বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/সমদ্রপথের আবিষ্কার
৭৩
সমুদ্রপথের আবিষ্কার
আমরা এখন ইউরোপের এমন একটা অবস্থায় পৌঁচেছি যখন মধ্যযুগের অবসান ঘটতে আরম্ভ হয়েছে, এবং তার স্থানে এক নূতন যুগ নূতন জীবনপদ্ধতির আবির্ভাব দেখা দিয়েছে। প্রচলিত অবস্থার বিরুদ্ধে তখন যে ক্ষোভ আর অসন্তোষ জেগেছে সেই হল পরিবর্তন ও প্রগতির জম্মদাতা। সামন্ততন্ত্র আর ধর্মনীতি যেসব শ্রেণীর শোষণ করছিল তাদের ভিতরে জাগল অসন্তোষ। আমরা কৃষক-বিদ্রোহ, অথবা ফরাসি ভাষায় যাকে ‘জ্যাকোয়ারি’ (জ্যাকোয়েস-নামক একটি ফরাসি চাষির নাম থেকে) বলা হয়, ঘটতে দেখেছি। কিন্তু কৃষকরা তখনও অত্যন্ত অনুন্নত ও দুর্বল থাকায় বিদ্রোহ করেও বিশেষ লাভ হয় নি। তাদের দিন তখনও আসে নি। আসল বিরোধ ছিল পুরোনো সামন্তশ্রেণী ও নূতন পুর্ণজাগরিত মধ্যবিত্তশ্রেণীর মধ্যে। শেষোক্ত শ্রেণীর ক্ষমতা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সামন্তযুগের পদ্ধতিতে ধনসম্পত্তি ছিল ভূমির উপরে প্রতিষ্ঠিত, আসলে ভূমিই ছিল ধনসম্পদ। কিন্তু এখন যে নূতন সম্পদ আহরিত হতে লাগল তার সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক নেই। এটা হল যন্ত্রশিল্প ও বাণিজ্যের দান, এর থেকেই লাভবান হয়ে নূতন মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল। সামন্ত ও মধ্যবিত্তশ্রেণীর এই সংঘাত অনেক দিন আগেই শুরু হয়েছিল। এখন যেটা দেখছি সেটা শুধু উভয় দলের পারস্পরিক অবস্থার পরিবর্তন। সে সমস্ত নীতি এখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, আর মধ্যবিত্তশ্রেণী নবলব্ধ শক্তির আশ্বাসে আক্রমণাত্মক পন্থায় চলেছে। শত শত বৎসর ধরে চলেছে এই সংগ্রাম, আর তাতে মধ্যবিত্তশ্রেণীই উত্তরোত্তর জয়ী হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই সংগ্রামের তীব্রতার কমবেশি দেখা গেছে। পূর্ব-ইউরোপে সংগ্রাম খুবই কম হয়। পশ্চিম ইউরোপেই মধ্যবিত্তশ্রেণী প্রথম প্রাধান্য লাভ করে।
প্রাচীন বাধানিষেধের বেড়াজাল ভাঙতে পারলেই মানুষ বিজ্ঞানে, শিল্পে, সাহিত্যে, ভাস্কর্যে ও নব নব আবিষ্কারের পথে অগ্রসর হতে পারে। বন্ধনমুক্ত মানবাত্মা নিজেকে প্রসারিত করে, ব্যাপ্ত করে। ঠিক এমন করেই, যখন আমাদের দেশে স্বাধীনতা আসবে, আমাদের দেশবাসীর প্রতিভা চতুর্দিকে নিজেকে উজাড় করে দেবে।
চার্চের প্রভাব যত স্তিমিত হয়ে আসতে লাগল, লোকে ধর্মমন্দির বা চার্চ-নির্মাণে তত কম খরচ করতে শুরু করল। কত জায়গায় সুন্দর সুন্দর বাড়ি গড়ে উঠল, কিন্তু বেশির ভাগই টাউন হল বা সেইজাতীয়। ‘গথিক’ নির্মাণপদ্ধতি দূরীভূত হয়ে তার স্থলে এল নূতন এক ধরন।
