বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/সোভিয়েটের জয়লাভ

উইকিসংকলন থেকে

১৫২

সোভিয়েটের জয়লাভ

১১ই এপ্রিল, ১৯৩৩

 ১৯১৮ সনের জুলাই মাসে রাশিয়াতে অবস্থার বিস্ময়কর পরিবর্তন হল। বলশেভিকদের চার পাশ থেকে সংকটের বেড়াজাল ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। দক্ষিণে ইউক্রেন থেকে জর্মনরা আক্রমণের উদ্যোগ করছে; রাশিয়াতে আগে থেকেই বহুসংখ্যক চেকোস্লোভাকিয়ান যুদ্ধবন্দী ছিল, মিত্রপক্ষের উৎসাহ পেয়ে তারা মস্কোর দিকে অভিযান করল। ফ্রান্সে পশ্চিম-রণাঙ্গনের সর্বত্র জুড়ে তখনও মহাযুদ্ধ চলছে; অথচ সোভিয়েট রাশিয়াতে দেখা গেল আশ্চর্য ব্যাপার; সেখানে মিত্রপক্ষ আর জর্মনি, দু জনে যে যার স্বাধীন ভাবে একই কাজ করতে লেগে গেছে—সেটি হচ্ছে, বলশেভিকদের উচ্ছেদসাধন। জাতিগত বিদ্বেষই অত্যন্ত বিষদিগ্ধ এবং কুৎসিত ব্যাপার; জাতিগত বিদ্বেষের চেয়েও শ্রেণীগত বিদ্বেষের জোর কত বেশি হতে পারে এখানে আমরা তারই প্রমাণ দেখছি। সরকারিভাবে এরা কেউই রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল না; অন্য নানা প্রকারে সোভিয়েটকে উত্ত্যক্ত উৎপীড়িত করতে লাগল, বিশেষ করে বিপ্লববিরোধী নেতাদের উৎসাহিত করে এবং টাকাকড়ি অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তাদের সাহায্য করে। জারের আমলের প্রাচীন সেনাপতি যাঁরা ছিলেন তাঁদের অনেকে এবার সোভিয়েটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন।

 জার এবং তাঁর পরিবারবর্গকে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলে উরালপর্বতের কাছে এক জায়গাতে বন্দী করে রাখা হয়েছিল; তাঁদের ভার ছিল সেখানকার সোভিয়েটের হাতে। চেক সৈনারা এই প্রদেশে এগিয়ে আসছে দেখে স্থানীয় সোভিয়েট ভয় পেয়ে গেল; ভূতপূর্ব জারকে তারা এসে মুক্ত করে দেবে এবং বিপ্লববিরোধীদের তিনি আবার একটা মস্তবড়ো অবলম্বন হয়ে উঠবেন, এই সম্ভাবনার কথা ভেবে তারা শঙ্কিত হয়ে উঠল। অতএব তারা নিজেদের বুদ্ধিমতো কাজ করে বসল, জারের সমস্ত পরিবারটিকেই হত্যা করল। সোভিয়েটের কেন্দ্রীয় কমিটি এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে দায়ী ছিলেন না বলেই মনে হয়; লেনিন নিজেও এর বিরোধী ছিলেন— আন্তর্জাতিক কুটনীতির দিক থেকে ভূতপূর্ব জারের এবং মানবোচিত করুণার দিক থেকে তাঁর পরিবারের প্রাণনাশ তিনি উচিত মনে করেন নি। তবুও কাজ যখন সম্পন্ন হয়েই গেছে তখন কেন্দ্রীয় সরকারও কাজেই সেটা অনুমোদন করলেন। সম্ভবত এরই ফলে মিত্রপক্ষীয় সরকাররা আরও বেশি বিচলিত হয়ে পড়লেন, তাঁদের বিদ্বেষ আরও তীব্র হয়ে উঠল।

 আগস্ট মাসে অবস্থা আরও খারাপ হল; দুটি ঘটনার ফলে লোকের মনে ক্রোধ হতাশা এবং ভয় অত্যন্ত বেড়ে গেল। এর একটি হচ্ছে লেনিনের প্রাণনাশের চেষ্টা; অন্যটি উত্তর-রাশিয়ার আর্চ-এঞ্জেল বন্দরে একটি মিত্রপক্ষীয় বাহিনীর অবতরণ। মস্কোতে অত্যন্ত উত্তেজনার সৃষ্টি হল; সকলেই ভাবল, সোভিয়েটের আয়ু শেষ হতে আর দেরি নেই। বস্তুত মস্কো শহরের চার দিকেই তখন শত্রুসেনারা এসে ঘিরে ধরেছে—জর্মন, চেক, বিপ্লববিরোধী, কেউই বাকি নেই। মস্কোর আশপাশে মাত্র সামান্য ক’টি জেলা তখন সোভিয়েট শাসনের অধীন। এর উপরে আবার মিত্রপক্ষের সেনা এসে হাজির হয়েছে দেখে সকলেই বুঝল, এবার আর মস্কোর রক্ষা নেই। বলশেভিকদের সেনাবাহিনী বলতে তেমন কিছুই ছিল না; ব্রেস্ট্‌লিটভস্কের সন্ধি হয়েছে মাত্র মাস-পাঁচেক আগে; আগেকার সেনাবাহিনী যা ছিল তার অধিকাংশই অন্তর্হিত হয়ে আবার কৃষিক্ষেত্রে গিয়ে জুটেছে। মস্কো-শহরের মধ্যেও তখন নানাবিধ চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্র চলেছে; সোভিয়েটের পতন আসন্ন বলে বুর্জোয়ারা খোলাখুলিই আনন্দ-উৎসব লাগিয়ে দিয়েছে।

