বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/হর্ষবর্ধন থেকে সুলতান মাহমুদ
৫১
হর্ষবর্ধন থেকে সুলতান মাহ্মুদ
আরব কিংবা সারাসেনদের কাহিনী রেখে চলো অন্যান্য দেশের দিকে একবার তাকাই। আরবজাতি যে সময়ে শক্তিশালী হয়ে উঠল, জয় করল দেশ বিদেশ, এবং আবার হীনবল হয়ে পড়ল, সেই সময়টাতে ভারতবর্ষ, চীন আর ইউরোপে কী ঘটছিল একবার আলোচনা করে দেখা যাক। অবশ্য এর কিছুটা আভাস আমরা ইতিপূর্বে পেয়েছি—৭৩২ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সের টুর্স্-নামক স্থানে চার্ল্স্ মর্টেলের সৈন্যবাহিনীর নিকট আরবদের পরাজয়, মধ্য-এশিয়ায় তাদের আধিপত্য, আর ভারতে সিন্ধুদেশ পর্যন্ত তাদের বিজয়-অভিযান।
প্রথমে ভারতবর্ষের দিকেই তাকানো যাক।
৬৪৮ খৃষ্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর ভারতের রাজনৈতিক অধঃপতন স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। অবশ্য আগে থেকেই এই অধঃপতন শুরু হয়েছিল; হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের বিরোধ এই ব্যাপারটাকে সহায়তা করেছে। হর্ষবর্ধনের জীবিতকালে বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় নি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেই উত্তর-ভারতে কয়েকটি ছোটো ছোটো রাষ্ট্র গড়ে ওঠে; কখনও কখনও এই রাষ্ট্রগুলো প্রতিপত্তি লাভ করেছে, আবার কখনও-বা পরস্পর কেবল ঝগড়াঝাঁটি করেছে। লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, এই অবস্থাতেও হর্ষর মৃত্যুর পরে তিন শতাধিক বৎসর কাল স্থাপত্য ও অন্যান্য সুকুমার শিল্প এবং সাহিত্যের বিশেষ উন্নতি হয়েছিল। ভবভূতি, রাজশেখর প্রভৃতি বিখ্যাত সংস্কৃত সাহিত্যিকগণ এই যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই যুগের কয়েকজন রাজার আমলে শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করেছিল। রাজা ভোজ এঁদেরই একজন; ইনি পৌরাণিক কালের আদর্শ রাজা রূপে পরিণত হয়েছেন, এবং আদর্শ রাজা বলতে আজও লোকে ভোজরাজার নাম করে থাকে।
কিন্তু তথাপি উত্তর-ভারতের অধঃপতন ঘটছিল। দাক্ষিণাত্য উত্তর-ভারতকে পশ্চাতে ফেলে পুনরায় উন্নতির পথে এগিয়ে চলল। ইতিপূর্বে এক পত্রে (৪৪) তোমাকে তখনকার দিনের দাক্ষিণাত্যের অবস্থার কিছুটা আভাস দিয়েছি; চালুক্য, চোল, পহ্লবী আর রাষ্ট্রকূট-সাম্রাজ্যের কাহিনী বলেছি। শঙ্করাচার্যের কথাও তোমাকে বলা হয়েছে; ইনি সারা ভারতে শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলের মনে ভীষণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন; বৌদ্ধধর্ম এ দেশ থেকে প্রায় লোপ পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, শঙ্করাচার্য যখন প্রচার করে বেড়াচ্ছিলেন তখনই কিনা ভারতের প্রবেশদ্বারে এক নতুন ধর্ম এসে হানা দিল! পরবর্তীকালে এই ধর্মই বন্যার মতো বেগে প্রবেশ করে এ দেশে, এবং তাতে করে প্রচলিত আচার-ব্যবস্থায় শুরু হয় বিরাট পরিবর্তন।