কতকটা এইরকম সময়েই, যখন পাশ্চাত্য-ইউরোপ নূতন উদ্দীপনায় সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছে, পূর্ব দিক থেকে এল স্বর্ণরাজ্যের হাতছানি। মার্কোপোলো ও অন্যান্য পর্যটকদের ভারতবর্ষ ও চীন ভ্রমণের কাহিনী ইউরোপের কল্পনাশক্তিকে অস্থির করে তুলেছে, প্রাচ্যের প্রভূত ধনসম্পদের উত্তেজনায় অনেকেই নেমে এল সমুদ্রপথে। এই সময়েই ঘটল কন্স্টাণ্টিনোপ্লের পতন। পূর্ব দিকের স্থল ও জলপথ তখন তুর্কিরা নিয়ন্ত্রণ করছিল, বাণিজ্যকে তারা বেশি আমল দিত না। বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী ও বণিকসম্প্রদায় এতে চটে গেল। প্রাচ্যের-স্বর্ণ-কামী নূতন অভিযাত্রীদলও অত্যন্ত বিরক্ত হল। স্বর্ণময় প্রাচ্যদেশে পৌঁছনোর জন্যে তাই তারা নূতন পথের সন্ধান করতে লাগল।
ইস্কুলের সব মেয়েই তো জানে, পৃথিবীটা গোল আর সেটা সূর্যের চার দিকে প্রদক্ষিণ করে। এ তো আমরা সবাই বুঝতে পারি। কিন্তু বহুদিন আগে এটা এত স্পষ্ট ছিল না; বরং যারাই সাহস করে এ কথা ভাবত, চার্চ তাদের বিপদে ফেলত। কিন্তু চার্চের ভয় থাকা সত্ত্বেও ক্রমেই অধিকসংখ্যক লোক ‘পৃথিবীটা গোল’ এই সত্য বিশ্বাস করতে আরম্ভ করল। কেউ কেউ আবার ভাবল, পাথিবী যদি সতাই গোল হয় তবে অনবরত পশ্চিম দিক দিয়ে গিয়ে চীন ও ভারতবর্ষে পৌঁছনো নিশ্চয় সম্ভব। আবার অনেকে ভাবল, আফ্রিকা ঘুরে ভারতবর্ষে পৌঁছবে। তোমার নিশ্চয় মনে আছে, তখন সুয়েজ-খালের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, কাজেকাজেই ভূমধ্যসাগর থেকে কোনো জাহাজ লোহিতসাগরে পৌঁছতে পারত না। ভূমধ্যসাগর ও লোহিতসাগরের মধ্যবর্তী স্থলভাগটুকুতে মালপত্র ও ব্যবসায়সামগ্রী সম্ভবত উটের পিঠে চাপিয়ে পার করা হত এক সাগরের জাহাজ থেকে অন্য সাগরের জাহাজে। কিন্তু এইরকমভাবে আদানপ্রদানটা মোটেই সুবিধাজনক ছিল না। মিশর আর সিরিয়া তুর্কিদের অধীনে থাকায় এ পথটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু ভারতবর্ষের ধনসম্পদ পাশ্চাত্যের লোককে অনবরত আকর্ষণ করতে লাগল। স্পেন এবং পোর্তুগাল এই অনুসন্ধানী সমুদ্রযাত্রায় নেতৃত্ব গ্রহণ করল। স্পেন তখন গ্রানাডা থেকে মূর এবং সারাসেনদের অবশিষ্টাংশকে বিতাড়িত করছিল। অ্যারাগনের ফার্ডিনাণ্ড ও কাস্টিলের ইসাবেলা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়ে খৃষ্টধর্মাবলম্বী স্পেনকে যুক্ত করেন, এবং ১৪৯২ সালে, ইউরোপের অপর প্রান্তে তুর্কিরা কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ অধিকার করার প্রায় ৫০ বৎসর পরেই, আরবদের গ্রানাডার পতন হয়। অনতিকালের মধ্যেই স্পেন ইউরোপের এক বৃহৎ খৃষ্টধর্মী শক্তিতে পরিণত হয়।
পোর্তুগালবাসী যেতে চেষ্টা করল পূর্বদিকে, স্পেনবাসী গেল পশ্চিমে। ১৪৪৫ সালে পোর্তুগাল কর্তৃক বার্ড-অন্তরীপের আবিষ্কার এই প্রচেষ্টার পথে প্রথম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই অন্তরীপটি আফ্রিকার পশ্চিমতম প্রদেশে অবস্থিত। আফ্রিকার মানচিত্রের দিকে তাকাও, দেখবে, ইউরোপ থেকে এই অন্তরীপে যেতে হলে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যেতে হয়। আবার বার্ড অন্তরীপের কোণ ঘুরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে হয়। এই অন্তরীপ আবিষ্কারের পরে লোকের মনে আশার সঞ্চার হল; তারা ভাবল, এবার আফ্রিকাকে প্রদক্ষিণ করে ভারতবর্ষে পোঁছনো যাবে।
