বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/সংকটের হেতু
১৮৫
সংকটের হেতু
বিশ্ব-সংকট সমস্ত পৃথিবীর টুঁটি চেপে ধরেছে, যেখানে যা কিছু কাজকর্ম চলছিল সব দমবন্ধ করে মেরে ফেলেছে, বা তার গতি প্রায় থামিয়ে দিয়েছে। বহু স্থানে শিল্পের রথের চাকা গিয়েছে থেমে; যে ক্ষেতে একদা খাদ্য বা অন্য শস্য জন্মাত সে পড়ে আছে ঊষর অকর্ষিত; রবারের গাছ থেকে রবারের রস গড়িয়ে পড়ছে তাকে কেউ আহরণ করছে না; একদা যে পাহাড়ের দেহ সযত্ন রক্ষিত চায়ের বাগানে ঢাকা ছিল এখন তা জংলা হয়ে পড়েছে, তার যত্ন করবার লোক নেই। এইসমস্ত কাজ যারা এতকাল করে এসেছে তারা গিয়ে ভিড় করছে বেকারের দলে; অপেক্ষা করছে কাজের, চাকরির—সে চাকরি আসছে না; ইতিমধ্যে সহায়হীন আশাহীন এই মানুষের দল ক্ষুধায়, অভাবে ক্লান্তপদে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। অনেক দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা অত্যন্তরকম বেড়ে গিয়েছে।
আমি বলেছি, সমস্ত শিল্পেরই উপরে এই সংকটের ছায়া পড়েছিল। কিন্তু না, একটি শিল্প ছিল যার কোনো ব্যতিক্রম হয় নি, সে হচ্ছে রণসজ্জা নির্মাণের শিল্প। তারা সমানেই কাজ করে যাচ্ছিল, সমস্ত দেশের জাতীয় সেনাবাহিনী নৌবাহিনী বিমানবাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্র রণসম্ভার যোগান দিচ্ছিল। এদের ব্যবসা বরং বাড়তে লাগল, সে ব্যবসার অংশীদারেরা খুব মোটা মোটা লভ্যাংশ পেতে লাগল। বাণিজ্যসংকটে এই ব্যবসায়ের হানি হয় নি, কারণ এর কারবারই হচ্ছে জাতিতে জাতিতে রেষারেষি আর বিদ্বেষ নিয়ে—সংকটের চাপে পড়ে সে রেষারেষি বিদ্বেষের তীব্রতা আরও বেড়েই চলছিল।
পৃথিবীর মধ্যে একটি বৃহৎ অঞ্চলও এই সংকটের প্রত্যক্ষ আঘাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেল, সে হচ্ছে সোভিয়েট রাশিয়া। সেখানে বেকার-সমস্যা দেখা দিল না; বরং পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দরুন কাজকর্ম আরও বেশি জোর চলতে লাগল। এই দেশটি ছিল ধনিকতন্ত্রের আয়ত্তের বাইরে, এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ভিন্ন রকমের। তবু সংকটের ফলে পরোক্ষভাবে কিছু ক্ষতি তাকেও সইতে হল; কারণ বাইরে সে যে কৃষিজাত পণ্য বেচত, তার দাম গেল কমে।
এই বিপুল বাণিজ্য-হানি, এই বিশ্বব্যাপী মহাসংকট, বিশ্বযুদ্ধের মতোই এর ভয়াবহতা—এর উদ্ভব হল কী করে? আমরা একে বলছি ধনিকতন্ত্রের সংকট, কারণ ধনিকতন্ত্রের বিরাট এবং জটিল যন্ত্রটি এর চাপে ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে। ধনিকতন্ত্রের এভাবে ভাঙন ধরল, কেন? আর এই সংকট, এ কী শুধু একটা সাময়িক ব্যাধিমাত্র, এর প্রকোপ কাটিয়ে আবার কি ধনিকতন্ত্র সুস্থ হয়ে বেঁচে উঠবে? না এইই তার মৃত্যুবাণ—এতকাল ধরে পৃথিবীতে প্রভুত্ব চালিয়ে এল যে বিরাট ব্যবস্থা, এইবারেই কি তার শেষ হয়ে যাবে? এই রকমের বহু প্রশ্নই আজ জেগে উঠছে, আমাদের মনকে অভিভূত করে ফেলছে; কারণ এর উত্তরের উপরেই নির্ভর করছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ, সেই সেই সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও ভবিষ্যৎ। ১৯৩২ সনের ডিসেম্বর মাসে ব্রিটিশ সরকার আমেরিকার সরকারকে একটি পত্র পাঠান, তাতে মিনতি জানান, যুদ্ধের দরুন তাঁদের যে দেনা আমেরিকার কাছে রয়েছে সেটা শোধ দেবার দায় থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া হোক। এই চিঠিতে তাঁরা বলেন, এই ব্যাধি সারাবার জন্যে যে-সব ঔষধ আমরা প্রয়োগ করেছিলাম, তাতে শুধু বাাধিই বেড়ে গেছে। “প্রত্যেক জায়গাতেই আমরা করের পরিমাণ নির্মমভাবে বাড়িয়ে দিয়েছি, ব্যয়ের অঙ্কও যথাসম্ভব ছেঁটে কমিয়ে এনেছি। কিন্তু বিপদ থেকে মুক্তি পাবার আশায় যে