বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/রোমক-সাম্রাজ্য

উইকিসংকলন থেকে

৩২

রোমক-সাম্রাজ্য

২৩শে এপ্রিল, ১৯৩২

 অনেকদিন তোমাকে চিঠি লিখি নি। ইতিমধ্যে এলাহাবাদের খবরে মন বড়ো খারাপ লেগেছিল, বিশেষ করে তোমার ‘দোল আম্মা’র (ঠাকুমা) জন্যে। আমি তো জেলে কতকটা আরামেই আছি, আর ওদিকে আমার বৃদ্ধা রুগ্‌ণা মাকে কিনা পুলিশ লাঠির আঘাত করল? মনে মনে চটে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম, ওসব কথা ভেবে মন খারাপ করে লাভ নেই; বরং কাজে ব্যাঘাত ঘটে।

 আজ আবার রোমের কথাই বলব। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে রোমের আর-এক নাম দেওয়া হয়েছে—রোমক। ইতিপূর্বে আমরা রোমক প্রজাতন্ত্রের পতন এবং রোম-সাম্রাজ্যের উৎপত্তির ইতিহাস আলোচনা করেছি। প্রথম রাজার পদে অভিষিক্ত হলেন জুলিয়স সিজারের পোষ্যপুত্র অক্টেভিয়ান। তিনি রাজা হয়ে অগাস্টাস সিজার এই নাম গ্রহণ করলেন। কিন্তু রাজা উপাধি তিনি নিলেন না; ওটা নাকি তাঁর পদমর্যাদার উপযোগী ছিল না; তা ছাড়া প্রজাতন্ত্রের বাইরেকার খোলসটাও তিনি বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। ‘ইম্পারেটর’ অর্থাৎ ‘রাজ্যের প্রভু’ এই উপাধি তিনি গ্রহণ করলেন। এই কথাটাই শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ-উপাধি-রূপে গণ্য হল। পরে এই কথা থেকেই ইংরেজি ‘এম্পারার’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, প্রাচীন রোম-সাম্রাজ্য এমন দুটি শব্দের সৃষ্টি করেছে যা সমগ্র পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়করা সানন্দে নিজেদের নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। শব্দ দুটি হল ‘এম্পারার’, আর ‘সিজার’, ‘কাইজার’ অথবা ‘জার’। প্রথমে এই ধারণা ছিল যে, পৃথিবীতে একই সময়ে একজনের বেশি সম্রাট থাকবে না। রোম-নগরকে সেকালে বলা হত ‘মিস্ট্রেস অব দি ওয়ার্ল্‌ড্’ বা ‘ধরিত্রীর অধিনেত্রী’। রোমের অবস্থা তখন খুব উন্নত; পাশ্চাত্যের অধিবাসীরা তাই মনে করত, রোমের শক্তি ও প্রভুত্বে সারা পৃথিবী আচ্ছন্ন। কিন্তু এটা ভুল ধারণা এবং এতে করে ভূবিদ্যা এবং ইতিহাসে তাদের অজ্ঞতাই প্রকাশ পেয়েছে। রোম-সাম্রাজ্য ছিল প্রধানত ভূমধ্যসাগরীয় সাম্রাজ্য; পুবদিকে এর সীমা ছিল মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত। সময় সময় আবার চীন এবং ভারতবর্ষে রোমের চেয়ে বড়ো আর শক্তিশালী রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল, সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকেও সেগুলি ছিল অধিকতর উন্নত। তবে কিনা পৃথিবীর পশ্চিমাংশে রোমই ছিল একমাত্র সাম্রাজ্য এবং প্রাচীনরা ঐ অংশকে একটা পৃথিবী বলেই মনে করত। রোমের তখন দারুণ খ্যাতি-প্রতিপত্তি।

 রোমের একটা আদর্শ ছিল—সর্বাধিনায়করূপে পৃথিবীর উপরে আধিপত্য করার আদর্শ। তাই তো রোমের পতন হওয়া সত্ত্বেও সাম্রাজ্য রক্ষা পেল, রোম-নগর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়েও সেই আদর্শটাকে আঁকড়ে ধরে রইল। এমনকি সাম্রাজ্য যখন একেবারে লোপ পেল, মিলিয়ে গেল ছায়ায়, তখনও আদর্শটা থেকে গেল।

 রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাস লেখা সহজ ব্যাপার নয়। আমি একটু মুশকিলেই পড়েছি। কত বইয়ে কত কথা পড়েছি, হরেক রকমের তথ্য ও কাহিনীতে আমার মন এলোপাথাড়ি বোঝাই হয়ে আছে; বেছে বেছে কোনটা লিখব আর কোনটা লিখব না, ঠাওর পাচ্ছি নে। অধিকাংশ বই জেলে বসে পড়েছি। বাস্তবিক, জেলে না এলে রোম-সম্পর্কে একখানি প্রসিদ্ধ বই কোনোকালে আমার পড়া হত কি না সন্দেহ। বিরাট বই, নানা কাজের ফাঁকে সময় করে আগাগোড়া পড়া সম্ভব নয়। বইখানি গিবন-নামক জনৈক ইংরেজের লেখা—‘দি ডিক্লাইন অ্যাণ্ড্ ফল অব দি রোমান এম্পায়ার’। দেড় শো বছর পূর্বেকার লেখা বই; এখনও পড়তে ভারি চমৎকার, উপন্যাসের চেয়েও বেশি চিত্তাকর্ষক। প্রায় দশ বছর পূর্বে লক্ষ্ণৌ-জেলে এই বই পড়তে শুরু করেছিলাম; কিন্তু মাসখানেক পরেই জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হল আমাকে, তাই সেবারে বইখানি শেষ করা হয় নি। তার পরে আর সময়ও পাই নি, তা ছাড়া মনের অবস্থাও ঠিক রোম এবং কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের ইতিহাস পড়বার মতো ছিল না; অথচ আর মাত্র শ-খানেক পৃষ্ঠা বাকি ছিল।

 কিন্তু সে তো দশ বছর আগেকার কথা এবং এত দিনে অনেক-কিছু হয়তো আমি ভুলে গেছি; তথাপি এখনও অনেক কথা আমার মনে তালগোল পাকিয়ে আছে। যাই হোক, তোমাকে বিভ্রান্ত করব না।

 খৃষ্টীয় যুগের অব্যবহিত পূর্বে অগাস্টাস সিজার রোম সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। প্রথমে কিছুকাল প্রজাতন্ত্রের কাঠামোটা বজায় রইল, সম্রাটগণ সিনেটকে মেনে চললেন। কিন্তু সে বেশি দিনের জন্যে নয়। শীঘ্রই সম্রাট সমস্ত ক্ষমতা নিলেন নিজের হাতে, শুরু হল স্বেচ্ছাচারতন্ত্র, লোকে তাদের দেখতে লাগল দেবতার মতো। সম্রাট যত দিন বেঁচে থাকতেন প্রজারা অর্ধদেবতা জ্ঞানে তাঁর পূজা করত; আর মৃত্যুর পরেই তিনি পুরোপুরি দেবত্ব লাভ করতেন। সেকালের সমস্ত লেখকই সম্রাটদের গুণবর্ণনায় পঞ্চমুখ ছিলেন। সম্রাটরা ছিলেন সর্বগুণের অধিকারী, বিশেষত অগাস্টাস। তাঁর যুগকে বলা হয় স্বর্ণযুগ, সব-কিছু চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল তখন; শিষ্টের পালন, দুষ্টের দমন এই ছিল নীতি। স্বেচ্ছাচারতন্ত্র যে দেশে সে দেশের নিয়মই এই; রাজার প্রশংসা করলে লেখকরা পুরস্কৃত হন। ভার্জিল, ওবিদ, হোরেস, প্রভৃতি লাতিন গ্রন্থকারগণ সে যুগের লোক। প্রজাতন্ত্রের শেষের দিকে যে গৃহযুদ্ধ আর গোলযোগের শুরু হয়েছিল, সেসমস্ত অবসানের পরে সম্ভবত ব্যবসাবাণিজ্যের কিছুটা উন্নতি হয়েছিল এবং সভ্যতা কিয়ৎপরিমাণে বিস্তারলাভ করেছিল।

 কিন্তু সেই সভ্যতা কীরূপ ছিল, জানো? সে সভ্যতা ছিল ধনীদের একচেটিয়া। আর ঐ ধনীরা ছিল নেহাত স্থূলবুদ্ধি এক দল লোক, সর্বদা আমোদপ্রমোদে মত্ত। বিদেশ থেকে তাদের জন্যে আমদানি হত খাদ্য আর বিলাস সামগ্রী, আর তার কতই-না আড়ম্বর! এজাতীয় লোক কিন্তু এখনও আছে। জাঁকজমক, আড়ম্বর, শোভাযাত্রা, সার্কাসের খেলা ইত্যাদি লেগেই থাকত, কিন্তু এসবের অন্তরালে জনগণের দুর্দশার অবধি ছিল না। ট্যাক্সের হার খুব বেশি ছিল। শ্রমসাধ্য কাজের ভার ছিল ক্রীতদাসের উপরে। শুনে অবাক হবে যে, ঐ গ্রীক ক্রীতদাসরাই ছিল ধনীদের রোগ-চিকিৎসক এবং এমনকি বিদ্যানুশীলনের ভারও ছিল তাদেরই উপরে। শিক্ষার ব্যবস্থা বা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার সংবাদ এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবার চেষ্টা অতি সামানাই ছিল।

 কত সম্রাট এল আর গেল। সব অকর্মণ্যের দল। ক্রমে ক্রমে সেনা-বিভাগ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল; সম্রাটকে তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত। কাজেকাজেই সেনা-বিভাগকে হাতে না রাখলে চলে না, দিতে হয় ঘুষ। সেই ঘুষের জোগাড় হত জনগণকে শোষণ করে। দাসব্যবসা চলত পুরোদমে এবং সেটা ছিল রাজস্ববৃদ্ধির প্রধান উপায়। প্রাচীন গ্রীসের পবিত্র ডেলস্-দ্বীপ ছিল দাসব্যবসায়ের একটা প্রধান কেন্দ্র। দাসরা পরস্পরকে হত্যা করে সকলের সামনে অস্ত্রখেলা দেখাত; কোনো-এক সম্রাট তো একই সময়ে একত্রে বারো শো ক্রীতদাসের খেলা দেখাবার ব্যবস্থা করতেন।