অবশ্য এই আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করতে আরও চল্লিশ বছর কেটে গেল। ১৪৮৬ সালে পোর্তুগালের বারথোলোমিউ ডিয়াজ আফ্রিকার দক্ষিণ অংশ ঘুরে যান। এই অংশের নাম ‘কেপ অব গুড হোপ’ বা উত্তমাশা অন্তরীপ। কয়েক বৎসরের মধ্যেই ভাস্কো-ডা-গামা নামে আর একজন পোর্তুগালবাসী এই আবিষ্কারের সুযোগ নেন, এবং উত্তমাশা অন্তরীপের পথে ভারতবর্ষে আসেন। তিনি ১৪৯৮ খৃষ্টাব্দে মালাবারের তীরে কালিকটে এসে পৌঁছন।
ভারতবর্ষে পৌঁছনোর প্রতিযোগিতায় পোর্তুগালই গেল জিতে। কিন্তু ইতিমধ্যে পৃথিবীর অপর প্রান্তে এমন সব বৃহৎ ঘটনা ঘটছিল যার থেকে স্পেন লাভবান হল। ক্রিস্টফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকায় উপস্থিত হন। কলম্বাস ছিলেন জেনোয়ার এক গরিব ঘরের ছেলে। পৃথিবীটা গোল জেনে তিনি পশ্চিমদিক দিয়ে জাহাজ চালিয়ে জাপান ও ভারতবর্ষে পৌঁছতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ভাবেন নি রাস্তাটা এতটা লম্বা হবে। তিনি বিভিন্ন রাজ-দরবারে ঘুরে ঘুরে রাজন্যদের তাঁর অনুসন্ধানী সমদ্রযাত্রার সাহায্য করতে অনুরোধ জানান। অবশেষে স্পেনের ফার্ডিনাণ্ড ও ইসাবেলা তাঁকে সাহায্য করতে রাজি হন, এবং কলম্বাস তিনটি ছোট জাহাজ আর অষ্টাশি জন লোক নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। অজানার উদ্দেশে এই পাড়ি-দেওয়াটা নিতান্তই দুঃসাহসিক হয়েছিল, কারণ সামনে কী কেউ জানে না। কিন্তু কলম্বাসের মনে যে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সেটা সত্যে পরিণত হল। উনসত্তর দিন সমুদ্রযাত্রার পর তাঁরা স্থলের নাগাল পেলেন।
কলম্বস ভাবলেন, এটাই বুঝি ভারতবর্ষ। আসলে সেটা ছিল ‘ওয়েস্ট ইণ্ডিজ’এর একটা দ্বীপ। কলম্বস কোনোদিন খাস আমেরিকায় পৌছতে পারেন নি, আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর বিশ্বাস ছিল, তিনি এশিয়ায় পৌঁচেছেন। তাঁর এই অদ্ভুত ভ্রান্ত বিশ্বাস আজও চলে আসছে, এই দ্বীপগুলিকে এখনও বলা হয় ‘ওয়েস্ট ইণ্ডিজ’ বা পশ্চিম-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের এখনও ‘ইণ্ডিয়ান’ অথবা ‘রেড ইণ্ডিয়ান’ বলা হয়ে থাকে।
কলম্বস ইউরোপে ফিরে এসে পরের বৎসরই আরও অনেক জাহাজ নিয়ে যাত্রা করেন। ভারতবর্ষে পৌঁছনোর নূতন রাস্তা আবিষ্কার (তাই ছিল লোকের বিশ্বাস) সারা ইউরোপকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। এর অল্প কিছু পবেই ভাস্কো-ডা-গামা তাঁর প্রাচ্যের সমুদ্রযাত্রা দ্রুত শেষ করে কালিকটে পৌঁছন। পূর্ব থেকে পশ্চিমে, যত নব নব আবিষ্কারের সংবাদ আসতে লাগল, ইউরোপের চঞ্চলতা ততই বর্ধিত হল। পোর্তুগাল ও স্পেন ছিল নবাবিষ্কৃত দেশে