ব্যয় সংকোচের অনুশাসন খাড়া করেছি, তার ফলে শুধু বিপদেরই তীব্রতা বেড়ে চলেছে।” চিঠির আরেক জায়গাতে বলা হয়েছে, “মানুষের এই ক্ষতি বা দুঃখভোগ, এটা বিশ্বপ্রকৃতির কার্পণ্যের ফলে আসে নি। বস্তুবিজ্ঞানের জয়যাত্রা আজও অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলেছে, ধন-উৎপাদনের যে অসীম সম্ভাবনা আমাদের হাতে ছিল তারও অস্তিত্ব কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় নি।” দোষ বিশ্বপ্রকৃতির নয়—দোষ মানুষের, সে যে ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে দোষ তার।
ধনিকতন্ত্রের এই ব্যাধি, এর নির্ভুল কারণ নির্দেশ করা বা তার অব্যর্থ ঔষধের ব্যবস্থা দেওয়া সহজ কথা নয়। আমরা ভাবি—অর্থনীতিবিদরা নিশ্চয়ই এর সবখানি জানেন বোঝেন; অথচ তাঁদেরই মধ্যে এ নিয়ে মতভেদের অন্ত নেই, এক-একজনে এক-একরকম কারণ নির্দেশ করছেন, এক-একজনে এক-একরকম প্রতিকারের পথা বাতলাচ্ছেন। এর সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা আছে বোধ হয় একমাত্র কমিউনিস্ট এবং সমাজতন্ত্রবাদীদের: তারা ধনিকতন্ত্রের এই ভাঙন ধরাকে তাদের মতবাদেরই সত্যতার প্রমাণ বলে ধরে নিচ্ছে। ধনিকতন্ত্রী পণ্ডিতরা তো স্পষ্টই স্বীকার করছেন, তাঁরা বিস্মিত হয়ে গেছেন, এর হদিশ খুঁজে পাচ্ছেন না। ব্রিটেনের মহাজনদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং যোগ্যতম ব্যক্তিদের একজন হচ্ছেন মণ্টেগু নর্ম্যান, ব্যাঙ্ক অব ইংলণ্ডের তিনি গভর্নর। মাসকয়েক আগে একটি প্রকাশ্য জনসভায় তিনি বলেছেন: “অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তার বিশ্লেষণ করা আমার শক্তির বাইরে। যে-সব বিঘ্নবিপত্তির সৃষ্টি এতে হয়েছে তার পরিমাণ এত বিপুল, এমন অভিনব, এবং এমন অভূতপূর্ব যে, এর আলোচনা আমাকে করতে হবে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা এবং অক্ষমতা স্বীকার করে নিয়ে। এ আমার বোঝবার শক্তির বাইরে। ভবিষ্যতের কথা বলতে হলে, হয়তো আমরা অন্ধকার সুড়ঙ্গের পরপারে আলোর রশ্মি দেখতে পাব—কেউ কেউ ইতিমধ্যেই সে আলোকের আভাস দেখতে পাচ্ছেন, আমাদের দেখাতে পারছেন।” কিন্তু সে আলো শুধুই আলোর দীপ্তি, মিথ্যা মরীচিকা আমাদের মনে সে আশা জাগিয়ে তুলছে কেবল আবার নিরাশ করবে বলে। ব্রিটেনের একজন প্রসিদ্ধ রাষ্ট্রনীতিবিদ্ সার্ অকল্যাণ্ড গেডিস্। তিনি বলেছেন: “চিন্তাশীল ব্যক্তিদের ধারণা হয়েছে, সমাজের ভাঙন এই শুরু হল। আমরা যারা ইউরোপে আছি, আমরা জানি একটা যুগের মৃত্যু হচ্ছে।”
জর্মনরা বলত, এই সংকটের আসল কারণ হচ্ছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়। অন্য অনেকে বলে, সংকটের জন্ম হয়েছে যুদ্ধ-ঋণ থেকে: এক দেশের কাছে অন্য দেশের ঋণ এবং দেশের মধ্যেকার ঋণ—এই ঋণের বোঝা ক্রমে এত ভারী হয়ে উঠেছে যে তাকে আর বহন করা যাচ্ছে না, তার চাপেই সমস্ত শিল্প-ব্যবসায় ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। এইভাবে পৃথিবীর এই অশান্তির জন্য যুদ্ধটাকেই প্রধানত দায়ী করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ্রা অনেকে মনে করেন, আসলে গোল বেধেছে টাকার অদ্ভূত আচরণ এবং পণ্য-মূল্যের অত্যধিক হ্রাসের ফলে; সেটার মূলে আবার রয়েছে সোনার টানাটানি—সোনার অভাব পড়েছে পৃথিবীতে, তার এক কারণ, পৃথিবীর যত সোনার দরকার তত সোনা খনি থেকে উঠছে না; তার চেয়েও বড়ো কারণ, প্রত্যেক দেশেরই সরকারপক্ষ যতখানি সম্ভব সোনা ঘরে মজুত করে রাখছেন। অন্যরা আবার বলেন, সমস্ত গোলযোগেরই মূল হচ্ছে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, বাণিজ্য-শুল্ক এবং পণ্য-শুল্ক; এর ফলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা পড়ে যাচ্ছে। আরেকদল বলেন: না, এর