বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’
৩
‘ইন্কিলাব জিন্দাবাদ’
চোখের সামনে যখন থাকো তখন তুমি প্রিয়দর্শিনী। চোখের আড়ালে রয়েছ বলে তোমায় যেন আরও বেশি করে ভালো লাগে।
আজ তোমাকে চিঠি লিখতে বসে মনে হল, সুদূর মেঘগর্জনের মতো যেন বহু কণ্ঠের একটা অস্ফুটে গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি। প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারি নি, শুধু মনে হল শব্দটা যেন চেনা-চেনা, যেন বুকের মধ্যে তার অনুরণন বাজছে। জনতা নিকটতর হলে কথাগুলোও স্পষ্টতর হল, আর বুঝতে বাকি রইল না। ‘ইন্কিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে সমস্ত কারাগার মুখর হয়ে উঠল। মনটা খুশিতে ভরে উঠল। আমাদের এত কাছাকাছি, কারাপ্রাচীরের ঠিক অপর পাশেই কারা যে বিপ্লবের বাণী ঘোষণা করে চলে গেল জানি না। হয়তো তারা এই শহরেরই লোক, হয়তো তারা গাঁ থেকে এসেছে—কৃষকের দল। নাই-বা জানলাম ওরা কোথাকার লোক—ওদের ওই নূতন যুগের আবাহনমন্ত্রে আমাদের সমস্ত মন যেন নীরবে সাড়া দিল।
‘ইন্কিলাব জিন্দাবাদ’ এই বাণীর অর্থ কী? কেনই-বা আমরা বিপ্লব চাই? ভারত আজ অনেক কিছু নূতন করে গড়তে চায়। যে বিরাট পরিবর্তন আমরা আনতে চাই তা যখন সার্থক হবে, যখন আমরা স্বরাজ পাব, তখনও কিন্তু আমাদের চুপচাপ বসে থাকা চলবে না। প্রাণবস্তু যা-কিছু, তার ক্রমাগত অদলবদল ঘটছে। সমস্ত প্রকৃতি প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে নিত্যনূতন হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। একমাত্র প্রাণহীন জড়পদার্থ অচল হয়ে বসে থাকে। উৎসধারা আপনার বেগে বেরিয়ে যেতে চায়, তাতে যদি বাধা দাও তা হলে সে অপরিচ্ছন্ন ডোবায় পরিণত হবে, আপনাকে নিরর্থক করে দেবে। মানুষ কিংবা জাতির জীবনটাও এইরকম একটা অব্যাহত ধারা। আমাদের ইচ্ছা থাক্ বা না থাক্ আমরা বড়ো হবই। খুকিরা বয়সে বেড়ে হয় ছোটো ছোটো মেয়ে, আবার ছোটো ছোটো মেয়েরা পরিণত হয় বড়ো বড়ো মেয়ে ও বয়স্কা মহিলাতে এবং পরিণতবয়স্কা মহিলারা কালক্রমে বৃদ্ধা হন। এসকল পরিবর্তন-পরিবর্ধন মেনে নিতেই হবে। কিন্তু অনেকে আছেন যাঁরা জগতের পরিবর্তন স্বীকার করতে চান না। তাঁরা তাঁদের মনের দুয়ার রুদ্ধ ও অর্গলবদ্ধ করে রাখেন, যাতে করে কোনো নূতন ভাবধারা তাতে প্রবেশ করতে না পারে। চিন্তাশক্তি-পরিচালনার কথা ভাবতেই তাঁরা যৎপরোনাস্তি ভীত হন। ফল কী দাঁড়ায়? তাঁদের সাহায্য ব্যতীতও দুনিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু তাঁরা এবং তাঁদের মতোই অন্যান্য লোকেরা নিজেদের জাগতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারেন না সেজন্যেই মাঝে মাঝে বিরাট অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়; এক শো চল্লিশ বছর আগেকার ফরাসি বিপ্লব বা তেরো বছর আগেকার রুশ বিপ্লবের মতো বড়ো বড়ো বিপ্লব ঘটে থাকে। সেইরূপ আমাদের দেশে এখন আমরা একটা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। আমরা অবশ্যই স্বাধীনতা চাই—কিন্তু তার চেয়েও আরও কিছু বেশি চাই। আমরা সব আবদ্ধ জলাশয়গুলির রুদ্ধ গতিপথ মুক্ত করে দিয়ে সর্বত্র জলপ্রবাহ আনতে চাই। আমাদের দেশ থেকে দুঃখ-দৈন্য-মলিনতা ঝেঁটিয়ে দূর করতেই হবে। আর যতদূর পারা যায়, দূর করতে হবে বহু লোকের মনের আবরণস্বরূপ সেই মাকড়সার জাল, যা তাদের চিন্তাশক্তি লুপ্ত করে দিয়েছে এবং আমাদের মহৎ কাজে তাদের সহযোগিতার পথে অন্তরায় হয়ে রয়েছে। এটা খুব বড়ো কাজ—হয়তো এতে সময়ও লাগবে যথেষ্ট। লাগাও ধাক্কা, হেঁইও জোয়ান, ইন্কিলাব জিন্দাবাদ!
বিপ্লবের দুয়ারে এসে আমরা আজ দাঁড়িয়ে আছি। ভবিষ্যৎ কী বহন করে আনবে তা জানি না, তবে বর্তমানেও আমাদের শ্রমের প্রভূত পুরস্কার তো আমরা পেয়েছি। আজ দেশের মেয়েদের দিকে তাকিয়ে দেখো—কী গর্বভরে তাঁরা এই আন্দোলনে সবার আগে এগিয়ে চলেছেন। শান্ত অথচ দুর্দম এই বীরাঙ্গনাদের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজ সবাইকে চলতে হচ্ছে। যে পর্দার অভিশাপের আড়ালে এঁরা আত্মগোপন করেছিলেন, আজ সে পর্দা কোথায়? অতীত যুগের বহু নিদর্শনের সঙ্গে যাদুঘরে তা স্থান পেতে চলেছে।
কেবল মেয়েদের কেন, শিশুদেরও দেখো, তাদের বানর-সেনা, বালসভা, বালিকাসভার দিকে তাকাও। এইসব বালকবালিকাদের বাপ-পিতামহ কেউ কেউ হয়তো অতীত কালে ভীরুর মতো ব্যবহার করেছে, বিজাতীয়ের দাসত্ব করেছে। এ যুগের ছেলেমেয়েরা ভীরুতা কিংবা গোলামি কোনোটাই বরদাস্ত করবে না—সে কথা বুঝতে আজ আর কারও বাকি নেই।
কালের চাকা ঘুরে চলেছে, যারা তলায় চাপা পড়ে ছিল তারা আজ উপরে উঠে আসছে, উপরওয়ালারা নেমে যাচ্ছে নীচে। এ দেশের চাকা ঘোরার সময় এসেছে এবার। চাকার গায়ে কাঁধ লাগিয়ে এবার আমরা এমন ধাক্কা দেব যে, সে চাকার ঘূর্ণি আর কেউ থামাতে পারবে না।
ইন্কিলাব জিন্দাবাদ!