আবিষ্কার-বিস্তারের ব্যাপারে দুই প্রতিদ্বন্দী। পটভূমিতে তখন হল পোপের আবির্ভাব; স্পেন ও পোর্তুগালের দ্বন্দ্ব মিটমাট করে দিতে গিয়ে তিনি পরের কড়িতে দাতব্য শুরু করলেন। ১৪৯৩ সালে তিনি একটি অনুশাসন জারি করেন। এই অনুশাসনের নাম ‘বুল অব ডিমার্কেশন’, (পোপের অনুশাসনকে কোনো কারণে ‘বুল’ আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে) অর্থাৎ, সীমানা নির্ধারণের অনুশোসন। ‘আজোর’-এর এক শো ‘লীগ’ পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে তিনি একটা কাল্পনিক রেখা টানলেন এবং ঘোষণা করলেন যে, এই রেখার পূর্ব দিকে যত অখৃষ্টীয় জায়গা আছে তারা যাবে পোর্তুগালের অধিকারে, আর স্পেনের অধিকারে থাকবে রেখার পশ্চিমাংশ। ইউরোপ বাদে প্রায় সারা পৃথিবীটাকেই পোপ বিনা আয়াসে বিলিয়ে দিলেন। আজোরদ্বীপগুলি আটলাণ্টিক সমুদ্রে অবস্থিত, আর তাদের ১০০ ‘লীগ’ অর্থাৎ ৩০০ মাইল পশ্চিম দিয়ে যদি একটা রেখা টানা যায়, তা হলে পশ্চিম দিকে পরে সমগ্র উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অধিকাংশ। অতএব কার্যত পোপ স্পেনকে দান করলেন আমেরিকা, আর পোর্তুগালকে দান করলেন ভারতবর্ষ, চীন, জাপান এবং অন্যান প্রাচ্য-দেশগুলি, এমনকি সময় আফ্রিকাও!
পোর্তুগাল এই বিস্তৃত রাজ্যের উপর অধিকারস্থাপনে ব্যাপত হল। কাজটা সহজ নয়। কিছুটা অগ্রসর হয়ে পর্তুগীজরা পূর্বদিকে যেতে থাকল। ১৫১০ সালে তারা গোয়ায় এসে পোঁছয়। ১৫১১ সালে পৌছল মালয় উপদ্বীপের মালাক্কাতে; তার কিছু পরেই জাভায়; এবং ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে পৌঁছল চীনদেশে। এর অর্থ এই নয় যে, এসমস্ত জায়গাই তারা অধিকার করতে পেরেছিল। মাত্র কয়েকটা ছোটোখাটো জায়গায় তারা কিছুটা স্থান পায়। প্রাচ্যে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার বিষয় আমরা পরবর্তী কোনো চিঠিতে আলোচনা করব।
প্রাচ্যে আগত পর্তুগীজদের মধ্যে ফার্ডিনাণ্ড ম্যাগেলান নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। পর্তুগীজ প্রভুদের প্রসাদলাভে বঞ্চিত হয়ে তিনি ইউরোপে ফিরে আসেন, এবং স্পেনের প্রজা হন। উত্তমাশা অন্তরীপের পথে, পূর্বের সমুদ্রপথ দিয়ে তিনি ভারতবর্ষ ও প্রাচ্য-দ্বীপগুলিতে একবার এসেছিলেন। এখন তাঁর খেয়াল হল, পশ্চিমের পথ দিয়ে আমেরিকা হয়ে সেখানে যাবার। হয়তো তিনি জানতেন যে, কলম্বস-আবিষ্কৃত দেশ এশিয়া থেকে অনেক দূরে। এমনকি ১৫১৩ সালে ‘বালবোয়া’ নামে একজন স্পেনদেশবাসী মধ্য-আমেরিকায় পানামা পর্বতমালা পার হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পোঁচেছিল। যে কারণেই হোক, সে এর নাম দিয়েছিল ‘দক্ষিণ-সমুদ্র’, আর নব-আবিষ্কৃত সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে সে দাবি করেছিল যে, এই সমুদ্রধৌত যত দেশ আছে, সব তার প্রভু স্পেনের রাজার সম্পত্তি।