আরবগণ অতি দ্রুত ভারতের সীমান্তে এসে উপস্থিত হল, এমনকি হর্ষবর্ধনের জীবিতকালেই কিছুকাল সীমান্তে অবস্থান করে পরে সিন্ধুদেশ দখল করল। ৭১০ খৃষ্টাব্দে সতেরো বৎসর বয়স্ক একটি বালক আরবসৈন্যের পরিচালন-ভার গ্রহণ করে এবং মুলতান পর্যন্ত সমগ্র সিন্ধু-উপত্যকা জয় করে; এই বালকের নাম মহম্মদ বিন কাসিম। ভারতে আরব অধিকারের বিস্তার ঐ পর্যন্ত। খুব চেষ্টা করলে তারা আরও অগ্রসর হতে পারত, বিশেষ বেগ পেতে হত না, উত্তরভারত তখন হীনবল হয়ে পড়েছিল কিনা! আসল কথা এই, আরবরা যদিও চতুষ্পার্শ্বস্থ রাজাদের সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ করছিল, দেশ-জয়ের জন্য তারা কোনো চেষ্টা করে নি। সুতরাং রাজনীতির দিক দিয়ে আরবদের এই সিন্ধুদেশ-জয়ের বিশেষ কোনো তাৎপর্য ছিল না। মুসলমানকর্তৃক ভারত-জয় তো কয়েক শো বছর পরের ঘটনা। কিন্তু সংস্কৃতির দিক থেকে আরবদের সঙ্গে ভারতের অধিবাসীদের এই মিলনের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী।
দাক্ষিণাত্যের ভারতীয় সম্রাটদের সঙ্গে আরবদের খুব সদ্ভাব ছিল, বিশেষ করে রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে। বহু সংখ্যক আরব ভারতের পশ্চিম উপকূলে বসবাস করতে শুরু করল এবং তৈরি করল অনেক মসজিদ। আরব পর্যটক আর ব্যবসায়ীরা ভারতের নানা স্থানে যেতে লাগল। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় তখন চিকিৎসা-শাস্ত্রের জন্যে বিখ্যাত; আরব থেকে দলে দলে বিদ্যার্থীরা এল ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কথিত আছে, হারুন-অল-রশিদের আমলে বোগদাদে ভারতীয় মনীষার খুব আদর ছিল; এবং ভারতীয় চিকিৎসকগণ নাকি সেখানে গিয়ে হাসপাতাল ও চিকিৎসা বিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা করেছিলেন। অঙ্ক এবং জ্যোতিঃশাস্ত্র-সম্পর্কিত অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।
দেখা যাচ্ছে, আরবজাতি প্রাচীন ভারতীয় আর্য-সংস্কৃতি থেকে অনেক-কিছুই গ্রহণ করেছিল। পারশিক এবং যাবনিক বা গ্রীক সংস্কৃতি থেকেও নিয়েছিল অনেক-কিছু। আরবরা বলতে গেলে একটা নূতন জাতি, শক্তি-সামর্থ্যের দিক দিয়ে এই সবে উঠতি সময়; সুতরাং আশেপাশের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে তারা শিখল ঢের এবং তাকে ভিত্তি করেই গড়ে তুলল নিজস্ব সংস্কৃতি—সারাসেনিক সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি অল্পকালের মধ্যেই লোপ পায় বটে, কিন্তু ইউরোপের অন্ধকার মধ্যযুগে এই সংস্কৃতিই চার দিক আলোকিত করেছিল।
ইন্দো-আর্য, পারশিক আর যাবনিক সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে আরবজাতি যথেষ্ট লাভবান হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্য, আরবদের সংস্পর্শে এসে ভারতীয় পারশ্যবাসী কিংবা গ্রীকদের তেমন কোনো লাভ হয় নি। এর হেতু সম্ভবত এই যে, আরবজাতি সবেমাত্র গড়ে উঠেছে; তার নূতন শক্তি, নূতন উদ্যম। ওদিকে, ওরা সব প্রাচীন জাত; পুরাতনের মায়া কাটাতে পারে নি, পরিবর্তনের পক্ষপাতীও ছিল না; সুতরাং চলেছে পুরোনো-চলা পথে। যেমন ব্যক্তিবিশেষের উপরে, তেমনি একটা জাতির উপরেও, বয়স একই রকমের প্রভাব বিস্তার করে থাকে। অদ্ভুত ব্যাপার! বয়স কোনো লোক কিংবা জাতির চলৎশক্তি রহিত করে, হ্রাস করে মনের প্রসারতা, শরীরের শক্তি; তাকে করে তোলে রক্ষণশীল আর পরিবর্তনবিরোধী!