কারণ হচ্ছে উৎপাদন-পদ্ধতি বা বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালীর অত্যধিক উৎকর্ষ সাধন; তারই ফলে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে, বেকার সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়াও আরও অনেক কারণ এর অনেকে নির্দেশ করছেন। এই-সব কারণ দেখানোর গোড়ায় যুক্তিও হয়তো আছে; হয়তো এর সবগুলো কারণ একত্র মিলেই পৃথিবীর এই দুর্বিপাক ঘটিয়ে তুলেছে। কিন্তু তবুও এই সংকট সৃষ্টির অপরাধটা এর কোনো একটা কারণের, বা একত্রে এদের সকলেরও ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা উচিত বা যুক্তিযুক্ত হবে না। বস্তুত, কারণ বলে এই যতগুলো ব্যাপারের নাম করা হয়েছে তার মধ্যে অনেকগুলো হচ্ছে এই সংকটেরই ফল; অবশ্য তার প্রত্যেকটাই আবার সংকটের নিদারুণতাকে বাড়িয়েও তুলেছে। এর মূল কারণকে খুঁজতে হবে নিশ্চয়ই আরও অনেক তলায় গিয়ে। কেবল যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে এ সংকট আসে নি, কারণ বিজয়ীরাও এর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে; শুধু জাতির দারিদ্র্য থেকে এর জন্ম নয়, কারণ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ আমেরিকাতেও এর প্রকোপ কারও তুলনার কম নয়। বিশ্বযুদ্ধের ফলে এই সংকটের আগমন দ্রুততর হয়ে উঠেছিল তাতে সন্দেহ নেই। যুদ্ধের ফলেই ঋণের বিষম বোঝা সকলের কাঁধে চেপেছে, এবং সে ঋণের টাকা উত্তমর্ণদের মধ্যে ভাগ হয়েছে যেভাবে সেটাও যুদ্ধেরই সৃষ্টি। তাছাড়া যুদ্ধের সময়ে এবং যুদ্ধের পরেও কয়েক বছর যাবৎ জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি ছিল, সেটা ছিল মানুষেরই গড়া, কৃত্রিম—তার পরে আবার একটা উল্টো ভাঙন না এসে পারে না। কিন্তু না, আরও একটু তলিয়ে দেখা থাক
শোনা যাচ্ছে, পণ্য-বাহুল্যই নাকি এর আসল কথা। কথাটা গোলমেলে; লক্ষ লক্ষ মানুষ যেখানে জীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুটুকুও পাচ্ছে না, সেখানে পণ্য-বাহুল্য থাকতেই পারে না। ভারতবর্ষে আজ লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের পরবার কাপড়টুকুও জুটছে না; অথচ শুনছি ভারতবর্ষের কাপড়ের কলগুলোতে, খাদি-ভাণ্ডারগুলোতে নাকি প্রচুর কাপড় জমে গেছে, কাপড়ের নাকি উৎপাদন-বাহুল্য ঘটেছে এদেশে। আসল কথা হচ্ছে, লোকেরা এত গরিব হয়ে গেছে যে কাপড় কেনবার সামর্থ্যই তাদের নেই—কাপড়ের প্রয়োজন তাদের নেই একথা ভুল। মানুষের অভাব হয়েছে টাকার। টাকার অভাব মানে এ নয় যে পৃথিবী থেকে সমস্ত টাকা উধাও হয়ে গেছে। এর মানে হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বত্র মানুষের মধ্যে টাকা যে ভাবে ছড়িয়ে ছিল তার সেই বণ্টন-রীতিটা বদলে গেছে, এখনও ক্রমাগত বদলে চলছে; তার মানে ধনের বণ্টনে দেখা দিয়েছে অসমতা। একদিকে গড়ে উঠছে ধনের বাহুল্য, অত ধন নিয়ে কী করবে সেইটেই তার মালিকরা ভেবে পাচ্ছে না; বাধ্য হয়ে তারা শুধু সে-ধন জমিয়েই চলেছে, ব্যাঙ্কের খাতায় জমার হিসাব খালি ফেঁপেই উঠছে তাদের। এই টাকা জমছে, বাজারে পণ্য কেনার কাজে এর ব্যবহার হচ্ছে না। অন্যদিকে তেমনই দেখা দিয়েছে ধনের বৃহত্তর অভাব; যে-পণ্য মানুষের একান্ত দরকার তাও তারা কিনতে পারছে না, টাকার অভাবে।