 এমনিতর ভয়ানক ছিল সে দিন সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রের অবস্থা, তখন তার বয়স ন মাস মাত্র। হতাশায় ভয়ে বলশেভিকরা অভিভূত হয়ে পড়ল; স্থির করল, মরতে যখন হবেই দেখা যাচ্ছে তখন যুদ্ধ করেই মরব। কোণঠাসা বন্য জন্তুর মতো তারা পিছন ফিরে একেবারে শত্রুর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল—এর সওয়া শো বছর আগের তরুণ ফরাসি প্রজাতন্ত্রও ঠিক তাই করেছিল। এবার আর তারা কোনোরকম ক্ষমা দেখাবে না, দয়া দেখাবে না। সমস্ত দেশে সামরিক আইন জারি করা হল; সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় সোভিয়েট কমিটি ‘রক্ত বিভীষিকা’র নীতি ঘোষণা করল—‘সমস্ত দেশদ্রোহীকে বধ করা হবে, বিদেশী আক্রমণকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে কোনো দয়ামায়া দেখানো হবে না’। দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে তারা, এবার একই সঙ্গে দেশের ভিতরকার শত্রু এবং বাইরের শত্রুর সঙ্গে তাদের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে এক দিকে রইল সোভিয়েট, আর অন্য দিকে রইল সমস্ত পৃথিবী এবং রাশিয়ার নিজেরও বিপ্লববিরোধীরা। নূতন একটি কর্মধারার যুগ শুরু হল, একে বলা হয়েছে ‘সমরতন্ত্রী কমিউনিজ্‌ম্’। গোটা দেশটাকেই প্রায় একটা অবরুদ্ধ সেনাশিবিরে পরিণত করা হল। লালফৌজকে (Red Army) গড়ে তোলবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা চলতে লাগল; এর ভার দেওয়া হল ট্রট্‌স্কির হাতে।

 এটা মোটামুটি ১৯১৮ সনের সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসের কথা; পশ্চিম-রণাঙ্গনে তখন জর্মনদের রণসজ্জায় ভাঙন ধরেছে, যুদ্ধবিরতির কথাবার্তাও চলছে। প্রেসিডেণ্ট উইলসন তাঁর চৌদ্দ দফা শর্ত ঘোষণা করেছেন; লোকে মনে করছে, মিত্রপক্ষের মনের কথা তার মধ্যেই বলা হয়েছে। মজার কথা এই, এর মধ্যে একটি শর্ত ছিল, রাশিয়ার সমস্ত জায়গা থেকে বাইরের সেনা সরিয়ে আনতে হবে, অন্য সমস্ত দেশের সহায়তা নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলবার সম্পর্ণ সুযোগ রাশিয়াকে দিতে হবে। রাশিয়ার আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মিত্রপক্ষ হস্তক্ষেপ করছে, সেখানে তাদের সৈন্য নামিয়েছে। এগুলো এই শর্তটির অতি অপূর্ব ভাষ্য। বলশেভিক সরকার প্রেসিডেণ্ট উইলসনকে একটি চিঠি পাঠালেন, তাতে তাঁর ‘চৌদ্দ দফা’ শর্তের অত্যন্ত কটু সমালোচনা করলেন। এই চিঠিতে তাঁরা বললেন: “পোল্যাণ্ড সার্বিয়া বেলজিয়াম স্বাধীন হবে, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির লোকেরা স্বাধীনতা অর্জন করবে, এই দাবি আপনি করছেন......কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আপনার এই দাবির মধ্যে আয়ার্ল্যাণ্ড মিশর ভারতবর্ষ, এমনকি ফিলিপাইন-দ্বীপপুঞ্জকেও স্বাধীনতা দেবার কোনো ইঙ্গিত আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।”

 মিত্রপক্ষের সঙ্গে জর্মনির সন্ধি হল, ১৯১৮ সনের ১১ই নভেম্বর এঁরা যুদ্ধবিরতি-পত্রে স্বাক্ষর করলেন। রাশিয়াতে কিন্তু গোটা ১৯১৯ এবং ১৯২০ সন ধরেই গৃহযুদ্ধ চলতে লাগল। অসংখ্য শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সোভিয়েট একাই লড়তে লাগল। একবার তো সতেরোটি বিভিন্ন দিক থেকে একই সঙ্গে লালফৌজের উপর আরমণ করা হল। ইংলণ্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, সার্বিয়া চেকোস্লোভাকিয়া, রুমানিয়া, বাল্‌টিক-অঞ্চলের রাজ্যগুলি, পোল্যাণ্ড এবং রাশিয়ারই অগুন্‌তি বিপ্লববিরোধী সেনাপতি—সবাই সোভিয়েটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে; সাইবেরিয়ার পূর্বপ্রান্ত থেকে শুরু করে বাল্‌টিক সাগর এবং ক্রিমিয়া পর্যন্ত সর্বব্যাপী যুদ্ধ চলেছে। বরাবর লোকের মনে হল, সোভিয়েটের এবার শেষ। মস্কো-শহর পর্যন্ত শত্রুরা আক্রমণ করতে উদ্যত হল, পেট্রোগ্রাড-শহর তো একেবারেই শত্রুদের হাতে পড়বার উপক্রম হল; তবু সমস্ত সংকট সমস্ত বিপদ উত্তীর্ণ হয়ে চলল সোভিয়েট। এক-একটি সংকটে জয়লাভ করবার সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মপ্রত্যয় এবং শক্তিও অনেকখানি করে বাড়তে লাগল।

 বিপ্লববিরোধীদের একজন নেতা ছিলেন অ্যাডমিরাল কোল্‌চাক। তিনি নিজেকে রাশিয়ার শাসক বলে অভিহিত করলেন, মিত্রপক্ষও বাস্তবিকই তাঁকে তাই বলেই স্বীকার করে নিল, প্রচুরপরিমাণে সাহায্য করতে লাগল। সাইবেরিয়াতে তিনি যে আচরণ দেখিয়েছিলেন, তাঁরই একজন মিত্রের বর্ণনা থেকে আমরা তার পরিচয় পাই। এই লোকটির নাম জেনারেল গ্রেভ্‌স্‌, যুক্তরাষ্ট্রের যে সেনাবাহিনীটি কোল্‌চাকের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করছিল ইনি ছিলেন তার অধিনায়ক। এই আমেরিকান সেনাপতিটি বলেছেন:

 বহু ভয়াবহ নরহত্যা করা হয়েছিল; সে হত্যা বলশেভিকদের অনুষ্ঠিত নয়, যদিও পৃথিবীর লোকে এটা তাদেরই কাজ বলে জানে। বলশেভিকরা যে কজন লোক হত্যা করেছে তার জনপ্রতি একশো মানুষ পূর্ব-সাইবেরিয়াতে নিহত হয়েছে বলশেভিক-বিরোধীদের হাতে, এ কথা বললে আমি বিন্দুমাত্র অত্যুক্তির অপরাধে অপরাধী হব না।”