সুতরাং আরবদের সঙ্গে কয়েক শো বছরের মেলামেশার ফলেও ভারতীয়দের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় নি। তবে এই দীর্ঘকালের মধ্যে ভারতবর্ষ নিশ্চয়ই নূতন ইসলামধর্ম সম্বন্ধে কিছু জেনে থাকবে। কেননা, মুসলমান আরবগণ সর্বদাই আসা-যাওয়া করেছে, এখানে-সেখানে মসজিদও তৈরি করেছে; তা ছাড়া কখনও কখনও ধর্ম প্রচার করেছে, দীক্ষাও দিয়েছে। সেকালে এসব ব্যাপারে কোনো বাধানিষেধ ছিল না; হিন্দু আর ইসলামধর্মের মধ্যে বিরোধ কিংবা সংঘর্ষও বাধে নি কোনো। এটা লক্ষ্য করবে। কেননা, পরবর্তীকালে এই দুটো ধর্মের মধ্যে বিরোধ আর সংঘর্ষ ঘটেছে। একাদশ শতাব্দীতে যখন মুসলমানগণ তলোয়ার হাতে বিজয়ীর বেশে ভারতে প্রবেশ করল তখন এ দেশে দেখা দিল একটা দারুণ প্রতিক্রিয়া; যুগযুগান্তের পরমতসহিষ্ণুতার ভাব অন্তর্হিত হল, তার স্থান গ্রহণ করল বিদ্বেষ আর বিরোধ।
এই বিজয়ীর বেশে ভারতে এল গজনির মাহমুদ; সঙ্গে আনল নিষ্ঠুর হত্যা আর অগ্নিকাণ্ড। বর্তমানে গজনি আফগানিস্থানের একটি ছোটো শহর। দশম শতাব্দীতে গজনির আশেপাশে একটা রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। মধ্য-এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো নামেমাত্র বোগদাদের খলিফার অধীনে ছিল। তোমাকে তো পূর্বেই বলেছি, হারুন-অল-রশিদের মৃত্যুর পরে ক্রমশ খলিফার ক্ষমতা হ্রাস পায়; অবশেষে এক সময়ে তার সাম্রাজ্য যায় ভেঙে, গড়ে ওঠে গোটা-কতক স্বাধীন রাষ্ট্র। ঠিক এই সময়কার ইতিহাসই আমরা এখন আলোচনা করছি। তুর্কি ক্রীতদাস সবুক্তগীন ৯৭৫ খৃষ্টাব্দে গজনি এবং কান্দাহারে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সবুক্তগীন ভারতবর্ষও আক্রমণ করেছিলেন। ঐ সময়ে লাহোরের রাজা ছিলেন জয়পাল, বেজায় দুঃসাহসী লোক। জয়পাল সসৈন্যে কাবুল-উপত্যকায় প্রবেশ করলেন, কিন্তু যুদ্ধে সবুক্তগীনের নিকট পরাস্ত হলেন।
সবুক্তগীনের মৃত্যুর পর রাজা হলেন মাহ্মুদ। ইনি ছিলেন অতি বিচক্ষণ একজন সেনাপতি, আর উৎকৃষ্ট অশ্বারোহী সেনানায়ক। মাহ্মুদ বছরের পর বছর ভারত আক্রমণ করেছেন; হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন দারুণ নিষ্ঠুরভাবে আর লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছেন রাশি রাশি ধনরত্ন। মোট সতেরো বার তিনি ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিলেন; কিন্তু মাত্র একবারের আক্রমণ ব্যর্থ হয়—কাশ্মীর-আক্রমণ। তা ছাড়া তাঁর প্রতিটি আক্রমণ সফল হয়েছিল; সারা উত্তর-ভারতে তিনি দারুণ ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দক্ষিণে পাটলিপুত্র, মথুরা এবং সোমনাথ পর্যন্ত তিনি অভিযান করেছিলেন। থানেশ্বরের যুদ্ধে জয়লাভ করে তিনি দুই লক্ষ বন্দী আর প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে স্বদেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ধনরত্ন লণ্ঠন করেছেন সোমনাথে। প্রাচীনকাল থেকে সোমনাথের মন্দিরে অগাধ ধনরত্ন সঞ্চিত ছিল। কথিত আছে, মাহ্মুদ আক্রমণ করতে আসছে খবর পেয়ে হাজার হাজার লোক এই মন্দিরে আশ্রয় নেয়; ওরা আশা করেছিল অলৌকিক কিছু ঘটবে, মন্দিরের দেবতা রক্ষা করবে তাদের। কিন্তু কী জানো, অলৌকিক ঘটনা বড়ো একটা ঘটে না—বিশ্বাসীদের কল্পনাতেই এর স্থান। মাহ্মুদ মন্দির ভেঙে ফেললেন, লুণ্ঠন করে নিলেন সব-কিছু। পঞ্চাশ হাজার লোক ধ্বংস হল সেখানে। ওরা অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু দৈব ঘটনা ঘটল না।