এ-যেন, পৃথিবীতে ধনী আর দরিদ্রের প্রভেদ আছে—এই কথাটাকেই ঘুরিয়ে বলা কিন্তু এ কথা তো সবাই জানে, এর জন্য যুক্তি-প্রমাণের আবশ্যক নেই। ধনী আর দরিদ্রের এই তফাত, এ তো ইতিহাসের একেবারে প্রথম দিন থেকেই চলে এসেছে। তবে এবারের এই সংকটের অপরাধটাও এর ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া কেন? বোধ হয় এর আগের একটা চিঠিতেই তোমাকে বলেছি, ধনিকতন্ত্রী ব্যবস্থার প্রকৃতিই হচ্ছে ধন-বণ্টনের এই বৈষম্যকে আরও প্রখর করে তোলা। সামন্ততন্ত্রের যুগে এদের তফাতটা প্রায় ধরাবাঁধা গোছের ছিল, বা বদলালেও এ অতি সামান্যই বদলাত। আর ধনিকতন্ত্রের আছে বড়ো বড়ো কল-কারখানা, আছে পৃথিবী জোড়া বাজার; তার গতিবেগ প্রচণ্ড। অতএব ব্যক্তি বা দলবিশেষের হাতে ধনসম্পত্তি জমে উঠবার সঙ্গে সঙ্গেই সমাজের মধ্যেও অতি দ্রুত পরিবর্তন শুরু হল। ধনবণ্টনের মধ্যে বৈষম্য বাড়ল, তার সঙ্গে এসে যোগ দিল আরও নানাবিধ কারণ, সকলে মিলে সৃষ্টি করল একটা নূতনতর সংগ্রামের—শিল্পতন্ত্রী দেশগুলিতে শ্রমিক আর ধনিকের মধ্যে লড়াই লাগল। এই-সব দেশের ধনিকরা তখন নিজের দেশের শ্রমিকদের কিছু বেশি বেতন, কিছু ভালো জীবনযাত্রার ব্যবস্থা ইত্যাদি নানাপ্রকার অনুগ্রহ দিয়ে বিরোধের তীব্রতাটাকে কমিয়ে আনল—এর টাকা সংগ্রহ করা হল উপনিবেশ এবং অনুন্নত দেশদের শোষণ করে। এইভাবে এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা আর পূর্ব-ইউরোপকে শোষণ করে পশ্চিম-ইউরোপ এবং উত্তর-আমেরিকার দেশগুলো টাকাকড়ি জমিয়ে নিল, সে টাকার কিছুটা অংশ তাদের শ্রমিকদের দিতে পারল। নূতন নূতন বাজার আবিষ্কৃত হবার সঙ্গে সঙ্গে নূতন নূতন শিল্পও গড়ে তোলা হল, বা পুরোনো শিল্পগুলোকেই বাড়িয়ে তোলা হল। সাম্রাজ্যবাদের তখন আত্মপ্রকাশ ঘটল এই-সব বাজার আর কাঁচামাল কোথায় মিলবে তার উগ্র অন্বেষণে; বিভিন্ন শিল্পতত্রী দেশের মধ্যে বাধল এই নিয়ে রেষারেষি, তার পর তাই থেকে এল বিরোধ। ক্রমে সমস্ত পৃথিবীটাই ধনিকতন্ত্রী দেশদের এই শোষণের কবলে এসে পড়ল; তখন আর কারও নূতন করে হাত-পা মেলবার জায়গা মিলছে না, অতএব তখন এদের সংঘর্ষ থেকেই সৃষ্টি হল যুদ্ধের।
এর সব কথাই আমি তোমাকে আগেও বলেছি। তবুও আবার বললাম, যেন বর্তমান সংকটের স্বরূপ তুমি ঠিকমতো বুঝতে পার। ধনিকতন্ত্র যখন গড়ে উঠছিল, সাম্রাজ্যবাদ যখন বেড়ে উঠছিল, সে যুগেও একদিকে অতিমাত্রায় সঞ্চয় এবং অন্যদিকে ব্যয় করবার মতো টাকার অভাবের দরুন পাশ্চাত্ত্য জগতে বহুবার এই সংকট দেখা দিয়েছে। কিন্তু সে সংকট আবার কেটেও গেছে, কারণ ধনিকদের হাতে যে বাড়তি টাকা ছিল, সেই টাকা দিয়ে তারা তখন অনুন্নত দেশকে গড়ে তুলেছে, শোষণ করেছে, সেখানে নূতন বাজারের সৃষ্টি করেছে, সেই বাজারে তাদের মাল কাটিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদকে নাম দেওয়া হয়েছিল ধনিকতন্ত্রের চরম রূপ। সাধারণ অবস্থায়, সমস্ত পৃথিবী শিল্পী হয়ে না-ওঠা পর্যন্ত এই শোষণের এই প্রক্রিয়াটি চলতে পারত। কিন্তু তার অনেক বিঘ্ন, অনেক বাধা এসে হাজির হল। সবচেয়ে বড়ো বিঘ্ন সাম্রাজ্যবাদী জাতিদেরই মধ্যে হিংস্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা—প্রত্যেকেই চায় সবচেয়ে বড়ো ভাগটা সে নেবে। আরেকটি বিঘ্ন হল ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান। তার পর আবার উপনিবেশগুলির নিজস্ব সব শিল্প গড়ে উঠল, তাদের বাজার তাদেরই মালে ভরে যেতে লাগল। এইসব ব্যাপারের ফলেই যুদ্ধটা বেধে উঠেছিল। কিন্তু সে যুদ্ধে ধনিকতন্ত্রের সমস্যাগুলোর সমাধান হল না, হওয়া সম্ভবও ছিল না। প্রকাণ্ড একটি দেশ, মানে সোভিয়েট ইউনিয়ন, একেবারেই ধনিকতন্ত্রী জগতের বাইরে চলে গেল; সেখানে আর তাদের মাল বেচা চলবে না। প্রাচ্যজগতে জাতীয়তাবাদ ক্রমেই উগ্র হয়ে উঠতে লাগল, শিল্পতন্ত্রেরও প্রতিষ্ঠা বেড়ে উঠল। যুদ্ধের সময়ে এবং যুদ্ধের পরে বৈজ্ঞানিক প্রয়োগবিধির যে প্রচণ্ড উন্নতি সাধিত হয়েছিল, তার ফলেও ধনবণ্টনের বৈষম্য আরও বেড়ে গেল, বেকার সমস্যাও বেড়ে গেল। এর উপরে আবার ছিল যুদ্ধ-ঋণ।