 এই তো রোম-সাম্রাজ্যের সভ্যতা। কিন্তু গিবন তাঁর বইতে কী লিখেছেন, জানো? লিখেছেন: “যদি কাকেও বলা যায় পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটা সময়ের উল্লেখ করো যখন মানবজাতি সবরকম সুখসমৃদ্ধির অধিকারী হয়েছিল, সে নিশ্চয় বিনা দ্বিধায় বলবে, দোমিতানের মৃত্যুর পর থেকে কমোডাসের সিংহাসন আরোহণের মধ্যবর্তী কাল”—অর্থাৎ খৃষ্টীয় ৯৬ থেকে ১৮০ অব্দের মধ্যবর্তী চুরাশি বছর। আশ্চর্য, গিবন জ্ঞানী লোক হয়েও এমন কথা কী করে বললেন। অধিকাংশ লোকই নিশ্চয় এ কথায় সায় দেবে না। মানবজাতি অর্থে তিনি প্রধানত ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীর অধিবাসীদের কথাই বলেছেন; কেননা, ভারতবর্ষ চীন কিংবা প্রাচীন মিশর সম্বন্ধে সম্ভবত তাঁর কোনো জ্ঞান ছিল না।

 কিন্তু হয়তো আমি রোম সম্পর্কে একটু অবিচার করছি। বস্তুত সীমান্তে অহরহ লড়াই চললেও প্রথম দিকটায় সাম্রাজ্যের ভিতরে শান্তি স্থাপিত হয়েছিল। দেশ নিরুপদ্রব হওয়াতে ব্যবসাবাণিজ্যেরও উন্নতি হয়েছিল। নাগরিক অধিকার সকলকেই দেওয়া হত; তাই বলে ক্রীতদাসদের নয়। জনগণের বিশেষ-কোনো ক্ষমতা ছিল না, সম্রাটই ছিলেন সর্বেসর্বা। রাজনীতি আলোচনা করলেই রাজদ্রোহের দায়ে পড়তে হত। উচ্চশ্রেণীর সকল সম্প্রদায়ের লোকের জন্যে একই আইন এবং একই শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল।

 কালক্রমে রোমানরা বড়ো অলস হয়ে পড়ল, যুদ্ধ করবার ক্ষমতাটকু পর্যন্ত হারিয়ে ফেলল। পল্লী অঞ্চলের লোক করভারে ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ল, নগরবাসীদের অবস্থাও তদ্রূপ। সম্রাট নাগরিকদের খুশি রাখবার চেষ্টা করেন, যাতে না কোনো ফ্যাশাদ বাধায় ওরা। রোম-নগরের অধিবাসীদের জন্যে বিনা মূল্যে রুটি বিতরণ আর বিনা দর্শনীতে আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু কত কাল এবং কত জায়গায়ই-বা এই ব্যবস্থা বজায় রাখা চলে? আর ঐ রুটির জোগাড় হত কোথা থেকে জানো? মিশর প্রভৃতি দেশের ক্রীতদাসদের অংশে ভাগ বসিয়ে। সেখান থেকে বিনা মূল্যে ময়দা জোগাড় করা হত।

 রোমানরা তো যেন যুদ্ধবিদ্যা ভুলে গেল, কিন্তু সেনাদল রাখতে হবে যে! সৈনাবিভাগে লোক সংগ্রহ করা হ’ত বর্বর জাতি থেকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল রোমের শত্রু; এদের দলের লোকরাই সীমান্তে অনবরত গোলযোগ সৃষ্টি করছিল। রোম-নগর যত শক্তিহীন হতে লাগল, এই অসভ্যজাতি তত দুঃসাহসী আর ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল। পূর্ব-সীমান্ত ছিল অরক্ষিত এবং সেদিক থেকেই ছিল বিপদের আশঙ্কা। অগাস্টাস সিজারের তিন শো বছর পরে সম্রাট কন্‌স্টাণ্টাইন এমন এক ব্যবস্থা করলেন যার ফল হল সুদূরপ্রসারী। রোম-নগর থেকে সাম্রাজ্যের রাজধানী তিনি সরিয়ে নিলেন, কৃষ্ণসাগর আর ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী বস্ফোরাস্ উপসাগরের তীরে বাইজেন্‌টাম্-নগরের নিকটে তিনি এক নূতন শহর গড়ে তুললেন। নিজের নাম অনুসারে তার নাম রাখলেন কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্। তখন থেকে এই নগরই হল রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী। এশিয়ার কোনো কোনো অংশে কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্‌ আজও ‘রুম’ নামে পরিচিত।