১০৩০ খৃষ্টাব্দে মাহ্মুদের মৃত্যু হয়। সমগ্র পাঞ্জাব আর সিন্ধুদেশ তাঁর আধিপত্য স্বীকার করেছিল। লোকে মনে করে, ইসলামধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ভারতে এসেছিলেন; তাই মুসলমানরা তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে, আর হিন্দুরা দেখে বিদ্বেষের চোখে। আসলে মাহ্মদ ধর্মের ধার বড়ো-একটা ধারতেন না। তিনি মুসলমান ছিলেন বটে, কিন্তু সেটা বড়ো কথা নয়। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকার সৈনিক, কুশলী নিপুণ যোদ্ধা। মাহ্মুদে ভারতে এসেছিলেন জয়ের উদ্দেশ্যে, বিপুল ধনরত্ন লুণ্ঠনের আশায়। সৈনিকদের কাজই এই। সুতরাং যে ধর্মের লোকই তিনি হতেন না কেন, লুটপাট তিনি করতেনই। আশ্চর্য যে, সিন্ধুর মুসলমান রাজাদেরও তিনি শাসিয়েছিলেন; বশ্যতা স্বীকার করে এবং কর দিয়ে তবে তারা রক্ষা পায়; এমনকি, বোগদাদের খলিফাকেও তিনি হত্যার ভয় দেখিয়েছিলেন, তাঁর কাছে সমরকন্দ দাবি করেছিলেন। সুতরাং মাহ্মদেকে একজন কৃতী সৈনিক ছাড়া আর কিছু মনে করা ভুল। ⋅
অনেক ভারতীয় মিস্ত্রি আর কারিগরকে মাহ্মুদ গজনি নিয়ে গিয়েছিলেন এবং এদের দিয়ে সেখানে অতি সুন্দর একটি মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন, নাম দিয়েছিলেন ‘স্বর্গের পরী’।
মথুরা নাকি তখন সমৃদ্ধিশালী নগরী ছিল। মাহ্মুদ গজনির শাসনকর্তার নিকট লিখেছিলেন: “মথুরায় হাজার হাজার সুন্দর সুদৃঢ় অট্টালিকা আছে। বহু লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয়ব্যতীতই যে এই নগরী বর্তমান উন্নত অবস্থায় এসে পৌঁচেছে তা মনে হয় না, এবং দুশো বছরের মধ্যেও এরূপ আর একটি শহর গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি নে।”
মাহ্মুদ প্রদত্ত মথুরা নগরীর এই বর্ণনা ফির্দৌশির বইয়ে আছে। মাহ্মুদের সময়ে বিখ্যাত পারশিক কবি ফির্দৌশি ‘শাহ্নামা’ রচনা করেছিলেন। গত বছর তোমাকে লিখিত এক চিঠিতে আমি ফির্দৌশি এবং তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ শাহ্নামার উল্লেখ করেছিলাম। কথিত আছে, মাহ্মুদের অনুরোধেই কবি ‘শাহ্নামা’ রচনা করেন; প্রতি লাইনের একটি শ্লোকের জন্যে মাহ্মুদ কবিকে একটি স্বর্ণমুদ্রা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ফির্দৌশি সংক্ষেপে সারবার লোক ছিলেন না; রচনা করলেন হাজার হাজার শ্লোক—বিরাট কাব্য। মাহ্মুদ প্রশংসা করলেন যথেষ্ট, কিন্তু প্রতিশ্রুত স্বর্ণমুদ্রা দিতে পারলেন না; অবশ্য তিনি কিছু দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা প্রতিশ্রুত অর্থের চেয়ে ঢের কম। তাই ফির্দৌশি রাগ করে কিছুই নিলেন না।
