোকদের এই রকমেরই সব ধ্যানধারণা ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংলণ্ডে যে-সমস্ত বড়ো লেখকের আবির্ভাব হয়েছিল, রাস্‌কিন তাঁদের অন্যতম। গান্ধীজি তাঁর বই পড়তে খুব ভালোবাসেন। তুমিও সম্ভবত তাঁর কিছু কিছু বই পড়েছ। এই লোকটির মানসিক মহত্ত্বের সম্বন্ধে কারও সংশয় নেই; তাঁর একটি বইতে তিনি লিখেছেন:

 “সংক্ষেপে বলতে পারি, আমি ইহাই দেখেছি, সমস্ত বড়ো জাতিই তাদের বাক্যের সত্যতা এবং চিন্তার দৃঢ়তা যুদ্ধের সময়ে শেখে এবং শান্তির সময়ে হারিয়ে ফেলে; যুদ্ধে তারা শিক্ষালাভ করে, শান্তিতে তারা প্রবঞ্চিত হয়; যুদ্ধে তাদের কর্মে দীক্ষা হয়, শান্তির সময়ে সে দীক্ষা তারা ভুলে যায়। এক কথায়, যুদ্ধে তাদের জন্ম এবং শান্তিতে তাদের মৃত্যু ঘটে।”

 রাস্‌কিন ছিলেন স্পষ্টভাষী সাম্রাজ্যবাদী; তাঁর লেখা থেকে আর-একটি জায়গা আমি উদ্‌ধৃত করছি, তা থেকে তুমি তার পরিচয় পাবে।

 “তাকে (ইংলণ্ডকে) এই করতে হবে, অন্যথা সে বিনষ্ট হবে। তাকে বহু উপনিবেশ স্থাপন করতে হবে...... যেখানে যতটুকু উর্বর জনশূন্য ভূমি তাদের পক্ষে আয়ত্ত করা সম্ভব, সমস্তই দখল করতে হবে, সেখানে তার উপনিবেশবাসীদের শেখাতে হবে যে, তাদের প্রথম....... লক্ষ্যই হচ্ছে জলে স্থলে ইংলণ্ডের শক্তি সর্বতোভাবে বাড়িয়ে তোলা।”

 আরেকটি বই থেকে খানিকটা জায়গা উদ্‌ধৃত করছি। এই বইটি একজন ইংরেজ সামরিক কর্মচারীর লেখা, ইনি ব্রিটিশ সেনার একজন মেজর-জেনারেল হয়েছিলেন। তিনি বলেন, “জেনেশুনে ইচ্ছে করে মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা আচরণ করা, বা ধাপ্পাবাজি ছাড়া” যুদ্ধে জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব। এঁর মতে, দেশের যে লোক “এই-সকল কাজ করতে অস্বীকৃত হয় সে....... জেনেশুনেই নিজের সহকর্মী এবং অধীনস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে”........এবং “তাকে অত্যন্ত ঘৃণ্য কাপুরুষ ব্যতীত আর কিছুই বলা চলে না।” “সুনীতি, দুর্নীতি—বড়ো বড়ো জাতিদের পক্ষে কী মূল্য আছে এদের, যখন তাদের ভাগ্য নিয়েই জুয়োর দান চলেছে?” জাতিকে “আঘাতের পর আঘাত হানতে হবে, যে পর্যন্ত না তার শত্রুর একেবারে মর্মস্থল বিদ্ধ হয়।” আশ্চর্য হয়ে ভাবি, রাস্‌কিন এর লেখা পড়লে কী বলতেন। এ কথা অবশ্য মনে কোরো না যে এই কথাগুলোই ইংরেজ জাতির মনোবৃত্তির নির্ভুল নমুনা, বা কাইজার যেসব বড়ো বড়ো কথা বলে আস্ফালন করতেন সেইগুলোই জর্মনির সাধারণ লোকের মনের কথা। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, এই রকমের কথা যারা ভাবে দেশের কর্তৃত্ব অনেক সময়েই থাকে তাদেরই হাতে; এবং যুদ্ধের সময় এরাই দেশের মুখ্য ব্যক্তি হয়ে ওঠেন, এর ব্যতিক্রম প্রায় দেখা যায় না।

