বিষয়বস্তুতে চলুন

বিষম ভ্রম (প্রথম অংশ)/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

অষ্টম পরিচ্ছেদ

 পর দিবস আমি নুর মহম্মদের অনুসন্ধানে বহির্গত হইলাম। প্রায় অর্দ্ধ ঘণ্টা পরে সহরের প্রান্তস্থিত একটা ভয়ঙ্কর ও বিপদসঙ্কুল স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। বলা বাহুল্য, এই স্থানটী চোর ও হত্যাকারীদিগের দ্বারা একেবারে পরিপূর্ণ। একটী সঙ্কীর্ণ গলির মধ্যে প্রবেশ করিয়া সম্মুখে একখানি জীর্ণ ও অপরিষ্কার কাঠের বাড়ী দেখিতে পাইলাম। এই সময় আমার বেশভূষা দেখিয়া সকলেই মনে করিতে পারেন, আমি একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় মুসলমান। আমি ঐ বাড়ীর দরজায় উপস্থিত হইয়া কড়া নাড়িতে লাগিলাম। ভিতর হইতে উত্তর আসিল। “ভিতরে এস।”

 আস্তে আস্তে দরজা খুলিয়া বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম, একটী যুবতী স্ত্রীলোক প্রাঙ্গনে দণ্ডায়মান আছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম “এই স্থানে কোন দাই থাকে?”

 স্ত্রী। হাঁ থাকে!

 আমি। আমার একটী ভাল দাইর আবশ্যক।

 স্ত্রী। বেশ, আমি আপনার কার্য্য করিব। ঘরের মধ্যে আসুন।

 বলা বাহুল্য, আমি তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া একখানি তক্তাপোষের উপর উপবিষ্ট হইলাম। স্ত্রীলোকটী আমার পার্শ্বে আসিয়া উপবেশন করিল। ঠিক এই সময় একটী যণ্ডাকৃতি লোক একখানি বৃহৎ ছুরিকা হস্তে ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া কহিল “কি তোমার এত বড় আম্পর্দ্ধা! আমার স্ত্রীর সহিত একত্র বসিয়া আছ।”

 আমি। না, না। আমি এই স্থান হইতে প্রস্থান করিতেছি।

 আগ। তাহা হইবে না। আমি তোমাকে নিশ্চয়ই হত্যা করিব।

 এই বলিয়া সে আমাকে সজোরে ধরিয়া ছোরা দেখাইতে লাগিল।

 আমি। আমাকে মাপ করুন।

 আগ। না, তাহা হইবে না। আমি তোমাকে নিশ্চয়ই হত্যা করিব।

 আমি। দোহাই তোমার। আমাকে হত্যা করিও না।

 এই সময় স্ত্রীলোকটী বলিয়া উঠিল “মহম্মদ, উহাকে খুন করিও না।”

 আগ। ইহাকে হত্যা করিবই। সঙ্গে সঙ্গে তোমাকেও খুন করিব।

 স্ত্রী। আচ্ছা, তাহা হইলে মামাকে উহার সহিত একটী কথা কহিতে দাও।

 আগ। শীঘ্র কহিয়া লও। তাহার পর আমি তোমাদিগের উভয়কেই হত্যা করিব।

 স্ত্রীলোকটী আমার নিকট আসিয়া বলিল “দেখুন, আমার স্বামী নিতান্ত অসভ্য। উহাকে আপনি টাকা দিতে স্বীকার করুন। তাহা হইলে আপনাকে ছাড়িয়া দিবে।”

 আমি। আমার নিকট ত টাকা নাই!

 আমার কথা শুনিতে পাইয়া আগন্তুক বলিয়া উঠিল “যদি ২০০ টাকা দাও, তবেই ছাড়িয়া দিব। নতুবা তোমার নিস্তার নাই।”

 আমি। আমার নিকট টাকা নাই।

 আগন্তুক। তাহা হইলে প্রস্তুত হও। এখনই তোমাকে খুন করিব।

 আমি। কি? খুন করিবে?

 আমার কথা শুনিয়া লোকটী ছুরিকা হস্তে অগ্রসর হইতে লাগিল। আমিও একেবারে নিরস্ত্র ছিলাম না। পকেট হইতে পিস্তল বাহির করিয়া কহিলাম “নুর মহম্মদ, সাবধান।” আমার কথা শুনিয়া আগন্তকের মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। তাহার হস্ত হইতে ছুরিকা ভূতলে পতিত হইল। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীলোকটীও চীৎকার করিয়া উঠিল।

 আমি কহিলাম “যদি তোমরা কোনরূপ গোলমাল কর, তাহা হইলে উভয়কেই এই পিস্তলের সাহায্যে শমন- সম্বনে প্রেরণ করিব।” এই বলিয়া আমি পকেট হইতে লৌহ শৃঙ্খল বাহির করিয়া উহা মহম্মদের হস্তে পরাইয়া দিলাম। স্ত্রীলোকটি বসিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিল। আমি মহম্মদকে জিজ্ঞাসা করিলাম “আচ্ছা, বালিকাটীকে চুরি করিবার পর কোথায় লইয়া গিয়াছিলে? মিথ্যা কথা বলিও না। ইস্মাইল সমস্তই স্বীকার করিয়াছে।”

 নহ। কি, ইম্মাইল সমস্ত প্রকাশ করিয়া ফেলিয়াছে?

 আমি। হাঁ! এক্ষণে তুমি সমস্ত কহিতে বাধ্য হইবে।

 নহ। আচ্ছা, যদি আমি সমস্ত প্রকাশ করি, তাহা হইলে আপনি আমাকে ছাড়িয়া দিবেন?

 আমি। তাহা আমি বলিতে পারি না, তবে চেষ্টা করিয়া দেখিব।

 মহ। বালিকাটীকে লইয়া আমরা বিয়ামের গৃহে গমন করি।

 এই বলিয়া মহম্মদ চুপ করিল। আমি তাহাকে লইয়া থানায় আসিয়া তাহাকে ফাটকে আবদ্ধ করিয়া বাসায় প্রত্যাগমন করিলাম।