১৫১৯ সালে ম্যাগেলান তাঁর পশ্চিম-সমুদ্রযাত্রা শুরু করেন। এটাই পরে সবচেয়ে বৃহৎ সমুদ্রযাত্রা বলে প্রতিপন্ন হয়। তাঁর ছিল পাঁচটি জাহাজ ও ২৭০ জন লোক। তিনি আটলাণ্টিক পার হয়ে যান দক্ষিণ আমেরিকায়, এবং মহাদেশের শেষ প্রান্তে না পৌঁছনো পর্যন্ত ক্রমাগত দক্ষিণে যেতে থাকেন। পথে একটি জাহাজ নষ্ট হয় জলমগ্ন হয়ে, আর একটি জাহাজ পালিয়ে যায়। রইল তিনটি জাহাজ। এদের নিয়ে তিনি দক্ষিণ আমেরিকা ও একটি দ্বীপের মাঝখানের সংকীর্ণ একটি প্রণালী পার হয়ে অন্যদিকের মহাসমুদ্রে এসে পড়েন। এটাই হল প্রশান্ত মহাসাগর। আটলাণ্টিকের তুলনার খুব শান্ত ছিল বলেই ম্যাগেলান তার এইরকম নাম দিয়েছিলেন। প্রশান্ত মহাসাগরে পৌছতে তাঁর ঠিক চোদ্দ মাস লেগেছিল। আর যে প্রণালীটি তিনি পার হয়েছিলেন, তাঁর নামে তার নাম দেওয়া হল ‘স্ট্রেট অব ম্যাগেলান’।
তার পরে ম্যাগেলান এই অজানা সমুদ্রের মধ্য দিয়ে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে প্রথমে উত্তরে এবং পরে উত্তর-পশ্চিমে অগ্রসর হতে লাগলেন। সমুদ্রভ্রমণের এই অংশটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ানক। কেউ জানত না যে, এত বেশি সময়ের দরকার হবে। প্রায় চার মাস ধরে, সঠিকভাবে ঠিক ১০৮ দিন ধরে, তাঁদের প্রায় খাদ্যপানীয়হীন অবস্থায় মাঝ-সমুদ্রে ভাসতে হয়েছিল। অবশেষে বহু দুর্দশার পর তাঁরা ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে পৌঁছন। সেখানকার অধিবাসীরা তাঁদের বন্ধুভাবে গ্রহণ করে ও তাঁদের খাদ্য দেয়। এদের সঙ্গে তাঁদের উপহার বিনিময়ও হয়। কিন্তু স্পেনের লোকের স্বভাবই ছিল উগ্র আর উদ্ধত। দুই দলের সর্দারের মধ্যে একটা ছোটোখাটো যুদ্ধে জড়িত হয়ে ম্যাগেলান মারা যান। অন্যান্য বহু স্পেনীয় তাদের উগ্র স্বভাবের দোষে দ্বীপের লোকেদের হাতে মারা পড়ে।
স্পেনের লোকেরা তার পরে খুঁজতে বেরোল ‘স্পাইস আইল্যাণ্ড্স্, যেখান থেকে তাদের মূল্যবান মশলাপাতি আসত। আর-একটা জাহাজকেও শেষ করতে হল আগুনে পুড়িয়ে। বাকি রইল মাত্র দুটি। তখন ঠিক হল একটা জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে স্পেনে ফিরে যাবে, আরএকটা জাহাজ ফিরবে উত্তমাশা অন্তরীপের পথ ধরে। পূর্বোক্ত জাহাজটি বেশি দূর এগোবার আগেই পর্তুগীজরা তাদের বন্দী করে। কিন্তু অন্য জাহাজটি ভিটোরিয়া—চুপি চুপি আফ্রিকা ঘুরে ১৮ জন লোক নিয়ে পৌঁছল স্পেনের ‘সেডিল’-এ। তারা পৌঁছল ১৫২২ সালে, রওনা হবার ঠিক তিন বছর পরে। এইভাবে এই জাহাজটাই সর্বপ্রথম সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে এল।
ভিটোরিয়া জাহাজের কথা এত বেশি করে বলছি তার কারণ, এর সমুদ্রযাত্রাটা ছিল বড়ো চমৎকার। আমরা তো আজকাল কত আরামে সমুদ্র পার হই, বড়ো বড়ো জাহাজে লম্বা পথ পাড়ি দিই। কিন্তু ভাবো তো একবার সেইসব দিনের সমুদ্রযাত্রীর কথা, যারা সমস্ত বিপদ মাথায় করে অজানা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে তাদের পরবর্তীদের জন্যে কত সমুদ্রপথ আবিষ্কার করে গেছে। তখনকার দিনের স্পেন ও পোর্তুগালের লোকেরা উদ্ধত, অহংকারী এবং নিষ্ঠুর ছিল সত্যি; কিন্তু তাদের সাহস ছিল অদ্ভূত, আর ছিল অজানাকে জানবার দুর্দম আগ্রহ।