 সাধারণত এত খোলাগুলি সত্য কথা লোককে না শুনিয়ে যুদ্ধ-ব্যাপারটাকেই একটা ধর্মানুষ্ঠানের ছদ্মবেশ পরিয়ে দেওয়া হয়। ইউরোপে এবং অন্যত্র শত শত মাইলব্যাপী রণক্ষেত্র জুড়ে যখন বিপুল হত্যাকাণ্ড চলেছে, প্রত্যেক দেশের মধ্যে তখন বড়ো বড়ো শ্রুতিমধুর বচন তৈরি করা হচ্ছিল, তাই দিয়ে নরহত্যাকে সমর্থন আর জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে রাখা হচ্ছিল। সে যুদ্ধ করা হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা আর মর্যাদা রক্ষা করবার জন্যে, “যদ্ধ শেষ করবার জন্যে”, গণতন্ত্রকে নিরাপদ করবার জন্যে, ছোটো ছোটো জাতিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনতার ব্যবস্থা করবার জন্যে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর মহাজনরা, শিল্পপতিরা, যুদ্ধোপকরণ নির্মাতারা যাঁরা ঘরে বসে ছিলেন এবং খাঁটি দেশপ্রেমের বশে এইসব চমৎকার বুলি আউড়ে দেশের যুবকদের যুদ্ধের দাবানলে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করছিলেন, তাঁদের অনেকেই সারাক্ষণ প্রকাণ্ড লাভ পিটে নিচ্ছিলেন, লক্ষপতি কোটিপতি হয়ে যাচ্ছিলেন।

 মাসের পর মাস বছরের পর বছর যুদ্ধ গড়িয়ে চলল, ক্রমেই আরও নূতন নূতন দেশ এর আবর্তে এসে পড়তে লাগল। দুই পক্ষই গোপনে ঘুষের লোভ দেখিয়ে নিরপেক্ষ দেশদের নিজের পক্ষে টানতে চেষ্টা করতে লাগল। প্রকাশ্যভাবে অবশ্য সে কথা তারা বলত না, বললে ঘরের চালে দাঁড়িয়ে যেসব মস্ত মস্ত আদর্শ আর বড়ো বড়ো বুলি কপ্‌চে এরা চীৎকার করছিল তার শেষ হয়ে যাবে। জর্মনির তুলনায় ইংলণ্ড আর ফ্রান্সের ঘুষ দেবার সংস্থান বেশি ছিল, কাজেই নিরপেক্ষরা যারা পরে যুদ্ধে যোগ দিল তাদের বেশির ভাগই গেল ইংলণ্ড-ফ্রান্স-রাশিয়ার পক্ষে। জর্মনির পুরোনো বন্ধু ছিল ইতালি, তাকে এই মিত্রপক্ষ হাত করে নিল একটি গোপন সন্ধি করে; সে সন্ধিতে এশিয়া-মাইনরে এবং অন্যত্র অনেকগুলি জায়গা ইতালিকে দিয়ে দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আর-একটি গোপন সন্ধি করে এরা রাশিয়াকে ভরসা দিল, কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ তাকেই ছেড়ে দেবে। সমস্তটা পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে এইভাবে ভাগাভাগি করে নেওয়া বেশ আরামের কাজ সন্দেহ নেই। মিত্রপক্ষের রাষ্ট্রনেতারা প্রকাশ্যে যেসব বিবৃতি প্রকাশ করছিলেন, এই গোপন সন্ধিগুলোর কথা ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাশিয়াতে বল্‌শেভিকরা যখন শাসনক্ষমতা হস্তগত করল তখন তারা এইসব গোপন সন্ধির কথা প্রকাশ করে দিল; তা নইলে হয়তো এদের কথা কেউ কোনোদিন জানতেই পেত না।

 শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, মিত্রপক্ষের (আমি ইংরেজ ও ফরাসিদের পক্ষটাকে সংক্ষেপে মিত্রপক্ষ বলেই উল্লেখ করব) দলে পুরো এক ডজন বা তার চেয়েও বেশি দেশ এসে জুটেছে। এই দলে ছিল ব্রিটেন এবং তার সাম্রাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়ম, সার্বিয়া, জাপান, চীন, রুমানিয়া, গ্রীস এবং পর্তুগাল। (আরও হয়তো একটা-দুটো নাম ছিল, ঠিক মনে নেই)। জর্মনির দিকে ছিল জর্মনি, অস্ট্রিয়া, তুরষ্ক এবং বুল্‌গেরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দিল যুদ্ধের তৃতীয় বৎসরে। তার কথা আপাতত ছেড়ে দিলেও দেখা যায়, জর্মনদের তুলনায় মিত্রপক্ষের সহায়-সম্বল ছিল অনেক বেশি। তাদের হাতে লোক বেশি, অনেক বেশি টাকা, অস্ত্রশস্ত্র রণসজ্জা তৈরি করবার অনেক বেশি কারখানা। সকলের চেয়ে বড়ো কথা, সমুদ্রে তাদেরই আধিপত্য। কাজেই পৃথিবীর সমস্ত নিরপেক্ষ দেশ থেকেও উপকরণ সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল। সমুদ্রপথ হাতে ছিল বলেই মিত্রপক্ষ যুদ্ধের সরঞ্জাম বা খাদ্য আমদানি করতে পারছিল, আমেরিকা থেকে টাকা ধার করতে পারছিল। জর্মনি আর তার মিত্রদের সে সুবিধা নেই, তাদের চার দিকে ঘিরে রয়েছে শত্রুদের দেশ; জর্মনির মিত্ররাও নিজেরাই দুর্বল দেশ, খুব বেশি সাহায্য দেবার সামর্থ্য তাদের ছিল না। অনেক সময় বরং তারাই হয়ে উঠেছে জর্মনির বোঝা, জর্মনিকেই ঠেক্‌নো দিয়ে তাদের খাড়া করে রাখতে হয়েছে। কাজেই যুদ্ধ বস্তুত হচ্ছিল একা জর্মনির সঙ্গে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের সম্মিলিত শক্তির। সকল দিক থেকেই এটাকে একটা অত্যন্ত অসমান বিরোধ বলে মনে হয়। অথচ জর্মনিই চার-চারটা বছর ধরে সমস্ত পৃথিবীকে একেবারে নাস্তানাবুদ করে রাখল, বারংবার যুদ্ধে চরম জয়েরই অত্যন্ত কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছল। বছরের পর বছর ধরে কোন পক্ষের জয় হবে সেটা অতিশয় অনিশ্চিত ছিল। একটিমাত্র জাতির পক্ষে এটা কম বাহাদুরির ব্যাপার নয়; জর্মনি যে অপূর্বসুন্দর সামরিক শক্তি গড়ে তুলেছিল শুধু তার দরুনই এটা সম্ভব হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যখন জর্মনি এবং তার মিত্ররা সবাই পরাজিত হল তখন জর্মন সেনা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে, এবং তার অনেকখানি অংশই রয়েছে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে।

 মিত্রপক্ষের দিকে যুদ্ধের ধাক্কাটা গেল ফরাসি সেনার উপর দিয়ে; ফরাসিরাই প্রচণ্ড-পরিমাণ যুবক-প্রাণ আহুতি দিয়েও জর্মন বাহিনীর দুর্ধর্ষ অভিযানকে ব্যাহত করল। ইংলণ্ড বেশির ভাগ সাহায্য দিল তার সামুদ্রিক আধিপত্য আর নৌসেনা দিয়ে, আর তার কূটকৌশল এবং প্রচারকার্য দিয়ে। জর্মনি তার সেনার বল নিয়েই গর্বিত; নিরপেক্ষ দেশদের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রচারকার্য চালানোর ব্যাপারে সে একেবারেই সাদাসিধা পথে চলত। যুদ্ধের সময়ে মিথ্যা কথা এবং বিকৃত সত্য কথা প্রচারের নিপুণ এবং নিখুঁত ব্যবস্থার বাহাদুরি ইংলণ্ড যতখানি দেখিয়েছে, পৃথিবীর আর কোনো দেশই তা পারে নি এ বিষয়ে কিছুমাই সন্দেহ নেই। রাশিয়া, ইতালি, এবং মিত্রপক্ষের অন্যান্য দেশরা যুদ্ধে যেটকু অংশ নিয়েছে সে এদের তুলনায় অনেক অল্প; তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। অথচ সমস্ত দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সইতে হয়েছিল বোধ হয় রাশিয়াকে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে এসে যোগ দিল, জর্মনিকে পরাভূত করবার ব্যাপারে সেই এসে শেষ ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রয়োগ করল।