এই যুদ্ধ-ঋণের পরিমাণটা বিপুল; তাছাড়া এই ঋণের পেছনে অন্য কোনো প্রকার বাস্তব ধনের অস্তিত্ব ছিল না। একটা দেশ যেখানে রেলওয়ে বা জলসেচের খাল বা দেশের পক্ষে হিতকর অন্য কোনো বস্তু তৈরি করবার জন্য টাকা ধার করছে, সেখানে যে-টাকাটা সে ধার করল এবং ব্যয় করল তার বদলে সত্যিকারের জিনিসও সে পেয়ে যাচ্ছে। অনেক সময়ে দেখা যায়, এই বস্তুটিকে গড়ে তুলতে যে টাকা লেগেছিল, একে কাজে খাটিয়ে ধন উৎপন্ন হচ্ছে বস্তুত তার চেয়ে অনেক বেশি; তাই এদের বলা হয়—‘ফলপ্রসূ আয়োজন’। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে যে টাকা ধার করা হয়েছিল তা এরকম কোনো কাজে ব্যয় করা হয় নি। সে টাকা অফলপ্রসূ তো বটেই, ধংসপ্রসূও। অপরিমিত টাকা যুদ্ধে ব্যয় করা হল, সে-টাকার পদচিহ্ন লেখা রইল শুধু ধ্বংস আর হত্যালীলায়। এই জন্যই যুদ্ধ-ঋণটা হয়ে রইল পৃথিবীর স্কন্ধে একটা অবিমিশ্র এবং অলঘুকৃত বোঝা। এই যুদ্ধ-ঋণ আবার ছিল তিন রকমের: যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ—বিজিত জাতিদের জোর করেই এই টাকা দিতে রাজি করা হয়েছিল; আন্তর্জাতিক ঋণ—মিত্রপক্ষের সরকাররা পরস্পরের কাছে এবং বিশেষ করে আমেরিকার কাছে এই টাকা ধারতেন; আর জাতীয় ঋণ—প্রত্যেক দেশেরই মধ্যে সরকার পক্ষ তাঁদের নিজের প্রজাদের কাছ থেকে এই টাকা ধার করেছিলেন।
এই তিনরকম ঋণের প্রত্যেকটারই পরিমাণ ছিল বিপুল; কিন্তু প্রত্যেক দেশেরই পক্ষে সবচেয়ে বড়ো ঋণের অঙ্ক ছিল তার জাতীয় ঋণ। যেমন, যুদ্ধের পরে ব্রিটেনের জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৬,৫০,০০,০০,০০০ পাউণ্ড। এই যেখানে ঋণের বহর, তার দরুন সুদের টাকা মিটিয়ে দেওয়াও একটা বিরাট ব্যাপার, সে দিতে হলে দেশে অত্যন্ত বেশিরকম কর না বসিয়ে উপায় নেই। জর্মনি তার আভ্যন্তরীণ ঋণটাকে মুছে ফেলল মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে—মুদ্রাস্ফীতির ফলে তার পুরোনো মার্কটারই আয়ু শেষ হয়ে গেল। এদিক থেকে বলা যায়, জর্মনি তার বোঝার দায় থেকে অব্যাহতি পেল তার প্রজাদের—যে প্রজারা দুর্দিনে তাকে টাকা ধার নিয়েছিল—তাদের সর্বনাশ করে। ফ্রান্সও সেই মুদ্রাস্ফীতির নীতিই অবলম্বন করল, অবশ্য অতখানি পরিমাণে নয়। ফ্রাঙ্কের দাম সে কমিয়ে পুরোনো দাম যা ছিল তার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগে এনে ফেলল; এক ধাক্কায় তার আভ্যন্তরীণ জাতীয় ঋণের পরিমাণটাকেও মূলের এক-পঞ্চমাংশে পরিণত করে দিল। কিন্তু অন্যান্য দেশের কাছে যার যা ঋণ ছিল (ক্ষতিপূরণ বা আন্তর্জাতিক ঋণ) তার বেলায় এই চাল চালা সম্ভব ছিল না, সে টাকা এদের নগদ সোনা দিয়েই মিটিয়ে দিতে হল।
এই-সব আন্তর্জাতিক ঋণের টাকা এক দেশের অন্য দেশকে মিটিয়ে দেবার মানেই হল, যে-দেশ টাকা দিচ্ছে, তার ঐ পরিমাণ টাকা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, অতএব সে দরিদ্র হয়ে পড়ছে। কিন্তু দেশের মধ্যে যে জাতীয় ঋণ ছিল সেটা শোধ করার ফলে দেশের অবস্থার এরকম কোনো পরিবর্তন হয় না, কারণ সে টাকা পাকেচক্রে দেশের মধ্যেই থেকে যায়। অথচ এক্ষেত্রেও একটা বড়ো পরিবর্তন ঘটতে সাগল। সরকারপক্ষ এই ঋণ শোধ করলেন দেশের সমস্ত করদাতাদের উপরেই কর বসিয়ে টাকা তুলে—ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে। যে মহাজনশ্রেণী রাষ্ট্রকে টাকা ধার দিয়েছিল তারা হচ্ছে ধনীর দল। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াল এই; ধনী বা দরিদ্র সকলের উপরেই কর বসিয়ে টাকা তোলা হল এবং সে টাকাটা দেওয়া হল ধনীদের; ধনীরা কর বলে যে-টাকা রাষ্ট্রকে দিয়েছিল সেটা তো ফেরৎ পেলই, তার চেয়ে বেশিও কিছু পেল। গরিবরা শুধু করই দিল, ফেরৎ কিছুই পেল না। ধনীদেরই ধনবৃদ্ধি ঘটল, দরিদ্ররা হল দরিদ্রতর।