হর্ষ থেকে মাহ্মুদ, প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক বৎসরের ভারতের ইতিহাসের আলোচনা মাত্র কয়েকটি অনুচ্ছেদে শেষ করা গেল। এই দীর্ঘকালের ইতিহাস সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য আরও অনেক-কিছুই হয়তো বলা যেত। কিন্তু তেমন কোনো কথা আমার জানা নেই, সুতরাং চুপ করে যাওয়াই ভালো। অবশ্য, সে যুগের রাজারাজড়া এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদের কাহিনী বলতে পারি; পাঞ্চালরাজ্যের মতো উত্তর-ভারতের অন্যান্য বড়ো বড়ো রাজ্যগুলোর ইতিহাস কিংবা কনৌজ নগরের ভাগ্যবিপর্যয়ের কাহিনীও বলা যায় বটে, কিন্তু প্রয়োজন নেই; বরং তাতে করে তোমার সব গোল পাকিয়ে যাবে।
ভারতের ইতিহাসে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষ সীমায় এসে পৌঁচেছি, এখানে নূতন এক অধ্যায়ের শুরু। ইতিহাসকে বিভিন্ন কোঠায় ভাগ করা দূরহ ব্যাপার এবং সেটা সমীচীনও নয়। প্রবহমান নদীর মতো এই ইতিহাস—বয়ে চলেছে তো চলেইছে। তবে কিনা তারও পরিবর্তন হয়; এক অঙ্ক শেষ হয়ে শুরু হয় আর-এক অঙ্ক। কিন্তু এইসব পরিবর্তন নেহাত অতর্কিতে ঘটে না। ধীরে ধীরে নূতন যুগ পুরোনো যুগকে ছায়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। যাই হোক, ভারতেতিহাসে একটি অঙ্কের প্রান্তসীমায় এসে আমরা পৌঁচেছি। হিন্দুযুগ শেষ হয়ে আসছে; হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ইন্দো-আর্য সংস্কৃতিকে এখন বোঝাপড়া করতে হবে আর এক নবাগতের সঙ্গে। কিন্তু মনে রেখো, এই পরিবর্তন সহসাই ঘটে নি, হবে আস্তে আস্তে হয়েছে। মাহ্মুদের সঙ্গে ইসলামধর্মও এসেছিল উত্তর ভারতে। কিন্তু মুসলমান-বিজয়ের এই ঢেউ দাক্ষিণাত্যে এসে লাগে নি অনেক কাল; আর বাংলাদেশ তো তার পরেও দু শো বছর-কাল ঐ প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল। উত্তরে চিতোর-রাজ্য; বিভিন্ন রাজপুত জাতিগুলো সমবেত হয়েছিল এখানে। পরবর্তীকালের ইতিহাসে অসম সাহস আর বীরত্বের জন্যে চিতোর খ্যাতিলাভ করেছে। সে যাই হোক, মুসলমান আধিপত্য ক্রমশ বিস্তার লাভ করছিল এবং তাকে ঠেকাবার সাধ্য কারও ছিল না। সুপ্রাচীন ইন্দো-আর্য ভারতের অধঃপতন শুরু হয়েছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইন্দো-আর্য সংস্কৃতি পারল না বিদেশী বিজেতাকে ঠেকিয়ে রাখতে; আত্মরক্ষা করা ছাড়া উপায় রইল না আর। আশ্রয় নিল গণ্ডির মধ্যে, খাড়া করল একটা আবরণ। কঠোরতর করা হল বর্ণভেদ প্রথা, হরণ করা হল নারীজাতির স্বাধীনতা, এবং এমনকি, গ্রাম্য পঞ্চায়েত প্রথাও ক্রমে অবনতির দিকে গেল। অধিকতর শক্তিশালী লোকের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়েছিল বটে, কিন্তু তথাপি এই সুপ্রাচীন সংস্কৃতি ওদের উপরে প্রভাব বিস্তার করেছে, নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে নূতনের সঙ্গে। আশ্চর্য, নূতনকে গ্রহণ এবং নিজস্ব করার এতটা ক্ষমতা এর ছিল যে, শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতির দিক থেকে হার মানতে হল বিজেতাকে।
মনে রাখবে, এই বিরোধ ইন্দো-আর্য সভ্যতা আর সুসভ্য আরবজাতির মধ্যে নয়। এক দিকে সভ্য অথচ ক্ষয়িষ্ণু ভারত, অপর দিকে মধ্য-এশিয়ার অর্ধসভ্য এবং সদ্য ইসলামধর্মে দীক্ষিত যাযাবরজাতি—বিরোধ ঘটেছিল এ দুয়ের মধ্যে। দুঃখের বিষয়, ভারত ঐ অ-সভ্যতা আর মাহ্মুদের আক্রমণের বিভীষিকার সঙ্গে ইসলামধর্মকেও জড়িত করে ফেলল এবং তার থেকেই হল তিক্ততার সৃষ্টি।