 বড়ো বড়ো রাষ্ট্রনীতিবিদ্‌রা বড়ো বড়ো জাতির ভাগ্যকে পরিচালনা করেন, পৃথিবীতে যুদ্ধ এবং শান্তির সৃষ্টি করেন কী সব জ্ঞান আর খবরের উপর নির্ভর করে সেটা এক মজার ব্যাপার। এই সময়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লয়েড জর্জ, তখন বোধ হয় সমগ্র ইউরোপের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বাপেক্ষা শক্তিমান ব্যক্তি। ব্রিটেনের হাউজ অব কমন্‌সে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি কোল্‌চাক এবং রাশিয়ার অন্যান্য সেনাপতিদের নাম উল্লেখ করছিলেন। এদেরই সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে তিনি নাম করলেন ‘জেনারেল খারকভ’-এর। খারকভ অবশ্য সেনাপতি নন, একটি বড়ো শহর, ইউক্রেনের রাজধানী। প্রাথমিক ভূগোলের এই সামান্য জ্ঞানটুকুও রাষ্ট্রনীতির এই-সব মহারথীদের ছিল না, অবশ্য তাই বলে ইউরোপকে কেটে টুক্‌রো টুক্‌রো করতে বা এর সম্পূর্ণ নূতন একটা মানচিত্র প্রণয়ণে এঁদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় নি।

 রাশিয়ার চার দিক ঘিরে মিত্রপক্ষ অবরোধও বসিয়ে দিল; এই অবরোধ এত প্রচণ্ড ছিল যে সমস্ত ১৯১৯ সনের মধ্যে রাশিয়া বাইরের কোনো দেশের সঙ্গে কিছুমাত্র পণ্য কেনাবেচা করতে পারে নি।

 অথচ এত-সমস্ত প্রচণ্ড বাধাবিপত্তি, এত অসংখ্য শক্তিমান শত্রুসেনার সঙ্গে লড়াই করেও সোভিয়েট রাশিয়া শেষ পর্যন্ত বেঁচে রইল, জয়লাভ করল। ইতিহাসে যত অপূর্ব বীরত্বের কাহিনী আছে এটি তার অন্যতম। এটা করল তারা কিসের জোরে? এ কথা অবশ্য নিঃসন্দেহ মিত্রপক্ষের জাতিরা যদি একত্র হয়ে বলশেভিকদের চূর্ণ করবার জন্য উদ্যোগ করতে পারত তা হলে প্রথম দিকেই বলশেভিকদের শেষ হয়ে যেত। জর্মনি উচ্ছন্ন হয়ে গেছে; তখন তাদের হাতে অজস্র সৈন্য, কিন্তু সে সেনাকে তখনই আবার অন্যত্র এবং বিশেষ করে সোভিয়েটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানো তত সহজ ছিল না। সৈন্যরা সকলেই তখন রণশ্রান্ত; সেই সময়ে আবার নূতন করে আর-একটা যুদ্ধ করতে বললে তারা সবাই অস্বীকার করে বসত। তা ছাড়া সকল দেশেরই শ্রমিকদের মনে নবজাত রাশিয়ার প্রতি একটা বিপুল সহানুভূতি দেখা দিয়েছিল; সোভিয়েটের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করলে তাদের নিজেদের দেশের মধ্যেই হাঙ্গামা বেধে যাবে, এ ভয়ও মিত্রপক্ষের সরকাররা না করে পারছিলেন না। এমনিতেই তখন ইউরোপের সর্বত্র বিদ্রোহের আভাস পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, মিত্রপক্ষের দেশদের মধ্যেও পরস্পর-রেষারেষির কিছু অভাব ছিল না। যুদ্ধ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে এরা নিজেদের মধ্যে খোঁচাখুঁচি শুরু করে দিয়েছিল। এইসমস্ত ব্যাপারের দরুনই এরা তেমন জোর করে বলশেভিকদের উচ্ছেদসাধনে ব্রতী হতে পারে নি। চাইছিল, নিজেরা সামনে না এসে, যতটা সম্ভব আড়ালে-আবডালে থেকেই কাজ উদ্ধার করবে, এদের হয়ে অন্যদের যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাবে এবং নিজেরা শুধু পিছন থেকে তাদের টাকাকড়ি অস্ত্রশস্ত্র আর বিচক্ষণ পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবে। সোভিয়েটের আয়ুর জোর বেশি নয়, এ বিষয়ে এদের মনে সন্দেহমাত্র ছিল না।

 সোভিয়েটের এতে নিশ্চয়ই খুব সুবিধা হয়ে গিয়েছিল, তারা নিজেদের শক্তি গুছিয়ে বাড়িয়ে নেবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তবুও শুধু বাইরের পরিবেশের এইসব সুবিধার জনাই জয়লাভ তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল এ কথা মনে করলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। মুখ্যত এদের জয় হয়েছিল রাশিয়ার জনসাধারণের আত্মপ্রত্যয়, দৃঢ় বিশ্বাস, আত্মোৎসর্গ এবং অদম্য সংকল্পের বলে। এবং সবচেয়ে অশ্চর্য কথা হচ্ছে এই, এই জাতটাকে পৃথিবীর সর্বত্রই লোকে জানত অলস, অজ্ঞ, দূর্বলচেতা এবং কোনোরকম বৃহৎ উদ্যমের অনুপযুক্ত বলে—সে ধারণা একেবারে মিথ্যাও ছিল না। স্বাধীনতা আসলে একটা অভ্যাস; দীর্ঘকাল এতে বঞ্চিত হয়ে থাকলে আমরা ক্রমে এর নামই ভুলে যাই। রাশিয়ার এই অজ্ঞ কৃষক আর শ্রমিকরা—এদের সে বস্তুতে অভ্যস্ত হবার বিশেষ কারণ কোনোদিন ঘটে নি। তবুও সেদিনের রাশিয়াতে নেতারা এমনই কর্মপটু ছিলেন যে এই দীনহীন জনতাকেও গড়ে তুলে তাঁরা একটি শক্তিশালী সুসংহত জাতিতে পরিণত করেছিলেন; তাদের লক্ষ্যে তাদের সবল বিশ্বাস, নিজের শক্তিতে তাদের অগাধ নির্ভর। কোল্‌চাকরা এবং তাঁদের সমধর্মী বিরোধীরা যে পরাজিত হয়েছিলেন সে কেবল বলশেভিক নেতারা কর্মদক্ষ এবং দঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন বলে নয়, রাশিয়ার কৃষকরা আর তাঁদের সহ্য করতে রাজি হল না বলেও। কৃষক জানত— তার হাতে সদ্য যে খানিকটা জমি এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা এসে পড়েছে, এই কোল্‌চাকরা, পুরোনো দিনের ব্যবস্থার প্রতিনিধি, তাদের সে জমি এবং সুবিধা আবার কেড়ে নিতেই এসেছে। অতএব সেও স্থির করল, প্রাণ দিয়েও সে একে রক্ষা করবে।