 যুদ্ধের প্রথম ক’মাস ইংলণ্ড এবং আমেরিকার মধ্যে দারুণ মন কষাকষি চলেছিল, এদের মধ্যে যুদ্ধ বাধবে এমন জল্পনাকল্পনাও শোনা গেছে। ইংলণ্ডের সন্দেহ ছিল, আমেরিকার জাহাজে করে জর্মনিতে মালের জোগান যাচ্ছে, অতএব সে সমুদ্রপথে আমেরিকার জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে গেল—তাই নিয়েই বিবাদের উৎপত্তি। তার পরেই কিন্তু আবার ব্রিটেনের প্রচার-বিভাগ তৎপর হয়ে উঠল। আমেরিকাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দলে টানবার জন্যে বিশেষরকম চেষ্টাচরিত্র শুরু করল। প্রথম কাজই তারা শুরু করল জর্মনদের নৃশংসতার খবর প্রচার; জর্মন সেনা বেলজিয়মে কী ভয়ানক অত্যাচার করেছে তার সম্বন্ধে অতি লোমহর্ষক সব গল্প সর্বত্র রটানো হতে লাগল। একে নাম দেওয়া হল জর্মন হুনদের ‘ভয়ানকত্ব’। এই গল্পের মধ্যে অল্প দু-চারটায় হয়তো মূলে কিঞ্চিৎ সত্য ছিল, যেমন লুভেনের বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুস্তকাগার ধ্বংস। কিন্তু অধিকাংশ গল্পই ছিল নিছক বানানো। এর মধ্যে একটি আশ্চর্য গল্প ছিল, জর্মনরা নাকি একটি মৃতদেহের কারখানা চালাচ্ছিল! অথচ দুই শত্রুপক্ষের মানুষদের মনে পরস্পরের প্রতি এমন বিদ্বেষ তখন জেগে উঠেছে যে, যে-কোনো কথাই ব’লে তাদের বিশ্বাস করানো যেত।

 আমেরিকাতে ব্রিটেন যে যুদ্ধসংক্রান্ত মিশন পাঠিয়েছিল তাতে ছিল পাঁচ শো কর্মচারী এবং দশ হাজার সহকারী। এই থেকেই বুঝবে, ব্রিটেনের প্রচারব্যবস্থার আয়তন কী বিপুল ছিল! এও তো গেল সরকারি হিসাবে; এ ছাড়াও বিরাট পরিমাণ বেসরকারি কাজ চালানো হত। এই প্রচারকার্য চালাবার জন্য ন্যায় বা অন্যায় সকলপ্রকার পন্থাই অবলম্বন করা হত। সুইডেনের স্টক্‌হল্‌ম্ শহরে ব্রিটিশরা সরকারি তরফ থেকেই একটি ইংরেজি নাট্যশালা খুলল, সেখানে নানারকম সংগীত ও অভিনয়ের ব্যবস্থা করা হল। সুইড্‌দের সঙ্গে ভাব জমাতে হবে তো!