ম্যাগেলান যখন সারা পৃথিবী ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, কর্টেস তখন মেক্সিকো শহরে ঢুকে স্পেনের রাজার জনো ‘আজটেক’-সাম্রাজ্য জয় করছিলেন। এই সম্বন্ধে ও আমেরিকার ‘মায়া’সভ্যতা সম্বন্ধে তোমাকে আগেই কিছু কিছু বলেছি। কর্টেস্ মেক্সিকো পৌঁছলেন ১৫১৯ সালে। দক্ষিণ আমেরিকা ‘ইনকা’-সাম্রাজ্যে (এখন যেখানে পেরু) পিজারো পৌঁছলেন ১৫৩০ সালে। সাহস, স্পর্ধা, বিশ্বাসঘাতকতা ও নিষ্ঠুরতার সাহায্যে, আর দেশের আভ্যন্তরীণ বিবাদের সুযোগ নিয়ে, কর্টেস্ আর পিজারো দুই প্রাচীন সাম্রাজ্যকে লুপ্ত করতে সক্ষম হলেন। অবশ্য এই দুটি সাম্রাজ্যই খুব জীর্ণশীর্ণ হয়ে এসেছিল, আর কোনো কোনো বিষয়ে ছিল অত্যন্ত আদিম। তাই প্রথম ধাক্কাতেই তারা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো।
যে পথে বড়ো বড়ো অনুসন্ধানী আর আবিষ্কারক গিয়েছিলেন সেই পথে তাঁদের অনুসরণ করল লুণ্ঠনলোভী দুঃসাহসিক দস্যুর দল। বিশেষ করে স্পেনীয় আমেরিকাকেই এই দস্যুদলের হাতে দুর্ভোগ ভুগতে হয়েছিল, কলম্বসও এদের লাঞ্ছনার হাত থেকে উদ্ধার পান নি। সেই সময়েই পেরু আর মেক্সিকো থেকে স্পেনে অবিশ্রান্ত সোনা আর রূপোর সমাগম হচ্ছিল। ইউরোপের চোখ ধাঁধিয়ে প্রভূত পরিমাণ মূল্যবান ধাতু এসে স্পেনকে ইউরোপের মধ্যে বিরাট এক শক্তিতে পরিণত করল। এই সোনারূপো ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপের অন্যান্য দেশেও, আর এইভাবে প্রাচ্যদেশের উৎপন্নদ্রব্য ক্রয় করার জন্যে প্রচুর অর্থ এসে পড়ল।
পোর্তুগাল ও স্পেনের এই সাফল্য স্বভাবতই অন্যান্য দেশের লোকদের, বিশেষ করে ফ্রান্স, ইংলণ্ড, হল্যাণ্ড এবং উত্তর-জর্মনির শহরবাসীদের কল্পনারাজ্যে আগুনে ধরিয়ে দিল। প্রথমে তাদের প্রাণপণ প্রচেষ্টা হল উত্তরদিকের সমুদ্রপথে এশিয়া ও আমেরিকায় যাবার রাস্তা খুঁজে পাওয়া, নরওয়ের উত্তর হয়ে পূর্বদিকে, তার পর গ্রীনল্যাণ্ড ছুঁয়ে পশ্চিমে। কিন্তু প্রচেষ্টায় বিফল হয়ে তারা পরিচিত রাস্তাগুলিই গ্রহণ করল।
সে সময়টা কী আশ্চর্য সুন্দরই না ছিল, যখন মনে হত পৃথিবী কি তার সমস্ত ধনসম্পদ আর বিস্ময়ের ঝুলি উজাড় করে ঢেলে দিচ্ছে! একের পর এক হতে লাগল নব নব আবিষ্কার, কত অজানা মহাসমুদ্র, আর মহাদেশ, আর অপরিমিত ধনভাণ্ডার, সবাই যেন একটি যাদুমন্ত্রের অপেক্ষায় ছিল—‘চিচিং ফাঁক’। সারা আকাশ-বাতাস বুঝি ভরে ছিল সেই দুঃসাহসিক যাদুমন্ত্রের মায়াতে।
এখন পৃথিবীকে কত সংকীর্ণ মনে হয়, এখন যেন কিছুই আবিষ্কার করার নেই। কিন্তু তা তো সত্যি নয়। বিজ্ঞান যে আবিষ্কারের অজস্র পথ খুলে দিয়েছে, বন্ধুর যাত্রাপথের তো অভাব নেই—বিশেষ করে আজকের ভারতবর্ষে!