 আর সকলের উপরে ছিলেন লেনিন স্বয়ং। তাঁর অধিনায়কত্বে আপত্তি বা সংশয় প্রকাশ করতে পারে এমন কেউ ছিল না। রাশিয়ার প্রজারা তাঁকে জেনে নিয়েছিল একজন অর্ধদেবতা বলে—আশা এবং নির্ভরের প্রতীক তিনি; তিনিই জ্ঞানীপুরুষ, যিনি প্রতিটি সংকটে তাদের উদ্ধার করবার উপায় জানেন; কোনো বিপদেই যিনি বিভ্রান্ত বা বিচলিত হন না। তখনকার দিনে (এখন রাশিয়াতে তাঁর প্রতিষ্ঠা নষ্ট হয়েছে) লেনিনের ঠিক পরেই স্থান ছিল ট্রট্‌স্কির—লেখক এবং বক্তা ট্রট্‌স্কি, যুদ্ধ সম্বন্ধে তাঁর আগের অভিজ্ঞতা কিছুমাত্র নেই, অথচ তখন তিনিই গৃহযুদ্ধ এবং অবরোধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলার কাজে ব্রতী হয়েছেন। ট্রট্‌স্কির ছিল দুরন্ত দুঃসাহস, যুদ্ধে তিনি বহুবার নিজের জীবন বিপন্ন করেছেন। কারও মধ্যে কাপুরুষতা বা শৃঙ্খলাজ্ঞানের অভাব দেখলে তিনি তাকে তিল মাত্র দয়া দেখাতেন না। গৃহযুদ্ধের একটি সংকট-মুহূর্তে তিনি এই আদেশ জারি করেছিলেন:

 “আমি সকলকে সতর্ক করে দিচ্ছি, যদি কোনো সেনাদল বিনা আদেশে রণক্ষেত্র থেকে পশ্চাদপসরণ করে তবে সর্বপ্রথম সেই দলের কমিশারীকে এবং তার পরেই তার সেনানায়ককে গুলি করে মারা হবে; তাদের স্থানে অন্য সাহসী এবং বীর সৈনিককে নিযুক্ত করা হবে। কাপরুষ ভীরু এবং বিশ্বাসঘাতকরা কিছুতেই মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি পাবে না। সমগ্র লাল ফৌজের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমি এই স্থির সংকল্প করছি।”

 এই কথা তিনি পালনও করেছিলেন। ১৯১৯ সনের অক্টোবর মাসে প্রচারিত ট্রট্‌স্কির আর-একটি বিজ্ঞপ্তিও আমাদের প্রণিধানের যোগ্য; এতে দেখা যায়, বলশেভিকরা সর্বদাই প্রজাসাধারণ আর ধনিকতন্ত্রী সরকারের মধ্যের তফাতটা মনে রাখত, তারা কোনো দিনই খাঁটি জাতীয়তাবাদী বলে নিজেকে পরিচিত করে নি। এই বিজ্ঞপ্তিটি হচ্ছে:

 “কিন্তু আজ এই মুহূর্তে, যখন ইংলণ্ডের ভাড়াটে যোদ্ধা জুডেনিক-এর সঙ্গে আমরা তীব্র সংগ্রামে লিপ্ত, এই মুহূর্তেও আমি বলছি, তোমাদের এ কথা কখনোই ভুললে চলবে না যে আসলে ইংলণ্ড আছে দুটি। একটি ইংলণ্ড তার লাভান্বেষণ, অত্যাচার, ঘুষ আর রক্তপিপাসুতার জন্য প্রসিদ্ধ; কিন্তু ঠিক তারই পাশাপাশি আরও একটি ইংলণ্ড আছে, সে ইংলণ্ড শ্রমিকদের ইংলণ্ড, আধ্যাত্মিক শক্তির দেশ ইংলণ্ড, আন্তর্জাতিক ঐক্যবন্ধনের উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত ইংলণ্ড। আমাদের সঙ্গে যে যুদ্ধ করছে সে হচ্ছে নীচ এবং অসাধুর দেশ ইংলণ্ড, তার জীবনসূত্র নিয়ন্ত্রিত করে ব্যবসার বাজারের ফড়িয়ারা। কিন্তু শ্রমিকদের ইংলণ্ড এবং জনসাধারণের ইংলণ্ড আমাদেরই পক্ষ সমর্থন করছে।”

 কী অটল সংকল্প নিয়ে লালফৌজকে যুদ্ধক্ষেত্রে চালানো হত তার কিছুটা পরিচয় পাওয়া যাবে পেট্রোগ্রাড শহর রক্ষা করবার সিদ্ধান্ত থেকে। পেট্রোগ্রাড তখন জুডেনিক-এর হাতে পড়বার আসন্ন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। দেশরক্ষা-সমিতি (Council of Defence) আদেশ জারি করলেন—“শেষ রক্তবিন্দুটি পর্যন্ত ঢেলে দিয়ে পেট্রোগ্রাডকে রক্ষা করতে হবে, এক পাও পিছনে হটলে চলবে না, শহরের প্রতিটি রাস্তায় পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে হবে।

 রাশিয়ার প্রসিদ্ধ লেখক গোর্কি বলেছেন, লেনিন নাকি একবার ট্রট্‌স্কির সম্বন্ধে ছিলেন:

 “বেশ তো, আমাকে এমন আর একজন লোক দেখাও যে একটি বৎসরের মধ্যে একটি প্রায় ত্রুটিহীন সেনাবাহিনী গড়ে তুলবে এবং তারই সঙ্গে সঙ্গে সমরনীতি-বিশারদগণেরও দৃষ্টিতে মর্যাদা অর্জন করবে। সেই রকমের একটি লোক আমাদের আছে। আমাদের সমস্ত কিছুই আছে। এখনও আরও বহু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটবে, দেখো।”