ইউরোপের ঋণী দেশরা আমেরিকার কাছে তাদের ঋণেরও খানিকটা শোধ করছিল; কিন্তু সে-টাকাও সবটাই গিয়ে পৌঁছল আমেরিকার বড়ো বড়ো ব্যাঙ্কার আর মহাজনদের হাতে। অতএব এই যুদ্ধ-ঋণ পরিশোধের ফলে খারাপ অবস্থাটাই আরও বেশি খারাপ হয়ে উঠল; ধনীরা অতিরিক্ত টাকার ভারে বিব্রত হয়ে পড়ল এবং সে-টাকা এল দরিদ্রদের বঞ্চিত করে। ধনীরা আবার এই টাকা কারবারে খাটাতে চাইল, কারণ কোনো ব্যবসাদার লোকই তার টাকাকে অলস ফেলে রাখতে চায় না। নূতন নূতন কারখানা বসিয়ে কলকব্জা কিনে এবং অন্যান্য মূলধনে তারা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খাটিয়ে বসল; দেশের প্রজারা তখন সকলেই দরিদ্র হয়ে পড়েছে, সে অবস্থায় অত টাকা খাটাতে যাবার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। শেয়ারের বাজারেও তারা ফাটকা খেলতে শুরু করল। জনসাধারণের জন্য আরও অনেক বেশি বেশি পরিমাণে মাল তৈরি করবার জন্য প্রস্তুত হল তারা; কিন্তু তার সার্থকতা কোথায়, সে মাল কেনবার টাকাই তো জনসাধারণের হাতে নেই। অতএব হল পণ্য-বাহুল্য, মালপত্র বেচা গেল না, শিল্পদের টাকা লোকসান হতে লাগল, অনেক কারখানাতে কাজই বন্ধ হয়ে গেল। লোকসানের বহর দেখে ব্যবসাদাররা ভয় পেল; শিল্পে ব্যবসায়ে টাকা খাটানো বন্ধ করে দিয়ে তারা টাকার পুঁটুলি আঁকড়ে ধরে বসে রইল, সে টাকা ব্যাঙ্কে পড়ে পচতে লাগল। তার ফলেই ব্যাপক হয়ে উঠল বেকার সমস্যা, সংকটের ঢেউ পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ল।
সংকটের কারণ বলে যে-সব ব্যাপারকে নির্দেশ করা হয়েছে, আমি তাদের নিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনা করলাম। কিন্তু বস্তুত এরা সকলে একত্র হয়েই সংকটটিকে ঘটিয়েছিল; সেইজন্যই সে-বাণিজ্য-সংকট এত বিরাট হয়ে উঠল যে এর আগে কোনো দিন তেমন হয় নি। মূলত এর কারণ ছিল, ধনিকতন্ত্রের আমলে যে অতিরিক্ত লাভ উৎপন্ন হয় তার অসম বণ্টন। অন্য ভাষায় বলা যায়, জনসাধারণ তাদের নিজেদের শ্রম দিয়ে যে-সব পণ্য তৈরি করছিল, তা কিনে নেবার মতো টাকা তারা বেতন বা মাইনে বলে পাচ্ছিল না। তাদের মোট যা আয়, তার তুলনার উৎপন্ন পণ্যের মূলা ছিল অনেক বেশি। টাকাটা যদি জনসাধারণের হাতে থাকত তবে সেই টাকা দিয়ে তারা এই-সব পণ্য কিনতে পারত। কিন্তু সে টাকা গিয়ে জমেছে অল্প ক’জন অত্যন্ত ধনীব্যক্তির হাতে; সে টাকা দিয়ে কী করবে তাই তারা ভেবে পাচ্ছে না। এই বাড়তি টাকাটাই ঋণের আকারে আমেরিকা থেকে চলে যাচ্ছিল জর্মনিতে, মধ্য-ইউরোপে, দক্ষিণ-আমেরিকায়। বিদেশ থেকে পাওয়া এই ঋণের জোরেই যুদ্ধ-জীর্ণ ইউরোপ এবং ধনিকতন্ত্রী ব্যবস্থাটা আরও কয়েকটা বছর খাড়া হয়ে থাকতে পেরেছিল; অথচ সংকটেরও একটা বড়ো হেতু হল এই টাকাটাই। এবং শেষকালে এই বিদেশী ঋণ বন্ধ হয়ে গেল বলেই এদের ব্যবসা-বাণিজ্য সব হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।
ধনিকতন্ত্রের যে সংকট দেখা দিয়েছে তার এই কারণ নির্দেশ যদি সত্য হয়, তবে এর প্রতিকার হতে পারে মাত্র একটি উপায়ে—সকল মানুষের আয় সমান করে দেওয়া, বা অন্তত তার দিকে চলতে চেষ্টা করা। পুরোপুরি এটা করার মানে দাঁড়াবে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা; নেহাৎ অবস্থার চাপে পড়ে যতদিন একান্ত বাধ্য না হচ্ছে, ততদিন ধনিকতন্ত্র সেটাকে স্বেচ্ছায় মেনে নেবে এমন সম্ভাবনা নেই। অনেকে পরিকল্পনা-সমন্বিত ধনিকতন্ত্রের কথা বলছেন, বলছেন অনুন্নত দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাবার জন্য আন্তর্জাতিক মিলিত প্রচেষ্টার কথা। কিন্তু এই-সব কথার আড়ালেই উগ্র হয়ে জেগে উঠছে দেশে দেশে রেষারেষি, পৃথিবীর বাজার দখল করবার জন্য সাম্রাজ্যবাদী জাতিদের মধ্যে পরস্পর সংগ্রাম। পরিকল্পনা, কিসের জন্য? একজনকে মেরে আরেকজনের লাভ বাড়াবার জন্য? ধনিকতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ব্যক্তিগত লাভ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা তার মূল-মন্ত্র—প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর পরিকল্পনা একত্র চলতে পারে না।