 এই প্রচারব্যবস্থা আর জর্মন সাবমেরিনের অভিযান (এর কথা আমি পরে তোমাকে আরও বলব), অনেকটা এদের জন্যই আমেরিকা মিত্রপক্ষে এসে যোগ দিল। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড়ো কারণ অবশ্য ছিল টাকার লেনদেন।

 যুদ্ধটা টাকা খরচের ব্যাপার, অতি ভয়ানকরকম টাকা খরচ হয় এতে। পাহাড়প্রমাণ মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী প্রয়োজন হয় এতে, তার ফলে দেখা যায় শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস। ও দিকে আবার যুদ্ধের সময় দেশের অর্থ এবং পণ্য-উৎপাদনের কাজ প্রায় সমস্তই যায় বন্ধ হয়ে; মানুষেরা তাদের সমস্তখানি উদ্যম নিয়ে ধংসের কাজেই মেতে ওঠে। এত টাকার দরকার, সে টাকা আসবে কোথা থেকে? মিত্রপক্ষের কথাই প্রথম ধরা যাক। এদের মধ্যে একমাত্র ইংলণ্ড আর ফ্রান্সেরই অবস্থা সচ্ছল ছিল বলা যায়। নিজেরা যে যুদ্ধ করছিল শুধু তারই ব্যয় বহন করছিল না তারা, টাকা ধার দিয়ে মালমশলা ধার দিয়ে তাদের মিত্রদেরও অনেকখানি ব্যয় মিটিয়ে দিচ্ছিল। কিছুদিন পর প্যারিস আর পেরে উঠল না, তার সমস্ত আর্থিক সম্বল নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। লণ্ডন তখন একাই মিত্রপক্ষের সমস্ত টাকাকড়ি জোগান দিতে লাগল। যুদ্ধের দ্বিতীয় বছরে লণ্ডনেরও হাত খালি হয়ে গেল। ১৯১৬ সনের শেষ দিকে এসে দেখা গেল, ফ্রান্স এবং ইংলণ্ডের আর ধারের বাজারে খাতির নেই। তখন ইংলণ্ডের সবচেয়ে বাছাবাছা কৌশলী রাজনীতিকদের নিয়ে গড়া একটি দৌত্য-দলকে আমেরিকায় পাঠানো হল, সেখানে গিয়ে তাঁরা টাকা ধারের জন্য প্রার্থনা জানালেন। আমেরিকা টাকা ধার দিতে রাজি হল। তার পর থেকে আমেরিকার টাকার জোরেই মিত্রপক্ষ যুদ্ধ চালাতে লাগল। আমেরিকার কাছে মিত্রপক্ষের ঋণ দেখতে দেখতে মস্তবড়ো অঙ্কের কোঠায় গিয়ে পৌঁছল; ঋণের পরিমাণ বাড়বার সঙ্গে সঙ্গেই আমেরিকার যে বড়ো বড়ো ব্যাঙ্কাররা আর মহাজনরা সে টাকা ধার দিচ্ছিলেন তাঁরা মিত্রপক্ষের যাতে জয় হয় সে দিকে মনোযোগী হয়ে উঠলেন। মিত্রপক্ষকে আমেরিকা এত বিরাট পরিমাণ টাকা ধার দিয়েছে, এখন যদি মিত্রপক্ষ জর্মনির কাছে হেরে যায় তবে সে টাকার গতি কী হবে? আমেরিকার ব্যাঙ্ক্‌ওয়ালাদের পকেটে তখন হাত পড়েছে, তাতে তারা নড়েচড়ে উঠল। আমেরিকা মিত্রপক্ষের দিকে যোগ দিয়ে যুদ্ধে নামুক, এমনিতর একটা ভাবাবেগ দেশের মধ্যে এরা গ’ড়ে তুলল; শেষ পর্যন্ত আমেরিকাও যুদ্ধে যোগ দিল।

 আমেরিকার কাছে এদের ঋণের সমস্যা নিয়ে আজকাল অনেক আলোচনা আমরা শুনতে পাই, সংবাদপত্রেও এই আলোচনারই ছড়াছড়ি। ইংলণ্ড আর ফ্রান্সের গলায় পাথরের জাঁতার মতো এই ঋণের ভার ঝুলে রয়েছে; সে ঋণ শোধ দেবার সাধ্যও এখন তাদের নেই—এই সমস্ত ঋণই হয়ে উঠেছিল সেই যুদ্ধের সময়ে। তখন যদি এই টাকা তারা না পেত, তবে অন্য দেশের কাছে তাদের ধার পাবার সম্ভাবনা একেবারেই ভেঙে পড়ত, এবং আমেরিকাও হয়তো তাদের দিকে এসে যোগ দিত না।