 এই লালফৌজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেড়ে উঠল। ১৯১৭ সনের ডিসেম্বর মাসে, বলশেভিকরা ক্ষমতা হস্তগত করবার ঠিক পরে, এই বাহিনীর লোকসংখ্যা ছিল ৪,৩৫,০০০। ব্রেস্ট্‌লিটভস্কের সন্ধির পরে নিশ্চয়ই এর মধ্যে অনেক লোক সরে পড়েছিল এবং বাহিনীটিকে আবার নতন করে গড়ে তুলতে হয়েছিল। ১৯১৯ সনের মাঝামাঝি সময়ে এর লোকসংখ্যা হল ১৫,০০,০০০। ঠিক একবছর পরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৫৩,০০,০০০।

 ১৯১৯ সনের শেষাশেষি দেখা গেল, গহযুদ্ধে সোভিয়েট তার শত্রুদের নিঃসংশয়ে কাবু করে এনেছে। তার পরেও অবশ্য আরও এক বছর ধরে যুদ্ধ চলল; বহু বার বহু সংকটমুহূর্তও এসে উপস্থিত হল। ১৯২০ সনে নবসৃষ্ট পোল্যাণ্ড-রাজ্য (জর্মনদের পরাজয়ের পর নূতন করে একে গড়া হয়েছিল) রাশিয়ার সঙ্গে এসে ঝগড়া বাধাল, দুয়ের মধ্যে যুদ্ধ লাগল। ১৯২০ সনের শেষ দিকে এসে এই সমস্ত যুদ্ধই বস্তুত শেষ হয়ে গেল; এতদিনে রাশিয়ার অদৃষ্টে একটু শান্তির দেখা মিলল।

 ইতিমধ্যে দেশের মধ্যেও নানা বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ অবরোধ ব্যাধি আর দুর্ভিক্ষের ফলে দেশের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছে। পণ্য-উৎপাদন অনেক কমে গেছে। কারণ পরস্পরবিরোধী সেনাদল বারবার ক্ষেত আর কারখানার উপর দিয়ে যাতায়াত করতে লাগল, কৃষকরা জমি চাষ করতে পারে না, শ্রমিকরাও কারখানা চালাতে পারে না। “সমরতন্ত্রী কমিউনিজ্‌মের” জোরে দেশটা কোনোমতে এতদিন সামলে চলে এসেছে। কিন্তু প্রত্যেকেই ক্রমাগত কম-খাওয়া অভ্যাস করতে করতে চলতে হয়েছে, এখন সেটা সকলের পক্ষেই প্রায় অসহ্য হয়ে উঠেছে। চাষিরা বেশি ফসল উৎপাদন করতে চায় না; বলে, দেশে সামরিক কমিউনিজ্‌মের রাজত্ব চলেছে, যেটুকু বাড়তি ফসল তারা উৎপাদন করবে তাই তো রাষ্ট্র কেড়ে নিয়ে যাবে তবে আর অত হাঙ্গামা করে তাদের কী লাভ? দেশে ক্রমশই একটা অত্যন্ত কঠিন এবং বিপজ্জনক অবস্থা আসন্ন হয়ে উঠছে। পেট্রোগ্রাডের কাছে ক্রন্‌স্টাডে নাবিকরা বিদ্রোহ পর্যন্ত করল, খোদ পেট্রোগ্রাড শহরেও শ্রমিকদের ধর্মঘট হল।

 মূল কর্মনীতিকে বর্তমান অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে প্রয়োগ করার ব্যাপারে লেনিনের অপূর্ব প্রতিভা; তিনি অবিলম্বে এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করলেন। সমরতন্ত্রী কমিউনিজ্‌ম্ তিনি বন্ধ করে দিলেন; নূতন একটি নীতির প্রবর্তন করলেন, এর নাম হল নূতন অর্থনৈতিক নীতি বা (New Economic Policy), সংক্ষেপে NEP (কথাকটির প্রথম অক্ষর নিয়ে)। কৃষকরা এতে ফসল উৎপাদন এবং বিক্রয় করবার অনেক বেশি স্বাধীনতা পেয়ে গেল; ব্যক্তিগতভাবে কিছু কিছু ব্যবসাবাণিজ্য চালাবার অধিকারও এতে লোককে দেওয়া হল। কমিউনিজ্‌মের খুব খাঁটি নীতির এটা কিছুটা ব্যতিক্রম; কিন্তু লেনিন এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বললেন, এটা একটা সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। লোকের দুঃখকষ্টের অনেকখানি লাঘব এতে হল, সন্দেহ নেই। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই রাশিয়াকে আবার একটা ভয়ংকর দুর্বিপাকের মধ্যে পড়তে হল। দেশে একটা প্রচণ্ড অনাবৃষ্টি হল, রাশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অতি বিস্তীর্ণ স্থানের ফসল একেবারে নষ্ট হয়ে গেল এবং তার ফলে এল দুর্ভিক্ষ। অতি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, এত বড়ো দুর্ভিক্ষের কথা খুব বেশি শোনা যায় না—বহু লক্ষ লোক এই দুর্ভিক্ষে মারা গেল। এর ঠিক আগেই দেশে একটানা বহু বছর ধরে যুদ্ধ চলেছে, চলেছে গহযুদ্ধ, অবরোধ আর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা; তার উপর আবার সোভিয়েট সরকার তখন পর্যন্ত শান্তিকালীন কার্যকলাপের দিকে মন দেবারও সময় পায় নি—কাজেই মাঝখানে এই নিদারুণ দুর্ভিক্ষের আঘাতে শাসনব্যবস্থা একেবারে ভেঙেচুরে পড়া কিছুই বিচিত্র ছিল না। তবু কিন্তু আগেকার বহু বিপদের মতো এই বিপদকেও সোভিয়েট উত্তীর্ণ হয়ে এল। এই দুর্ভিক্ষে রাশিয়াকে সাহায্য করতে কে কী দিতে পারে তার আলোচনা করবার জন্য ইউরোপের সমস্ত দেশদের প্রতিনিধি নিয়ে একটি মন্ত্রণাসভা বসল। এরা ঘোষণা করলেন, অতীতে জাররা এদের কাছে যত ঋণ করেছিলেন সোভিয়েট সে ঋণ শোধ করতে অস্বীকার করেছে; এখন সেই ঋণ যদি সে শোধ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয় তবেই তাঁরা তাকে সাহায্য করতে পারেন, নইলে নয়। মানবধর্মীর চেয়ে বড়ো হয়ে উঠল মহাজনের প্রবৃত্তি; অনাহারে মুমূর্ষু শিশুদের জন্য খাদ্য চেয়ে রাশিয়ার মায়েরা যে মর্মভেদী আবেদন জানাল তাতেও এরা কেউ কর্ণপাত করল না। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এরকমের কোনো শর্ত খাড়া করল না, রাশিয়াকে অনেকখানি সাহাযা সে পাঠাল।