সমাজতন্ত্রবাদী এবং কমিউনিস্টদের কথা ছেড়েই দিই; অন্যান্য চিন্তাশীল ব্যক্তিরাও এখন অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, বর্তমান অবস্থাতে ধনিকতন্ত্র কি সত্যই কার্যকরী? এক-একজন এঁরা অদ্ভূত সব প্রস্তাব তুলছেন, শুধু বর্তমানের এই লাভের রীতিটাকেই নয়, যে মূল্যপ্রদানের রীতিতে মানুষেকে টাকা দিয়ে জিনিসপত্রের দাম দিতে হয়, তাকেই বাতিল করে দেবার কথা বলছেন। এসব খুব জটিল বিষয়, তার আলোচনা এখানে সম্ভব নয়, যতগুলো প্রস্তাব প্রায় আজগুবি। আমি এদের কথা উল্লেখ করছি এজন্য যাতে তুমি স্পষ্টরূপে বুঝতে পায় যে মানুষের মন কীভাবে ঘা খেয়ে নব নব ভাবে সাড়া দিচ্ছে এবং এই বিপ্লবাত্মক প্রস্তাবগুলি যারা উত্থাপন করছে তারা মোটেই বিপ্লববাদী নয়।
জেনেভার আই. এল্. ও. (ইণ্টারন্যাশনাল লেবার অফিস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দপ্তর) অল্পদিন হল একটি প্রস্তাব করেছেন—শ্রমিকদের খাটুনির মেয়াদটাকে সপ্তাহে চল্লিশ ঘণ্টার অনধিক বলে বেঁধে দেওয়া হোক, তাহলেই সঙ্গে সঙ্গে বেকার সমস্যাও অনেকখানি কমে আসবে। কাজের মেয়াদ কমলেই আরও বহু লক্ষ লক্ষ লোক কাজ পেয়ে যাবে, অতএব বেকার সমস্যাও সেই পরিমাণে কমবে। শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা সকলেই এই প্রস্তাবটিকে সাগ্রহে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, জর্মন এবং জাপানের সাহায্যে কোনোক্রমে এটাকে ধামাচাপা দিয়ে দিলেন। যুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত আগাগোড়াই আই. এল্. ও.-র কাজকর্মে ব্রিটেন সমস্ত ব্যাপারে প্রগতি-বিরোধী মনোবৃত্তি দেখিয়ে আসছে।
মন্দা এবং সংকট পূথিবী জুড়েই দেখা দিয়েছে, তাই স্বভাবতই মনে হয় এর প্রতিকারটাও করতে হবে সবাই মিলে, একসঙ্গে সমস্ত পৃথিবীর জন্য। অনেক দেশই সকলকে একত্র করে কাজে নাবার একটা উপায় করা যায় কিনা তার পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে, এখন পর্যন্ত সে পথ খুঁজে কেউ পায় নি। অতএব একসঙ্গে সমস্ত পৃথিবীকে প্রতিকারের ব্যবস্থা হবে এ আশা পরিত্যাগ করে এখন প্রত্যেক দেশই তার নিজের মতো প্রতিকারের সন্ধান করছে, সে প্রতিকারের উপায় বলে জেনেছে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদকে। বলছে পৃথিবীর বাণিজ্য যদি শুকিয়ে মরে যায় যাক; আমরা অন্তত আমাদের নিজের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যটাকে আমাদের হাতেই রেখে দেব, বিদেশী পণ্যকে এদেশের বাজারে আসতে দেব না। রপ্তানি ব্যবসা কতদূর চলবে বলা কঠিন এবং চললেও তার পরিমাণের ঠিক নেই, অতএব প্রত্যেক দেশই তার নিজের মধ্যেকার বাজারটাকে মাল কাটাবার প্রধান বাজার বলে ধরে নিচ্ছে। বাণিজ্য-শুল্ক বসিয়ে বা বাড়িয়ে বিদেশী পণ্যকে দেশের বাইরে ঠেকিয়ে রাখবার চেষ্টা হয়েছে, সে চেষ্টা সফলও হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষতিও হয়েছে প্রচুর, কারণ প্রত্যেক দেশের বাণিজ্য-শুল্কই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথে একটা প্রতিবন্ধক। ইউরোপ, আমেরিকা, এবং কিছু পরিমাণে এশিয়াও এই-সব অত্যুচ্চ শুল্ক-প্রাচীরে ভরে উঠেছে। শুল্ক-প্রাচীরের আরেকটা ফল হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বৃদ্ধি, কারণ সে প্রাচীর বসানোর ফলে খাদ্য-সামগ্রী এবং প্রাচীর দিয়ে রক্ষিত সমস্ত জিনিসপত্রের দাম অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে। শুল্ক-প্রাচীর বসালেই দেশের মধ্যে একটা একচেটিয়া ব্যবসায়ের পত্তন হয়, বাইরে