 ইংলণ্ড এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো রাশিয়ার দুর্ভিক্ষে তাকে সাহায্য করতে অস্বীকার করল; অথচ ঠিক সেই সময়েও কিন্তু অন্যান্য ব্যাপারে তারা রাশিয়ার সংশ্রব বর্জন করছিল না। ১৯২১ সনের প্রথম দিকে ইংলণ্ড এবং রাশিয়ার মধ্যে একটা বাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল; দেখাদেখি আরও বহু দেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য-চুক্তি স্বাক্ষর করল।

 চীন, তুরস্ক, পারশ্য এবং আফগানিস্তান প্রভৃতি প্রাচ্য দেশগুলোর প্রতি সোভিয়েট অভ্যন্ত উদার নীতি অবলম্বন করল। জারেরা এই সব দেশে যে-সব সুযোগ-সুবিধা আদায় ক’রে নিয়েছিলেন সোভিয়েট সে-সব ছেড়ে দিল। এদের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করল। সোভিয়েটের নীতি ছিল সমস্ত পরাধীন এবং শোষিত জাতির স্বাধীনতা অর্জন, এটা সেই নীতিরই ফল। কিন্তু তার চেয়ে আরও বড়ো একটা উদ্দেশ্য সোভিয়েটের ছিল, সে হচ্ছে তাদের নিজের অবস্থাটা একটু মজবুত করে নেওয়া। সোভিয়েট রাশিয়ার এই উদার নীতির ফলে ইংলণ্ড প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো অনেক সময় বড়ো বিব্রত হয়ে পড়ছিল, প্রাচ্য দেশগুলিতে এদের দুই পক্ষের মধ্যে যে তুলনা করা হত তাতে ইংলণ্ড এবং অন্যান্য বড়ো দেশগুলো হীন প্রতিপন্ন হয়ে যেত।

 ১৯১৯ সনে আরও একটি বড়ো ঘটনা হয়, এর কথা তোমাকে বলা দরকার। এটি হচ্ছে কমিউনিস্ট দল কর্তৃক মস্কোতে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের প্রতিষ্ঠা। আগের কয়েকটি চিঠিতে আমি তোমাকে প্রথম এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের কথা বলেছি। প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কার্ল মার্ক্‌স্‌; আর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অনেক বড়ো বড়ো কথা বলে, শেষে ১৯১৪ সনের যুদ্ধ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙেচুরে যায়। এই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক যাদের সৃষ্টি সেই পুরোনো কর্মীরা এবং সমাজতন্ত্রবাদী দলগুলো শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, এই ছিল বলশেভিকদের মত। অতএব তারা তৃতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা করল। এর দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষরূপেই বিপ্লবাত্মক, এবং এর উদ্দেশ্য ধনিকতন্ত্র আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানো, যে সুবিধাবাদী সমাজতন্ত্রী মধ্য-পন্থা ধরে চলার নীতি অনুসরণ করেন তাদের সঙ্গেও সংগ্রাম করা। এই আন্তর্জাতিকটিকে অনেক সময়ে ‘কমিনটার্ন্’ (‘কমিউনিস্ট-ইণ্টারন্যাশনাল’ থেকে) বলা হয়। কমিউনিস্ট মতবাদ প্রচারের কাজে বহু দেশেই এ বিপুল কাজ দেখিয়েছে। নাম থেকেই বোঝা যায় এটি একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, বহু বিভিন্ন দেশের বহু কমিউনিস্ট দলের নির্ধারিত সদস্য নিয়ে তৈরি। কিন্তু রাশিয়াই হচ্ছে একমাত্র দেশ যেখানে কমিউনিজ্‌মের জয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সুতরাং স্বভাবতই কমিনটার্নে রাশিয়াই কর্তৃত্ব করে থাকে। এই কমিনটার্ন্ আর সোভিয়েট সরকার অবশ্যই এক বস্তু নয়; যদিও অনেক লোক আছেন যাঁরা এর দুটিতেই নেতৃস্থানীয় হয়ে কাজ করছেন। কমিনটার্ন্ খোলাখুলি বলে সে বিপ্লবতন্ত্রী কমিউনিজ্‌ম্‌ প্রচারের জন্য গঠিত হয়েছে; অতএব সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলো একে অত্যন্ত অপছন্দ করে, নিজেদের এলাকার মধ্যে এর কার্যকলাপে তারা সর্বদাই বাধা দিতে চেষ্টা করছে।

 পশ্চিম-ইউরোপে যুদ্ধের পরে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিককেও (শ্রমিক এবং সমাজতন্ত্রবাদীদের আন্তর্জাতিক) আবার বাঁচিয়ে তোলা হল। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের লক্ষ বহুলাংশে এক, অন্তত নামে। কিন্তু এদের মতবাদ এবং কর্মনীতিতে অনেক তফাত; দুয়ের মধ্যে কোনোপ্রকার সম্প্রীতিও নেই। পরস্পর এরা যে পরিমাণ কলহ যুদ্ধ আর আক্রমণ চালায়, এদের দু’য়েরই শত্রু, ধনিকতন্ত্রের উপরেও ততটা আক্রমণ এরা করে না। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আজকাল অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত প্রতিষ্ঠান, বহুবার এর বহু সভ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মন্ত্রিসভায় পর্যন্ত স্থানলাভ করেছেন। তৃতীয় আন্তর্জাতিকটা এখনও বিপ্লবপন্থীই হয়ে রয়েছে, সুতরাং এটা আর সম্ভ্রান্ত হয়ে উঠতে পারে নি।

 রাশিয়াতে গৃহযুদ্ধের আগাগোড়া কালটাই রক্ত-বিভীষিকা আর শ্বেত-বিভীষিকার মধ্যে কে কতখানি নির্মম অত্যাচার চালাতে পারে তার পাল্লা লেগে গিয়েছিল; এই পাল্লায় সম্ভবত শেষের দলই প্রথম দলকে বহুদের পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল। সাইবেরিয়াতে কোলচাক্‌কৃত নৃশংসতার যে বিবরণ আমেরিকার সেনাপতিটি দিয়েছেন (এই বিবরণ আমি আগেই উদ্‌ধৃত করেছি) সেটি এবং অন্যান্য লোকেরও প্রদত্ত বিবরণ পড়লে এই কথাই মনে হয়। তবু রক্ত-বিভীষিকাও বেশ নিদারুণ ব্যাপার ছিল এবং তাদের হাতেও নিশ্চয়ই বহু নিরীহ লোকের দুর্গতি সইতে হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। বল্‌শেভিকরা তখন চতুর্দিক থেকেই আক্রান্ত, তাদের ঘিরে অসংখ্য চক্রান্ত আর গুপ্তচরের খেলা, এতে তাদেরও মন উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল; অতি সামান্য সন্দেহ হলেই তারা অত্যন্ত কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করছিল। তাদের পুলিশ বাহিনীর রাজনৈতিক বিভাগটির নাম ছিল ‘চেকা’, এই বিভীষিকা-সৃষ্টির ব্যাপারে সেটি রীতিমতো কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। এটা ছিল ঠিক ভারতবর্ষের সি. আই. ডি.’র সমশ্রেণীর বস্তু; তবে এদের চেয়ে তাদের ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি।

 চিঠিটা বড্ড বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা শেষ করবার আগে আমি লেনিন সম্বন্ধে আরও কিছু কথা তোমাকে বলব। ১৯১৮ সনের আগস্ট মাসে তাঁর প্রাণনাশ করবার একটা চেষ্টা হয়। তিনি এতে আহত হয়েছিলেন, কিন্তু তবুও বিশেষ বিশ্রাম তিনি নিলেন না; অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ সমানে করে যেতে লাগলেন। এর যা ছিল অবশ্যম্ভাবী তাই হল, ১৯২২ সনের মে মাসে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ল। তখন অল্প একটু বিশ্রাম নিলেন, তারপরই আবার কাজে লেগে গেলেন। কিন্তু বেশিদিন আর তাঁকে কাজ করতে হল না। ১৯২৩ সনে আবার তাঁর শরীর আগের চেয়েও খারাপ হয়ে পড়ল। এই অসুস্থতা আর সারল না; ১৯২৪ সনের ২১শে জানুয়ারী মস্কো শহরের কাছে তাঁর মৃত্যু হল।

 অনেক দিন পর্যন্ত তাঁর দেহ মস্কো শহরেই রাখা হল। সেটা শীতকাল, এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ার দ্বারা দেহটাকে টিঁকিয়ে রাখা হচ্ছিল। রাশিয়ার সর্বত্র থেকে, সুদূর সাইবেরিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে দলে দলে মানুষ আসতে লাগল—সাধারণ প্রজা, কৃষক ও শ্রমিক, পুরুষ নারী ও শিশুদের, প্রতিনিধি তারা; তাদের সেই প্রিয় সহকর্মীকে তাদের শেষ অভিবাদন জানাতে—দৈন্যের অতল গহ্বর থেকে যিনি তাদের টেনে তুলেছেন, পূর্ণতর জীবনের পথ চিনিয়ে দিয়েছেন। মস্কোর সুন্দর রেড্ স্কোয়ারে তারা তাঁর জন্য একটি সহজ এবং কারুকার্য বর্ণিত সমাধিমন্দির রচনা করল; আজও সেখানে একটি কাচের আধারে তাঁর দেহ সংরক্ষিত রয়েছে; প্রতি সন্ধ্যায় মানুষের একটি অফুরন্ত শোভাযাত্রা নিঃশব্দে তাকে প্রদক্ষিণ করে প্রণাম জানিয়ে যায়। তিনি মারা গেছেন পুরো দশ বছরও হয় নি, কিন্তু এরই মধ্যে লেনিনের নাম একটা বিশাল ঐতিহ্য সম্পদে পরিণত হয়েছে, কেবল তাঁর নিজের দেশ রাশিয়াতে নয়, সমগ্র পৃথিবীতেই। দিন যত চলে যাচ্ছে মানুষের চোখে লেনিন ততই বড়ো হয়ে উঠছেন; পৃথিবীতে মানুষ যে ক’জন লোককে অমর বলে জেনে রেখেছে তিনিও তাঁদেরই একজন। পেট্রোগ্রাডের নাম হয়েছে লেনিনগ্রাড্; রাশিয়াতে এমন গৃহস্থ প্রায় নেই যার ঘরে একটি লেনিনের বেদী বা লেনিনের ছবি পাবে না। কিন্তু লেনিন বেঁচে রয়েছেন স্মৃতিস্তম্ভ বা ছবির মধ্যে নয়; তিনি যে বিরাট কার্য সাধন করে গেছেন তারই মধ্যে বেঁচে রয়েছেন আজকের কোটি-কোটি শ্রমিকের বুকের মধ্যে, যারা তাঁর জীবন থেকে অননুপ্রেরণা পাচ্ছে, মহত্তর জীবনের আশ্বাস পাচ্ছে।

 তাই বলে লেনিন একটা অমানুষিক কাজের যন্ত্র মাত্র ছিলেন, নিজের কাজ নিয়েই মগ্ন থাকতেন এবং অন্য কিছুর কথাই ভাবতেন না, এমন মনে কোরো না। তাঁর নিজের কাজ, তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য তাঁর সারাক্ষণের সাধনা ছিল সন্দেহ নেই; কিন্তু তারই সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবার ছিলেন একেবারেই আত্মভোলা মানুষ; একটা আদর্শ যেন রূপ পরিগ্রহ করেছিল তাঁর মধ্যে। অথচ অন্যদিকে আবার তিনি ছিলেন একেবারেই সহজ মানুষ; মানুষের প্রকৃতিতে যেটি সহজতার সবচেয়ে বড়ো পরিচয়, প্রাণখুলে উচ্চৈস্বরে হাসতে জানতেন তিনি। সোভিয়েটের প্রথম যুগের বিপদের দিনে মস্কোতে একজন ব্রিটিশ প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁর নাম লকহার্ট। তিনি বলেছেন, যাই কেন হোক না, লেনিনের মন সর্বদাই প্রসন্ন থাকত। “জীবনে যত জন নেতাকে আমি দেখেছি, তাঁর মতো শান্ত মেজাজ আর কারও দেখি নি। এই হচ্ছে এই ব্রিটিশ কূটনীতিক ভদ্রলোকের উক্তি। কথায় এবং কাজে লেনিন ছিলেন যেমন সহজ তেমনই ঋজু; বড়ো বড়ো কথা আর ভড়ংকে অত্যন্ত ঘৃণা করতেন তিনি। সঙ্গীত বড়ো ভালোবাসতেন, এত ভালোবাসতেন যে তাঁর প্রায় ভয় ছিল সংগীতপ্রিয়তাই তাঁর কাল হবে, তাঁর মনকে এত কোমল করে ফেলবে যে তাঁর কাজকর্মেরই শেষে ব্যাঘাত হবে।