থেকে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব হওয়া অসম্ভব, অন্তত কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবসা একচেটিয়া হলে পণ্যের দাম বাড়বেই। শুল্ক-প্রাচীর গড়ে যে বিশেষ শিল্পটিকে রক্ষা করা হচ্ছে, সে রক্ষার ফলে তার হয়তো লাভ হয়—মানে তার মালিকদের হয়তো লাভ হয়। কিন্তু সে লাভ প্রধানত আসে, যারা সেই পণ্য কিনছে তাদের ঘাড় ভেঙে, কারণ তাদের সে পণ্য বেশী দরে কিনতে হয়। অতএব দেখছ, শুল্ক-প্রাচীর বসালে কয়েকটা শ্রেণীর লোকদের কিছুটা সুরাহা হয়, দেশে কতকগুলো কায়েমী স্বার্থেরও সৃষ্টি হয়, কারণ সে শুল্ক-প্রাচীরের ফলে যে শিল্পগুলির লাভ হচ্ছে তারা একে টিঁকিয়েই রাখতে চায়। ভারতবর্ষে বস্ত্রশিল্পকে রক্ষা করা হচ্ছে জাপানের কাপড়ের উপরে গুরুভার শুল্ক বসিয়ে। ভারতীয় কলওয়ালাদের এতে খুব সুবিধা হচ্ছে, কারণ এই শুল্ক না থাকলে তারা জাপানের সঙ্গে মোটেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে উঠত না; এই শুল্ক আছে বলে তারা কাপড়ের দামও বাড়িয়ে দিতে পারছে। এদেশের চিনি-শিল্পকেও এই ভাবে রক্ষা করা হচ্ছে; তার ফলে ভারতের সর্বত্র বহু সংখ্যক চিনির কল গজিয়ে উঠেছে,—বিশেষ করে যুক্তপ্রদেশে আর বিহারে। এমনি করে নূতন একটি কায়েমী স্বার্থের সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে; এখন যদি এই চিনি-শুল্কটি তুলে দেওয়া হয় তবে এদের স্বার্থে আঘাত লাগবে, নূতন চিনির কারখানাগুলোও সম্ভবত ভেঙে পড়বে।
দু’রকমের একচেটিয়া ব্যবসা বেড়ে উঠল: শুল্ক-প্রাচীরের দ্বারা যে-সব দেশ নিজদিগকে রক্ষা করছিল তাদের মধ্যে একচেটিয়া বহির্বাণিজ্য; আর প্রত্যেক দেশের মধ্যে একচেটিয়া কারবারের অভ্যুত্থান, সেখানে বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানগুলো ছোটো ছোটো প্রতিষ্ঠানগুলোকে গিলে খেয়ে ফেলল। একচেটিয়া ব্যবসায়ের বুদ্ধিটা অবশ্য অভিনব ব্যাপার কিছু নয়। বহু বছর ধরেই এটা ঘটে আসছিল, বিশ্বযুদ্ধেরও আগে থেকেই। এবার শুধু এর গতিটা দ্রুততর হল। শুল্ক-প্রাচীরও বহু দেশেই আগে থেকে বসানো ছিল। ইংলণ্ডই ছিল একমাত্র বড়ো দেশ যে এতদিন পর্যন্ত অবাধ-বাণিজ্যে নির্ভর করে এসেছে, শুল্ক-প্রাচীর বসায় নি। কিন্তু এবার তাকেও তার সে প্রাচীন প্রথা ভাঙতে হল, আমদানির পণ্যের উপরে শুল্ক বসিয়ে অন্যান্য দেশদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে দাঁড়াতে হল। এই শুল্ক বসানোর ফলে তার কতকগুলো শিল্পের দুর্গতির আপাতত একটা লাঘব হল।
কিন্তু স্থানীয় এবং সাময়িক নিষ্কৃতি একটুখানি মিললেও, আসলে এর ফলে সমগ্র পৃথিবীর দুর্দশা আরও বেড়ে উঠল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ তো এতে আরও কমে গেলই; শুধু তাই নয়, ধনবণ্টনে যে বৈষম্য পৃথিবীতে ছিল সেটাও এর ফলে আরও ভালো করে টিঁকে রইল, বেড়ে চলল। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশদের মধ্যে এর ফলে সারাক্ষণ ঠোকাঠুকি চলতে লাগল, প্রত্যেকেই অন্যের পণ্যের বিরুদ্ধে তার শুল্কের প্রাচীর আরও উচু করে গেঁথে তুলতে লাগল—এর নাম দেওয়া হয়েছে শুল্ক-যুদ্ধ। পৃথিবীব্যাপী বাজারের সংখ্যা দিন দিন কমতে লাগল, প্রত্যেক দেশের বাজার ক্রমেই বেশি করে রক্ষার প্রাচীরে আট্কা পড়তে লাগল; তারই সঙ্গে সঙ্গে সে বাজারে ঢুকবার জন্য ঠেলাঠেলিরও তীব্রতা বাড়তে লাগল; মনিবরা ক্রমেই শ্রমিকদের মাইনে আরও ছেঁটে দেবার চেষ্টা করতে লাগল, তা নইলে তারা অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে উঠছে না। অতএব তার ফলে মন্দা ক্রমেই বেড়ে চলল, বেকারদের সংখ্যাও বেড়ে চলল। প্রতিবারে বেতন কাটার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রমিকদের ক্রয়-ক্ষমতাও আরও কমে যেতে লাগল।