 লেনিনের একজন সহকর্মী ছিলেন লুনাচার্‌স্কি, বহু বছর ধরে ইনি বল্‌শেভিক সরকারের শিক্ষা-বিভাগের কমিশার ছিলেন। ইনি একবার লেনিনের সম্বন্ধে একটি আশ্চর্য উক্তি করেছিলেন। লেনিন ধনিকতন্ত্রীদের উচ্ছেদসাধন করেছেন; খৃষ্টও সুদখোর মহাজনদের পূজামন্দির থেকে বার করে দিয়েছিলেন। এই দুটি ঘটনার তুলনা দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন: “খৃষ্ট যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি বলশেভিক হতেন।” ধর্মকে যারা মানে না তাদের মুখে এটা আশ্চর্য উপমা, সন্দেহ নেই।

 নারীদের সম্বন্ধে লেনিন একবার বলেছিলেন: “কোনো জাতিই স্বাধীন হতে পারে না, যতক্ষণ তার জনসংখ্যার অর্ধেক লোক রান্নাঘরে দাসীবৃত্তি করতে বাধ্য থাকে।” একদিন কতকগুলি ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েকে আদর করতে করতে একটা কথা তিনি বলেছিলেন, কথাটি অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। তাঁর পুরোনো বন্ধু ম্যাক্সিম গোর্কী বলেন, তিনি নাকি বলেছিলেন “এদের জীবন সুখের জীবন হবে, তত সুখ আমরা পাই নি। আমাদের অনেক দুঃখকষ্ট সইতে হয়েছে, তা এদের সইতে হবে না। এদের জীবনে অতখানি নিষ্ঠুরতার অস্তিত্ব থাকবে না।” সবাই আমরা সেই আশা করছি।

 এই চিঠিটি আমি শেষ করব রাশিয়ার একটি গান উদ্‌ধৃত করে। এই গানটি অল্পদিন আগে রচিত হয়েছে, পূর্ণ অর্কেস্ট্রা এবং লোকেদের কোরাস গানের জন্য। যাঁরা এই গানটি শুনেছেন তাঁরা বলেন এর সুরটি প্রাণ এবং শক্তিতে ভরপুর। গানটিই যেন বিদ্রোহী জনগণের উন্মাদনার প্রতীক। এর যে অনুবাদটি আমি এখানে উদ্‌ধৃত করছি তাতেও এই উন্মাদনার কিছুটা পরিচয় রয়েছে। গানটির নাম ‘অক্টোবর’—তার মানে হচ্ছে ১৯১৭ সনের নভেম্বর মাসের বলশেভিক বিপ্লব। তখনকার দিনে রাশিয়াতে যে পঞ্জিকা ব্যবহৃত হত সেটা তথাকথিত অসংশোধিত পঞ্জিকা; পাশ্চাত্য জগতে সাধারণত যে পঞ্জিকা প্রচলিত তার থেকে এটা তেরো দিন পিছিয়ে থাকত। এই পঞ্জিকা অনুসারে ১৯১৭ সনের মার্চমাসের বিপ্লব ঘটেছিল ফেব্রুয়ারি মাসে; অতএব তারা তাকে নাম দিয়েছে “ফেব্রুয়ারির বিপ্লব।” তেমনি আবার, বল্‌শেভিক বিপ্লব ঘটেছিল ১৯১৭ সনের নভেম্বর মাসের গোড়ার দিকে, এদের হিসেবে তার নাম হয়েছে “অক্টোবরের বিপ্লব"। এখন রাশিয়া তার পঞ্জিকা বদলে এখনকার সংশোধিত পঞ্জিকা প্রবর্তিত করেছে; কিন্তু এই পুরোনো নামগুলো তারা এখনও ব্যবহার করে। এবার ‘অক্টোবর’ গানটির অনুবাদটা দিই:

আমরা ঘুরে বেড়াতাম, কাজ আর খাদ্য প্রার্থনা ক’রে,
আমাদের হৃদয় বেদনায় অবসন্ন হয়ে থাকত,
কারখানার চিমনিগুলো আকাশের দিকে ইঙ্গিত করত,
সে যেন ক্লান্ত হাত, তাতে মুষ্টি বদ্ধ করবার মতো জোর নেই।
নিস্তব্ধতা ভেঙে যেত আমাদের দুঃখের কথায় বেদনার আর্তনাদে,
তোপধ্বনির চেয়েও তা তীব্র।
হে লেনিন, খেটে খেটে কড়া-পড়া হাত যাদের তাদেরই আকাঙ্ক্ষার তুমি মূর্ত প্রতীক।
আমরা বুঝেছি, লেনিন, আমরা বুঝেছি আমাদের ভাগ্যটাই
হচ্ছে শুধু একটা সংগ্রাম! সংগ্রাম! সংগ্রাম।
শেষ যুদ্ধে তুমিই আমাদের চালিত করেছিলে। সংগ্রাম!
তুমি আমাদের হাতে এনে দিলে শ্রমিকদের জয়।

অজ্ঞতা আর অত্যাচারের উপরে আমাদের এই জয়,
একে আমাদের হাত থেকে কেড়ে নিতে কেউ পারবে না।
কেউ না! কেউ নয়! কখনও নয়! কখনও না!
সবাই আজ তরুণ হয়ে উঠুক, উঠুক সংগ্রামের সাহসী বীর হয়ে
কারণ আমাদের জয়ের নামই যে অক্টোবর!
অক্টোবর। অক্টোবর।
অক্টোবর বার্তা বহন করে এনেছে সূর্যের কাছ থেকে।
অক্টোবর হচ্ছে শত-শতাব্দীর বিদ্রোহী চেতনার প্রতীক!
অক্টোবর! এটা একটা পরিশ্রম, একটা আনন্দ, একটা সংগীত।
অক্টোবর! চাষের মাঠ আর কারখানার কলের পক্ষে সে
একটা পরম সৌভাগ্য!
তাই আমাদের পতাকায় নাম জেগে রইল নবীন যুগের
মানুষের আর লেনিনের!